অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
স্বামীজী বুদ্ধকে কি চক্ষে দেখিতেন

স্বামীজীর জীবনে বুদ্ধের প্রতি ভক্তিই ছিল সর্বপ্রধান বিচারমূলক অনুরাগ। সম্ভবতঃ ভারতের এই মহাপুরুষের জীবনের ঐতিহাসিক প্রামাণ্যই তাহাকে ঐ বিষয়ে আনন্দ প্রদান করিত। তিনি বলিতেন, “ধর্মাচার্যগণের মধ্যে কেবল বুদ্ধ ও মহম্মদ সম্পর্কেই আমরা প্রকৃত ইতিহাস জানি, কারণ সৌভাগ্যক্রমে তাহাদের শত্রু মিত্র দুই-ই ছিল।” তাহার আদর্শ পুরুষের (বুদ্ধের) চরিত্রে যে পূর্ণ বিচারবোধের পরিচয় পাওয়া যায় বার বার তিনি সে-প্রসঙ্গ উল্লেখ করিতেন। তাহার নিকট বুদ্ধ কেবল আর্যগণের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ নহেন, পরন্তু জগতে যত লোক জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সম্পূর্ণ স্থির-মস্তিষ্ক ছিলেন। তিনি কেমন পূজা গ্রহণে অস্বীকার করেন? কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে যে তাহাকে পূজা করা হইয়াছিল, সে বিষয়ে স্বামীজী কোন উচ্চবাচ্য করেন নাই। তিনি বলিতেন, “বুদ্ধ ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়, এক উচ্চ অবস্থা বিশেষ। এস, সকলেই ঐ অবস্থা লাভ কর। এই নাও তার চাবি!”

আজগুবী ব্যাপার সম্পর্কে সাধারণের যে ঔৎসুক্য, বুদ্ধ তাহার প্রতি এত বীতস্পৃহ ছিলেন যে, জনতার সমক্ষে একটা লম্বা খুঁটির উপর হইতে কেবল শব্দের দ্বারা মণিমুক্তাখচিত একটি বাটি নামাইয়া আনার জন্য এক যুবককে সঙ্ঘ হইতে নির্মমভাবে বাহির করিয়া দেন। তিনি বলিয়াছিলেন, ধর্মের সহিত বুজরুকির কোন সম্পর্ক নাই।

এই আনন্দময় পুরুষের কি অসাধারণ স্বাধীনতাবোধ ও নিরভিমানতা ছিল! বারনারী অশ্বপালীর নিমন্ত্রণে তিনি যোগ দেন। মৃত্যু ঘটিতে পারে জানিয়াও তিনি এক অন্ত্যজের গৃহে ভিক্ষাগ্রহণ করেন, কারণ তাঁহার ইচ্ছা ছিল,দীন-হীন ব্যক্তিগণের সহিত সংযোগস্থাপনই যেন তাহার জীবনের শেষকার্য হয়। অতঃপর যাহার গৃহে ভিক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহাকে মহাপরিনির্বাণলাভে সহায়তার জন্য সৌজন্যপূর্ণ বার্তা পাঠান। কি প্রশান্ত! কি পুরুষোচিত আচরণ! সত্যই তিনি ছিলেন পুরুষর্ষভ এবং অশেষ গুণাকর।

আবার তাহার মধ্যে যেমন বিচারশক্তির পূর্ণতা ঘটিয়াছিল, তেমনি তিনি ছিলেন আশ্চর্য দয়ার আধার। রাজগৃহে ছাগগুলির জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। একবার এক ব্যাঘ্রীর ক্ষুধা পরিতৃপ্তির জন্য নিজ শরীর দান করিতে চাহিয়াছিলেন। পঁচশতবার পরার্থে জীবন বিসর্জনের ফলেই ধীরে ধীরে সেই অপার পবিত্র করুণার উদ্ভব হয়, এবং উহাই তাহাকে বুদ্ধত্বে উপনীত করে। জনৈক যুবক সম্বন্ধে তিনি যে গল্পটি বলেন, তাহা হইতে বহুযুগের ব্যবধানেও আমরা তাহার রসজ্ঞানের কিঞ্চিৎ আভাস পাই। যাহাকে জীবনে দেখে নাই, এবং যাহার নাম পর্যন্ত শোনে নাই, এইরূপ এক নায়িকার প্রতি ঐ যুবক গদগদভাবে নিজের প্রেম ব্যক্ত করিতেছে—এই কষ্টকর অবস্থাকে তিনি মানবের ঈশ্বর সম্পর্কে নানা উক্তির সহিত তুলনা করেন। একমাত্র তিনিই ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে স্বর্গ-নরকাদি কল্পনা হইতে মুক্ত করিতে সমর্থ হন। অথচ উহা দ্বারা তাহার শক্তি এবং মানবহৃদয়ে তাহার প্রাণস্পর্শী আবেদন কিছুমাত্র হ্রাস হয় নাই। উহার কারণ তাহার নিজের মহান ব্যক্তিত্বপূর্ণ ক্ষমতা এবং সমসাময়িক ব্যক্তিগণের উপর উহার অসীম প্রভাব।

এক সন্ধ্যায় স্বামীজী, বুদ্ধের সহধর্মিণী যশোধরার নিকট বুদ্ধের জীবনকাহিনী যেরূপ প্রতিভাত হইয়াছিল, তাহার একটি কাল্পনিক চিত্র আমাদের কয়েকজনের নিকট বর্ণনা করেন। ইতিহাসের শুষ্ক অস্থি ঐরূপ পরিপূর্ণ জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ ঘটনার ন্যায় বর্ণিত হইতে আমি ইতিপূর্বে কখনও শুনি নাই। স্বয়ং হিন্দু সন্ন্যাসী হইলেও স্বামী বিবেকানন্দের নিকট ইহা অত্যন্ত স্বাভাবিক বোধ হইয়াছিল যে, বুদ্ধের ন্যায় দৃঢ়চেতা ব্যক্তির পরিণয় সম্পর্কে ইউরোপীয়দের মতো ধারণা থাকিবে, এবং তিনি স্বয়ং দেখিয়া পাত্রী নির্বাচন করার ব্যাপারে দৃঢ় মনোভাব অবলম্বন করিবেন। সপ্তাহব্যাপী উৎসব ও বাগদানের প্রত্যেকটি ঘটনা স্বামীজী বিশদভাবে ও দরদের সহিত বর্ণনা করিলেন। অতঃপর উভয়ের সুদীর্ঘ দাম্পত্যজীবন এবং অবশেষে সেই বিখ্যাত বিদায়রজনীর চিত্র বর্ণিত হইল। দেবগণ গাহিলেন,”জাগো, হে প্রবুদ্ধ! ওঠ এবং জগৎকে সাহায্য কর।” রাজপুত্রের মনের মধ্যে সংগ্রাম চলিতে লাগিল,বার বার তিনি নিদ্রিত পত্নীর শয্যাপার্শ্বে প্রত্যাগত হইলেন। “কি সেই সমস্যা—যা তাকে বিচলিত করিয়াছিল! তিনি যে তার পত্নীকেই জগতের কল্যাণের জন্য বলি দিতে উদ্যত হয়েছেন! তার জন্যই এই সংগ্রাম। নিজের কথা তিনি একেবারেই ভাবছিলেন না।”

