ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
মহাপুরুষদর্শন-প্রসঙ্গে

স্বামীজী একদিন যে-সব মহাপুরুষকে তিনি দর্শন করিয়াছেন, তাহাদের প্রসঙ্গ করেন। সম্ভবতঃ নাগ মহাশয়ের কথা লইয়া ঐ প্রসঙ্গের অবতারণা হয়। নাগ মহাশয় এই সময়ের কয়েক সপ্তাহ পূর্বে (১৮৯৯ খ্রীঃ) বেলুড় মঠে স্বামীজীকে দর্শন করিতে আসেন। স্বামীজী বহুবার বলিতেন, “নাগ মহাশয় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের এক অসাধারণ কীর্তি।” আমাদের নিকট স্বামীজী ভক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে নাগ মহাশয়ের জ্বলন্ত বিশ্বাসের কথা বর্ণনা করেন, কিভাবে তিনি ঈশ্বরকে ভালবাসিতে পারেন নাই বলিয়া নিজের জন্ম ও ভাগ্যকে ধিক্কার দিয়া অন্নজল ত্যাগ করেন। স্বামীজী আমাকে আরও বলেন যে, নাগ মহাশয় একবার জ্বালানী কাঠের অভাবে নিজের ঘরের খুঁটি কাটিয়া অতিথির জন্য রন্ধনের কাঠ হিসাবে ব্যবহার করেন।

ইহার পরেই সম্ভবতঃ সেই যুবকের প্রসঙ্গ আসিয়া পড়ে, যিনি শ্রীরামকৃষ্ণের স্পর্শলাভ করেন এবং তাহার পরে ‘প্রিয়নাথ’ শব্দ ব্যতীত আর কিছু বলিতে পারিতেন না। ঐ ঘটনার পর তিনি দশ বৎসর বঁচিয়া থাকেন, কিন্তু তাহার মুখে অবিরত ভগবানকে ঐরূপে সম্বোধন ব্যতীত আর কিছু শোনা যাইত না। শ্রীরামকৃষ্ণপদাশ্রিত সন্ন্যাসিগণ এমন বহু ব্যক্তির কথা জানেন, যাহারা তাহাদের গুরুদেবের জীবিতকালে দক্ষিণেশ্বরে আগমন করিয়া তাহার কৃপাম্পৰ্শলাভে তৎক্ষণাৎ সমাধি-অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। বহুক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা ব্যতীত ঐ সকল ব্যক্তির সম্বন্ধে আর কিছু কেহ জানিত না। এক মহিলা সম্পর্কে একথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। তিনি গাড়ি করিয়া দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে আসেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে দেখিয়াই বলেন, আদ্যাশক্তির অংশে তাহার জন্ম। জগন্মাতাজ্ঞানে তিনি তাহাকে প্রণাম করিয়া ধূপধুনা ও পুষ্পচন্দনাদি দ্বারা পূজা করিবামাত্র ঐ মহিলা গভীর সমাধিস্থ হইয়া পড়েন। হয়তো ইহাতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না, কিন্তু তাহার সমাধি কিছুতেই ভঙ্গ হয় না দেখিয়া সকলেই অতীব বিস্মিত হন। দুই-তিন ঘণ্টা পরে সমাধি ভঙ্গ হইল। শোনা যায়, সমাধি-অবস্থায় তাহার ভাবভঙ্গি মাতালের ন্যায় বোধ হইয়াছিল। যাহা হউক, শেষ পর্যন্ত সব ভালভাবে মিটিয়া গেল দেখিয়া সকলে আশ্বস্ত হয়, কারণ আশঙ্কা হইয়াছিল, হয়তো সমাধি-অবস্থা আরও দীর্ঘকাল স্থায়ী হইতে পারে, এবং সেক্ষেত্রে তাহার আত্মীয়স্বজনগণের (তাহারা যেখানেই থাকুন) চিন্তিত হইবার যথেষ্ট কারণ থাকিবে। অতঃপর সকলে মিলিয়া কালীমন্দির হইতে অপরিচিত মহিলার যাত্রার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। তাহার নাম কি, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি প্রশ্ন করিবার কথা কাহারও মনে হয় নাই। তিনিও আর কখনও আসেন নাই। সুলক্ষণা, সাধ্বী, পুত্রবৎসলা রমণীকে মাতৃজ্ঞানে শ্রীরামকৃষ্ণের পূজা করিবার পরিচায়কস্বরূপ এই মনোহর উপাখ্যানের মতো এই রমণীর স্মৃতি রামকৃষ্ণসঙ্ঘের নিকট চির সমাদৃত। শ্রীরামকৃষ্ণ কি বলেন নাই, “এই রমণীর আদ্যাশক্তির অংশে জন্ম!”

