সপ্তম পরিচ্ছেদ
তত্ত্বালোকের ঝলক

আমি যে সব উপলব্ধি লাভ করি, তাহার মধ্যে এইটি একমাত্র নহে, কিন্তু কেবল এই উপলব্ধির সম্বন্ধেই বিস্তৃতভাবে বলার প্রয়োজন ছিল। যে পূর্ণ ঘটনাটির ইহা অংশমাত্র, তাহা হইতে আভাস পাওয়া যায়, প্রাচ্যদেশীয় আচার্যগণ শিষ্যের নিকট কিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি অত্যাবশ্যক বলিয়া মনে করেন। সর্বপ্রথম শিষ্যকে সর্বতোভাবে গুরুর আনুগত্য স্বীকার করিতে হইবে। শুনিয়াছি, গুরুর ব্যক্তিগত সেবাও একান্ত আবশ্যক, এবং ঐরূপ স্থলেই গুরুর চিন্তারাশি শিষ্যের মনে বীজাকারে অঙ্কুরিত হয়, বলিতে পারি না। আমার নিজের ক্ষেত্রে এই ধরনের সেবা বলিতে গেলে কালেভদ্রে অতি অল্পক্ষণের জন্য সূচী অথবা লেখনী কার্যেই আবদ্ধ থাকিত। স্বামীজী বলিয়াছেন, কন্যার কখনও এরূপভাবে কাজ করা উচিত নয়, যাহাতে লোকে মনে করে, পিতৃগৃহে ভৃত্যের অভাব ছিল। তথাপি আমার বিশ্বাস—কারণ কয়েকটি ক্ষেত্রে আমি ইহার সত্যতার প্রমাণ পাইয়াছি-প্রীতির সহিত গুরুজনদের সামান্য সেবা দ্বারা তাহাদের সহিত আমাদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক একাত্মতা জন্মে; যাহার ফলে আমাদের জীবনে অপূর্ব ও সুন্দর ফল লাভ করি।

পাশ্চাত্যে কোন কোন সম্প্রদায়ের লোক গীর্জার প্রতি যে পূর্ণ বিশ্বাস ও ভক্তির ভাব পোষণ করে, প্রাচ্যে গুরুর প্রতি শিষ্যকে অনুরূপ ভাব প্রদর্শন করিতে হয়। শিষ্যের পশ্চাতে গুরু এবং তাহার সাধনই শক্তিরূপে বর্তমান থাকে। এই ঋণ মানিয়া লইতে অসমর্থ হওয়া বা অস্বীকার করা মহাপাপ এবং অমার্জনীয়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভাব অনুযায়ী ভক্তি প্রকাশ করিয়া থাকেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ গুরু, যিনি শিষ্যের স্বাধীনতা গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়াছেন। কিন্তু গুরুর প্রতি শিষ্যের একান্ত ভক্তি অবশ্য প্রয়োজন। যে ব্যক্তি শুধু নিজের শক্তির উপরই আত্মোপলব্ধিকে প্রতিষ্ঠিত করিতে চায়, তাহার অধ্যাত্মজীবন ‘ঘুনধরা’ কাঠের মতো অচিরে জীর্ণ হইয়া পড়ে।

