পাশ্চাত্য পাঠক-পাঠিকাগণের প্রতি নিবেদন

বৌদ্ধধর্মের প্রচারযুগের অবসান হইবার পর হইতে ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে যেদিন স্বামী বিবেকানন্দ গৈরিকধারী সন্ন্যাসীর বেশে শিকাগো প্রদর্শনীর অন্তর্গত ধর্মমহাসভার মঞ্চে দণ্ডায়মান হন, সেদিন পর্যন্ত হিন্দুধর্ম নিজেকে প্রচারশীল ধর্ম বলিয়া ভাবে নাই।  হিন্দুধর্মের শিক্ষকতা কার্যই যাহাদের নির্দিষ্ট বৃত্তি ছিল, সেই ব্রাহ্মণগণ ছিলেন নাগরিক ও গৃহস্থ এবং সেজন্য হিন্দুসমাজেরই এক অঙ্গস্বরূপ ছিলেন, ফলে সমুদ্রযাত্রার অধিকার হইতেও তাহারা বঞ্চিত ছিলেন।  আর সিদ্ধপুরুষ বা অবতার পুরোহিত ও পণ্ডিতগণ অপেক্ষা যতটা উচ্চে অবস্থিত, হিন্দুধর্মের অন্তর্গত পরিব্রাজক সন্ন্যাসিগণের মধ্যে যাহারা উচ্চতম অধিকারী, প্রামাণ্য হিসাবে যদিও তাহাদের স্থান ব্রাহ্মণজাতি অপেক্ষা ঠিক ততটাই উচ্চে — তথাপি তাঁহারা স্বাধীনতার ঐ প্রকার ব্যবহারের কথা আদৌ ভাবিতে পারেন নাই।  স্বামী বিবেকানন্দও নিজ বিশ্বস্ততাজ্ঞাপক কোন পরিচয়-পত্র লইয়া শিকাগোর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হন নাই।  যেমন তিনি ভারতের এক গ্রাম হইতে অন্য গ্রামে ভ্রমণ করিতে পারিতেন, ঠিক তেমনভাবেই তাহার মাদ্রাজের জনকয়েক অনুরাগী ও শ্রদ্ধাবান শিষ্যের আগ্রহে প্রশান্ত মহাসাগরের অপর পারে আগমন করেন।  আমেরিকাবাসিগণও স্বজাতিসুলভ আতিথ্য ও সরলতাগুণে তাহাকে সমাদরে গ্রহণপূর্বক বক্তৃতা দিবার সুযোগ দেন। যেমন বৌদ্ধপ্রচারকগণের ক্ষেত্রে, তেমন তাহার ক্ষেত্রেও এক মহাপুরুষের শক্তিই তাহাকে জোর করিয়া বিদেশে প্রেরণ করে — যে মহাপুরুষের চরণপ্রান্তে বহু বৎসর বাস করিয়া তিনি তাহার জীবনের সঙ্গিস্বরূপ হইয়াছিলেন। তথাপি পাশ্চাত্যদেশে তিনি কোন বিশেষ আচার্যের কথা বলেন নাই, কোন এক সীমাবদ্ধ সম্প্রদায়ের মত ঘোষণা করেন নাই।  “হিন্দুগণের ধর্ম সম্বন্ধীয় ধারণাবলী” — ইহাই ছিল তাহার শিকাগো বক্তৃতার বিষয়; এবং ইহার পরেও, যে সকল তত্ত্ব বহু অংশে বিভক্ত সনাতন হিন্দুধর্মের সাধারণ সম্পত্তি এবং বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক, কেবল সেইগুলিই তাহার বক্তৃতায় স্থান পাইত।  সুতরাং ইতিহাসে এই প্রথম একজন অতি উচ্চদরের মনীষাসম্পন্ন হিন্দু, অন্য সকল বিষয় পরিহারপূর্বক হিন্দুধর্মকেই বিশ্লেষণ ও উহার বিশ্লিষ্ট-অংশগুলির সাধারণ ধর্ম আবিষ্কার করিতে যত্নপর হন।

স্বামীজী ১৮৯৫ খ্রীস্টাব্দের আগস্ট মাস পর্যন্ত আমেরিকায় অবস্থান করেন এবং তারপর প্রথমবার ইউরোপে আগমন করেন।  সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ইংলণ্ডে উপনীত হন এবং প্রায় একমাস পরে লণ্ডনে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন।