চতুর্থ পরিচ্ছেদ
স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্ঘ

গঙ্গাতীরস্থ শষ্পাবৃত ভূমি ও বৃক্ষরাজির মধ্যেই, যে লোকগুরুর কার্যে ইতিপূর্বেই আমার জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলাম, ব্যক্তিগতভাবে তাহার সম্বন্ধে জানিতে পারি।  আমার ভারতে পদার্পণকালে (১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি) বেলুড়ে সবেমাত্র একখণ্ড জমি ও একটি বাড়ি ক্রয় করা হইয়াছিল; তাহাই পরে রামকৃষ্ণ-সঙ্ঘের মঠরূপে পরিণত হয়। আরও কয়েক সপ্তাহ পরে আমেরিকা হইতে কয়েকজন বন্ধু আগমন করেন এবং স্বভাবগত সাহসিকতার সহিত ঐ অর্ধজীর্ণ বাড়িটি অধিকার করিয়া উহাকে সাদাসিধা অথচ স্বচ্ছন্দভাবে বাসের উপযোগী করিয়া লন।  এই বন্ধুগণের অতিথিরূপে বেলুড়ে বাসকালে, এবং পরে কুমায়ুন ও কাশ্মীর ভ্রমণকালেই আমি তাহাদের সহিত ভারতবর্ষকে ভাল করিয়া চিনিতে ও স্বদেশে স্বজনগণের মধ্যে স্বামীজীর জীবনযাত্রা লক্ষ্য করিতে প্রবৃত্ত হই।

আমাদের বাড়িটি ছিল কলিকাতা হইতে কয়েক মাইল উত্তরে, গঙ্গার পশ্চিম তীরে নিম্ন সমতলভূমির উপরে নির্মিত।  জোয়ারের সময় পানসির ন্যায় ছোট ছোট নৌকাগুলি (গঙ্গাতীরে যাহারা বাস করে, এই নৌকাগুলি তাহাদের যানবাহনের কাজ করে) একেবারে সিঁড়ির নিচেই আসিয়া লাগিত।  আমাদের ও অপর পারের গ্রামের মধ্যে নদীটির বিস্তার ছিল অর্ধ হইতে তিন-চতুর্থাংশ মাইল।  নদীর পূর্বতীরে আরও প্রায় এক মাইল উত্তরে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের চূড়া ও বৃক্ষগুলি দৃষ্টিগোচর হইত।  মন্দির সংলগ্ন এই উদ্যানেই স্বামীজী ও তাঁহার গুরুভ্রাতাগণ বাল্যকালে শ্রীরামকৃষ্ণের পদপ্রান্তে বাস করিতেন।  যে বাড়িটি এখন মঠরূপে ব্যবহৃত হইত, তাহা আমাদের কুটির হইতে প্রায় অর্ধ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল।  মঠবাড়ি ও আমাদের কুটিরের মধ্যে অনেকগুলি বাগানবাড়ি এবং অন্ততঃ একটি নালা ছিল।  তালগাছের গুড়ি চিরিয়া তাহার অর্ধাংশ দ্বারা নির্মিত একটি পুলের উপর দিয়া নালাটি পার হইতে হইত; পুলটি দেখিলে সন্দেহ হইত, ভার সহিতে পারিবে কি না।  আমাদের এই বাড়িতেই স্বামীজী প্রতিদিন প্রাতঃকালে একাকী অথবা কয়েকজন গুরুভ্রাতাসহ আসিতেন।  এখানেই প্রাতঃকালীন জলযোগ সমাপ্ত হইবার পর বৃক্ষতলে বহুক্ষণ ধরিয়া আমরা স্বামীজীর অফুরন্ত ব্যাখ্যাপ্রবাহ শ্রবণ করিতাম।  ভারতীয় জগতের কোন না কোন গভীর রহস্য তিনি উদঘাটন করিতেন।  কদাচিৎ প্রশ্নোত্তর স্থান পাইত।  এইকালের কথা যখনই আমার স্মৃতিপথে উদিত হয়, আমি আশ্চর্য হইয়া ভাবি, কিরূপে এই বিপুল চিন্তা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা সম্ভব, আবার সঞ্চয় করিলেও উহা বিতরণ করিবার প্রবল শক্তিই বা কিরূপে আসে! কথাবার্তা বা আলাপ-আলোচনায় যাহারা সুদক্ষ, তাহাদের মধ্যেও এক বিষয়ে স্বামীজীর বৈশিষ্ট্য ছিল।  কথাবার্তার মাঝখানে কেহ বাধা দিলে তিনি বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ করিতেন না।  যাহাদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতেন, সেই শ্রোতাদের মনোভাব সম্পর্কে উদাসীন থাকিতেন না।  সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা লইয়া যাহারা আলোচনায় যোগদান করিতেন, কেবল তাহাদের উপস্থিতিকালেই তাহার গভীরতম উক্তিগুলি শোনা যাইত; বস্তুতঃ তিনি স্বয়ং এ বিষয়ে সচেতন থাকিতেন বলিয়া বোধ হয়না।  বহুবার তিনি উত্তেজিত হইতেন, কিন্তু যেমন কোন অজ্ঞাত কারণে মনে মধুর ভাবের উদয় হইত, তৎকালীন মানসিক উত্তেজনাও তেমন সম্পূর্ণ সাধারণ কোন অজ্ঞাত কারণেই প্রকাশ পাইত; কোন ব্যক্তি বিশেষের সহিত উহার যোগ থাকিত না। 

এখানেই আমরা জানিতে পারি, ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের মূলমন্ত্র কি, এবং কোন্ আদর্শ দ্বারা উহা নিয়ন্ত্রিত।  কারণ, কথাবার্তার মধ্যে বিভিন্ন আদর্শেরই ব্যাখ্যা করা হইত।  একথা সত্য, ঘটনা ও দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করা হইত ইতিহাস, সাহিত্য ও অন্যান্য সহস্র উপকরণ হইতে; কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল সর্বদাই এক আধ্যাত্মিক পূর্ণত্বলাভ সম্পর্কে ভারতীয় আদর্শকে স্পষ্টতর করা।  যেরূপ মনে হইত, আদর্শগুলি বস্তুতঃ সকল সময়ে সেরূপ সহজবোধ্য ছিল না।  এই ভারতীয় জগতে সহজাত পরোপকার বৃত্তির পুষ্টিসাধনের জন্য যতটা প্রয়োজন, তাহা অপেক্ষা চিনের একাগ্রতা সম্পাদনে অধিক মনোযোগ দেওয়া হইয়া থাকে।  কিন্তু উহা ভারতের পক্ষে কল্যাণকর কি না, তাহা তর্কযুক্তিসহায়ে প্রমাণ করিবার সময় এখনও আসে নাই।  ব্যক্তিগত ব্যাপারে স্বামীজীর নির্ভীক উপদেশ ছিল, ব্যক্তিত্বের সীমা অতিক্রম করিতে হইবে (বা নৈর্ব্যক্তিক অবস্থালাভই লক্ষ্য)।  শত্রুর জন্য প্রার্থনা করিতে হইবে, এই তত্ত্বের পরিবর্তে ‘সাক্ষিস্বরূপ হও’ এই উপদেশ অধিক শোনা যাইত।  কারণ,জগতে আমার কোন শত্রু আছে, তাহার মতে এই চিন্তা দ্বেষবুদ্ধিব প্রমাণ।  প্রেম যদি ‘অহেতুক’ না হয়, তবে উহা কোনক্রমেই প্রেম বলিয়া অভিহিত হইতে পারে না—একথা দৃঢ়তার সহিত উচ্চারিত হইত।  পাশ্চাত্য বক্তা হয়তো ‘উদ্দেশ্যবিরহিত’ শব্দদ্বারা ঐ ভাবটিকে প্রকাশ করিবার চেষ্টা করিবেন, কিন্তু তাহাতে অত জোর প্রকাশ পাইবে না।  ব্রহ্মচর্য ও ত্যাগের বিশ্লেষণে কখনও তাহার ক্লান্তি ছিল না।  আমাদের সকল চিন্তার মধ্যে বিরাজ করিতেন শ্রীমহাদেব—যিনি নিজের সৃষ্ট ত্রৈলোকের রাজত্ব অথবা পিতৃত্ব, ঐশ্বর্য অথবা সুখ—কোন কিছুর দ্বারাই প্রলুব্ধ নন, বরং সাংসারিক দৃষ্টিতে ঠিক বিপরীত একজন অতি ‘সাদাসিধা ব্যক্তি কোন কৌতূহল নাই, সহজে প্রতারিত—যিনি প্রতিদিন দ্বারে দ্বারে একমুষ্টি তণ্ডুল ভিক্ষা করিয়া বেড়ান।  তিতিক্ষা অথবা অন্যায়ের প্রতিকার না করাই হইল ধর্মজীবনের চিহ্ন।  পাশ্চাত্যে আমরা ইহার উদাহরণ সেই কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত সাধুর মধ্যে পাই।  আঙ্গুলের গাট হইতে কৃমিকীট পড়িয়া গেলে তিনি হেঁট হইয়া তাহাদের পুনর্বার যথাস্থানে রাখিয়া দিয়া বলিতেন, “ভাই সব, খাও। ” জীবের অন্যতম সিদ্ধিলাভ হইল রঘুনাথেরদর্শনপ্রাপ্তি যে সাধু সম্মুখস্থ কয়েকটি বলদকে প্রহৃত হইতে দেখিয়া মূৰ্ছিত হইয়া পড়েন, এবং তাহার পৃষ্ঠে চাবুকের দাগগুলি ফুটিয়া ওঠে, তিনি ঐ সিদ্ধাবস্থা লাভ করিয়াছিলেন।  ধর্ম সম্বন্ধে আমাদের পূর্ব ধারণা হইতে সম্পূর্ণ বিজাতীয়একটি ভাবকে হৃদয়ঙ্গম করিবার জন্য স্বামীজী আমাদের আহ্বান করেন।  তাহার মতে দেহবোধের একান্ত অভাবই পূর্ণ সাধুত্বের লক্ষণ।  ঐ দেহবোধের অভাব এত গভীর, সাধু যে উলঙ্গ অবস্থায় রহিয়াছেন; সে সম্বন্ধে তাহার কোন বোধই নাই।  নগ্নতার মধ্যেও বিশেষ স্থলে উচ্চতর ভাব উপলব্ধি করিবার যে সূক্ষ্মবিচারবোধ–পাশ্চাত্যে তাহার প্রকাশ ললিতকলায়; ভারতে উহার বিকাশ ধর্মে।  কোন গ্রীক প্রতিমূর্তির সম্মুখে আমরা যেমন সৌন্দর্যের আদর্শ হিসাবে একটা শ্রদ্ধার ভাব উপলব্ধি করি, হিন্দুরা তেমনি নগ্ন সাধুর মধ্যে মাহাত্ম ও শিশুসুলভ পবিত্রতা দেখিয়া থাকেন। 