স্মরণ রাখিতে হইবে, এইকালে আমরা এমন এক সংসর্গে বাস করিতেছিলাম,যেখানে নির্জনতাই আত্মোন্নতির শ্রেষ্ঠ উপায় বলিয়া বিবেচিত হইত। স্বামীজী বলিতেন, তাহার মনে হয়, নিয়োক্ত ঘটনা হইতে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য চিন্তা-প্রণালীর পার্থক্য স্পষ্টরূপে বুঝা যায়। ইউরোপীয়দের ধারণা, কুড়ি বৎসর একাকী বাস করিলে মানুষ পাগল না হইয়া যায় না, আর ভারতীয় ধারণা হইল, কুড়ি বৎসর একাকী না থাকিলে কাহাকেও সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ বলা যায় না। এই বৈপরীত্য কতকটা অতিরঞ্জিত ভাষায় প্রকাশ করিলেও মূলতঃ সত্য। হিন্দুধারণা অনুযায়ী মৌ ও নির্জনবাসের দ্বারাই আমরা সেই আত্মোপলব্ধির আনন্দরস আকণ্ঠ পান করিতে পারি, এবং তাহার ফলে যে আন্তরবিকাশ ঘটে, তাহাতে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অহমিকার ধার মসৃণ হইয়া যায়। সেজন্যই দেখা যায়, নির্বাণ অবস্থায় বুদ্ধমূর্তিগুলির মুখমণ্ডল সর্বদা প্রশান্ত। যে কোনদিক দিয়াই দেখা যাউক, নানাভাবে পরিদৃশ্যমান এই জগৎ ও জাগতিক সম্পর্কসমূহ চিন্তাপ্রবাহকে শিশুসুলভ বাধা দেয় মাত্র। সকল বস্তুর পশ্চাতে অনুভূত হয় সেই অনির্বচনীয় পূর্ণত্ব, সকল দৃষ্ট বস্তু যাহার অতি তুচ্ছ ও বিকৃত বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সকল মানবীয় সম্পর্কের উৎসস্বরূপ সেই চরম সত্তা বা ব্রহ্মে যাহারা অবগাহন করিয়াছেন, তাহাদের আর ঐ প্রকার সম্পর্ক প্রলোভিত করিতে পারে না। আর স্মরণ রাখিতে হইবে যে, ভারতে প্রেম, করুণা অথবা বীরত্বকে মূল কারণ বলিয়া চিন্তা করা হয় না; যদিও উহারা সেই অতীন্দ্রিয় সত্যে উপনীত হইবার বিভিন্ন পথস্বরূপ। কেবল একমেবাদ্বিতীয় বস্তুর সাক্ষাৎকারই ঐ ১ল উৎস। আমার বরাবর ধারণা, এই কারণে নিষ্ঠা, নির্জনবাস ও আত্মবিলোপ হিন্দুমতে প্রধান গুণ বলিয়া বিবেচিত, আর পাশ্চাত্যে অধিকতর সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক গুণগুলিই সমাদৃত হইয়া থাকে। ভারতীয় মতে, দেহধারী হইয়াও প্রত্যেক ব্যাপারে আমরা যতটুকু নিজ নিজ দেহবুদ্ধি হইতে ঠিক ঠিক দূরে থাকিতে পারিব, ততটুকুই লাভ।

এই সকল চিন্তার প্রভাবে, ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের সেই অপূর্ব গ্রীষ্মকালে আমাদের ।সকলের নিকট ইহা স্বতঃসিদ্ধ বলিয়া মনে হয় যে, যাহারা সাকার রূপ ধারণ করিয়া পরিত্রাতা রূপে আবির্ভূত হন, তাহাদের অপেক্ষা অব্যক্ত সত্তায় (পরব্রহ্মে) যাহারা চিরকালের মতো লীন হইয়া গিয়াছেন, আর এই জগতে ফিরিয়া আসিবেন না, তাহারাই শতগুণে শ্রেষ্ঠ। স্বামীজী মধ্যে মধ্যে বলিতেন, “শরীরের কথা চিন্তা করাও পাপ।” অথবা বলিতেন, “শক্তি বা সিদ্ধি লোকের সামনে প্রকাশ করা ভাল নয়।” বুদ্ধের করুণার মধ্যেও ব্যক্তিত্বের স্মৃতি বিদ্যমান ছিল। ঈশার পবিত্রতার মধ্যেও ছিল শক্তিপ্রদর্শনের ভাব।

শেষোক্ত চিন্তাটি, অর্থাৎ অপরের নিকট শক্তি প্রকাশ করা অন্যায় ভারতীয় সাধুসমাজে বিশেষ প্রচলিত বলিয়া মনে হয়। একবার অদূরদর্শিতাবশতঃ আমাদের তবু তীর্থযাত্রীদের তাঁবুর নিকটে ফেলা হইয়াছিল। শত শত লোক উহার প্রতিবাদে কোলাহল করিয়া উঠিল। স্বামীজী তাঁবু সেখানেই রাখিবার জন্য প্রায় জিদ ধরিয়া বসিয়াছিলেন, এমন সময়ে এক অপরিচিত সাধু অগ্রসর হইয়া মৃদুস্বরে তাহাকে বলিলেন, “স্বামীজী, মানি, আপনার ক্ষমতা আছে, কিন্তু ঐ ক্ষমতা প্রকাশ করা আপনার উচিত নয়।” স্বামীজী তৎক্ষণাৎ তাঁবু অন্যত্র সরাইয়া লইতে আদেশ দিলেন।

