তৃতীয় পরিচ্ছেদ
বিভিন্ন আদর্শের সংঘর্ষ

স্বামী বিবেকানন্দ তাহার গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব সম্পর্কে একবার এইরূপ বলেন, “তিনি বেদান্তের অথবা নানা তত্ত্বের ধার ধারতেন না।  তিনি শুধু সেই মহৎ জীবন যাপন করতেন এবং তার ব্যাখ্যার ভার অন্যের উপর ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতেন।” কোনও মহাপুরুষের জীবনে এমন কোন অংশ থাকিতে পারে, যাহার অর্থ তিনি নিজেই বুঝিতে পারেন না — স্বামীজীর নিজ জীবনালোচনা-প্রসঙ্গে এই অর্থে ঐ কথাগুলি আমার বহুবার মনে পড়িয়াছে।

পাশ্চাত্যে আমাদের নিকট স্বামীজী শুধু ধর্মাচার্যরূপেই প্রকাশিত হইয়াছিলেন।  এখনও ক্ষণকাল চিন্তা করিলেই আমরা তাহাকে সেই পুরাতন বক্তৃতাগৃহে ছাত্রমণ্ডলীর অপেক্ষা কিঞ্চিৎ উচ্চ আসনে উপবিষ্ট দেখিতে পাই; দেখিতে পাই, তিনি বুদ্ধের ন্যায় প্রশান্তভাবে সেই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত, এবং তাঁহার শ্রীমুখ হইতে আর একবার এই আধুনিক জগৎ সুদূর অতীতের সেই বাণী শ্রবণ করিতেছে।  ত্যাগ, মুক্তি-পিপাসা, বন্ধনক্ষয় অগ্নিতুল্য পবিত্রতা, সাক্ষিস্বরূপ হইবার আনন্দ, নিরাকারে সাকারের পর্যাবসান — কেবল এইগুলিই ছিল সেই আলোচনার বিষয়।  সত্য বটে, চকিতের ন্যায় এক-আধবার আমরা তাঁহাকে মহাদেশপ্রেমিকরূপে দেখিয়াছি।  তথাপি নিয়তি আহ্বান করিলে গোপন ইঙ্গিতমাত্রই যথেষ্ট, এবং যে-সব মুহূর্ত একজনের জীবনের গতি পরিবর্তিত করিয়া দেয়, তাহারা শতজনের চোখের সামনে দিয়া চলিয়া গেলেও কেহ ধরিতে পারে না।  পাশ্চাত্যে আমরা স্বামীজীকে হিন্দুধর্মের প্রচারকরূপেই দেখিয়াছি, ভারতের উন্নতিকামী কর্মিরূপে নহে।  আবেগভরে তিনি বলিয়া উঠিয়াছিলেন,”আহা! মানবের দেবত্ব যিনি প্রকৃত উপলব্ধি করেছেন, তার কাজ কতই না শান্তিপূর্ণ! কারণ, এরূপ ব্যক্তির পক্ষে মানুষের চোখ খুলে দেওয়া ব্যতীত আর কিছুই করবার নেই; বাকি সব আপনা থেকেই হয়ে যায়। ” সন্দেহ নাই, তাহার সম্বন্ধে আমরা যাহা কিছু দেখিয়াছিলাম ও শুনিয়াছিলাম, তাহা এইরূপ কোন অগাধ শান্তিরই ফলস্বরূপ। 

কিন্তু আমার ভারতে পদার্পণের মুহূর্ত হইতে এই সকল ব্যাপারের অন্তরালে নিহিত সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক বস্তু দেখিতে পাইলাম।  এইরূপ অদ্ভুতভাবে যে জ্ঞান লাভ হয়, তাহা শ্রীরামকৃষ্ণ অথবা তাহার সম্পর্কিত কোন বিষয় নহে; উহা আমার গুরুদেবের ব্যক্তিত্ব — যাহা জালবদ্ধ সিংহের ন্যায় পুনঃ পুনঃ ব্যর্থ চেষ্টা করিতেছে এবং সেজন্য দুঃসহ ক্লেশ বোধ করিতেছে।  কারণ, যেদিন জাহাজ হইতে অবতরণকালে জেটিতে তাহাকে দেখি, সেদিন হইতে সেই শেষ শান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত — যখন গোধূলি সময়ে দেহটিকে ভাজকরা পোশাকের ন্যায় ফেলিয়া রাখিয়া তিনি এই জগৎরূপ গ্রামখানি চিরদিনের মতো পরিত্যাগ করিয়া যান — এই ভাবটি যে তাহার জীবনের অপর ভাবের সহিত অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল, সে বিষয়ে আমি সচেতন ছিলাম। 

কিন্তু কোথায় এই সংঘর্ষের মূল? কেন তিনি নিজেকে উদ্দেশ্যসাধনে বার বার বিফলপ্রযত্ন ও বাধাপ্রাপ্ত বোধ করিতেন? এক মহান উদ্দেশ্যের ধারণা যতই তাহার নিকট স্পষ্টতর হইয়া উঠিতেছিল, তাহার শারীরিক দুর্বলতাবোধও ততই বাড়িতেছিল — ইহাই কি তাহার কারণ? ভারতে তাহার বিজয়সূচক অভ্যর্থনার যে প্রতিধ্বনি ইংরেজ বন্ধুদের নিকট পৌঁছায়, তাহার সহিত আমি এই বিষয়টিই একজনের নিকট শুনিতে পাই।  যে মুহূর্তে তাহার ক্ষমতা চরম সীমায় আরোহণ করে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ভগ্নস্বাস্থ্য লইয়া হিমালয়ে নির্বাসিত স্বামীজী তাঁহার বন্ধুকে এক পত্র লেখেন।  ঐ পত্রে ছিল হতাশার কাতর ক্রন্দন।  আমাদের মধ্যে কয়েকজন তাহাকে যে-কোন উপায়ে ভারতের কার্যভার অপরের স্কন্ধে অর্পণপূর্বক পাশ্চাত্যে প্রত্যাবর্তনে সম্মত করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া পড়েন।  ঐরূপ ব্যবস্থা করিবার সময়, তাহার আরব্ধ কার্য কি প্রকারের এবং উহা সম্পন্ন করিবার জন্য কত কঠিন এবং জটিল শিক্ষার প্রয়োজন, তাহা আমরা অতি অল্পই হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলাম। 