কিন্তু এই নূতন চিন্তা-জগতে ধর্মজীবনে চিত্তের একাগ্রতার ন্যায় যে আকাঙ্ক্ষা অনুরূপ ভাবে প্রধান ও সর্বজনীন বলিয়া গণ্য হইত, তাহা হইল জীবাত্মার স্বাধীনতা।  চিন্তা, মতামত এবং কর্মের ছোটখাটো অধিকারগুলি ছিল উহার অন্তর্ভুক্ত।  একমাত্র এই অধিকারটি নিজস্ব মনে করিয়া সাধুরা উহা প্রাণপণে রক্ষা করিয়া থাকেন।  ইহাই তাহাদের একমাত্র সম্পদ, যেখানে তাঁহারা কোন প্রকার অনধিকার প্রবেশ সহ্য করিতে পারেন না।  প্রাত্যহিক জীবনে এই ভাবটি কিরূপে রূপায়িত করা হয়, তাহা লক্ষ্য করিতে গিয়া দেখিলাম, উহা একপ্রকার ত্যাগেই পরিণত।  যতই সুখকর হউক, যদি উহা বন্ধন শৃঙ্খলে আবৃত থাকে, তবে কিছুতেই গ্রহণ করা চলিবে না; এক কথায়, বন্ধনের ইঙ্গিতমাত্ৰ থাকিলে তাহার সহিত সকল সম্পর্ক ছিন্ন করিবার জন্য প্রস্তুত থাকিতে হইবে।  ইহার জন্য চিত্ত কতদূর নির্মল, ইচ্ছাশক্তি কতদূর শুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।  আবার এই আদর্শই কত তথ্য উদঘাটন করিয়া দেয়! এ কথা বুঝিতে বিলম্ব হয় না, ভারতবর্ষে সঙ্ঘবদ্ধ সন্ন্যাসধর্ম যে তেমন বিকাশ লাভ করে নাই, ইহাই তাহার কারণ।  অতীতে ধর্মজীবনে যে সকল মহাপুরুষ আদর্শস্থানীয় বলিয়া গণ্য হইতেন, তাহারা কুটিচক অথবা পরিব্রাজক যাহাই হউন, সর্বদা একাকী বাস করিতেন।  আমাদের নিকটস্থ মঠে এমন সব ব্যক্তি ছিলেন বলিয়া শুনিতাম, যাহারা তাহাদের নেতার মেয়েদের সহিত বাক্যালাপ পছন্দ করিতেন না।  কেহ কেহ ছিলেন সকল প্রকার ক্রিয়াকলাপ ও অনুষ্ঠানের বিরোধী।  একজনের ধর্ম ছিল ব্যক্তি-উপাসনায় পর্যবসিত, যাহাকে প্রায় নাস্তিকতা বলা যাইতে পারে।  আবার, একজনের ধর্ম তাহাকে এমন সব অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত করিত, যাহা আমাদের অনেকের নিকটেই অসহনীয় মনে হইত।  কয়েকজন বাস করিতেন ‘মহাপুরুষ’ ও নানাবিধ দর্শনের এবং অলৌকিক রাজ্যে; আবার কেহ কেহ এইসব অর্থহীন ব্যাপার একেবারে উড়াইয়া দিতে পারিতেন না, তবে চুলচেরা তর্কযুক্তিসহায়ে গন্তবাপথে অগ্রসর হইতেন।  এই বিভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তিগণ যে ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারিয়াছিলেন, ইহা দ্বারা নির্বিবাদে প্রমাণ হয় যে, তাঁহা প্রত্যেকের নিজ নিজ পথ বাছিয়া লইবার অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন।  আবার এই সূত্রেই তখন এবং পরেও আমি না ভাবিয়া থাকিতে পারি নাই যে, ইহাই ছিল কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতের প্রাচীন শাসনপদ্ধতির ব্যর্থতার কারণ।  যাহাতে উচ্চস্তরের ও সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ চরিত্রের ব্যক্তিগণ রাষ্ট্র ও নগর সংক্রান্ত কর্মে নিজেদের সম্যকরূপে নিযুক্ত করিতে পারেন, সেজন্য তাহাদের আন্তরিক বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন যে, সঙ্ঘবদ্ধ কার্যই প্রশস্ততর ও সম্মানজনক।  অতএব ঐ কার্য সম্পন্ন করিবার জন্য তাহাদের উদ্যম থাকা উচিত।  প্রাচীন ভারতে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী আধ্যাত্মিক আদর্শ বিষয়ে অত্যধিক সচেতন থাকিতেন—বিশেষতঃ স্বাধীনতাবোধের ফলে নগর ও রাষ্ট্রসংক্রান্ত নিয়ম শৃঙ্খলার প্রতি তাহারা কোন প্রকার আগ্রহ বোধ করিতেন না।  সুতরাং ইহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই যে, তাহাদের ক্ষমতা ও চরিত্রবল থাকা সত্ত্বেও আধুনিক বিধিব্যবস্থার সুযোগসুবিধা কার্যে রূপায়িত করিবার ভার পড়িয়াছে আধুনিক ব্যক্তিগণের উপর।  তথাপি এই সকল কার্য সম্যকরূপে ধারণা ও পোষণ করিবার এবং উন্নতির অঙ্গীভূত করিয়া লইবার শক্তি যে হিন্দুধর্মে বিদ্যমান, আমার বিশ্বাস, তাহা শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাহার শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের আবির্ভাব ও জাতীয় চিন্তাভাণ্ডারে তাহাদের বিশিষ্ট দান হইতেই প্রমাণিত হইয়াছে। 

স্বামীজী মনে করিতেন, পাশ্চাত্য চবিত্রের এক মহাদোষ, তাহারা নিজেদের পক্ষে যাহা কল্যাণকর মনে করে, অপরের উপর বলপূর্বক তাহা চাপাইয়া দিবার চেষ্টা।  গম্ভীরভাবে তিনি বারবার আমাদের ঐ দোষ পরিহার সম্পর্কে সতর্ক করিয়া দিতেন।  সম্ভবতঃ তাহার চির অভীপ্সিত ‘আদর্শ-বিনিময়ের’ই ইহা অন্যতম উদাহরণ।  আবার সেই সঙ্গে তাহার আপনার লোকেরা যখন প্রশ্ন করেন, তিনি তো স্বদেশে ইংরেজদের দেখিয়াছেন, তাহারা কোন্ বিষয়ে সর্বাপেক্ষা উৎকর্ষসাধন করিয়াছে বলিয়া তাহার বোধ হয়? তখন স্বামীজী উত্তরে বলেন, “আত্মসম্মান বজায় রেখে কিরূপে আজ্ঞাবহ হওয়া চলে, এটা তারা শিখেছে। ”