অতঃপর তাহার জয়লাভ এবং তাহারই অনিবার্য ফলস্বরূপ বিদায় গ্রহণ, এবং অতি সন্তর্পণে রাজপুত্রীর চরণচুম্বন–এত সন্তর্পণে যে, তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল না। স্বামীজী বলিলেন, “তোমরা কি কখনো বীরদের হৃদয়ের কথা চিন্তা করনি? তাহার হৃদয় মহৎ, অতি মহৎ। সে মহত্ত্বের তুলনা নেই, আবার তাননীর মতোই কোমল!”

দীর্ঘ সাতবৎসর পরে রাজপুত্র—তখন তিনি বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত কপিলাবস্তুতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। যেদিন তিনি তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া যান, সেইদিন হইতে যশোধরাও তাহার নারীজনোচিত উপায়ে স্বামীর ধর্মজীবনের অনুবর্তনকারিণী। তাহার পরিধানে কষায় বসন, আহার কেবল ফলমূল, অনাবৃত স্থানে ভূমিশয্যায় শয়ন। বুদ্ধ প্রবেশ করিলেন, যশোধরা প্রকৃত সহধর্মিণীর ন্যায় তাহার বস্ত্রের প্রান্তভাগ স্পর্শ করিলেন। ভগবানও তাহাকে এবং তাহার পুত্রকে সত্য উপদেশ দিলেন। উপদেশ প্রদানের পর তিনি উদ্যানে চলিয়া যাইবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে যশোধরার চমক ভাঙিল। তিনি পুত্রের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “শীঘ্র যাও, তোমার পিতার নিকট গিয়ে পিতৃধন চেয়ে নাও।”

শিশু যখন প্রশ্ন করিল, “মা, এদের মধ্যে আমার পিতা কে?” যশোধরা গর্বের সহিত উত্তরে কেবল এইটুকু বলিলেন, “যিনি সিংহের ন্যায় রাজপথ দিয়ে যাচ্ছেন, তিনিই তোমার পিতা!”

শাক্যবংশের ভাবী উত্তরাধিকারী কুমার তখন পিতার নিকট গিয়া বলিল, “পিতা, আমাকে আমার পিতৃধন দিন!”

বালক তিনবার বুদ্ধের নিকট ঐরূপ ভিক্ষা করিলে বুদ্ধ আনন্দের দিকে চাহিয়া বলিলেন, ‘ওকে দাও! তখন বালককে গৈরিক বস্ত্র প্রদান করা হইল।

তারপর যশোধরাকে দেখিয়া এবং স্বামীর নিকট থাকিবার জন্য তাহার আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করিয়া প্রধান শিষ্য ভগবানকে বলিলেন, “ভগবান, স্ত্রীলোকেরাও কি সঙ্গে প্রবেশ করিতে পারেন? আমরা কি এঁকেও গৈরিক বস্ত্র প্রদান করব?”

বুদ্ধ উত্তর করিলেন, “জ্ঞানে কি কখনো লিঙ্গভেদ থাকতে পারে? আমি কি কখনো বলেছি যে, স্ত্রীলোকের সঙেঘ প্রবেশাধিকার নেই। কিন্তু আনন্দ, এ প্রশ্ন তোমারই উপযুক্ত।”

এইরূপে যশোধরাও শিষ্যারূপে গৃহীত হইলেন। অতঃপর সেই দীর্ঘ সাত বৎসরের অবরুদ্ধ প্রেম ও করুণা জাতক কাহিনীগুলিতে প্রবাহিত হইল! কারণ, ঐগুলি সবই যশোধরার জন্য! পঁচ শতবার উভয়েই অহংভাবনা বিস্মৃত হইয়া গিয়াছিলেন। এখন তাহারা উভয়ে একত্রে চরম পূর্ণত্বলাভ করিবেন।

“হাঁ, হাঁ, এইরূপই হয়েছিল! যশোধরা এবং সীতার পক্ষে তাদের প্রেমপরীক্ষার জন্য একশ বছর যথেষ্ট সময় নয়।”

