একবিংশ পরিচ্ছেদ
পাশ্চাত্য সেবাব্রতীকে শিক্ষাদান-প্রণালী

স্বামীজী একবার গাজীপুরের পওহারী বাবাকে জিজ্ঞাসা করেন, ”কাজে সফলতার রহস্য কি?” এবং তিনি এই উত্তর লাভ করেন, “জৌন সাধন তৌন সিদ্ধি”—যাহা সাধন, তাহাই সিদ্ধি, অর্থাৎ সাধন বা উপায়গুলিকে সাধ্য বা উদ্দেশ্যের ন্যায় জ্ঞান করিতে হইবে।

এই উক্তির প্রকৃত অর্থ লোকে কালেভদ্রে ক্ষণেকের জন্য হৃদয়ঙ্গম করে। কিন্তু যদি ইহার অর্থ এই হয় যে, সাধকের সমগ্র শক্তি উপায়গুলির উপরেই কেন্দ্রীভূত হওয়া চাই—যেন উহারাই উদ্দেশ্য এবং সেই সময়ের জন্য প্রকৃত উদ্দেশ্য বিস্মৃত হইতে হইবে, অথবা উপেক্ষা করিতে হইবে—তাহা হইলে গীতার সেই মহতী শিক্ষারই উহা প্রকারান্তর মাত্র হইয়া দাঁড়ায়, “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন”-কর্মেই তোমার অধিকার, ফলে নহে।

আমাদের আচার্যদেব তাহার শিষ্যগণকে এই আদর্শের অভ্যাসপ্রচেষ্টায় অনুপ্রাণিত করিবার রহস্য অদ্ভুত রকমে জানিতেন। তিনি মনে করিতেন, যদি কোন ইউরোপীয় তাঁহার মতানুযায়ী ভারতের জন্য কার্যকরেন, তবে তাহাকে উহা ভারতীয় প্রণালীতেই করিতে হইবে। স্বামীজীর এই ধারণার পশ্চাতে তাহার নিজস্ব যুক্তি ছিল, এবং হয়তো প্রত্যেক ভারতবাসী উহা বুঝিতে পারিবেন। এই দাবির মধ্যে একদিকে যেমন তিনি মুখ্য ও গৌণ বিষয়গুলিকে কদাপি মিশাইয়া এক করিয়া ফেলেন নাই, তেমনি অপরদিকে সামান্য তুচ্ছ ব্যাপারও তিনি কম গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া মনে করিতেন না। যেসব খাদ্য শাস্ত্রসম্মত, কেবল তাহাই আহার এবং উহা আবার হাত দিয়া খাওয়া, মেঝের উপর উপবেশন ও শয়ন, হিন্দুর সকল আচার-অনুষ্ঠান পালন, এবং হিন্দুর দৃষ্টিতে যাহা শিষ্টাচার বলিয়া গণ্য, তাহার যথাযথ পালন ও সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ

এই সকলের প্রত্যেকটি তাহার মতে ভারতীয় চেতনা আয়ত্ত করিবার উপায়স্বরূপ, যাহার ফলে অতঃপর কোন বিদেশী জীবনের বৃহত্তর সমস্যাগুলির সমাধান ভারতীয়ভাবে বুঝিতে অভ্যস্ত হইবেন। অতি তুচ্ছ ব্যাপার, যেমন সাবানের পরিবর্তে বেসন ও লেবুর রস ব্যবহার—তাহার নিকট প্রণিধানযোগ্য ও করণীয় বলিয়া বোধ হইত। এমনকি, জাতিভেদ সম্পর্কে যে চিরপোষিত ধারণা অত্যন্ত অমার্জিত বলিয়া বোধ হইত, তাহাও সমর্থন ও আত্মসাৎ করিয়া লইতে হইবে। স্বামীজী যেন অন্তর হইতে বুঝিয়াছিলেন, হয়তো এমন দিন আসিবে, যখন লোকে তাহারই মতো ঐ সকল ধারণার পারে চলিয়া যাইবে; কিন্তু কোন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া ঐ প্রকার ধারণা হইতে মুক্তিলাভ এবং অন্ধতাবশতঃ উহার প্রতি উপেক্ষা অথবা অজ্ঞতা প্রদর্শন—এই উভয়ের মধ্যে কত প্রভেদ।

কোন একটি প্রথা শিক্ষা দিবার সঙ্গে তাহার অন্তর্নিহিত আদর্শ দেখাইয়া দিবার অসাধারণ ক্ষমতা স্বামীজীর ছিল। আজ পর্যন্ত ফু দিয়া আলো নেবানো মহা অপবিত্র ও অসভ্যজনোচিত কার্য ভাবিয়া আমরা শিহরিয়া উঠি, আবার শাড়ি পরা ও অবগুণ্ঠন দ্বারা মস্তক আবৃত করার অর্থ অভিমান ও হামবড়া ভাবের পরিবর্তে সর্বদা নম্ন-মধুরভাবে সকলকে মানিয়া চলা—এ-সকল বাহ্য ব্যাপার কত পরিমাণে এক একটি আদর্শের অভিব্যক্তি বলিয়া ভারতের সর্বসাধারণের পরিচিত, পাশ্চাত্যবাসী আমরা হয়তো যথার্থভাবে বুঝিয়া উঠিতে পারি না। অবগুণ্ঠন সম্পর্কে স্বামী সদানন্দ একবার আমাকে বলেন, “কখনো ওটা টেনে দিতে ভুলো না। মনে রেখো, আদর্শ পবিত্র জীবনের অর্ধেক ঐ শ্বেত অবগুণ্ঠনের মধ্যেই নিহিত।”