কিন্তু এই সংঘর্ষ বাস্তবিক কিসের জন্য? উহা কি যাহাকে তিনি ‘মনোবুদ্ধির অগোচর বলিতেন, তাহাকেই সাধারণ জীবনে লইয়া আসার প্রাণান্তকর চেষ্টার ফল? একথা নিঃসন্দেহ — যে-কার্যের জন্য তাহার জন্ম, তাহা এতই কঠিন যে, কেবল বীরের পক্ষেই তাহা সাধ্য।  প্রচলিত আদর্শসমূহের নিরাপদ পস্থা পরিত্যাগ করিয়া, পুরাতন উপায়ের সহিত আপাত বিরোধশীল কোন প্রণালী অবলম্বন দ্বারা নূতন কোন আদর্শকে কার্যে পরিণত করিতে যাওয়ার মতো দুরূহ কার্য আর নাই।  তাহার বাল্যকালে একবার শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্র’কে (স্বামীজী তখন ঐ নামেই অভিহিত হইতেন) জিজ্ঞাসা করেন, “তোমার জীবনের সর্বোচ্চ অভিলাষ কী?” তিনিও তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, “সর্বদা সমাধিস্থ থাকা। ” শুনা যায়, এই কথায় তাহার গুরুদেব ঈষৎ হাসিয়া উত্তরে শুধু বলেন, “বাবা, আমি মনে করেছিলাম, তুমি আরও কোন বড় অধিকার লাভের জন্য জন্মেছ। ” আমরা ধরিয়া লইতে পারি যে, উক্ত মুহূর্তটি শিষ্যের জীবনে এক নূতন যুগের সূচনা করিয়াছিল।  একথা নিশ্চিত যে, ভবিষ্যতে, বিশেষতঃ তাহার স্বদেশবাসীর প্রতি শ্রেষ্ঠ দানস্বরূপ শেষের সাড়ে পাঁচ বৎসর তিনি নিষ্কাম কর্ম অথবা পরার্থে কর্মই ধর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ বিকাশ বলিয়া প্রচার করিয়া গিয়াছেন; এবং ভারতের ইতিহাসে এই সর্বপ্রথম এক সন্ন্যাসী-সম্প্রদায় নিজেদের সঙঘবদ্ধ করেন, যাহার মুখ্য উদ্দেশ্য হইল, নূতন ধরনের সামাজিক কর্তব্যের প্রবর্তন ও তাহার বিকাশ সাধন।  ইউরোপে, যেখানে প্রাচ্যের তুলনায় প্রত্যক্ষ ধর্মানুভূতি লাভ অতি বিরল, এবং প্রাচ্য অপেক্ষা লোকের উহা বুঝিবার ক্ষমতা কম, সেখানে সাধারণের চক্ষে এইরূপ পরার্থে কর্ম পুণ্যকর্ম বলিয়াই বিবেচিত হয়।  কিন্তু ভারতে সন্ন্যাসিসঙ্ঘের নিকট লোকে প্রধানতঃ এই আশা পোষণ করে যে, ঐ সঙেঘ মহাপুরুষগণের আবির্ভাব ঘটিবে।  আর যে সন্ন্যাসী, পরম্পরাগত সমাধিমূলক জীবনের মহান ভাবধারা বজায় রাখিবার জন্য নিজেকে নিযুক্ত রাখিবার পরিবর্তে সমাজকে উন্নত করিবার প্রয়াস পান, তাহার মূল্য প্রাচীনকালের লোকেরা সম্যকরূপে হৃদয়ঙ্গম করিতেন না। 

