সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
স্বামীজী-প্রচারিত মতসমূহের সমষ্টিভাবে আলোচনা

খ্রীস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী পূর্বে বুদ্ধের আবির্ভাব দ্বারা দ্বিবিধ প্রয়োজন সাধিত হয়। যে শক্তিপ্রবাহ স্বদেশ হইতে নির্গত হইয়া দূরবর্তী দেশসমূহকে সঞ্জীবিত করিয়াছিল, একদিকে তিনি ছিলেন তাহার উৎসস্বরূপ। ভারতবর্ষ তাহার বাণী সমগ্র প্রাচ্য জগতে বিস্তার করিয়া অবশেষে নিজ সীমার বহুদূরে অবস্থিত বিভিন্ন দেশে নানা জাতি, ধর্মসম্প্রদায়, সাহিত্য, কলা ও বিজ্ঞানচর্চার স্রষ্টারূপে গণ্য হয়। কিন্তু ভারতের নিজসীমার মধ্যে ঐ মহাপুরুষের জীবনই ছিল জাতি সংগঠনের প্রথম উপায়স্বরূপ। উপনিষদ্-নিহিত আর্য সংস্কৃতি আপামর জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করিয়া বুদ্ধ সাধারণ ভারতীয় সভ্যতার আদর্শ নির্ণয় করেন, এবং ভাবীকালের জন্য এক অখণ্ড ভারতীয় জাতির সূত্রপাত করেন।

যে মহান জীবনের পরিচয় আমি লাভ করি, আমার স্থির বিশ্বাস, সেই জীবনেও অনুরূপভাবে দ্বিবিধ প্রয়োজন সাধিত হইয়াছেঃ প্রথম-সমগ্র জগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি করা; দ্বিতীয়—এক মহাজাতি সংগঠন। বিদেশের কথা বলিতে গেলে, স্বামী বিবেকানন্দই পাশ্চাত্য জাতিসমূহের নিকট বেদ ও উপনিষদের ভাবাদর্শের প্রথম প্রামাণিক ব্যাখ্যাকার। তাহার নিজস্ব কোন ধর্মমত প্রচার করিবার ছিল না। তিনি বলিয়াছিলেন, “বেদ ও উপনিষদ্ ব্যতীত আমি অন্য কোন গ্রন্থ থেকে কখনো কিছু উদ্ধৃত করিনি, এবং তাদের মধ্য থেকেও কেবল শক্তির কথাই বলেছি।” স্বর্গের পরিবর্তে তিনি প্রচার করেন মুক্তি, পরিত্রাণের পরিবর্তে ‘জ্ঞানলাভ’; ঈশ্বরের পরিবর্তে সর্বব্যাপী বা সর্বভূতে অবস্থিত অখণ্ড ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার ছিল তাহার উপদেশ, এবং কোন বিশেষ ধর্মের মাহাত্ম ঘোষণার পরিবর্তে তিনি ঘোষণা করিতেন সকল ধর্মের সত্যতা।

পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ সময়ে সময়ে বিস্মিত এবং অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিতেন যে, ধৈর্যসহকারে বহু গবেষণার দ্বারা তাহারা যে-সকল সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন, এই প্রচারক ধর্মব্যাখ্যাতার স্বভাবসিদ্ধ ওজস্বিতার সহিত সেই সব কথা জীবন্ত সত্যের ন্যায় অনর্গল বলিয়া যাইতেছেন। কিন্তু তাহারা যত প্রকার পরীক্ষাই উপস্থিত করুন না, এই প্রচারকের পাণ্ডিত্য অনায়াসে তাহাদের বহু ঊর্ধ্বে অবস্থিত বলিয়া প্রমাণিত হইত। তাঁহার প্রচারিত মতবাদ কেবল বিদ্যালয়ে অধিগত দর্শনচর্চামাত্র ছিল না, যাহা ঐতিহাসিক ও প্রাচীন ভাষাবিদ্যাগত—অতএব লোকের চিত্তাকর্ষক হইবে, উহা ছিল এক জীবন্ত জাতির হৃদয়েব চিরপোষিত বিশ্বাস, যে জাতি পঞ্চবিংশ শতাব্দী ধরিয়া জীবনে-মরণে ঐ সত্য উপলব্ধি করিবার জন্য ক্রমাগত সংগ্রাম করিয়া আসিয়াছে। ধর্মগ্রন্থসকল তাঁহার নিকট জ্ঞানভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয় নাই; পরন্তু এক মহান জীবনের টীকা ও ব্যাখ্যাস্বরূপ ছিল, যে জীবনের অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা ঐ সকল গ্রন্থের কোনরূপ সহায়তা ব্যতীত তাঁহার চক্ষুকে প্রতিহত করিত, এবং যাহার বিশ্লেষণে তিনি একান্ত অপারগ ছিলেন। ভগবান রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনই তাহার মনে এই ধারণা দৃঢ়বদ্ধ করিয়া দেয় যে, শঙ্করাচার্য প্রচারিত অদ্বৈতবাদই শেষ পর্যন্ত একমাত্র সত্য। পরমহংসদেবের জীবনই তাহার নিজস্ব অনুভূতির দ্বারা দৃঢ় হইয়া তাহাকে হৃদয়ঙ্গম করাইয়া দেয় যে, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ প্রভৃতি যে-সকল বিভিন্ন মতবাদ সেই ‘একমেবাদ্বিতীয় অবস্থায় উপনীত হইতে না পারিলেও প্রায় উহার সমীপবর্তী হইয়াছে, তাহারাও অবশেষে অদ্বৈতাবস্থারূপ সর্বশ্রেষ্ঠ অনুভূতিরই নিম্নতর বিভিন্ন অবস্থা বলিয়া প্রমাণিত হইবে।

