বিংশ পরিচ্ছেদ
নারীজাতি ও জনসাধারণ

দক্ষিণেশ্বর মন্দির জাতিতে কৈবর্ত ধনাঢ্য রানী রাসমণি কর্তৃক নির্মিত হয়, এবং ১৮৫৫ খ্রীস্টাব্দে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের অন্যতম পূজারীরূপে সেখানে বাস করিতে আরম্ভ করেন।

এই ঘটনাদ্বয় স্বামী বিবেকানন্দের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে; সম্ভবতঃ স্বামীজী নিজে সে প্রভাবের সম্যক পরিচয় পান নাই। তাঁহার গুরুদেবের শিষ্যগণ যে ধর্ম-আন্দোলন সংগঠন করেন, এক হিসাবে নিম্নশ্রেণীর এক নারীই তাহার মূল কারণস্বরূপ। মানবিক দৃষ্টিতে দেখিলে, দক্ষিণেশ্বর মন্দির না হইলে আমরা শ্রীরামকৃষ্ণকে পাইতাম না, শ্রীরামকৃষ্ণ না থাকিলে স্বামী বিবেকানন্দও আসিতেন না, এবং স্বামী বিবেকানন্দ ব্যতীত পাশ্চাত্যদেশে কোন প্রচারকার্যও হইত না। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের ঠিক পূর্বে কলিকাতার কয়েক মাইল উত্তরে গঙ্গাতীরে এক কালীবাড়ি নির্মাণের উপরই সমগ্র ব্যাপারটি নির্ভর করিয়াছে। তাহাও আবার নিম্নজাতির এক ধনবতী নারীর ভক্তির ফল। স্বামীজী স্বয়ং আমাদের মনে করাইয়া দিতে ভোলেন নাই যে, ব্রাহ্মণ-প্রাধান্য-সংরক্ষণে দৃঢ়বদ্ধ হিন্দুরাজগণ কর্তৃক এদেশ সম্পূর্ণরূপে শাসিত হইলে ঐরূপ ঘটা কদাপি সম্ভব হইত না। এই ঘটনা হইতে তিনি ভারতে সার্বভৌম শাসকবৃন্দের জাতিভেদের প্রতি সবিশেষ মনোযোগ অর্পণ না করার গুরুত্ব অনুমান করেন।

রানী রাসমণি তাহার সময়ের একজন বীরপ্রকৃতির নারী ছিলেন। কিরূপে তিনি কলিকাতার জেলেদের অন্যায় করভার হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন, এখনও লোকমুখে সে গল্প শুনিতে পাওয়া যায়। সরকার যে বিপুল অর্থ দাবি করেন, তাহা দিবার জন্য তিনি প্রথমে স্বামীকে সম্মত করান। অতঃপর নদীর উপর দিযা বিদেশীয় জাহাজ গমনাগমন একেবারে বন্ধ করিয়া দিবার জন্য দৃঢ় মনোভাব অবলম্বন করেন। সুসমৃদ্ধ গড়ের মাঠ বা ময়দানে তাহার অধিকৃত রাস্তা দিয়া তাহার পরিজনবর্গ কেন দেবপ্রতিমা লইয়া যাইতে পারিবেন না, তাহা লইয়া তিনি বেশ ভালমতো যুদ্ধ বাধাইয়া দেন। তাহার বক্তব্য ছিল, ইংরেজরা যদি ভারতবাসীর ধর্ম পছন্দ না করেন, তাহা হইলে যে পথে প্রতিমাসহ শোভাযাত্রা বাহির হয়, তাহার আপত্তিকর অংশের দক্ষিণে ও বামে প্রাচীর তুলিয়া দিলেই হয়–উহাতে বিশেষ হাঙ্গামা কি? সেইরূপই করা হইল। ফল হইল এই যে, কলিকাতার ‘রতন রো’ নামক চমৎকার রাজপথটি মাঝখানে বন্ধ হইয়া গেল। বৈধব্যদশা ঘটিবার কিছুদিন পরেই ব্যাঙ্কারদের নিকট সঞ্চিত বিপুল অর্থ স্বহস্তে উঠাইয়া লইবার জন্য তাহাকে সমগ্র বুদ্ধি-কৌশল প্রয়োগ করিতে হয়। ঐ অর্থ তিনি নিজে খাটাইবার সঙ্কল্প করেন। কার্যটি কঠিন হইলেও অসীম বুদ্ধি ও দক্ষতাসহকারে তিনি উহা সম্পাদন করেন এবং তখন হইতে সমস্ত কার্য নিজেই পরিচালনা করিতেন। বহুদিন পরে এক বড় মকদ্দমার কৌসুলীর মাধ্যমে তাহার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বপূর্ণ উত্তর প্রদান ও প্রতিপক্ষকে নিরস্ত করার কাহিনী আজ পর্যন্ত কলিকাতার প্রতি হিন্দুপরিবারে চলিয়া আসিতেছে।

রানী রাসমণির জামাতা মথুরবাবুর নাম শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম জীবনের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। যখন আশেপাশের সকল লোক সেই মহাসাধককে ধর্মোন্মাদ বলিয়া স্থির করে, তখন তিনিই তাহাকে রক্ষা করেন। কোনরূপ কাজকর্ম না করা সত্ত্বেও বরাবর শ্রীরামকৃষ্ণ বৃত্তি ও বাসস্থানের সুবিধা পাইবেন—এ ব্যবস্থা তিনিই করিয়া দেন। এই সকল বিষয়ে মথুরবাবু তাহার শশূঠাকুরানীর প্রতিনিধিরূপে কার্য করিতেন। প্রথমাবধি রানী রাসমণি শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মবিষয়ে অদ্ভুত প্রতিভা উপলব্ধি করিতে সক্ষম হন এবং আজীবন নিষ্ঠার সহিত তাহার সেই প্রথম ধারণা অব্যাহত রাখেন।

তথাপি শ্রীরামকৃষ্ণ যখন কামারপুকুরের ব্রাহ্মণযুবকরূপে দক্ষিণেশ্বরে প্রথম আগমন করেন, তখন তিনি এত আচারনিষ্ঠ ছিলেন যে, এক নিম্নশ্রেণীর নারীকর্তৃক মন্দির নির্মাণ এবং ঐ উদ্দেশ্যে সম্পত্তি দান তাহার অত্যন্ত বিসদৃশ বোধ হইয়াছিল। তিনি ছিলেন প্রধান পুরোহিতের কনিষ্ঠভ্রাতা এবং সেজন্য প্রতিষ্ঠাদিবসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাহাকে পূজানুষ্ঠান কার্যে সহায়তা করিতে হয়। কিন্তু কিছুতেই তিনি প্রসাদ গ্রহণে সম্মত হন নাই। শুনা যায়, সব শেষ হইয়া গেলে এবং সমাগত লোকজন চলিয়া গেলে গভীর রাত্রে তিনি বাজার হইতে একমুঠা ছোলাভাজা কিনিয়া আনেন এবং উহা খাইয়া সারাদিন উপবাসের পর ক্ষুধা নিবৃত্ত করেন।

