দ্বিতীয় খণ্ড
বিবিধ ভাব প্রদর্শন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
সমাপ্ত প্রভুর এবে সাধন-ভজন ।
সাধু-ভক্ত সনে কৈল খেলা আরম্ভন ॥ ১ ॥
এ সময় আসে এক পণ্ডিতপ্রবর ।
নারায়ণ শাস্ত্রী নাম জয়পুরে ঘর ॥ ২ ॥
বাল্যাবধি শাস্ত্র-পাঠে অনুরাগী মন ।
অস্ফুট বিরাগযুক্ত ব্রাহ্মণনন্দন ॥ ৩ ॥
গুরুগৃহে অবস্থান ব্রহ্মচারিবেশে ।
পঁচিশ বৎসর কাল আয়াস অশেষে ॥ ৪ ॥
ষড়দর্শনের মধ্যে পাঁচ কৈলা সায় ।
এখন কেবলমাত্র বাকি আছে ন্যায় ॥ ৫ ॥
পরস্পরা শুনিলেন শাস্ত্রজ্ঞ-সমীপে ।
প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক নবদ্বীপে ॥ ৬ ॥
তাই নবদ্বীপে হয় তাঁর আগমন ।
সাত বৎসরের মধ্যে ন্যায় সমাপন ॥ ৭ ॥
স্বদেশাভিমুখে যাত্রা মনে মনে আশা ।
ঘটনার চক্রে হৈল এইখানে আসা ॥ ৮ ॥
অতি মনোরম স্থান ভাগীরথী-তীর ।
সুন্দর পুরীতে দেবদেবীর মন্দির ॥ ৯ ॥
সেবা রাগাদির কত বন্দোবস্ত তায় ।
সদরে সন্ন্যাসী ত্যাগী অতিথিশালায় ॥ ১০ ॥
ভাণ্ডারেতে নানাদ্রব্য বহু পরিমাণে ।
প্রসাদার্থ দীন-দুঃখী লোকারণ্য দিনে ॥ ১১ ॥
শোভমান পুষ্পোদ্যান কত ফুল তায় ।
গন্ধবহ চারিদিকে সৌরভ ছুটায় ॥ ১২ ॥
সর্বোপরি শান্তিময় পঞ্চবটী তল ।
ত্রিতাপ-সন্তপ্ত চিত পরশে শীতল ॥ ১৩ ॥
দিব্যভাব-পরিপূর্ণ যোগীর লালসা ।
ধীর স্থির সুগম্ভীর বৈরাগ্যের বাসা ॥ ১৪ ॥
প্রভুর তপস্যা-তেজে সচৈতন্য স্থল ।
তিল-আশে কর্মে তথা তালবৎ ফল ॥ ১৫ ॥
অপার কৃপার সিন্ধু প্রভু ভগবান ।
জীবহিত সদাব্রত কল্যাণনিদান ॥ ১৬ ॥
পাপভারাক্রান্ত জীব-উদ্ধারের হেতু ।
সহিয়া অশেষ কষ্ট কৈলা কত সেতু ॥ ১৭ ॥
অকূল পাথার ভবজলধির মাঝে ।
হীনবল জীব পারে যাইবে সহজে ॥ ১৮ ॥
হেন সোজা পথে যেতে তবু যে অক্ষম ।
তার জন্যে কৈলা কল্পবৃক্ষের রোপণ ॥ ১৯ ॥
ওরে মন গুন কল্পবৃক্ষ কারে বলে ।
ভাই পায় যে যা চায় বসি যার তলে ॥ ২০ ॥
মূল কল্প-বৃক্ষ প্রভু বুঝিয়া আপনে ।
বহুদিন নরদেহে রহে ধরাধামে ॥ ২১ ॥
জীবের কল্যাণে করি সাধন-ভজন ।
কল্পবৃক্ষ পঞ্চবট করিলা রোপণ ॥ ২২ ॥
ঈশ্বরের তত্ত্ব-আশে যদি কোন জনে ।
সরল অন্তরে খুঁজে সজল নয়নে ॥ ২৩ ॥
এই পঞ্চবটতলে শ্রীহস্তে রোপিত ।
মনোরথ পূর্ণ তার হইবে নিশ্চিত ॥ ২৪ ॥
শাস্ত্র নহে শুধু শাস্ত্রপাঠী একজন ।
বৈরাগ্য তাহার সঙ্গে ছিল সংমিলন ॥ ২৫ ॥
