দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ
সন্ন্যাস ও গার্হস্থ্য

স্বামীজীর দৃষ্টিতে তাহার সন্ন্যাসের ব্ৰতগুলি ছিল অতিশয় মূল্যবান। যে-কোন অকপট সন্ন্যাসীর ন্যায় তাহার নিজের পক্ষে বিবাহ অথবা তৎসংশ্লিষ্ট কোন ব্যাপার মহাপাপ বলিয়া গণ্য হইত। ঐ-বিষয়ক প্রবৃত্তির স্মৃতি পর্যন্ত মনে স্থান পাইবে না, ইহাই ছিল তাঁহার আদর্শ এবং কায়মনোবাক্যে নিজেকে এবং নিজের শিষ্যগণকে উহার লেশমাত্র সম্ভাবনা হইতেও তিনি দূরে রাখিবার চেষ্টা করিতেন। অবিবাহিত থাকাটাই তাহার নিকট এক আধ্যাত্মিক সম্পদ বলিয়া পরিগণিত হইত। এইসকল পর্যালোচনা করিলে বুঝা যায়, তিনি যে শুধু সন্ন্যাস-জীবনে চরম উৎকর্ষলাভের জন্যই সর্বদা উৎসুক থাকিতেন তা নয়, ব্রতভঙ্গের আশঙ্কাতেও সর্বদা ভীত থাকিতেন। এই ভয় তাহার নিজের আদর্শ-উপলব্ধির পক্ষে যতই সহায়ক ও আবশ্যক বলিয়া বোধ হউক, নিঃসন্দেহে উহা বহু বৎসর ধরিয়া এই অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ে একটা চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে দেয় নাই।

কিন্তু একথা যেন সকলে উপলব্ধি করেন যে, তিনি স্ত্রীলোক হইতে ভয় পাইতেন না, তাহার ভয় ছিল প্রলোভনকে। পৃথিবীর সর্বত্র তাহাকে মেয়েদের সহিত যথেষ্ট মিশিতে হইয়াছিল। তাহারা ছিলেন তাহার শিষ্য, কার্যের সহায়ক, এমনকি, বন্ধু এবং খেলার সাথীও। তাহার পরিব্রাজক-জীবনের এই সকল বন্ধুর সহিত ব্যবহারে তিনি প্রায় সর্বদাই ভারতের পত্নীগ্রামের প্রথা অবলম্বন করিতেন, এবং তাহাদের সহিত কোন একটা পারিবারিক সম্পর্ক পাতাইয়া লইতেন। কোন স্থানের মেয়েরা তাহার ভগিনী হইল, কোথাও বা মাতা, কোথাও কন্যা, এইরূপ সর্বত্র। ইহাদের মহত্ত্ব এবং মিথ্যা বা তুচ্ছ ভাবরাহিত্য সম্বন্ধে তিনি কখন কখনও গর্ব প্রকাশ করিতেন; কারণ, তাঁহার নিজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও মার্জিত ব্যক্তিগণের যে বৈশিষ্ট্য তাহা অত্যন্ত অধিক পরিমাণে ছিল, সেজন্য নারীগণের মধ্যে তিনি ক্ষুদ্রতা ও দুর্বলতার পরিবর্তে মহত্ত্ব ও চারিত্রিক শক্তিরই অন্বেষণ করিতেন। আমেরিকায় তিনি মেয়েদের নৌকা চালানো, সন্তরণ ও নানাপ্রকার ক্রীড়া দেখিয়া বিশেষ আনন্দলাভ করেন। তাহার নিজের ভাষায় “এইসব মেয়েদের একবারও মনে হয় না যে, তারা ছেলে নয়।” ঐরূপে তাহারা যে পবিত্রতার আদর্শের মূর্ত বিগ্রহ বলিয়া তাহার বোধ হইয়াছিল, সেই আদর্শ তিনি পূজা করিতেন।