অতীন্দ্রিয় সত্যোপলব্ধির দ্বারস্বরূপ মৌন ও নির্জনবাসের শক্তি সম্বন্ধে বিচার করিবার বহু সুযোগ আমরা লাভ করিয়াছিলাম। কারণ, স্বামীজী বারবার আমাদের মধ্য হইতে হঠাৎ চলিয়া যাইতেন, আবার অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরিয়া আসিতেন। তাহার বিপুল খ্যাতি শ্রবণে আকৃষ্ট হইয়া বহু লোক তাহার বজরায় প্রবেশ করিয়া বসিয়া থাকিত এবং একদৃষ্টে চাহিয়া তাহার কার্যকলাপ নিরীক্ষণ করিত। ফলে একটু সময়ও একাকী থাকিবার উপায় ছিল না। বিশেষতঃ ভক্তবৃন্দের অপলক দৃষ্টির সম্মুখে তিনি অস্থির বোধ করিতেন। সময়ে সময়ে মনে হইত, প্রেমিক যেরূপ তাহার প্রেমাস্পদের চিন্তা করিয়া থাকে, তিনিও যেন সেই ভাবে মৌন, ভস্মাবৃত পরিব্রাজক অথবা নির্জনবাসী সাধুর জীবন চিন্তা করিতেন। যদি কেহ হঠাৎ আসিয়া বলিত, তিনি আজ বা কাল চিরদিনের মতো আমাদের নিকট বিদায় লইয়া যাইবেন, আর শেষবারের মতো আমরা তাহার কণ্ঠস্বর শ্রবণ করিতেছি, তাহা হইলে বিস্মিত হইবার কিছুই ছিল না। তিনি এবং তাহার উপর নির্ভর করিত এমন সব বিষয়ে আমরাও যেন ভগবদিচ্ছার সুরধুনী স্রোতে ভাসমান তৃণের ন্যায় ছিলাম। যে কোন মুহূর্তে ঐ ইচ্ছা তাহার নিকট মৌনরূপে আত্মপ্রকাশ করিতে পারিত। যে কোন মুহূর্তে পৃথিবীতে তাহার বাস শেষ হইয়া যাইতে পারিত।

এই যে মতলব আটিয়া কাজ না করা—ইহা কোন আকস্মিক ব্যাপার নহে। ইহার দুই বৎসর পরে তিনি একদিন আমাকে একটি পত্র দেখিতে দেন, এবং উহার উত্তর দেওয়ার ব্যাপারে আমি যখন অযাচিতভাবে কিছু সাংসারিক উপদেশ দিতে যাই, তখন যে বিরক্তির সহিত তিনি আমাকে উত্তর দেন, তাহা আমি কখনও ভুলিতে পারিব না। সক্রোধে তিনি বলিয়া ওঠেন, “মতলব! কেবল মতলব ভাজা! এইজন্যই পাশ্চাত্যের লোক তোমরা কোনকালে ধর্ম সৃষ্টি করতে পারনি। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ কখনো ধর্মপ্রচার করে থাকেন, তো সে জনকয়েক ক্যাথলিক সাধু-যারা মতলব এঁটে কাজ করতে জানতেন না। যারা মতলব এটে কাজ করে, তাদের দ্বারা কোনকালে ধর্মপ্রচার হয়নি, হতে পারে না।”