স্বামীজীর পরিকল্পনায় কিন্তু বোধ হইল, যে-সকল সাধন-প্রণালী পূর্বে আধ্যাত্মিক শিক্ষায় স্থানলাভ করিত, এই ধরনের সৎকার্যই যেন তাহাদের স্থান অধিকার করিয়াছে।  অদ্বৈতবাদীর অথবা ভারতীয় বেদান্তদর্শনের চরমপন্থীর নিকট ‘একমেবাদ্বিতীয়’ অবস্থালাভই আদর্শ।  এই অবস্থায় যিনি উপনীত হইয়াছেন, তাহার পক্ষে উপাসনা অসম্ভব, কারণ, তাহার নিকট উপাস্য বা উপাসক কেহই নাই; এবং সকল কর্মই সেই সর্বব্যাপী একত্বের তুল্য বিকাশ বলিয়া কোন কর্মকেই বিশেষভাবে উপাসনার যোগ্য বলিয়া পৃথক করা যায় না।  তাহার নিকট উপাস্য, উপাসক ও উপাসনা সবই এক; তথাপি অদ্বৈতবাদীও স্বীকার করেন যে, ভগবদ্গুণবর্ণনা ও প্রার্থনা দ্বারা সাধকের চিত্তশুদ্ধি হয়।  কারণ, স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, অন্য কোন উপায় অপেক্ষা ঈশ্বর-চিন্তা দ্বারা অহংজ্ঞান সহজে দমন করা যায়।  এই কারণে, উপাসনা উচ্চতর আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রথম সোপান বলিয়া বিবেচিত হয়।  কিন্তু স্বামীজী কর্ম বা মানবসেবাকেও অনুরূপ স্থান দিতেন বলিয়া বোধ হয়।  চিত্তশুদ্ধির অর্থ–স্বার্থপরতা নিঃশেষে দগ্ধ হইয়া যাওয়া।  উপাসনা ব্যবহার করা বা কাজে লাগানোর বিপরীত।  কিন্তু সেবা বা দানও ইহার বিপরীত ভাব।  এইরূপে, তিনি অপরকে সাহায্যদান ব্যাপারটি পবিত্রতামণ্ডিত তো করিলেনই, অধিকন্তু মানবের নামও পবিত্র করিলেন।  এমনকি, আমি একজন শিষ্যের কথা জানি, সঙ্ঘ-জীবনের প্রথমদিকে যাহার হৃদয় ভক্তিভাবে এরূপ পূর্ণ হইয়াছিল যে, তিনি কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত লোকদের যন্ত্রণা উপশম করিবার জন্য তাহাদের ক্ষতস্থান চুষিতেন।  পীড়িতের শুশ্রুষা ও দরিদ্রকে আহার্যদান বস্তুতঃ প্রথম হইতেই শ্রীরামকৃষ্ণ সন্তানগণের স্বাভাবিক কার্য ছিল।  কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ পাশ্চাত্য হইতে প্রত্যাবর্তন করিবার পরে ঐ কার্যগুলি বিপুল আকার ধারণ করে।  অতঃপর ঐসব কার্য জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হইত।  দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে সাহায্য দিবার জন্য, কোন শহরে স্বাস্থ্যবিধি পালন সম্বন্ধে নির্দেশ দিবার জন্য, অথবা কোন তীর্থস্থানে পীড়িত ও মুমূর্ষুগণকে সেবা-শুশ্রুষা করিবার জন্য মঠ হইতে লোক পাঠানো হইতে লাগিল।  একজন মুর্শিদাবাদে একটি অনাথাশ্রম ও শিল্প বিদ্যালয় খোলেন; অপর একজন দাক্ষিণাত্যে একটি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন।  স্বামীজী বলিতেন, ইহারা হইল ধর্মবাহিনীর জঙ্গল-সাফ করা ও রাস্তা-তৈয়ারি-করার দল (sappers and miners)।  তাহার পরিকল্পনা কিন্তু ইহা অপেক্ষা অনেক ব্যাপকতর ছিল।  ভারতীয় নারীগণের শিক্ষাবিধান এবং দেশের মধ্যে শিল্পশিক্ষা বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা তাহার সমগ্র মনপ্রাণ অধিকার করিয়াছিল।  পরার্থে কর্ম করিবার প্রবৃত্তি যে কতগুণ দুঃখবৃদ্ধি করে, তাহা ভুক্তভোগীরাই বুঝিতে পারেন।  যে ‘ত্রিশকোটি টাকা’ পাইলে তিনি ভারতবর্ষকে তাহার পায়ের উপর দাঁড় করাইয়া দিতে পারিতেন বলিতেন, সেই টাকা হাতে না আসায় সত্যসত্যই কি তাহার জীবনের উদ্দেশ্য বিফল হইয়াছিল? সময়ে সময়ে তাহার ঐরূপই মনে হইত।  অথবা উচ্চতর কোন বিধান অলক্ষ্যে কাজ করিতেছিল — যাহার ফলে একজীবনে যে সাফল্য লাভের সম্ভাবনা, ভবিষ্যতে তাহা অপেক্ষা বহুগুণ সফলতা অর্জিত হইতে পারে?

তাহার দৃষ্টি ছিল যেমন ব্যাপক, তেমনি গভীর।  ভারতের উন্নতি প্রবর্তনের উপাদানগুলিকে তিনি বিশ্লেষণ করিয়া দেখিয়াছিলেন।  ভারতকে এক অভিনব আজ্ঞাবহতার আদর্শ শিক্ষা করিতে হইবে।  সুতরাং মঠটি সংঘবদ্ধতার ভিত্তির উপর স্থাপিত হইল, যাহা ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রচলিত সর্বপ্রকার আদর্শের প্রতিকূল।  হাজার রকমের নূতন ও নিত্যব্যবহার্য জিনিসকে ধীরে ধীরে আত্মসাৎ করিয়া লইতে হইবে।  অতএব যদিও তিনি নিজে অত্যন্ত সাদাসিধাভাবে থাকিতে অভ্যস্ত ছিলেন, দুই-তিনটি ঘর আসবাবপত্রে সাজানো হইল।  মাটি-খোঁড়া, বাগান করা, দাঁড়টানা, ব্যায়াম ও পশুপালন প্রভৃতি ক্রমে ক্রমে তাহার নিজের এবং নবীন ব্রহ্মচারিগণের জীবনের অঙ্গরূপে পরিণত হইল।  কূপখনন অথবা পাউরুটি প্রস্তুত করার সমস্যা সমাধানের জন্য পূর্ণ উৎসাহের সহিত তিনি দীর্ঘদিন ধরিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে যোগদান করিতেন।  তাহার জীবনের শেষ চড়কপূজার দিনে একটি ব্যায়াম সমিতি মঠে ক্রীড়া প্রদর্শন ও পুরস্কার লাভের জন্য আসে।  ঐ উপলক্ষে স্বামীজী বলেন, তাহার ইচ্ছা এই হিন্দুপাৰ্বণটি (খ্রীস্টানদের লেন্ট স্থানীয়) অতঃপর বিশেষ বিশেষ ব্যায়াম প্রদর্শন দ্বারা যাপন করা উচিত।  তাহার মতে, যে শক্তি এতদিন ধরিয়া শরীর-নিগ্রহে ব্যয়িত হইয়া আসিয়াছে, অতঃপর বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উহাকে পেশীসমূহের উন্নতিকল্পে নিযুক্ত করিলে যথার্থ সদ্ব্যবহার হইবে। 

