পঞ্চম পরিচ্ছেদ
উত্তরভারত-ভ্রমণ

১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের গ্রীষ্মকালটি আমার স্মৃতিপটে কতকগুলি চিত্রের ন্যায় বিরাজ করিতেছে। ঐ চিত্রগুলি যেন প্রাচীনকালের বেদীর পশ্চাতে অবস্থিত পর্দার উপর ধর্মানুরাগ ও সরলতারূপ সোনালী জমির উপর অঙ্কিত। আর প্রত্যেকটি চিত্রই একজনের উপস্থিতির দ্বারা মহিমান্বিত; তিনি আমাদের অন্তরঙ্গ ভক্তমণ্ডলীর মধ্যবিন্দু। আমরা ছিলাম চারজন পাশ্চাত্য নারী; একজন ম্যাসাচুসেটসের অন্তর্গত কেমব্রিজ-নিবাসী মিসেস ওলিবুল, এবং অপর একজন কলিকাতার উচ্চপদস্থ এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান কর্মচারিবৃন্দের অন্যতম। গুরুভ্রাতা ও শিষ্যগণ-পরিবৃত স্বামীজী আমাদেরই পাশাপাশি ভ্রমণ করিতেছিলেন। আলমোড়ায় পৌঁছিয়া তিনি দলবলসহ সেভিয়ার-দম্পতির আতিথ্য গ্রহণ করেন। তাহারা ঐ সময়ে আলমোডায় অবস্থান করিতেছিলেন। আমরা কিছু দূরে একটি বাংলোয় স্থান গ্রহণ করিলাম। এইরূপে সকলেই অন্তরঙ্গ বলিয়া বেশ অবাধ স্বাধীনতার সহিত মেলামেশা করিবার সুবিধা হইয়াছিল। কিন্তু মাসখানেক পরে আমরা যখন আলমোড়া হইতে কাশ্মীর যাত্রা করিলাম, তখন সঙ্গিগণকে রাখিয়া স্বামীজী মিসেস বুলের অতিথিরূপে আমাদের সহিত যোগদান করেন।