কিন্তু বেলুড়ে আমরা কেবল স্বামীজীকেই দেখি নাই।  সারা মঠই আমাদের অতিথি মনে করিতেন।  সেইজন্য অতিথিপরায়ণ সাধুগণ কখনও আমাদের প্রতি অনুগ্রহবশতঃ, কখনও বা সেবার উদ্দেশ্যে আমাদের নিকট যাতায়াতের কষ্ট স্বীকার করিতেন।  যে গাভীটি আমাদের দুধ দিত, তাহাকে তাঁহারাই দোহন করিতেন।  যে ভৃত্যের উপর রাত্রে ঐ দুধ পৌঁছিয়া দিবার ভার ছিল, সে যখন একদিন পথে গোখুরা সাপ দেখিয়া ভয় পায় ও যাইতে অস্বীকার করে, তখন সাধুদের মধ্যেই একজন ঐ কার্যের ভার গ্রহণ করেন।  ভারতীয় গৃহস্থালীর আমাদের অজানা সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য প্রত্যহ একজন করিয়া ব্রহ্মচারী মঠ হইতে প্রেরিত হইতেন।  একজনের উপর ভার ছিল বাংলা শিখাইবার।  সঙেঘর প্রাচীন সন্ন্যাসিগণ প্রায়ই সৌজন্যবশতঃ এবং অনুগ্রহপূর্বক আমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিতেন।  আর যখন স্বামীজী স্বয়ং কয়েক সপ্তাহের জন্য অন্যত্র যাইতেন, তখন তাহাদের মধ্যে কেহনা-কেহ অতিথিদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করিয়া প্রাতঃকালের চায়ের টেবিলে নিয়মিতভাবে তাঁহার স্থান গ্রহণ করিতেন।  এইরূপ সহস্র উপায়ে আমরা সেই সব ব্যক্তির সংস্পর্শে আসিয়াছিলাম যাহাদের কথাবার্তার মধ্যে স্মৃতির উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটিত।  ঐ স্মৃতিই ছিল ‘টানা’ যাহার উপর ‘পড়েনে’র মতো এই সব ত্যাগীর জীবন বোনা হইয়াছিল। 

কারণ, যে সব সন্ন্যাসিগণ আমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিতেন তাহাদের একমাত্র আলোচ্য বিষয় ছিল শ্রীরামকৃষ্ণ এবং তাহার প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।  মাত্র তের-চৌদ্দ মাস হইল স্বামীজী তাহাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন, এবং তখনও পর্যন্ত প্রথম দর্শনজনিত আনন্দ ও বিস্ময় অপনীত হয় নাই বলিলেই চলে।  তাহার পূর্বে প্রায় ছয় বৎসর কাল স্বামীজী একরূপ নিরুদ্দিষ্ট ছিলেন।  সত্য বটে, শেষের দিকে তাঁহাদের সহিত ঘন ঘন পত্র ব্যবহার ছিল, এবং কোন সময়ে এরূপ হয় নাই যে, তাহারা স্বামীজীর গতিবিধি সম্পর্কে একেবারে অবহিত ছিলেন না।  স্বামীজীর জীবনের মহান উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁহার গুরুদেবের ভবিষ্যদ্বাণীর উপর গুরুভ্রাতাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল।  তাই আমেরিকায় তাহার প্রথম সাফল্যের সংবাদ শুনিবামাত্র তাহারা অনুমান করেন যে, ইনি তাহাদেরই স্বামী বিবেকানন্দ। 

যাহারা কোথাও কোন মহাত্যাগীর জীবন প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, তাঁহারা অবগত আছেন যে, নিজের পরিচয় সম্পূর্ণরূপে মুছিয়া ফেলিবার, অতি তুচ্ছ ও যাহাদের কেহ খোঁজ খবর রাখে না, এরূপ বস্তুর সহিত একাত্ম হইয়া যাইবার, এবং লোকসঙ্গ হইতে দূরে চলিয়া গিয়া তাহাদের স্মৃতি হইতে লুপ্ত হইয়া যাইবার এক প্রবল আকাঙক্ষা হইল আবেগময় ত্যাগজীবনের অঙ্গস্বরূপ! আমার মনে হয়, দীর্ঘকাল ব্যাপী মৌন, নির্জন গুহাবাস এবং বন হইতে বনে, গ্রাম হইতে গ্রামে ভ্রমণ করিবার সময় মৃত্তিকা ও বিভূতি অঙ্গে লেপন প্রভৃতি এই প্রকার ধর্মের যেসহস্র বৈশিষ্ট্য আছে, পাশ্চাত্য দর্শক বাহির হইতে যাহার অর্থবোধ করিতে পারেন না, ইহাই তাহার প্রকৃত ব্যাখ্যা।  শ্রীরামকৃষ্ণের অদর্শনের পর কয়েক বৎসর ধন্যিা এই ভাবট স্বামীজীর মনে বিশেষভাবে আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিল বলিয়া বোধ হয়।  এবং একথা নিশ্চয়, কেহ যাহাতে তাহার কোন সন্ধান না পায়, এই উদ্দেশ্যেই তিনি বারবার গুরুভ্রাতাদের ছোট দলটিকে পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইতেন।  এইরূপ এক যাত্রায়, তিনি হাথরাসে পীড়িত হইয়া রহিয়াছেন শুনিয়া গুরুত্ৰাতাগণ তাহাকে আনিবার জন্য লোক পাঠান।  তাহাদের পরস্পরের মধ্যে বিশেষতঃ স্বামীজীর সহিত, এরূপ ভালবাসার বন্ধন ছিল যে, তাহারা স্বয়ং তাহার সেবা না করিয়া থাকিতে পারিতেন না।  স্বামীজী প্রত্যাবর্তন করিবার কয়েকমাস পরে তাহার এক শিষ্যের মঠে আগমন ঘটে।  পর্যটনকালে স্বামীজী তাহাকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন।  তাহার সন্ন্যাস নাম ছিল স্বামী সদানন্দ।  সদানন্দের ভাঙা-ভাঙা অথচ বলিষ্ঠ ইংরেজীতে প্রদত্ত বিবরণ হইতে এইকালে স্বামীজী মঠে কিরূপ জীবন যাপন করিতেন, তাহার ইতিবৃত্ত সংগ্রহ করি।  পূর্বাশ্রম ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় আসিবার পাথেয় সংগ্রহ করিবার জন্য সদানন্দকে দুই-তিন মাস রেলে চাকরি করিতে হয়।  মঠে পৌঁছিয়া দেখিলেন, স্বামীজী পুনরায় বাহির হইয়া পড়িবার উদ্যোগ করিতেছেন।  কিন্তু তাহার জন্য তিনি যাত্রা স্থগিত রাখেন এবং সেই সন্ধ্যায় যে যাত্রারম্ভের কথা ছিল, এক বৎসরের পূর্বে তাহা আর ঘটিয়া ওঠেনাই।  এইকালের কথা উল্লেখ করিয়া স্বামীজীর প্রথম শিষ্য গর্বের সহিত বলিতেন, “স্বামীজীর জগদ্ধিতায় কর্মের আরম্ভ আমাকে নিয়ে। ”