সন্ন্যাসীদের শিক্ষা সম্বন্ধে তিনি সর্বদা বিশেষ জোর দিয়া বলিতেন যে, সন্ন্যাসী নিজেকে পুরুষ বা নারী কিছুই ভাবিবেন না, কারণ তিনি ঐ উভয়ের পারে গিয়াছেন। যাহা কিছু—এমনকি শিষ্টাচারও–লিঙ্গভেদের কথা মনে পড়াইয়া দেয়, তাহাই তাঁহার নিকট ঘৃণার্থ বলিয়া মনে হইত। পাশ্চাত্যে যাহা ‘শিভালরি’ (অর্থাৎ নারীর প্রতি অতি মাত্রায় সৌজন্য প্রকাশ) বলিয়া অভিহিত, তাহার নিকট উহা নারীজাতির প্রতি অপমানসূচক বলিয়া বোধ হইত। মেয়েদের সাধারণ জ্ঞান যথেষ্ট, এবং পুরুষদের জ্ঞানে যেন সহানুভূতির আধিক্য না থাকে—কোন কোন লেখকের এই মত স্বামীজীর নিকট অতি নীচ এবং উপেক্ষার বিষয় বলিয়া গণ্য হইত। মানবের অন্তরাত্মা চায় স্বাধীনতা; আমাদের দৈহিক গঠন তাহার উপরে জোর করিয়া যে-সব বন্ধন আনিয়া দিয়াছে, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই উহা অতিক্রম করিতে সচেষ্ট হওয়া উচিত।

নির্জনবাস, সংযম এবং চিত্তের গভীর একাগ্রতা—এই সকলের সংযোগে গঠিত ছাত্রজীবনের আদর্শই ভারতবর্ষে ‘ব্রহ্মচর্য নামে অভিহিত। স্বামীজী বলিতেন, “ব্রহ্মচর্য শিরায় শিরায় জ্বলন্ত আগুনের মতো প্রবাহিত থাকা চাই।” ছাত্রজীবনের আনুষঙ্গিক পাঠ্যবিষয়ে মনঃসংযোগ তাহার নিকট অনন্তের মধ্যে সান্তকে বিলীন করিয়া দিবার অন্যতম পন্থামাত্র; এবং এই অনন্তের মধ্যে সান্তের বিলোপসাধন তাহার নিকট সকল মহৎ জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ বলিয়া বোধ হইত, যাহার জন্য যে রোবল্পীয়র গোড়ামি দ্বারা বিভীষিকার রাজত্ব সৃষ্টি করিয়াছিলেন, তাঁহাকে পর্যন্ত তিনি প্রশংসা করিতে প্রলুব্ধ হইয়াছিলেন। তিনি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করিতেন, যে-কোন কার্য—যাহাতে হৃদয়, মন ও শরীরের সর্বোত্তম বিকাশসাধনের প্রয়োজন, তাহার প্রস্তুতির জন্য সরস্বতীপূজা একান্ত আবশ্যক; অবশ্য সরস্বতীপূজা বলিতে তিনি বুঝিতেন ভাবরাজ্যে গভীর তন্ময়তা এবং পূর্ণ সংযম।