শাস্ত্রস্থ ঈশ্বর তত্ত্ব প্রত্যক্ষানুভূতি ।
করিতে বাসনা মনে প্রাণে বলবতী ॥ ২৬ ॥
বিবেক-বৈরাগ্যবান ব্রাহ্মণের ছেলে ।
স্বতিব্রত আরম্ভিল পঞ্চবটতলে ॥ ২৭ ॥
ভকতবৎসল প্রভু আর নহে স্থির ।
শাস্ত্রীর সমীপে গিয়া হইলা হাজির ॥ ২৮ ॥
দোঁহে দোঁহাকার প্রতি সমাকৃষ্ট মন ।
পরম আনন্দে হয় তত্ত্ব-আলাপন ॥ ২৯ ॥
পাত্র দেখি হৈল কৃপা শাস্ত্রীর উপরে ।
দিন দিন যায় যত ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ॥ ৩০ ॥
সাধনাজ অনুভূতি দর্শননিচয় ।
ক্রমশঃ শ্রীপ্রভু তারে দিলা পরিচয় ॥ ৩১ ॥
তদুপরি চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ নিরবধি ।
আঙ্গিক লক্ষণ-সহ প্রভুর সমাধি ॥ ৩২ ॥
প্রথম ভূমিতে বায়ু হইয়া উদয় ।
ঘাটে ঘাটে উঠে হয় সপ্তমেতে লয় ॥ ৩৩ ॥
এতক্ষণে ধীরবর পায় দেখিবারে ।
বেদান্তের গুপ্ত রত্ন প্রভুর ভিতরে ॥ ৩৪ ॥
বেদান্তের বাগারণ্যে যে বস্তু নিহিত ।
তাহার লক্ষণ শ্রীঅঙ্গেতে সমুদিত ॥ ৩৫ ॥
স্তম্ভিত পণ্ডিতবর করে মনে মনে ।
জীবন্ত বেদান্ত হন প্রভু বিদ্যমানে ॥ ৩৬ ॥
প্রভুকে শ্রীগুরু করি প্রভুর কৃপায় ।
সাধিতে হইবে ব্রহ্ম-লাভের উপায় ॥ ৩৭ ॥
এত ভাবি দেশে প্রত্যাগতের কামনা ।
ত্যজিয়া প্রভুর কাছে করিলেন থানা ॥ ৩৮ ॥
একরূপ শ্রীপ্রভুর দেখি নিরন্তর ।
গুণ বর্তমান যেথা সেখানে আদর ॥ ৩৯ ॥
দয়া-গুণে দাতা কিবা পরহিতাচারী ।
সাধারণ মধ্যে যার যশ-মান ভারি ॥ ৪০ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ সাধক কিবা সাধু কিবা ভক্ত ।
যে কোন ভাবের কিবা সম্প্রদায়ভুক্ত ॥ ৪১ ॥
স্থানাস্থান মানামান বিচারবিহীনে ।
অযাচিত হইয়াও গমন সেখানে ॥ ৪২ ॥
লোকপরম্পরা প্রভু করিলা শ্রবণ ।
বিখ্যাত পণ্ডিত নাম শ্রীপদ্মলোচন ॥ ৪৩ ॥
সভাপণ্ডিতের পরে বর্ধমানে আছে ।
সসম্মানে তথাকার অধিপের কাছে ॥ ৪৪ ॥
দিগ্বিজয়ী বিচারেতে দেশ জুড়ে নাম ।
নাহিক পণ্ডিত কেহ তাঁহার সমান ॥ ৪৫ ॥
ন্যায়েতে পণ্ডিত হেন বেদান্তে তেমন ।
তদুপরি সাধনায় সিদ্ধ একজন ॥ ৪৬ ॥
বহুগুণে বিভূষিত প্রতিভা উজ্জ্বল ।
দীনে দয়া ইষ্টনিষ্ঠা উদার সরল ॥ ৪৭ ॥
প্রভুর প্রবল ইচ্ছা হইল তখন ।
দেখিবারে দেশখ্যাত পণ্ডিত কেমন ॥ ৪৮ ॥
হেনকালে প্রভুদেব পাইলা খবর ।
পণ্ডিত অনুস্থাবস্থা পীড়ায় কাতর ॥ ৪৯ ॥