এই বৎসর স্বামীজী “একদমে চব্বিশঘণ্টা কাজ করতেন।  তার এত কাজ ছিল যে, প্রায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। ” অতি প্রত্যুষে অন্ধকার থাকিতে তিনি গাত্রোত্থান করিতেন, এবং “জাগো, জাগো সকলে, অমৃতের অধিকারী”, এই গানটি গাহিতে গাহিতে সকলকে উঠাইয়া দিতেন।  তারপর সকলে একত্র ধ্যানে বসিতেন।  অতঃপর যেন অজ্ঞাতসারেই ভজন ও সৎপ্রসঙ্গে উপনীত হইতেন এবং দ্বিপ্রহর পর্যন্ত বা তাহার পরেও উহা চলিত।  স্তবপাঠ ও ভজন হইতে ক্রমে ইতিহাস-প্রসঙ্গ আসিয়া পড়িত।  কখনও ইগেশিয়াস লয়োলার গল্প, কখনও জোয়ান অব আর্ক অথবা ঝালীর রানীর গল্প হইত।  আবার কখনও স্বামীজী কালাইলের ‘ফরাসী রাষ্ট্রবিল্পব হইতে দীর্ঘ অংশ আবৃত্তি করিতেন, এবং সকলে যেন স্বপ্নবিষ্টের ন্যায় দুলিতে দুলিতে সমস্বরে পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করিতেন, “সাধারণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক”! ”সাধারণতন্ত্রের জয় হোক!” অথবা তাহারা সেন্ট ফ্রান্সিস্ অব অ্যাসিসির কথায় তন্ময় হইয়া যাইতেন।  নাট্যকার যেমন নিজের অজ্ঞাতসারে স্বভাববশে নাটকের পাত্রগণের সহিত একাত্ম হইয়া যান, তেমনি তাঁহারাও উক্ত মহাপুরুষের “মৃত্যু, তোমায় স্বাগত জানাই”, এই বাক্যটি দীর্ঘকাল ধরিয়া চিন্তা করিতে করিতে আত্মহারা হইয়া যাইতেন।  বেলা একটা-দুইটার সময় স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ—যিনি ছিলেন একাধারে এই সঙ্ঘের পাচক, গৃহস্থালীর তত্ত্বাবধায়ক ও পূজারী—তাহাদের বকুনি দিয়া স্নানাহার করিবার জন্য উঠাইয়া দিতেন।  কিন্তু আবার তাহারা একত্র হইতেন, আবার ভজন ও সৎপ্রসঙ্গ চলিত সন্ধ্যা পর্যন্ত।  তারপর দুইঘণ্টা ধরিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের আরাত্রিক সম্পন্ন হইত।  অনেক সময় তখনও তাহাদের তন্ময়তা ভঙ্গ হইত না, আবার ভজন ও শ্রীরামকৃষ্ণপ্রসঙ্গ করিতে করিতে তাহারা ধ্যানে মগ্ন হইয়া যাইতেন।  অথবা ছাদের উপর বসিয়া মধ্যরাত্রি অতীত হইবার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাহারা নামগান করিতেন, ‘জয় সীতারাম!’ ‘জয় সীতারাম!’ সকল ধর্মের বিশেষ বিশেষ পর্বগুলি উহাদের উপযোগী বিশেষ অনুষ্ঠান সহকারে সম্পন্ন হইত।  যেমন, বড়দিনের সময় তাঁহারা মেষপালকদের মতো মাথা কানো লম্বা ছড়ি হস্তে জ্বলন্ত কাঠের গুড়ির চারিপার্শ্বে অধশায়িত অবস্থায় অনুচ্চস্বরে আলোচনা করিতেন; কেমন করিয়া এক নির্জন স্থানে কয়েকটি মেষপালক তাহাদের মেষযুথের রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিল, এমন সময়ে দেবদূতগণ সেখানে শুভাগমন করেন এবং কিরূপে সেই দিনই জগতের প্রথম গ্লোরিয়া নামক স্তবগানের উৎপত্তি হয়।  একবার গুডফ্রাইডে উৎসব তাাহারা কিরূপে সম্পন্ন করেন, তাহার গল্পটি কৌতুকাবহ।  ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়া গেল এবং ক্রমে ক্রমে, ঐ উৎসব যাহারা পালন করেন তাহাদের যেমন উৎকট ভাবাবস্থা হয়, তাহারাও সেই অবস্থা প্রাপ্ত হইলেন।  আহারের কথা চিন্তা করা চলিবে না।  যে কয়টি আঙুর তাহারা সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহার রস বাহির করিয়া জলের সহিত মিশানো হইল।  একই পাত্র হইতে সকলে উহা পান করিবেন, তাহার উদ্যোগ চলিতেছে, এমন সময়ে দরজায় একজন ইউরোপীয় অতিথির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “কে আছ, খ্রীস্টের দোহাই, দরজা খোল। ” এক অবর্ণনীয় আনন্দের সঙ্গে দশ-পনের জন ছুটিয়া গিয়া অতিথির চারিদিকে জড় হইলেন।  সকলেই একজন খ্রীস্টানের মুখে ঐদিনের মাহাত্ম্য শ্রবণ করিতে উৎসুক।  কিন্তু তিনি বললেন, “তিনি মুক্তিফৌজের লোক, গুডফ্রাইডের কথা কিছুই জানেন না।  তারা কেবল জেনারেল বুথের জন্মদিন পালন করে থাকেন। ” স্বামী সদানন্দ বলিলেন, “তিনি আরও কি কি বলেছিলেন, আমার মনে নেই। ” কথাগুলি বলিতে বলিতে বক্তার মুখমণ্ডল ও কণ্ঠস্বর যেরূপ বিষাদপূর্ণ হইয়া গেল, তাহাতে স্পষ্ট বোঝা গেল, সাধুরা এই আবিষ্কারে কিরূপ হতাশা বোধ করিয়াছিলেন।  বোধ হয়, আশাভঙ্গের প্রথম মুহূর্তেই তাহারা, “আপনার এটা রাখবার অধিকার নেই” এই কথা বলিয়া পাত্রী বেচারার হাত হইতে বাইবেলখানা কাড়িয়া লইয়া তাহাকে দূর করিয়া দেন।  যাহা হউক, শোনা যায় যে, তাঁহাদের মধ্যে একজন অন্য দরজা দিয়া চুপি চুপি তাহাকে ফিরাইয়া আনেন, এবং কিছু আহার করাইয়া গোপনে তাঁহার জিনিসটি প্রত্যর্পণ করেন। 

যিনি এই সব কাহিনী বর্ণনা করিতেছিলেন, তিনি উৎসাহ-প্রদীপ্ত মুখে বলিতে লাগিলেন, “সে সময়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হতো, এক মুহূর্ত বিশ্রাম ছিল না।  বহু বাইরের লোক যাতায়াত করতেন, পণ্ডিতেরা তর্ক আলোচনা করতেন।  স্বামীজী কিন্তু এক মুহূর্ত কাজ ছাড়া থাকতেন না।  কখন কখনও তিনি কিছুক্ষণের জন্য একলা থাকবার অবসর পেতেন; সেই সময় তিনি হরিবোল, হরিবোল’! অথবা ‘মা মা’! বলতে বলতে পায়চারি করতেন।  এই সব উপায়ে তিনি নিজেকে তার মহৎ কার্যের জন্য প্রস্তুত করছিলেন।  আমি সর্বদা দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করতাম, এবং অবসর পেলেই বলতাম, ‘মশাই, আপনি কি খাবেন না?’ প্রত্যেকবারই তিনি কোননা-কোন কৌতুকপূর্ণ উত্তর দিতেন। ” কখনও রন্ধনের সময় অথবা ঠাকুর পূজার সময় এইরূপ কথাবার্তা চলিত; এই সব কার্যে কোন প্রকার পার্থক্য না করিয়া সকলেই যোগ দিতেন।  এই সময়ে সাধুদের অভাব থাকা সত্ত্বেও অনেকে তাহাদের নিকট আহারপ্রার্থী হইয়া আসিত।  তাহাদের নিজেদের সম্বল ছিল অতি অল্প।  মঠের বাহিরে গায়ে দিয়া যাইবার মতো একখানি মাত্র ভাল চাদর ছিল।  চাদরটি দড়িতে ঝুলানো থাকিত, এবং যে কেহ বাহিরে যাইবার সময় লইয়া যাইতেন।  দ্বিতীয় উত্তরীয় রাখিবার সঙ্গতি ছিল না।  তথাপি যেভাবে হউক দরিদ্র ও অভ্যাগতদের জন্য আহার্য সংগৃহীত হইত।  সাহায্য বা উপদেশের জন্যও অনেকে আসিতেন।  তাহারা আবার অর্থ সংগ্রহ করিয়া কয়েক শত গীতা ও Imitation of Chirst (ঈশানুসরণ) ক্রয় করিয়া বিতরণ করেন।  পুস্তক দুইটি ঐ সময়ে সঙ্ঘের নিকট বিশেষ আদরের ছিল।  বহু বৎসর পরে ঐ দ্বিতীয় পুস্তকের যে বাক্যটি স্বামীজী যদৃচ্ছাক্রমে আবৃত্তি করিতে পারিতেন, তাহা হইল, “ওহে লোকশিক্ষকগণ, চুপ কর! আর ভবিষ্যদ্বক্তাগণ, তোমরাও থামো।  হে প্রভো, একমাত্র তুমিই আমার অন্তরাত্মার সঙ্গে কথা কও!” টমাস-আ-কেম্পিসের গ্রন্থের ঐ অংশটুকুই কেবল তাহার মনে ছিল।  বোধ হয়, একথা বলার আর প্রয়োজন নাই যে, শ্রীরামকৃষ্ণের এই হিন্দুসন্তানগণের মন হইতে ঐ পুস্তকখানির প্রভাব ক্রমশঃ হ্রাস পাইয়া অবশেষে স্মৃতিমাত্রে পর্যবসিত হইয়াছিল, এবং উহার পরিবর্তে গীতার সৌন্দর্য ও প্রভাব দিন দিন পরিস্ফুট হইয়া উঠিতেছিল। 

প্রায় একবৎসর এইরূপে কাটিয়া গেল।  স্বামীজী অতঃপর যোগী পওহারীবাবাকে দর্শন করিবার জন্য গাজীপুর গমন করেন।  স্বামীজী চিরকাল শ্রীরামকৃষ্ণের পরেই এই যোগীকে স্থান দিতেন।  সেখানে স্বামীজী যে অমূল্য সম্পদ লাভ করেন, অপর সকলের সহিত তাহা একত্র সম্ভোগ করিবার জন্য দুই মাস পরে মঠে প্রত্যাবর্তন করেন।  সহসা সংবাদ আসিল, স্বামী যোগানন্দ নামে তাহাদের এক গুরুভ্রাতা বসন্তরোগে আক্রান্ত হইয়া এলাহাবাদে পড়িয়া আছেন।  কয়েকজন গুরুভ্রাতা তাঁহাকে সেবা করিবার জন্য ছুটিলেন; স্বামীজীও তাহাদের অনুসরণ করিলেন।  আমরা পুনরায় স্বামী সদান-প্রদত্ত বিবরণের অনুবর্তন করিব।  এলাহাবাদে বেশ কিছুদিন ধর্মচর্চায় অতিবাহিত হয়।  স্বামী যোগানন্দের পীড়া যেন উপলক্ষ মাত্র; যেন তাহার মাধ্যমে সকলকে আমন্ত্রণ জানানো হইল।  সমগ্র শহরের মধ্যে বিশেষ চাঞ্চল্য দেখা গেল।  সারাদিনরাত্রি ক্রমাগত ছোট ছোট দলে লোকজন যাতায়াত করিতে লাগিল।  স্বামীজীর মনও এই সময়ে সর্বদা উচ্চভাবে অবস্থান করিত।  একদিন তিনি এক মুসলমান পরমহংস সাধুকে দর্শন করেন, “তার অঙ্গের প্রত্যেকটি রেখা বলে দিল যে, ইনি একজন পরমহংস। ” এক পরম মুহূর্ত, এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। 

“দিগম্বররা বাপি চ সাম্বররা বা
গম্বররা বাপি চিদম্বরস্থ। 
উন্মত্তবদ্বাপি চ বালবঘা
পিশাচবদ্বাপি চরত্যবন্যাম্ ॥”

