দশম পরিচ্ছেদ
কলিকাতা ও স্ত্রীভক্ত-পরিবার

স্বামীজীর এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল। যাহারা তাহার নিকট অবস্থান করিতেন, তাহাদের সকলকে তিনি বড় করিয়া তুলিতেন। তাহার সান্নিধ্যে প্রত্যেকে নিজ নিজ জীবনের অনভিব্যক্ত মহৎ উদ্দেশ্য যেন দেখিতে পাইত এবং দেখিয়া উহাকে ভালবাসিত; আর দোষ-ত্রুটিগুলি দেখিতে পাইলে মনে হইত, ঐগুলি বিশেষ দোষাবহ নহে—উহাদেরও যেন যথেষ্ট কারণ আছে। বলা বাহুল্য, জাগতিক বস্তুজ্ঞানের ব্যাপারে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য থাকে। কেহ কেহ মানুষের দৈহিক গঠন এবং কার্যকলাপই দেখিতে পায়, এবং বুঝিতে পারে। কেহ বা তাহার আকৃতি পরীক্ষা দ্বারা নির্দেশ করে সাধারণভাবে সে কোন্ শ্রেণীভুক্ত, এবং তাহার বাহ্য অবয়বে বিভিন্ন জটিল ভাবপ্রবাহের ঘাত-প্রতিঘাতের চিহ্ন দেখিতে পায়। কিন্তু এমন কিছু মানুষও আছেন, যাহারা মানব জীবনের পশ্চাতে অবস্থিত অসংখ্য কারণপরম্পরার সমাবেশ সম্পর্কে অবহিত—প্রত্যেকটি জীবন উহাদের এক খণ্ড পরিণাম মাত্র। আমাদের কথা ও কার্য কতটা জ্ঞানের বহির্বিকাশ, তাহা আমরা নিজেরা অনুমান করিতে পারি না।

১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে কলিকাতায় আসিবার পরে স্বামীজীর শিষ্যারূপে আমি যে জগতের মধ্যে প্রবেশ করিলাম, তাহার সম্বন্ধে আমার ক্রমলব্ধ অভিজ্ঞতা কতকটা পূর্বোক্ত ধরনের। ঐ দিন হইতে পরবর্তী জুলাই মাস পর্যন্ত আমি তাঁহাকে সর্বদা তাঁহার স্বদেশবাসিগণের মধ্যেই দেখিতে পাইতাম। এমনকি, সেখানে কোন ভক্ত ইউরোপীয় পরিবারের ব্যবধান পর্যন্ত ছিল না। আমিও তাঁহাদের একজন বলিয়া গণ্য হইলাম, এবং স্বামীজীর প্রতিভাসৃষ্ট অনুকূল পরিবেশের মধ্যে বাস করিতে লাগিলাম। এইরূপে, প্রতিপদে তাহারই ভাবরাজি দ্বারা পরিবৃত, তাঁহারই প্রগাঢ় স্বজাতিপ্রেমের দ্বারা প্রভাবিত হইয়া আমি যেন কোন দেবলোকের স্নিগ্ধ জ্যোতির মধ্যে বিচরণ করিতে লাগিলাম, যেখানে প্রত্যেক নরনারীর আকৃতি তাহাদের স্বভাবের অপেক্ষা বড় হইয়া দেখা দিত।

প্রথম হইতেই স্থির ছিল যে, যত শীঘ্র সম্ভব সুবিধামত, আমি কলিকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় খুলিয়া দিব। স্বামীজীর কার্যপ্রণালীর বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, কার্য আরম্ভ করিবার জন্য কোনরূপ তাড়া না দিয়া ভ্রমণ এবং মানসিক প্রস্তুতির জন্য তিনি আমাকে যথেষ্ট অবকাশ দিয়াছিলেন। আমি বেশ জানিতাম, বিদ্যালয়টি খোলা হইলে উহা প্রথমে সাময়িক ও পরীক্ষামূলক হইবে। আমাকে প্রথমে মেয়েদের প্রয়োজন সম্পর্কে জানিতে হইবে, আমার স্থান কোথায় তাহা নির্ধারণ করি৩ হইবে, এবং যে সমাজের উন্নতিকল্পে আমার সমগ্র প্রচেষ্টা প্রয়োগ করিব, তাহার সম্বন্ধেও বিশেষ জ্ঞান প্রয়োজন। একটি মাত্র জিনিস আমার জানা ছিল, তাহা হইল, শিক্ষাসংক্রান্ত সকল প্রচেষ্টা অবশ্যই শিক্ষার্থীর বিদ্যাবুদ্ধি অনুযায়ী আরম্ভ হওয়া চাই; এবং যাহাতে সে নিজের ভাবে উন্নতি করিতে পারে, সেজন্য তাহাকে সাহায্য করিতে হইবে। আমাকে শিক্ষাবিষয়ক এমন একটি উপায় আবিষ্কার করিতে হইবে, যাহা ভারতীয় নারী-সমাজের আধুনিক শিক্ষার যথার্থ উপযোগী এবং সর্বাবস্থায় কার্যকরী হয়। ইহা ব্যতীত আমার কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অথবা প্রত্যাশা ছিল না।

সম্ভবতঃ অনেকে এ বিষয়ে আমার অপেক্ষা অনেক বেশি চিন্তা করিয়াছিলেন; এবং প্রায়ই শুনিতাম, সকল সম্প্রদায়ের গণ্ডির উর্ধ্বে থাকাই আমার পক্ষে বাঞ্ছনীয়। কিন্তু একদিন সন্ধ্যাকালে কাশ্মীরে বেরনাগ বনের তাঁবুতে এই সকল প্রশ্নের শেষ মীমাংসা হইয়া গেল। আমরা একখানা জ্বলন্ত গুড়ির চারিপাশে উপবিষ্ট ছিলাম, সহসা স্বামীজী আমার দিকে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বিদ্যালয় সম্পর্কে এখন তুমি কি করবে ভাবছ?” আমি সাগ্রহে উত্তর দিলাম, “আমি চাই আমার কোন সহকারী না থাকেন। অতি সামান্যভাবে কাজের আরম্ভ হবে, এবং ছোট ছেলেমেয়ে যেমন বানান করে পড়তে শেখে, আমিও ক্রমে ক্রমে নিজের প্রণালী ঠিক করে নেব। তাছাড়া, আমার ইচ্ছা, এই শিক্ষার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধর্মভাব থাকে। আমার মনে হয়,সাম্প্রদায়িক ভাব বিশেষ উপকারী।”