কিন্তু এই চরম আদর্শের প্রকাশ হিসাবে প্রত্যেক ব্যক্তির আন্তরিক বিশ্বাসই সত্য। শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়াছিলেন, “যেখানে অন্যান্য লোকে উপাসনা করে, সে স্থানকে প্রণাম ও পূজা করবে, কারণ লোকে যে রূপে তাকে আরাধনা করে, তিনি সেইরূপেই তাকে দেখা দেবেন–এটা ধ্রুব সত্য।” স্বামীজী বলিলেন, “পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে যে ব্যবধান, তার প্রতি পদক্ষেপে যদি আমরা কল্পনার সাহায্যে সূর্যের এক-একটি ফটো তুলি তাহলে তার কোন দুইটিই পরস্পরের অবিকল অনুরূপ হবে না, তবু ঐ ফটোগুলির মধ্যে কোটিকে তুমি অসত্য বলতে পার?” এই সকল উক্তির তাৎপর্য এই যে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে যে বিরোধ, তাহাদের সমন্বয় সম্ভব। কিন্তু দক্ষিণেশ্বরের সেই আচার্যশ্রেষ্ঠ যখন সাধনা দ্বারা আবিষ্কার করিলেন যে, নারীগণের জীবনেও উচ্চতম জ্ঞানলাভ সম্ভব, তখন হয়তো আমাদের এইরূপ ধারণা সঙ্গত বলিয়া মনে হইতে পারে যে, সাধারণতঃ যে-সকল ব্যবহারকে সামাজিক ও সাংসারিক বলিয়া হেয় করা হয়, তাহাদেরও পবিত্ৰজ্ঞানে যথোচিত সমাদর করিতে হইবে। যে জগতে রূপকের এত আধিক্য, যেখানে শত শত বস্তু প্রতীকরূপে ব্যবহৃত হইয়া ঈশ্বরের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, সেই জগতে তিনি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করিয়া দিলেন যে, মন্দিরে পূজা-অর্চনার ন্যায় গৃহকর্মের সম্যক অনুষ্ঠান ভগবানলাভের সহায়ক হয়; মন্দিরে পুরোহিত দেবতার উদ্দেশে ভোগ নিবেদন করিয়া যে আশীর্বাদ লাভ করেন, গৃহে জননী বা পত্নী অন্নব্যঞ্জন প্রস্তুত করিয়া পরিবারের সকলকে পরিবেশনপূর্বক তাহা অপেক্ষা কম ভগবৎকৃপা লাভ করেন না। শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়াছিলেন, “যা কিছু সবই মায়ার ভেতরে ঈশ্বরের নাম পর্যন্ত। কিন্তু এই মায়ার কতক অংশ জীবকে মুক্তির পথে সাহায্য করে; বাকি অংশ শুধু অধিকতর বন্ধনের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। আমার মনে হয়, সাধ্বী নারীর প্রাত্যহিক জীবনও যে এইরূপে ঈশ্বরের আশীর্বাদলাভে ধন্য হইয়া থাকে, গৃহ যে মন্দিরস্বরূপ, এবং শিষ্টাচার, অতিথির সেবা ও সাংসারিক ব্যপালন প্রভৃতি যে এক দীর্ঘকালব্যাপী পূজার অঙ্গরূপে পরিণত হইতে পারে—ইহা প্রদর্শন করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তরকালে তাঁহার মহান শিষ্যের জীবনে এক মুখ্য চিন্তাধারার ভিত্তি স্থাপন ও অনুমোদন করিয়া গিয়াছিলেন।

পরবর্তী বত্সরগুলিতে তাহার ভারত-ভ্রমণকালে স্বামীজী উহার পৃথক পৃথক ধর্মমতবিশিষ্ট অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়গুলিকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং উহার প্রত্যেকটির মধ্যে তিনি সেই ধর্মজ্যোতির সামান্য একটু আধটু প্রকাশ দেখিতে পান, যাহার পূর্ণ বিকাশ তাহার গুরুদেবের চরিত্রেই দেখিয়াছিলেন। কিন্তু ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে যখন ভারতের বাহিরে পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলি দেখিতে আরম্ভ করেন, তখনই তিনি জাতীয়তা ও দেশাত্মবোধ দ্বারা একতাবদ্ধ জনসঙঘসমূহের সম্মুখীন হইলেন। আর স্বভাবতই স্বদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতো এই সকল জনসমষ্টির মধ্যেও তিনি মানবের অন্তর্নিহিত সেই ব্ৰহ্মভাবের লীলাবিলাস অনুভব করিতে লাগিলেন। বহু বৎসর ধরিয়া ইহা তাহার সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারেই ঘটিতেছিল; তথাপি বিভিন্ন জাতির মধ্যে তাহাদের বিশেষ গুণগুলি অনুধাবন করিবার যে আন্তরিক চেষ্টা তিনি করিতেন, অন্তরঙ্গ ভক্ত মাত্রকেই তাহা আকৃষ্ট করিয়াছিল।

একদিন ইংলণ্ডযাত্রার পথে তিনি অত্যন্ত আনন্দসহকারে আমাকে তুর্কী নাবিকের দক্ষতা ও অপূর্ব সৌজন্যের বিষয় বলিতেছিলেন, তখন আমি তাহার চরিত্রের ঐ বিস্ময়কর উৎসাহ প্রদর্শনের প্রতি তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। সম্ভবতঃ তিনি জাহাজের খালাসীদের কথা ভাবিতেছিলেন; তাহার প্রতি তাহাদের বালকের ন্যায় প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার তাহাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করিয়াছিল। যেন আমি তাহাকে কোন দোষে অভিযুক্ত করিয়াছি, এইভাবে তিনি শুধু বলিলেন, “কি জান, আমার মুসলমানদের আমি ভালবাসি।” উত্তরে আমি বলি, “তা বুঝলাম, কিন্তু আমি জানতে চাই, এই যে প্রত্যেক জাতিকে তাদের শ্রেষ্ঠ গুণগুলির দিক থেকে বুঝতে চেষ্টা করার অভ্যাস, এ আপনি কোথা থেকে পেলেন? কোন ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ব্যক্তির চরিত্রে কি আপনি এটা দেখতে পেয়েছেন? অথবা কোন সূত্রে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছ থেকেই লাভ করেছেন”

ধীরে ধীরে তাহার মুখের বিস্মিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়ভাব অপনীত হইল। তিনি উত্তর দিলেন, “খুব সম্ভব এ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিক্ষারই ফল। আমরা সকলেই কতকটা তারই পথে চলেছিলাম। অবশ্য, তিনি নিজে যে কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, আমাদের ততদূর করতে হয়নি। তিনি যে-সব ব্যক্তির ভাব আয়ত্ত করতে চাইতেন, তাদের মতো আহার করতেন, তাদের পরিচ্ছদ ধারণ কবতেন; তাদের দীক্ষা গ্রহণ করতেন এবং তাদের ভাষাতেই কথা বলতেন। তিনি বলতেন, ‘আমাদের যেন অপরের সত্তার মধ্যে নিজেকে প্রবিষ্ট করাতে হবে। এই যে প্রণালী, এ তার নিজস্ব। ভারতবর্ষে এর পূর্বে কেউ এমনভাবে পর পর বৈষ্ণব, মুসলমান ও খ্রীস্টানধর্ম গ্রহণ করেননি।”

এইরূপে, স্বামীজীর দৃষ্টিতে প্রত্যেক জাতির জাতীয়ত্ব বিশেষ বিশেষ ধর্মমতের ন্যায় পবিত্রতাস্বরূপ বলিয়া গণ্য হইত। তাঁহার মতে, প্রত্যেকেই যেন আদর্শ মানবত্ব সম্পর্কে নিজের ধারণা প্রকাশ করিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে। একবার তিনি সহসা বলিয়া ওঠেন, “যত বয়স হচ্ছে, ততই আমার মনে হচ্ছে, মনুষ্যত্ব বা ‘পৌরুষের মধ্যেই সব তত্ত্ব নিহিত রয়েছে।”