অর্থাৎ, আত্মবিৎ পরমহংসগণ কখনও দিগম্বর, কখনও উত্তম বস্ত্রধারী, কখনও বল্কল বা চর্ম পরিহিত, আবার কখনও জ্ঞানমাত্রে আচ্ছাদিত, বালকবৎ, উন্মত্তবৎ, কখনও বা পিশাচবৎ পৃথিবীতে বিচরণ করিয়া থাকেন।  শঙ্করাচার্যের ‘বিবেক চূড়ামণি’ হইতে পরমহংসের এই লক্ষণগুলি আবৃত্তি করিতে করিতে—শিষ্যের ভাষায়—উৎসাহের সহিত তাহাদের সারারাত্রি অতিবাহিত হইত।  সম্ভবতঃ এইরূপ নানা প্রকার ঘটনাবৈচিত্র্যের মধ্য দিয়া এক পক্ষকাল কাটে।  অতঃপর তাঁহারা এলাহাবাদ পরিত্যাগ করেন এবং দুইজন অথবা তিনজন করিয়া গঙ্গাতীরে বরাহনগর মঠে ফিরিয়া আসেন।  কিন্তু ১৮৯০ খ্রীস্টাব্দের কোন এক সময়ে স্বামীজী গুরুভ্রাতাদের পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যান; ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দের বিরাট সাফ্যলাভের পূর্বে আর প্রত্যাগমন করেন নাই। 

এবার তিনি যাত্রা করেন স্বামী অখণ্ডানন্দ নামক জনৈক সন্ন্যাসীর সহিত।  স্বামীজীকে তিনি আলমোড়া লইয়া যান এবং সেখানে এক গৃহস্থের অতিথিরূপে রাখিয়া দেন।  স্বামী অখণ্ডানন্দের তিব্বত যাত্রাকালে এই গৃহস্থটি তাহাকে বন্ধুর ন্যায় সাহায্য করিয়াছিলেন।  শুনা যায়, পার্বত্য পথে ভ্রমণকালে স্বামীজী একদিন ক্ষুধায় সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়েন।  তাহাকে ঐ অবস্থায় দেখিয়া একজন মুসলমান একটি শশা কাটিয়া তাহাকে খাইতে দেয় এবং বলিতে গেলে উহাতেই তাহার জীবন রক্ষা হয়।  কতদিন ধরিয়া ভ্রাতৃদ্বয় অনাহারে ছিলেন জানি না।  সম্ভবতঃ এই সময়ে স্বামীজীর এইরূপ সঙ্কল্প ছিল যে, আহার, পানীয়প্রভৃতি অযাচিত আসিলে তবেই গ্রহণ করিবেন।  অন্ততঃ পরে এক সময়ে তিনি ঐরূপ সঙ্কল্প করেন, তাহা নিঃসন্দেহ।  এই ভ্রমণকালে তাহাকে জানিতেন, এইরূপ এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে স্বামীজী বলেন যে, এই কঠোর সাধনার সময়ে কখনও তাহাকে পাচদিন পর্যন্ত একাদিক্রমে অনশনে থাকিতে হইয়াছে। 

ইহার পর তাহার গতিবিধির সূত্র হারাইয়া যায়।  মধ্যে মধ্যে তিনি পত্র লিখিতেন, কিন্তু সাধুরা তখন নানাদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছিলেন।  স্বামী সদানন্দ বলেন, স্বামীজী চলিয়া যাইবার পর তাহারা বড় নিরানন্দে দিন যাপন করিতেন।  আবার প্রথম মঠ বাড়িটিও ছাড়িয়া দিবার কথা হইতেছিল।  কারণ, গৃহস্বামী ঐ স্থানে নূতন বাড়ি নির্মাণ করিবেন বলিতেছিলেন।  কিন্তু স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ নামে একজন সন্ন্যাসী কিছুতেই শ্রীগুরুর ভস্মাবশেষ পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইতে সম্মত হইলেন না।  অটল পর্বতের ন্যায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল, সম্পদে-বিপদে ঐ ভস্মাবশেষ ও গুরুভ্রাতাদের মাথার উপর আচ্ছাদন রাখিতেই হইবে, যতক্ষণ না তাহারা পুনরায় সকলে ঠাকুরঘরে একত্র হইতে পারেন।  অতঃপর তিনি, স্বামী নির্মলানন্দ, মধ্যে মধ্যে স্বামী প্রেমানন্দ নামক একজন এবং বাসন মাজা ইত্যাদি কার্যে রত সঙ্ঘের নবাগত সদস্যের সহিত কিছুদূরে, কিন্তু দক্ষিণেশ্বরের নিকটে, এক গৃহে স্থান পরিবর্তন করেন, এবং পূর্বে যে মঠ বরাহনগরে অবস্থিত ছিল, তাহা এখন আলমবাজার মঠ নামে অভিহিত হইল। 

এই সময়ে স্বামী অখণ্ডানন্দ সর্বদা স্বামীজীর পশ্চাৎ অনুসরণ করিতেছিলেন।  প্রায়ই মধ্যে মধ্যে তিনি শুনিতে পাইতেন, স্বামীজী অমুক শহরে রহিয়াছেন; শুনিয়াই সেখানে ছুটিতেন, কিন্তু গিয়া দেখিতেন, স্বামীজী সেইমাত্র চলিয়া গিয়াছেন; কোথায় গিয়াছেন, তাহার ঠিকানা নাই।  একবার স্বামী ত্রিগুণাতীত গুজরাটের কোন এক ক্ষুদ্র দেশীয় রাজ্যে বিপদে পড়েন।  এমন সময়ে এক ব্যক্তি তাহাকে বলেন, এক বাঙালী সাধু প্রধান মন্ত্রীর বাড়িতে অবস্থান করিতেছেন; তাহার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিলে নিশ্চিত পাওয়া যাইবে।  সাহায্য প্রার্থনা করিতে গিয়া ত্রিগুণাতীত দেখিলেন, সেই অজ্ঞাত সাধু স্বয়ং স্বামীজী।  স্বামীজী কিন্তু প্রয়োজনীয় সাহায্যের ব্যবস্থা করিয়া দিয়া গুরুভ্রাতাকে গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতে বলিলেন, এবং স্বয়ং একাকী যাত্রা করিলেন।  ভগবান বুদ্ধদেবের মহান বাক্য তিনি সর্বদা আবৃত্তি করিতেন, “সিংহ যেমন সামান্য শব্দে ভীত হয় না, বায়ু যেমন কদাপি জালে আবদ্ধ হয় না, পদ্মপত্র যেমন জলে লিপ্ত হয় না, তুমিও সেইরূপ গণ্ডারবৎ একাকী বিচরণ কর। ” এই কথাগুলি যেন ঐ সময়ে তাহার মূলমন্ত্রস্বরূপ ছিল। 

এখন আমরা জানি, আলমোড়াতেই তিনি সংবাদ পান যে, তাহার শৈশবের প্রিয় ভগিনী অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় দেহত্যাগ করিয়াছেন।  অতঃপর তিনি নিবিড় অরণ্যসঙ্কুল পার্বত্যপ্রদেশে চলিয়া যান, এবং তাহাব কোনপ্রকার খবর আর পাওয়া যায় না।  বহু বৎসর পরে একজন স্বামীজীর জীবনের ঘটনাবলী গভীরভাবে পর্যালোচনা করিতে গিয়া বুঝিয়াছিলেন যে, এই মৃত্যু তাহার হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করিয়াছিল, এবং উহার তীব্র যন্ত্রণা মুহূর্তের জন্যও উপশম হয় নাই।  আমরা বোধ হয় সাহস করিয়া বলিতে পারি ভারতের নারীগণের শিক্ষা ও উন্নতিকল্পে তাঁহার যে প্রবল আগ্রহ দেখা যাইত, তাহার কিছুটা অন্ততঃ এই মর্মবেদনা হইতে সঞ্জাত। 

এই সময়ে কয়েক মাস তিনি এক পার্বত্য গ্রামের ঊর্ধ্বদেশে গুহার মধ্যে বাস করেন।  মাত্র দুইবার আমি তাহাকে এইকালের অনুভূতির বিষয় উল্লেখ করিতে শুনিয়াছি।  একবার তিনি বলেন, “আমাকে কাজ করতে হবে, এই ধারণা এই সময়ে যতটা অভিভূত করে, সারা জীবনে আর কখনও তা করেনি।  মনে হতো, কে যেন আমাকে জোর করে এক গুহা হতে আর এক গুহায় জীবন-যাপনে বিরত করে নিচে সমতল প্রদেশে বিচরণ করবার জন্য ফেলে দিল। ” আর একবার তিনি অপর একজনকে বলিয়াছিলেন, “সাধু কি রকম জীবন যাপন করছে, সেটাই তার সাধুত্বের পরিচায়ক নয়।  কারণ, গুহার মধ্যে বসে থেকেও কেউ অনায়াসে মনে মনে রাত্রির আহারের জন্য কখানা রুটি মিলবে এই প্রশ্নে নিমগ্ন থাকতে পারে। ”