পাশ্চাত্যমনের নিকট ইহা অনায়াসেই প্রতীয়মান হইবে যে, স্বামীজীর জীবনে ইহা অপেক্ষা প্রশংসাহ আর কিছুই হইতে পারিত না।  বহুপূর্বে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উচ্চতম আদর্শের অনুধাবন ও উহাদের আদান-প্রদান রামকৃষ্ণ মিশনের বিশেষ ব্রত (mission) বলিয়া নির্দেশ করেন।  নিশ্চিতভাবে তিনি নিজের শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানের সামর্থ্য দ্বারা প্রমাণ করেন যে, ঐরূপ ধরনের কার্যে হস্তক্ষেপ করিবার ক্ষমতা তাহার আছে।  কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও অনিবার্য ছিল যে, সময়ে সময়ে তিনি নিজেই নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিবার মমর্যাতনা ভোগ করিবেন।  হিন্দুর ধর্মজীবনের আদর্শ হইল, যে শুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাব, সদাসাক্ষিস্বরূপ, অচল-অটল অস্পর্শ, পরম ব্যোমে অবস্থিত দেবাদিদেব — এই মর্তলোক হারই প্রতিফলিত প্রতিচ্ছায়া।  এই ধারণা র্তাহাদের মনে এত সুস্পষ্ট ও দৃঢ় বদ্ধমূল যে, মানসিক দ্বন্দ্বরূপ বিপুল ক্ষতি স্বীকার করিয়াই কেবল উহাকে নূতন পথে প্রবর্তিত করা সম্ভব।  কোন নূতন আদর্শ প্রবর্তন করিতে গিয়া ভাস্করকে যে কি মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করিতে হয়, তাহা কেহ অনুভব করিয়াছেন কি? তাহার কার্য সাধনের জন্য যে ভাবপ্রবণতা, সূক্ষ্ম অনুভূতিবোধ প্রয়োজন, যে নৈতিক উচ্চাদর্শ তাঁহার হাতের বাটালিস্বরূপ, অবসর মুহূর্তে তাহারাই সন্দেহ ও দায়িত্ববোধের আতঙ্ক হইয়া তাহাকে চাপিয়া ধরে।  সুতরাং এরূপ ব্যক্তির নিকট, যাহাদের জীবন অতি কঠোর কিন্তু জনসাধারণের নৈতিকবোধের দ্বারা অনুকরণের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত ও প্রমাণিত হইয়াছে, তাহাদের জীবনও কত সুখময় বলিয়া মনে হয়! বহু অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে আমি লক্ষ্য করিয়াছি, উহারা যেন দুইটি সূতায় বোনা — একটি সূতা আমাদের নিজেদের নির্বাচিত, অপরটি, আমরা সহ্য করিয়া যাই।  কিন্তু এক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব দুই পৃথক আদর্শের মধ্যে ঘাত-প্রতিঘাতের আকার ধারণ করে।  ইহাদের প্রত্যেকটিই নিজের জগতে সর্বোচ্চ, আবার প্রতিপক্ষ মতাবলম্বীর নিকট মহাপাপ বলিয়া গণ্য। 