মনের এক স্বাভাবিক নিয়মানুসারে, যতই তিনি অন্যান্য জাতির শক্তির পরিমাণ ও প্রীতিকর গুণগুলির সহিত পরিচিত হইতে লাগিলেন, ততই ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণের জন্য তিনি নিজেকে অধিকতর গৌরবান্বিত বোধ করিতেন; কারণ, যে-সকল গুণে তাহার জন্মভূমি সকলের উর্ধ্বে বিরাজ করিতেছিল, সেগুলি সম্বন্ধে প্রতিদিন তিনি অধিকতর সচেতন হইয়া উঠিতে লাগিলেন। বিভিন্ন যুগের ন্যায় বিভিন্ন জাতিকেও তিনি ক্রমান্বয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হইতে আলোচনা করিতেন—তাহাদের বিরাট সত্তার একটি দিকেই তাহার দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিতেন না। রোমক সাম্রাজ্যের বংশধরদের তিনি সর্বদাই নিষ্ঠুর প্রকৃতি বলিয়া বিবেচনা করিতেন এবং জাপানীদের বিবাহসম্পৰ্কীয় ধারণা তাহার নিকট ভয়াবহ ছিল। তথাপি, কোন জাতির সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করিবার সময় সর্বদা তিনি তাহাদের গঠনমূলক আদর্শ গুণগুলির প্রতি দৃষ্টি রাখিতেন, কখনও কোন সম্প্রদায়ের দোষগুলি দেখিয়াই বিচার করিতেন না। এই সকল বিষয়ে আলোচনার সময়ে আমি তাহাকে শেষ যেসব মন্তব্য করিতে শুনিয়াছি, তাহার অন্যতম হইল, “স্বদেশপ্রীতি দেখতে হলে জাপানীদের দেখ। পবিত্রতা চাইলে হিন্দুদের দেখ, আর যদি পৌরুষ দেখতে চাও, তবে ইউরোপীয়দের দিকে তাকাও।” তারপর জোরের সহিত বলিলেন, “কোন ব্যক্তির পক্ষে মানুষের গৌরবের বস্তু কি হওয়া উচিত, তা ইংরেজ যেমন বোঝে, জগতে আর কোন জাতি তেমন বোঝে না।”

এক ব্যক্তিগত আলোচনাকালে স্বামীজী বলিয়াছিলেন, ভারত সম্পর্কে তাহার বরাবর ইচ্ছা ছিল, “হিন্দুধর্মকে অপর ধর্মের উপর প্রভাবশালী করা।” সনাতন ধর্মকে সক্রিয় ও প্রচারশীল হইতে হইবে; বিশেষ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে প্রচারকদল প্রেরণ, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে স্বমতে আনয়ন, এবং তাহার নিজের যে সকল সন্তান কুহকে পড়িয়া ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের পুনরায় নিজ ক্রোড়ে গ্রহণের সামর্থ্য থাকা চাই; পরিশেষে জ্ঞাতসারে ও বিশেষ বিবেচনাপূর্বক নূতন নূতন ভাবকে আত্মসাৎ করিতে হইবে। স্বামীজী কি জানিতেন যে, কোন জাতি অথবা সম্প্রদায় যে মুহূর্তে নিজেদের জীবশরীরের ন্যায় সুসংবদ্ধ বলিয়া সচেতন হয়, সেই মুহূর্তে উহা অপরের উপর প্রভাবশালী এবং সক্রিয় হইয়া উঠে? তিনি কি জানিতেন যে, তিনিই তাহার পূর্বপুরুষগণের ধর্মের মধ্যে স্বস্বরূপ জ্ঞান উপলব্ধির পুনরুদ্বোধনে সহায়ক হইবেন? যেভাবে হউক, তাহার নিজের উক্তি অনুসারে প্রথমাবধি তাহার একমাত্র কার্য ছিল, ‘হিন্দুধর্মের সাধারণ ভিত্তিগুলি আবিষ্কার করা। স্বাভাবিক প্রেরণার বশে তিনি হৃদয়ঙ্গম করেন, এইগুলির আবিষ্কার ও দৃঢ় প্রত্যয়ের সহিত উহাদের সমর্থনই একমাত্র পন্থা, যাহা দ্বারা তিনি জননীস্বরূপ হিন্দুধর্মকে নিজের অটুট যৌবন ও শক্তি সম্বন্ধে এক আনন্দময় প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিতে পারেন। বুদ্ধ কি ত্যাগ ও নির্বাণ প্রচার করেন নাই, এবং যেহেতু এই ত্যাগ ও নির্বাণলাভ জাতীয় জীবনের সারবস্তু, তাহার দেহাবসানের দুই শতাব্দীর মধ্যেই কি ভারতবর্ষ এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয় নাই? সুতরাং স্বামীজীও সেইরূপ জাতীয় জীবনের পক্ষে অপরিহার্য সার বস্তুগুলির উপর নির্ভর করিয়া তাহাদের প্রচার করিবার সঙ্কল্প গ্রহণ করেন—ফল যাহা হয় হউক।

তিনি বলিতেন, হিন্দুধর্ম ঘোষণা করে, একমাত্র এই ধর্মই অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক সত্যরূপ প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত, এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকেই বলে, ইহাকেই একমাত্র পথপ্রদর্শকরূপে গ্রহণ কর’। সকল শাস্ত্রের মূলে জ্ঞানের উৎপত্তিবিষয়ক যে-সকল নিয়ম বর্তমান, এবং যাহা হইতে সকল শাস্ত্রের উদ্ভব, হিন্দুধর্মে ‘বেদ’ শব্দে প্রকৃতপক্ষে তাহাই বুঝায়। হিন্দুধর্মের সন্তানগণের মধ্যে কেহ কেহ বেদনামক গ্রন্থসমূহে আস্থা স্থাপন করেন নাই—যেমন, জৈনেরা; তথাপি জৈনেরা হিন্দুপদবাচ্য ব্যতীত আর কিছু নহে। যাহা কিছু সত্য, তাহাই বেদ, এবং জৈনেরাও সত্য বলিয়া যাহা বুঝিয়াছেন, তাহাই পূর্ণরূপে মানিয়া চলিলেই হইল। যতদূর সম্ভব হিন্দুধর্মের পরিধি বিস্তৃত করিয়া দেওয়া ছিল স্বামীজীর উদ্দেশ্য। পক্ষিণী যেমন দুটি ডানা দিয়া তাহার শাবকগুলিকে আচ্ছাদন করিয়া রাখে, হিন্দুধর্মও তাহার সকল শাখাপ্রশাখা তেমন আচ্ছাদন করিয়া রাখুন—ইহাই ছিল স্বামীজীর মননগত ভাব। প্রথম বার আমেরিকা যাত্রার পূর্বে তিনি নিজের সম্বন্ধে বলেন, “আমি এমন একটি ধর্ম প্রচার করতে যাচ্ছি, বৌদ্ধধর্ম যার বিদ্রোহী সন্তান, এবং খ্রীস্টধর্ম সকল আস্ফালন সত্ত্বেও যার দূরাগত প্রতিধ্বনি মাত্র।” স্বামীজী বলিতেন,’বেদ’ শব্দে যদি গ্রন্থগুলিকেই ধরা যায়, তথাপি ধর্মের ইতিহাসে বেদের মাহাত্ম্য অতুলনীয়। কেবল উহাদের অতি প্রাচীনত্বের জন্য নহে, পরন্তু এই কারণেই উহা বহুগুণে শ্রেষ্ঠ যে, জগতের সমুদয় গ্রন্থের মধ্যে একমাত্র বেদই মানবকে সতর্ক করিয়া বলিতেছেন, তাহাকে সকল গ্রন্থের পারে যাইতে হইবে।