সম্ভবতঃ এই কালের অবসানেই এবং যে শক্তি ক্রমাগত তাঁহাকে যেন সামনেব দিকে ঠেলিয়া দিতেছে বলিয়া তিনি উল্লেখ করিতেন, তাহারই নিদর্শন-স্বরূপ তিনি কন্যাকুমারিকায় মাতা কুমারীকে পূজা করিবার সঙ্কল্প করেন।  ধীরে-সুস্থে তিনি এই সঙ্কল্প কার্যে পরিণত করেন, তথাপি প্রায় দুই বৎসব লাগিয়া থাকিবে।  মনে হয়, এই ভ্রমণকালের শেষের দিকে তিনি ভারতীয় জীবনের প্রত্যেকটি বিষয় লক্ষ্য করিয়া অনুশীলন করিয়াছিলেন।  এই কালের প্রচলিত কাহিনীর আর শেষ নাই।  এত বন্ধু লাভ করিয়াছিলেন যে, তাহাদের তালিকা দেওয়া সম্ভব নয়।  শিখদের আমন্ত্রণ তিনি গ্রহণ করেন; মহারাষ্ট্রীয় পণ্ডিতগণের নিকট মীমাংসা-দর্শন এবং জৈনদের নিকট জৈন শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন; রাজপুত রাজগণ তাহাকে গুরুরূপে বরণ করেন; মধ্যভারতে এক মেথর পরিবারে সহিত তিনি কয়েক সপ্তাহ বাস করেন; মালাবারের জাতিগত দুর্বোধ্য বিষয়গুলি স্বচক্ষে নিরীক্ষণ করিবার সুযোগ পান।  জন্মভূমির বহু ঐতিহাসিক দৃশ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করিয়া অবশেষে যখন তিনি কন্যাকুমারিকায় পৌঁছিলেন, তখন কন্যাকুমারীর মন্দিরের অদূরে শৈলদ্বীপে যাইবার নৌকা ভাড়া দিবার সামর্থ্য পর্যন্ত তাহার ছিল না।  সুতরাং সঙ্কল্পিত পূজাদানের পর, হাঙ্গর থাকা সত্ত্বেও তার দিয়া প্রণালী পার হইয়া তিনি দ্বীপে উপস্থিত হইলেন।  মাদ্রাজ হইয়া উত্তর দিকে প্রত্যাবর্তন কালেই তিনি একদল অনুরক্ত শিষ্য লাভ করেন, যাহারা তাহার আমেরিকা গমনের উপলক্ষ হইয়াছিলেন।  অবশেষে ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দের জুন মাসের বোধ হয় প্রথম সপ্তাহে তিনি বোম্বাই হইতে জাহাজে ঐ মহাদেশে যাত্রা করেন। 

কিন্তু এই যাত্রায় তাঁহার আগ্রহ ছিল না।  তাঁহার মাদ্রাজী শিষ্যগণ বলেন যে, ঐ উদ্দেশে সংগৃহীত প্রথম পাঁচশত টাকা তিনি তৎক্ষণাৎ পূজা ও দানে ব্যয় করিয়া ফেলেন, যেন তাহাকে কর্মক্ষেত্রে অবতরণ করাইবার ভার তিনি জোর করিয়া নিজ অদৃষ্টের উপরেই চাপাইবেন।  এমনকি, বোম্বাই পৌঁছিবার পরেও তিনি পাশ্চাত্যে যাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হইবার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন।  তাহার মনে দ্বন্দ্ব চলিতেছিল, এমন সময় তিনি অনুভব করেন যে, তাহার শ্রীগুরুর মূর্তি যেন বার বার আবির্ভূত হইয়া তাহাকে যাইবার জন্য উৎসাহিত করিতেছেন।  অবশেষে তিনি গোপনে পরমারাধ্যা শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীকে লিখিলেন, তিনি যেন কৃপা করিয়া তাঁহাকে উপদেশ দেন ও আশীর্বাদ করেন; বিশেষ করিয়া অনুনয় করিলেন, পুনরায় তাহার পত্র না পাওয়া পর্যন্ত এই নূতন যাত্রা সম্পর্কে যেন কাহাকেও কিছু না বলেন।  এই পত্রের উত্তরে শ্রীশ্রীমার আন্তরিক উৎসাহ এবং ভগবৎসমীপে তাহার জন্য সর্বদা প্রার্থনা করিবেন এই আশ্বাসবাণী লাভ করিয়া তবে তিনি ভারত পরিত্যাগ করিয়া পাশ্চাত্যে যাত্রা করেন।  শেষ পর্যন্ত আর অদৃষ্টকে পরিহার করিবার উপায় রহিল না।  যে অভিপ্রায়ে তিনি মঠ পরিত্যাগ করেন, সেই আত্মগোপনের আকাঙ্ক্ষাতেই তিনি ভারতে প্রত্যেক গ্রামে পৌঁছিবামাত্র নাম পরিবর্তন করিতেন।  বহু বৎসর পবে এক ব্যক্তি তাহার নিকট শ্রবণ করেন, কিরূপে শিকাগো নগরীর সেই প্রথম বিখ্যাত বক্তৃতার পর তিনি সারারাত্রি ধরিয়া এই ভাবিয়া মমর্যাতনা ভোগ করেন যে, তাহার এই বিজয়-গৌরবের ফলে আত্মগোপনের আশা একেবারে নির্মূল হইয়া গেল।  এখন তিনি প্রকাশ্য দিবালোকে লোকচক্ষুর সম্মুখে দণ্ডায়মান।  অজ্ঞাত ভিক্ষুক আর অজ্ঞাত থাকিতে পারিলেন না।  যে সত্যসমূহ আমার গুরুদেব উপলব্ধি করেন এবং যাহা তাহার জীবনে প্রমাণীকৃত ও প্রত্যক্ষ হইয়াছিল, ভারতের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাহার এই ভ্রমণের মধ্যেই তাহার তৃতীয় ও শেষ উপাদান নিহিত। 

আমার মনে হয়, একথা নিঃসন্দেহ যে, তাহার জীবনগঠনের মূলে ছিল ত্রিবিধ প্রভাব, প্রথমতঃ, তাঁহার ইংরেজী ও সংস্কৃত সাহিত্যে শিক্ষা লাভ; দ্বিতীয়তঃ, সমুদয় শাস্ত্র যে জীবনকে একবাক্যে আদর্শ বলিয়া ঘোষণা করিয়া থাকে, সেই জীবনের উদাহরণ ও প্রমাণস্বরূপ তাঁহার গুরুদেবের অলৌকিক চরিত্র; এবং তৃতীয়তঃ, আমার যতদূর মনে হয়, এক বিপুল প্রাণধর্মী অধ্যাত্মশরীরের অঙ্গরূপে ভারত ও ভারতবাসিগণ সম্পর্কে তাহার প্রত্যক্ষ জ্ঞান।  তাহার অশেষ মহিমান্বিত গুরুদেবও ছিলেন উহার সাকার বিগ্রহ ও বাণী মাত্র।  আমার মনে হয়, তাহার বিবিধ বক্তৃতা হইতে উপরি-উক্ত ত্রিবিধ প্রভাব স্পষ্টরূপে পরিলক্ষিত হয়।  যখন তিনি বেদান্ত প্রচার ও জগৎ সমক্ষে স্বদেশবাসীর দর্শনের পক্ষ সমর্থন করেন, তখন প্রধানতঃ প্রাচীন যুগের সংস্কৃত গ্রন্থ হইতেই উপাদান সংগ্রহ করিয়া থাকেন; যদিও ইহা সত্য যে, ঐরূপ প্রাঞ্জলভাবে ও দৃঢ় নিশ্চয়তার সহিত উহার ব্যাখ্যা করা তাহার পক্ষে এই কারণেই সম্ভব হয় যে, ঐ সকল গ্রন্থপ্রতিপাদ্য সত্যগুলি উহার গুরুদেবের বিস্ময়কর জীবনে একাধাবে সমষ্টিভূত হইতে দেখিয়াছিলেন।  ভক্তির প্রসঙ্গে যখন তিনি বলেন, “প্রেমেই ভক্তির আরম্ভ, স্থিতি ও পরিণাম,” অথবা যখন তিনি কর্মযোগের বিশ্লেষণ করিতে গিয়া বলেন, “কর্মের রহস্য, তখন আমরা যেন তাহার গুরুদেবকেই দেখিতে পাই; আমরা উপলব্ধি করিতে পারি যে, শিষ্য অপর একজনের পদতলে যে জ্যোতির্ময় রাজ্যে বাস করিয়াছেন, তাহারই কথা বলিতে যথাসাধ্য প্রয়াস পাইতেছেন মাত্র।  কিন্তু যখন আমরা তাহার শিকাগো সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তৃতা, অথবা ঠিক ঐরূপ অসাধারণ ‘মাদ্রাজ অভিনন্দনের উত্তর’, কিংবা ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দে হিন্দুধর্মের মুখ্য ও সাধারণ লক্ষণগুলি চিত্রিত করিয়া লাহোরে প্রদত্ত বক্তৃতাগুলি পাঠ করি, তখন এমন কিছুর পরিচয় পাই, যাহা তাহার নিজের পরিশ্রমলব্ধ অভিজ্ঞতা হইতে প্রসূত।  এই সকল বক্তৃতার পশ্চাতে অবস্থিত শক্তি তাহার ভারতব্যাপী দীর্ঘভ্রমণের ফল।  মনে হয়, এই ভ্রমণকাহিনী বলিয়া শেষ করিবার নহে।  সুতরাং দেখা যাইতেছে, স্বদেশ ও স্বদেশবাসিগণের প্রতি তাহার শ্রদ্ধা এই প্রত্যক্ষজ্ঞান হইতেই উৎপন্ন হইয়াছিল, উহা কোন ফাঁকা ভাবুকতা বা ইচ্ছাকৃত অন্ধতার ফল নহে।  অধিকন্তু ইহাও বলা যায় যে, তাহার অনুমান-প্রক্রিয়া ছিল সতেজ ও ক্রমবর্ধমান, নূতন নূতন তথ্যের জন্য সর্বদা উন্মুখ এবং প্রতিকূল সমালোচনায় নির্ভীক।  একবার তিনি বলেন, “হিন্দুধর্মের সাধারণ ভিত্তিগুলি কি, তাহাই তাহার সমগ্র জীবনের আলোচনার বিষয় হইয়াছে। ” কেবল তাহা নহে, এই সর্বাঙ্গসম্পন্ন ও প্রত্যক্ষজ্ঞান ছিল বলিয়াই স্বদেশ ও স্বজাতি সম্পর্কে তাহার যে সব ধারণা তাহাতে হিন্দু সভ্যতার প্রাচীনতর ও অপেক্ষাকৃত সাদাসিধা উপাদানগুলিও এত মহৎ দেখাইত।  তাহার স্বদেশে যতদূর সম্ভব আধুনিক শিক্ষায় অগ্রণী হইয়াও কোন কোন নব্যপন্থীর ন্যায় তিনি সন্ন্যাসী বা কৃষকসম্প্রদায়কে, অথবা যাহারা প্রতিমা পূজা করেন, বা যাহারা জাতিভেদপ্রথা দ্বারা পীড়িত, তাহাদিগকে এই বলিয়া উড়াইয়া দেন নাই যে, “উহারা অখণ্ড ভারতের অঙ্গবিশেষ” নহে।  আর এই যে সকলকে অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইবার দৃঢ় সঙ্কল্প, উহা তাহাদের সহিত বহু বৎসর ধরিয়া একত্র জীবন যাপনেরই ফলস্বরূপ। 