মে মাসের প্রথম হইতে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত আমরা কি অপরূপ দৃশ্যাবলীর মধ্য দিয়াই না ভ্রমণ করিয়াছি! আর প্রত্যেক নূতন স্থানে আসিবামাত্র কি অনুরাগ ও উৎসাহের সহিত স্বামীজী সেখানকার প্রত্যেক জ্ঞাতব্য বস্তুর সহিত আমাদের পরিচয় করাইয়া দিতেন! শিক্ষিত পাশ্চাত্যগণের ভারত সম্বন্ধে অজ্ঞতা এত অধিক যে, উহাকে প্রায় মূখতা বলা চলে; অবশ্য যাহারা চেষ্টা করিয়া এ বিষয়ে কতকটা জ্ঞান। আহরণ করিয়াছেন, তাঁহাদের কথা স্বতন্ত্র। সন্দেহ নাই, এ বিষয়ে আমাদের হাতে-কলমে শিক্ষার আরম্ভ হইল পাটনা বা প্রাচীন পাটলিপুত্র হইতে। রেলপথে পূর্বদিক হইতে প্রবেশ করিবার মুখে কাশীর ঘাটগুলির যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তাহা জগতের দর্শনীয় দৃশ্যগুলির অন্যতম। স্বামীজী সাগ্রহে উহার প্রশংসা করিতে ভুলিলেন না। লক্ষ্ণৌ শহরে প্রস্তুত শিল্প ও বিলাস দ্রব্যগুলির নাম ও গুণবর্ণনা বহুক্ষণ ধরিয়া চলিল। যে-সকল মহানগরী সৌন্দর্যে স্বীকৃতি ও ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে, শুধু তাহাদের বিষয় যে স্বামীজী আগ্রহের সহিত আমাদের মনে দৃঢ়ভাবে অঙ্কিত করিয়া দিতে প্রয়াস পাইতেন, তাহা নহে। আর্যাবর্তের সুবিস্তৃত খেত-খামার ও গ্রামবহুল সমতল প্রদেশ অতিক্রম করিবার সময় তাহার প্রেম যেরূপ উথলিয়া উঠিত, অথবা তাহার তন্ময়ভাব যেরূপ প্রগাঢ় হইত, এমন আর বোধহয় কোথাও হয় নাই। এইখানে তিনি অবাধে সমগ্র দেশকে অখণ্ডভাবে চিন্তা করিতে পারিতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি বুঝাইবার চেষ্টা করিতেন, কিরূপে ভাগে জমি চাষ করা হয়; অথবা প্রত্যেক খুঁটিনাটি সহ কৃষক-গৃহিণীর দৈনন্দিন জীবন বর্ণনা করিতেন; যেমন, সকালের জলখাবারের জন্য যে খিচুড়ি রাত্রি হইতে উনানে চাপানো থাকিত, তাহার কথাও উল্লেখ করিতেন। এ বিষয়ে সন্দেহ নাই যে, এইসব কথা আমাদের নিকট বর্ণনাকালে তাহার নয়ন যে প্রদীপ্ত হইয়া উঠিত, অথবা কণ্ঠ যে আবেগ ভরে কম্পিত হইত, তাহা নিশ্চিত তাহার পরিব্রাজক জীবনের স্মৃতিবশতঃ। কারণ, সাধুদের নিকট শুনিয়াছি, ভারতের আর কোথাও দরিদ্র কৃষক কুটিরের ন্যায় অতিথি সৎকার হয় না। সত্য বটে, তৃণশয্যা অপেক্ষা কোন উৎকৃষ্টতর শয্যা, এবং মাটির চালাঘর ব্যতীত কোন ভাল আশ্রয় গৃহস্বামিনী অতিথিকে দিতে পারেন না; কিন্তু তিনিই আবার বাটীর অপর সকলে যখন নিদ্রিত, নিজে শেষ মুহূর্তে শয়ন করিতে যাইবার পূর্বে একটি দাঁতন ও একবাটি দুধ এমন জায়গায় রাখিয়া দেন, যাহাতে অতিথি নিদ্রাভঙ্গে সকাল বেলা উহা দেখিতে পান, এবংঅন্যত্র যাত্রাকরিবার পুর্বে যথাযথ ঐগুলির সদ্ব্যবহার করিতে পারেন।

সময়ে সময়ে এরূপ বোধ হইত, যেন স্বদেশের অতীত গৌরবই স্বামীজীর মনঃপ্রাণ সম্পূর্ণভাবে অধিকার করিয়া রহিয়াছে। তাহার ঐতিহাসিক চেতনা অতিমাত্রায় বিকাশলাভ করিয়াছিল। এইরূপে, বর্ষার প্রারম্ভে একদিন যখন আমরা উত্তপ্ত অপরাহ্নে তরাই অঞ্চল অতিক্রম করিতেছি, তখন স্বামীজী যেন আমাদের প্রত্যক্ষ করাইয়া দিলেন যে, এই সেই স্থান, যেখানে ভগবান বুদ্ধের কৈশোরকাল অতিবাহিত হয় এবং বৈরাগ্য দেখা দেয়। বন্য ময়ূরগণ মনে করাইয়া দিল রাজপুতনা ও তাহার চারণদের পল্লীগাথা। কদাচিৎ কোথাও একটি হস্তী স্বামীজীর প্রাচীনকালে যুদ্ধকাহিনী বর্ণনা করিবার উপলক্ষ হইয়া উঠিল। সেই প্রাচীন যুগের ভারত যতনি বিদেশী-আক্রমণের বিরুদ্ধে এই জীবন্ত কামানরূপ সামরিক প্রকার খাড়া করিতে পারিয়াছিল, ততদিন পরাজিত হয় নাই।