ধর্মকর্ম ব্যাপারে একপ্রকার অজ্ঞ ছিলাম বলিয়া আদ্যাশক্তির এই সব অপরিচিত সন্তানদের বিষয়ে আরও জানিবার জন্য মনে আগ্রহ বোধ করিতাম, যাহারা সুদূর নক্ষত্ররাজির ন্যায় নিজ নিজ কক্ষে বিদ্যমান থাকিয়াই দীপ্তি পাইবেন এবং আমাদের এই জগতে কদাপি প্রত্যাবর্তন করিবেন না। জানিতে ইচ্ছা করিত, তাঁহাদের সেই অনিন্দ্যসুন্দর জীবনেও হয়তো বা দূর অতীতের একদিনের সেই মহান অনুভূতির কথা তাহারা বিস্মৃত হইয়াছেন; হয়তো বা তাহাদের নিকট আচার্যশ্রেষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতি ও তাহার কৃপাস্পর্শের কথা বহু অতীতের কোন ঘটনার মতো, অথবা স্বপ্নাবস্থায় শ্রুত কোন কোন গল্পের মতো স্মৃতিপট হইতে বিলুপ্তপ্রায় হইয়া থাকিবে—যেমন দক্ষিণেশ্বরে তাহাদের আগমনের কথা যাহাদের সাক্ষাতে ঘটিয়াছিল, তাহাদের স্মৃতি হইতে প্রায় লুপ্ত। ইহা সত্য কি না আমার জানিতে ইচ্ছা করিত। প্রকৃতপক্ষে সকল ব্যাপারেই পারস্পরিক প্রভাব কাহার অধিক তাহা নির্ণয় করিতে চাহিতাম; ঐ কালে আমার একেবারেই ধারণা হয় নাই যে, এইপ্রকার অভিজ্ঞতা হিন্দুগণের নিকট দৈনন্দিন ব্যাপারহিন্দুমাত্রেই এ-সকল অনায়াসে বুঝিতে পারে। কিন্তু স্বামীজী আমার মনের এই আলো-আঁধার অবস্থার কথা অবহিত ছিলেন না। তিনি বলিলেন, “শ্রীরামকৃষ্ণ যে কৃপা করে কাউকে স্পর্শ করেছেন, এটা কি তামাসার কথা? তার কাছে যে-সব নরনারী আসত, তারা এই রকম ক্ষণকালের স্পর্শেই নূতন জীবন লাভ করেছে—এ কথা কি আবার বলে বোঝাতে হবে?” অতঃপর তিনি এক এক করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন শিষ্যের জীবনের ঘটনাসমূহ বলিতে লাগিলেন। একজন ক্রমাগত তাহার নিকট যাতায়াত করিত এবং সত্যবস্তু ধারণার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টাও করিত। কিছুদিন পরে সহসা একদিন তিনি ঐ ব্যক্তিকে বলেন, “এখন যাও, কিছু টাকাকড়ি উপার্জন কর, তারপর আবার এস!” ফলে সে ব্যক্তির জগতে আজ বেশ পসার-প্রতিপত্তি, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি তাহার সেই পূর্ব ভালবাসা এখনও তেমনি উজ্জ্বল। এই সকল ঘটনা বর্ণনাকালে স্বামীজী ঐ ব্যক্তির বা অপর কাহারও দোষত্রুটির বিন্দুমাত্র উল্লেখ করিতেন না। তাঁহার বর্ণনায় শ্রোতা ইহাদের প্রত্যেকের জীবনে যে সৎসাহস ও মহত্ত্ব কেবল তাহারই পরিচয় পাইতেন। প্রত্যেকেই জোর করিয়া সন্ন্যাস অবলম্বন করিবে কেন? কেবল তাহা নহে, অন্যান্য কর্মগুলি সমাপ্ত না হইলে তাহার সন্ন্যাসগ্রহণ কখনই সম্ভব নয়। কিন্তু শেষকালে আর তাহার ভুল হইবে না। তখনই সে প্রকৃত কর্মত্যাগের বা সন্ন্যাসজীবনের অধিকারী হইবে।