এইরূপে, হিন্দুধর্মের অন্তর্গত সকল সম্প্রদায়ের একমাত্র উদ্দেশ্য হইল সত্য। আবার এই সত্য গ্রন্থনিবদ্ধ নহে, সুতরাং উহাকে শুধু মানিয়া লইতে হইবে তাহা নহে; সকলেই অনুভূতি দ্বারা এই সত্য লাভ করিতে পারেন। ইহা হইতে বুঝা যায়, হিন্দুধর্মে বিজ্ঞানসম্মত-বিশ্বাস এবং ধর্মবিশ্বাস এই উভয়ের মধ্যে কোন প্রকার বাস্তব ও কাল্পনিক বিরোধ নাই। এই বিষয়ে স্বামীজী দেখিয়াছিলেন যে, বিজ্ঞানকে জ্ঞানরাজ্যের সর্বত্র প্রয়োগ করিবার আধুনিককালের যে বৈশিষ্ট্য, ভারতবাসীর সেই ভাবগ্রহণে বিশেষ যোগ্যতা আছে। ভারতের ধর্মচর্চায় রত মনীষিগণ কখনও কোন জ্ঞানের উন্নতির পথে বাধা প্রদান করেন নাই। ইহাও গৌরবের কথা, এখনও পর্যন্ত হিন্দু যাজকগণ কোন ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তা ও মতবাদে বিশ্বাস করিবার অধিকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিয়াছেন বলিয়া শোনা যায় নাই। শেষোক্ত তথ্য হইতেই ইষ্টদেবতার প্রতি নিষ্ঠারূপ মনের উদ্ভব—অর্থাৎ প্রত্যেককে আত্মোন্নতির জন্য স্বয়ং নিজের পথ নির্বাচন করিয়া লইতে হইবে, এবং স্বামীজীর মতে ইহাই হিন্দুধর্মের একমাত্র সার্বভৌম বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য হিন্দুধর্মকে জগতের সর্বপ্রকার ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি কেবল যে সহনশীল করিয়াছে তাহা নহে, উহাদিগকে আত্মসাৎ করিয়া লইবার সামর্থ্যও প্রদান করিয়াছে। তিনি দেখাইয়া দেন যে, এমনকি, সাম্প্রদায়িক ভাবও—যাহাতে ঈশ্বর স্বয়ং বিশ্বাসীর বা সাধকেরই মতাবলম্বী বলিয়া বিশ্বাসের দ্বারা সূচিত, এবং নিজের ক্ষুদ্র সম্প্রদায়টি একমাত্র খাঁটি সম্প্রদায় বলিয়া অভিহিত,এবং যাহাতে সময় সময় চরম গোড়ামি পর্যন্ত স্থান পাইয়া থাকে—হিন্দুধর্মের দৃষ্টিতে তাহা অসত্য বা সঙ্কীর্ণতার চিহ্ন নহে, পরন্তু অপরিণত মনেরই লক্ষণ বলিয়া বিবেচিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন বলিতেন, উহা বিচারের বেড়া—চারাগাছের পক্ষে অত্যাবশ্যক, কিন্তু বৃক্ষের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমরা যে কোন কিছুর সীমা নির্দেশ করি, ইহাই প্রমাণ করে যে, আমরা এখনও পর্যন্ত সসীম বস্তু লইয়াই নাড়াচাড়া করিতেছি। যখন অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ হইবে, তখন আমাদের মন কেবল অনন্তের চিন্তায় মগ্ন থাকিবে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেন, “সকলেই জামর খানিকটা অংশে বেড়া দিয়ে বলে, ওটা আমার জমি’, কিন্তু আকাশকে কে বেড়া দিয়ে ভাগ করতে পারে?”

যে অসংখ্য সম্প্রদায় ও মতমতান্তর লইয়া হিন্দুধর্ম গঠিত, তাহাদের প্রত্যেকটির ভিত্তি হইল অপরোক্ষানুভূতি, এবং সকলেরই বৈশিষ্ট্য হইল অনন্ত উদারতা—যাহা সকলকে গ্রহণ করিতে সমর্থ। অবশ্য পালনীয় বলিয়া পুরোহিতশ্রেণী যে-সকল নিয়মের প্রবর্তন করেন, তাহা কেবল সামাজিক ক্ষেত্রে। যদিও ইহার ফলে আচার প্রথায় অত্যধিক কড়াকড়ির সৃষ্টি হয়, ইহা দ্বারা স্পষ্টই অনুমিত হয়, তাহাদের মতে মানবমন চিরকালই স্বাধীন। কিন্তু ইহা অস্বীকার করিতে পারা যায় না যে, হিন্দুধর্মের মধ্যে চিন্তাশক্তির যতদূর প্রসারলাভ ঘটে, তাহার মধ্যে কয়েকটি বিশিষ্ট ভাবের সমাবেশ পরিলক্ষিত হয়। ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে শিকাগো ধর্মমহাসভায় এইগুলি ছিল স্বামীজীর বক্তৃতার প্রধান বিষয়।

অস্থিমজ্জাস্বরূপ যে-সকল বিশিষ্ট ধাবণা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ভারতবর্ষের অস্তিত্ব ভাবা যায় না, তাহার প্রথমটি হইল সৃষ্টিপ্রবাহের চত্রবৎ আবর্তন। সৃষ্টি থাকিলেই তাহার একজন স্রষ্টা থাকিবে, এবং স্রষ্টা বলিলেই সৃষ্টি বুঝা যায়—উভয়েই তুল্যভাবে পরস্পর সাপেক্ষ। এই দ্বৈতমূলক সম্পর্ক আপেক্ষিক সত্য ব্যতীত আর কিছু নহে। হিন্দুধর্মে এ বিষয়ে গভীর দার্শনিক বিচার আছে এবং স্বামী বিবেকানন্দ তাহার দৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করিবার ক্ষমতা দ্বারা স্বল্প কথায় উহা প্রকাশ করিতে সমর্থ হন। সাধারণভাবে ভারতীয় চিন্তার প্রকৃষ্ট উদাহরণস্বরূপ তিনি যে দ্বিতীয় মতটির আলোচনা করেন, তাহা পুনর্জন্ম ও কর্মবাদ, যাহার চরম পরিণতি মানবের অন্তর্নিহিত দেবত্বের পূর্ণ বিকাশে। পরিশেষে, চিন্তা ও উপাসনার মধ্যে আকারভেদ সত্ত্বেও সকল সময়ে এবং সর্বাবস্থায় সত্যের সর্বজনীনত্ব ঘোষণা দ্বারা তিনি হিন্দুধর্মের এই সকল বৈশিষ্ট্য যে প্রকৃতপক্ষে গৌণ সে বিষয়ে তাহার বক্তব্যের সমাপ্তি করেন। কয়েকটি প্রাঞ্জল বাক্যের মাধ্যমে তিনি সর্বাদিসম্মতরূপে হিন্দুধর্মের একত্ব প্রতিপাদন করেন এবং উহার মুখ্য লক্ষণগুলি চিত্রিত করেন। পাশ্চাত্য-জগতে তাহার অবশিষ্ট কার্য ছিল, প্রধানতঃ সনাতন ধর্মের অন্তর্গত মহান সত্যগুলিকে আধুনিক কালের ও সর্বজনের উপযোগী করিয়া অকাতরে সকলের মধ্যে বিতরণ করা। ধর্মের প্রবক্তা হিসাবে তাহার নিকট সমগ্র জগৎই ছিল ভারতবর্য, সর্বদেশের মানবমাত্রেই তাহার নিজধর্মের অন্তর্ভুক্ত।