বঙ্গদেশের সীমা অতিক্রম করিয়া আমরা যখন যুক্তপ্রদেশে প্রবেশ করিতেছি, তখন স্বামীজী আমাদের কাছে সেই সময়ে যে মহানুভব ইংরেজ তদানীন্তন শাসনকর্তৃপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাঁহার বিচক্ষণতা ও কার্যপ্রণালীর কথা বলেন। মর্মস্পর্শী ভাষায় তিনি বলেন, “অন্যান্য শাসনকর্তা থেকে তার পার্থক্য এই যে, তিনি বোঝেন, প্রাচ্য দেশগুলিতে জনমত এখনও তেমন প্রবল হয়ে না ওঠায় শাসনভার ব্যক্তিবিশেষের ওপর থাকা আবশ্যক। সেজন্য কোন হাসপাতাল, কলেজ বা অফিসের লোক জানে না, কোন্ দিন তিনি পরিদর্শনের জন্য উপস্থিত হবেন। এবং অতি দরিদ্র ব্যক্তিও বিশ্বাস করে যে, একবার তার সঙ্গে দেখা করতে পারলেই তার কাছে সুবিচার পাবে।” প্রাচ্য দেশসমূহের শাসনব্যাপারে ব্যক্তিগত প্রভাবের গুরুত্ব অধিক, এই ভাবটি স্বামীজীর কথাবার্তায় বিশেষভাবে প্রকাশ পাইত। তিনি সর্বদা বলিতেন যে, বিচারের দৃষ্টিতে দেখিতে গেলে সমগ্র দেশশাসনের পক্ষে গণতন্ত্র বা ডিমক্রেসি সর্বাপেক্ষা অপকৃষ্ট শাসনপ্রণালী। তাহার অন্যতম প্রিয় ধারণা ছিল, এই সত্যটি উপলব্ধি করার ফলেই জুলিয়াস সীজার স্বয়ং সম্রাট-পদবী আকাঙক্ষা করেন। যাহার নিকট সর্বদা সহজে নিজ অভাব জানানো যায়, যাহার হৃদয়ে সহজে দয়ার উদ্রেক হয়, এবং যিনি অপরের মতামত উপেক্ষা করিয়া নিজের বিবেচনা মতো ন্যায়বিচারে সমর্থ-এরূপ কোন শাসনকর্তা বা সম্রাটরূপ ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তে রাজ্যে ক্রমিক বিভাগীয় ও উদাসীন আমলাতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের প্রবর্তন যে ভারতের দরিদ্র অধিবাসীর পক্ষে কত কষ্টকর হইয়া দাঁড়ায়, স্বামীজীর নিকট অনবরত শুনিয়া আমরা মধ্যে মধ্যে তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতাম। কারণ, তাহার নিকট আমরা শুনিতে পাইলাম, ব্রিটিশ শাসনের প্রথমভাগে কত সরলচিত্ত ব্যক্তি যে লণ্ডনে উইগুসর প্রাসাদে ভারতেশ্বরী মহারানীর নিকট গিয়া সাক্ষাতে সমস্ত নিবেদন করিবার উদ্দেশ্যে নিজেদের যথাসর্বস্ব ক্ষয় করিয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। অধিকাংশ যাত্রীই এই নিষ্ফল যাত্রায় আশাভঙ্গ ও অভাবের মধ্যে নিজ নিজ গ্রাম ও বাড়িঘর হইতে বহুদূরে প্রাণ বিসর্জন করিয়াছে। জন্মভূমির দর্শনলাভ পুনরায় তাহাদের ভাগ্যে ঘটিয়া ওঠেনাই।