মধ্যে মধ্যে কোন সঙ্গীর নিকট অন্যমনস্কভাবে তিনি দু-একটা কথা বলিয়া ফেলিতেন এবং তাহাতেই অন্তরের এই সংঘর্ষ ধরা পড়িয়া যাইত।  একদিন খেতড়িরাজের সহিত অশ্বারোহণে যাইবার সময় তিনি দেখিতে পান, রাজার হাত কাটিয়া গিয়া প্রচুর রক্ত পড়িতেছে; এবং জানিতে পারেন যে, তাঁহার যাইবার রাস্তা হইতে একটি কাটা ডাল সরাইতে গিয়াই রাজার হাত ঐরূপভাবে কাটিয়া যায়।  স্বামীজী মৃদু ভৎসনা করিলে রাজপুত ব্যাপারটি হাসিয়া উড়াইয়া দিয়া বলেন, “স্বামীজী, আমরা কি চিরকালই ধর্মের রক্ষাকর্তা নই?” গল্পটি বলিয়া স্বামীজী বলিলেন, “দেখ, তারপর আমি তাকে বলতে যাচ্ছিলাম, একজন সন্ন্যাসীকে আপনাদের এত সম্মান প্রদর্শন করা উচিত নয়’, এমন সময়ে হঠাৎ আমার মনে হলো, হয়তো তারা ঠিকই করেছেন।  কে জানে! হয়তো আমিও তোমাদের এই আধুনিক সভ্যতার ক্ষণস্থায়ী অত্যুজ্জ্বল ছটার মধ্যে পড়ে গেছি!” একজন তাহাকে বলিয়াছিলেন, “আমার মতে, যিনি চারদিকে জ্ঞান বিস্তার করতে করতে যদৃচ্ছা ভ্রমণ করতেন এবং একস্থান থেকে স্থানান্তরে যাবার সময় নাম পরিবর্তন করতেন,সেই ‘রমতা সাধু’ই বহু চিন্তা ও কার্যভারপীড়িত বেলুড় মঠের মহন্ত অপেক্ষা বড় ছিলেন। ” উত্তরে তিনি শুধু বলিয়াছিলেন, “আমি জড়িয়ে পড়েছি। ” আমেরিকার জনৈকা মহিলা যে গল্পটি বলেন, তাহাও আমার মনে আছে।  তার স্বামী এই অদ্ভুত অতিথিকে বুঝাইয়া বলেন যে, তাহাকে শিকাগো যাইতে হইবে, এবং তাহার মুখে ধর্মবিষয়ক বক্তৃতা শুনিবার জন্য তাঁহাকে প্রয়োজনীয় অর্থ সানন্দে দেওয়া হইবে।  ঐ মুহূর্তে তাহার মুখের অবস্থা এরূপ হইয়াছিল যে, মনে করিতেও কষ্ট বোধ হয়।  মহিলাটি বলিতেন, “এই কথায় মনে হলো, তার শরীরের মধ্যে যেন কোন কিছু ছিঁড়ে গেল, যা আর কখনো জোড়া লাগবার নয়। ” পাশ্চাত্যে একদিন তিনি মীরাবাঈ-এর গল্প বলিতেছিলেন।  উচ্চদরের সাধিকা মীরাবাঈ একসময়ে চিতোরের রানী ছিলেন।  তাহার স্বামী তাহাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে চাহিয়াছিলেন, শুধু তাহাকে রাজ অন্তঃপুরে থাকিতে হইবে।  কিন্তু তাহাকে বাধিয়া রাখা গেল না।  শ্রোতৃবর্গের মধ্যে একজন বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করেন, “কিন্তু কেন তিনি ঐভাবে থাকবেন না?” স্বামীজী প্রত্যুত্তরে বলিলেন, “কেনই বা থাকবেন? তিনি কি জগতের এই পচা পাকের মধ্যে পড়ে থাকবেন?” শ্রোতাও সহসা বুঝিতে পারিলেন যে, বহুপ্রকার অবান্তর সম্পর্ক এবং ঘাত-প্রতিঘাত সহ সমগ্র সামাজিক জীবন স্বামীজীর নিকট অসহ্য বন্ধন ও তীব্র যন্ত্রণাস্বরূপ বলিয়া মনে হয়।  এইরূপে, ধর্মাচার্য হিসাবে স্বামীজী রৌদ্রোজ্জ্বল অনাবিলতা ও শিশুসুলভ শান্তি দ্বারা পরিবৃত থাকিলেও তাহার স্বদেশে আসিয়া সঙ্গে সঙ্গে দেখিতে পাইলাম, আর এক দৃষ্টিভঙ্গি হইতে দেখিলে তিনি সম্পূর্ণ মানবভাবাপন্ন।  আর, এক্ষেত্রে যদিও তাহার সকল প্রচেষ্টার ফল আমাদের অনেকের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর অথবা অধিকতর স্থায়ী হইত, কিন্তু ঐজন্য তাহাকেও ঠিক আমাদেবই মতো অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়া দীর্ঘকাল পরিশ্রম স্বীকার করিতে হইত।  কদাচিৎ আলোক দেখা যাইত।  প্রায়ই তিনি ব্যর্থতার হতাশা হইতে নিজেকে মুক্ত করিতে পারিতেন না।  যে দেহযন্ত্রসহায়ে তাহাকে কার্য করিতে হইতেছে এবং যাহাদের তিনি মানুষ করিয়া তুলিতে চাহিতেছেন, উভয়েরই সীমিত ক্ষমতা প্রায়ই তাহার চিত্তে বিরক্তি উৎপাদন করিত — এবং এইভাবে বৎসরের পর বৎসর অতিবাহিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করিবার অথবা অজ্ঞাত কোন বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলিবার সাহসও তাহার ক্রমশঃ কমিয়া যাইতে লাগিল।  একবার তিনি বলিয়াছিলেন, “সবদিক ভেবে দেখলে, সত্যই আমরা কি জানি? মা-ই সব জিনিস নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করছেন।  আমরা শুধু আনাড়ির মতো হাতড়ে বেড়াচ্ছি। ” সম্ভবতঃ মহাপুরুষগণের জীবনের এই অংশটি তাহাদের জীবনচরিতকারেরা বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করিতে চাহেন নাই।  তথাপি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে জগদীশ্বরীর প্রতি তাহার নিম্নোক্ত অনুযোগপূর্ণ বাক্য হইতে আমরা ইহার কিছুটা আভাস পাই, “মা, এ কি করলি? আমার সব মনটা যে এই ছেলেগুলোর উপর পড়ছে মা!” আর চতুর্বিংশতি শতাব্দী অতীত হইবার পরেও আর এক জন ধর্মাচার্যের চিত্ততটে ‘ধম্মপদের’ একাদশ অধ্যায়ের অনুরূপ ঝঞ্ঝার তরঙ্গাঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। 