স্বাস্থ্যোন্নতি-হেতু বাস করে গঙ্গাতীরে ।
এড়েদহে এখানের অনতি অন্তরে ॥ ৫০ ॥
হৃদয় প্রেরিত হৈল জানিতে বারতা ।
কেমন পণ্ডিত আর আছে হেগা কোথা ॥ ৫১ ॥
অনুমতি মত হৃদু চলিল ত্বরিত ।
পণ্ডিতের কাছে গিয়া হয় উপনীত ॥ ৫২ ॥
পণ্ডিত হরষান্বিত বৃত্তান্ত শ্রবণে ।
হৃদয়ে আদর কত জানিয়া ভাগিনে ॥ ৫৩ ॥
পরে সবিনয় কয় ধীরশিরোমণি ।
শ্রীপ্রভুর দরশন ভাগ্য করি মানি ॥ ৫৪ ॥
কিছুক্ষণ পরে হেথা ফিরিল হৃদয় ।
শ্রীগোচরে দিল আদি-অন্ত-পরিচয় ॥ ৫৫ ॥
যথাদিনে হৃদু সঙ্গে প্রভুর গমন ।
শ্রদ্ধায় পণ্ডিত কৈলা প্রভুকে গ্রহণ ॥ ৫৬ ॥
পরস্পর সম্মিলনে তুষ্ট অতিশয় ।
যেন পূর্বে পূর্বে কত ছিল পরিচয় ॥ ৫৭ ॥
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী সব সুবিদিত ।
বুঝিলা যতেক গুণে ভূষিত পণ্ডিত ॥ ৫৮ ॥
শ্রদ্ধা-ভক্তিযুক্ত ইষ্ট-দেবীর উপরে ।
বিভূতি সিদ্ধাই প্রাপ্ত অম্বিকার বরে ॥ ৫৯ ॥
তাই প্রভু বীণাকণ্ঠ মোহিতে পণ্ডিত ।
ধরিলেন কালিকার গুণগান-গীত ॥ ৬০ ॥
কি কব গীতের গতি ভূবন ভুলায় ।
কিবা কথা চেতনের পাষাণে গলায় ॥ ৬১ ॥
ভক্তিঘন শ্রীমুরতি বিনোদপ্রতিম ।
অদৃষ্ট অশ্রুতপূর্ব ভাব নিরুপম ॥ ৬২ ॥
তুলনার কথা মন তুল না তুল না ।
প্রভুর তুলনা মাত্র প্রভুই তুলনা ॥ ৬৩ ॥
বিধির গঠন হৈলে তুলনা পাইতে ।
আপনে গঠেছে প্রভু আপনার হাতে ॥ ৬৪ ॥
অপরূপ হোতে প্রভু অপরূপতর ।
রূপরসতন্মাত্রের অপার সাগর ॥ ৬৫ ॥
অনন্ত লহরী তার গেলে পলে পলে ।
যে আসে সকাশে তার হিল্লোলেতে টলে ॥ ৬৬ ॥
কিবা কব শ্রীপ্রভুর ঐশ্বর্যের কথা ।
পেয়ে তার বিন্দুমাত্র বিধাতা বিধাতা ॥ ৬৭ ॥
রূপরসযুপ্ত মন জীবের উদ্ধারে ।
অবতীর্ণ প্রভুদেব লীলার আসরে ॥ ৬৮ ॥
গীতে মুগ্ধ পণ্ডিতের অবস্থা এখন ।
বাক্ রুদ্ধ মন স্তব্ধ সজল নয়ন ॥ ৬৯ ॥
গাইতে গাইতে গীত ভাবের আবেশ ।
গভীর সমাধিমগ্ন পরে পরমেশ ॥ ৭০ ॥
বাহ্যেতে আসিলে প্রভু পণ্ডিত জিজ্ঞাসে ।
অনুভূতি দরশন কি হয় আবেশে ॥ ৭১ ॥
সমাধিতে উপলব্ধি কি প্রকার হয় ।
যাবতীয় আদি মধ্য অন্ত পরিচয় ॥ ৭২ ॥
তন্ন তন্ন বলিলেন প্রভু গুণমণি ।
প্রথম হইতে তার চরম কাহিনী ॥ ৭৩ ॥
চরমের উপলব্ধি প্রভুর কীর্তিত ।
বেদান্তের মধ্যে তাহা না পায় পণ্ডিত ॥ ৭৪ ॥
হেথা যে শ্রীপ্রভুদেব বেদান্তের পার ।
কেমনে বেদান্ত পাবে সমাচার তাঁর ॥ ৭৫ ॥