কিন্তু, পাঞ্জাবে প্রবেশ করিয়াই আমরা স্বামীজীর গভীরতম স্বদেশ প্রেমের পরিচয় পাইলাম। সে সময়ে কেহ তাহাকে দেখিলে ধারণা করিয়া বসিতেন যে, স্বামীজী এই প্রদেশেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন! কত গভীরভাবে তিনি নিজেকে উহার সহিত একাত্ম করিয়াছিলেন। মনে হইত, ঐ প্রদেশের অধিবাসিগণের সহিত তিনি অনেক ভালবাসা ও ভক্তিব বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। যেন তাহাদের নিকট তিনি পাইয়াছেন অনেক, দিয়াছেনও অনেক। কারণ, তাহাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন যাহারা জোর করিয়া বলিতেন, তাহাদের প্রথম ও শেষ গুরু-গুরু নানক ও গুরু গোবিন্দের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ স্বামীজীর চরিত্রে তাহারা লক্ষ্য করিয়াছেন। এমনকি, তাহাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সন্দেহপ্রবণ ব্যক্তিগণও তাহাকে বিশ্বাস করিতেন। আর যদি তাহার মতামত তাঁহারা মানিয়া লইতে না পারিতেন, অথবা যে ইউরোপীয়গণকে তিনি আপনার করিয়া লইয়াছিলেন–তাহাদের সম্পর্কে তাহার উচ্ছ্বসিত সহানুভূতি অনুমোদন না করিতেন, তাহা হইলে এই উদ্দামহৃদয় ব্যক্তিগণকে তাহাদের অপরিবর্তনীয় মনোভাব ও অটুট কঠোরতার জন্য যেন তিনি অধিকতর ভালবাসিতেন। যে পাঞ্জাবী বালিকা চরকা কাটিবার সঙ্গে সঙ্গে ‘শিবোহম’, ‘শিবোহম’, উচ্চারণ করিত তাহার কথা বর্ণনাকালে তাহার মুখমণ্ডল আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিত। ঐ বালিকার সম্পর্কে আমেরিকাবাসী শিষ্যগণ পূর্বেই অবহিত হইয়াছিলেন। আবার এ কথা বলিতে ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, এই পাঞ্জাব প্রদেশে প্রবেশ করিয়াই তিনি এক মুসলমান মেঠাইওয়ালাকে ডাকিয়া তাহার নিকট মুসলমানী খাবার কিনিয়া খান। জীবনের অপরাহ্নে কাশীতে অবস্থানকালে তিনি পুনরায় ঐরূপ আচরণ করেন বলিয়া জানা যায়।

কোন গ্রামের ভিতর দিয়া যাইবার সময় তিনি আমাদের দরজার মাথায় ঝোলানো গাঁদাফুলের মালাগুলি দেখাইয়া দিতেন। উহা দ্বারা গৃহগুলি হিন্দু পরিবারের বলিয়া বোঝা যাইত। আবার ভারতবাসীরা ‘সুন্দর’ বলিয়া যাহার আদর করেন, গায়ের সেই ‘কাঁচা সোনার বর্ণ’ তিনি দেখাইয়া দিতেন। ইউরোপীয়দের আদর্শ যে ঈষৎ রক্তাভ শ্বেত গাত্রবর্ণ, তাহা হইতে ইহা কত বিভিন্ন। অথবা আমাদের সঙ্গে লইয়া টাঙ্গাযোগে যাইবার সময় সব ভুলিয়া যে শিব-মাহাত্ম্য বর্ণনায় তিনি কদাপি ক্লান্তিবোধ করিতেন না, তাহাতেই মগ্ন হইয়া যাইতেন। লোক সমাগম হইতে বহুদূরে পর্বতশিখরে মহাদেবের অবস্থিতি–মানবের নিকট যাহার প্রার্থনা কেবল নিঃসঙ্গতা—যিনি এক অনন্তধ্যানে সমাহিত।

রাওয়ালপিণ্ডি হইতে গাড়ি করিয়া আমরা মারী যাই, এবং কয়েকদিন সেখানে অতিবাহিত করি। অতঃপর কতক টাঙ্গায়, কতক নৌকাযোগে কাশ্মীরের শ্রীনগর অভিমুখে গমন করি। পরবর্তী কয়েকমাস ভ্রমণকালে কাশ্মীর ছিল আমাদের প্রধান কেন্দ্র।