ক্ষণকাল নীরবতার পর আখ্যায়িকা সমাপ্ত করিতে গিয়া স্বামীজী আপন মনে বলিলেন, “না, না, এস, আমরা সকলেই স্বীকার করি যে, আমাদের মধ্যে এখনো কামক্রোধাদি বর্তমান! এস, আমরা প্রত্যেকেই বলি, ‘এখনো আমি আদর্শ অবস্থায় উপনীত হইনি।’ কেউ যেন অপর কোন ব্যক্তিকে ভগবান বুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করতে সাহস না করে!” যৌবনের প্রারম্ভে আমাদের গুরুদেব যখন দক্ষিণেশ্বর যাতায়াত করিতেন, সেই সময়ে বৌদ্ধধর্মের প্রতি জগতের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হইয়াছিল। ব্রিটিশ সরকারের আদেশে এই সময়ে বুদ্ধগয়ার বৃহৎ মন্দিরের পুনরুদ্ধার কার্য চলিতেছিল, এবং বাঙালী পণ্ডিত রাজেন্দ্রলাল মিত্র উক্ত কার্যে যোগদান করায় সমগ্র ভারতবাসীর মধ্যে গভীর আগ্রহ দেখা যায়। অধিকন্তু ১৮৭৯ খ্রীস্টাব্দে সার এডউইন আর্ণন্ডের ‘লাইট অব এশিয়া’ গ্রন্থখানি প্রকাশিত হওয়ায় ইংরেজীভাষী দেশগুলিতে অল্পশিক্ষিত সাধারণ লোকের কল্পনাও বিশেষভাবে উদ্দীপিত হয়। ঐ গ্রন্থের অধিকাংশ স্থল অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিতের’ প্রায় আক্ষরিক অনুবাদ বলিয়া কথিত। কিন্তু স্বামীজী কখনও অপরের মুখে কিছু শুনিয়া তৃপ্ত হইতেন না, এবং এই বিষয়েও তিনি নিশ্চিন্ত থাকিতে পারেন নাই; অবশেষে ১৮৮৭ খ্রীস্টাব্দে তিনি গুরুভ্রাতাদের সহিত একত্র কেবল ‘ললিত বিস্তর’ নহে, বৌদ্ধধর্মের মহাযান শাখার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রজ্ঞাপারমিতার’ মূল সংগ্রহ করিয়া অধ্যয়ন করেন তাহাদের সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তিই পালিভাষা বুঝিতে সাহায্য করে, কারণ পালিভাষা সংস্কৃত হইতেই উদ্ভূত। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের রচনাবলী এবং ‘লাইট অব এশিয়া’র অধ্যয়ন স্বামীজীর জীবনের স্বল্পকাল স্থায়ী ঘটনামাত্র হয় নাই। শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট শিষ্যরূপে অবস্থানকালে তাহার এই প্রধান শিষ্যের সূক্ষ্মভাবপ্রবণ চিত্তে এইরূপে যে বীজ উপ্ত হয়, তাহা সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষালাভের সঙ্গে সঙ্গে পুষ্পভারে বিকশিত হইয়া উঠে। কারণ, ঐ সময়ে তাহার প্রথম কার্য হইল অবিলম্বে বুদ্ধগয়া গমন, এবং সেই মহাবৃক্ষতলে উপবেশন করিয়া আপনমনে চিন্তায় মগ্ন হইয়া যাওয়া, “এ কি সত্যই সম্ভব, তিনি যে বায়ুতে নিঃশ্বাস গ্রহণ করেছিলেন, আমিও সেই বায়ুতে শ্বাস গ্রহণ করছি?—যে ভূমির উপর তিনি বিচরণ করেছিলেন, আমিও তার উপরেই বিচরণ করছি?”

তাহার জীবনের শেষভাগে—তাহার উনচল্লিশ বৎসরের জন্মদিনের প্রাতঃকালে তিনি অনুরূপভাবে বুদ্ধগয়ায় উপস্থিত হন। কাশী দর্শনান্তে এই যাত্রার শেষ হয়, এবং ইহাই তাহার জীবনের শেষ ভ্রমণ। তাহার ভারত পর্যটনের বৎসরগুলিতে কোন সময়ে তিনি বুদ্ধের ভস্মাবশেষ অস্থি স্পর্শ করিবার অনুমতি লাভ করেন—সম্ভবতঃ যে স্থানে ঐসকল অস্থি প্রথম আবিষ্কৃত হয়, তাহারই সন্নিকটে। ঐ সময় তিনি যে প্রবল ভক্তি ও নিঃসংশয়তার ভাবে বিশেষ অভিভূত হইয়াছিলেন, পরবর্তী কালে ঐ ঘটনার উল্লেখ করিতে গেলে তাহার কিছুটা প্রকাশ সর্বদাই দেখা যাইত। অবতারগণকে ঈশ্বরজ্ঞানে পূজা করা সম্বন্ধে একবার তাহাকে কেহ প্রশ্ন করিলে তিনি যে উত্তর দেন, তাহা খুবই স্বাভাবিক; তিনি বলেন, ‘সত্য বলতে কি মহাশয়া, ন্যাজারেথবাসী ঈশার সময়ে আমি যদি জুডিয়ায় বাস করতাম, তাহলে চোখের জল দিয়ে নয়, হৃদয়ের শোণিতে আমি তার পা-দুখানি ধুয়ে দিতাম।”

তিনি কোন ধর্মাবলম্বী ঠিক না জানিয়া, একজন ভ্রমবশতঃ তাহাকে বৌদ্ধ বলায় তিনি বলিয়া উঠেন, “বৌদ্ধ! আমি বুদ্ধের দাসানুদাসের দাস!” বুদ্ধের প্রতি তাহার ভক্তি এরূপ প্রগাঢ় ছিল যে, বৌদ্ধমতে বিশ্বাসী হওয়াও যেন তাহার নিকট এক উচ্চ অবস্থায় উপনীত হওয়া বোধ হইত—যেন তিনি উহাও দাবি করিতে পারেন না।

বুদ্ধের অস্তিত্বের ঐতিহাসিক প্রামাণ্যই কেবল তাহাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে নাই। আর একটি প্রধান কারণ এই যে, তাহার প্রত্যক্ষদৃষ্ট গুরুদেবের জীবনের সহিত আড়াই হাজার বৎসর পূর্বেকার এই সর্বজনস্বীকৃত ইতিহাসের বহু পরিমাণে ঐক্য পরিলক্ষিত হয়। ভগবান বুদ্ধের জীবনে তিনি দেখিতে পাইয়াছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে; শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে তিনি দেখিয়াছিলেন ভগবান বুদ্ধকে।

একদিন বুদ্ধের দেহত্যাগের দৃশ্য বর্ণনা করিতে করিতে চকিতের ন্যায় তাহার মনে এই চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটিল। তিনি বলিতে লাগিলেন—কিরূপে এক বৃক্ষতলে তাহার জন্য কম্বল বিছানো হইয়াছিল, এবং সেই আনন্দময় পুরুষ “সিংহের ন্যায় দক্ষিণ পার্শ্বে শয়ন করিয়া” মৃত্যু-প্রতীক্ষায় রত, এমন সময়ে সহসা এক ব্যক্তি তাহার নিকট দৌড়িয়া আসিল উপদেশ গ্রহণের জন্য। শিষ্যগণ তাহাদের প্রভুর মৃত্যুশয্যার নিকট যেরূপে হউক শান্তিরক্ষা করিবার জন্য ঐ ব্যক্তির সেই সময়ে আগমন অনুচিত ভাবিয়া তাহাকে ফিরাইয়া দিতেছিলেন, কিন্তু ভগবান দূর হইতে তাহাদের কথাবার্তা শুনিতে পাইয়া বলিলেন, “না, না! ফিরিয়ে দিও না! তথাগত সর্বদাই প্রস্তুত।” তিনি কনুয়ের উপর ভর দিয়া একটু উঠিয়া তাহাকে উপদেশ দিলেন। চারবার এইরূপ ঘটিল; তখনই কেবল বুদ্ধ ভাবিলেন, এখন আমি নিশ্চিন্তচিত্তে মরতে পারি। তাহার পূর্বে নহে। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “কিন্তু প্রথমে তিনি ক্রন্দন করার জন্য আনন্দকে তিরস্কার করেন। বললেন, বুদ্ধ কোন ব্যক্তি বিশেষ নয়, উহা এক উচ্চ অবস্থাবিশেষ এবং যে কেহ ঐ অবস্থা লাভ করতে পারে আর শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে তিনি কারও পূজা করতে নিষেধ করেন।”