প্রভুর প্রকৃত তত্ত্ব দর্শন না জানে ।
এ হেন গোসাঞি এবে রামকৃষ্ণ নামে ॥ ৭৬ ॥
পণ্ডিতেরে হেথা ধাঁধা দিল মহামায়া ।
আলোকের মধ্যে যেন আধারের ছায়া ॥ ৭৭ ॥
আজি এই তক্ প্রভু ফিরিলা মন্দিরে ।
স্বস্থানে পণ্ডিতবর নানা চিন্তা করে ॥ ৭৮ ॥
বুদ্ধিশুদ্ধিহারা এবে ভাবে মনে মন ।
যা দেখিনু যা শুনিনু সত্য কি স্বপন ॥ ৭৯ ॥
মগ্ন চিত্ত দিবারাত্র ভাবিছে প্রভুকে ।
লোহার অবস্থা যেন টানিলে চুম্বকে ॥ ৮০ ॥
প্রকৃত সঠিক তত্ত্ব করিতে নির্ণয় ।
পণ্ডিত অস্থিরচিত্ত হৈল অতিশয় ॥ ৮১ ॥
পরস্পর দেখাশুনা হয় বারংবার ।
পণ্ডিতের প্রতি হৈল রূপার সঞ্চার ॥ ৮২ ॥
সত্যতত্ত্ব অন্বেষক উদার সরল ।
সন্দেহ-মোচনে প্রভু করিলা কৌশল ॥ ৮৩ ॥
শুন মন এক মনে তমঃ হবে দূর ।
মহীয়ান মহতী মহতি মহিমা শ্রীপ্রভুর ॥ ৮৪ ॥
পণ্ডিত দুনিয়াজানা বর্ধমানে বাসা ।
যবে যেথা উঠে কেন দুর্বোধ্য সমস্যা ॥ ৮৫ ॥
যথার্থ সিদ্ধান্ত কিবা মীমাংসার আশে ।
দিগ্ দিগন্তরবাসী কত লোক আসে ॥ ৮৬ ॥
মীমাংসায় বসিবার পূর্বে ধীরবর ।
আছিল তাহার এক রীতি স্বতন্তর ॥ ৮৭ ॥
জলপূর্ণ ঝারি এক গামছা সহিত ।
সর্বদা তাঁহার পাশে থাকিত স্থাপিত ॥ ৮৮ ॥
তাই ল'য়ে হাতে ইতস্ততঃ বিচরণ ।
পশ্চাতে তাহার হয় মুখপ্রক্ষালন ॥ ৮৯ ॥
বন্ধন-মোক্ষণ পরে গামছা দ্বারায় ।
ভবে তিনি বসিতেন প্রশ্ন-মীমাংসায় ॥ ৯০ ॥
এ হেন প্রক্রিয়া করি বসিলে বিচারে ।
কেহ নাহি দুনিয়ায় হারায় তাঁহারে ॥ ৯১ ॥
ইষ্টনিষ্ঠাবান-হেতু পণ্ডিতপ্রবর ।
ইষ্টদেবী সুপ্রসন্না দেন এই বর ॥ ৯২ ॥
অদ্যাপি এ সন্ধান কেহ নাহি জানে ।
সংগোপনে প্রাপ্ত যেন রক্ষা সংগোপনে ॥ ৯৩ ॥
জগতে যাবৎ সব বিদিত প্রভুর ।
ভাবমুখে অবস্থিত অচেনা ঠাকুর ॥ ৯৪ ॥
একদিন মীমাংসাতে কোন সমস্যার ।
বসিবার পূর্বে ঝারি গামছা তাঁহার ॥ ৯৫ ॥
লুকায়ে রাখেন প্রভু আপনার হাতে ।
সময়েতে দ্বিজবর খুঁজে চারি ভিতে ॥ ৯৬ ॥
ভৃঙ্গার গামছা তার ভেল্কির মূল ।
যথাস্থানে না পাইয়া চিন্তায় আকুল ॥ ৯৭ ॥
যাদুর আধার বিনা হারা বুদ্ধিবল ।
পশ্চাতে জানিল ইহা প্রভুর কৌশল ॥ ৯৮ ॥
ছুটিল সন্দেহ-তমঃ উদিল চেতন ।
প্রভু তাঁর ইষ্টদেবী করে নিরীক্ষণ ॥ ৯৯ ॥
পদপ্রান্তে উপবিষ্ট বিহ্বল আতুর ।
ইচ্ছা দেখে আনিভরে প্রেমের ঠাকুর ॥ ১০০ ॥
কিন্তু তার এবে নাহি পুরিল কামনা ।
অবিরল অশ্রুজল দিল তাহে হানা ॥ ১০১ ॥