এই-সকল বিষয়ে স্বামীজী শিষ্যকে সেই পথেই পরিচালিত করিতেন, যে পথ শিষ্য ইতোমধ্যেই সঠিক বলিয়া জানিয়াছেন। যদি তাহাকে ভারতীয় শিক্ষাসংক্রান্ত কোন সমস্যার সমাধান করিতে হয়, তাহা হইলে প্রথমে নিম্নস্তরের শিক্ষাদান-প্রণালীর অভিজ্ঞতালাভ তাহার পক্ষে অপরিহার্য; এবং এই কার্যের জন্য সর্বোচ্চ ও অত্যাবশ্যক গুণ হইল, ছাত্রের দৃষ্টিতে জগৎকে দেখা—যদি একমুহূর্তের জন্য হয়, তাহাও স্বীকার। শিক্ষাবিজ্ঞানের প্রত্যেকটি নিয়ম এই কথাই ঘোষণা করে। যাহারা ছাত্রের দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া জগৎকেদেখিতে জানেন না, অথবা কোন্ অভীক্ষিত উদ্দেশ্যসাধনে সহায়তা করিতে হইবে, তাহা জ্ঞাত নহেন, তাহার নিকট ‘জ্ঞাত হইতে অজ্ঞাত বস্তুতে’, ‘সরল হইতে জটিল তত্ত্বে’, ‘স্থূল হইতে সূক্ষ্মে’ কথাগুলি, এমনকি, ‘শিক্ষা’ শব্দটি পর্যন্ত কেবল মুখের কথায় পর্যবসিত হয়। ছাত্রের স্বাভাবিক ইচ্ছার প্রতিকূলে শিক্ষাদান হিতসাধনের পরিবর্তে অনিষ্টকরই হয়।

স্বামীজীর শিক্ষাদানের মধ্যে তাঁহার এই সহজাত ধারণাই বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করিত যে, ভারতীয় চেতনা ভারতীয় দৈনন্দিন জীবনে সহস্র খুঁটিনাটি ঘটনার উপর প্রতিষ্ঠিত। একটু ভাল করিয়া দেখিলে বুঝিতে পারা যায় যে, শ্রীরামকৃষ্ণও এই প্রণালী অবলম্বন করিয়াছিলেন। যখনই তাহার কোন নূতন ভাব উপলব্ধি করিবার আকাঙক্ষা হইত, তিনি উক্ত মতাবলম্বীদের আহার, পরিচ্ছদ, ভাষা এবং সাধারণ চালচলন গ্রহণ করিতেন। কয়েকটি ধর্মমতের ব্যাপারেই শুধু তাহাদের সদৃশ হইবার প্রচেষ্টায় ক্ষান্ত হইতেন না।

কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের ন্যায় একজন মহান শিক্ষক এই সকল ব্যাপারেও শিষ্যের স্বাধীনতা অবহেলা করিতে পারিতেন না। উদ্দেশ্যটি একটু একটু করিয়া উদঘাটিত হইত, এবং সর্বদাই শিষ্য ইতোমধ্যে যাহা আয়ত্ত করিয়াছে, তাহারই সহায়তায় তাহাকে অগ্রসর করিয়া দিতেন। ইহা সত্য যে, তিনি সর্বদা তাহার নিজের ও অপর সকলের কর্মে প্রবৃত্ত হইবার উদ্দেশ্যটি বিশুদ্ধ কিনা, তাহা পরীক্ষা করিতেন, এবং সর্বদা সতর্ক থাকিতেন যাহাতে বিন্দুমাত্র স্বার্থ উহাতে প্রবেশ না করে। তিনি বলিতেন, “আমি কাউকে বিশ্বাস করি না, কারণ, আমি নিজেকেই বিশ্বাস করি না। কে জানে কাল আমি কি হব?” কিন্তু তিনি নিজে একবার যেমন বলিয়াছিলেন, তাহাও সত্য যে, অপরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ তাহার প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল—এমনকি, ভুলের সম্ভাবনা দূর করিবার জন্যও নহে। ভুল ঘটিয়া যাইবার পরই কেবল তিনি উহার কারণ প্রদর্শন করিতেন তাহার পূর্বে নহে।

১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দের প্রথম ছয়মাস আমি মধ্যে মধ্যে কলিকাতার নানা শ্রেণীর দেশীয় ও ইউরোপীয় ব্যক্তিগণের গৃহে আহারাদি করিতাম। স্বামীজী ইহাতে অস্বস্তিবোধ করিতেন। সম্ভবতঃ তাঁহার আশঙ্কা ছিল, ইহা দ্বারা নিষ্ঠাবান হিন্দুজীবনের অত্যধিক সরলতার প্রতি আমার বিতৃষ্ণা জন্মিতে পারে। একথাও তিনি নিঃসন্দেহে ভাবিয়াছিলেন যে, ইহাতে আজন্মসঞ্চিত সংস্কারসমূহের দ্বারা আমার পুনরায় আকৃষ্ট হইবার সম্ভাবনা আছে। পাশ্চাত্যে তিনি এক বিরাট ধর্মান্দোলনকে জনৈক অতিরিক্ত রুচিসম্পন্ন মহিলার তুচ্ছ সামাজিক উচ্চাকাঙাহেতু ধূলিসাৎ হইতে দেখেন। তথাপি তিনি এ-বিষয়ে আমাকে বিন্দুমাত্র বাধা দেন নাই, যদিও তাঁহার মুখনিঃসৃত একটি আদেশবাক্যই যে কোন সময়ে উহা বন্ধ করিয়া দিতে পারিত। ইহা যে তাহার মনঃপূত নয়, একথাও কখনও প্রকাশ করেন নাই। উপরন্তু কেহ নিজের কোন অভিজ্ঞতা তাহার দৃষ্টিগোচর করিলে তিনি আগ্রহসহকারে তাহা শ্রবণ করিতেন। রাজসিক আহার সম্পর্কে তাহার আশঙ্কা সাধারণভাবে প্রকাশ করিতেন, অথবা উহা দ্বারা অনিষ্ট হইবে বলিয়া গম্ভীর সাবধানবাণী উচ্চারণ করিতেন—যাহার অর্থ ঐ সময় আমাদের হৃদয়ঙ্গম হইত না। কিন্তু বর্তমান ভারতে যে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও স্বার্থ রহিয়াছে, তাহাদের সমন্বয় দৃষ্টিতে ধারণা করা আমার পক্ষে একান্ত প্রয়োজনীয়, সম্ভবতঃ ইহা উপলব্ধি করিয়াই তিনি সম্পূর্ণরূপে শিষ্যের মত সমর্থন করিয়া তাহাকে স্বাধীনভাবে তত্ত্ব অন্বেষণে অনুমতি দেন।

ইংলণ্ড-যাত্রারম্ভের পর জাহাজেই তিনি নিজ সঙ্কল্পিত আদর্শ সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত করেন। স্ত্রী-শিক্ষা কার্যের ভবিষ্যৎ আলোচনা-প্রসঙ্গে তিনি একদিন বলেন, “তোমাকে লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ একেবারে ছাড়তে হবে, এবং রীতিমত নির্জনবাস করতে হবে। তোমার চিন্তা, প্রয়োজন, ধারণা, অভ্যাস—এসব হিন্দুভাবাপন্ন করে তুলতে হবে। তোমার জীবন হবে ভেতরে বাইরে যথার্থ নিষ্ঠাবতী হিন্দু ব্রাহ্মণ-ব্রহ্মচারিণীর মতো। এর সাধনের উপায় তুমি নিজে থেকেই জানতে পারবে, যদি যথেষ্ট আগ্রহ থাকে। কিন্তু অতীত জীবন তোমাকে একেবারে ভুলতে হবে, এবং অপরেও যাতে ভুলে যায়, দেখতে হবে। তার স্মৃতি পর্যন্ত ত্যাগ করতে হবে।” আপাত-প্রতীয়মান বহু স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরঙ্কুশ জীবন সত্ত্বেও কোন সন্ন্যাসীই স্বামী বিবেকানন্দের ন্যায় মনে প্রাণে সন্ন্যাসী ছিলেন না। তথাপি এই সেবাব্রতীর ক্ষেত্রে তিনি তাহাকে কোন মঠের চতুঃসীমার মধ্যে আবদ্ধ না রাখিয়া তাহার পরিবর্তে ভারতবাসিগণের মধ্যে অবস্থান করিয়া তাহাদের জীবনযাত্রা লক্ষ্য করিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। আমার নিকট সময়ে সময়ে ইহাই তাহার প্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ বিকাশ বলিয়া প্রতিভাত হইয়াছে। একবার তিনি বলেন, “আমাদের সকল লোকের সঙ্গে তাদের নিজের ভাব বজায় রেখে কথা বলতে হবে।” এই বলিয়া তিনি কল্পনা-সহায়ে বর্ণনা দিতে লাগিলেন, হয়তো ভবিষ্যতে ইংলিশ চার্চের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গৈরিকধারী, নগ্নপদ ও অতি কঠোর-তপস্যারত ভারতীয় সন্ন্যাসী-সঙ্ঘের কোন সম্প্রদায় সর্বদা এই চরম সত্য ঘোষণা করিবে যে, সকল ধর্মই পরস্পরের সহিত সম্বদ্ধ।

যাহা হউক, এই ভারতীয় চেতনা আয়ত্ত করার ক্ষেত্রে তাহার আদর্শ কায়মনোবাক্যে ঐরূপ কামনা করার মধ্যেই কেবল নিহিত ছিল না। ইউরোপে সাধারণতঃ কোন ধর্মসম্প্রদায়ের নব শিক্ষার্থীকে যেভাবে শিক্ষাদান করা হয়, সেইভাবে তিনি ধাপে ধাপে তন্ন তন্ন করিয়া হিন্দু আচার ব্যবহার সম্পর্কে বিশদভাবে উপদেশ দিতেন। এই উপায়ে তিনি প্রাচ্যবাসীর নিকট অতিশয় অমার্জিত বলিয়া প্রতিভাত পাশ্চাত্যের আদবকায়দার সদা অস্থিরভাব ও সকল বিষয়ে জোর দিয়া বলার অভ্যাস দূর করিতে প্রয়াস পান। কষ্ট, প্রশংসা অথবা বিস্ময়—যে কোন মনোভাব সর্বদা সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করিয়া ফেলা তাহার নিকট অত্যন্ত বিসদৃশ বলিয়া বোধ হইত। ইহাকে অধর্মরূপে চিহ্নিত করা নিম্প্রয়োজন কারণ উহা কুশিক্ষার ফল। প্রাচ্যবাসী এই প্রত্যাশা করেন যে, প্রত্যেকের অন্তরে অনুভূতি থাকা উচিত, কিন্তু ঐ ভাব অন্তরেই চাপিয়া রাখিতে হইবে। দিবারাত্র কোন কৌতূহলোদ্দীপক অথবা সুন্দর বস্তু দৃষ্টিতে পড়িলেই তাহা তৎক্ষণাৎ দেখাইয়া দেওয়া, তিনি চিন্তার নিভৃতভাব ও স্বচ্ছন্দগতির অনধিকার বাধাস্বরূপ মনে করিতেন। তথাপি তাহার মনোমত আচরণ বা আদবকায়দার সেই শান্তভাব যে একটা নিষ্ক্রিয় অবস্থামাত্র নহে, তাহার নিদর্শন জনৈক সাধুর প্রত্যুত্তরে পাওয়া যায়। “ঈশ্বরের স্বরূপ কি?” রাজার বারংবার এই প্রশ্নের উত্তরে সাধু বলেন, “রাজা, এতক্ষণ ধরে তার স্বরূপ কি—তাই তো আমি তোমাকে বলছিলাম। কারণ, মৌনই তার স্বরূপ!”

