প্রথম খণ্ড

পুঁথি-লিখন


জয় শিশু গদাধর,          প্রভু পরম ঈশ্বর,
        জয় জয় যত ভক্তগণ ।
পদরজ সবাকার,     মাগিতেছি বার বার,
        ভক্তিহীন পামর অধম ॥ ১ ॥

ক্রমে প্রভু বয়োধিকে,    সাঙ্গ কেবল কাঠাকে, 
        অল্প অল্প বর্ণ-পরিচয় ।
কিন্তু হস্তলিপি তাঁর,      গোটা গোটা দীর্ঘাকার, 
        পরিষ্কার হৈল অতিশয় ॥ ২ ॥

পাঠশালে বিদ্যার্জন,      এই তক্ সমাপন,
        উচ্চ শিক্ষা নাই কোন কালে ।
বংশের যেমন রীতি,   ব্যাকরণ ন্যায় স্মৃতি,
        শাস্ত্র আদি শিক্ষা করা টোলে ॥ ৩ ॥

শুন মন অতঃপর,         কি করেন গদাধর,
        পাঠশালা করি পরিত্যাগ ।
রামকৃষ্ণায়ন-পুঁথি,     লিখিবারে দিবারাতি,
        অন্তরে জনমে অনুরাগ ॥ ৪ ॥

এক পুঁথি লেখা তাঁর,  দীর্ঘাক্ষয়ে চমৎকার,
        দেখিয়াছি আপন নয়ন ।
সুবাহুর পালা সেটি,   লেখা অতি পরিপাটি, 
        হেলায় পড়িবে অন্ধজনে ॥ ৫ ॥

সাঙ্গ দিন-নিরূপণ,            বার শ ছাপান্ন সন,
        ঊনবিংশ আষাঢ় মাহায় ।
প্রার্থনা করিয়া রামে,  রাখিতে তাঁরে কল্যাণে,
        শ্রীপ্রভুর স্বাক্ষর তাহায় ॥ ৬ ॥

কখন ভকতিভরে,       পুজা হয় রঘুবীরে,
        নানা ফুলে গাঁথি ফুলহার ।
কভু উচ্চে রামনাম,    গাইতেন অবিরাম,
        প্রভুর অঙ্কুর সাধনার ॥ ৭ ॥

রঙ্গ-রস-পরিহাসি,    লয়ে যত প্রতিবাসী,
        হাসিরাশি প্রকাশি বয়ানে ।
শুনিতে কীর্তন যাত্রা,   সঙ্গিসহ হয় যাত্রা,
        পল্লীগ্রামে যা হয় সেখানে ॥ ৮ ॥

অরুণ-উদয় আগে,      যেইরূপ পূর্বভাগে,
        নানারাগে রক্তিম বরণ ।
জগৎ-লোচন রবি,      কিরণ-আকর ছবি,
        প্রায়াগত প্রকাশে লক্ষণ ॥ ৯ ॥

বালক বালার্ক-রূপ,     তেমতি প্রভুর রূপ,
        অপরূপ দিন দিন উঠে ।
মর্মগ্রাহী সুচতুর,        প্রতিবাসী শ্রীপ্রভুর,
        সময় বুঝিয়া সঙ্গে জুটে ॥ ১০ ॥

হয় কথা ইশারায়,  অন্যে না বুঝিতে পায়,
        বোবায় বোবায় যেন ভাষ ।
শ্রী প্রভুর নরলীলা,      ধরায় বৈকুণ্ঠ মেলা,
        লেখনীতে না হয় প্রকাশ ॥ ১১ ॥

এবে নিকটস্থ গ্রামে,    গদাই ঠাকুরে ক্রমে,
        চিনিতে লাগিল লোকজন ।
গদাই বুঝিয়া স্থান,     গ্রাম গ্রামান্তরে যান,
        বহুলোকে করে আবাহন ॥ ১২ ॥