১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারী মাসে ভারতে প্রত্যাবর্তনের পরেই, স্বামীজী তাঁহার স্বদেশবাসীর চিন্তাধাবায় তাহার দান দার্শনিক আকারে প্রদান কবেন। ভাবতের সকল যুগপ্রবর্তকেরই উহা দিবার প্রয়োজন হয়, একথা পূর্বেই অন্যত্র বলা হইয়াছে। এতদিন ধরিয়া অদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, এই তিনটি দর্শন জীবাত্মার মুক্তির তিনটি বিভিন্ন আদর্শ প্রদর্শন করিতেছে, এইরূপ বিবেচনা করা হইত। এই বিভিন্ন মতবাদের পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় স্থাপনের কোন চেষ্টা ইতিপূর্বে হয় নাই। কিন্তু ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দে মাদ্রাজে উপনীত হইয়া স্বামী বিবেকানন্দ সাহসপূর্বক ঘোষণা করেন যে, দ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের চরম অনুভূতিও অদ্বৈতবাদেরই নিম্নতর বিভিন্ন অবস্থামাত্র, এবং সকলের পক্ষেই চরম আনন্দ সেই একমেবাদ্বিতীয় তত্ত্বে বিলীন হইয়া যাওয়া। শোনা যায়, তাহার কোন এক মধ্যাহ্নকালীন প্রশ্নোত্তর-ক্লাসে জনৈক শ্রোতা জিজ্ঞাসা করেন, ইহা সত্য হইলে, পূর্ববর্তী আচার্যগণের কেহ এ বিষয়ে কখনও উল্লেখ করেন নাই কেন? উপস্থিত পণ্ডিতগণের মধ্যে যাহারা ইংরেজী জানিতেন না, তাহাদের সুবিধার জন্য ক্লাসে নিয়ম ছিল, ঐ সকল প্রশ্নের উওর প্রথমে ইংরেজীতে এবং পরে সংস্কৃতে দেওয়া হইবে। বর্তমান ক্ষেত্রে সেই বৃহৎ সভায় উপস্থিত সকলেই তাহার উত্তর শুনিয়া চমকিত হইলেন, “যেহেতু ঐজন্যই আমার জন্ম, এবং ঐ কাজ আমারই জন্য নির্দিষ্ট ছিল।”

ভারতবর্ষে হিন্দুধর্মের অসংখ্য শাখা-প্রশাখার কোন একটিকেও তাহার গণ্ডির বাহিরে রাখিবার কোনপ্রকার চেষ্টা স্বামীজী আদৌ সহ্য করিতে পারিতেন না। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যাইতে পারে, ব্রাহ্ম অথবা আর্যসমাজভুক্ত হওয়ার জন্য কোন ব্যক্তি তাহার নিকট অহিন্দু বলিয়া গণ্য হইতেন না। তাহার মতে শিখদের বিখ্যাত খালসা সৈন্যদলের ন্যায় অতি সুন্দর, সুগঠিত সঙঘ হিন্দুধর্মেরই সৃষ্টি, এবং উহা হিন্দুধর্মেরই অপূর্ব বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। গুরুগোবিন্দ সিংহ ধর্মের জন্য তাহার শিষ্যদের প্রাণ উৎসর্গের যে আহ্বান করিতেন—সেই দৃশ্যটি তিনি কী আবেগের সহিত বারংবার আমাদের নিকট অঙ্কিত করিতেন! তাহার মতে, হিন্দু ধর্মের তিনটি পৃথক স্তরের অস্তিত্ব স্বীকার করা প্রয়োজন। তাহার মধ্যে প্রথম হইল—প্রাচীম, ঐতিহাসিক ধর্ম যাহা শাস্ত্রানুবর্তী। দ্বিতীয় মুসলমান রাজত্বকালে ধর্মসংস্কারকগণ কর্তৃক প্রবর্তিত সম্প্রদায়সমূহ। তৃতীয় বর্তমানকালের সংস্কারপ্রয়াসী বিভিন্ন সম্প্রদায়। কিন্তু সকল সম্প্রদায়ই সমভাবে হিন্দুধর্মভুক্ত। স্বদেশ ও নিজের ধর্মের সমস্যাগুলি বিস্তৃতভাবে অনুধাবন করিবার জন্য তাহার ঐকান্তিক আগ্রহ যে যৌবনে ব্রাহ্মসমাজের সদস্য থাকাকালে প্রথম পূর্ণতার পথে অগ্রসর হয়, একথা তিনি কদাপি বিস্মৃত হন নাই। ঐ সদস্যপদের কথা অস্বীকার করা দূরে থাকুক, বরং একদিন আগ্রহের সহিত তিনি বলিয়া ওঠেন,”তারাই বলুন, আমি তাদেরই একজন কিনা! আমার নাম যদি তারা কেটে না দিয়ে থাকেন, তাহলে তা এখনো তাদের খাতায় আছে!” এইরূপে, কোন ব্যক্তি নিজেকে আর্য, ব্রাহ্ম বা সনাতনপন্থী-ইত্যাদি যে বিশেষণেই অভিহিত করুক, স্বামীজীর মতে সে প্রকৃতপক্ষে হিন্দুই। জৈনদের হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি তো অতি সহজেই সামাজিক আচার-ব্যবহার ও ইতিহাসের সাহায্যে প্রমাণ করা যায়। পশ্চিম ভারতের জৈনরা আজ পর্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিবেন, যদি তাহারা যথার্থ হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। এখনও পর্যন্ত তাহারা বিবাহকালে সমান শ্রেণীর হিন্দুদের নিকট কন্যা আদান-প্রদান করিয়া থাকেন, এবং আজ পর্যন্ত তাহাদের মন্দিরে সময়ে সময়ে পৌরোহিত্য করেন সাধারণ ব্রাহ্মণগণ। সকল ধর্মের মধ্যেই স্বামীজীর শিষ্য ছিল—এমনকি, মুসলমানদের মধ্যেও, এবং তাহার কয়েকজন জৈন বন্ধুর সহায়তায় তিনি এমন কতকগুলি জৈন ধর্মগ্রন্থ পড়িতে পারিয়াছিলেন, যাহা অপর সম্প্রদায়ের লোকেদের সাধারণতঃ দেওয়া হয় না। এই অধ্যয়নের ফলে জৈনদের ধর্মমত ও বংশপরম্পরা ভাবধারার প্রাধান্য সম্পর্কে এবং হিন্দুধর্মের ক্রমবিকাশলাভে জৈনধর্মের বিশেষ অবদান সম্পর্কে স্বামীজী গভীরভাবে প্রভাবিত হন। হিন্দুধর্মের প্রবল আদর্শগুলির অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য হইল, মূক পশুগণের ভিতরেও সেই বিভু বর্তমান বলিয়া তাহাদের প্রতি সদয় ব্যবহার, এবং সাধুজীবনে ত্যাগ-তপস্যার আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এই দুই বৈশিষ্ট্য জৈনগণ কর্তৃক পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত ও বিশেষভাবে প্রচারিত হইয়াছে। আবার জীবাণুঘটিত তত্ত্ব সম্পর্কে তাহাদের সুস্পষ্ট অভিমত হইতে এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাগণের বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়—বিশেষতঃ উহা আধুনিক বিজ্ঞান-গবেষণার পরীক্ষা-নিরীক্ষাদ্বারা সমর্থিত। স্বামীজী বলিতেন, “জৈনরা যে বলে থাকেন, তাদের মতগুলি প্রথমে ঋষিদের দ্বারা প্রচারিত হয়েছিল—এ অতি সত্য, এবং সহজেই বোঝা যায়।”