স্বামীজী মনোযোগ দিয়া সব কথা শুনিলেন এবং মানিয়া লইলেন; এবং যেহেতু আমার কোন ইচ্ছাতে তিনি কখনও বাধা দিতেন না, এখানেও তাহাই হইল। অতঃপর তিনি যেন আমার শিষ্য এবং আমি তাহার শিক্ষক হইলাম! কেবল একটি বিষয়ে তিনি দৃঢ় রহিলেন। ভারতীয় নাবীগণেব যে শিক্ষাকার্যে তাহার নাম জড়িত থাকিবে, আমি ইচ্ছামত তাহা সাম্প্রদায়িক করিতে পারি—আমার উক্তির এই অংশের উওব তিনিকেবল বলিলেন, “একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মাধ্যমে তুমি সকল সম্প্রদায়ের বাইরে যেতে চাও।” একজন মহিলা আমার কার্যে সাহায্য করিতে প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু তাহার সম্বন্ধে আমি বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করিবামাত্র তিনি সে নাম প্রত্যাহার করিয়া লইলেন। কিন্তু ইতিপূর্বে যে অল্প কয়েকজনের সহিত আমার পরিচয় ঘটিয়াছিল, তাহাদের সহায়তা লইবার প্রস্তাব তিনি কিছুতেই সমর্থন করিলেন না। ভাবতীয় চরিত্রের সমুদ্রতুল্য গভীরতা মাপ করিবার কোন যন্ত্র তখনও পর্যন্ত আমার নিকট ছিল না, সুতরাং প্রথম হইতেই ভুল করা অপেক্ষা কাহাবও সাহায্য না লইয়া অগ্রসর হওয়া তাহার মতে শতগুণ নিরাপদ।

এই পরিকল্পনা কার্যে পরিণত করিবার জন্য আমি নভেম্বর মাসের প্রথমে একাকী কলিকাতায় পৌঁছিলাম। স্টেশন হইতে শহবের উত্তর প্রান্তে রাস্তা চিনিয়া যাইতে সমর্থ হইলাম। যাহারা দ্বীপে বাস করেন, তাহারা স্বভাবতই কতকটা সামাজিক কঠোরতার পক্ষপাতী। বোধ হয় সেই কারণে আমি মহিলাগণের সহিত এক বাস করিবার জন্য জেদ করিতে লাগিলাম। ঘটনাক্রমে, স্বামীজী সেই সময় কলিকাতায় এক বিশিষ্ট ভক্তের গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন। তাহারই মাধ্যমে কথাবার্তা চলিতে লাগিল। শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী সারদা দেবী’ অথবা ভক্তগণের পরমারাধ্যা শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী স্ত্রীভক্তগণসহ নিকটে বাস করিতেন। সেইদিনই আমি তাহার নিকট একটি কক্ষে বাস করিবার অনুমতি লাভ করি। আমাদের জীবনে এমন কতকগুলি ঘটনা ঘটে, যাহাদের প্রতি বহুদিন পরে পিছন ফিরিয়া তাকাইলে বুঝিতে পারা যায় যে, তৎকালীন সাহস আমাদের অজ্ঞতারই ফল। বলা যায়, ইহা বিধাতারই কৃপা। কারণ, ইহা ব্যতীত অন্য কোন প্রকারে ঐ সকল সমস্যার সমাধান হওয়া কঠিন ছিল। আবার একটা কিছুসমাধান করা ব্যতীত গত্যন্তরও ছিল না। তথাপি, যদি আমি ঐ সময় যথার্থ হৃদয়ঙ্গম করিতাম যে, আমার এই হঠকারিতা কেবল আমার নিরপরাধ আশ্রয়দাত্রীকে নহে, পরন্তু সুদূর পল্লীগ্রামে তাহার আত্মীয় কুটুম্বগণকেও সামাজিক গোলযোগের মধ্যে ফেলিবে, তাহা হইলে আমি কখনই ঐরূপ আচরণ করিতাম না। সেরূপ ক্ষেত্রে আমি যেভাবে হউক, ঐ সঙ্কল্প হইতে নিবৃত্ত হইতাম। কিন্তু যেহেতু আমার ধারণা ছিল, জাতিভেদ ব্যক্তিগত নির্বোধ কুসংস্কার মাত্র—বিদেশী মাত্রেই অনাচারী, এইরূপ ভ্রান্ত ধারণাই উহার কারণ, এবং প্রকৃত সত্যের উদঘাটনে উহার অবসান হইবে—অতএব সব অজ্ঞতা তাহার উপর চাপাইয়া হৃষ্টচিত্তে জোর করিয়া আমি এই ভারতীয় মহিলার গৃহে অতিথি হইলাম।

সৌভাগ্যক্রমে এই ব্যাপারে স্বামীজীর প্রভাব সবার উপরে জয়ী হইল—এবং আমি সমাজে গৃহীত হইলাম। আট-দশ দিনের মধ্যেই অতি নিকটে একটি বাড়ি পাওয়া গেল। কিন্তু তখনও আমি প্রতি অপরাহু শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর ঘরেই কাটাইতাম। গ্রীষ্মকাল আসিলে তাহার বিশেষ আদেশে বিশ্রামের জন্য তাহার গৃহেই আসিতাম। সেখানে অপেক্ষাকৃত ভাল ব্যবস্থা ছিল। আমার জন্য আর পৃথক কক্ষ নির্দিষ্ট ছিল না, অপর সকলের সহিত শীতল ও সাদাসিধা ঘরটিতেই শয়ন করিতাম। পালিশ করা লাল মেঝের উপর সারি সারি মাদুর বিছানো, তাহার উপর এক-একটি বালিশ ও মশারি।

আমি যে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হইলাম, তাহা এক অভূত ধরনের। একতলায় প্রবেশ পথে দুই দিকে দুটি ঘর ছিল। একটি ঘরে এক সাধু বাস করিতেন। যৌবনের প্রারম্ভ হইতে কঠিন তপস্যার ফলে ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হইয়া পূর্ণ যৌবনেই তিনি মৃত্যুর দ্বারে উপস্থিত। বাংলা শিখিবার জন্য আমি তাহার ঘরে যাইতাম। পিছনের রন্ধন কক্ষে তাহার এক শিষ্য এবং এক ব্রাহ্মণ পাচক কাজকর্ম করিতেন। ছাদ ও বারান্দা সমেত সমস্ত উপরতলা আমাদের মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। অদূরেই গঙ্গা; উপর তলা হইতে গঙ্গদর্শন হইত।