পরবর্তী কালে কালীবাড়িতে তিনি যে পদ অধিকার করেন, এই ঘটনাটি নিশ্চিত তাহার তাৎপর্য গভীরতর করিয়া তোলে। ভ্রমবশতঃ তিনি কদাপি কৈবর্তবংশীয়া রানীর সম্মানিত অতিথি বা তাহার দ্বারা প্রতিপালিত হন নাই। আমাদের বিশ্বাস করিবার যথেষ্ট কারণ আছে যে, যখন তিনি জানিতে পারেন, জগতে তাঁহাকে কোন কার্য সাধন করিতে হইবে, তখন ইহাও হৃদয়ঙ্গম করেন যে, বাল্যকালে পল্লীগ্রামের কঠোর আচারনিষ্ঠ অভ্যস্ত জীবন ঐ কার্যে সহায়ক না হইয়া বরং প্রতিকূলই হইবে। আমরা ইহাও বলিতে পারি, তাহার সমগ্র জীবন এই কথাই ঘোষণা করিতেছে যে, সামাজিক জীবনে কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে মানুষ যে পদেই অধিষ্ঠিত থাকুক, ধর্মজীবনে সকলের সমান অধিকারে তাহার বিশ্বাস ছিল।

আমাদের গুরুদেব অন্ততঃ মনে করিতেন, তিনি যে সঙ্ঘভুক্ত, তাহার ব্রত হইল নারীজাতি ও নিম্নশ্রেণীর লোকদিগের উন্নতিসাধন। খেতড়ির রাজাকে তাহার বার্তা পাঠাইবার জন্য আমেরিকায় যখন তিনি ফনোগ্রাফের সামনে কয়েকটি কথা বলেন, তখন সহজ প্রেরণাবশতঃ ঐ বিষয়টি তাহার মনে ওঠে। বিদেশে একাকী যখনই তিনি নিজেকে মৃত্যুর অধিকতর নিকটবর্তী জ্ঞান করিতেন, ঐ চিন্তাই তাহার হৃদয় অধিকার করিত এবং নিকটে উপবিষ্ট শিষ্যকে বলিতেন, “কখনো ভুলো না, নারীজাতি ও নিম্নশ্রেণীর মানুষের উন্নতিসাধনই আমাদের মূলমন্ত্র।”

অবশ্য, বিভিন্ন দলের সংগঠনকালেই সমাজের শক্তির সর্বাধিক বিকাশ ঘটে, এবং স্বামীজী এই বিষয়টির উপর বিশেষ চিন্তা করিতেন যে, একবার কোন নির্দিষ্ট গঠন প্রাপ্ত হইবার পর উহার মধ্যে আর প্রাণসঞ্চার অথবা অনুপ্রেরণা দান করিবার ক্ষমতা থাকে না। তাহার নিকট ‘নির্দিষ্ট আকার প্রাপ্ত’ ও ‘মৃত’ সমানার্থক শব্দ। কোন সমাজ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট আকারে সংগঠিত হইয়া গেলে উহার অবস্থা সেই বৃক্ষের ন্যায় হইয়া যায়, যাহার আর বৃদ্ধির সম্ভাবনা নাই। উহার নিকট আর কিছু প্রত্যাশা করার অর্থ মিথ্যা ভাবুকতা, এবং স্বামীজীর দৃষ্টিতে ভাবুকতা হইল স্বার্থপরতা, ‘ইন্দ্রিয়ের অসংযত উচ্ছ্বাসমাত্র’।

জাতিভেদ-প্রথা সম্পর্কে স্বামীজী সর্বদাই আলোচনা করিতেন। কদাচিৎ উহার বিরুদ্ধে সমালোচনা করিতেন, বরং সর্বদাই উহার পশ্চাতে অবস্থিত কারণ অনুসন্ধান করিতেন। জাতিভেদ মানবজীবনের এক অনিবার্য ব্যাপার বলিয়া মনে করায়, উহা কেবল হিন্দুধর্মেরই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য বলিয়া তিনি ভাবিতে পারিতেন না। জনৈক ইংরেজ যে একদা মহীশুরে গোবধ করিয়াছিলেন, সমবেত ভদ্রলোকদের সামনে তাহা স্বীকার করিতে ইতস্ততঃ করিতেছেন দেখিয়া স্বামীজী বলিয়া ওঠেন, “স্বজাতির মতামতই কোন ব্যক্তিকে ধর্মপথে রাখবার শেষ ও শ্রেষ্ঠতম উপায়।” অতঃপর দুই-চারি কথায় তিনি দুই প্রকার আদর্শের মধ্যে যে পার্থক্য বিদ্যমান তাহার বর্ণনা দেন—একটি আদর্শ শিষ্ট ও দুষ্টের মধ্যে অথবা ধার্মিক ও নাস্তিকের মধ্যে প্রভেদ নির্দেশ করে, অপরটি এক সূক্ষ্মতর, সংগঠনমূলক নৈতিক আদর্শ, যাহা আমাদের সমকক্ষ বলিয়া মনে করি, এরূপ অল্প সংখ্যক ব্যক্তির শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিবার প্রচেষ্টা জাগাইয়া দেয়।

কিন্তু এই প্রকার মন্তব্যগুলি পক্ষপাতিত্বের পরিচায়ক নয়। সন্ন্যাসী শুধু সাক্ষীর ন্যায় জীবনকে দেখিয়া যাইবেন, কোন পক্ষ অবলম্বন করিবেন না। তাহার নিকট এমন বহু প্রস্তাব আসিয়াছিল, যাহা গ্রহণ করিলে তিনি যে কোন একটি সম্প্রদায়ের নেতারূপে পরিগণিত হইতেন, কিন্তু ঐ সকল তিনি অগ্রাহ্য করেন। নারীজাতি ও জনগণকে কেবল শিক্ষা দেওয়া হউক; তাহাদের ভবিষ্যৎসংক্রান্ত সকল প্রশ্নের মীমাংসা করিতে তাহারা নিজেরাই সমর্থ হইবে। স্বাধীনতা সম্পর্কে ইহাই ছিল তাহার দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইহাই তিনি আজীবন প্রচার করিয়াছেন। শিক্ষা কি ধরনের হইবে সে সম্বন্ধে নিজ অভিজ্ঞতা হইতে তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, এ পর্যন্ত ঐ সম্পর্কে কিছুই নির্দিষ্ট হয় নাই। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও অসতী বিধবার পাপ-আচরণ বলিয়া যাহা অভিহিত, তাহার প্রতি তাঁহার দারুণ ঘৃণা ছিল। তিনি মনেপ্রাণে অনুভব করিতেন ও বলিতেন, “আর যা হয় হোক, কিন্তু এটি যেন কখনো না হয়।” তাহার নিকট বৈধব্যের শ্বেতবাস ছিল যাহা কিছু পবিত্র ও সত্য, তাহারই প্রতীকস্বরূপ। সুতরাং এই সকল ভাবের সহিত সম্পর্কশূন্য কোন শিক্ষাপ্রণালীর কথা স্বভাবতই তিনি চিন্তা করিতে পারিতেন না। চঞ্চল, বিলাসপরায়ণ ও জাতীয়তাভ্রষ্ট কোন ব্যক্তি, বাহিরের শত পারিপাট্য সত্ত্বেও, তাহার মতে শিক্ষিত নহে, বরং অধঃপতিত। পক্ষান্তরে, কোন আধুনিকভাবাপন্ন নারীর মধ্যে যদি সেই প্রাচীনকালের ন্যায় একান্ত নির্ভরতা ও পরম ভক্তির সহিত স্বামীর প্রতি আনুগত্য এবং শ্বশুরগৃহের পরিজনদের প্রতি পুরাকালের নিষ্ঠা দেখিতে পাইতেন, তাহা হইলে তাহার দৃষ্টিতে তিনিই হইতেন ‘আদর্শ হিন্দুপত্নী। প্রকৃত সন্ন্যাসের ন্যায় যথার্থ নারীজীবনও কেবল লোক-দেখানো ব্যাপার নয়। আর প্রকৃত নারীজনোচিত গুণগুলির প্রচার ও বিকাশে সহায়তা ব্যতীত কোন স্ত্রীশিক্ষাই যথার্থ স্ত্রীশিক্ষা বলিয়া গণ্য হইতে পারে না।

ভাবী আদর্শ নারীর লক্ষণগুলি যদি দৈবাৎ মিলিয়া যায়, তিনি সর্বদা তাহার সন্ধানে থাকিতেন। কিছু পরিমাণে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের বিকাশ অবশ্যম্ভাবী, সেই সঙ্গে অধিকতর বয়সে বিবাহ এবং স্বামী নির্বাচনে কতকটা ব্যক্তিগত মতামত—এসবও আসিবেই। সম্ভবতঃ অন্য উপায় অপেক্ষা ইহা দ্বারাই বাল্যবৈধব্যজনিত সমস্যাসমূহের প্রকৃষ্ট সমাধান হইবে। কিন্তু সেই সঙ্গে ইহা বিস্মৃত হইলে চলিবে না যে, সেই যুগে অধিক বয়সে বিবাহের পরিণামস্বরূপ কতকগুলি দোষ পরিহার করিবার উদ্দেশ্যেই সমাজ কর্তৃক বিশেষ বিবেচনাপূর্বক বাল্যবিবাহ প্রথার সৃষ্টি হয়।

ভবিষ্যতের হিন্দুনারীকে তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রাচীনকালের ধ্যানশক্তিবর্জিত বলিয়া চিন্তা করিতে পারিতেন না। নারীগণের আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু প্রাচীন আধ্যাত্মিকতা বা ধর্ম বিসর্জন দিয়া নহে। তিনি স্পষ্টই বুঝিয়াছিলেন, যে শিক্ষাপদ্ধতি সমগ্র সমাজে প্রত্যক্ষ পরিবর্তন সাধনের জন্য সর্বাপেক্ষা কম প্রভাব প্রয়োগ করিবে, তাহাই আদর্শ শিক্ষা। যে শিক্ষা কালে প্রত্যেক নারীকে একাধারে ভারতের অতীত যুগের নারীজাতির শ্রেষ্ঠ গুণগুলি বা মহত্ত্ব বিকাশে সহায়তা করিতে সমর্থ, তাহাই আদর্শ শিক্ষা।

অতীতকালের প্রত্যেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ পৃথকভাবে নিজ কার্য সাধন করিয়াছে। রাজপুত ইতিহাস জাতীয় আদর্শ নারীজীবনের বীরত্ব ও সাহসে পরিপূর্ণ। কিন্তু ঐ জ্বলন্ত ও দ্রবীভূত ধাতুকে এখন নূতন ছাঁচে ঢালিতে হইবে। অতীত ভারতে যত মহীয়সী নারী জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, রানী অহল্যাবাঈ তাহাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়া। দেশের সর্বত্র তাহার জনহিতকর কীর্তি-দর্শনে একজন ভারতীয় সাধুর পক্ষে ঐরূপ চিন্তাই স্বাভাবিক। তথাপি ভাবী নারীগণের মহত্ত্ব তাহার প্রতিরূপ মাত্র হইবে না; উহাকে অতিক্রম করিয়া যাইবে। আগামী যুগের নারীর মধ্যে বীরোচিত দৃঢ়সঙ্কল্পের সহিত জননীসুলভ হৃদয়ের সমাবেশ ঘটিবে। যে বৈদিক অগ্নিহোত্রাদি পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে শান্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক সাবিত্রীর আবির্ভাব, উহাই আদর্শ অবস্থা, কিন্তু ভবিষ্যৎ নারীর মধ্যে মলয়-সমীরের কোমলতা এবং মাধুর্যেরও বিকাশ ঘটিবে।