কিন্তু স্মরণ বাখিতে হইবে যে, কোন মহাপুরুষের জীবনের মূল মন্ত্রস্বরূপ কতকগুলি ধারণাকে তাহার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সহিত কার্যকারণ সম্পর্কে জড়িত করিলেই যে উহার সম্যক বিশ্লেষণ করা হইল, তাহা নহে।  সেই মূল প্রেরণার কারণ নির্দেশ করিতে হইবে, যাহার ফলে অফুরন্ত শক্তি লাভ করিয়া একজন আর একজন অপেক্ষা এই দৃশ্যমান জগৎকে অধিকতর অর্থযুক্ত বলিয়া মনে করেন।  শুনিয়াছি, আশৈশব বিবেকানন্দের এই অন্তর্নিহিত সংস্কার ছিল যে, দেশের উপকার করিবার জন্যই তাহার জন্মগ্রহণ পরবর্তী কালে এই কথা মনে করিয়া তিনি গর্ববোধ করিতেন যে, আমেরিকা-বাসের প্রথম দিনগুলিতে যখন তিনি অবস্থা-বিপর্যয়ের মধ্যে পড়িয়াছিলেন—যখন জানিতেন না, পরবর্তী আহারের জন্য কাহার দ্বারস্থ হইবেন, সেই সময়েও ভারতে শিষ্যগণকে যে সব পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহাতে বিলক্ষণ জানা যায় যে, তাহার এই দৃঢ় প্রত্যয় ক্ষণকালের জন্যও বিচলিত হয়নাই।  কোন বিশেষ কার্য সংসাধনের জন্য যে সকল মহাপুরুষের জন্ম, তাহাদের প্রত্যেকের মধ্যে এই প্রকার অদম্য আশা বিদ্যমান থাকে।  ভাবী মহত্ত্বের এই গভীর চেতনা-বোধ ভাষায় প্রকাশ করিতে হয়না; জীবনেই উহার প্রকাশ ঘটিয়া থাকে।  হিন্দুর চিন্তা প্রণালী অনুসারে, এই ভাবী মহত্ত্বের ধারণা ও আত্মাভিমান—এ দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, এবং আমার মনে হয়, শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎকালে, স্বামীজীর জীবনে ইহার পরিচয় পাওয়া যায়।  ঐ সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ কর্তৃক নিজের উচ্চ প্রশংসায় আকৃষ্ট হওয়া দূরে থাকুক, বরং তিনি বিশেষ বিমুখ হইয়াছিলেন, কারণ, তাহার মনে হইয়াছিল, এ সকল অতিশয়োক্তি মাত্র। 

যখন দক্ষিণেশ্বর-দর্শনে আগত একদল লোকের সঙ্গে তিনি প্রথম আসেন, তখন তিনি অষ্টাদশবর্ষীয় বালক মাত্র।  কোন এক ব্যক্তি সম্ভবতঃ তাহার কণ্ঠস্বরের অসাধারণ মাধুর্য ও সঙ্গীতে পারদর্শিতার বিষয় অবগত ছিলেন বলিয়া, তাহার গান গাহিবার কথা উত্থাপন করেন।  উত্তরে তিনি ব্রাহ্মসমাজের ‘মন চল নিজ নিকেতনে” গানটি গাহিলেন। 

উহাই যেন সঙ্কেতের ন্যায় কার্য করিল শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়া উঠিলেন, “বাবা, এই তিন বছর ধরে তোমার অপেক্ষায় আছি, তুমি এতদিনে এলে!” বলা যাইতে পারে, সেইদিন হইতে তিনি অনুগত বালকবৃন্দকে একত্র করিয়া এমন একটি সঙ্ঘে পরিণত করিতে ব্যাপৃত হইলেন, যাহাদের নরেন্দ্র’-এর (স্বামীজীর তখন উহাই নাম ছিল) প্রতি অনুরাগ চিরকাল অটুট থাকিবে। 

তিনি যে মহা যশের অধিকারী হইবেন, সেই সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করিতে, অথবা তাহার অসাধারণ প্রতিভার উল্লেখ করিতে শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও ক্লান্তিবোধ করিতেন না।  যদি অধিকাংশ লোকের দুইটি, তিনটি অথবা দশ, বারোটি গুণ থাকে, তবে নরেন্দ্রের সম্বন্ধে তিনি কেবল বলিতে পারেন যে, তাহার সহস্রটি গুণ আছে; সত্যই তিনি সহস্রদল পদ্ম’।  শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেন, যাহারা উচ্চ অধিকারী, তাহাদের মধ্যেও যদি কাহারও শিবত্বের লক্ষণ প্রকাশক দুইটি গুণ থাকে, তাহা হইলে নরেন্দ্রের অন্ততঃ ঐরূপ আঠারোটি গুণ আছে। 

কোন ব্যক্তি ভণ্ড কি না, তাহা শ্রীরামকৃষ্ণ এরূপ বুঝিতে পারিতেন যে, সময়ে সময়ে তাহার দৈহিক যন্ত্রণা উপস্থিত হইত।  একবার তিনি এক ব্যক্তিকে কিছুতেই আঁটি বলিয়া গ্রহণ করেন নাই, যদিও উপস্থিত সকলের মতে তাহার ধার্মিকতা স্বীকৃত হইয়াছিল।  শ্রীরামকৃষ্ণের মতে, “সমস্ত বাহ্যাড়ম্বর সত্ত্বেও লোকটা ‘চুনকাম-করা কবর’! রাতদিনশুদ্ধাচারে থাকা সত্ত্বেও ওর উপস্থিতি অপবিত্রকর, আর নরেন যদি ইংরেজের হোটেলে গোমাংসও খায়, তবুও সে পবিত্রই থাকবে—এতই পবিত্র যে, তার স্পর্শমাত্রে অপরে পবিত্র হয়ে যাবে। ” এইভাবে নানা কথা বলিয়া তিনি ভবিষ্যতে নেতৃত্ব গ্রহণ করিবেন যে শিষ্য এবং অপর যাহারা তাহার সহায়ক হইবেন—এই উভয়ের মধ্যে কতকগুলি বিশেষ গুণের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত একটি স্থায়ী সম্পর্ক গড়িয়া তুলিবার চেষ্টা করিতেন। 