এই যাত্রাপথের সৌন্দর্যবর্ণনায় সহজেই আত্মহারা হইয়া যাইতে হয়। পার্বত্য অরণ্যানী, গীর্জার আকারে শোভমান বিতস্তা গিরিসঙ্কটের পাহাড়গুলি ও শস্যক্ষেত্ৰমধ্যে অদৃশ্যপ্রায় গ্রামগুলি ঐ পথের অন্তর্গত। ঐ সময়ের কথা স্মরণ করিলে এক সৌন্দর্যময় দৃশ্যপরম্পরা মানসপটে উদিত হয়। ঐ সকল চিত্রের মধ্যে কাশ্মীরের কৃষক রমণীর উপযুক্ত রক্তবর্ণের মুকুট পরিহিতা ও শ্বেত অবগুণ্ঠনযুক্তা সেই প্রাচীন রমণীর স্মৃতিও কম মধুর নয়। ঐ পথ দিয়া যাইবার সময় হার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়া দেখিলাম, তিনি এক খামারের মধ্যে অবস্থিত বিশাল চেনার বৃক্ষতলে পুত্রবধূগণ পরিবৃত হইয়া চরকায় সূতা কাটিতেছেন। তাহার সহিত স্বামীজীর এই দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। পূর্ব বৎসব স্বামীজী তাহার নিকট কোন ছোটখাট উপহার লাভ করেন। তাহার সম্বন্ধে এই গল্প করিতে স্বামীজী কখনও ক্লান্তিবোধ করিতেন না যে, বিদায় গ্রহণের পূর্বে তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, “মা, আপনি কোন ধর্মাবলম্বী?” ঐ প্রশ্ন-শ্রবণে বৃদ্ধার মুখ আনন্দ ও গর্বে উদ্ভাসিত হইয়া ওঠে, এবং আনন্দোৎফুল্ল উচ্চকণ্ঠে স্পষ্টভাবে বলেন, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, প্রভুর কৃপায় আমি মুসলমানী।”

অথবা শ্রীনগরের বহির্ভাগে অবস্থিত সমুন্নত লম্বার্ডিদেশসুলভ পারবীথির কথা এখানে উল্লেখ করিতে পারি। যেন হবিমা (Hobbema)-রচিত বিখ্যাত চিত্রখানির অবিকল অনুরূপ ‘ ভারত ও সনাতন-ধর্ম সম্পর্কে কত প্রসঙ্গই না আমরা এখানে শ্রবণ করিয়াছি!

অথবা ফসল কাটা শেষ হইবার পর শূন্য ক্ষেতগুলিতে গ্রামবাসিগণ যে প্রমোদানুষ্ঠান করিয়া থাকে, তাহার কথা বহুক্ষণ ধরিয়া বর্ণনা করিতে পারি। অথবা ইসলামাবাদের সেই উন্নত পপলার-তরুশ্রেণীতলে যে তাম্রাভ ‘অ্যামারাস্থ শস্য কিংবা সদ্যোজাত হরিদ্বর্ণ ধানগাছগুলি—তাহাদের কথাও বলিতে পারি। বনফুলের মধ্যে উজ্জ্বল নীলবর্ণের একজাতীয় ‘ফরগেট-মিনট’ গ্রীষ্মকালে কাশ্মীরের ক্ষেতগুলিতে অতি সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু শরৎ ও বসন্তকালে ক্ষেত ও নদীতীর ছোট ছোট বেগুনী ‘আইরিস’ ফুলে একেবারে ভরিয়া যায়। ঐ ফুলগুলির বর্শার মতো সুচাল পাতাগুলির মধ্যে বেড়াইতে বেড়াইতে উহাদের ঘাস বলিয়াই ভ্রম হয়। কোথাও পথেব পার্শ্বে ছোট ঘোট পাহাড় দৃষ্টি অবরোধ করিয়া দণ্ডায়মান। বোঝ যায়, ঐগুলি মুসলমানদের গোরস্থান। আইরিস কুসুমে আবৃত ঐ স্থানগুলি কি অসীম করুণ ভাবেরই না ইঙ্গিত করে।