নারীগণকে যোগ্যতার সহিত সমাজে উঠিয়া দাঁড়াইতে হইবে। অবনত হইলে চলিবে না। বিধবাশ্রম বা বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজসংক্রান্ত তাঁহার সকল পরিকল্পনায় বড় বড় সবুজ ঘাসে ঢাকা জমির ব্যবস্থা থাকিত। যাহারা এই সকল স্থানে বাস করিবে, শারীরিক ব্যায়াম, উদ্যানসংরক্ষণ এবং পশুপালন প্রভৃতি তাহাদের নিত্য কর্তব্য বলিয়া গণ্য হওয়া প্রয়োজন। এই নূতন যাত্রাপথের পটভূমি ও প্রাণস্বরূপ হইবে ধর্ম ও উচ্চলক্ষ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ-সংসার অপেক্ষা এই ধরনের বাসস্থান না আশ্রমের মধ্যেই যাহার সমধিক বিকাশ ঘটে। এই সকল বিদ্যালয়ের অধিবাসিনীগণ শীতঋতুর অবসানে তীর্থযাত্রায় বাহির হইবে এবং ছয়মাস হিমালয়ে অবস্থান করিয়া অধ্যয়নে রত থাকিবে। এইরূপে, এমন এক শ্রেণীর নারী সৃষ্টি হইবে, যাহারা ধর্মরাজ্যে হইবে ‘বাশিবাজুকদিগের’ সদৃশ(১); এবং তাহারাই নারীজাতির সকল সমস্যার সমাধান করিবে। কর্মক্ষেত্র ব্যতীত তাহাদের কোন গৃহ থাকিবে না, ধর্মই হইবে তাহাদের একমাত্র বন্ধন, এবং ভালবাসা থাকিবে কেবল গুরু, স্বদেশ ও জনগণের প্রতি। কতকটা এইরূপই ছিল তাহার কল্পনা। তিনি বেশ বুঝিয়াছিলেন, বিশেষ প্রয়োজন একদল শিক্ষয়িত্রীর—এবং এইভাবেই তাহাদের সংগ্রহ করিতে হইবে। শক্তি—শক্তিই একমাত্র গুণ, যাহার বিকাশ তিনি পুরুষ এবং নারী সকলের মধ্যে দেখিতে চাহিতেন। কিন্তু এই শক্তির বিন্যাস সম্পর্কে তাহার বিচার কত কঠোর ছিল! আত্মপ্রচার অথবা ভাবোচ্ছ্বাস, কোনটাই তাহার নিকট প্রশংসা লাভ করিত না। প্রাচীনকালের মৌন, মাধুর্য ও নিষ্ঠাপূর্ণ আদর্শ চরিত্রে তাহার মন এতদূর মুগ্ধ ছিল যে, বাহিরের কোন আড়ম্বর তাহাকে আকৃষ্ট করিতে পারিত না। সেই সঙ্গে বর্তমান যুগের যে চিন্তা ও জ্ঞান ভারতে বিশেষ উন্নতি সাধন করিয়াছে, তাহাতে পুরুষের ন্যায় নারীরও সম অধিকার। সত্যেকোন লিঙ্গভেদ নাই। আত্মা ও মনের উপর শরীরের বন্ধন আরও দৃঢ় করিয়া তুলিতে চাহে, এরূপ কোন সমাজ বা রাষ্ট্রনীতি তিনি আদৌ সহ্য করিতে পারিতেন না। যে নারী যত বড় হইবেন, তিনি ততই চরিত্র ও মনের নারীসুলভ দুর্বলতা অতিক্রম করিতে পারিবেন; এবং আশা করা যায়, ভবিষ্যতে বহুসংখ্যক নারী এইরূপে উন্নতিলাভ করিয়া প্রশংসা অর্জন করিবেন।

স্বভাবতই তাহার আশা ছিল, বিধবাগণের মধ্য হইতেই প্রথম শিক্ষয়িত্রীদল সংগৃহীত হইবে এবং তাহারা পাশ্চাত্যদেশের মঠাধিকারিণীদের অনুরূপ হইবেন। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় এক্ষেত্রে তাঁহার নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা ছিল না। তাহার নিজের কথায় বলিতে গেলে তিনি শুধু বলিতেন, “জাগো! জাগো! সঙ্কল্পগুলি আপনা থেকেই বর্ধিত এবং কার্যে পরিণত হয়!” তথাপি কোন উপকরণ উপস্থিত হইলে—যেখান হইতেই উহা আসুক, তাঁহার সমাদর লাভ করিত। প্রত্যেক নারীর পক্ষে দৃঢ়, সবল চরিত্র, বুদ্ধিমতী এবং সত্যপথে পরিচালিত হইয়া নিজেকে উচ্চতম আদর্শের যন্ত্রস্বরূপ করিয়া তোেলা কেন সম্ভব হইবে না, এ বিষয়ে তিনি কোন কারণ খুঁজিয়া পাইতেন না। এমন কি, অসকার্য হেতু বিবেকের গ্লানিও অকপটতার দ্বারা দূর করিতে পারা যায়। নারীগণের উন্নতির সহিত সংশ্লিষ্ট আন্দোলন সম্পর্কে এক আধুনিক লেখক বলিয়াছেন, “সকল উচ্চ উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে অনুসরণ করা চাই।” স্বামীজী স্বাধীনতাকে ভয় পাইতেন না, এবং ভারতীয় নারীজাতির প্রতি তাহার কোন অবিশ্বাস ছিল না। কিন্তু স্বাধীনতার বিকাশ সম্বন্ধে তাহার যে কল্পনা ছিল, তাহা কোনপ্রকার আন্দোলন, হইচই বা প্রাচীন অনুষ্ঠানসমূহ চূর্ণ করিয়া ফেলা—এই সকলের দ্বারা সাধিত হইবার নহে। তাহার মতে যথার্থ স্বাধীনতা হইল পরোক্ষ,নীরব ও সাংগঠনিক। প্রথমে সমাজের প্রচলিত আদর্শগুলি নারীদের যথাযথভাবে গ্রহণ করিতে হইবে; তারপর যতই তাহারা অধিকতর গুণের অধিকারিণী হইবেন, জাতীয় জীবনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আদেশ ও সুযোগগুলি যথার্থভাবে হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইবেন। ঐ-সকল নির্দেশ পালন ও পূর্ণমাত্রায় সুযোগ গ্রহণের দ্বারা তাহারা পূর্বাপেক্ষা অধিকতর ভারতীয়ভাবাপন্ন হইয়া উঠিবেন এবং অবশেষে উন্নতির এরূপ উচ্চশিখরে আরোহণ করিবেন, অতীত ভারত যাহা কখনও স্বপ্নেও ভাবে নাই।