মহাপুরুষগণ সম্বন্ধেও স্বামীজী অনুরূপভাবে আলোচনা করিতেন। যখন যাহার প্রসঙ্গ উঠিত, তখন তাহার সম্পর্কে সমস্ত মনপ্রাণ দিয়া এরূপভাবে কথা বলিতেন যে, সেই সময়ের জন্য শ্রোতার মনে হইত, ইহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ আর কেহ নাই। পওহারী বাবা সম্বন্ধে এত বিশদভাবে বলিবার চেষ্টা করিতেন যে, অতঃপর ঐ বিষয়ে কোন অনিশ্চিত প্রশ্ন উত্থাপন করা ভদ্রতাবিরুদ্ধ বলিয়া বোধ হইত। সেই মহাত্মার দেহত্যাগকালে যাহারা স্বামীজীর নিকট উপস্থিত ছিলেন, তাঁহারা জানিতেন, তাঁহার নিকট পওহারী বাবার স্থান ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের পরেই; তাহারা আরও জানিতেন, পওহারী বাবার ভালবাসার ন্যায় আর কিছুই তাহার নিকট ঐরূপ মূল্যবান ছিল না।

তারপর ঘণ্টাখানেক ধরিয়া তিনি আরও দু-একজন মহাপুরুষ, যাহাদের তিনি দর্শন করিয়াছিলেন, তাহাদের বিষয় গল্প করিতে লাগিলেন। ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে যখন স্বামীজী দেখেন, তখন তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ। দেখিলে মনে হইত, একশত বৎসরের অধিক বয়স। তিনি মৌন অবলম্বন করিয়া থাকিতেন। কাশীতে এক শিবমন্দিরে পড়িয়া থাকিতেন—শিবলিঙ্গের উপর পা দিয়াই শুইয়া আছেন! হঠাৎ দেখিলে মনে হইবে পাগল! কিন্তু দর্শকগণের মধ্যে কাহারও কোন প্রশ্ন থাকিলে লিখিয়া দিতে বাধা ছিল না, এবং খেয়াল হইলে তিনি কোন প্রশ্নের উত্তর সংস্কৃতে লিখিয়া দিতেন। কিছুদিন পূর্বে ইনি দেহত্যাগ করেন।

স্বামীজী যখন রঘুনাথদাসের আশ্রমে উপনীত হন, তখন দুইমাস হইল উক্ত মহাপুরুষের দেহত্যাগ হইয়াছে। প্রথমে তিনি ব্রিটিশ সৈন্যবিভাগে কার্য করিতেন, এবং শিবির-রক্ষক প্রহরীর কার্যে সৎ ও বিশ্বাসী কর্মচারী হিসাবে উপরিতন কর্মচারিগণের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন। এইরূপে দিন যায়, এমন সময়ে একরাত্রে তিনি দেখিতে পাইলেন, একদল লোক রামনাম সঙ্কীর্তন করিতে করিতে চলিয়াছে। উহা শুনিবার পর নিজ কর্তব্য পালনে যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেও “বোল রাজা রামচন্দ্রকী জয়!”—এই ধ্বনি শুনিবামাত্র তিনি উন্মত্তপ্রায় হইয়া উঠিলেন। নিজের অস্ত্রশস্ত্র ও সৈনিকের পরিচ্ছদ ছুড়িয়া ফেলিয়া তিনি সঙ্কীর্তনে যোগ দিলেন।