কুস্তিগিরদের উপযুক্ত শিক্ষার অন্যতম অঙ্গ হিসাবে এরূপ পূজা ভারতবর্ষে যুগযুগান্তর হইতে সমাদর লাভ করিয়া আসিয়াছে; ইহার তাৎপর্য এই যে, যদি কেহ মধ্যে মধ্যে সেই অতিচেতনার অন্তর্দৃষ্টির উচ্চতম শিখরে আরোহণ করিতে চান, যাহা অপরের নিকট দিব্যজ্ঞান, ঐশীপ্রেরণা অথবা অনন্যসাধারণ দক্ষতা বলিয়া প্রতীত হয়, তাহা হইলে তাহাকে সমগ্র শক্তি নিয়োজিত করিতে হইবে। ধর্মের ন্যায় সুকুমার শিল্প ও বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ কীর্তির জন্যও ঐরূপ দিব্যজ্ঞান বিশেষ প্রয়োজন। যে ব্যক্তি ঐরূপ দিব্যজ্ঞানলাভের পরিবর্তে স্বার্থপর অথবা হীন উপায়ে নিজের শক্তিক্ষয় করিতেছে, সে কদাপি রাফেলের ন্যায় অপূর্ব মাতৃমূর্তি অঙ্কনে অথবা মাধ্যাকর্ষণ-নিয়ম আবিষ্কারে সমর্থ হয় না। আধ্যাত্মিক আদর্শের ন্যায় নাগরিক বা রাষ্ট্রীয় আদর্শসিদ্ধির জন্যও একান্ত প্রয়োজন সন্ন্যাসিসুলভ নিষ্ঠাভক্তি। কৌমারব্রত গ্রহণের অর্থই দশের কল্যাণের জন্য ব্যক্তিসুখ বিসর্জন দেওযা। এইরূপে স্বামীজী উপলব্ধি করেন যে, সংযম ব্যতীত প্রকৃত মনুষ্যত্বের বিকাশ হইতে পারে না; হৃদয়ঙ্গম করেন, যে পথ দিয়া হউক, প্রকৃত মহত্ত্ব অর্জনের জন্য প্রয়োজন দেহের প্রবৃত্তির উপর আত্মার জয়লাভ এবং পরিশেষে ইহাও তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, একজন শ্রেষ্ঠ সাধুর মধ্যে মহৎ কর্মী অথবা রাজ্যের শ্রেষ্ঠ নাগরিক হইবার সামর্থ্যও প্রচ্ছন্নভাবে নিহিত থাকে। ইহার বিপরীত পক্ষ—অর্থাৎ যেখানে ব্রহ্মচারিণী বা সন্ন্যাসিনীগণের উদ্ভব হওয়া সম্ভব সেখানেই কেবল যথার্থ উন্নতচরিত্রা পত্নী অথবা শ্রেষ্ঠ নাগরিক জন্মিতে পারে, এ বিষয়ে তাঁহার ঐরূপ স্পষ্ট ধারণা ছিল কিনা বলিতে পারি না। আমার মনে হয়, সম্ভবতঃ তিনি নিজে সন্ন্যাসী এবং সন্ন্যাসপ্রার্থীদের গুরু ছিলেন বলিয়া, কিঞ্চিৎ আভাস ব্যতীত এই মহাসত্যটি তাহার নিকট প্রচ্ছন্ন রহিয়া গিয়াছিল; অবশেষে মহাপ্রয়াণের পূর্বে তিনি ঐ বিষয়ে চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারেন। একবার তিনি বলেন, “একথা সত্য যে, এমন সব নারী আছেন, যাদের উপস্থিতিই মানুষকে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়; আবার এমন নারীও আছে, যারা তাকে নরকের দিকে ঠেলে দেয়।”

তাঁহার নিকট অবস্থানকালে, যে-ভালবাসা প্রেমাস্পদের দ্বারা কোন উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিয়া লইতে চায়, তাহাকে সর্বতোভাবে আপনার বশীভূত করিয়া রাখিতে চায়, অথবা নিজের সুখ বা কল্যাণসাধনের উপায় করিয়া তোলে, সে-ভালবাসাকে শ্রদ্ধার চক্ষে দেখা কাহারও পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাহার পরিবর্তে প্রেমপদবাচ্য হইবার জন্য প্রেমকে চিরন্তন কল্যাণের প্রস্রবণস্বরূপ হইতে হইবে। প্রেম নিজেকে বিনামূল্যে বিলাইয়া দেয়; প্রেম অহেতুক, এবং প্রতিদানের আকাঙক্ষারহিত। তিনি যে সর্বদা ‘অনাসক্তভাবে ভালবাসার কথা বলিতেন ইহাই তাহার অর্থ। বস্তুতঃ একবার কোন ভ্রমণান্তে প্রত্যাবর্তন করিয়া তিনি আমাদের বলেন, এইবার তিনি বুঝিতে পারিয়াছেন যে, কোন বিষয় হইতে মন উঠাইয়া লইবার শক্তির ন্যায় কোন বিষয়ে মন লাগাইবার শক্তিও অনুরূপভাবে প্রয়োজনীয়। উভয়ই তৎক্ষণাৎ পূর্ণমাত্রায় এবং সর্বান্তঃকরণে নিষ্পন্ন হওয়া চাই; এবং এই উভয়ের একটি আর একটির পরিপূরক। ইংলণ্ডে তিনি বলেন, “প্রেম সব সময়ে আনন্দেরই বিকাশমাত্র; তার উপর লেশমাত্র দুঃখের ছায়া পড়ার অর্থ দেহসুখ কামনা ও স্বার্থপরতা।”