আঁখি-দৃষ্টি রুদ্ধ দেখি পথপদ স্বরে ।
ইষ্টজ্ঞানে প্রভুদেবে স্তবস্তুতি করে ॥ ১০২ ॥
উচ্ছ্বাস-বিগতে পুনঃ কহে আর বার ।
আপুনি স্বয়ং সেই ঈশ্বরাবতার ॥ ১০৩ ॥
মুকতি যদ্যপি কভু পাই এ পীড়ায় ।
দেশেতে পণ্ডিত যত আছে যে যেথায় ॥ ১০৪ ॥
নিমন্ত্রিয়া তে সবারে সভা সাজাইব ।
ডাকিয়া হাঁকিয়া আমি সকলে কহিব ॥ ১০৫ ॥
এই রামকৃষ্ণ নামে নরদেহধারী ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন ভবের কাণ্ডারী ॥ ১০৬ ॥
উদ্ধারিতে জীবকুল শোকন্তঃপাতুর ।
ধর্মদ্বন্দ্ব একেবারে করিবারে দূর ॥ ১০৭ ॥
দয়াল ঠাকুর অবতীর্ণ ধরাধামে ।
দেখিব আমার কথা খণ্ডে কোন্ জনে ॥ ১০৮ ॥
কি দেখা দেখিয়াছিল প্রভুর ভিতর ।
ধন্য দেব রামকৃষ্ণ ধন্য ধীরবর ॥ ১০৯ ॥
মধ্যে মধ্যে মথুরের সভাধিবেশন ।
বঙ্গীয় পণ্ডিতবর্গে করি নিমন্ত্রণ ॥ ১১০ ॥
সখ ও স্বভাব ছিল দেখি পূর্বাপর ।
বহু ব্যয় হইলেও না হয় কাতর ॥ ১১১ ॥
অন্ত কোন প্রয়োজনে মথুর এবার ।
করিতেছিলেন এক সভার যোগাড় ॥ ১১২ ॥
বলবতী ইচ্ছা পদ্মলোচনে আহ্বান ।
কিন্তু সাহসেতে নাহি হয় সংকুলান ॥ ১১৩ ॥
কারণ লোকের মুখে করেছে শ্রবণ ।
শূদ্রদত্ত পণ্ডিতের না হয় গ্রহণ ॥ ১১৪ ॥
সুযোগ বুঝিয়া এবে কন প্রভুয়ায় ।
যদি তাঁর অনুরোধে আসেন সভায় ॥ ১১৬ ॥
যথা কথা পণ্ডিতে কহিলা গুণমণি ।
উত্তরে প্রভুকে কয় ধীর শিরোমণি ॥ ১১৭ ॥
ইহা তো সামান্য কথা সঙ্গেতে তোমার ।
হাড়ির বাড়িতে পারি করিতে আহার ॥ ১১৮ ॥
ধন্য ধীরবর তব পাণ্ডিত্যও ধন্য ।
এ মহালীলায় খ্যাতি রাখিলে অক্ষুন্ন ॥ ১১৯ ॥
প্রাতঃস্মরণীয় তুমি তোমার ভারতী ।
প্রাতঃসন্ধ্যা যদি কেহ করেন আবৃত্তি ॥ ১২০ ॥
শ্রীপ্রভু নিশ্চয় তাঁহে করিবেন পায় ।
ভয়ঙ্কর ভবসিন্ধু অকুল পাথার ॥ ১২১ ॥
পণ্ডিতের যনঃসাধ মনেতে রহিল ।
দিনে দিনে অসুস্থতা বাড়িতে লাগিল ॥ ১২২ ॥
বিদায় লইয়া তবে অভয় চরণে ।
রক্ষা করিলেন দেহ গিয়া কাশীধাামে ॥ ১২৩ ॥
এ সময় কত লোক আসে দলে দলে ।
খেয়ে দুটি পাকা ফল পুনঃ যায় চলে ॥ ১২৪ ॥
একবার প্রভুদেবে যে করে দর্শন ।
কতই না কত গেঠে পায় রত্নধন ॥ ১২৬ ॥
এখন নানান ভাবে প্রভু গুণমণি ।
বিশেষিয়া শুন মন অপূর্ব কাহিনী ॥ ১২৭ ॥
কভু দিয়া করতালি হরি-গুণগান ।
কখন হুঙ্কার করি শ্যামায় আহ্বান ॥ ১২৮ ॥
আবেশে প্রবেশ কভু শ্যামার মন্দিরে ।