বর্তমানে ভারতের যে-সব জাতি খ্রীস্টধর্ম গ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের সম্পর্কে স্বামীজী আশা করিতেন, রাজনীতিক্ষেত্রে প্রভুত্বপ্রাপ্ত জাতির ধর্মগ্রহণ করিয়া তাহারা সামাজিক পদমর্যাদায় উন্নীত হইবে, এবং ভাবী যুগে লোকে খ্রীস্টধর্ম বিস্মৃত হইয়া গেলেও তাহারা ঐ উন্নতি বজায় রাখিতে সমর্থ হইবে। এইরূপে, আমরা আশা করিতে পারি যে, ভবিষ্যতে ঊনবিংশ শতাব্দীকে বিভেদসৃষ্টিকর শক্তি বলিয়া লোকে আর মনে রাখিবে না, এবং এই শতাব্দী তখন ভারতের সকল বিষয়ে স্থায়ী উন্নতিরূপ সুফল প্রসব করিবে। এইরূপ উন্নতির সম্ভাবনার দৃষ্টান্তস্বরূপ উত্তরভারতে চৈতন্যদেবের কার্যের উল্লেখ করা যাইতে পারে। তিনি কি তাহার অনুবর্তীদের একটি বিলক্ষণ খ্যাতি-প্রতিপত্তিশালী সমাজে পরিণত করিয়া যাইতে সমর্থ হন নাই?

খ্রীস্টধর্মের বর্তমান কার্যাবলীর জন্য তাহাকে ক্ষমা করা কঠিন। হিন্দুধর্মের অপর প্রতিযোগী ধর্ম, অর্থাৎ মুসলমান ধর্ম কিন্তু সেরূপ নহে। ঐ ধর্মের নাম শ্রবণমাত্র আমাদের আচার্যদেবের মনে সর্বদাই এক আগ্রহপূর্ণ ভ্ৰাতৃভাবের চিত্র উদয় হইত–যে ধর্ম সাধারণ ব্যক্তিগণকে সর্ববিধ স্বাধীনতা প্রদানে এবং উচ্চপদস্থগণকে সর্বসাধারণের পর্যায়ে রাখিতে তৎপর। স্বামীজী মুহূর্তের জন্যও বিস্মৃত হইতে পারিতেন না যে, মুসলমানগণ এদেশে অনধিকার প্রবেশ করিলেও বর্তমান ভারতের ক্রমোন্নতির মূলে যে সকল উপাদান বর্তমান, তাহাদের অন্যতম হইল, মুসলমান কর্তৃক প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ও রাজ্যশাসন পদ্ধতি গ্রহণ। নীচবংশে যাহারা জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের কেবল উচ্চ সামাজিক অধিকারপ্রদানপূর্বক উন্নত করা নহে, পরন্তু এই অতি শান্তজাতির মধ্যে সঙ্ঘবদ্ধভাবে আত্মরক্ষার জন্য উদ্যম এবং বাধাপ্রদানের প্রচেষ্টা এই উভয় আদর্শের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন দ্বারা তাহারা যে উপকার সাধন করিয়াছেন, তাহাও স্বামীজীর নিকট উপেক্ষণীয় ছিল না। তিনি সর্বদা দেখাইয়া দিতেন, মুসলমানদের মধ্যে সৈয়দ, পাঠান, মোগল ও শেখ—এই চারিটি শ্রেণী আছে, এবং ইহাদের মধ্যে ভারতের মাটি ও অতীত-স্মৃতিতে শেখদের উত্তরাধিকারস্বত্ব রহিয়াছে। ঐ স্বত্ব হিন্দুদের মতোই প্রাচীন এবং ঐ সম্পর্কে কোন বিতর্কের স্থান নাই। অবিবেচনাপূর্বক লিখিত একটি শব্দ প্রসঙ্গে তিনি জনৈক শিষ্যকে বলিয়াছিলেন, “সাজাহান নিজেকে ‘বিদেশী’ নামে অভিহিত হতে শুনলে কবরের ভিতর থেকে ফিরে দেখবেন, কে তাকে ঐ রকম বলছে।” সর্বোপরি, মাতৃভূমির কল্যাণকল্পে স্বামীজীর শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা ছিল—ভারত যেন ‘ইসলামীয় দেহ ও বৈদান্তিক হৃদয়’ এই দ্বিবিধ আদর্শকে প্রকাশ করিতে পারে।

এইরূপে, এই সকল ঘটনার রাজনীতিক গুরুত্বের সহিত তাহার কোন সম্পর্ক না থাকিলেও সমগ্র ভারতবর্ষ ছিল তাহার নিকট এক, অখণ্ড এবং গভীরভাবে তলাইয়া দেখিলে উপলব্ধি হইবে যে, ঐ একতা মনের দিক দিয়া নহে, ঐ একতা হৃদয়ের। তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন, জগতে তাহার কার্য তাঁহার গুরুদেবের বার্তা আচণ্ডালে বিতরণ করা। কিন্তু তাহার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও আকাঙক্ষা স্বদেশের কল্যাণসাধনের অদম্য কামনার সহিত বিশেষভাবে জড়িত ছিল। তিনি নিজে কখনও নিছক জাতীয়তা প্রচার করেন নাই; কিন্তু তিনি স্বয়ং ছিলেন জাতীয়তাশব্দে যাহা বুঝায়, তাহার জীবন্ত প্রতিমূর্তিস্বরূপ। ভারতের জাতীয় আদর্শ যে পরস্পরের মধ্যে প্রগাঢ় প্রীতি, আমাদের গুরুদেব নিজের জীবনেই তাহা প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন।

