প্রথম খণ্ড

খেলাছলে আসন-প্রদর্শন


জয় জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


দেখ মন যা খেলিলা বালক গদাই ।
বুঝিবারে বালকের কৃপাকণা চাই ॥ ১ ॥

না দেখিতে পেলে লীলা বুঝা বড় দায় ।
চাঁদের কিরণ যেন চাঁদেতে মিশায় ॥ ২ ॥

না হইলে চক্ষুষ্মান কে দেখিতে পারে ।
থালার মতন চাঁদ কত আলো ধরে ॥ ৩ ॥

দিন দিন যায় যত বাড়ে বয়ঃক্রম ।
দেখান সবারে খেলা নূতন নূতন ॥ ৪ ॥

কেহ না বুঝিতে পারে কি ভিতরে তাঁর ।
বিনা দুই-এক আর চিনু শঙ্খকার ॥ ৫ ॥

এখন শ্রীপ্রভুদেব না বলিয়া কারে ।
থাকিতেন দুই-চারি দিন স্থানান্তরে ॥ ৬ ॥

কোথায় গমন কিবা স্থান কোন্ খানে ।
সে তত্ত্ব সুগুপ্ত কেহ কিছু নাহি জানে ॥ ৭ ॥

লুপ্ত পূর্বকার ভাব নাহিক উল্লাস ।
চিন্তাতুর মুখভার উদাস উদাস ॥ ৮ ॥

শৈশব হইতে আজিতক নিরন্তর ।
রঙ্গ-রস-পরিহাস কতই রগড় ॥ ৯ ॥

বঞ্চিলেন আগাগোড়া যাহারের সনে ।
তারাও কহিলে কথা নাহি চান পানে ॥ ১০ ॥

বহু জেদ অনুরোধ করিবার পর ।
বিষাদিত ক্ষুব্ধচিতে দিতেন উত্তর ॥ ১১ ॥

বৃথা কাজে অনর্থক এত দিন গেল ।
সুন্দর সে হরি তাঁর তত্ত্ব না হইল ॥ ১২ ॥

বিষয়ে মলিন বৃদ্ধি তোমরা সকলে ।
কি মধুর হরি-কথা নাহি কও ভুলে ॥ ১৩ ॥

সকল সন্তাপহর হরি-আলাপনা ।
স্মরণ-মনন নানা সাধন-ভজনা ॥ ১৪ ॥

তাহে নাহি রুচি, রুচি হাস্য-পরিহাসে ।
এরূপে কাটিলে কাল কি হইবে শেষে ॥ ১৫ ॥

অনিত্য সংসার এই ভেবে দেখ ভাই ।
হরি বিনা মানুষের অন্য গতি নাই ॥ ১৬ ॥

হরি-কথা প্রভু যত কন সঙ্গিগণে ।
চেয়ে দেখে তাঁর কথা নাহি শুনে কানে ॥ ১৭ ॥

ভাগ্যবান সঙ্গিগণ হরি চায় নাই ।
বড় খুশী দিবানিশি পাইলে গদাই ॥ ১৮ ॥

ব্রহ্মানন্দ-সম্ভোগেতে যে সুখ উদর ।
প্রভু-সঙ্গ-সুখ সনে কিছুমাত্র নয় ॥ ১৯ ॥

মরি কি মধুর নর-লীলা ধরাধামে ।
নরদেহে নিজে হরি মায়া-আবরণে ॥ ২০ ॥

মুগ্ধকর সহচর সদা সঙ্গে বাস ।
তাহারাও তিলমাত্র না পায় আভাস ॥ ২১ ॥

অমৃত সমান ক্ষীর মাতৃ-বক্ষে স্থান ।
খায় শিশু পায় পুষ্টি নাহি জানে নাম ॥ ২২ ॥

সেই মত শ্রীপ্রভুর যত সহচর ।
নাহি বুঝে পরানন্দ, ভুঞ্জে নিরস্তর ॥ ২৩ ॥

শ্রীপ্রভুর সঙ্গ-সুখ করে আস্বাধন ।
রুক্ষ হরি-কথা কেন করিবে শ্রবণ ॥ ২৪ ॥

সঙ্গ-সুখ-ভোগী যারা সঙ্গ-সুখ' চায় ।
প্রভু-সঙ্গ সুখানন্দ না আসে কথায় ॥ ২৫ ॥

যে ভুগেছে সে জেনেছে তাহার মরমে ।
উপমায় অলিকুল যেমন কুসুমে ॥ ২৬ ॥

মধু পেলে খায়, নৈলে নাহি খায় আর ।
উপবাসে যদি হয় জীবন-সংহার ॥ ২৭ ॥

চাতক ফটিক জলে যেমন পিয়াসে ।
যায় প্রাণ তবু নাহি জলাশয়ে বসে ॥ ২৮ ॥

সেই মত যে করেছে প্রভু-সহবাস ।
না করে কখন অন্য সুখ-অভিলাষ ॥ ২৯ ॥



ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু গদাধর ।
যে ভক্তে যা চায়, দায় তাঁহার উপর ॥ ৩০ ॥