গান নানা ভাবে গীত সুমধুর স্বরে ॥ ১২৯ ॥
গাইতে গাইতে প্রভু এতই উন্মত্ত ।
নূপুর বাঁধিয়া পায় করিতেন নৃত্য ॥ ১৩০ ॥
কখন রমণীবেশে সখীর মতন ।
শ্রীঅঙ্গে শ্যামার হয় চামর-ব্যজন ॥ ১৩১ ॥
নবনী-মন্থন কভু লইয়া মন্থনী ।
কামার বদনে দেন সদ্যোজাত ননী ॥ ১৩২ ॥
কভু নানা রঙ্গ ঢঙ্গ বালকের প্রায় ।
শ্রীবদনে হাসিরাশি গালি দিয়া মায় ॥ ১৩৩ ॥
কখন বা বাজে গাল শিব-সন্নিধানে ।
ববম্ ববম্ বোল মুখে ঘনে ঘনে ॥ ১৩৪ ॥
কখন বা সমাধিস্থ যেন যোগেশ্বর ।
গভীর প্রশান্ত কান্তিযুক্ত কলেবর ॥ ১৩৫ ॥
যেন দিয়া আত্মসুখ দেহ মন প্রাণ ।
করিছেন জীবহিত বিশ্বহিত-ধ্যান ॥ ১৩৬ ॥
শিবময় দয়াময় মঙ্গলনিধানে ।
যে যেখে তখন তার এই হয় মনে ॥ ১৩৭ ॥
বিষ্ণুর মন্দিরে কভু ল'য়ে রাধা-শ্যাম ।
নানাবিধ ভাবে হয় নানাবিধ গান ॥ ১৩৮ ॥
শামের শ্রীঅঙ্গে শোভে যত অলঙ্কার ।
কাড়িয়া পরায়ে দেন শ্রীঅঙ্গে রাধার ॥ ১৩৯ ॥
কভু ল'য়ে পীতবাস মোহন বাঁশরী ।
নানা রঙ্গে রসভাব হয় ছড়াছড়ি ॥ ১৪০ ॥
কখন হইত তাঁর অপরূপ খেলা ।
পিতল-গঠিত মুর্তি ল'য়ে রামলালা ॥ ১৪১ ॥
রঘুবীর শ্রীপ্রভুর জীবন-জীবন ।
স্বরগ্রামে রামনাম কখন কখন ॥ ১৪২ ॥
কি মধুর রামনাম শ্রীবদনে তাঁর ।
তুলনায় কিছু নহে ভ্রমর-ঝঙ্কার ॥ ১৪৩ ॥
ভাগ্যবলে বারেক যে শুনিয়াছে কানে ।
হৃদিতন্ত্রী বাঁধা তার আছে রামনামে ॥ ১৪৪ ॥
কি প্রকার বাঁধা তন্ত্রী বলা বড় দায় ।
স্মরণে দেহের শিরা রামনাম গায় ॥ ১৪৫ ॥
জলে স্থলে জড় কি চেতন আছে যত ।
মনে হয় রামনাম গায় অবিরত ॥ ১৪৬ ॥
দশদিকে রামনাম সতত কেবল ।
শ্রীবদনে রামনাম শুনার এ ফল ॥ ১৪৭ ॥
কভু বৈদান্তিক সনে বেদান্ত-বিচার ।
কখন বা সমাধিস্থ জড়ের আকার ॥ ১৪৮ ॥
যতেক ইন্দ্রিয় কাজে দিয়েছে জবাব ।
সকলের মূল নাড়ী তাহারও অভাব ॥ ১৪৯ ॥
কিন্তু ফুল্ল মুখপদ্ম অতি সুশোভন ।
খেলে তায় শারদীয় চাঁদের কিরণ ॥ ১৫০ ॥
কভু বৈষ্ণবের সঙ্গে কৃষ্ণ-গুণ-গান ।
কখন ভাঙ্গিয়া কন গীতাদি পুরাণ ॥ ১৫১ ॥
গুণত্রয়-ভেদে ভক্তি-ভাবের পার্থক্য ।
কি ভাবে কাহার গতি কি হেতু অনৈক্য ॥ ১৫২ ॥
ভক্তি-পথে পঞ্চভাব লক্ষণ তাহার ।
সাধক ভজক অনুরাগী কি প্রকার ॥ ১৫৩ ॥
কখন বা হয় নৃত্য গৌরহরি বলি ।
তালে তালে দুই করে দিয়া করতালি ॥ ১৫৪ ॥
কভু পঞ্চনামী নবরসিক বাউল ।