যে অল্পপ্রাণ সাহিত্য ও আদর্শবিচ্যুত ললিতকলা মানবকে মুখ্যতঃ শরীর বলিয়া মনে করিয়া নিজ অধিকারে রাখিতে চায়, এবং সংযম ও স্বাধীনতার নিত্য লীলাভূমি মন ও আত্মাকে গৌণস্থান প্রদান করে তাহাদের স্বামীজী ভুলিয়াও প্রশংসা করিতেন না। সবটা না হইলেও আমাদের পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের আদর্শবাদের (Idealism) অনেকটাই তাহার নিকট এই ভাব দ্বারা গভীরভাবে কলুষিত বলিয়া বোধ হইত, এবং উহার সম্পর্কে তিনি সর্বদা “ফুল দিয়ে মৃতদেহ ঢেকে রাখা” বলিয়া উল্লেখ করিতেন। প্রাচ্য ভাবানুযায়ী তিনি মনে করিতেন, আদর্শ পত্নীত্ব বলিতে বোঝায় এক স্বামীর প্রতি অবিচল জ্বলন্ত নিষ্ঠা। পাশ্চাত্যের প্রথাগুলিকে তিনি সম্ভবতঃ বহুপতিক পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করিয়া থাকিবেন, নতুবা বহুপতিক জাতির ভিতরও তাহার স্বদেশের ন্যায় মহানুভবা এবং পবিত্রস্বভাবা বহু নারী দেখিয়াছেন, তাহার এই উক্তির কোন কারণ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তিনি মালাবারে ভ্রমণ করিয়াছেন, কিন্তু তিব্বতে নহে; এবং অনুসন্ধান দ্বারা জানিতে পারা যায় যে, মালাবারে তথাকথিত বহুপতিক প্রথা প্রকৃতপক্ষে মাতৃশাসিত সমাজের বিবাহমাত্র। স্বামী পত্নীর পিত্রালয়ে গিয়া তাহার সহিত দেখা সাক্ষাৎ করেন, এবং ভারতের অন্যান্য স্থানের ন্যায় বিবাহ আজীবন স্থায়ী হইবেই, তাহার কোন নিশ্চয়তা নাই; কিন্তু দুইজন পুরুষ এককালে স্বামী-রূপে গৃহীত হয় না। যাহা হউক, তিনি বলেন যে, তাহার এই শিক্ষা হইয়াছে যে, দেশাচার কিছুই নহে’—আচার ব্যবহার কখনও মানবের বিকাশসাধনে সম্পূর্ণরূপে বাধা দিতে বা সঙ্কুচিত করিতে পারে না। তিনি জানিতেন, যে-কোন দেশে, যে-কোন জাতির মধ্যে আদর্শটি বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির মধ্য দিয়াই পূর্ণভাবে প্রকাশ পাইতে পারে।