কিছুকাল এইরূপে চলিবার পর অবশেষে কর্ণেল সাহেবের নিকট তাহার নামে অভিযোগ গেল। কর্ণেল রঘুনাথদাসকে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন—ঐ সকল সংবাদ সত্য কি না এবং উহার শাস্তি তাঁহার জানা আছে কিনা। রঘুনাথ উত্তর দিলেন, হ তাঁহার জানা আছে, বন্দুকের গুলিতে প্রাণ যাইবে। কর্ণেল বলিলেন, “দেখো, এবারের মতো তোমায় ক্ষমা করলাম। যাও, আমি একথা কাউকে বলব না। কিন্তু যদি আবার এরূপ হয়, তবে তোমার শাস্তি অনিবার্য।”

সেই রাত্রেই আবার রঘুনাথ শুনিলেন, রামনাম সঙ্কীর্তনের দল কীর্তন করিতে করিতে চলিয়াছে। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেন, কিন্তু সে আকর্ষণ অদম্য। অবশেষে সব কিছু ছুড়িয়া ফেলিয়া তিনি সারারাত্রি সঙ্কীর্তন দলের সহিত অতিবাহিত করিলেন।

এদিকে রঘুনাথদাসের উপর কর্ণেলের এতদূর আস্থা যে, তাহাকে নিজ মুখে অপরাধ স্বীকার করিতে শুনিয়াও তাহার বিরুদ্ধে কিছু বিশ্বাস করা তাহার পক্ষে কঠিন। সুতরাং ব্যাপারটি স্বচক্ষে দেখিবার জন্য তিনি রাত্রিকালে সৈন্যশিবিরে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন রঘুনাথ নিজ স্থানে দণ্ডায়মান, এবং তাহার সহিত যথাযথ তিনবার সঙ্কেত বাক্য আদান-প্রদান করিলেন। নিশ্চিন্তবোধ করিয়া কর্ণেল নিজ আবাসে প্রত্যাবর্তন করিয়া নিদ্রা গেলেন।

প্রাতঃকালে রঘুনাথদাস আসিলেন নিজের অপরাধ জ্ঞাপন করিয়া অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণপূর্বক দণ্ডগ্রহণের উদ্দেশ্যে। কিন্তু তাহার বিবরণ কর্ণেল শুনিলেন না, তিনি নিজে যাহা দেখিয়া ও শুনিয়া আসিয়াছেন তাহাই বর্ণনা করিলেন।

বিস্ময়ে হতবুদ্ধি রঘুনাথ কার্য হইতে কোনপ্রকারে নিষ্কৃতিলাভ করিবার জন্য জিদ করিতে লাগিলেন। এ যে তাহার প্রভু রামচন্দ্র, যিনি ভৃত্যের জন্য ঐরূপ করিয়াছেন! প্রতিজ্ঞা করিলেন, এখন হইতে তিনি আর কাহারও দাসত্ব করিবেন না।

স্বামীজী বলিলেন, “তিনি সরস্বতী নদীর তীরে বৈরাগী সাধুর জীবন যাপন করতে লাগলেন। লোকে তাকে অজ্ঞ মনে করত, কিন্তু আমি তার ক্ষমতা জানতাম। তিনি প্রত্যহ হাজার হাজার লোককে খাওয়াতেন। কিছুদিন পরে হয়তো গমওয়ালা এসে তার প্রাপ্য চাইত। রঘুনাথদাস বলতেন,, কত, হাজার টাকা? দাঁড়াও, দেখি। কই, মহাপুরুষদর্শন প্রসঙ্গে মাস খানেকের ভেতর তো কিছু টাকাকড়ি পাইনি। এ টাকাটা কাল আসবে মনে হয়। টাকা ঠিক সেই দিনই আসত—তার একটুও অন্যথা হতো না।”

একজন রঘুনাথদাসকে জিজ্ঞাসা করেন, রামনাম সঙ্কীর্তন দলের গল্পটি সত্য কি না।

উত্তরে তিনি বলেন, “এ-সকল খবর জেনে লাভ কি?”