আমাদেব ক্ষুদ্র সংসারটির কী সম্বন্ধে কিছু বলিতে যাওয়া ধৃষ্টতা বলিয়াই মনে হয়। তাহার কথা সকলেই জানেন। পাঁচ বৎসর বয়সে তাহার বিবাহ হয়, কিন্তু বিবাহের পর আঠারো বৎসর বয়স পর্যন্ত স্বামী তাহার কথা ভুলিয়া যান। পরে মাতার অনুমতি লইয়া পল্লীগ্রাম হইতে পদব্রজে গঙ্গাতীববর্তী দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়িতে স্বামিসকাশে উপস্থিত হইলে পতির দাম্পত্যবন্ধনের কথা স্মরণ হইল। কিন্তু তিনি জীবনের যে আদর্শ গ্রহণ করিয়াছেন তাহার কথা বলিলেন। পত্নীও প্রত্যুত্তরে দাতার সহিত তাহার ঐ জীবনে সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করি কেবল শিষ্যার ন্যায় তাহার নিকট শিক্ষালাভের প্রার্থনা জানাইলেন। তাঁহার জীবনের এই সকল ঘটনা আমরা পুর্বে বহু বার শুনিয়াছি। তখন হইতে সেই উদ্যানেরই একটি গৃহে বহু বৎসর তিনি স্বামীর নিকট পতিতা স্ত্রীর ন্যায় বাস করেন। একাধারে ধর্মপত্নী ও সন্নাসিনী, আবার শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্যগণের মধ্যে তিনিই সর্বদা সর্বশ্রেষ্ঠ। শিক্ষা-আরম্ভকালে তাহার বয়স ছিল অল্প; পরে কথাপ্রসঙ্গে কখন কখনও তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষাদান কত বিভিন্নমুখী ছিল তাহাব উল্লেখ কবিতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সব জিনিস গুছাইয়া বাখাব পক্ষপাতী ছিলেন এবং নিতান্ত তুচ্ছবিষয়েও তাহাকে শিক্ষা দিতেন—যেমন প্রদীপ জ্বালিবার সাজসরঞ্জাম দিনের বেলায় কোথায় রাখিতে হইবে। কোন বিষয়ে অপরিচ্ছন্নতা তিনি সহ্য কবিতে পাবিতেন না, এবং উগ্র কঠোরতা সত্ত্বেও লালিত্য, সোন্দর্য ও চালচলনে শান্ত-গাম্ভীর্য পছন্দ করিতেন। শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর সম্বন্ধে এই কালের একটি গল্প শুনা যায়। একদিন তিনি আনন্দে উৎফুল্ল শিশুর ন্যায় আগ্রহ ও গর্বের সহিত একঝুডি ফলমূল শ্রীরামকৃষ্ণেব নিকট আনয়ন করিলে, তিনি গম্ভীরভাবে উহার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “কিন্তু এত বেশি বেশি কেন?” অপ্রত্যাশিত নিরাশায় বালিকা পত্নীর সমস্ত আনন্দ অন্তর্হিত হইয়া গেল। “অন্ততঃ এ-সব আমার জন্য নয়” –এই মাত্র বলিয়া তিনি নীরবে অশ্রুপূর্ণ চক্ষে চলিয়া গেলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কিন্তু এই দৃশ্য সহ্য করিতে পারিলেন না। নিকটে যে সব বালক বসিয়াছিল, তাহাদের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “ওকে ফিরিয়ে নিয়ে এস। ওকে কাঁদতে দেখলে আমার ঈশ্বরভক্তি পর্যন্ত উড়ে যাবে।”

তিনি তাহার এত প্রিয় ছিলেন! তথাপি শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর একটি উল্লেখযোগ্য গুণ এই যে, তাহার আরাধ্য পতির সম্পর্কে কথা বলিবার সময় তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করিয়া রাখেন তিনি যেন কেহই নহেন। তাহার সকল ভক্তই বলেন যে, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রত্যেকটি বাক্য যে সত্য হইবে, এ বিষয়ে শ্রীশ্রীমা সম্পদে-বিপদে ‘অটল সুমেরুবৎদৃঢ়। গুরুদেব শ্রীগুরু’ বলিয়া তিনি তাহার উল্লেখ করেন, তাহার কথাবার্তায় এমন একটি শব্দ কদাপি থাকে না, যাহাতে, ‘আমি তাহার অমুক’ এই বলিয়া কোন আত্ম-অধিকার প্রকাশ পায়। তাহার পরিচয় জানে না, এমন কেহ তাহার কথাবার্তা হইতে বিন্দুমাত্র অনুমান করিতে পারিবে না যে, উপস্থিত অপর সকলের অপেক্ষা শ্রীরামকৃষ্ণের উপর তাহার অধিকতর স্বত্ব বা দাবী আছে, অথবা তাহাদের অপেক্ষা তাঁহার সম্পর্ক নিকটতর। মনে হয়, পূর্বের ন্যায় পত্নীর নিষ্ঠাটুকু ব্যতীত পত্নীভাব তাহার মধ্য হইতে বহুকাল চলিয়া গিয়াছে—সেখানে আছে শুধু ‘আমি শিষ্যা’ এইভাব। তথাপি সকলে তাহাকে এরূপ প্রগাঢ় ভক্তি করিয়া থাকেন যে, তাহার সহিত একত্র ভ্রমণকালে রেলগাড়িতে কেহই তাহার বেঞ্চির উপরের বার্থে আরোহণ করিবেন না। একটি মাত্র দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা হইল। তাহার উপস্থিতিই সকলের নিকট পরম পবিত্রতাস্বরূপ।