কিন্তু আচার্যদেবের প্রকৃতিতে আর একটি জিনিস বদ্ধমূল ছিল।  তিনি নিজেই জানিতেন না, কিরূপে উহার সামঞ্জস্য করিবেন। উহা হইল তাহার স্বদেশপ্রেম ও স্বদেশের দুর্গতির জন্য ক্ষোভ।  ঐ সময়ে কয়েক বৎসর আমি প্রায় প্রত্যহ তাহাকে দেখিতে পাইতাম।  দেখিতাম, ভারতের চিন্তা তাহার নিকট শ্বাসপ্রশ্বাসস্বরূপ।  একথা সত্য, তিনি ছিলেন একেবারে মূল ধরিয়া কাজ করিবার পক্ষপাতী।  ‘জাতীয়তা’ শব্দটিও তিনি ব্যবহার করিতেন না,অথবা ‘জাতিগঠনে’র যুগ বলিয়াও ঘোষণা করিতেন না।  তিনি বলিতেন, তাঁহার কাজ হইল ‘মানুষ তৈরি করা’।  কিন্তু প্রেমিকের হৃদয় লইয়া তিনি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, আর তাঁহার আরাধ্য দেবতা ছিলেন জননী জন্মভূমি।  একটি ঘণ্টাকে যদি চারিদিকের ভার সমান করিয়া নিপুণভাবে ঝুলাইয়া রাখা হয়, তাহা হইলে উহা যেমন কোন শব্দ দ্বারা আহত হইবামাত্র ঝকৃত ও স্পন্দিত হইয়া ওঠে, তাহার জন্মভূমিসংক্রান্ত সল ব্যাপারেই তাঁহার হৃদয়ও অনুরূপভাবে ঝকৃত হইয়া উঠিত।  ভারতের চারিপ্রান্তের মধ্যে উখিত যে কোন কাতরধ্বনি তাঁহার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হইত।  ভারতের প্রত্যেকটি ভীতিসূচক ক্রন্দন, দুর্বলতাজনিত কম্পন, অপমানহেতু সঙ্কোচবােধ-তিনি জানিতেন এবং বুঝিতেন।  ভারতের অন্যায় আচরণের তিনি ছিলেন কঠোর সমালোচক, তাহার সাংসারিক অনভিজ্ঞতার উপর খগহস্ত; কিন্তু সে কেবল ঐ দোষগুলিকে তিনি নিজেরই মনে করিতেন বলিয়া।  পক্ষান্তরে, তাহার ন্যায় কেহই আবার ভারতের ভাবী মহিমার কল্পনায় অভিভূত হইতেন না।  তাঁহার দৃষ্টিতে ভারতই ইংরেজী-সভ্যতার প্রসূতিরূপে প্রতিভাত হইত।  কারণ, তিনি বলিতেন, আকবরের ভারতের তুলনায় এলিজাবেথের ইংলণ্ড কি ছিল? আর, ভারতের সম্পদ পশ্চাতে না থাকিলে ভিক্টোরিয়ার ইংলণ্ডেরই বা কি ঘটিত ? কোথায় থাকিত তাহার মার্জিত সভ্যতা ? তাহার অভিজ্ঞতাই বা কোথায় থাকিত ? তাহার মুখ হইতে স্বদেশের ধর্ম, ইতিহাস, ভূগোল ও জাতিতত্ত্ব অবিরল ধারায় নির্গত হইত।  ভারতীয় প্রসঙ্গ সমগ্রভাবে অথবা উহার বিশদ বর্ণনা — উভয়ই তাহার নিকট সমান আনন্দের ছিল–অথবা তাহার শ্রোতৃবর্গের নিকট ঐরূপ বোধ হইত।  এমনকি, সময়ে সময়ে এরূপও ঘটিত যে, যদি কেহ স্বামীজী পূর্বে যাহা বলিয়াছেন তাহা মনে রাখিতে ইচ্ছা করিতেন, তবে তাহার পক্ষে আরও অধিক শোনার সামর্থ্য থাকিত না।  আবার কেহ যদি আনুপূর্বিকভাবে ঐসব মনে না রাখিতেন, তাহা হইলে তিনি দেখিতে পাইতেন, আরও দুই ঘণ্টাকাল ধরিয়া অবিশ্রান্তভাবে তিনি নারীজাতির উত্তরাধিকার বিষয়ক আইন, অথবা বিভিন্ন প্রদেশের জাতিগত আচার ব্যবহারের খুঁটিনাটি, কিংবা কোন জটিল অধ্যাত্মবাদ বা ধর্মতত্ত্বের বিশ্লেষণ করিয়া চলিয়াছেন। 

তাহার এই সকল প্রসঙ্গের মধ্যে রাজপুতজাতির বীরত্ব, শিখদের বিশ্বাস, মারাঠাজাতির শৌর্য, সাধুগণের ঈশ্বরভক্তি এবং মহীয়সী নারীগণের পবিত্রতা ও নিষ্ঠা যেন পুনজীবন লাভ করিত।  মুসলমানকেও তিনি এই প্রসঙ্গে বাদ পড়িতে দিতেন না।  হুমায়ুন, শের শা, আকবর, সাজাহান — ইহাদের প্রত্যেকের এবং আরও শত ব্যক্তির নাম তিনি কোন-না-কোন দিন, যাহাদের নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠা উজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছে তাহাদের আবৃত্তি প্রসঙ্গে যথাস্থানে উল্লেখ করিতেন।   এই হয়তো তিনি আকবরের সিংহাসনে আরোহণ উপলক্ষে তানসেন রচিত গানটি, যাহা আজ পর্যন্ত দিল্লীর পথে পথে গীত হইয়া থাকে, তানসেনেরই সুর-লয় সহযোগে আমাদের গাহিয়া শুনাইলেন; আবার আমাদের বুঝাইয়া দিলেন যে, মোগলবংশে বিবাহিতা নারীগণ বিধবা হইলে কখনও পুনরায় বিবাহ করিতেন না।  পরন্তু হিন্দুনারীর ন্যায় পূজাপাটে মগ্ন থাকিয়াই জীবনের নিঃসঙ্গ বৎসরগুলি অতিবাহিত করিতেন।  আবার অন্য এক সময়ে তিনি সেই মহান জাতীয়গৌরব, প্রতিভাশালী আকবরের কথা বলিতেন — যিনি বিধান দিয়াছিলেন যে, ভারতীয় সম্রাটগণের জন্ম হওয়া উচিত মুসলমান পিতা ও হিন্দু মাতা হইতে।  এক সময়ে তিনি আমাদের নিকট সিরাজুদ্দৌলার উজ্জ্বল কিন্তু গ্ৰহবৈগুণ্যে ক্ষণস্থায়ী রাজত্বের বর্ণনা করেন।  রুদ্ধশ্বাসে আমরা শুনিলাম, কিরূপে সেই হিন্দু সেনাপতি মোহনলাল পলাশী প্রান্তরে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক প্রদত্ত এক আদেশ শ্রবণ করিয়া আক্ষেপ সহকারে বলিয়া উঠেন, “তাহলে আজকের যুদ্ধে জয়ের আশা নেই!” এবং তারপর অশ্বসহ গঙ্গায় ঝাপ দেন।  আর সিরাজের সাধ্বী স্ত্রীর কথাও আমরা শুনিলাম, যিনি বৈধব্যের শ্বেতবাস পরিধান করিয়া আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অবস্থানপূর্বক দীর্ঘদিন ধরিয়া বৎসরের পর বৎসর পরলোকগত স্বামীর কবরের উপর দীপ জ্বালাইয়া দিতেন।  তাহার মুখে ঐ সকল কথা শুনিবার সময় দৃশ্যগুলি যেন প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিত। 