বাস্তবিক সেই মধুর গ্রীষ্মকালীন-যাত্রায় আমরা সর্বদা ভৃত্যদের নিকট এই কথা শুনিবার জন্য প্রস্তুত থাকিতাম যে, স্বামীজীর নৌকা এক ঘণ্টা পূর্বে নোঙ্গর তুলিয়া চলিয়া গিয়াছে এবং সেদিন আর প্রত্যাবর্তন করিবে না। প্রকৃতপক্ষে তিনি একদিন কি বহুদিন অনুপস্থিত থাকিবেন, তাহার কিছুই স্থিরতা ছিল না। কিন্তু সর্বদাই তিনি এই সকল নির্জনবাস হইতে দিব্য জ্যোতির্ময়রূপে ও শান্তিতে পূর্ণ হইয়া ফিরিয়া আসিতেন, আর তাহার শ্রীমুখ হইতে উচ্চারিত হইত গভীর—অতি গভীর জ্ঞানের কথা। যে-সব ধর্মানুষ্ঠান অপর ধর্মমত কর্তৃক পবিত্ররূপে স্বীকৃত, শ্রীরামকৃষ্ণের সকল শিষ্যের নিকটেই তাহারা বিশেষ অর্থপূর্ণ। তাহাদের মধ্যে একজন বলেন, স্বামীজী রোমের পবিত্র সোপানরাজি’ (Scala Santa) দর্শনে অতীব মুগ্ধ হইয়াছিলেন। অধিকন্তু এই সঙ্ঘের আদর্শ হইল, নিষ্ঠাবান ভক্তগণের ন্যায় সকল অনুষ্ঠানে যোগদান। আমার নিজের গুরুর সম্বন্ধে দেখিয়াছি, তীর্থদর্শনকালে একজন সাধারণ স্ত্রীলোক যেরূপ করিয়া থাকেন, সেইভাবে তিনি পায়সভোগ দিতেন অথবা মালা জপ করিতেন। এই সকল স্থলে তিনি জাগতিক অথবা ধর্মীয় সকল ব্যাপারে আচার-অনুষ্ঠানের তুচ্ছ নিয়মগুলিও যথাযথভাবে পালন করিতেন। এইভাবেই উচ্চতম ভূমিতে আরোহণ করিবার পূর্বে তিনি সাধারণ লোকের সহিত নিজেকে একাত্ম করিয়া ফেলিয়াছিলেন।

কাশ্মীরে দুইটি স্থান অতীব পবিত্র বলিয়া গণ্য করা হয়। একটি ক্ষীরভবানী নামক প্রস্রবণ, যেখানে জগন্মাতার পূজা হইয়া থাকে; অপরটি অমরনাথ নামক পর্বতগুহা, তুষারময় শিবলিঙ্গ যেখানে বিরাজমান। এবং ঐ গ্রীষ্মকালে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হইল স্বামীজী কর্তৃক ঐ স্থান দুইটি দর্শন। কিন্তু আমরাও উচ্চ আশা পোষণ করিতাম। যথাযথভাবে ধ্যান করিবার আগ্রহ প্রকাশ করিয়া আমরা কোন নির্জন স্থানে কিছুকাল বাসের অনুমতি প্রার্থনা করি—যেখানে নিয়মিত শিক্ষাধীনে থাকিয়া কয়েকঘণ্টা মৌন অবলম্বনপূর্বক ধ্যানাভ্যাসের চেষ্টা করিতে পারিব। এই কারণে, কয়েকটি তাঁবু আনা হইল, এবং সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমে এক সপ্তাহের জন্য আচ্ছাবল নামক স্থানে বনের প্রান্তে আমাদের বু পড়িল। অমরনাথ তীর্থযাত্রা হয় আগস্ট মাসের প্রথমে, আর ৩০ সেপ্টেম্বর স্বামীজী আমাদের ছাড়িয়া ক্ষীরভবনী দর্শনে গমন করেন। অবশেষে ১২ অক্টোবর বারামুল্লায় আমরা তাহার নিকট বিদায় গ্রহণ করি। আমাদের যাত্রারও পরিসমাপ্তি ঘটে।