অমর কাহিনী ক্রমে সমাপ্ত হইল। কিন্তু বর্ণনাকালে স্বামীজী যখন “কনুয়ের উপর ভর দিয়ে একটু উঠে তাকে উপদেশ দিলেন” এইখানে আসিয়া একটু চুপ করিলেন, এবং কথার পিঠে বলিলেন, “দেখ, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের জীবনে এটা আমি নিজের চোখে দেখেছি?”—তখন শ্রোতার নিকট ঐ অংশটি সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ বলিয়া বোধ হইয়াছিল। আমার মনে সেই ব্যক্তির কথা উদিত হইল, সেই আচার্যশ্রেষ্ঠের নিকট শিক্ষালাভ যাহার ভাগ্যে ছিল। একশত মাইল দূর হইতে তিনি আসিতেছিলেন, এবং যখন তিনি কাশীপুরে উপনীত হইলেন, তখন পরমহংসদেবের অন্তিমকাল উপস্থিত। এক্ষেত্রেও শিষ্যগণ তাহার আগমনে বাধা দিতেন, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ আপনা হইতে বলিলেন, “ওকে আসতে দাও, আমি ওকে উপদেশ দেব।”

বৌদ্ধমতবাদের ঐতিহাসিক ও দার্শনিক তাৎপর্য সম্পর্কে স্বামীজী সর্বদা মনে মনে গভীরভাবে আলোচনা করিতেন। হঠাৎ ঐ প্রসঙ্গের উল্লেখ এবং আকস্মিক উক্তিসকল দ্বারা বোঝা যাইত যে, তাহার মনে ঐ সম্পর্কে চিন্তা সর্বদা বিদ্যমান। একদিন তিনি বুদ্ধের উপদেশ হইতে উদ্ধৃত করিয়া বলিলেন, “রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান—এই হলো পঞ্চস্কন্ধ বা পঞ্চতত্ত্ব যা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, এবং পরস্পরের সঙ্গে সংমিশ্রিত। এরই নাম ‘মায়া। কোন একটি বিশেষ তরঙ্গ সম্বন্ধে কিছুই বলা যায় না, কারণ যা ছিল, এখন আর তা নেই। এক সময়ে সেটা ছিল, কিন্তু এখন গত। হে মানব, জেনো যে, তুমি সাগরস্বরূপ!” তিনি আরও বলিলেন, “মহর্ষি কপিলও এই দর্শনই প্রচার করেন; কিন্তু তার মহানুভব শিষ্যের (বুদ্ধের) অদ্ভুত হৃদয় সেই দর্শনকে জীবন্ত করে তোলে।”

তারপর সেই পুরুষশ্রেষ্ঠের কথাগুলি অন্তরে ধ্বনিত হওয়ায় তিনি ক্ষণকালের জন্য নীরব রহিলেন। পরে ধম্মপদ হইতে মানবাত্মার প্রতি তাহার অমর আদেশবাণী আবৃত্তি করিলেন, “কোন নির্দিষ্ট পথের দিকে লক্ষ্য না রেখে ক্রমাগত এগিয়ে যাও! নির্ভীক অন্তরে, সমস্ত তুচ্ছ করে একাকী গণ্ডারবৎ বিচরণ কর।” “সিংহ যেমন কোন শব্দে ভীত হয় না, বায়ু যেমন জালে বদ্ধ হয় না, পদ্মপত্র যেমন জলে লিপ্ত হয় না, তুমিও তেমনি একাকী গণ্ডারবৎ বিচরণ কর।”

একদিন স্বামীজী বৌদ্ধদের প্রথম সভা এবং তাহাদের সভাপতি নির্বাচন সম্পর্কে বিবাদ—এই প্রসঙ্গ বর্ণনা করিতে গিয়া বলিলেন, “তাদের তেজ কিরূপ ছিল, তোমরা কি তা কল্পনা করতে পার? একজন বললেন, ‘আনন্দই সভাপতি হবে, কারণ সেই তাকে সর্বাপেক্ষা ভালবাসত।’ কিন্তু আর একজন অগ্রসর হয়ে বললেন, ‘তা হবে না। কারণ আনন্দ তার মৃত্যুশয্যায় ক্রন্দন করার অপরাধে অপরাধী। সুতরাং তাকে বাদ দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হলো।”

তিনি বলিতে লাগিলেন, “কিন্তু বুদ্ধ মারাত্মক ভুল করেছিলেন এই ভেবে যে, সমগ্র জগৎকে উপনিষদের উচ্চ আদর্শে উন্নীত করা যেতে পারে। ফলে স্বার্থপরতা সমস্ত নষ্ট করে দিল। শ্রীকৃষ্ণ বুদ্ধের চেয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন, কারণ তিনি দেশকাল-পাত্র বুঝে কাজ করবার কৌশল জানতেন কিন্তু বুদ্ধের কাছে কোন আপস ছিল না। জগতের ইতিহাসে ইতিপূর্বেই দেখা গেছে যে, আপস করবার জন্য অবতারপুরুষও বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছেন, বুঝতে না পেরে তাকে যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। বুদ্ধ যদি মুহূর্তের জন্যও আপস করতেন, তবে তার জীবিতকালেই তিনি সমগ্র এশিয়ায় ঈশ্বররূপে পূজিত হতেন। কিন্তু তার উত্তর ছিল, ‘বুদ্ধত্ব এক উচ্চ অবস্থাপ্রাপ্তি, কোন ব্যক্তি বিশেষ নয়। সত্যই, জগতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ ছিলেন—জগতে যত লোক জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি।”

খ্রীস্টান আমরা যে যন্ত্রণাভোগকে পূজা করিতে ভালবাসি, তাহার প্রতি স্বামীজীর ঘৃণা ছিল। উহা দ্বারা ভারতের স্বচ্ছ চিন্তাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যে অনেকে তাহাকে বলেন যে, বুদ্ধ ক্রুশবিদ্ধ হইয়া প্রাণত্যাগ করিলে তাহার মহত্ত্ব অধিকতব হৃদয়গ্রাহী হইত! ইহাকে তিনি ‘রোমক বর্বরতা বলিয়া তীব্রভাবে নিন্দা করিতে বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করেন নাই। তিনি দেখাইয়া দেন, “সর্বাপেক্ষা নীচ ও পাশবপ্রকৃতির লোকেরাই কোন একটা অসাধারণ ব্যাপারের পক্ষপাতী। অতএব জগৎ চিরকাল বীরত্বের কাহিনী বা মহাকাব্য ভালবাসবে। কিন্তু ভারতের সৌভাগ্য যে, সে কখনো হেঁট মুণ্ডে গভীর অতলস্পর্শ গহুরে নিক্ষেপ করলেন (Hurled headlong down the steep abyss)’, এই রকম রচনার স্রষ্টা মিল্টনের মতো কবি প্রসব করেনি। ঐ কাব্যের সবটার বদলে ব্রাউনিঙ-এর দুই-এক ছত্র কবিতা পাওয়া গেলেও লাভ!” তাহার মতে খ্রীস্টজীবনের কাহিনীগুলির মধ্যে এই মহাকাব্যোচিত শক্তি বা তেজই রোমকদের হৃদয় স্পর্শ করিয়াছিল। ঐ ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাই রোমীয় জগতের সর্বত্র খ্রীস্টধর্ম প্রসারিত হওয়ার কারণ। তিনি পুনরায় বলিলেন, “একথা অস্বীকার করা যায় না যে, পাশ্চাত্যবাসী তোমরা বড় বড় কাজ দেখতে চাও! জীবনের প্রত্যেক সাধারণ ক্ষুদ্র ঘটনার মধ্যে যে কবিত্ব নিহিত থাকে, তা তোমরা এখনো অনুভব করতে পার না। মৃতপুত্র ক্রোড়ে তরুণী মাতার বুদ্ধের নিকট আসা—এ কাহিনীর মতো আর কোন্ কাহিনীর মাধ্য বেশি? অথবা, ছাগশিশুদের জীবনরক্ষার গল্পটি? তোমরা জান যে, মহাভিনিষ্ক্রমণ ব্যাপারটি ভারতে কিছু নূতন নয়। গৌতম ছিলেন এক সামান্য রাজার পুত্র। তার পূর্বে অনেকে ঐরূপ ঐশ্বর্য ত্যাগ করে চলে গেছে। কিন্তু নির্বাণের পর, আহা! দেখ কি কবিত্ব।

“এক বিরামহীন বর্ষণের রাত্রি। তিনি এক গোপের কুটিরে এসে ছাঁচের নিচে দেওয়াল ঘেঁসে দাঁড়ালেন। ছাঁচ থেকে বৃষ্টির জল ঝরছে। প্রবল বৃষ্টি পড়ছে, এবং বাতাসের বেগ বাড়ছে।

“কুটিরের ভেতর গোপ জানালার মধ্য দিয়ে চকিতের ন্যায় একখানি মুখ দেখতে পেল। মনে মনে সে বললে, “বেশ, বেশ! গেরুয়াধারী! থাকো ওখানে, তোমার পক্ষে ঐ যথেষ্ট। তারপর সে গান আরম্ভ করে দিল, আমার গরুবাছুর নিরাপদে ঘরে উঠেছে, আগুনও খুব জ্বলছে, আমার স্ত্রী নিরাপদ, ছেলেমেয়েরাও সুখে নিদ্রা যাচ্ছে! সুতরাং মেঘেরা, আজ রাত্রে তোমরা স্বচ্ছন্দে বর্ষণ করতে পার!

“বুদ্ধ বাইরে থেকে উত্তর দিলেন, ‘আমার মন সংযত, ইন্দ্রিয় প্রত্যাহৃত; আমার হৃদয় দৃঢ়। অতএব মেঘেরা, আজ রাত্রে তোমরা স্বচ্ছন্দে বর্ষণ করতে পার?’

“তারপর গোপ আবার গাইল, ‘ক্ষেতে ফসলকাটা শেষ, খড়গুলিও খামারে ভাল করে রাখা আছে; নদী পরিপূর্ণ, আলগুলি বেশ দৃঢ়। সুতরাং মেঘেরা, ইচ্ছা হলে তোমরা আজ রাত্রে বর্ষণ করতে পার।’

“এইভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হবার পর, অবশেষে বিস্মিত ও অনুতপ্ত হয়ে গোপ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করল।

“অথবা নাপিত উপালির আখ্যান অপেক্ষা সুন্দরতর আর কিছু হতে পারে কি?–

“ভগবান আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; আমি একজন সামান্য নাপিত আমারও বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন! আমি দৌড়ে গেলাম। কিন্তু তিনি নিজেই ফিরলেন এবং আমার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

“আমি এক নগণ্য নাপিত, আমার জন্য অপেক্ষা করলেন!

আমি বললাম, প্রভু, আপনার সঙ্গে আমি কথা বলতে পারি কি?

তিনি বললেন, হাঁ।

আমি নাপিত, আমাকেও ‘হাঁ’ বললেন!

আমি বললাম, নির্বাণ কি আমাদের মতো লোকদের জন্যও?

তিনি বললেন, নিশ্চয়!

আমি নাপিত, আমার জন্যও।

তারপর আমি বললাম, প্রভু, আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি?

উত্তরে তিনি বললেন, নিশ্চয় পার।

আমি যে নাপিত, সেই আমাকেও অনুমতি দিলেন!

আমি আবার বললাম, প্রভু, আমি আপনার নিকট থাকতে পারি?

তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থাকতে পার।

আমি এক দরিদ্র নাপিত, আমাকেও তিনি তার কাছে থাকবার অনুমতি দিলেন!”