কখন কখনও কথাবার্তা অপেক্ষাকৃত কৌতুক পরিহাসময় হইত।  সামান্য ঘটনা উপলক্ষেই প্রসঙ্গ উঠিত।  কোন মিষ্টান্নপ্রাপ্তি, অথবা মৃগনাভি বা জাফরাণের মতো দুর্লভ বস্তুলাভ, অথবা ইহা অপেক্ষাও সামান্যতম ঘটনাই উহা আরম্ভ করিবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।  একবার তিনি আমাদের কাছে গল্প করেন যে, যখন তিনি পাশ্চাত্যে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন একদিন সন্ধ্যায় ভারতের কোন গ্রামের বাহিরে কিছু দূরে দাঁড়াইয়া ক্রীড়ারত বালকবালিকাদের তন্দ্রাজড়িত কলরব, সন্ধ্যারতির কাসরঘণ্টা, রাখাল বালকগণের চিৎকার এবং স্বল্পকালস্থায়ী গোধূলির আধ-অন্ধকারে শ্রুত অস্ফুট কণ্ঠস্বর — এইসব শুনিবার জন্য তিনি কতই না ব্যাকুল হইয়াছিলেন! বাংলাদেশে শৈশব হইতেশ্রুত সেই আষাঢ় মাসের বৃষ্টির শব্দশুনিয়া স্বদেশের জন্য তাহার কতই না মন কেমন করিয়াছিল! বৃষ্টি, জলপ্রপাত, অথবা সমুদ্রের জলের শব্দ তাঁহার নিকট কত বিস্ময়কর বোধ হইত! একবার তিনি দেখিয়াছিলেন, জনৈকা জননী এক পাথর হইতে অপর পাথরে পা দিয়া পার্বত্য নদী পার হইবার সময় এক একবার মুখ ফিরাইয়া পৃষ্ঠস্থিত শিশুটিকে খেলা দিতেছেন ও আদর ওরিতেছেন।  এই দৃশ্যটি তাহার সর্বাপেক্ষা সুন্দর বলিয়া মনে পড়িত।  তাহার চক্ষে হিমালয়ের গভীর অরণ্যে পর্বতপৃষ্ঠে শয়ন করিয়া নিম্নে স্রোতস্বিনীর অবিরাম ‘হর ‘হর’ ‘মুক্ত’ ‘মুক্ত’ ধ্বনি শ্রবণ করিতে করিতে শরীর ত্যাগ করাই আদর্শ মৃত্যু। 

সর্পিল-কুণ্ডলীর (spiral) উপরেব বেড়গুলি যেমন ঘুরিয়া ঘুরিযা ছোট হইতে হইতে অবশেষে এক বিন্দুতে পর্যবসিত হয়, স্বামীজীর স্বদেশ-ভক্তির আবেগও ছিল সেইরূপ এক বিরাট বস্তু।  স্বদেশের মাটির প্রতি ভালবাসা ও নিসর্গপ্রেম ছিল যেন উহার সর্বনিম্ন বেড়গুলি; জাতি, অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও চিন্তা সম্পর্কীয় অপর যাহা কিছু সমস্তই ছিল উহার পরবর্তী বেড়গুলির অন্তর্গত।  আর সমগ্র বেড় ক্রমশঃ সরু হইয়া অবশেষে এক নির্দিষ্ট বস্তুতে কেন্দ্রীভূত-ইহাই ছিল তাহার দেশপ্রেমের স্বরূপ।  ঐ কেন্দ্রস্থানীয় বিন্দু হইল ভারত সম্পর্কে তাহার দৃঢ় বিশ্বাস।  ভারতের সমালোচকগণ যেরূপ অনুমান করেন, ভারত ঐরূপ স্থবির বা জরাজীর্ণ নহে, পরন্তু নবযৌবন-সম্পন্না, ভাবী সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ এবং এই বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে, অতীতে যাহা ছিল তাহা অপেক্ষা মহত্তর এক বিকাশের পথে পদার্পণ করিয়াছে — ভারত সম্বন্ধে ইহাই ছিল তাহার দৃঢ় বিশ্বাস।  আমার মনে পড়ে, একবার মাত্র তাহাকে কথার মধ্যে ঐ চিন্তা প্রকাশ করিতে শুনিয়াছি।  এক গভীর শান্ত মুহূর্তে তিনি বলিয়াছেন, “বহু শতাব্দীর পর আবির্ভূত বলে নিজেকে অনুভব করছি।  প্রত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছি, ভারত নবীন। ” কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁহার প্রত্যেক কথায় এই উপলব্ধির পরিচয় পাওয়া যাইত, তাহার প্রতি গল্পে ইহার স্পন্দন অনুভূত হইত।  যাহা কিছু ভারতীয়, তাহার জন্য কোন প্রকার কৈফিয়ৎ দেওয়া অথবা তাহার ত্রুটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করা তিনি সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা করিতেন।  আর, যখন তিনি কোন মিথ্যা অপবাদ বা অবজ্ঞাসূচক সমালোচনার তীব্র প্রতিবাদ করিতেন, অথবা কিরূপ বিশ্বাস ও ভালবাসা লইয়া দেশসেবায় প্রবৃত্ত হওয়া উচিত, এই বিষয়ে অপরকে শিক্ষা দিতেন (অবশ্য ঐ বিশ্বাস ও ভালবাসা তাহার নিজের বিশ্বাস ও ভালবাসার ক্ষীণ প্রতিচ্ছায়া ব্যতীত আর কিছু হইতে পারিত না), তখন কতবারই না বোধ হইত, তাঁহার সন্ন্যাসীর পরিচ্ছদ খসিয়া গিয়াছে, এবং ভিতরকার যোদ্ধার বর্ম বাহির হইয়া পড়িয়াছে!