এই বিষয়ে তিনি ছিলেন নাছোড়বান্দা। ইউরোপীয় শিষ্যের প্রতি তিনি দীর্ঘকালব্যাপী কঠোর সংযমের আদেশ দিতেন। একবার কোন ঘটনা উপলক্ষে তিনি বলিয়াছিলেন, “ভাবোচ্ছাসের নামগন্ধ না রেখে আত্মানুভূতির চেষ্টা কর।”

একবার শরৎকালের এক নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় বৃক্ষ হইতে জীর্ণপত্ৰসমূহ পড়িতে দেখিয়া তিনি অস্বীকার করেন নাই যে, দৃশ্যটির মধ্যে কবিত্ব আছে, কিন্তু বলেন, বাহ্য ইন্দ্রিয়জগতের সামান্য একটি ঘটনা হইতে উদ্ভূত মানসিক উত্তেজনা নিতান্তই ছেলেমানুষি এবং অশোভন। তিনি আরও বলেন, পাশ্চাত্যবাসীকে অনুভূতি ও ভাবোচ্ছস এই দুইটি বস্তুকে পৃথক রাখিবার মহাশিক্ষা লাভ করিতে হইবে। “গাছের পাতাগুলো ঝরছে দেখে যাও, কিন্তু এই দৃশ্য দেখে যে ভাবের উদ্রেক হয়, তা পরে কোন সময়ে নিজের অন্তর থেকে সংগ্রহ কর।”

ইহা অবিকল সেই ইউরোপের মঠসমূহে প্রচলিত নীতি—যাহা শান্ত ও সংযতভাব বলিয়া পরিচিত। ইহাকে কি আমাদের উদ্ভাবনী শক্তি বিকাশের এক সূন উপায় বলা যায়? অথবা উহা এমন এক কবিত্বের সূচনা নির্দেশ করে—যাহা জগৎকে এক বিরাট প্রতীক বলিয়া মনে করিলেও বিচার বুদ্ধিকে ইন্দ্রিয়রাজ্যের বহু ঊর্ধে আসন প্রদান করে?

প্রশ্নটিকে শুধু সৎশিক্ষা ও সংযম অভ্যাসের রাজ্যের বাহিরে লইয়া গিয়া স্বামীজী কেবল ধর্মজীবনে ঐ সত্যের প্রয়োগ করিয়াও দেখিয়াছিলেন। সেইজন্য সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক বিচার-প্রসূত সুখলিঙ্গাকেও তিনি ভয়ঙ্কর বন্ধন বলিয়া জ্ঞান করিতেন এবং ঐভাবে বর্ণনা করিতেন। স্বামীজী বলিতেন, সকল আদর্শের ক্ষেত্রেই একটি বিপদের আশঙ্কা আছে, তাহা হইল, আমরা যতটুকু নিজে উপলব্ধি করিতে পারিয়াছি, তাহাকেই আদর্শ বলিয়া মনে করা। উহা কেবল শবের উপর একরাশ ফুল চাপা দেওয়া, এবং কার্যে পরিণত হইলে উহার অর্থ দাঁড়ায়—শীঘ্র অথবা বিলম্বে হউক, জনসাধারণের পক্ষ পরিত্যাগ এবং তাহাদের উন্নতিকল্পে আর কার্যের বিনাশ। তাহারাই কেবল বিশ্বস্ত, যাহারা প্রলোভনের অতীত এবং সম্পূর্ণরূপে অহংবর্জিত হইয়া কেবল শুদ্ধ ভাবের অনুগামী। ভাবী কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আলোচনা করিতে করিতে তিনি বলিলেন, “সাবধান! উত্তম আহার, পরিচ্ছদ—এ সকলের প্রতি মনোযোগ দিও না। সংসারে বাইরের চাকচিক্যে মুগ্ধ হলে চলবে না। ওসব একেবারে পরিত্যাগ করা চাই। মূলসমেত উপড়ে ফেলতে হবে। এ কেবল ভাবুকতা—ইন্দ্রিয়ের অসংযম থেকেই এর উৎপত্তি। বিচিত্র বর্ণ, সুন্দর দৃশ্য ও শব্দ এবং অন্যান্য সংস্কার অনুযায়ী এইসব উচ্ছাস মানুষের কাছে উপস্থিত হয়। এসব দূর কর। ঘৃণা করতে শেখ। এটা একেবারে বিষ!”

এইরূপে হিন্দু গৃহস্থালীর সাধারণ দৈনন্দিন কর্তব্যগুলি স্বামীজীর বর্ণনায় রাশি রাশি গভীরতর তথ্যের উদ্বোধক হইয়া দাঁড়াইত—যাহা কেবল হিন্দু মনেরই সহজবোধ্য। তিনি নিজে আশৈশব সন্ন্যাসী-সঙ্ঘ-পরিচালনা সম্পর্কে জানিতে উৎসুক ছিলেন। এক সময়ে একখানি ঈশা-অনুসরণ (Imitation of Christ) পুস্তক ঠাহার হস্তগত হয়; উহার মুখবন্ধে উক্ত গ্রন্থের আনুমানিক রচয়িতা আঁা-দ্য-জের্স (Jean de Gerson) যে মঠভুক্ত ছিলেন ঐ মঠ এবং যে নিয়মগুলি তিনি অনুসরণ করিতেন, তাহার বর্ণনা ছিল। স্বামীজীর কল্পনায় উক্ত মুখবন্ধ ছিল পুস্তকটির রত্নস্বরূপ। বার বার পাঠ করিয়াও তাঁহার তৃপ্তি হয় নাই; ক্রমে উহা তাহার কণ্ঠস্থ এবং বাল্যকালের স্বপ্নের সহিত বিশেষভাবে জড়িত হইয়া যায়। অবশেষে প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হইয়া বিস্ময়ের সহিত দেখিলেন যে, তিনি স্বয়ং ভাগীরথীতীরে এক সন্ন্যাসীসঙ্ঘ স্থাপন করিতেছেন, এবং হৃদয়ঙ্গম করিলেন যে, তাহার শৈশবের ঐকান্তিক অনুরাগ ভাবী জীবনের পূর্ব ছায়াপাত মাত্র।

তথাপি কোন পাশ্চাত্য শিষ্যের নিকট আদর্শরূপে তিনি যে নিয়মানুবর্তিতা উপস্থিত করিতেন, তাহা কর্তৃপক্ষের বা বিদ্যালয়ের কঠোর আনুগত্য নহে; উহা যেন কোন হিন্দু বিধবার পরিবারের মধ্যে অবস্থান করিয়া স্বাধীনভাবে নিজ নিয়মগুলি পালন করিয়া যাওয়া। চরিত্রবতী নারীর আদর্শ বলিতে তিনি বুঝিতেন ‘নিষ্ঠাবতী হিন্দু ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচারিণী।’ যে আনন্দের সহিত তিনি ঐ কয়েকটি কথা উচ্চারণ করিতেন তাহা বর্ণনা করা যায় না!

এই বিষয়টির আলোচনা-প্রসঙ্গে একদিন তিনি বলেন, “তোমার ছাত্রীদের জন্য কতকগুলো নিয়ম কর, এবং ঐ নিয়ম সম্বন্ধে তোমার মতামতও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দাও। সুবিধা হলে একটু উদার ভাবের প্রশ্রয় দিও। কিন্তু মনে রেখো যে, সমগ্র জগতে পঁচ-ছ জনের বেশি লোক কখনো একসঙ্গে ঐ ভাব গ্রহণ করবার উপযুক্ত নয়! সম্প্রদায়ের ব্যবস্থা থাকবে, আবার সেই সঙ্গে সম্প্রদায়ের গণ্ডির বাইরে চলে যাবার ব্যবস্থাও থাকবে। তোমার সহকারিণীদের তোমাকেই প্রস্তুত করে নিতে হবে। নিয়ম কর, কিন্তু এমনভাবে কর যে, যারা নিয়ম ব্যতীত কাজ করবার উপযুক্ত হয়েছে, তারা যেন সহজে ওগুলি ভেঙে ফেলতে পারে। আমাদের মৌলিকত্ব হলো, পূর্ণ স্বাধীনতার সঙ্গে পূর্ণ শৃঙ্খলা। সন্ন্যাসী-সঙেঘও তা করা যেতে পারে। আমার নিজের কথা বলতে গেলে, আমি সব সময় অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাই এবং তার ফলে বুঝতে পারি, ওটা সম্ভবপর।”

সহসা তিনি এই প্রসঙ্গ ত্যাগ করিলেন এবং যে প্রসঙ্গ সর্বদা তাহার নিকট প্রীতিকর ছিল ও যথাযথ প্রয়োগের দ্বারা যাহা ফলপ্রদ হইবে বলিয়া তিনি বিশ্বাস করিতেন, তাহার অবতারণা করিলেন। বলিলেন, “দুটো বিভিন্ন জাতের মেলামেশার ফলে তাদের মধ্য থেকে এক নতুন ধরনের শক্তিশালী জাতের উদ্ভব হয়। এই নতুন জাতটা নিজেকে অপরের সঙ্গে মিশে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করে, আর এখানেই জাতিভেদের আরম্ভ। দেখ না, যেমন আপেল। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভালজাতের আপেলগুলি বিভিন্ন জাতের সংযোগে উৎপন্ন হয়েছে, কিন্তু একবার ঐভাবে উৎপন্ন হবার পর আমরা ঐ বিশেষ জাতের আপেল বার বার পৃথক রাখবার চেষ্টা করে থাকি।”

কয়েকদিন পরে আবার ঐ চিন্তাই স্বামীজীর মনে প্রবল হইয়া উঠিল, এবং তিনি বিশেষ আগ্রহের সহিত বলিলেন, “আমি ভবিষ্যতের যতটা দেখতে পাচ্ছি, তাতে একটি বলশালী ও পৃথক নতুন জাত সর্বদাই শরীর-ভিত্তিক। সর্বজনীনতা, উদারভাব প্রভৃতি মুখে বলা খুব সহজ, কিন্তু এখনো লক্ষ লক্ষ বছর জগৎ এব জন্য তৈরি হতে পারবে না।”

তিনি আবার বলিলেন, “মনে রেখো, যদি তুমি জানতে চাও, একখানা জাহাজ দেখতে কি রকম,তাহলে জাহাজটি ঠিক যেমন, তেমন তার বর্ণনা দিতে হবে তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, আকার, এবং কোন্ কোন্ উপাদানে তৈরি; কোন জাতকে বুঝতে হলেও আমাদের অনুরূপভাবে বুঝতে হবে। ভারত মূর্তিপূজক দেশ, স্বীকার করি। সে যেমন, তাকে ঠিক তেমনভাবে সাহায্য করতে হবে কিছু বাদ দিলে চলবে না। যারা তাকে ত্যাগ করেছে, তারা তার কোন উপকারই করতে পারবে না।”

স্বামীজী প্রাণে প্রাণে বুঝিতেন, ভারতে স্ত্রীশিক্ষাবিস্তারের ন্যায় আর কিছুই তত প্রয়োজন নহে। তাহার নিজের জীবনে দুটি সঙ্কল্প ছিল—একটি রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের জন্য মঠ স্থাপন, এবং অপরটি নারীজাতির শিক্ষাকল্পে কোন উদ্যমের সূত্রপাত করিয়া যাওয়া। তিনি প্রায়ই বলিতেন, “পাচশত পুরুষের সাহায্যে ভারতবর্ষ জয় করতে পঞ্চাশ বছর লাগতে পারে, কিন্তু পাচশত নারীর দ্বারা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা সম্ভব।”

শিক্ষা দিয়া তৈয়ারি করিয়া লইবার জন্য বিধবা ও অনাথাদের সংগ্রহ করা সম্বন্ধে তাঁহার মত ছিল, জন্মগত উচ্চ-নীচ ভেদ দৃঢ়তার সহিত উপেক্ষা করিতে হইবে। কিন্তু এ বিষয়ে কৃতকার্য হইতে গেলে, যাহাদের নির্বাচন করা হইবে, তাহারা’ যাহাতে অল্পবয়স্ক ও পূর্বেই কোন নির্দিষ্টরূপে গঠিত না হইয়া থাকে, তাহা দেখা একান্ত আবশ্যক। প্রায়ই তিনি বলিতেন, “জন্ম কিছুই নয়, পারিপার্শ্বিক অবস্থাই সব।” কিন্তু সর্বোপরি তিনি উপলব্ধি করিতেন যে, এ বিষয়ে কোনরূপ অসহিষ্ণুতা অমার্জনীয়। যদি বার বৎসরে কোন ভাল ফল দৃষ্ট হয়, তবে বুঝিতে হইবে, বিশেষ সাফল্য হইয়াছে। কাজটি এতই গুরুতর যে, উহার সম্পাদনে সত্তর বৎসর লাগিলেও তাহা অধিক নহে।

ঘন্টার পর ঘণ্টা ধরিয়া তিনি বসিয়া থাকিতেন এবং স্ত্রীশিক্ষা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করিতেন, একটি আদর্শ বিদ্যালয় স্থাপন সম্বন্ধে আকাশকুসুম রচনা করিতেন, এবং ঐ-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে সাদরে বর্ণনা করিতেন। হয়তো উহার কোন অংশই যথাযথভাবে কার্যে পরিণত হইবে না, তথাপি উহার সবটাই নিশ্চয় মূল্যবান। কারণ, উহা দ্বারা বুঝা যায়, তিনি কতটা স্বাধীনতা দিবার পক্ষপাতী ছিলেন এবং তাহার দৃষ্টিভঙ্গিতে কিরূপ ফললাভ বাঞ্ছনীয় বলিয়া বোধ হইত।

ইহা খুব স্বাভাবিক ছিল যে, পরিকল্পিত কার্যপ্রণালী একটা ধর্মভাবে অনুরঞ্জিত হইবে। কারণ, আমার নিজের দিক দিয়া আমি সেই সময় হিন্দুধর্মের চিন্তা ও আদর্শের আলোচনায় বিশেষ ব্যাপৃত ছিলাম। ঐ কার্যপ্রণালী আবার পাণ্ডিত্যের দিকে লক্ষ্য না রাখিয়া সাধুজীবনযাপনের অনুকূল করিবার দিকে বিশেষ চেষ্টা ছিল। কোন্ কোন্ বিষয়ে শিক্ষা দিতে হইবে, তাহার অপেক্ষা শিক্ষার প্রকৃতি ছিল তাহার সমধিক চিন্তার বিষয়। আমাদের বিদ্যালয় থেকে এমন সব মেয়ে শিক্ষিতা হবে, যারা ভারতের সকল মেয়ে পুরুষের মধ্যে মনীষায় শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করবে”—একবার মাত্র হঠাৎ এই কথা বলা ব্যতীত আমার মনে পড়ে না যে, স্ত্রীশিক্ষা-পরিকল্পনার ঐহিক দিকটির বিষয়ে তিনি প্রত্যক্ষভাবে কখনও কিছু বলিয়াছেন। তিনি ধরিয়া লইয়াছিলেন যে, কোন শিক্ষা বাস্তবিক শিক্ষা নামে অভিহিত হইবার উপযুক্ত কিনা, তাহা উহার গভীরতা ও কঠোরতা দ্বারাই নিরূপিত হইবে। যে মিথ্যা আদর্শ-কল্পনা নারীজাতির জন্য জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন সাধন অথবা নিম্নতর সত্যলাভই যথেষ্ট বলিয়া বিবেচনা করে, তাহার প্রতি তাহার কোনরূপ বিশ্বাস ছিল না।

গৃহ পরিবেশ কিরূপ হইলে স্ত্রীশিক্ষাকার্যটি সর্বতোভাবে প্রগতিশীল ও সম্পূর্ণ হিন্দুভাবে পরিচালিত হইতে পারে, এই সমস্যা তাহার বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছিল। অধিকন্তু, পুরাতন পদ্ধতির নিয়মগুলির এরূপ আকার দান করিতে হইবে, যাহাতে তাহারা বরাবর আধুনিকভাবাপন্ন ব্যক্তিগণের শ্রদ্ধা আকর্ষণে সক্ষম হয়। সামাজিক স্থায়িত্ব ও সুসঙ্গতির উপর বিদেশী ভাবাদর্শের ফলাফল বিচার না করিয়া অতি সহজেই তাহাদের গ্রহণ করিয়া লওয়ার ফলে চরিত্রের দিক দিয়া এবং নীতিগত যে ব্যর্থতা প্রত্যক্ষ হয়, তাহা সর্বদাই তাহার দৃষ্টিপথে পড়িত। স্বাভাবিক সংস্কারবশে তিনি জানিতেন, প্রাচীন সমাজ যেসকল বন্ধন দ্বারা ঐক্যবদ্ধ ছিল, আধুনিক শিক্ষার আলোকে তাহাদের নূতন করিয়া অনুমোদন লাভ এবং পবিত্ৰতররূপে পরিগ্রহণ একান্ত আবশ্যক, নতুবা ঐ শিক্ষা শুধু ভারতের অধঃপতনের সূচনামাত্র বলিয়া প্রমাণিত হইবে। কিন্তু তিনি কদাপি চিন্তা করেন নাই যে, এই প্রাচীন ও নূতনের সমন্বয়সাধন সহজসাধ্য। কিরূপে আধুনিক ভাবকে জাতীয়তাসম্পন্ন এবং প্রাচীন ভাবকে আধুনিক যুগের উপযোগী করিয়া তোলা যায়—যাহাতে উভয়ের মধ্যে ঐক্য সাধিত হইতে পারে এই কঠিন সমস্যা তাহার অধিকাংশ সময় ও চিন্তা অধিকার করিয়া থাকিত। তিনি ঠিকই বুঝিয়াছিলেন যে, যখন এই উভয়কে সংযোগ করিয়া একত্র করা যাইবে, তখনই জাতীয় শিক্ষার সূচনা ঘটিবে, তাহার পূর্বে নহে।

কি উপায়ে হিন্দুজীবনের প্রচলিত ঋণগুলিকে নূতনভাবে ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে, যাহাতে দেশ ও ইতিহাসের প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে আধুনিক চেতনা উহার অন্তর্ভুক্ত করিয়া লওয়া যায়, তাহা সহসা একদিন তাহার মনে উদিত হয়, এবং তিনি বলিয়া ওঠেন, “এই পঞ্চযজ্ঞের ব্যাপার নিয়েই কত কী করা যায়! কত বড় বড় কাজেই এগুলিকে লাগানো যেতে পারে!”

বিষয়টি সম্পর্কে তাহার মনে সহসা এক নূতন আলোকপাত হইয়াছিল, কিন্তু মন হইতে চলিয়া যায় নাই। ঐ ভাবটির সূত্র ধরিয়া তিনি ক্রমশঃ উহার বিস্তৃত অবতারণা করিলেন।

“[পিতৃযজ্ঞ] প্রাচীনযুগের ঐ পিতৃউপাসনা থেকে তোমবাবীরপূজার সৃষ্টি করতে পার।

“[দেবযজ্ঞ] দেবপূজায় অবশ্য প্রতিমাদির ব্যবহার চাই। কিন্তু তোমরা তাদের পরিবর্তন সাধন করতে পার। মা কালীকে সব সময় এক অবস্থায় দণ্ডায়মান রাখবার প্রয়োজন নেই। তোমার ছাত্রীদের নূতন নূতন ভাবে মা কালীকে কল্পনা করতে উৎসাহ দাও। দেবী সরস্বতীকে একশতভাবে ধারণা কর। মেয়েরা নিজ নিজ ভাব অনুযায়ী মূর্তি গঠন করুক এবং চিত্র অঙ্কন করুক।

“পূজার ঘরে বেদীর সবচেয়ে নিম্নধাপে সব সময় একটি জলপূর্ণ কলস থাকবে, এবং তামিলদেশের মতো সর্বদাই বড় বড় ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলবে। আর যদি ঐসঙ্গে দিবারাত্র ভজন-পূজনের ব্যবস্থা করতে পারা যায়, তাহলে তার চেয়ে হিন্দুভাবের পোষক আর কিছুই হতে পারে না।

“কিন্তু পূজার অনুষ্ঠানগুলির ব্যবস্থা যেন অবশ্যই বৈদিক হয়। বৈদিক যুগের মতো একটি বেদী থাকবে, এবং পূজাকালে তাতে বৈদিক অগ্নি প্রজ্বলিত হবে। ছোট ছোট মেয়েরাও তাতে অবশ্যই যোগ দিয়ে আহুতি দেবে। এই অনুষ্ঠান সমগ্র ভারতে শ্রদ্ধা অধিকার করবে।

“[ভূতযজ্ঞ] নানারকম জন্তু রাখবে। গরু থেকে আরম্ভ করলে ভালই হবে। কিন্তু কুকুর, বিড়াল, পাখি প্রভৃতি অন্যান্য জীবজন্তুও রাখবে। ছোট ছোট মেয়েদের তাদের খাওয়াবার ও যত্ন করবার একটা সময় নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।

“[ব্ৰহ্মযজ্ঞ] তারপর বিদ্যাযজ্ঞ। এটি সবচেয়ে সুন্দর। ভারতে প্রত্যেক বই-ই পবিত্র; একথা জান কি? শুধু বেদ নয়, ইংরেজী, মুসলমানী সব বই। সব পবিত্র।

“পুরানো কলাবিদ্যাগুলি আবার উদ্ধার কর। তোমার মেয়েদের খোয়াক্ষীর দিয়ে নানারকম ফলের আকার তৈরি করতে শেখাও। তাদের সুন্দর, শিল্পসম্মত রন্ধন ও সেলাই শেখাও। তারা ছবি আঁকা, ফটো তোলা, কাগজের নানারকম নক্সা কাটা এবং সোনারূপার তার দিয়ে লতাপাতা তৈরি করা ও ছুঁচের কাজ শিখুক। লক্ষ্য রাখবে, প্রত্যেকে যেন এমন কিছু বিদ্যা শেখে, যার দ্বারা প্রয়োজন হলে জীবিকা অর্জন করতে পারে।

“[নৃযজ্ঞ] মানুষের সেবার কথা কদাপি ভুলে যেও না। সেবার ভাব থেকে মানুষকে পূজা করার ভাব ভারতে বীজাকারে বর্তমান আছে, কিন্তু তার প্রতি কখনও বিশেষ জোর দেওয়া হয়নি। তোমার মেয়েরা এর বিকাশসাধন করুক। একে কাব্য ও চারুকলার অঙ্গ করে নিও। হ, প্রত্যহ স্নানের পর এবং আহারের পূর্বে ভিক্ষুকদের পা পূজা করলে একসঙ্গে হৃদয় ও হাতের আশ্চর্যরকম যথা শিক্ষা হবে। কোন কোন দিন আবার ছোট ছোট মেয়েদের—তোমার নিজের ছাত্রীদেরই পূজা করতে পার। অথবা তুমি অপরের শিশু সন্তানদের চেয়ে এনে তাদের সেবাশুশ্রুষা করতে ও আহার করাতে পার। মাতাজী(১) আমাকে বলেছিলেন, স্বামীজী! আমার কোন সহায় নেই। কিন্তু আমি এই পবিত্র কুমারীদের পূজা করে থাকি, এরাই আমাকে মুক্তির পথে নিয়ে যাবে।’ দেখলে, তিনি প্রাণে প্রাণে অনুভব করেন যে, এইসব কুমারীদের মধ্যে তিনি উমারই সেবা করছেন। বিদ্যালয় আরম্ভ করবার পক্ষে এ ভাবটি অতি চমৎকার।”

কিন্তু এইরূপে প্রাচীন ও নূতনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য তিনি বিশদ চিত্র অঙ্কনে প্রবৃত্ত হইলেও ইহা সর্বদাই সত্য ছিল যে, তাহার উপস্থিতিই ছিল আদর্শটিকে গ্রহণ করিবার উপায়স্বরূপ—প্রত্যেক আন্তরিক প্রচেষ্টাকেই উহা আদর্শের সহিত প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করিয়া দিত। অতি স্থূলদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির নিকটেও প্রাচীন অনুষ্ঠানাদির যথার্থ মর্ম উদঘাটন করিয়া দিত। তাহার প্রভাবেই আধুনিকভাবাপন্ন হিন্দুগণ কর্তৃক স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে ঐ সকল অনুষ্ঠান পুনরায় আচরিত হইয়া সহসা উহাদের প্রাণপ্রদ ও মূল্যবান করিয়া তুলিত। এইরূপে, ইউরোপীয় বিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে যে সকল বীরহৃদয় মনীষী জীবন আহুতি দিয়াছেন, তাঁহাদের প্রতি জনৈক ভারতীয় মহান্ বৈজ্ঞানিকের শ্রদ্ধা দেখিয়া মনে হইল, উহা প্রাচীনযুগের আচাৰ্যকুলবরই আধুনিক রূপান্তরমাত্র। ব্রহ্মজ্ঞানই যে-জাতির জীবনের চরম লক্ষ্য, তাহার পক্ষে জ্ঞানের বাহ্যপ্রয়োগ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকিয়া কেবল জ্ঞানের জন্যই জ্ঞানচর্চা অবশ্যম্ভাবী মহত্ত্ব বলিয়াই বোধ হয়। নাম, যশ ও ঐশ্বর্যের প্রতি প্রশান্ত নিরাসক্তি ইহাই প্রমাণ করে যে, কর্মী নাগরিক ও গার্হস্থ্য জীবনযাপন করিলেও ধর্মের দিক হইতে তিনি সন্ন্যাসীই।

তাহার নিজ জীবনের এই উপাদান বা গুণ—যাহা তাহার মহত্ত্ব ও বীরোচিত সবকিছুর স্বীকৃতিজ্ঞাপক, ইতিপূর্বে প্রকাশিত আদর্শবিশেষের পরিচায়ক অথবা উদাহরণরূপে পরিগণিত—সে সম্পর্কে স্বামীজী স্বয়ং অবশ্য অবহিত ছিলেন না। তথাপি মনে হয়, ইহার মধ্যেই তাঁহার সকল জিনিস ধরিবার ও বুঝিবার যে ক্ষমতা তাহার শ্রেষ্ঠ বিকাশ নিহিত। শিক্ষাসংক্রান্ত তাহার বিশদ ইঙ্গিতগুলি সম্পর্কে বক্তব্য এই যে, শিক্ষাব্যাপারে উহাদের যৌক্তিকতা আমার নিকট সর্বদাই বিস্ময়কর। যদিও তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন যে, এক সময়ে তাহাকে দুঃখ-দারিদ্র্যেরসহিত কঠোর সংগ্রাম করিতে হয় এবং সেই সময় তিনি হার্বার্ট স্পেন্সারের শিক্ষা (Education) নামক গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করিবার ভার লন; এবং ক্রমশঃ ঐ বিষয়ে আকৃষ্ট হইয়া পেস্তালৎসি(২) রচিত যে পুস্তকগুলি পাইয়াছিলেন, তাহাও অধ্যয়ন করেন, যদিও উহা তাহার পাঠ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তথাপি এই ঘটনাটি শিক্ষাবিষয়ে তাহার গভীর জ্ঞানের যথেষ্ট কারণ বলিয়া আমার কখনও মনে হয় নাই।

প্রকৃতপক্ষে হিন্দুগণ মনের ক্রিয়াকলাপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করিতে এত নিপুণ, এবং ধর্মানুষ্ঠানের মাধ্যমে মানসিক বৃত্তিসমূহের বিকাশসাধনের এমন চমৎকার দৃষ্টান্ত সর্বদা তাহাদের সামনে অবস্থান করে যে, শিক্ষাসংক্রান্ত মতামতের আলোচনা-জগতে তাঁহারা অন্য জাতি অপেক্ষা প্রচুর সুবিধা লাভ করিয়া থাকেন। একথা ভাবিবার যথেষ্ট কারণ আছে যে, ঐ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিন্তা করার রহস্য তাঁহারা একদিন আয়ত্ত করিয়া ফেলিবেন। ইতিমধ্যে ঐ আদর্শের পরিপূর্ণতালাভের প্রথম সোপান হইল প্রচলিত প্রথাগুলির মধ্যে কি বিপুল উন্নতির সম্ভাবনা রহিয়াছে তাহা ধারণা করা। স্বামী বিবেকানন্দের কল্পনার বিস্তার ও পূর্ণতা সম্পাদনের ভার ভাবতীয় শিক্ষাবিগণের উপর নিহিত। যখন উহা সম্পূর্ণ হইবে, যখন তাহার অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রীতির সহিত ভাবী বংশধরগণ সম্বন্ধে তাহার সাহস ও আশা এবং জ্ঞানমাত্রেই পবিত্রবোধে তাহার আনুগত্য-এই সকল একত্র যুক্ত করিতে আমরা সমর্থ হইব, তখনই বুঝিতে হইবে, জগতের নারীজাতির মধ্যে ভারতীয় নারীর যথার্থ স্থান অধিকারের দিন সমাগতপ্রায়।


* ব্ৰহ্মযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ ও নৃযজ্ঞ।
“অধ্যাপনং ব্রহ্মযজ্ঞঃ পিতৃযজ্ঞশ্চ তর্পণম।
হোমো দৈবো, বলিভৌতো, নৃযজ্ঞোহতিথিপূজনম।”—মনু, ৩।৭০–অনুঃ
১ মহকালী পাঠশালার প্রতিষ্ঠাত্রী
২ পেস্তালৎসি (Pestalozzi) জীবনের কতক অংশ শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যা লইয়া অতিবাহিত করেন। ঐ সম্বন্ধে তিনি কয়েকখানি পুস্তকও রচনা করেন। তিনি ১৭৪৬ খ্রীস্টাব্দে সুইজারল্যাণ্ডের জুরিক (Zurich) শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮২৭ খ্রীস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।–অনুঃ