বোধ হয়, আমাদের জাতীয় জীবনধারার অবিচ্ছিন্নতা হৃদয়ঙ্গম করার মধ্যে স্বামীজীর স্বাধীন চিন্তার যেরূপ স্পষ্ট অভিব্যক্তি দেখা যায়, তেমন আর কিছুতেই নহে। কোন প্রথায় নূতন আকার তাহার নিকট সর্বদা প্রাচীন পবিত্র সংস্কারের দ্বারা পবিত্ৰীকৃত বলিয়া বোধ হইত। দেবী সরস্বতীর চিত্র অঙ্কন করাই তাহার ‘দেবীর পূজা’ বলিয়া মনে হইত; ভেষজ-বিজ্ঞান অধ্যয়নের অর্থ “রোগ ও অপরিচ্ছন্নতারূপ দানবদ্বয়ের আক্রমণ হইতে রক্ষা পাইবার জন্য ভগবানের নিকট নতজানু হইয়া প্রার্থনা করা।” হিন্দুসমাজের মধ্যে নূতন ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে দুগ্ধ, মাখন প্রভৃতির সরবরাহ, পশুগণের জন্য চারণভূমির ব্যবস্থা ও তাহাদের পরিচর্যাবিধান ইত্যাদি ভাব যে পূর্ব হইতেই যথেষ্ট পরিমাণে বর্তমান ছিল, প্রাচীনকালে ভক্তিভরে গোসেবা তাহারই পরিচয় প্রদান করে। তাহার মতে, বুদ্ধিবৃত্তির চরম উৎকর্ষসাধনের অনুশীলন আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণাদির শক্তিলাভের পক্ষে অপরিহার্য; অধানই তপস্যা, এবং হিন্দুদের ধ্যানপরায়ণতা বৈজ্ঞানিক অন্তদৃষ্টিলাভের উপায়। সকল কার্যই একপ্রকার ত্যাগ। গৃহ ও পরিবারবর্গের প্রতি ভালবাসাও সর্বদা মহত্তর ও বিশ্বজনীন প্রীতিতে পরিণত হইতে পারে।

তিনি সানন্দে দেখাইয়া দিতেন যে, হিন্দুগণের চক্ষে লিখিত সকল শব্দই সমভাবে পবিত্র; সংস্কৃত যেরূপ, ইংরেজি ও পারসিক শব্দও সেইরূপ পবিত্র। কিন্তু বিদেশী আদবকায়দা ও বিদেশী শিক্ষাদীক্ষার বাহ্য চাকচিক্যের প্রতি তাহার ঘৃণা ছিল। কেবল বাহ্যবস্তুগুলির পুনর্বিন্যাস সম্পর্কে যে-সব সমালোচনা, তাহার প্রতি তিনি আদৌ কর্ণপাত করিতে পারিতেন না। দুইটি সমাজের তুলনাকালে তিনি সর্বদা দেখাইয়া দিতেন যে, বিভিন্ন সমাজ বিভিন্ন আদর্শ বিকাশের প্রচেষ্টায় রত, এবং আধুনিককালে অথবা মধ্যযুগে হউক, এই লক্ষ্যসাধন অথবা আদর্শপ্রাপ্তির প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া তিনি তাহাদের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিচার করিতেন।

সর্বোপরি, ভালবাসা সম্পর্কে তাহার ধারণা এরূপ ছিল যে, বক্তা ও যাহার সম্পর্কে বলিতেন, এই উভয়ের মধ্যে তিনি কোন ভেদ স্বীকার করিতেন না। অপরের সম্বন্ধে ‘তাহারা’ বলিয়া উল্লেখ তাহার নিকট প্রায় ঘৃণাতুল্য বোধ হইত। যাহারা সমালোচনা বা নিন্দার পাত্র, তিনি সর্বদা তাহাদের পক্ষ অবলম্বন করিতেন। যাহারা তাহার নিকট অবস্থান করিতেন, তাহারা বেশ বুঝিয়াছিলেন যে, যদি সত্যই জগৎকে ঈশ্বর ও শয়তান নামক দুই পৃথক ব্যক্তির সৃষ্টি বলিয়া মীমাংসা করা যাইত, তাহা হইলে তিনি নিজে ঈশ্বরের সেনাপতি আর্কেঞ্জেল মাইকেলের পক্ষ অবলম্বন না করিয়া, যাহার উপর ঈশ্বর জয়ী হইয়াছেন, সেই চিরকালের জন্য পরাজিত শয়তানেরই পক্ষ গ্রহণ করিতেন। তিনি শিক্ষা বা সাহায্যদানে সমর্থ, এই প্রকার দৃঢ় বিশ্বাস হইতে তাহার এই ভাব উৎপন্ন নহে, পরন্তু কেহ যে চিরদিনের মতো দুঃসহ ক্লেশতভাগে বাধ্য হইতেছে, তাহারই দুঃখের অংশ গ্রহণ করিবার জন্য আন্তরিক দৃঢ়সঙ্কল্প হইতে উদ্ভূত। চিরকালের মতো কেহ নিদারুণ দুঃখে পতিত হইয়াছে দেখিলে, তাহার সকল কষ্ট নিজে গ্রহণ করিয়া প্রয়োজন হইলে বিশ্বের সমগ্র শক্তি অগ্রাহ্য করিবার জন্য তিনি প্রস্তুত থাকিতেন।

তাহার প্রকাশিত কয়েকখানি পত্রে দেখাইয়া দিয়াছেন যে, দয়ারূপ ভিত্তির উপরেও মানবসেবাব্রতকে যাথার্থরূপেস্থাপন করা যায় না। তাহার পক্ষে ঐরূপ বলা নিতান্ত স্বাভাবিক, কারণ ঐ ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার তিনি আদৌ পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি বলেন, অপরকে জীবজ্ঞানে সাহায্য করাকেই ‘দয়া বলিয়া অভিহিত করা হয়; কিন্তু প্রেম’ আত্মা জ্ঞান করিয়া সকলের সেবায় রত হয়। অতএব প্রেমই পূজাস্বরূপ, এবং এই পূজাই ঈশ্বরদর্শনে পরিণত হয়। সুতরাং অদ্বৈতবাদীর পক্ষে প্রেমই একমাত্র কার্যে প্রবৃত্ত হওয়ার হেতু।” কোন উচ্চ সেবার ভার প্রাপ্তির সহিত অপর কোন প্রকার উচ্চ অধিকারের তুলনা হইতে পারে না। এক পত্রে তিনি বলিয়াছেন, “যিনি কাহাকেও রক্ষা করিতে পারিয়াছেন, তাঁহারই আনন্দিত হইবার কথা, যাহাকে রক্ষা করা হইয়াছে, তিনি নহেন।” মন্দিরে পূজা করিবার সময় পুরোহিতগণকে যেরূপ বাহ্যান্তরশুদ্ধি করিয়া উৎসুকভাবে অথচ সম্ভ্রমের সহিত সকলপ্রকার বাধাবিপত্তির মধ্যে অবিচলিত থাকিবার দৃঢ়সঙ্কল্প লইয়া পূজায় প্রবৃত্ত হইতে হয়, স্ত্রীশিক্ষারূপ পবিত্র কার্যসাধনে যাহারা মনোনীত হইয়াছেন, তাহাদের ঐরূপ মনোভাব লইয়া কার্যে অবতীর্ণ হওয়া প্রয়োজন। কলিকাতা মহাকালী পাঠশালার স্থাপয়িত্ৰী মহারাষ্ট্র মহিলা মাতাজী মহারানীর কথাগুলি স্বামীজী মনে রাখিয়াছিলেন এবং প্রায়ই উল্লেখ করিতেন। যে ছোট ছোট মেয়েগুলিকে তিনি পড়াইতেন, তাহাদের দেখাইয়া তিনি বলিয়াছিলেন, “স্বামীজী, আমার কোন সহায় নেই। কিন্তু আমি এই পবিত্র কুমারীদের পূজা করি; তারাই আমাকে মুক্তির পথে নিয়ে যাবে।”