একদিন স্বামীজী বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস সংক্ষেপে এইরূপ বলেন যে, বৌদ্ধধর্মের তিনটি যুগের মধ্যে পাচশত বৎসর বুদ্ধোত্ত বিধিসমূহের যুগ, পঁচশত বৎসর প্রতিমা পূজার এবং পাচশত বৎসর তন্ত্রের যুগ। সহসা ঐ প্রসঙ্গ পরিত্যাগ করিয়া তিনি বলিলেন, “কখনো ভেবো না যে, ভারতে কোনকালে বৌদ্ধধর্ম বলে কোন পৃথক ধর্ম ছিল, আর তার নিজস্ব মন্দির ও পুরোহিত প্রভৃতি ছিল! একেবারেই নয়। বৌদ্ধধর্ম চিরকাল ছিল হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত। কেবল একসময়ে বুদ্ধের প্রভাব অত্যধিক হয়ে উঠে, এবং তার ফলে সমগ্র জাতি সন্ন্যাসপথ অবলম্বন করে।” আমার বিশ্বাস, বহু সময় ও অধ্যয়নের দ্বারাই কেবল এই মতবাদের সত্যতা পণ্ডিতগণের নিকট ক্রমে ক্রমে প্রতিপন্ন হইতে পারে। এই মতানুসারে প্রচারক প্রেরণের দ্বারা বিজিত দেশগুলিতেই বৌদ্ধধর্ম সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব মন্দিরাদি স্থাপন করিয়াছিল। কাশ্মীর ঐসকল দেশের অন্যতম। স্বামীজী এই সম্পর্কে এক চিত্তাকর্ষক ঐতিহাসিক তথ্য বর্ণনা করিয়া বলেন যে, ঐ দেশে ভারতীয় মহাপুরুষগণ বৌদ্ধধর্মের অঙ্গরূপে পরিগৃহীত হইবার পর স্থানীয় নাগগণ (অর্থাৎ কুণ্ডের অভ্যন্তরস্থ যে-সকল অদ্ভুত ক্ষমতশালী সর্পের অস্তিত্ব কল্পনা করা হইত) স্বভাবতঃ দেবত্বপদবী হইতে বিচ্যুত হয়। আশ্চর্যের বিষয়, তাহাদের ঐ ক্ষমতাচ্যুতির পরেই প্রচণ্ড শীত পড়ে, এবং ভীত জনসাধারণ কর্তৃক পুরাতন কুসংস্কার ও নূতন সত্য—এই উভয়ের মধ্যে দ্রুত একটা আপসবিধান হয়। ফলে নূতন ধর্মের মহাপুরুষ অথবা গৌণ দেবতারূপে নাগগণের পুনঃ প্রতিষ্ঠা ঘটে—মানব স্বভাবের এই প্রকার কার্যের দৃষ্টান্ত অন্যত্রও বিরল নহে।

বৌদ্ধধর্ম ও তাহার জননীস্বরূপ হিন্দুধর্মের মধ্যে অন্যতম প্রধান পার্থক্য এই যে, হিন্দুরা একই আত্মার পুনঃ পুনঃ জন্মান্তর পরিগ্রহের দ্বারা কর্মসঞ্চয়ে বিশ্বাস করেন, কিন্তু বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা হইল, এই আপাত-প্রতীয়মান একত্ব মায়ামাত্র এবং ক্ষণিক। বৌদ্ধমতে প্রকৃতপক্ষে আমরা এ-জীবনে যে কর্ম সঞ্চিত রাখিয়া যাই, অপর এক আত্মায় উহা বর্তায় এবং আমাদের ঐ অভিজ্ঞতাসহ সে নূতন কর্মবীজবপনে অগ্রসর হয়। এই প্রতিদ্বন্দ্বী মতদ্বযের অন্তর্নিহিত গুণাবলী সম্পর্কে স্বামীজী প্রায়ই চিন্তা করিতে বসিনে। তাহার মতো যাহাদের নিকট অতীন্দ্রিয় অনুভূতির দ্বার উদঘাটিত হইয়াছে তাহাদেব, এবং উহার ছায়ায় যাহারা বাস করিয়াছেন—কতক পরিমাণে তাহাদের নিকটেও আত্মার শরীরে অবস্থিতি এক চিরযন্ত্রণাকর বন্ধন। পিঞ্জরাবদ্ধ আত্মা শরীররূপ কারাগারের গারদে বিদ্রোহীর ন্যায় অবিরত আঘাত হানিতেছে; কারণ, শবীররূপ কারাগারের বাহিরে সেই শুদ্ধ, চৈতন্যময়, ভাবঘন, সদানন্দ পরম জ্যোতির্ময় ধাম সে দেখিতে পায় উহাই তাহার আদর্শ ও লক্ষ্য। এই সকল ব্যক্তির নিকট শরীর পরস্পরের সহিত সম্পর্ক স্থাপনের সহায় হওযাব পরিবর্তে একটা আবরণ, মহা প্রতিবন্ধক! সুখ-দুঃখ সেই আদি চৈতন্যই—কেবল ব্যষ্টিচৈতন্যের পরকলাব মধ্য দিয়া প্রতিভাত। সকলেই একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত—এই উভয়ের পারে যাইয়া সেই শুদ্ধ, অখণ্ড জ্যোতিস্বরূপকে প্রত্যক্ষ করা।

প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে স্বামীজীর অসহিষ্ণু উক্তিগুলির মধ্যে প্রায়ই উপরিউক্ত চিন্তা-পরম্পরা প্রকাশ পাইত। যেমন, একদিন সহসা তিনি বলিয়া উঠিলেন, “কি আশ্চর্য! এক জন্ম শরীর ধারণই মনে হয়, লক্ষ লক্ষ বৎসর কারাগারের তুল্য; লোকে আবার পূর্ব পূর্ব জন্মের স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চায়। প্রতিদিনের ভাবনা-দুশ্চিন্তাই প্রতিদিনের পক্ষে যথেষ্ট, আর অন্য দিনের ভাবনায় কাজ নেই!” তথাপি অভিজ্ঞতার এক দীর্ঘ শৃঙ্খলে আবদ্ধ বিভিন্ন ব্যক্তিগণের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের প্রশ্নটি তাহার নিকট সকল সময়ে চিত্তাকর্ষক বোধ হইত। পুনর্জন্মবাদকে তিনি কদাপি অবিসংবাদী সত্য বলিয়া জ্ঞান করিতেন না। ব্যক্তিগতভাবে তাহার নিকট উহা এক বিজ্ঞানসম্মত অনুবাদ মাত্র, তবে উহাতে বিশেষভাবে সন্দেহের নিরসন ঘটে। ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি হইতে সকল জ্ঞানের উৎপত্তি, আমাদের পাশ্চাত্য দেশে শিক্ষা-সম্বন্ধে এই মতের প্রতিকূলে স্বামীজী সর্বদাই জন্মান্তরবাদের প্রসঙ্গ উত্থাপনপূর্বক নিজ পক্ষ সমর্থন করিবার জন্য দেখাইয়া দিতেন যে, পাশ্চাত্য-কথিত এই জ্ঞানোন্মেষ প্রায়ই নির্দিষ্ট ব্যক্তির সুদূর অতীত জীবনে ঘটিয়া থাকে বলিয়া উহাকে আর লক্ষ্য করা যায় না।