সম্প্রদায়িগণ সনে কথা হুলস্থুল ॥ ১৫৫ ॥
আলেক্ সহজ রূপ-সাগরসম্বন্ধে ।
গাইতেন কত গীত মাতিয়া আনন্দে ॥ ১৫৬ ॥
কভু উক্তি-উপদেশ স্রোত বহি চলে ।
মত্তপ্রায় শ্রোতা তালে ভেসে ভেসে খেলে ॥ ১৫৭ ॥
সামান্য উপমা-সহ কথা নহে বড় ।
তাই দিয়া ভাঙ্গিতেন তত্ত্বকথা গূঢ় ॥ ১৫৮ ॥
মুখবিগলিত বাক্যে মহিমা অপার ।
সুমুর্খ শুনিবে বুঝে গুহ্য সমাচার ॥ ১৫৯ ॥
আগুন বারুদ বায়ু্ তিন সহকারে ।
নরম সীসার গোলা কামানের দ্বারে ॥ ১৬০ ॥
বাহিরায় যেন বেগে হেন শক্তি গায় ।
পলকে পাষাণ গিরি ইঙ্গিতে ফাটায় ॥ ১৬১ ॥
তেমতি প্রবাক্যে এত শক্তির উদয় ।
অনায়াসে ভেদ করে পাষণ্ড-হৃদয় ॥ ১৬২ ॥
উজ্জ্বলতা-গুণ বাক্যে এতই তাঁহার ।
তখনি উজ্জ্বল হৃদি যে ছিল আধার ॥ ১৬৩ ॥
তমসন্দ দূরীভূত আলো করে হৃদি ।
অপার আনন্দ ভুলে শ্রোতা-নিরবধি ॥ ১৬৪ ॥
কভু প্রভু ব্রহ্ম-জ্ঞানে হইয়া প্রমত্ত ।
যাবৎ বস্তুর আগে শ্রদ্ধায় প্রণত ॥ ১৬৫ ॥
ভাল মন্দ ভক্তাভক্ত সকলে প্রণাম ।
বলিতেন চোর সাধু উভয়েই রাম ॥ ১৬৬ ॥
পূর্ণভাবে ব্রহ্মজ্ঞান ঘটে বলবৎ ।
দেখেন জগতে তিনি তাঁহার জগৎ ॥ ১৬৭ ॥
একমনে শুন মন অতি মিষ্ট কথা ।
বিশ্বপ্রেম আত্মপ্রেম একই বারতা ॥ ১৬৮ ॥
মহাপ্রেম এই এর ওধারে গাঁ নাই ।
আধার আধেয় ভাবে ডুবেছে গোসাঁই ॥ ১৬৯ ॥
একদিন কোন জনে করি দরশন ।
চরণে ধলিয়া নবদুর্বাদলবন ॥ ১৭০ ॥
করিছেন বিচরণ উদ্যান-মাঝার ।
আর্তনাদে প্রভুর বিষম চীৎকার ॥ ১৭১ ॥
এ যে কিবা মহাপ্রেম নরবুদ্ধি ধরি ।
তিল আধ অণুকণা বুঝিতে না পারি ॥ ১৭২ ॥
কখন শাস্ত্রজ্ঞ-মুখে শাস্ত্রীয় শ্রবণ ।
পুরাণ চণ্ডীর গীত গীতা রামায়ণ ॥ ১৭৩ ॥
এইরূপ নানাভাব ভকতবিশেষে ।
দেখাইলা প্রভুদেব সাধনার শেষে ॥ ১৭৪ ॥
এইবারে মনে তাঁর হইল স্মরণ ।
যাবতীর সাঙ্গোপাঙ্গ পারিষদগণ ॥ ১৭৫ ॥
রোদন করেন কত বসিয়া নির্জনে ।
একে একে স্মরি যত অন্তরঙ্গগণে ॥ ১৭৬ ॥
সন্ধ্যাকালে শাক-ঘন্টা বাজিলে মন্দিরে ।
তাড়াতাড়ি উঠিতেন ছাদের উপরে ॥ ১৭৭ ॥
উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতেন প্রিয় ভক্তগণে ।
আয় কে কোথায় আমি আছি এইখানে ॥ ১৭৮ ॥
মথুর এতেক শুনি প্রভুদেবে কন ।
কই বাবা কোথা আছে তব ভক্তগণ ॥ ১৭৯ ॥
কেন নিত্য নিত্য ডাক এত কষ্ট করি ।
একা আমি হাজার ভক্তের বল ধরি ॥ ১৮০ ॥
যদি কেহ থাকে বাবা আনহ সত্বর ।