জনসাধারণ বা নিম্নশ্রেণীর লোক বলিয়া যাহারা অভিহিত, তাহাদের প্রতি তাহার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ঐ প্রকার প্রগাঢ় সহানুভূতি ও সেবার ভাব প্রকাশ পাইত। সমাজের উচ্চশ্রেণীর ভ্রাতাদের ন্যায় এই নিম্নশ্রেণীদেরও বিদ্যাশিক্ষা ও জ্ঞানলাভে সম অধিকার আছে। এই শিক্ষা ও জ্ঞান লাভ করিলেই তাহারা স্বাধীনভাবে নিজেরাই তাহাদের ভাগ্য নির্ণয় করিতে পারিবে। এই কার্যসাধন সম্পর্কে চিন্তাপূর্বক স্বামীজী কেবল বুদ্ধ হইতে আরম্ভ করিয়া ভারতের মহান লোকশিক্ষকগণের পদাঙ্কই অনুসরণ করিতেছিলেন। যে যুগে উপনিষদের দর্শন একমাত্র আদিগের বিশেষ অধিকার বলিয়া গণ্য হইত, সেই যুগে ভগবান তথাগত আবির্ভূত হইয়া জাতিবর্ণনির্বিশেষে সকলকে ত্যাগের দ্বারা নির্বাণলাভরূপ শ্রেষ্ঠ মার্গের উপদেশ করেন। যে দেশে এবং যে যুগে সিদ্ধ আচার্যগণ প্রদত্ত মন্ত্র কেবল অতি অল্প সংখ্যক সুশিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে সযত্নে রক্ষিত হইত, সেখানে আচার্য রামানুজ কাঞ্চনগরীর গোপুর হইতে সেই সকল মহামন্ত্র পারিয়া বা চণ্ডালদের নিকট ঘোষণা করেন। ভারতে এখন আধুনিক যুগের অভ্যুদয়; ঐহিক জ্ঞান দ্বারা মনুষ্যত্বলাভের উদ্বোধন কাল। সুতরাং স্বভাবতই স্বামী বিবেকানন্দের নিকট সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, কিরূপে জনসাধারণের মধ্যে ঐহিক জ্ঞান বিস্তার করা যায়।

অবশ্য তিনি হৃদয়ঙ্গম করেন যে, ভারতে ঐহিক উন্নতির পুনঃপ্রবর্তনের জন্য প্রয়োজন সমগ্র জাতির শক্তি ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আর তিনি বেশ জানিতেন যে, ঐহিক সম্পদের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই সর্বাগ্রে একান্ত আবশ্যক। তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ ওজস্বিতার সহিত তিনি বলিয়াছিলেন,”যে ঈশ্বর আমাকে ইহ জীবনে একটুকরা রুটি দিতে পারেন না, পরজীবনে তিনি আমাকে স্বর্গরাজ্য দেবেন, একথা আমি বিশ্বাস করতে পারি না। সম্ভবতঃ তিনি আরও উপলব্ধি করেন যে, একমাত্র জ্ঞানবিস্তার দ্বারাই সমগ্র দেশ তাহার বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির মহান উত্তরাধিকারের প্রতি নিজ শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ণ বাখিতে পারিবে। যে ভাবে হউক, একমাত্র গণতন্ত্রের অভ্যুত্থানের জন্য বিরাট আন্দোলনের দ্বারাই সমাজের উচ্চশ্রেণীর ধমনীতে নবজীবনের সঞ্চার সম্ভব। তাহার বিশ্বাস ছিল,উচ্চবংশে জন্মগ্রহণ করিলেই নেতৃত্বের সনদ লাভ হইবে এই প্রকারের কোন ধারণা সর্বতোভাবে পরিহার করিতে হইবে। সম্যক অনুশীলন দ্বারা পরিমার্জিত যে সাধারণ বুদ্ধিকে লোকে প্রতিভা আখ্যা দিয়া থাকে, তাহার উদ্ভব ব্রাহ্মণ বা কায়স্থের ন্যায় সামান্য দোকানদার অথবা কৃষকের মধ্যেও অনুরূপভাবে সম্ভবপর। সাহস কেবল ক্ষত্রিয়ের একচেটিয়া সম্পত্তি হইলে তান্তিয়া ভীল কোথায় থাকিত? তিনি বিশ্বাস করিতেন, বিধাতা সমগ্র ভারতবর্ষকেই গলাইবার পাত্রে নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইয়াছেন; তাহার ফলে কোন নব নব আকারের শক্তি ও মহত্ত্বের সৃষ্টি হইবে, তাহা পূর্ব হইতে বলা মানবের ক্ষমতাতীত।