তথাপি উভয় পক্ষের সব বক্তব্য শেষ হইবার পরেও বৌদ্ধধর্ম অবশেষে দার্শনিক তথ্য হিসাবে যথার্থ প্রতিপন্ন হইতে পারে কিনা এ প্রশ্ন থাকিয়াই যায়। পুনঃ পুনঃ জন্মপরিগ্রহের মধ্যে একই আত্মার অনুবর্তন ও অপরিবর্তনীয়তা—এই সম্পর্কে আমাদের সমগ্র ধারণা কি ভ্রান্তিমূলক নহে, যেহেতু পরিশেষে একই সৎ, বহু অসৎ’—এই অনুভূতির নিকট উহার পরাভব ঘটে? দীর্ঘকাল নীরবে চিন্তার পর একদিন স্বামীজী বলিয়া উঠিয়াছিলেন, “ঠিক, বৌদ্ধধর্ম নিশ্চয় যথার্থ বলছে! পুনর্জন্ম মরীচিকামাত্র! কিন্তু এই অনুভূতিলাভ কেবল অদ্বৈতমার্গেই সম্ভব।”

সম্ভবতঃ বুদ্ধ ও শঙ্করাচার্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধাইয়া দিয়া অবশেষে বৌদ্ধধর্মের অপূর্ণতা দূর করিবার উদ্দেশ্যে অদ্বৈতবাদের অবতারণা করিয়া স্বামীজী কৌতুক অনুভব করিতেন। হয়তো ইহা দ্বারা ইতিহাসের দুই বিভিন্ন যুগের সম্মিলন সাধিত হয় বলিয়াই তিনি এত আনন্দিত হইতেন, যেহেতু ইহা দ্বারা প্রতিপন্ন হয় যে, উক্ত মদ্বয়ের মধ্যে একটি অপরটির সাহায্য ব্যতীত অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। মনুষ্যত্বের চরম বিকাশের সংজ্ঞা নির্দেশ করিতে গিয়া তিনি সর্বদাই বলিতেন, ”বুদ্ধের হৃদয় এবং শঙ্করাচার্যের মনীষা।” বৌদ্ধ কর্মবাদেব বিরুদ্ধে জনৈকা পাশ্চাত্য মহিলার যুক্তিসমূহ তিনি ঐভাবেই শ্রবণ করেন। ঐ মত গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যে একটা অসাধারণ সামাজিক দায়িত্ববোধ জড়িত থাকে সে কথা মহিলা ধরিতে পারেন নাই। তিনি বলিলেন, “যেখানে আমার সৎকর্মের ফল আমি ভোগ করতে পারব না, অপরে করবে, সেখানে আমি আদৌ সৎকর্ম করতে যাব কেন, তার কারণ আমি খুঁজে পাই না।”

স্বামীজী নিজে ঐ ভাবে চিন্তা করিতে একান্ত অশক্ত হইলেও উক্ত মন্তব্যে তিনি বিশেষ আকৃষ্ট বোধ করেন; এবং দুই-একদিন পরে নিকটস্থ এক ব্যক্তিকে বলেন, “সেদিন যে কথাটি উঠেছিল, তা বড় চমৎকার—অর্থাৎ পরের উপকার করবার কোন কারণই থাকে না, যদি যাদের উদ্দেশ্যে করা হয়, তারা তার ফলভোগ না করে অপরে করে।”

স্বামীজী যাহাকে কথাগুলি বলেন, তিনি অশিষ্টের মতো উত্তর দেন,”কিন্তু তা নিয়ে তো তর্ক হয়নি! কথা ছিল এই যে, আমি ছাড়া অপর কেহ আমার কর্মের ফল ভোগ করবে।”

ধীরভাবে স্বামীজী উত্তর দিলেন, “তা জানি, কিন্তু আমাদের পরিচিতা মহিলা যদি কথাটি ঐভাবে বলতেন, তবে তার নিজের মতটি আরও যুক্তিযুক্ত হতো। ধর, তিনি ঐভাবেই প্রশ্নটি করেছেন—অর্থাৎ অপরের উদ্দেশ্যে উপকার করে আমরা বঞ্চিত হয়ে থাকি, কারণ ঐ উপকার তাদের কাছে পৌঁছায় না। দেখছ না, ওর একটিমাত্র উত্তর আছে, তা হলো অদ্বৈতবাদ! কারণ, আমরা সকলেই এক!”