প্রশ্নকর্তা বলিলেন, “আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করছি না। আমি শুধু জানতে চাই, এরূপ ব্যাপার ঘটা সম্ভব কি না।”

রঘুনাথদাস উত্তরে বলেন, “ভগবানের ইচ্ছায় সকলই সম্ভব।”…

স্বামীজী তারপর বলিতে লাগিলেন, “আমি হৃষীকেশে অনেক মহাপুরুষ দেখেছি। একজনের কথা আমার মনে আছে। তাকে দেখে পাগল বলে বোধ হয়েছিল। তিনি উলঙ্গ হয়ে রাস্তা দিয়ে আসছিলেন, আর কতকগুলো ছেলে তার পিছু পিছু পাথর ছুঁড়তে ছুঁড়তে আসছিল। তার মুখ ও ঘাড় থেকে দরদর করে রক্ত পড়ছে, তবুও তিনি হেসে কুটিকুটি হচ্ছেন। আমি তাকে কাছে এনে ক্ষতগুলি ধুয়ে দিলাম এবং রক্তপাত বন্ধ করবার জন্য নেকড়া পুড়িয়ে সেখানে লাগিয়ে দিলাম। যতক্ষণ আমি এসকল কাজে ব্যস্ত ছিলাম, তিনি উচ্চ হাস্য করতে করতে ছেলেদের পাথর ছোড়াছুড়ি নিয়ে কি অপূর্ব আনন্দ উপভোগ করছিলেন, তাই আমাকে বলতে লাগলেন। বললেন, ‘জগৎপিতা এভাবেই খেলা করে থাকেন।

“এঁদের মধ্যে অনেকে লোকসঙ্গ থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য লুকিয়ে থাকেন। লোকজন তাদের কাছে উৎপাতের হেতু মাত্র। একজন তার গুহার চারদিকে মানুষের হাড় ছড়িয়ে রেখেছিলেন এবং রটিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি শবমাংসভোজী। আর একজন পাথর ছুঁড়তেন। তারা এরকম নানা উপায় অবলম্বন করে থাকেন।…

“কখনো কখনো তাদের হঠাৎ চৈতন্যোদয় হয়। একটা ঘটনা বলছি। একটি ছোকরা অভেদানন্দের কাছে উপনিষদ্ পড়তে আসত। একদিন সে জিজ্ঞেস করল, ‘মশায়, এ-সব কি বাস্তবিকই সত্য?’

“অভেদানন্দ বলেন, “নিশ্চয়ই! এ-সকল অবস্থা লাভ করা শক্ত হতে পারে, কিন্তু এ-সব নিশ্চয়ই সত্য!

“পরদিনই সেই বালক নগ্ন সন্ন্যাসীর বেশে মৌনব্রত অবলম্বন করে কেদারনাথদর্শনে যাত্রা করল!

“তার কি হলো, জিজ্ঞেস করছ? সে মৌনী হয়ে গেল!

“কিন্তু সন্ন্যাসীদের আর পূজা, তীর্থযাত্রা বা তপস্যাদি করতে হয় না। তবে কেন তারা তীর্থ থেকে তীর্থান্তরে দেবদর্শনাদি করে বেড়ান এবং নানারকম কঠোর তপশ্চরণ করেন? এ-ভাবে পুণ্য অর্জন করে তারা জগৎকে দান করেন।”

তারপর হয়তো শিবিরানার গল্প হইল!বর্ণনান্তে স্বামীজী বলিলেন, “এই সব গল্পই আমাদের জাতির হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশ অধিকার করে রয়েছে। কখনো ভুলোনা যে, সন্ন্যাসী দুটি ব্রত গ্রহণ করেন। একটি সত্যোপলব্ধি, অপরটি জগতের হিতসাধন—’আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ। আর তার সবচেয়ে কঠোরভাবে পালনীয় ব্রত হলো, তিনি স্বর্গাদিলাভের চিন্তা পর্যন্ত বর্জন করবেন।”