কোন সামাজিক আদর্শকে তিনি কখনও আক্রমণ করিতেন না। ১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দে ইংলণ্ড প্রত্যাগমনকালে, সেখানে নামিবার দুই-একদিন পূর্বে তিনি আমাকে বলেন, পাশ্চাত্যদেশে অবস্থানকালে আমি যেন এমনভাবে ইউরোপের সামাজিক আদর্শগুলি পুনরায় গ্রহণ করি—যেন উহাদের কখনই পরিত্যাগ করি নাই। ইউরোপ বা আমেরিকায়, বিবাহিত নারীগণ তাহার নিকট অবিবাহিতা নারী অপেক্ষা কম সম্মান লাভ করিতেন না। ঐ সমুদ্রযাত্রাকালে জাহাজে কয়জন পাদরী কয়েকগাছা বিবাহকালীন রূপার বালা সকলকে দেখাইতেছিল; ঐগুলি দুর্ভিক্ষের দারুণ সঙ্কটকালে তামিল রমণীগণের নিকট তাহারা ক্রয় করে। কথাপ্রসঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সকল দেশের স্ত্রীলোকেই কুসংস্কারবশতঃ অঙ্গুলি বা মণিবন্ধ হইতে বিবাহ-অঙ্গুরীয় বা বলয় খুলিয়া দিতে আপত্তি করিয়া থাকে, এই কথা উঠিল। শুনিয়াই স্বামীজী সবিস্ময়ে বেদনাপূর্ণ অনুচ্চকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, “তোমরা একে কুসংস্কার বলছ? এর পেছনে যে উঁচুদরের সতীত্বের আদর্শ রয়েছে, তা তোমরা দেখতে পাচ্ছ না?” (১)

কিন্তু বিবাহ দ্বারা আদর্শ আধ্যাত্মিক স্বাধীনতালাভের যতটা সহায়তা হয় তাহা দেখিয়াই তিনি উক্ত প্রথার গুণাগুণ বিচার করিতেন। এখানে স্বাধীনতা’ শব্দটি প্রাচ্যদেশীয় অর্থে বুঝিতে হইবে, অর্থাৎ স্বাধীনতা বলিতে কোন কিছু করিবার অধিকার বুঝায় না, পরন্তু কোন কিছু করিবার ইচ্ছাকে দমন করিয়া নিশ্চেষ্ট থাকিবার অধিকার বুঝায়—উহার লক্ষ্য হইল নৈষ্কর্ম সকল কর্মের পারের অবস্থা। একদিন তর্কস্থলে তিনি স্বীকার করেন, “বিবাহের পারে যাবার জন্যই বিবাহ করা, এর বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলবার নাই।” তাঁহার গুরুদেবের, তাঁহার গুরুভ্রাতা যোগানন্দের এবং তাহার শিষ্য স্বরূপানন্দের যে প্রকার বিবাহ হয়, তাহার বিবেচনায় উহাই আদর্শ বিবাহ। এইরূপ বিবাহ অন্যদেশে নামমাত্র বিবাহ বলিয়া পরিগণিত হইত। ঐ বিষয় আলোচনাপ্রসঙ্গে তিনি একবার বলেন, “দেখছ, এ বিষয়ে ভারত ও পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। পাশ্চাত্যের বিবাহ বলতে বোঝায়, আইনবন্ধনের বাইরে যাকিছু, কিন্তু ভারতবর্ষে বিবাহ বলতে বোঝায় যে, সমাজ দুটি প্রাণীকে অনন্তকালের জন্য একটা বন্ধনে আবদ্ধ করে দিল। এই দুটি প্রাণীকে তাদের ইচ্ছা থাকুক, বা না থাকুক, জন্মে জন্মে পরস্পরকে বিবাহ করতেই হবে। এই উভয়ের প্রত্যেকেই অপরের কৃত ভালমন্দের অর্ধেকের ভাগী হয়। আর যদি একজন এ জীবনে অত্যন্ত পিছিয়ে পড়ে বলে বোধ হয়, তাহলে অপরকে অপেক্ষা করতে হবে, যতদিন না সে আবার তার নাগাল পায়।”

শুনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ বিবাহকে মাত্র কয়েকজনের সেবা এবং সন্ন্যাসকে জগতের সেবা বলিয়া উল্লেখ করিতেন। এরূপস্থলে মনে হয়, তিনি সর্বোচ্চস্তরের বিবাহের কথাই বলিতেন। স্বামীজীর নিজের মনেও যে ইহাই ব্রহ্মচর্যের মূল ধারণা ছিল, একথা স্পষ্ট বুঝা যায়। যেন সর্বশ্রেষ্ঠ যশলাভের জন্য যুদ্ধার্থে আহ্বান করিতেছেন, এইভাবে তিনি লোকদের ঐ ব্ৰতগ্রহণে আহ্বান করিতেন। সন্ন্যাসিসঘকে তিনি যেন আচার্যের পশ্চাতে অবস্থিত একদল সৈন্য’ বলিয়া জ্ঞান করিতেন, এবং তাহার মতে যে আচার্যের শিষ্যগণ সকলেই নাগরিক ও গৃহস্থ, তাহার কোন সৈন্যই নাই। যাহার এই সহায় বর্তমান এবং যাহার এই সহায়ের অভাব এই উভয়পক্ষের শক্তি সম্বন্ধে কোন তুলনাই করা চলে না, ইহাই ছিল তাহার ধারণা।

তথাপি কাহারও পক্ষে বিবাহ যে একটি পথ, ইহা তিনি একেবারে বুঝিতেন না, তাহা নহে। এক বৃদ্ধদম্পতির যে গল্প তিনি বলিয়াছেন, তাহা আমি কখনও ভুলিব না। পঞ্চাশ বৎসর একত্র বাসের পর তাহারা দরিদ্র-নিবাসের (Work house) দরজায় পরস্পরের নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন হয়। প্রথম দিনের অবসানে বৃদ্ধ বলিয়া উঠিল, “কি! মেরী, ঘুমোত যাবার আগে আমি তাকে একবার দেখতে পাব না, চুমু খেতে পাব না? আমি যে পঞ্চাশ বছর ধরে প্রতি রাত্রে ঐরকম করে এসেছি।” ঐ মহৎ কার্যের কথা ভাবিয়া আগ্রহের সহিত স্বামীজী বলিলেন, “একবার ভেবে দেখ! এরূপ সংযম ও নিষ্ঠার নামই মুক্তি! ঐ দু-জনের পক্ষে বিবাহই ছিল প্রশস্ত পথ।”

তিনি অবিচলিত দৃঢ়তার সহিত বলিতেন, ইচ্ছা না থাকিলে বিবাহ না করার স্বাধীনতা প্রত্যেক নারীর স্বাভাবিক অধিকার বলিয়া গণ্য হওয়া উচিত। এক বালিকার দ্বাদশবর্ষ বয়সের পূর্বেই ধর্মজীবনের প্রতি প্রবল অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়। বাড়ির লোকদের বিবাহ-প্রস্তাবের হাত হইতে রক্ষা পাইবার জন্য বালিকাটি তাহার সাহায্য প্রার্থনা করে। তিনিও বালিকার পিতার উপর নিজের প্রভাব থাকায় এবং ঐরূপ করিলে কনিষ্ঠ কন্যাদের জন্য অধিক যৌতুকের ব্যবস্থা করিতে পারিবেন একথা বুঝাইয়া বালিকাকে সাহায্য করিতে সমর্থ হন। বহু বত্সর অতীত হইয়াছে, কিন্তু বালিকা যে জীবন গ্রহণ করিয়াছিল তাহার প্রতি এখনও তেমন নিষ্ঠা রহিয়াছে—প্রত্যহ দীর্ঘকাল ধরিয়া নির্জনে ধ্যান-চিন্তা তাহার ঐ জীবনের অঙ্গস্বরূপ। তাহার কনিষ্ঠা ভগিনীগণ সকলেই বর্তমানে বিবাহিতা। এইরূপ উচ্চভাবসম্পন্ন কোন বালিকার জোর করিয়া বিবাহ দেওয়া তাহার দৃষ্টিতে অত্যন্ত গর্হিত আচরণ বলিয়া বোধ হইত। বালবিধবা, কুলীন ব্রাহ্মণ-পত্নী, যাহাদের বিবাহকালে পিতামাতা কোনরূপ যৌতুক প্রদানে সমর্থ হন নাই, এমন দুই-চারিজনকে স্বামীজী গর্বের সহিত হিন্দুসমাজের অবিবাহিতা নারী অথবা কুমারীস্থানীয় বলিয়া গণনা করিতেন।