আবার এখানে সেখানে ঘাস ও আইরিস পুষ্পের মধ্যে দুই-চারটি গ্রন্থিবহুল আপেল, বা নাসপাতি কিংবা আলুবোখরার গাছ দেখিতে পাওয়া যায়। এক সময়ে প্রত্যেক গ্রামের প্রজাগণ রাজ-সরকার হইতে বিনা ব্যয়ে একটি করিয়া ফলবাগানের উপস্বত্ব ভোগ করিত। বৃক্ষগুলি তাহাদেরই ধ্বংসাবশেষ। একদিন গোধূলি সময়ে উচ্চ নদীতীরে ভ্রমণ করিতে করিতে দেখিতে পাইলাম, একদল মুসলমান রাখাল মাথা কানো লম্বা ছড়ি হাতে কতকগুলি রামছাগল তাড়াইয়া লইয়া গ্রামের দিকে যাইতেছে। কয়েকটি আপেল গাছের নিকট পৌঁছিয়া তাহারা একটু থামিল, এবং প্রার্থনাকালে ব্যবহৃত গালিচার পরিবর্তে কম্বল বিছাইয়া সেই ঘনায়মান গোধূলি-আলোকে সান্ধ্য উপাসনা আরম্ভ করিল। হৃদয় বলিয়া উঠে, এ সৌন্দর্যের অন্ত নাই বাস্তবিক অন্ত নাই।

কিন্তু সত্যসত্যই বর্তমান গ্রন্থে এইসকল বিষয়ের কথা বলাই আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার বর্ণনার বিষয় ভূগোল বা রাজনীতি নহে, এমনকি, কৌতূহলোদ্দীপক অধিবাসিবৃন্দ বা অপরিচিত জাতিসমূহের আচার ব্যবহারও নহে। সৌভাগ্যবশতঃ আধুনিক পরিবর্তনের যুগে শত বিরোধ ও জটিলতার মধ্যে, আমি সেই প্রাচীন যুগের যে বিশাল ধর্মজীবনের উন্মেষ দেখিতে পাইয়াছিলাম, এখানে তাহারই কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া আমার উদ্দেশ্য। আবার এই সকল বিরোধের বিষয় সম্যকরূপে অবগত ছিলেন বলিয়া যে মহাপুরুষ সমধিক মমর্যাতনা ভোগ করিতেন, তাহার সম্বন্ধে বলিবার ইচ্ছা থাকিলেও আমার অক্ষমতাবশতঃ ঐ বর্ণনা অসংলগ্ন ও অস্পষ্টই থাকিয়া যাইবে। স্বামীজী নিজে একবার বলিয়াছিলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন, “একটি ফুলেরমতো”। মন্দির সংলগ্ন উদ্যানে স্বতন্ত্রভাবে জীবনযাপন করিতেন; সরল, অর্ধনগ্ন, আচারনিষ্ঠ, প্রাচীন-ভারতের আদর্শস্বরূপ; সহসা তিনি এমন এক জগতে পূর্ণ বিকশিত হইয়া ওঠেন, যে জগৎ তাহার প্রাচীনকালের স্মৃতি পর্যন্ত মুছিয়া ফেলিতে চাহিয়াছিল। আমার গুরুদেবের জীবনে একাধারে মহত্ত্ব ও বেদনার বিষয় এই যে, তিনি নিজে ঠিক ঐ ঘঁচের লোক ছিলেন না। তাহার মনের গঠন ছিল সম্পূর্ণভাবে আধুনিক। মনের যে অবস্থায় মানুষ ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করে–সেই শাশ্বত-প্রজ্ঞালোকে তাহার চিত্তও উদ্ভাসিত থাকিত, কিন্তু সেই সঙ্গে বর্তমান যুগের মনীষী ও কর্মিবৃন্দের সম্মুখে উপস্থিত সকল প্রশ্ন ও সমস্যার উপরেও তাহার আলোক আসিয়া পড়িত। তাঁহার আশা বিংশ শতাব্দীর জনগণের আশাকে আপনার অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইতে অথবা বর্জন করিয়া চলিতে পারিত, কিন্তু কদাচ উপেক্ষা করিতে পারিত না। সমুদয় জ্ঞানভাণ্ডার সুসংবদ্ধ হওয়ার ফলে সমগ্র মানবজাতির দুর্দশা ও তাহার প্রতিকূলে সংগ্রামের যে দৃশ্য উজ্জ্বল আলোকছটার ন্যায় সহসা লোকের দৃষ্টিপথে পড়িয়াছিল, তাহা ইউরোপীযগণের ন্যায় তাহাকেও সচেতন করিয়া তোলে। ইউরোপ এ বিষয়ে কি অভিমত প্রকাশ করিয়াছে, তাহা আমরা জানি। গত ষাট বৎসর বা ততোধিক কাল ধরিয়া ইউরোপীয় কলা, বিজ্ঞান ও কাব্য হতাশার ক্রন্দনে পূর্ণ। একদিকে অধিকার প্রাপ্ত জাতিগুলির ক্রমবর্ধমান আত্মতুষ্টি ও ইতরজনোচিত প্রবৃত্তি, অন্যদিকে অধিকারচ্যুত জাতিগুলির ক্রমবর্ধমান বিষাদ ও যন্ত্রণা; আর মানবের অতি উদার প্রকৃতি উহাকে ক্ষতিকর পাপ বলিয়া জানিলেও প্রতিকার বা দমনে অসমর্থ—ইউরোপের শ্রেষ্ঠ মনীষিগণের চক্ষে এই দৃশ্যই পড়ে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মর্মযাতনা ভোগ করিলেও, ইহা সত্য যে, উপায়ান্তর না দেখিয়া পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষা নিশ্চল অবস্থায় উচ্চৈঃস্বরে কেবল ইহাই বলিতে পারে, “যাহার আছে, তাহাকে আরও দেওয়া হইবে, আর যাহার নাই, তাহার নিকট হইতে সামান্যতম সম্বলটুকুও কাড়িয়া লওয়া হইবে। সাবধান, যে পরাজিত হইবে, তাহারই সর্বনাশ।”