মনে রাখিতে হইবে, ভারতের অতীতের কেবল পুনরুজ্জীবন অথবা পুনঃসংস্থাপন স্বামীজীর একেবারেই অভিপ্রেত ছিল না। যাহারা ঐরূপকরিতে প্রয়াস পাইতেন, তাহাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলিতেন, “মিশর দেশের পুরাতত্ত্ব আলোচনায় রত ব্যক্তিগণের যেমন ঐ দেশের প্রতি একটা স্বার্থজড়িত অনুবাগ থাকে, তেমনি ভারতের প্রতি এদের অনুরাগও সম্পূর্ণ স্বার্থজড়িত।এঁদের পড়া বইগুলিতে, চর্চায় এবং কল্পনারাজ্যে যে ভারতের চিত্র মনের মধ্যে রয়েছে, সেই অতীত যুগের ভারতকেই আবার দেখবার জন্য এরা লালায়িত।” তিনি নিজে চাহিতেন, ভারতের প্রাচীন শক্তির নূতন প্রয়োগ, এই নূতন যুগে তাহার কল্পনাতীত বিকাশ। তিনি ‘ডাইনামিক রিলিজন অর্থাৎ প্রচণ্ড শক্তিশালী এক ধর্ম দেখিবার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করিতেন। ধর্মের মধ্যে যতপ্রকার নীচতা, অধঃপতিত অবস্থা, এবং উন্নতির পরিপন্থী অংশ বিদ্যমান, কেবল সেগুলিকেই বাছিয়া লইয়া লোকে তাহাদের প্রাচীনপন্থী বা ‘গোড়া’ আখ্যায় অভিহিত করিবে কেন? প্রাচীনপন্থী’ শব্দ এত মহান, এত শক্তিশালী, প্রাণপ্রদ যে কিছুতেই উহার ঐভাবে প্রয়োগ চলে না। যে পরিবারে সকল পুরুষই পাণ্ডব বীরগণের তুল্য, সকল নারীই সীতার ন্যায় মহীয়সী, বা সাবিত্রীর ন্যায় নির্ভীক, সেই পরিবার সম্পর্কেই কেবল ঐ শব্দের যথার্থ প্রয়োগ হইতে পারে। রক্ষণশীল অথবা সংস্কারমূলক সকলপ্রকার বিশেষ সমস্যা হইতেই তিনি দূরে অবস্থান করিতেন। তাহার কারণ ইহা নহে যে, একদল অপেক্ষা অন্যদলের প্রতি তিনি অধিকতর সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন; প্রকৃত কারণ, তিনি স্পষ্ট দেখিতে পাইতেন যে, উভয়ের পক্ষেই প্রকৃত প্রশ্ন হইল আদর্শটিকে ঠিক ঠিক ধরিতে পারা, এবং ভারতের সহিত উহার একাত্মতা সাধন। নারীজাতি ও নিম্নশ্রেণীর ব্যক্তিগণ—এই উভয়ের জন্য তাহার অভিমত ছিল যে, তাহাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য সমাজের বর্তমান ব্যবস্থাগুলির পরিবর্তনসাধন নহে, পরন্তু তাহাদের জন্য শিক্ষার দ্বারা এমন অবস্থার সৃষ্টি করা, যাহাতে তাহারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করিয়া লইতে পারে।

অজ্ঞতার প্রতি তাহার যেমন বিদ্বেষ ছিল, জগতে অলৌকিক রহস্য নামে পরিচিত বস্তুর সহিত ভারতের অভিন্নতাবোধও তাহার নিকট ছিল তেমনই উৎকট ভীতিস্বরূপ। এ বিষয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিগণের যে স্বাভাবিক ঔৎসুক্য ও কৌতূহল, তাহা তাঁহারও ছিল, এবং জলের উপর দিয়া হাঁটিয়া যাওয়া, আগুনে হাত দেওয়া প্রভৃতি শুনিলে উহা পরীক্ষা করিয়া দেখিবার জন্য অসুবিধা স্বীকার করিতেও তিনি সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু আমরা সকলেই অবগত আছি যে, বিশেষ অনুসন্ধান করিলে এইসকল ব্যাপার শেষে প্রায়ই অত্যন্ত অবিশ্বাস্য শোনা কথায় পর্যবসিত হয়। যাহা হউক, এইরূপ কোন ক্ষেত্রে ঐ-সকল ঘটনা কেবল ইহাই নির্দেশ করে যে, আমাদের ইন্দ্রিয়গোচর বস্তুগুলির বর্তমান শ্রেণীবিভাগ অসম্পূর্ণ, এবং উহার সংশোধন অবশ্যই করা উচিত, যাহাতে সচরাচর দৃষ্টিতে পড়ে না, অথচ সম্ভবপর, এরূপ ব্যাপারগুলি উহার অন্তর্ভুক্ত হইতে পারে। উহারা আমাদের এই সরল উপদেশটুকু দেয়, ইহা ব্যতীত উহাদের আর কোন তাৎপর্য তাহার নিকট ছিল না। তাঁহার নিকট ঐ-সকল ঘটনা কোনক্রমেই অলৌকিক বলিয়া বিবেচিত হইত না। ঐরূপ অতিপ্রাকৃত কার্যের জন্য ভগবান বুদ্ধ কোন ভিক্ষুর সন্ন্যাসের পরিচ্ছদ কাড়িয়া লইয়াছিলেন এবং এই গল্পটি তাহার নিকট বুদ্ধজীবনের অপরাপর ঘটনার মধ্যে সর্বাপেক্ষা মর্মস্পর্শী বোধ হইত। খ্রীস্টান বাইবেলে যে মহাপুরুষের লীলাসমূহ বর্ণিত হইয়াছে, তাহার সম্বন্ধে তিনি বলিতেন, কতকগুলি অদ্ভুত কর্মের দ্বারা লোকের বিশ্বাস উৎপাদনের চেষ্টা না করিলে, ঐ চরিত্র তাহার নিকট অধিকতর সর্বাঙ্গসুন্দর বলিয়া বোধ হইত। এই বিষয়ে পরবর্তী কালে স্বামী সদানন্দ আমাকে যাহা দেখাইয়া দেন, সম্ভবতঃ তাহাই সত্য—অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিমে এশিয়ার মধ্যে বৌদ্ধিক পার্থক্যের ন্যায় একটা মানসিক ধাতুগত পার্থক্যও আছে। পশ্চিম এশিয়া চিরকাল শক্তি অথবা সিদ্ধাই-এর একটা নিদর্শন চায়, কিন্তু পূর্ব এশিয়া উহা বরাবর ঘৃণা করে। স্বামী সদানন্দের মতে, এই বিষয়ে মোঙ্গলীয় ও সেমিটিকদিগের ধারণা বিশেষরূপে পরস্পরবিরোধী; আর আর্যগণ এই উভয়ের মধ্যস্থলে অবস্থান করিয়া উহার ঔচিত্য সম্পর্কে বিচার করিয়া থাকেন। যাহা হউক, আমাদের অনেকেই স্বীকার করিবেন যে, তথাকথিত অলৌকিক ব্যাপারে আধুনিক কালের আগ্রহই অনেক পরিমাণে এই অনিষ্টকর ধারণার সৃষ্টি করিয়াছে যে, প্রাচ্য মানব এক দুর্বোধ্য প্রকৃতির জীব, মানবজাতির সাধারণ ইচ্ছা অনিচ্ছার সহিত তার যেন কোন সম্পর্ক নাই এবং তাহাদের শরীর যেন অলৌকিক শক্তির গুপ্ত বৈদ্যুতিক আধার। স্বামীজীর নিকট এ-সকল ছিল ঘৃণার বস্তু। তাঁহার আকাঙক্ষা ছিল, সকলে বুঝুক যেভারতবর্ষ মানুষের দ্বারাই অধুষিত; ভারতবাসীদের চরিত্র প্রকৃতই গভীরভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ; এবং তাহাদের সংস্কৃতি স্বাতন্ত্র-সূচক, কিন্তু সকল মানুষের ন্যায় তাহারাও সর্বতোভাবেই মানুষ, এবং সাধারণ মানুষের ন্যায় সকল কর্তব্য, অধিকার বোধ ও সুখদুঃখ তাহাদেরও আছে।