শ্রীরামকৃষ্ণের অভ্যাস ছিল, কোন নূতন শিষ্য তাহার নিকট আগমন করিলে যতরকমে সম্ভব তিনি তাহার শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা গ্রহণ করিতেন।  কারণ, সুদক্ষ বৈজ্ঞানিকের নিকট একটি কলের নমুনা (মডেল) যেরূপ অর্থপূর্ণ, মানবশরীরের প্রত্যেক অঙ্গ-প্রতঙ্গ শ্রীরামকৃষ্ণেব শিক্ষিত দৃষ্টিতে ঠিক সেইরূপ অর্থপূর্ণ বলিয়া প্রতীত হইত।  এই পরীক্ষাগুলির মধ্যে আবার একটি ছিল নবাগতকে ঘুম পাড়াইয়া নিদ্রাকালে তাহার অবচেতন মনের গতিবিধি লক্ষ্য করা।  শুনিয়াছি, বিশেষ সংস্কারবান ব্যক্তিগণকে তিনি এই অবস্থায় নিজ পূর্বজন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করিতে দিতেন; এবং যাহারা নিম্ন অধিকারী, তাঁহাদের প্রশ্ন করিয়া ঐ বৃত্তান্ত জানিয়া লইতেন।  নরেন্দ্র’কে প্রথমোক্তভাবে পরীক্ষা করিবার পর শ্রীরামকৃষ্ণ একদিন উপস্থিত সকলকে বলেন, যেদিন এই বালক জানিতে পারিবে সে কে, এবং কিরূপ উচ্চ অধিকারী, সেদিন মুহূর্তকালের জন্যও শরীর ধারণরূপ বন্ধন সে সহ্য করিতে চাহিবে না—সমস্ত অপূর্ণতসহ এই জীবন পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে।  ইহাতে শিষ্যগণ তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পাবেন, এই জগতে পূর্ব পূর্ব জন্মে যাহা কিছু করিয়াছেন, সে সবই স্বামীজীর স্মরণে আছে।  এই শিষ্যটির নিকট হইতে শ্রীরামকৃষ্ণ কোন ব্যক্তিগত সেবা লইতে পারিতেন না।  পাখার বাতাস করা, তামাক সাজা, এবং অন্য সহস্র রকমের ছোটখাটো সেবা, সচরাচর গুরুর জন্য শিষ্যেরা যাহা করিয়া থাকে, সে সমস্তই শ্রীরামকৃষ্ণের জন্য অপরে করিত। 

প্রাচ্যে বহুবিধ প্রথা আছে, যাহা অদ্ভুত বলিয়া মনে হয়।  ঐ সকল প্রথার মধ্যে আবার জাতির দিক দিয়া উচ্চ নহেন, এরূপ ব্যক্তির রন্ধন করা খাদ্য গ্রহণের বিরুদ্ধে যে সংস্কার, তাহা অতিশয় দৃঢ়মূল।  আর এই বিষয়টি স্বামীজীর গুরুদেব মেয়েদের মতোই মানিয়া চলিতেন।  কিন্তু তিনি নিজে যাহা খাইতেন না, প্রিয় শিষ্যকে তাহা অনায়াসে দিতেন।  কারণ, তিনি বলিতেন, নরেন্দ্র ‘জ্বলন্ত আগুন’, সমস্ত অপবিত্রতা দগ্ধ করিয়া ফেলিবে।  আবার বলিতেন, এই বালকের ভিতরে যে ঈশ্বরীয় সত্তা, তাহা পুরুষসত্তা, এবং তাহার নিজের হইল স্ত্রীসত্তা।  এইরূপে প্রশংসার ভাব পোষণ করিয়া—যাহার সহিত প্রকৃত শ্রদ্ধার ভাবও মিশ্রিত ছিল, এই বিশিষ্ট বালকের উচ্চ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি একটি বিশ্বাসের সৃষ্টি করিয়া গিয়াছিলেন।  তাঁহার দেহত্যাগের পর ঐ বিশ্বাস স্বামীজীর বিশেষ কাজে লাগিয়াছিল—উহাই তাহার সর্ববিধ কর্মকে প্রামাণ্য ও সমর্থন দেইয়।  কারণ, স্বামীজী ছিলেন সর্বপ্রকার বন্ধন মোচনের কর্তা।  ইহাও একান্ত প্রয়োজনীয় ছিল যে, তাহার চারিপার্শ্বে এমন কয়েকজন থাকিবেন, যাহারা স্বামীজীর এবং অলস-আত্মসুখাম্বেষী ব্যক্তিগণের আচার-লঙ্ঘনের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, তাহা হৃদয়ঙ্গম করিবেন।  আমার ভারতবাসের প্রথম দিকে যে বিষয়টি প্রবলভাবে আমাকে বারংবার সর্বাপেক্ষা আকৃষ্ট করিয়াছিল, তাহা হইল, এই সঙেঘর অন্যান্য ভ্রাতৃগণ তাহাদের উপর ন্যস্ত কার্যের এই অংশ যারপরনাই নিষ্ঠার সহিত পালন করিতেন।  গোড়া হিন্দুয়ানির কঠোরতম আচার-নিষ্ঠা, অথবা তপস্যার ঘঁচে যে-সকল ব্যক্তির জীবন গঠিত হইয়াছিল, তাহারাও তাহাদের নেতা কর্তৃক শিষ্যরূপে গৃহীত ইউরোপীয়গণের সহিত একত্র ভোজন করিতে রাজি ছিলেন।  হয়তো মাদ্রাজে কেহ স্বামীজীকে জনৈক ইংরেজ ও তাঁহার স্ত্রীর সহিত একত্র আহার করিতে দেখিয়াছিল; হয়তো কেহ বলিল, পাশ্চাত্যে অবস্থানকালে তিনি কখন কখনও মদ্য-মাংস স্পর্শ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন; কিন্তু এই সকল কথায় তাহার গুরুভ্রাতৃগণের মুখে বিন্দুমাত্র উদ্বেগের চিহ্ন দেখা যাইত না।  স্বামীজীর ঐ প্রকার আচরণের ভাল-মন্দ বিচার করা, কারণ দেখাইয়া বুঝাইয়া দিবার চেষ্টা করা, এমনকি, আদৌ উহার সঙ্গত কারণ বা যুক্তি ছিল কি না, তাহা জিজ্ঞাসা করাও তাহারা নিজেদের কর্তব্য বলিয়া মনে করিতেন না।  তিনি যাহাই করুন, যেখানেই তাহাদের লইয়া যান, তাহাদের কাজ হইল, অবিচলিতভাবে তাঁহার পার্শ্বে স্থান গ্রহণ করা।  আর একথা নিঃসন্দেহ যে, যিনিই এই দৃশ্যের আলোচনা করিবেন, তিনিই হৃদয়ঙ্গম না করিয়া থাকিতে পারিবেন না যে, স্বামী বিবেকানন্দ ব্যতীত শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্ঘ যেমন অর্থহীন হইয়া দাঁড়াইত, এই গুরুভ্রাতাগণ পশ্চাতে না থাকিলে বিবেকানন্দের জীবন এবং পরিশ্রমও বিফল হইয়া যাইত।  প্রাচীন সাধুগণের মধ্যে একজন সম্প্রতি আমাকে বলেন যে, স্বামী বিবেকানন্দকে তৈয়ারি করিবার তাই শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনধারণ।  বাস্তবিক কি তাই! অথবা জগন্মাতার অখণ্ড মহত্তর বাণীর এক অংশকে অপর অংশ হইতে নিশ্চয়পূর্বক পৃথক করিয়া দেখা যেমন অসম্ভব, এই দুই মহাজীবনকেও পৃথক করিয়া দেখা কি তেমনই অসম্ভব নয়? এই সকল জীবন সম্যকরূপে আলোচনা করিতে গিয়া প্রায়ই আমার এইরূপ মনে হইয়াছে যে, শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ নামক একটি আত্মা আমাদের মধ্যে আবির্ভূত হইয়াছিলেন, এবং তাহারই জীবনালোকে বহুমূর্তি দৃষ্টিগোচর হইয়াছিল; কয়েকজন এখনও আমাদের মধ্যে বর্তমান; আর তাহাদের কাহারও সম্পর্কে পূর্ণ সত্যতার সহিত একথা বলা চলে না যে, তাহার নিজের অথবা অপর সকলের সহিত জড়াইয়া যে কর্মক্ষেত্র, তাহার এখানেই শেষ। 


Ignatius de Loyola (১৪৯১-১৫৫৬ খ্রীঃ)-ইউরোপের বিখ্যাত জেসুইট সম্প্রদায়ের প্রবর্তক।  ইনি স্পেনের এক সম্ভ্রান্ত বংশোব সন্তান ছিলেন।  প্রথম জীবনে যুদ্ধবিদ্যার চর্চা করেন।  পরিশেষে একবার আহত হইয়া দীর্ঘকাল হাসপাতালে থাকেন।  সেখানে উপন্যাসাদি নিঃশেষ হওয়ায় মহাপুরুষগণের জীবনী পাঠ কবিতে বাধ্য হন।  এই পুস্তক পাঠের ফলে তাহার জীবনে প্রবল ধর্মভাব জাগরিত হয়।  ১৫২২ খ্রীস্টাব্দে তিনি জেরুজালেমে তীর্থযাত্রা করেন।  এই যাত্রাপথে তাহার মধ্যে অপূর্ব সেবাভাব ও তপস্যার বিকাশ দেখা যায়।  ১৫৩৪ খ্রীস্টাব্দে তিনি ঈশা সমিতি (Society of Jesus) স্থাপন করেন।  ১৫৪০ খ্রীস্টাব্দে এই সমিতি পুষ্টিলাভ করিয়া পোপ তৃতীয় পল কর্তৃক অনুমোদিত হয়।  ১৬২২ খ্রীস্টাব্দে ইনি ‘সেন্ট’ আখ্যায় ভূষিত হন। —অনুঃ
“স্বর্গে ঈশ্বরের নাম জয়যুক্ত হউক, এবং পৃথিবীতে মানবগণের মধ্যে শান্তি ও সদ্ভাব বিরাজ করুক!”—দেবদূতগণের গীতি
১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দে এই যোগী হোমাগ্নিতে নিজ দেহ আহুতি দিয়া মানবলীলা সংবরণ করেন।