প্রাচ্য জ্ঞানিমণ্ডলীরও কি এই অভিমত? তাহা হইলে মানবজাতির আর আশা কি? আমার গুরুদেবের জীবনে আমি এই প্রশ্নের উত্তর পাই। তাহার মধ্যে একাধারে ভারত ও সমগ্র জগতের অতীতকালের অসংখ্য আচার্য ও ঋষির যে আধ্যাত্মিক আবিষ্কার ও ধর্মলাভের জন্য সংগ্রাম—তাহারই উত্তরাধিকারী এবং এক নূতন ধরনের ভবিষ্যৎ উন্নতির প্রবর্তক ও ঋষির সমাবেশ ঘটিয়াছে দেখিতে পাই। কোন একটি সমস্যাকে তিনি যেভাবে মনের মধ্যে গ্রহণ করিতেন, তাহাতেই আমি উহার সমাধানের ইঙ্গিত পাইতাম; এবং প্রথম হইতেই আমি উহার ঠিক বিপরীত মত দৃঢ়ভাবে পোষণ না করিয়া থাকিলে (সেক্ষেত্রে স্বামীজীই উহা প্রথম আমাকে ধরাইয়া দিতেন) তাহার সমাধান আমার নিকট বিশেষ মূল্যবান বলিয়া বোধ হইত। এইভাবে চিন্তা করিয়াছি বলিয়া আমার বিশ্বাস, যে উন্নততর অসাধারণ চিন্তাধারা ও জ্ঞানরাজ্যে তিনি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করিতেন, আধুনিক যুগে তাহার প্রত্যেকটির কোন-না-কোন সার্থকতা আছে। আমার বিশ্বাসবহু জিনিস, যাহা বুঝিতে পাবি নাই বলিয়া আমার দৃষ্টি অতিক্রম করিয়াছে, তাহা অন্য কাহারও জীবনে উপযুক্ত ক্ষেত্ৰ লাভ করিবে। আর প্রার্থনা করি, নিজের মনগড়া কোন কিছু জুড়িয়া না দিয়া, অথবা সত্যের অপলাপ ঘটে এমন রঙ না লাগাইয়া, আমি যেন সর্বদা সত্য সাক্ষ্য প্রদান করিতে পারি।