সঙ্গে খেলিবারে চায় যত সঙ্গিগণ ।
করিবারে তাহাদের বাসনা পূরণ ॥ ৩১ ॥

রচিলা নূতন খেলা সময়ের মত ।
অতি মনোহর প্রভু গদাই-চরিত ॥ ৩২ ॥

মোহিত বিমুগ্ধ-চিত যত সঙ্গিগণ ।
প্রভুর নূতন খেলা করি দরশন ॥ ৩৩ ॥

যোগাসন যতগুলি যোগিজনে জানা ।
প্রভুর প্রচুরভাবে সব আছে জানা ॥ ৩৫ ॥

সুদীর্ঘজীবনযুক্ত ঋষি-মুনিগণ ।
সে আসন অভ্যাসেতে আগোটা জীবন ॥ ৩৬ ॥

কাটায় অশেষ রূপ সুখ পরিহরি ।
ফল মূল জল কিংবা বাতাহার করি ॥ ৩৭ ॥

তবু নহে সিদ্ধকাম বৃথা শ্রম যায় ।
তাহাই করেন প্রভু কথায় কথায় ॥ ৩৮ ॥

যোগেশ-দুঃসাধ্য সেই অসাধ্য-সাধনা ।
স্বতঃসিদ্ধ শ্রীপ্রভুর সব ভাল জানা ॥ ৩৯ ॥

ঘরে ভরা নানা নিধি আছয়ে যাঁহার ।
তখনি বাহির করে ইচ্ছা যবে তাঁর ॥ ৪০ ॥

অনন্ত রতনাগার দেহ শ্রীপ্রভুর ।
দেবের দুর্লভ দ্রব্য প্রচুর প্রচুর ॥ ৪১ ॥

দেশের মানুষে কিবা বুঝিবে আসন ।
চাষে খাটে মোটা লোক নিরক্ষর জন ॥ ৪২ ॥

ধর্মশাস্ত্র-অধ্যয়নে বৃদ্ধি বিপরীত ।
ব্যাকরণে সন্ধি জানে সে অতি পণ্ডিত ॥ ৪৩ ॥

আসন কাহারে কয় কি আছে আসনে ।
কি ব্রাহ্মণ কি বৈষ্ণব কেহ নাহি জানে ॥ ৪৪ ॥

আসনের নাম দেশে এই বলবৎ ।
সংগ্রাম-কৌশল-কার্য কুস্তি কসরত ॥ ৪৫ ॥

হেনভাবে করিতেন আসন গোসাঁই ।
যে দেখে সে বুঝে যেন অঙ্গে অস্থি নাই ॥ ৪৬ ॥

দর্শকেরা বৃদ্ধিহারা পাষাণের প্রায় ।
বলেন গদাই হেন শিখিল কোথায় ॥ ৪৭ ॥

নিকটস্থ গ্রামে গ্রামে পড়ে গেল সাড়া ।
কেহ নাহি কুস্তি-পটু গদাইর পারা ॥ ৪৮ ॥

সব তত্ত্ব সুবিদিত ছিল চিনিবাস ।
বলিতেন প্রভুদেবে করিয়া সম্ভাস ॥ ৪৯ ॥

বুঝেছি বুঝেছি তত্ত্ব ওরে গদাধর ।
এবারে উঠেছে তোর ভিতরেতে ঝড় ॥ ৫০ ॥

যাবি চলে লীলা-স্থলে না রহিবি আর ।
তাই কর খেলা ছেড়ে বৈরাগ্য-বিচার ॥ ৫১ ॥

আগুসাঙ্গ চিনিবাস দৃষ্টি বহুদূর ।
বুঝে সকলের সার গদাই ঠাকুর ॥ ৫২ ॥

যাহা দেখাইলা প্রভু কামারপুকুরে ।
খেলা ভিন্ন অন্য জ্ঞান কেহ নাহি করে ॥ ৫৩ ॥

বুঝাবুঝি পক্ষে যারা ছিল আগুয়ান ।
ভুলিত সকল দেখি প্রভুর বয়ান ॥ ৫৪ ॥

সেই ঈশ্বরীয় মায়া যে মায়ার বলে ।
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশের বুদ্ধি যায় দুলে ॥ ৫৫ ॥

হেন মায়া ল'য়ে খেলা করে গদাধর ।
মায়াপতি মায়াতীত পরম ঈশ্বর ॥ ৫৬ ॥

ধরি নর-কলেবর মায়ায় মোহিত ।
রামকৃষ্ণ শ্রীপ্রভুর বিচিত্র চরিত ॥ ৫৭ ॥

শ্রবণ-কীর্তনে নাশে মায়ার বন্ধন ।
স্মরণ-মননে হয় তাপ-বিমোচন ॥ ৫৮ ॥

হয় আঁখি-উন্মীলন ঘুচে অন্ধকার ।
ভবসিন্ধু-গোস্পদ হেলায় হয় পার ॥ ৫৯ ॥

ভেলায় বসিয়া দেখে তরঙ্গ-তুফান ।
রামকৃষ্ণ-কথা হেন মঙ্গল-নিদান ॥ ৬০ ॥

সায় বাল্য-লীলাগীত শ্রুতি-সুমধুর ।
গাইব দ্বিতীয় খণ্ডে সাধনা প্রভুর ॥ ৬১ ॥


        প্রথম খণ্ড সমাপ্ত