তিনি পরিষ্কাররূপে বুঝিয়াছিলেন, ভারতের শ্রমজীবিগণকে শিক্ষা দেওয়া প্রকৃতপক্ষে ভারতের শিক্ষিত সম্প্রদায়েরই কার্য, অপর কাহারও নহে। বিদেশী কর্তৃক বিদেশজাত জ্ঞানের প্রবর্তনে যে অশেষ বিপদের সম্ভাবনা, তাহা মুহূর্তে জন্যও তাহার নিকট গোপন ছিল না। অধুনা প্রকাশিত তাহার পত্রগুলিতে তিনি যে ক্রমাগত ছাত্রগণকে ম্যাজিক লণ্ঠন, ক্যামেরা এবং রাসায়নিক পরীক্ষার উপযোগী কিছু কিছু উপকরণ লইয়া গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া শিক্ষা প্রদানের যুক্তি দেখাইতেছেন–ইহাই তাহার অর্থ। আবার, সাধুরা যখন মাধুকরী করিতে গিয়া নিম্নশ্রেণীর জনসাধারণের সহিত মেলামেশা করেন, তখন তাহারা যেন কিছু কিছু ঐহিক শিক্ষাও তাহাদের প্রদান করেন, এজন্যও তিনি অনুরোধ জানান। অবশ্য এ সমস্তই হইবে নবশিক্ষার সহায়ক ও প্ররোচনামাত্র। সেই প্রকৃত শিক্ষার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে একাকী অথবা সম্মিলিতভাবে প্রাণপণ চেষ্টা করিতে হইবে। কিন্তু এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে, এক বৃহৎ জাতিকে, তাহার বোধসীমার বাহিরে অবস্থিত এক চিন্তা ও জ্ঞানের রাজ্য সম্পর্কে অবহিত করাই নূতন শিক্ষাকে সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচার করিবার প্রথম সোপান। সুতরাং এই ধরনের নানা পরিকল্পনা স্বামীজীর পক্ষে খুবই সঙ্গত হইয়াছিল।

কিন্তু ধর্মাচার্যের উপযুক্ত যে কার্যের সূত্রপাত এবং মাহাত্ম্য তিনি স্বয়ং প্রচার করিয়া গিয়াছেন, অধিকাংশ স্থলেই তাহা ছিল ক্ষুধার্ত অথবা পীড়িতের বিশেষ সেবা। ১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দে প্লেগনিবারণকল্পে শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃক প্রথম যে স্বাস্থ্য-সংরক্ষণ কার্য আরম্ভ হয়, তাহার জন্য অর্থ স্বামীজীই সংগ্রহ করিয়া দেন। ঐ কার্য আজ পর্যন্ত চলিয়া আসিতেছে। পাশ্চাত্যদেশে কয়েক বৎসর অবস্থান কালে তিনি সর্বদা এমন কর্মিগণের সন্ধানে থাকিতেন, যাহারা ভারতের অন্ত্যজদের সেবাকার্যে নিজেদের উৎসর্গ করিবে, এবং ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দে হার ব্রাহ্মণ শিষ্যগণকে নীচজাতীয় কলেরারোগীর সেবায় নিরত দেখিয়া তিনি যেরূপ আনন্দে উৎফুল্ল হইয়াছিলেন, এমন আব কিছুতেই নহে। এই ঘটনার উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন, “পূর্বে বুদ্ধের সময় যা ঘটেছিল, তা আবার আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাহার অন্তরঙ্গ ভক্তগণ তাহার প্রেম ও করুণাপ্রসূত সর্বশেষ সন্তানপ্রতিম কাশীর ক্ষুদ্র সেবাশ্রমটির প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা ও প্রীতি অনুভব করিয়া থাকেন।

বিশেষভাবে কেবল শিক্ষারই সহিত সংশ্লিষ্ট—এইরূপ কার্যের সহিত তাহার সাক্ষাৎ সম্বন্ধ না থাকিলেও তাহাদের প্রতি তাহার হৃদয় কম আকৃষ্ট হইত না। যে-সকল মাসিকপত্রের সহিত রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের অল্পবিস্তর সম্পর্ক ছিল, তাহাদের হিতাহিত এবং মুর্শিদাবাদ অনাথাশ্রম হইতে প্রদত্ত শিল্পশিক্ষা তাহার দৃষ্টিতে বরাবর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া গণ্য হইত। ভারতের বর্তমান অবস্থায় মাসিকপত্রগুলি বহুস্থলে একাধারে ভ্রাম্যমাণ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বলিলেই চলে। তাহাদের প্রভাব অদ্ভুত। উহারা একদিকে যেমন ভাব বিস্তার করে, অপরদিকে তেমন লোকের মনোভাব ব্যক্ত করিবার যন্ত্রস্বরূপ হয়। সহজাত সংস্কারপ্রভাবে স্বামীজী ইহাদের শিক্ষাসংক্রান্ত উপকারিতা উপলব্ধি করেন এবং সেজন্যই তাহার গুরুভ্রাতা ও শিষ্যগণ কর্তৃক পরিচালিত মাসিকপত্রিকাগুলির ভাগ্য সম্পর্কে তিনি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। কোন সাময়িক পত্রের একই সংখ্যায় হয়তো একপৃষ্ঠায় উচ্চতম অতীন্দ্রিয় তত্ত্বসমূহ এবং অপর পৃষ্ঠায় অপেক্ষাকৃত কাঁচা হাতের লেখা নানা ঐহিক বিষয়ের জল্পনা-কল্পনা স্থান পাইত, এবং ইহা দ্বারা ভারতের যুগ সন্ধিক্ষণে সাধারণ লোকের মনের গতি কোন দিকে তাহার প্রকৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়। এই আপাত-বিসংবাদের উল্লেখপূর্বক স্বামীজী স্বয়ং বলিয়াছেন, “হিন্দুদের ধারণা, ধ্যানের দ্বারা জ্ঞানলাভ হবে; বিষয়টি গণিতশাস্ত্র হলে ধারণাটি খাটে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভূগোলের বেলায়ও তাদের স্বাভাবিক সংস্কার ঐ উপায় গ্রহণে প্রবৃত্ত করে; এবং একথা বলা নিম্প্রয়োজন যে ঐ উপায়ে ভূগোলের জ্ঞান বিশেষ হয় না।”

কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের করুণার উচ্ছ্বাস কেবল ভারতের জনসাধারণের প্রতিই প্রবাহিত হইত না। ব্যবসাতে অধিক মূলধন নিয়োগে অধিক লাভের সম্ভাবনা, এইরূপ মতাবলম্বীদের বিপক্ষে তিনি যাহারা অল্প জমিতে চাষ করে, অথবা স্বল্প পুঁজি লইয়া কৃষিজাত দ্রব্যের কারবার করে, সর্বদা তাহাদের সমর্থন করিতেন। উহা তাহার প্রাচ্য ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণের উপযুক্ত কার্যই হইত। তিনি বলিতেন, বর্তমানে যে মানবিকতার যুগের অভ্যুদয় ঘটিতেছে, তাহার প্রধান কার্য হইবে—শ্রমজীবিদের সমস্যার সমাধান, অথবা তিনি যেমন বলিতেন, শূদ্র-সমস্যার সমাধান। তাহার পত্র হইতে জানা যায়, যখন পাশ্চাত্যে তিনি প্রথম পদার্পণ করেন, তখন সেখানকার আপাত-প্রতীয়মান অধিকার-সাম্যের দ্বারা তিনি বিশেষ আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। পরবর্তী কালে ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে উহার অন্তরালে যে ধনতান্ত্রিক স্বার্থপরতা ও বিশেষ অধিকার লাভের জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম চলিতেছে, সে সম্বন্ধে তাহার পরিষ্কার ধারণা হয়, এবং চুপি চুপি একজনকে বলেন, পাশ্চাত্য জীবন এখন তাহার নিকট ‘নরক’ বলিয়া বোধ হইতেছে। পরিণত বয়সের বহু অভিজ্ঞতার ফলে তিনি যেন কতকটা বিশ্বাস করিতে চাহিতেন যে, অপেক্ষাকৃত কোন কোন আধুনিক দেশ অপেক্ষা চীন দেশই সর্বাপেক্ষা মানবিকনীতিজ্ঞান সম্পর্কে যে আদর্শ ধারণা—তাহার সমীপবর্তী হইতে পারিয়াছে। তথাপি, সমগ্র জগতে আগামী যুগ যে জনসাধারণের অথবা শূদ্রজাতির কল্যাণের কারণ হইবে, এ বিষয়ে তাহার কোন সন্দেহ ছিল না। একদিন তিনি বলিয়াছিলেন, “শ্রমিক সমস্যার সমাধান আমাদেরই করতে হবে, কিন্তু কী ভয়ঙ্কর সংক্ষোভ, কী ভীষণ আলোড়নের মধ্য দিয়ে তা সংঘটিত হবে!” তিনি যেন ভবিষ্যৎ প্রত্যক্ষ করিয়া কথা বলিতেছিলেন; তাহার কণ্ঠে যেন ভবিষ্যদ্বাণী ঘোষিত হইতেছিল। শ্রোতা যদিও উৎসুকভাবে আরও কিছু শুনিবার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন, তিনি কিন্তু নীরব হইয়া গেলেন, এবং ক্রমে গভীরতর চিন্তায় মগ্ন হইয়া গেলেন।

আমার বরাবর বিশ্বাস, এইরূপ এক বিপর্যয় ও ভীতির যুগে জনসাধারণকে পরিচালনা করিবার ও প্রকৃতিস্থ রাখিবার জন্যই আমাদের আচার্যদেব ও শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনে শক্তিপূজার এক মহান উদ্বোধন ঘোষিত হইয়াছে। জগন্মাতাই একাধারে এই বিপরীত চরমভাবের সময়স্থল। ভালমন্দ উভয়ের মধ্যেই তাঁহার প্রকাশ ঘটে। সকল পথের গন্তব্যস্থল তিনিই। যখনই স্বামীজী সুর সংযোগে মাতৃপ্রণামের মন্ত্র আবৃত্তি করিতেন, আমরা যেন একটি মাত্র কোমল কণ্ঠস্বরের পশ্চাতে বহু যন্ত্রসহযোগে উখিত মৃদু সঙ্গীতের ন্যায় ঐতিহাসিক নাটকের এই মহান সমবেত সঙ্গীত শুনিতে পাইতাম। তিনি আবৃত্তি করিতেন?

“যা শ্ৰীঃ স্বয়ং সুকৃতিনাং ভবনেধলক্ষ্মীঃ।
পাপাত্মনাং কৃতধিয়াং হৃদয়েষু বুদ্ধিঃ ॥
শ্রদ্ধা সতাং কুলজনপ্ৰভবস্য লজ্জা।
তাং ত্বাং নতাঃ স্ম পরিপালয় দেবি বিশ্বম্ ॥”(২)

অতঃপর যেন এক সাধারণ আশা ও ভয়ে উৎপীড়ক ও উৎপীড়িতের একত্র সম্মিলন, সেনাসমূহের সগর্ব পদসঞ্চার এবং বিভিন্ন জাতির সংক্ষোভ মানসকর্ণে উচ্চতর ও স্পষ্টতরভাবে ধ্বনিত হইতে লাগিল, অমনি ঐ সকলের ঊর্ধ্বে সেই মহাস্তোত্রের বজ্রনির্ঘোষ শ্রুতিগোচর হইল :

“প্ৰকৃতিত্ত্বংহি সর্বস্য গুণত্রয়বিভাবিনী।
কালরাত্ৰিৰ্মহারাত্রিমোহরাত্রিশ্চ দারুণা।” (৩)
“সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণি নমোহস্তু তে ॥ (৪)


১ Bashi-Bazouks—ইহারা খলিফাদের শরীর-রক্ষক ছিল। বহু শতাব্দী ধরিয়া তুর্কী রক্ষীদলে যে-সকল সৈনিককে নিযুক্ত করা হইত, তাহাদের শৈশবে সকল দেশ ও জাতির মধ্য হইতে অপহরণ করিয়া আনা হইত ও ইসলামধর্মে দীক্ষিত করিয়া লালন-পালন করা হইত। এইরূপে তাহাদের ধর্মে অতিশয় অনুরাগ এবং দেশের ও রাজার সেবাই পরস্পরের মধ্যে একমাত্র বন্ধনস্বরূপ ছিল। সমগ্র ইউরোপে তাহারা হিংস্ৰপ্রকৃতি ও সাহসী বলিয়া বিখ্যাত ছিল। মিশরে নেপোলিয়ান তাহাদের ক্ষমতা চূর্ণ করেন।
২ যিনি সুকৃতিগণের ভবনে স্বয়ং লক্ষ্মী, আবার পাপাত্মাদিগের গৃহে অলক্ষ্মী, যিনি নির্মলচিত্ত ব্যক্তিগণের হৃদয়ে বুদ্ধি, যিনি সাধুদিগের শ্রদ্ধা ও সৎকুলজাত ব্যক্তিগণের লজ্জাস্বরূপ, সেই তোমাকে আমরা প্রণাম করিতেছি। হে দেবি. বিশ্বকে প্রতিপালন কর।—চণ্ডী ৪/৫
৩ তুমি সকলের গুণত্রয়প্রকাশকারিণী প্রকৃতি, তুমি গভীর প্রলয় রাত্রি, মরণরূপ রাত্রি এবং দারুণ মোহরাত্রি।–ঐ, ১/৭৮
৪ সকল মঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপে, হে শিবে, হে সর্বাভীষ্টসিদ্ধিকারিণি হে শরণাগত রক্ষয়িত্রি, হে ত্রিনয়নি, গৌরি, নারায়ণি, তোমাকে নমস্কার।—ঐ, ১১/১০