আমার সব সময় মনে হইয়াছে, তিনি যেন ভারতীয় নারীর আদর্শ সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণের শেষ বাণী। কিন্তু তিনি কি একটি পুরাতন আদর্শের শেষ প্রতিনিধি, অথবা কোন নূতন আদর্শের অগ্রদূত? তাহার মধ্যে দেখা যায়, অতি সাধারণ নারীরও অনায়াসলভ্য জ্ঞান ও মাধুর্য; তথাপি আমার নিকট তাহার শিষ্টতার আভিজাত্য ও মহৎ উদার হৃদয় তাহার দেবীত্বের মতোই বিস্ময়কর মনে হইয়াছে। কোন প্রশ্ন যত নূতন বা জটিল হউক না কেন, উদার ও সহৃদয় মীমাংসা করিয়া দিতে তাহাকে ইতস্ততঃ করিতে দেখি নাই। তাহার সমগ্র জীবন একটানা নীরব প্রার্থনার মতো। তাহার সকল অভিজ্ঞতার মূলে আছে বিধাতার মঙ্গলময় বিধানে বিশ্বাস। তথাপি তিনি সর্বপ্রকার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উর্ধ্বে বিরাজ করেন। তাহার পরিবারের কেহ যদি দুবুদ্ধিবশতঃ তাহাকে পীড়ন করে, তবে তাহার মধ্যে এক অদ্ভুত শান্ত ও প্রগাঢ়ভাব প্রকাশ পায়। তাহার বুদ্ধির অতীত কোন নূতন সামাজিক ব্যবস্থা হইতে উদ্ভূত জটিল চক্রে আবর্তিত অথবা উৎপীড়িত হইয়া কেহ যদি তাহার নিকট আসে, তিনি তৎক্ষণাৎ অভ্রান্ত অন্তদৃষ্টিসহায়ে প্রকৃত তথ্য হৃদয়ঙ্গম করিয়া প্রশ্নকর্তাকে বিপদ হইতে উদ্ধারের পথ নির্দেশ করেন। যদি কোন কারণে কঠোর হইবার প্রয়োজন হয়, অর্থহীন ভাবপ্রবণতার দ্বারা তিনি কদাপি বিচলিত হইয়া ইতস্ততঃ করিবেন না। কোন ব্রহ্মচারীকে মাধুকরী করিয়া এত বৎসর কাটাইতে হইবে বলিয়া আদেশ দিলে, তাহাকে এক ঘণ্টার মধ্যে সে স্থান ত্যাগ করিতে হইবে। কোন ব্যক্তি তাহার সামনে শ্লীলতার ও মর্যাদার সীমা অতিক্রম করিলে আর কখনও তাহাকে মুখ দেখাইতে পারিবে না। এই ধরনের অপরাধ করিয়াছিলেন এমন এক ব্যক্তিকে শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়াছিলেন, “দেখতে পাচ্ছ না, তুমি ওর নারীত্বকে আঘাত করছ? এরূপ করা মহা অনর্থকর।”

তথাপি তাহার জনৈক শিষ্যা সঙ্গীতে তাহার সহজাত ক্ষমতা সম্বন্ধে যাহা বলেন, বাস্তবিক তাহার প্রকৃতি সেইরূপ সঙ্গীতে ভরপুর’, কোমলতা ও কৌতুকে পূর্ণ। আর তাঁহার পূজার কক্ষটি সত্যই মাধুর্যে পূর্ণ।

শ্রীশ্রীমা পড়িতে জানেন, এবং তাহার অধিকাংশ সময় রামায়ণপাঠে অতিবাহিত হয়। তিনি লিখিতে পারেন না। কিন্তু কেহ যেন মনে না করেন, তিনি অশিক্ষিত স্ত্রীলোক মাত্র। দীর্ঘকাল ধরিয়া তিনি শুধু সংসার পরিচালনা এবং ধর্মজগৎ সম্পর্কে কঠোর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছেন তাহা নহে; ভারতবর্ষের অধিকাংশ স্থান তিনি ভ্রমণ করিয়াছেন এবং প্রায় সমস্ত প্রধান তীর্থগুলি দর্শন করিয়াছেন। আর মনে রাখিতে হইবে, শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণীরূপে ব্যক্তিগত চরিত্রে যতখানি উৎকর্ষ লাভ সম্ভব, তিনি তাহার পূর্ণ সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন। প্রতি মুহূর্তে তিনি অজ্ঞাতসারে এই মহাপুরুষ-সংসর্গের পরিচয় দিয়া থাকেন। কিন্তু কোন নূতন ধর্মীয় ভাব বা অনুভূতিকে মুহূর্ত মধ্যে হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইবার ক্ষমতার মধ্যেই ইহার যেরূপ সুস্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়, এমন আর কিছুতেই নহে।

কয়েক বৎসর পূর্বে একবার ঈস্টারের দিন অপরাহ্নে তিনি যখন আমাদের গৃহে পদার্পণ করেন, তখন আমি শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর মধ্যে এই শক্তির প্রথম পরিচয় পাই। ইতিপূর্বে যখনই তাঁহার নিকট গিয়াছি, জীবনে তিনি যে আদর্শ স্থাপন করিয়াছেন, তাহা আয়ত্ত করিবার চেষ্টায় একান্তভাবে তন্ময় থাকিতাম। বিপরীত অবস্থায় তাঁহাকে লক্ষ্য করিবার কথা ভাবি নাই। যাহা হউক, ঐ দিন শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ও তাহার সঙ্গিনীগণ আমাদের সমস্ত বাড়িটি ঘুরিয়া দেখিবার পরে ঠাকুরঘরে গিয়া বসিবার এবং খ্রীস্টানদের এই উৎসবের অর্থ শুনিবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অতঃপর আমাদের ক্ষুদ্র ফরাসী অর্গ্যান সহযোগে ইস্টাব দিনের গান-বাজনা হইল। খ্রীস্টের পুনরুত্থানসম্পৰ্কীয় স্তোত্রগুলি বিদেশী এবং শ্রীশ্রীমার সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাত, তথাপি উহাদের সূক্ষ্ম মর্মগ্রহণ ও গভীর সহানুভূতি প্রকাশের মধ্যে আমরা সর্বপ্রথম ধর্মজগতে শ্রীসারদাদেবীর অসাধারণ উন্নতিলাভের এক অতীব হৃদয়গ্রাহী চিত্র দেখিতে পাইলাম। শ্রীরামকৃষ্ণের স্পর্শলাভে ধন্য শ্রীশ্রীমার অন্তরঙ্গ স্ত্রীভক্তগণের মধ্যেও কিছু পরিমাণে এই শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু তাহার শক্তির মধ্যে যে দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তা আছে, তাহা কেবল উচ্চদরের সুগভীর পাণ্ডিত্যেই দেখা যায়।

আর এক সন্ধ্যায় তাহার এই বৈশিষ্ট্যের পরিচয় আমরা পাইয়াছিলাম। অল্প কয়েকজন অন্তরঙ্গ স্ত্রীভক্তপরিবৃত হইয়া তিনি বসিয়াছিলেন, এমন সময়ে আমাকে ও আমার গুরুভগিনীকে ইউরোপের বিবাহ-অনুষ্ঠান বর্ণনা করিতে বলেন। যথেষ্ট হাস্য ও কৌতুকের সহিত তাহার নির্দেশমতো আমরা একবার পুরোহিতের, পরক্ষণে বরকন্যার ভূমিকা অভিনয় করিয়া দেখাইলাম। কিন্তু বিবাহের শপথ বাক্য শ্রবণে মাতাঠাকুরানীর চিত্তে যে ভাবের উদয় হইল, তাহার জন্য আমরা কেহই প্রস্তুত ছিলাম না।

“সম্পদে-বিপদে, ঐশ্বর্যে-দারিদ্র্যে, রোগে-স্বাস্থ্যে—যাবৎ মৃত্যু আমাদের বিচ্ছিন্ন করে”—এই কথাগুলি শুনিয়া উপস্থিত সকলেই আনন্দ প্রকাশ করিয়া উঠিলেন। কিন্তু শ্রীশ্রীমার মতো অপর কেহই ঐ কথাগুলির যথার্থ মর্ম গ্রহণ করিতে পারেন নাই। বারংবার তিনি ঐ কথাগুলি আবৃত্তি করাইলেন এবং বলিলেন, “আহা, কি অপূর্ব ধমভাবের কথা! কি ন্যায়পূর্ণ কথা!”

শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর গৃহে এই সময়ে প্রায় সর্বদা যে সকল মহিলা বাস করিতেন—গোপালের মা, যোগীন-মা, গোলাপ-মা, লক্ষ্মীদিদি প্রভৃতি এবং আরও কয়েকজন তাহাদের অন্যতম। ইহারা সকলেই বিধবা; গোপালের মা এবং লক্ষ্মীদিদি আবার বালবিধবা ছিলেন; ইহারা সকলেই ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ শিষ্যা—যে সময়ে তিনি দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে বাস করিতেন সেই সময়ের। লক্ষ্মীদিদি ছিলেন তাহার ভ্রাতুস্পুত্রী, অপেক্ষাকৃত অল্পবয়স্কা। অনেকে তাহার নিকট দীক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করিয়া থাকেন। প্রকৃতই তিনি বিশেষ গুণসম্পন্না, এবং কথাবার্তার দ্বারা অপরকে আকৃষ্ট করিতে পারেন। কখনও তিনি কোন যাত্রার পালা হইতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ধর্মভাবপূর্ণ কথোপকথন আবৃত্তি করেন, কখনও বা বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি নকল করিয়া নীরব কক্ষ হাস্যমুখরিত করিয়া তোলেন। একবার হয়তো কালীমূর্তি ধারণ করিলেন, পরক্ষণেই সরস্বতীমূর্তি, কখনও বা জগদ্ধাত্রী, আবার হয়তো বা কদম্বতলে শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি এবং নাটকীয় উপাদানের স্বল্পতা সত্ত্বেও ঐ সকলের দ্বারা বেশ আসর জমাইয়া তুলিতেন।

শুনা যায়, এই প্রকার আমোদ-প্রমোদ শ্রীরামকৃষ্ণেরও অনুমোদিত ছিল। স্ত্রীভক্তগণের নিকট শুনিয়াছি, তিনি নিজেই ধর্মমূলক কোন নাটক, ঘণ্টা পর ঘণ্টা আবৃত্তি করিয়া যাইতেন, পর্যায়ক্রমে নাটকের প্রত্যেক পাত্রের ভূমিকা অভিনয় করিয়া কাব্যনিহিত স্তব ও পূজার গৃঢ় মর্ম সমবেত সকলকে হৃদয়ঙ্গম করাইতেন।

গোপালের মা ছিলেন অতি বৃদ্ধা। পনের কুড়ি বৎসর পূর্বে যখন তিনি তাঁহার কামারহাটির গঙ্গাতীরে অবস্থিত কুটির হইতে একদিন মধ্যাহ্নে পদব্রজে দক্ষিণেশ্বব উদ্যানে শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রথম দর্শন করিতে আসেন, তখনই তিনি বার্ধক্যে উপনীত। শুনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ নিজ কক্ষের দরজায় দাঁড়াইয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করেন—যেন তিনি তাহার প্রতীক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘকাল ধরিয়া গোপালের মা বালগোপাল মূর্তির উপাসনা করিতেন, শ্রীরামকৃষ্ণের সমীপবর্তী হইবামাত্র তাহার মধ্যে তিনি নিজের ইষ্টমূর্তি দর্শন করেন। এই বিষয়ে সর্বদা, তাঁহার কি অপবিসীম নিষ্ঠাই ছিল! শ্রীরামকৃষ্ণ তাহাকে মাতারূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন, এবং ইহার পর গোপালের মা তাহার জীবিতকালে কদাপি শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করেন নাই। শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর উল্লেখকালে ‘বউমা’ ছাড়া তাহাকে অপর শব্দ প্রয়োগ করিতে শুনি নাই।

শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ও তাহার স্ত্রীভক্তগণের সঙ্গে আমি যে কয়মাস অতিবাহিত করি, তাহার মধ্যে গোপালের মা কখনও কলিকাতায় অবস্থান করিতেন, কখনও বা কয়েক সপ্তাহ কামারহাটিতেই কাটাইতেন। এক পূর্ণিমা রজনীতে আমরা কয়েকজন তাঁহাকে দর্শন করিতে যাই। ক্ষুদ্র নৌকাখানি যখন ধীর গতিতে অগ্রসর হইতে লাগিল, তখন গঙ্গাবক্ষে কি অপূর্ব লোভা! জলের মধ্য হইতে যে দীর্ঘ সোপানশ্রেণী উঠিয়া গিয়াছে, এবং উচ্চ মানের ঘাট, শম্পাবৃত প্রাঙ্গণ অতিক্রম করিয়া দক্ষিণের বারান্দা পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে,তাহারই বা কি সুন্দর শোভা! বারান্দার এক প্রান্তে গোপালের মার ক্ষুদ্র কক্ষ সম্ভবতঃ পার্শ্বে অবস্থিত বৃহৎ অট্টালিকার কোন কর্মচারীর জন্য প্রথমতঃ নির্মিত হইয়াছিল। এই ক্ষুদ্র কক্ষে গোপালের মা জপে মগ্ন থাকিয়া বহু বর্ষ কাটাইয়াছেন। বৃহৎ অট্টালিকা এখন জনশূন্য। গোপালের মার ছোট ঘরটিতে আসবাবপত্রের কোন বালাই নাই। ঘরের পাথরের মেঝেই তাহার শয্যা। অতিথিদের বসিতে দিবার জন্য যে মাদুর পাতিয়া দিলেন, তাহা তাকের উপব গুটানে ছিল। শিকায় ঝুলানো মাটির পাত্র হইতে মুড়ি ও বাতাসা পাড়িয়া খাইতে দিলেন। অতিথিদের সংবর্ধনা করিতে উহাই তাহার একমাত্র সম্বল। কিন্তু জায়গাটি নিখুঁতভাবে পরিষ্কার; তিনি নিজেই কষ্ট করিয়া গঙ্গাজল আনিয়া সর্বদা ধুইয়া রাখেন। হাতের কাছে কুলুঙ্গীতে একখানি অতি পুরাতন রামায়ণ, তাহার বৃহৎ জীর্ণ চশমা ও হরিনামের ঝুলি। এই মালা জপ করিয়াই গোপালের মা সিদ্ধিলাভ করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, কত দীর্ঘ বৎসর তিনি দিবারাত্র ঐ মালা জপে তন্ময় হইয়া থাকিতেন।