রাখিব পরম যত্নে মাথার উপর ॥ ১৮১ ॥
ভক্তগণে প্রভুর অদ্ভুত আকর্ষণ ।
টানে প্রিয় সখা বায়ু আগুন যেমন ॥ ১৮২ ॥
বাহ্যিক দর্শনে একা বহ্নিশিখা জ্বলে ।
গোপনে পবনে ডাকে কৌশলের কলে ॥ ১৮৩ ॥
সে কল কৌশলাঙ্গিত মানুষে না জানে ।
উপমায় চুম্বক লোহায় যেন টানে ॥ ১৮৪ ॥
অলক্ষ্যেতে আকর্ষণ দেখিবারে নাই ।
ভক্তগণে হেন টানে টানেন গোসাঁই ॥ ১৮৫ ॥
যেমন শ্রীপ্রভুদেব ভক্ত-অবতার ।
তেমতি সুগুপ্ত যত ভকত তাঁহার ॥ ১৮৬ ॥
কাদা-মাটি-মাখা দেখে মহা আবরণে ।
রেখেছেন প্রভুদেব পরম গোপনে ॥ ১৮৭ ॥
অদ্ভুত প্রভুর লীলা দেখে দুলে মন ।
ভক্ত-সংজোটন-কাণ্ডে পাবে বিবরণ ॥ ১৮৮ ॥
চন্দ্র-সূর্য প্রভু তারা যত ভক্তমনা ।
এত আলো তবু লোকে ঠিক যেন কানা ॥ ১৮৯ ॥
কেহ দৃষ্টিহীন যেতে কেহ দিনমানে ।
ধন্য মেঘমায়া ঢাকে সূর্যের কিরণে ॥ ১৯০ ॥
যাদুকর শিরোমণি প্রভু গুণধাম ।
জ্বালিয়া সূর্যের বাতি আঁধার দেখান ॥ ১৯১ ॥
চক্ষুষ্মান কেবল তাঁহার ভক্তগণ ।
সম্প্রদায়ী ভাব মম না বুঝিও মন ॥ ১৯২ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ পারিষদ আত্মগণ তাঁর ।
জীব নহে ভক্ত মাত্র মানুষ আকার ॥ ১৯৩ ॥
ভক্তগণ তাঁর জন ভক্তদের তিনি ।
যাবে যাবে সঙ্গে যাওয়া-আসা মর্ত্যভূমি ॥ ১৯৪ ॥
গৃহিণী গৃহেতে যেন সাজায় ভাণ্ডার ।
তখনি আনেন হবে যাহা দরকার ॥ ১৯৫ ॥
তেমতি সাধান আছে ভক্ত শ্রীপ্রভুর ।
কেহ কিছু সন্নিকটে কেহ কিছু দূর ॥ ১৯৬ ॥
ফেলিলে প্রলোভী চার জলের ভিতরে ।
একবারে মৎস্যগণ নাহি আসে চারে ॥ ১৯৭ ॥
প্রভুর প্রকট-কাল সন্নিকট প্রায় ।
চারের চৌদিকে ভক্ত ঘুরিয়া বেড়ায় ॥ ১৯৮ ॥
ভক্তিলোভী প্রভুভক্ত দিব্য চক্ষুষ্মান ।
অদম অন্ধেরে এবে দেহ চক্ষুদান ॥ ১৯৯ ॥
কেমন খেলিলা প্রভু ভক্তগণ লৈয়া ।
সাধারণ মানবের চক্ষে ধূলা দিয়া ॥ ২০০ ॥
বিবরিয়া
তৃতীয় খণ্ডেতে গাব গান ।
গাইবারে যদি শক্তি দেন ভগবান ॥ ২০১ ॥
জয় জগমুগ্ধকর ব্রাহ্মণ-মূরতি ।
পরম ঈশ্বর বিষ্ণু ব্রহ্মাণ্ডের পতি ॥ ২০২ ॥
অগতির গতি তুমি পতিতপাবন ।
ত্রিতাপ-সন্তাপ-বিঘ্ন-বাধাবিনাশন ॥ ২০৩ ॥
ভবত্রাস মায়াপাশে করহ নিস্তার ।
জয় প্রভু রামকৃষ্ণ ভবকর্ণধার ॥ ২০৪ ॥
লোচন-আঁধার দূর করহ গোসাঁই ।
যেন চোখে দেখে লীলা দিবারাতি গাই ॥ ২০৫ ॥
বাতে নহে বিচলিত শিখার মতন ।
অভয়-চরণে যেন মত্ত হয় মন ॥ ২০৬ ॥