একে বয়ঃ সুকুমার,   রূপ-লাবণ্য-আগার,
        দীপ্তিমান বয়ান সুন্দর ।
গুণটানা শরাসন,      অল্প বাঁকা দু'নয়ন,
        ত্রিভুবন-জন-মনোহর ॥ ১৩ ॥

প্রশস্ত কপোল তলে,      সুদীর্ঘ কুন্তল খেলে,
        মুখদ্যুতি অর্ধ আবরণ ।
শতগুণে শোভা বাড়ে,   যখন জলবে ঘেরে,
        শরতের চন্দ্রিমা কিরণ ॥ ১৪ ॥

নাসা অতি পরিপাটি,      রক্তিম অধর দুটি,
        সুবিশাল বক্ষ মনোহর ।
বাহুযুগ সুললিত,         দুলে আজানুলম্বিত,
        মধ্যদেশ বড়ই সুন্দর ॥ ১৫ ॥

কায়মত পদদ্বয়,            ভকত-লালসালয়,
        হৃদিরত্ন সেব্য কমলার ।
সৌন্দর্যের ছবিখানি, কণ্ঠে ফুটে মিঠা বাণী,
        মোহনত্ব নহে বলিবার ॥ ১৬ ॥

শ্যাম-শ্যামা গুণগান,            মধুর গদাই গান,
        মনপ্রাণ মুগ্ধ যেই শুনে ।
কভু না ভুলিতে পারে,  থেকে থেকে মনে পড়ে,
        কি ছিল জানি না কিবা গানে ॥ ১৭ ॥
   
গ্রামের রমণীগণ,         গদাধরে মুগ্ধ মন,
        রূপে গুণে তন্ময় সকলে ।
হেরে তাঁরে সদা সাধ, দারুণ হৃদে বিষাদ,
        সাধে বাদ জঞ্জাল ঘটিলে ॥ ১৮ ॥

প্রভুসঙ্গে তা' সবার,      কি প্রকার ব্যবহার,
        বলিবার কথা নহে মন ।
ভিতরে সুন্দর কাণ্ড,        কাঁচা মন লণ্ডভণ্ড,
        সেই হেতু রাখিনু গোপন ॥ ১৯ ॥

আভাস সঙ্কেতে কই,     মিষ্টিমাখা চিড়া-দই,
        প্রভু বই নাহি জানে আর ।
গোপনে অনেক নারী,    গড়িয়ে দিত বাঁশরী,
        ভাঙ্গিয়া গায়ের অলঙ্কার ॥ ২০ ॥

গুপ্তমুখ কুলবালা,         গেঁথে দিত ফুলমালা,
        যেন সাধ্য মিষ্ট ভোজ্য কিনে ।
কেহ পুত্র নির্বিশেষে,      গদাধরে ভালবাসে,
        সমাদরে পরম যতনে ॥ ২১ ॥

ভগবৎ-ভক্ত যারা,          মহানন্দ পায় তারা,
        শুনে কাছে ঈশ্বর প্রসঙ্গ ।
হাস্য-রস সকৌতুক,     কিসে নহে পরাঙ্মুখ,
        নানা রঙ্গ রসের তরঙ্গ ॥ ২২ ॥

বাল্যাবধি শ্রীপ্রভুর,           শুনিয়াছি যতদূর,
        যাওয়া আসা ছিল নানা স্থানে ।
বিশেষে শিয়ড় গ্রাম,        যথা হৃদয়ের ধাম,
        সম্পর্কেতে হৃদয় ভাগিনে ॥ ২৩ ॥

হৃদুসঙ্গে সম্মিলন,        এবে হ'তে বিলক্ষণ,
        সংঘটন হইল তাঁহার ।
পরস্পর বড় প্রীতি,        হৃদু ভাগ্যবান অতি,
        পশ্চাৎ গাইব সমাচার ॥ ২৪ ॥