এই সকল মহান উপলব্ধি ও সাক্ষাৎকার ব্যতীত, যে সমুজ্জ্বল জীবনের সংস্পর্শে আমরা বাস করিতাম, তাহার উজ্জ্বলচ্ছটা প্রায়ই আমাদের উপর আসিয়া পড়িত। একবার কয়েকদিন অন্যত্র বাসের পর তিনি সবেমাত্র প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন এবং ভক্তি সম্বন্ধে কথাবার্তা বলিতেছেন, এমন সময়ে ভৃত্য আসিয়া জানাইল, আহার্য প্রস্তুত। কিন্তু আমরা দেখিতে পাইলাম, ভগবৎপ্রেমের উচ্চ শিখরে যিনি অবস্থান করিতেছেন তাহার নিকট আহারের চিন্তা পর্যন্ত কত অসহনীয়! আর একদিন সন্ধ্যার ম্লান আলোকে আমরা কয়েকজন মহিলা আমাদের তত্ত্বাবধায়িকা ধীরামাতার নৌকায় বসিয়া (আমরা সেদিন তাহার অতিথি) মৃদুস্বরে গল্পগুজব করিতেছি, এমন সময় স্বামীজী হঠাৎ আমাদের সহিত কয়েক মিনিট কথা বলিয়া কাটাইবার জন্য আসিলেন। ইউরোপযাত্রার দিন আসন্ন, সুতরাং সেই প্রসঙ্গ উঠিল। কিন্তু শীঘ্রই উহা শেষ হইয়া গেল। তারপর যাহাকে ভারতবর্ষে একাকী থাকিয়া যাইতে হইবে বলিয়া একরূপ স্থির ছিল, তিনি বলেন, অপরের অভাব তাহাকে বিলক্ষণ অনুভব করিতে হইবে। তাঁহার দিকে ফিরিয়া এক অদ্ভুত কোমলতার সহিত স্বামীজী বলিলেন, “কিন্তু, এত গুরুতর কষ্ট মনে করছ কেন? হাসিমুখে কেন বিদায় দাও না? পাশ্চাত্যবাসী তোমরা বড় সহজে বিষণ্ণ বোধ কর। তোমরা দুঃখের উপাসনা কর। তোমাদের সারা দেশে এই আমি দেখেছি। প্রতীচ্যে তোমাদের সামাজিক জীবন বাইরে থেকে হাস্যমুখরিত, কিন্তু ভিতরে গভীর মর্মব্যথা। শীঘ্রই তা কান্নায় পরিণত হয়। আমোদপ্রমোেদ যা কিছু, সব উপরে—আসলে তা গভীর দুঃখে পূর্ণ। কিন্তু এদেশে বাইরের দিকটা দুঃখপূর্ণ ও নিরানন্দ, কিন্তু ভিতরে নিশ্চিন্তভাব ও আনন্দ।

“তোমরা জানো, আমাদের একটা মত হলো, ঈশ্বর ক্রীড়াচ্ছলে নিজেকে জগক্সপে বিকাশ করেছেন বলে কল্পনা করা হয়। অবতারগণ লীলা হেতু এখানে আগমন করেন এবং বাস করেন। খেলা—সব খেলা। খ্রীস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন কেন? সে কেবল লীলা। জীবন সম্বন্ধেও তাই। ভগবানের সঙ্গে শুধু খেলা করে যাও। বলল, এ সব লীলা, লীলা। তুমি কিছু করেছ কি?” অতঃপর আর একটি কথাও না বলিয়া তিনি নক্ষত্রালোকে বাহির হইয়া পড়িলেন এবং নিজের নৌকায় চলিয়া গেলেন। আমরাও নদীর নিস্তব্ধতার মধ্যে পরস্পরের নিকট রাত্রির মতো বিদায় লইলাম।

নির্জনবাসের সপ্তাহে এক সন্ধ্যায় আমরা নদীর তীরে বিশাল বৃক্ষগুলির নিচে বসিয়াছিলাম, এবং স্বামীজী নেতৃত্ব’ সম্বন্ধে বলিতেছিলেন। তৎকালীন দুইটি প্রসিদ্ধ ধর্মসমাজের তুলনা করিয়া তিনি প্রসঙ্গ আরম্ভ করিলেন। উহার মধ্যে একটি প্রবর্তকের জীবিতকালেই প্রতিদিন সংখ্যা ও আয়তনে বৃদ্ধি পাইতেছিল, অপরটি ক্রমশঃ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত হইয়া ভাঙিয়া যাইতেছিল। পরিশেষে স্বামীজী বলেন, “আমার বিশ্বাস, নেতা এক জীবনে গড়ে ওঠে না। নেতা জন্মায়। কারণ, সংগঠন বা পরিকল্পনা করা কঠিন নয়। কিন্তু নেতার প্রকৃত লক্ষণ হলো তিনি অত্যন্ত ভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তিগণকে একটা সাধারণ সহানুভূতিসূত্রে একত্র করতে পারেন। আর এ কাজ স্বাভাবিক ক্ষমতাবশে আপনি সম্পন্ন হয়, চেষ্টা করে করা যায় না।”