শুভ্র চন্দ্রালোকে বাহিরের নানাবিধ বৃক্ষ ও পুষ্পরাজিকে মনে হইতেছিল কাল কাল ছায়া মূর্তি—যেন শ্বেত মর্মরের স্বপ্নরাজ্যে তাহারা ধীরে ধীরে বিচরণ করিতেছে ও অস্ফুট স্বরে কথা বলিতেছে। কিন্তু আমাদের সদা কর্মব্যস্ত ও চঞ্চল জগতের মধ্যে গোপালের মার এই শান্ত, নীরব ক্ষুদ্র কক্ষটির চিন্তার ন্যায় আর কিছুই যেন স্বপ্নবৎ প্রতীয়মান হইতে পারেনা। ঐ স্থানটি আমরা দর্শন করিয়া আসিয়াছি শুনিয়া স্বামীজী বলিয়াছিলেন, “আহা! তোমরা প্রাচীন ভারতকে দেখে এসেছ, উপাসনা ও অশ্রুবর্ষণ, উপাসনা ও রাত্রিজাগরণ—সে ভারত চলে যাচ্ছে, আর কখনো ফিরে আসবে না।”

কলিকাতার বাড়িতে একজন ইউরোপীয় মহিলার অবস্থানে সম্ভবতঃ অপরের অপেক্ষা গোপালের মার আশী বৎসরের সংস্কারে বিশেষ আঘাত লাগিয়াছিল, ইহাতে অস্বাভাবিক কিছু নাই। কিন্তু একবার ঐ ভাবটিকে জয় করিবার পর তিনি যেন উদারতার প্রতিমূর্তি ছিলেন। রক্ষণশীল তিনি বরাবর ছিলেন, কিন্তু কখনও জেদ করিয়া কুসংস্কার ধরিয়া থাকিতেন না। আমাদের প্রতিদিন যে ভাবে কাটিত, তাহাতে গঙ্গাতীরে অবস্থিত তাহার আশ্রম ও মাতাঠাকুরানীর গৃহে পূজা অর্চনা প্রভৃতি দৈনন্দিন কর্মের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য তিনি বোধ করিতেন না। দিনগুলি ছিল শান্তি ও মাধুর্যে পূর্ণ। সূর্যোদয়ের বহু পূর্বেই সকলে নীরবে শয্যাত্যাগ করিতেন, এবং মাদুর হইতে চাদর ও বালিশ সরাইয়া রাখিয়া মালা হস্তে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরাইয়া জপে বসিতেন। অতঃপর ঘর ঝাট দেওয়া ও স্নান আরম্ভ। বিশেষ বিশেষ দিনে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ও অপর একজন পালকি করিয়া গঙ্গাস্নানে যাইতেন, এবং তাহার পূর্ব পর্যন্ত রামায়ণপাঠে সময় অতিবাহিত হইত।

তারপর শ্রীশ্রীমা নিজের ঘরে পূজায় বসিতেন। অল্পবয়স্কা মেয়েরা দীপ জ্বালা, ধূপ-ধুনা দেওয়া, গঙ্গাজল আনা, এবং পুষ্প, নৈবেদ্য সাজানো প্রভৃতি কার্যে ব্যস্ত থাকিতেন। এমনকি, গোপালের মা পর্যন্ত এই সময়ে ফলমূল ও তরকারি কাটিয়া সাহায্য করিতেন। মধ্যাহ্নভোজনের পর অপরাহ্নে বিশ্রাম। তারপর সন্ধ্যা হইবামাত্র ঝি ঘরে ঘরে প্রদীপ দেখাইত, এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গল্পগুজব থামিয়া যাইত। সকলেই উঠিয়া পড়িতেন, এবং দেবমূর্তি অথবা পটের সামনে প্রণাম করিয়া গোপালের মা ও শ্রীশ্রীমার পাদবন্দনা করিতেন। অথবা ছাদে যেখানে তুলসীতলায় প্রদীপ দেওয়া হইয়াছে, সেখানে শ্রীশ্রীমার সঙ্গে যাইতেন। আর যিনি কন্যার ন্যায় শ্রীশ্রীমার সান্ধ্যধ্যানকালে পার্শ্বে বসিবার অনুমতি লাভ করিয়া তাহার গুরুপ্রণাম শ্রবণ করিতেন, তিনি সত্যই পরম ভাগ্যবতী! শ্রীশ্রীমার প্রতি পূজার প্রথমে ও অন্তে এই গুরুপ্রণাম থাকিত।

ভারতের পরিবারমাত্রই যেন সর্বদা প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠানের মনোহর স্তোত্রগানে রত। তাহার নিকট গৃহস্থালীর প্রত্যেকটি তুচ্ছ কর্ম, বিস্তৃত প্রণালী, দৈহিক শুচিতার অভ্যাস যেন অনির্বচনীয় মূল্যবান ও পবিত্র; জাতির চিরন্তন সম্পদ, সুদুর অতীত হইতে পুরুষানুক্রমে অর্পিত, নিখুঁত অবস্থায় রক্ষা করিয়া উহাকে ভাবী যুগের হস্তে সমৰ্পণ করিতে হইবে। আদর্শ পবিত্রতার তীব্র আকাঙক্ষা ও মাতৃপূজার সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত হইয়া এই চিন্তাপ্রণালী সমগ্র ভারতীয় চরিত্রের একাধারে পরিচালনা ও সংযত করার শক্তিরূপে পরিণত হইয়াছে। প্রাচ্য দেশ সরলতার উপাসক—এবং এই কারণেই কোন ইতরজনোচিত ভাব প্রাচ্য জাতির মধ্যে স্থান পাইতে পারে না।