তিনি কি হৃদয়ঙ্গম করেন যে, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের হিন্দুমনের মধ্যে ঠিক এই পার্থক্যই বিদ্যমান যে, ভারতের আধুনিক ধারণায় বৌদ্ধধর্ম ও বুদ্ধের স্থান সর্বদাই থাকিবে? তিনি কি ভাবিয়াছিলেন যে, গুপ্তযুগ হইতে যে রামায়ণ ও মহাভারত ভারতীয় শিক্ষার উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিয়া আসিয়াছে, অতঃপর সাধারণ লোক তাহার সহিত অশোক ও তাহার পূর্ববর্তী যুগের ইতিহাসও সংযুক্ত করিয়া দিবে? এশিয়ার পক্ষে এরূপ একটি সমন্বয়সাধনের উৎপর্য কত ব্যাপক, বৌদ্ধদেশসমূহের ধমনীতে হিন্দুধর্ম হইতে কি নূতন প্রাণ সঞ্চার হইবে, আবার জননীস্বরূপ হিন্দুধর্মও আত্মস্থ হইয়া কন্যাস্থানীয় বৌদ্ধজাতিগুলিকে জ্ঞানামৃত পান করাইলে স্বয়ং ভারতও কত শক্তি বীর্য লাভ করিবে—এ-সকল কথা কি স্বামীজী ভাবিয়াছিলেন? তিনি কি ভাবিয়াছিলেন জানি না, কিন্তু আমাদের বিস্মৃত হইলে চলিবে না যে, হিন্দুধর্মের মধ্যেই তিনি এই দুই ধর্মের দৃঢ় সম্মিলনভূমি দেখিতে পাইয়াছিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, জননী হিন্দুধর্মই সকল ধর্মমতকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করিতে সমর্থ; কন্যা বৌদ্ধধর্ম নয়। যেহেতু তিনি মহীয়সী ও প্রেমময়ী জননী, তাই তাহার ক্রোড়ে অবতারগণের মধ্যে সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা বিশাল-হৃদয় সেই মহামহিম বুদ্ধাবতারের স্থান চিরকালের জন্য আছে। বুদ্ধ প্রবর্তিত সম্প্রদায়গুলিকে তিনি আশ্রয় দিয়াছেন, তৎ-প্রচারিত শিক্ষার মর্ম তিনি অনুধাবন করিয়া শ্রদ্ধা করেন, তাহার আশ্রিত ভক্তগণের প্রতি মাতার ন্যায় স্নেহশীলা, এবং তাহার নিকট আনীত সকল নবজাতক সন্তানের (বৌদ্ধধর্ম বা বুদ্ধের জন্য সহানুভূতি বা সাদর সম্ভাষণও রহিয়াছে। কিন্তু সত্যকে বুদ্ধ যে আকারে প্রচার করিয়াছেন, সত্য তাহাতেই বদ্ধ, তাহার বাহিরে নাই, কেবল সন্ন্যাসমার্গ অবল নেই। মুক্তিলাভ সম্ভব, অথবা চরম পূর্ণতালাভের একটিই পথ বিদ্যমান-এ-সব কথা হিন্দুধর্ম কখনও বলিবে না। বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে সম্ভবতঃ স্বামীজীর শ্রেষ্ঠ উক্তি হইলঃ

বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুধর্মের মধ্যে প্রধান পার্থক্য এই যে, বৌদ্ধধর্ম বলেন, যা কিছু দেখছ, তা সবই মায়া বলে জেনো! আর হিন্দুধর্ম বলেন, জেনো যে, মায়ার অন্তরালে রয়েছেন সেই সত্যবস্তু। এই অনুভূতি কি উপায়ে লাভ হবে, সে সম্বন্ধে হিন্দুধর্ম কোন বাধাধরা নিয়ম করে দেননি। বৌদ্ধধর্মের আদেশ কেবল সন্ন্যাসের দ্বারাই পালন করা চলে; হিন্দুধর্মের আদেশ জীবনের সকল অবস্থায় পালন করা যায়। হিন্দুধর্মমতে সকল মতই সেই অদ্বিতীয় সত্যে উপনীত হবার এক একটি পথ। হিন্দুধর্মের অন্যতম উচ্চ ও শ্রেষ্ঠ উপদেশ এক ব্যাধের মুখ দিয়ে বিবৃত হয়েছে এক পতিব্রতা নারীর নির্দেশে কোন সন্ন্যাসীর নিকট তিনি ঐ উপদেশ প্রদান করেন (ব্যাধগীতা)। এইরূপে বৌদ্ধধর্ম এক সন্ন্যাসিসঙ্রে ধর্মে পরিণত হয়, হিন্দুধর্ম কিন্তু সন্ন্যাস-আশ্রমকে উচ্চ স্থান প্রদান করলেও চিরকাল নিষ্ঠার সহিত প্রতিদিনের কর্তব্য-পালনকে—তা যেমনই হোক, ঈশ্বরলাভের পথ বলে নির্দেশ দিয়ে আসছে।”


উক্ত বৃহৎ মন্দিরের চারিদিকে খননকার্য ১৮৭৪ খ্রীস্টাব্দে ব্ৰহ্মদেশীয় সকার কর্তৃক প্রথম আরম্ভ হয়। ১৮৭৯ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ সবকাব উহাব ভার গ্রহণ করেন, এবং ১৮৮৪ খ্রীস্টাব্দে উহা শেষ।
যাহা বুদ্ধিবৃত্তির পারে অতীন্দ্রীয় রাজ্যে লইয়া যায়।
এই দুইখানি পুস্তক তখন ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের দক্ষ সম্পাদকতায় এশিয়াটিক সোসাইটি ইতে প্রকাশিত হইতেছিল। সাধারণ পাঠকের সুবিধার জন্য গ্রন্থের মূল পালির পরিবর্তে সংস্কৃত অক্ষরে ছিল’—স্বামী সারদানন্দ
তথাগত শব্দের আক্ষরিক অর্থ—যিনি লব্ধসত্য, অর্থাৎ তত্ত্ব সাক্ষাৎকার করিয়াছেন। স্বামীজী বুঝাইয়া বলিলেন, “এই শব্দ অনেকটা তোমাদের ত্রাণকর্তা(Messiah) শব্দের মতো।”
*****শ্রীরামকৃষ্ণ ১৮৮৬ খ্রীস্টাব্দের ১৬ আগস্ট শ্ৰীযুক্ত কৃষ্ণগোপাল ঘোষের কাশীপুরস্থ উদ্যানবাটীতে মহাসমাধিলাভ করেন।
******বিনয় পিটক–প্রথমভাগ দ্রষ্টব্য।
স্বামীজী এখানে সূত্তনিপাতের অন্তর্গত ধনিয়া সূত্তের Rhys Davids-কৃত পদ্যের অনুবাদের ভাবার্থ তাহার স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করিতেছিলেন; Rhys Davids-এর আমেরিকার বক্তৃতাগুলি দ্রষ্টব্য।
‘উপালি পৃচ্ছা’ নামক গল্পটি প্রধান বৌদ্ধগ্রন্থে যে আকারে প্রকাশিত হয়, অধুনা তাহা লুপ্ত। কিন্তু ঐরূপ একটি রচনার অস্তিত্ব ‘বিনয় পিটক’ প্রভৃতি অন্যান্য বৌদ্ধগ্রন্থে উহার উল্লেখ দ্বারা জ্ঞাত হওয়া যায়।
যদি আমরা ভাবি যে আমাদের দুষ্কৃতিসমূহের ফলভোগ আমাদের পরিবর্তে অপরে করিবে, তাহা হইলে আমাদের সৎকর্ম করিবার প্রবৃত্তি আরও দৃঢ় হয়! অপরের সম্পত্তি বা সন্তান-সন্ততি রক্ষার জন্য আমাদের যে দায়িত্ববোধ, তাহাও এই জাতীয়।