কিন্তু তাই বলিয়া কেহ যেন অনুমান না করেন যে, ঐ সকলের সহিত কতটা প্রলোভন যে আসিয়া যায়, সে বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন না।  যখন তিনি সবেমাত্র শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছেন, সেই সময়ে তাহার গুরুদেব বলিয়াছিলেন, “সত্য বটে, তার মনের উপর অজ্ঞানের একটা পর্দা আছে।  সেটুকু আমার বহ্মময়ী মা-ই বেখে দিয়েছেন, তার কাজ হবে বলে।  কিন্তু ওটা ফিনফিনে কাগজের মতো পাতলা, কোন মুহূর্তে ছিঁড়ে ফেলা যায়।  যে ব্যক্তি গৃহপবিজন ত্যাগ করিয়াছে, সে যেন তাহাদের সম্বন্ধে সর্বপ্রকাব চিন্তা দমন করিবার জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম কবে, সেইরূপ তিনিও বার বার দেশ ও ইতিহাস সম্পর্কিত সকল চিন্তা সংযত ও রুদ্ধ রাখি, প্রবাস পাইতেন, যাহাতে সকল দেশ ও সকল জাতির প্রতি সমদৃষ্টিসম্পন্ন, নিঃসম্বল, পবিব্রাজকমাত্র হইতে পাবেন, তাহাবই চেষ্টা কবিতেন! কাশ্মীরে অবস্থানকালে জীবনের এক মহান অভিজ্ঞতালাভের পর প্রত্যাবর্তন করিয়া ৩ন শিশুব নয় সরলভাবে বলেন, “আর এভাবে রাগ করা চলবে না।  মা বললেন, যদিই বা ম্লেচ্ছ আমার মন্দিরে ঢুকে আমার মূর্তি অপবিত্র করে, তাতে তাব কি তুই আমাকে বক্ষা করিস, না আমি তোকে রক্ষা করি’?”

তাঁহার নিজের আদর্শ ছিলেন সিপাহী-বিদ্রোহকালের সেই সন্ন্যাসী, যিনি এক ইংরেজ সৈনিক কর্তৃক ছুরিকাঘাতে আহত হইয়া পনর বৎসরের মৌন ভঙ্গ করিয়া হত্যাকারীকে বলেন, “তুমিও তিনিই–তত্ত্বমসি। ”

সর্বদা শ্রীরামকৃষ্ণের পদানুগ হইয়া তাঁহার প্রতি বিশ্বস্ত থাকিতেই তিনি চেষ্টা করিতেন।  নিজের কোন বাণীর উল্লেখ তাহার নিকট অপরাধ বলিয়া বোধ হইত।  ইহা ব্যতীত, তিনি বিশ্বাস করিতেন, আবেশ প্রবণতায় শক্তির অষণ অপব্যয় হয়, শক্তিকে সংযত করিলেই তাহা সঞ্চিত হইয়া কর্মরূপে প্রকাশ পায়।  তথাপি, যথাসর্বস্ব দান করিয়া দিবার প্রবল বাসনা তাহাকে অভিভূত করিত, আবার উহা জানিবার পূর্বেই তিনি পুনরায় নিজের দেশ ও স্বজাতি সম্পর্কে আশা ও প্রেমপূর্ণ চিন্তাধারা চারিদিকে ছড়াইতে থাকিতেন।  আপাতদৃষ্টিতে মনে হইত, তাহার অজ্ঞাতসারেই ঐ সকল চিন্তাবীজ উপযুক্ত ক্ষেত্রে পতিত হইয়াছে, এবং ইতিমধ্যেই ভারতের দূরদূরান্তর প্রান্তে তাহাদের অঙ্কুর দেখা দিয়াছে।  মাতৃভূমির প্রতি ভক্তিতে যে সকল ব্যক্তি তাহার প্রতি সমর্পিতপ্রাণ, তাহারাই ঐ অঙ্কুর।  শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন কোন পুস্তকাদি পাঠ না করিয়াও বেদান্তের জীবন্ত বিগ্রহ ছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দও ছিলেন তেমন জাতীয় জীবনের মূর্তিমান বিগ্রহ; কিন্তু ইহার বিচারমূলক ব্যাখ্যা সম্বন্ধে তিনি কিছুই জানিতেন না।  তাঁহার গুরুদেব সম্পর্কে তিনি যে উক্তি প্রয়োগ করিতেন, তাহা উল্লেখ করিয়াই বলিতে হয়, “তিনি শুধু সেই মহৎ জীবন যাপন করেই খুশি ছিলেন; তার ব্যাখ্যা অপরে খুঁজে বার করুক!”


Lent  —  ভগবান ঈশার উপবাসের স্মরণার্থে খ্রীস্টানদিগের মধ্যে প্রচলিত চল্লিশ দিনব্যাপী উপবাস।   —  অনুঃ
অনেকজাতি-সংসারং সন্ধ্যাবিস্‌সং‌ অনিব্বিসং।
  গহকারকং গবেসস্তো দুক্‌খা জাতি পুনপ্পুনং।।  
  গহকারক দিট্ঠোসি পুন গেহং ন কাহসি।
  সব্বা তে ফাসুকা ভগ্গা গহকুটং বিসঙ্খতং। 
  বিসঙ্খাারগতং চিত্তং তন্হানং খয়মজ্ঝগা।।

 — এই দেহরূপ গৃহের নির্মাণকর্তাকে অন্বেষণ করিতে করিতে আমি বহু জন্মজন্মান্তর পরিগ্রহ করিয়াছি।  হাস, পুনঃ পুনঃ জন্মগ্রহণ কি দুঃখদায়ক! হে গৃহনির্মাণকারিণী তৃষ্ণে, আমি তোমায় দেখিতে পাইয়াছি।  আর তুমি গৃহনির্মাণ করিতে পারিবে না।  তোমার গৃহের সমস্ত পার্শ্বক (চালের ‘রুয়া) ভগ্ন হইয়াছে এবং শীর্ষকাষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইযাছে।  আমার চিত্ত সংস্কারবিহীন হইয়া সকল তৃষ্ণার ক্ষয়সাধন করিয়াছে।