কিন্তু ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে এই ধরনের রহস্য কেহই আবিষ্কার করিতে পারে; তাহার সহজ কারণ হইল, নিজের মনের পরিধির যথেষ্ট বাহিরে নিজেকে লইয়া যাইবার অক্ষমতা, যাহাতে বুঝিতে পারা যায়, কেবল যে পৃথক পৃথক সংস্কার লইয়া অন্যেরা জন্মগ্রহণ করিয়াছে তাহা নহে, পরন্তু ঐ সকল সংস্কারের মূল্য সম্পর্কে তাহাদের জন্মগত পৃথক ধারণাও আছে।সৌভাগ্যক্রমে স্বামীজীকে লক্ষ্য করিয়া এবং তাহার মধ্যে অজ্ঞাতসারে যে পরস্পরবিরোধী ভাবের প্রকাশ ঘটিত, সেগুলি লইয়া মাথা ঘামাইয়া অবশেষে আমি এই তথ্য আবিষ্কারে সমর্থ হই, এবং ফলে বহু জিনিস আমার নিকট স্বচ্ছ হইয়া যায়। অন্যের অপেক্ষা তিনি বিশেষ অবহিত ছিলেন যে, চরিত্রই সব, অথবা তাহার ভাষায় “দেশাচার কিছুই নয়।” তথাপি যেসব আচার-ব্যবহারের সহিত তিনি ঘনিষ্ঠ পরিচিত ছিলেন, তাহাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করিতে গিয়া কেহই তাহার ন্যায় আত্মহারা হইয়া যাইত না। স্বদেশবাসীর আচার ব্যবহার তিনি কবির দৃষ্টিতে ও ভবিষ্যদ্রষ্টার কল্পনা-সহায়ে দেখিতেন। যে সকল জাতির নারীর মধ্যে বহুবিবাহ প্রচলিত, তাহাদের মধ্যেও আদর্শ নারীচরিত্র ও নিষ্ঠাব পরিচয় বিদ্যমান, এবং পাশ্চাত্য দেশের সান্ধ্য পরিচ্ছদেও যথেষ্ট রুচি ও লজ্জাশীলতার চিহ্ন দেখিয়াই তিনি উপলব্ধি করেন যে,”দেশাচার কিছুই নয়।” কিন্তু এই সব দেখিয়াও স্বদেশের লোকাঁচার বা অনুষ্ঠানের প্রতি তাহার শ্রদ্ধা হ্রাস পায় নাই। বিধবার নিরাভরণ শ্বেত অবগুণ্ঠন ছিল তাহার নিকট শোক এবং সেই সঙ্গে পবিত্রতার চিহ্ন। সন্ন্যাসীর কৌপীনবহির্বাস, মেঝের উপরে মাদুরের শয্যা, থালার পরিবর্তে কলাপাতায় ভোজন, হাত দিয়া আহার এবং জাতীয় পরিচ্ছদ পরিধান—এ সবই তাহার নিকট যথার্থ মহাপবিত্র বলিয়া বোধ হইত। ইহাদের প্রত্যেকটি তাহার নিকট কোন আধ্যাত্মিক শক্তি অথবা মানব হৃদয়ের কোমল ভাবের রহস্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করিয়া আনিত। তাহার কথায় এইগুলির প্রতি এরূপ নিষ্ঠা ও আনুগত্য প্রকাশ পাইত যে, মনে হইত, সম্ভব হইলে তিনি সমগ্র জগৎ জয় করিয়া উহাদের পদানত করিয়া দিতে প্রস্তুত, এবং ব্যর্থ হইলে ভাবিতেন, তাহাদের পরাজয়ে অংশ গ্রহণের মধ্যেই ইহজীবনের স্বর্গসুখ নিহিত।

আমাকেও তিনি এই মধুর সঙ্গীত গাহিতে শিখাইয়াছিলেন; সত্য বটে, ক্ষীণ ও কম্পিতকণ্ঠেতথাপি এই মহান সঙ্গীতের অপরাপর গায়কগণের সহিত কতকটা একসুরে। গাহিতে গাহিতে ঐ সঙ্গীতের মাধ্যমে আমি নিবিষ্টচিত্তে লক্ষ্য করিতে শিখিলাম, কেমন করিয়া একটি জাতির আদর্শ ও হৃদয় রহস্য উদঘাটিত হয়।

১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর হইতে ১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দের জুন পর্যন্ত কয়েকটি মাস বেশ আনন্দে পূর্ণ ছিল। আমার ক্ষুদ্র বিদ্যালয়টি আরম্ভ হয় কালীপূজার দিন। শ্রীশ্রীমা স্বয়ং প্রতিষ্ঠাকালীন পূজাদি সম্পন্ন করিলেন। পূজান্তে তিনি মৃদুস্বরে বিদ্যালয়ের ভাবী ছাত্রীগণের উদ্দেশ্যে আশীর্বাণী করিলেন; গোলাপ-মা স্পষ্ট করিয়া উহা সমবেত সকলকে শুনাইয়া দিলেন, “শ্রীশ্রীমা প্রার্থনা করছেন, যেন এই বিদ্যালয়ের ওপর জগন্মাতার আশীর্বাদ বর্ষিত হয়, এবং এখান থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত মেয়েরা যেন আদর্শ বালিকা হয়ে ওঠে।” কেন জানি না, শ্রীশ্রীমায়ের উচ্চ মন ও হৃদয়ে এই আর কার্যের বিষয় বর্তমান আছে, এবং তিনি ইহার কল্যাণ কামনা করিতেছেন, এইটুকু জানাই আমার নিকট আশীর্বাদস্বরূপ, এবং হৃদয় ভরিয়া গিয়াছিল। ভবিষ্যতের শিক্ষিতা হিন্দু নারীজাতির পক্ষে শ্রীশ্রীমায়ের আশীর্বাদ অপেক্ষা কোন মহত্তর শুভ লক্ষণ আমি কল্পনা করিতে পারি না।

সাধারণতঃ স্বামীজী কলিকাতার বাহিরে তিন-চার মাইল দূরে গঙ্গার অপর তীরে অবস্থিত মঠে বাস করিতেন। কিন্তু প্রায়ই তিনি কলিকাতায় আসিতেন এবং প্রত্যেকবারই মধ্যাহে অথবা সন্ধ্যায় তাহার সহিত আহার করিবার জন্য আমাকে ডাকিয়া পাঠাইতেন। আমার প্রতি যাহারা অনুগ্রহ প্রকাশ করিতেন, তাহাদের তিনি সর্বদাই নিমন্ত্রণ করিয়া বেলুড় মঠে লইয়া যাইবার বিশেষ চেষ্টা করিতেন।