অতীতে ভারতীয় ঋষিগণ ভারতবাসীর নিকট যে ধর্ম প্রচার করিয়াছিলেন, উদারহৃদয় স্বামীজী পাশ্চাত্যগণের নিকট সেই ধর্মই প্রচার করেন, উহা হইল, মানবের অন্তর্নিহিত দেবত্ব, এবং যে কোন আকারের নিষ্ঠাপূর্ণ সেবার মাধ্যমে উহার উপলব্ধি—ইহাই তাহার প্রচারিত ধর্মের মর্মকথা। বাহ্য জগতের যে জীবনে ইন্দ্রিয়জ অনুভূতিকে সার জ্ঞান করিয়া তাহাতেই নিবিষ্টচিত্ত হওয়া—স্বামীজীর মতে উহা কেবল সম্মোহন বা স্বপ্নমাত্র; কোনক্রমেই মহৎ ভাবযুক্ত নহে। প্রাচ্যবাসীর ন্যায় পাশ্চাত্যবাসীরও আত্মার আকাঙক্ষা—এই স্বপ্ন ভাঙিয়া ফেলা, এক গভীরতর এবং অধিকতর শক্তিশালী বাস্তব সত্তায় জাগ্রত হওয়া। সকল মানবের ভিতরেই প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে সেই অনন্ত শক্তি—তাহার এই বিশ্বাস তিনি ক্রমাগত নূতন নূতন ভাবে প্রকাশ করিতে চাহিতেন। একবার তিনি বলেন, “সত্য বটে, আমার নিজের জীবন এক মহাপুরুষের প্রতি প্রগাঢ় ভাবাবেগের অনুপ্রেরণায় পরিচালিত, কিন্তু তাতে কি? অতীন্দ্রিয় তত্ত্বগুলি শুধু এক ব্যক্তির মধ্য দিয়েই প্রচারিত হয় না!”

তিনি আবার বলেন, “সত্য বটে, আমি বিশ্বাস করি যে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ছিলেন একজন আপুরুষ—ঐশীশক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত। কিন্তু, আমিও ঐশীশক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং তুমিও ঐরূপ অনুপ্রাণিত। আর তোমার শিষ্যেরাও ঐরূপ হবে, তারপরে তাদের শিষ্যেরাও-এইভাবে অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে!”

পরীক্ষা দ্বারা যাহারা উপযুক্ত প্রমাণিত হইবে, তাহাদেরই কেবল সত্যের উপদেশ প্রদান করা হইবে—প্রাচীনকালে আচার্যদের এই নিয়ম সম্পর্কে এক ব্যক্তি তাহাকে প্রশ্ন করিলে স্বামীজী অসহিষ্ণুভাবে বলিয়া ওঠেন, “দেখতে পাচ্ছ না, রহস্যব্যাখ্যার নাম করে সত্যকে জনকয়েক লোকের মধ্যে আটকে রাখবার যুগ চলে গেছে? ভালোর জন্যই হোক, অথবা মন্দের জন্যই হোক, সেদিন বিলীন হয়ে গেছে, আর কখনো ফিরবে না। ভবিষ্যতে সত্যের দ্বার সকলের নিকট উদঘাটিত থাকবে!”

ইউরোপীয়দের প্রবর্তিত ধর্মভাব ও সম্প্রদায়সমূহের দ্বারা ভারতবর্ষকে প্লাবিত করিবার প্রচেষ্টা সম্পর্কে স্বামীজী অপূর্ব কৌতুক সহকারে বলিতেন যে, উহা এক জাতির কল্যাণকল্পে অপর এক জাতির উচ্ছেদসাধন বা শোষণের এক সুদীর্ঘ উদ্যমের চরম পরিণতিমাত্র। কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে ঐরূপ ইউরোপীয় নেতৃত্বকে তিনি কদাপি গুরুত্ব প্রদান করিতেন না।

সর্বোপরি, খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে অশোক কর্তৃক দেশবিদেশে প্রেরিত ধর্মপ্রচারকগণের প্রতি মহান ভার অর্পণের ন্যায় তাঁহার স্বজাতির ইতিহাসের আর কোন ঘটনাই তিনি বারংবার উল্লেখ করিতেন না। যাহারা বিভিন্ন দেশে বুদ্ধের ধর্ম বহন করিয়া লইয়া যাইবেন, তাহাদের প্রতি সেই পরাক্রমশালী সম্রাট বলিয়াছিলেন, “মনে রাখবেন, সকল স্থানেই ধর্ম ও সদাচারের কিছু বীজ আপনারা দেখতে পাবেন। দেখবেন, আপনারা যেন ঐ-সকল পোষণ করেন এবং কখনো নষ্ট না করেন।” এইরূপে অশোক স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন যে, সমগ্র জগৎ একদিন বিভিন্ন ভাবরাশির দ্বারা একসূত্রে গ্রথিত হইবে—যে-সকল ভাব সর্বদাই চরম সত্যলাভ ও আদর্শ চরিত্রের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের প্রচেষ্টায় পরিচালিত ও অনুপ্রাণিত। কিন্তু অশোকের ঐ স্বপ্ন সফল হইবার পথে অন্তরায় ছিল, যাহাদের পরস্পরের মধ্যে বিরাট ব্যবধান এইরূপ অজানিত বিশাল বিভিন্ন দেশ ও জাতিগুলির সহিত যোগাযোগ স্থাপন ও গমনাগমনের জন্য প্রাচীনকালের পথ ও যানবাহনের অসুবিধা। সুতরাং তাহার সঙ্কল্পিত সংযুক্ত জগৎ গঠনের প্রাথমিক ধাপগুলি সম্পন্ন করিতেই স্বভাবতঃ এত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল যে, বিশ্বাস ও শক্তির যে প্রথম আবেগ ঐ কার্যের সূত্রপাত করে, ইতিমধ্যে তাহার হয়তো বিলোপ ঘটিবে। সম্ভবতঃ এই সকল বিষয়ের আলোচনা করিয়াই আমরা যখন কাঠগুদাম পার হইয়া উপরে অবস্থিত গিরিবর্গে প্রবেশ করিলাম, তখন একদিন দীর্ঘকাল গভীর চিন্তার পরে সহসা উর্ধ্বে তাকাইয়া স্বামীজী বলিয়া উঠিলেন, “বৌদ্ধদের যে কল্পনা ছিল আধুনিক জগৎই কেবল তার উপযুক্ত হয়েছে। আমাদের পূর্বে আর কেহই ঐ কল্পনাকে প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ পায়নি।”


গ্রন্থমভ্যস্য মেধাবী জ্ঞানবিজ্ঞানতত্ত্বতঃ।
পলালমিব ধান্যার্থী ত্যজে গ্রন্থমশেষতঃ ॥—অমৃতবিন্দু উপনিষদ
শাস্ত্রানাধীত্য মেধাবী অভ্যস্য চ পুনঃ পুনঃ।

পরমং ব্ৰহ্ম বিজ্ঞায় উল্কাবৎ তান্যথোৎসুজেৎ ॥—অমৃতদোপনিষদ্