এই কথার প্রসঙ্গে ক্রমশঃ প্লেটোর কথা উঠিল, এবং একজন প্লেটোর Ideas বা ভাবাদর্শের মতবাদ সম্পর্কে ব্যাখ্যা শুনিতে চাহিলেন। স্বামীজী উহার ব্যাখ্যা করিলেন এবং অবশেষে প্রসঙ্গের উপসংহার করিতে গিয়া উপস্থিত সকলের মধ্যে একজনকে বিশেষভাবে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “সুতরাং দেখতে পাচ্ছ আমরা যা কিছু দেখছি, সবই সেই মহান ভাবের ক্ষীণ বিকাশমাত্র; সেই ভাবসত্তাই কেবল সত্য ও সম্পূর্ণাঙ্গ। কোন এক জায়গায় একটা আদর্শ ত্বং পদার্থ রয়েছে, আর এই জগতে কেবল তাকেই প্রকাশ করবার চেষ্টা চলছে। এই চেষ্টা অনেক বিষয়ে আদর্শের কাছে যেতে পারছে না। তথাপি এগিয়ে চলো। কোন-না-কোনদিন আদর্শকে ধরতে পারবে।”

আর এক উপলক্ষে জীবনের সকল বন্ধন ছিন্ন করা সম্পর্কে স্বামীজীর কোন কথার উত্তরে একজন বলেন, “হিন্দুরা এই জীবনেব হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য যে আকাঙক্ষা বোধ করেন, আমি তা অনুভব করতে পারি না। আমার মনে হয়, নিজের মুক্তিসাধনের চেয়ে যেসকল মহৎ কাজ আমার প্রীতিকর, তাতে সহায়তা করবার জন্য আবার জন্মগ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।” স্বামীজী তৎক্ষণাৎ তীব্রস্বরে উত্তর দেন, “তার কারণ তুমি ক্রমোন্নতির ধারণাটি জয় করতে পার না। কিন্তু বাইরের কোন জিনিসই ভাল হয় না। তারা যেমন আছে, তেমনি থাকে। তাদের ভাল করতে গিয়ে আমরাই ভাল হয়ে যাই।”

এই শেষ কথাটি আমার নিকট বেদবাক্যের ন্যায় মূল্যবান মনে হয়—”তাদের ভাল করতে গিয়ে আমরাই ভাল হয়ে যাই।” এইরূপ, আমার মনে আছে, আলমোড়ায় অবস্থানকালে জনৈক নিরীহ প্রকৃতির প্রৌঢ় ব্যক্তি স্বামীজীর নিকট কর্ম সম্বন্ধে একটি প্রশ্ন করেন। প্রশ্নটি ছিল—যদি কেহ কর্মবশতঃ বলবানকে দুর্বলের প্রতি অত্যাচার করিতে দেখে, তবে তাহার কি করা উচিত? স্বামীজী বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া প্রত্যুত্তরে বলেন, “কেন, বলবানকে উত্তম-মধ্যম প্রহার দেওয়া—এর আর কথা কি আছে? এই কর্ম সম্পর্কে তুমি তোমার নিজের কর্তব্যটুকু ভুলে যাচ্ছ। অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার অধিকার তোমার সর্বদা রয়েছে।”


Scala Santa or Pilate’s Stair case-রোমের ‘ল্যাটারণ প্যালেস’ নামক প্রাসাদের অন্তর্গত সেন্ট জনের গীর্জার উত্তরদিকের বিখ্যাত সোপানাবলী। কথিত আছে, ইহার আটাশটি মার্বেল পাথরের ধাপ এককালে জেরুজালেমে খ্রীস্টের বিচারক পাইলেটের বাড়ির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সিঁড়ি দিয়া মধ্যযুগে নির্মিত পোপেদের পূজাগৃহে উঠা যায়, এবং লোকে হামাগুড়ি দিয়া এই সিঁড়ি আরোহণ করিবার ব্রত গ্রহণ করিয়া থাকে।—অনুঃ