তাহার অতি সামান্য কার্যও অর্থপূর্ণ ছিল, যাহা নূতন লোকের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। একদিন যখন তিনি আমাকে কোন একটি পথ্য প্রস্তুত করিয়া দিতে বলেন, আমি তখন স্বপ্নেও ভাবি নাই যে, ঐ অনুরোধের বিশেষ কোন উদ্দেশ্য ছিল। পরে যখন শুনিলাম, তাঁহার নিকট ঐ পথ্য লইয়া গেলে তিনি উহার সামান্য অংশ স্বয়ং গ্রহণ করিয়া বাকিটা উপস্থিত সকলের মধ্যে ভাগ করিয়া দিয়াছেন, তখন প্রকৃতই নিরাশ হইয়াছিলাম। এই কার্যের মধ্যে যে ধর্মানুষ্ঠানের একটা তাৎপর্য আছে, তাহা বুঝিতে পারি নাই। কী গভীর চিন্তা ও অনুকম্পার সহিত তিনি এবং তাহার পক্ষ হইয়া স্বয়ং শ্রীশ্রীমাও সর্বদা আমাকে হিন্দুসমাজে (আমি তো একজন বিদেশী) আশ্রয় দিবার জন্য চেষ্টা করিতেন, তাহা অনুধাবন করিতে আমার অনেক মাস লাগিয়াছিল। কাশ্মীরে তিনি আমাকে বলেন যে, তাহার সমগ্র জীবনের উদ্দেশ্য “খ্রীস্টীয় ও ইসলাম ধর্মের ন্যায় হিন্দু ধর্মকে সক্রিয় এবং অপরের উপর প্রভাবশালী করা” আর যে সকল উপায় অবলম্বনে তিনি ঐ উদ্দেশ্য কার্যে পরিণত করিবার চেষ্টা করিতেন, এইটি তাহার অন্যতম।

শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্ঘের তিনি যে সংজ্ঞা নির্দেশ করেন, তাহাতেও ঐ উদ্দেশ্যই প্রকাশ পাইয়াছে—”প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ আদর্শগুলির আদান-প্রদান ঘটানো ও ঐগুলি কার্যে পরিণত করা।” এই সংজ্ঞার পূর্ণতা ও ভারতের বর্তমান অবস্থায় উহার বিশেষ উপযোগিতা সময়ের সঙ্গে ক্রমশঃ বুঝা যাইতেছে। নিজস্ব মতবাদ লইয়া নিশ্চল থাকিলে চলিবে না; হিন্দুধর্মকে উহা প্রমাণ করিতে হইবে যে, সমগ্র আধুনিক উন্নতিকে আলিঙ্গন ও সাদরে গ্রহণ করিবার ক্ষমতা তাহার মধ্যে বিদ্যমান। ইহাই ছিল তাহার মনোভাব। হিন্দুধর্ম কতকগুলি বিভক্ত সম্প্রদায়ের সমষ্টিমাত্র নহে, পরন্তু এক অখণ্ড, সজীব এবং সকল ধর্মের মাতৃস্থানীয়; হিন্দুধর্ম হইতে উদ্ভূত সকল সম্প্রদায়কেই সে মাতার ন্যায় স্বীকার করিয়া লয়, কোন নূতন ধর্ম সম্পর্কে হিন্দুধর্ম নির্ভীক, যেখানেই হউক, সকল সন্তানের ভালবাসা লাভ করিবার জন্য উন্মুখ, প্রাজ্ঞ, অনুকম্পায় পূর্ণ, স্বপরিচালিত, সতত ক্ষমাশীলা এবং সকল প্রকার বিরোধ দূর করিয়া পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় সাধনে তৎপর। সর্বোপরি, তাহার নিজের নির্দিষ্ট উপলব্ধি আছে এবং জগতের অন্যান্য জাতির নিকট প্রচার করিবার জন্য তাহার একটি বিশেষ বার্তাও আছে। কিন্তু হিন্দুধর্মকে এইরূপে প্রতিপন্ন করিবার জন্য স্বামীজী চারিত্রিক বল ব্যতীত অন্য কোন শক্তির উপর নির্ভর করিতেন না। একথা সত্য, তাহার নিজস্ব ধর্মমতরূপ মন্দির নির্মাণ করিয়া তোলাই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু উহার জন্য অনন্তকাল পড়িয়া রহিয়াছে, এবং জগতের স্বাভাবিক গতিও মনে হয় অনুকূল। এ বিষয়ে তাহার নিজের দায়িত্ব কেবল সুদৃঢ় ইষ্টক নির্বাচন। যাহারা নির্বাচিত হইত, তাহাদের তিনি বুদ্ধি, আকর্ষণ শক্তি অথবা শক্তির পরিমাণের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া নির্বাচন করিতেন না; তাহার দৃষ্টি থাকিত একমাত্র সরল আন্তরিকতার প্রতি। একবার গ্রহণ করিবার পর তাহাদের সামনে তিনি একই আদর্শ স্থাপন করিতেন—মুক্তি নহে, ত্যাগ; আত্মানুভূতি নহে, আত্মত্যাগ। আবার ইহাও যেন অনেকটা মানুষের পক্ষ হইতে—ভগবানের নিকট নিবেদন নহে। তাহার শিষ্যদের নিকট তিনি দৃঢ়ভাবে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করিতেন। শিষ্যগণের মধ্যে একজন যেন কদাপি মঠে একদিনের পুণ্য অনুষ্ঠানের কথা বিস্মৃত না হন। সেদিন তাহার জীবনের প্রথম উন্মেষরূপেই যেন স্বামীজী তাহাকে শিবপূজা করাইতে শিখান। অতঃপর ভগবান বুদ্ধের চরণে পুস্পাঞ্জলি প্রদানপূর্বক শুভ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। একজনকে লক্ষ্য করিয়া, তিনি যেন তাহার নিকট যে-কেহ উপদেশ লইতে আসিবে, তাহাকেই সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “যাও, যিনি বুদ্ধত্বলাভের পূর্বে পাচশতবার অপরের জন্য জন্মগ্রহণ ও প্রাণ বিসর্জন করেছিলেন, সেই বুদ্ধকে অনুসরণ কর!”


এখানে বলা আবশ্যক যে, উক্ত বিদ্যালয়টি আমি যেরূপ ভাবিয়াছিলাম, তাহা অপেক্ষাও অস্থায়ী রকমের হইয়াছিল। ১৯০৩ খ্রীস্টাব্দের শরৎকালে সিস্টার ক্রিস্টিন নামে স্বামীজীর জনৈকা আমেরিকান শিষ্যা ভারতীয় স্ত্রীশিক্ষা কার্যের সমগ্র ভার গ্রহণপূর্বক প্রণালীবদ্ধভাবে উহার পরিচালনা করেন। একমাত্র তাহার চরিত্র, একনিষ্ঠতা ও উদ্যম আজ ইহার উন্নতির কারণ : ১৮৯৮হইতে ১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ভাবে আমি যে বিদ্যালয়ের কার্য পরিচালনা কবি, তাহাতে বিশেষ শিক্ষালাভ আমারই হইয়াছিল।
ইহার পূর্বে প্রধানতঃ একবাব চৌদ্দ বৎসর বয়সে কামারপুকুরে তিনি কিছুদিন রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে বাস করেন।–অনুঃ