তিনি এই অভিমত পোষণ করিতেন যে, বিধবাদের সতীত্বরূপ স্তম্ভের উপরেই সামাজিক অনুষ্ঠানগুলি দণ্ডায়মান। কেবল তিনি ঘোষণা করিতে চাহিতেন যে, এই বিষয়ে নারীর ন্যায় পুরুষের জন্যও সমান উচ্চাদর্শ থাকা উচিত। বিবাহ সম্পর্কে প্রাচীন আর্যপ্রথায় দেখা যায় যে, বিবাহকালে প্রজ্বলিত অগ্নি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে একত্র প্রত্যহ সকালে ও সন্ধ্যায় পূজা করিতেন। এই অনুষ্ঠান দ্বারা বুঝা যায় যে, স্বামী, স্ত্রী উভয়েরই আদর্শ ও দায়িত্ব সমান। মহর্ষি বাল্মীকির মহাকাব্যে সীতার যেমন রামের প্রতি অবিচলিত নিষ্ঠার বর্ণনা আছে, রামেরও সীতার প্রতি তদ্রুপ।

পৃথিবীর সর্বত্র বিবাহ-সংক্রান্ত সামাজিক সমস্যাগুলি স্বামীজীর অজ্ঞাত ছিল না। পাশ্চাত্যে এক বক্তৃতায় তিনি বিস্ময়ের সহিত বলেন, “এই সব মহিলা দুর্দমনীয়, যাদের মন থেকে সহ্য কর, ক্ষমা কর’ প্রভৃতি শব্দ চিরদিনের মতো চলে গেছে।” তিনি ইহাও স্বীকার করিতেন, যেখানে বিবাহসম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখার অর্থ মানবজাতির ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, সেক্ষেত্রে পরস্পরের সহিত সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করা স্বামী, স্ত্রী উভয়ের পক্ষেই সর্বাপেক্ষা মহত্ত্ব ও সাহসের কার্য। তিনি সর্বদাই বলিতেন যে, ভারতবর্ষে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আদর্শসমূহের মধ্যে আদান-প্রদান দ্বারা উভয়কেই সতেজ করিয়া লওয়া আবশ্যক। অগ্র-পশ্চাৎ চিন্তা না করিয়া তিনি কোন সামাজিক অনুষ্ঠানের উপর দোষারোপ করিতেন না, এবং সর্বদা বলিতেন, ঐসকল অনুষ্ঠান এমন কোন অনাচার দূর করিবার প্রচেষ্টা হইতেই ক্রমশঃ উদ্ভূত হইয়াছে, যাহা সমালোচক মহাশয় খুব সম্ভবতঃ নিজের একগুয়েমিবশতঃ বুঝিতে অক্ষম। কিন্তু ঘড়ির দোলক কোন একদিকে অধিক ঝুঁকিয়া পড়িলে, তিনি তৎক্ষণাৎ তাহা ধরিতে পারিতেন।

ভারতবর্ষে একদিন, পাত্রপাত্রীর নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিবাহের পরিবর্তে অভিভাবকগণের ব্যবস্থানুযায়ী হইয়া থাকে—এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওঃ! এদেশে কি কষ্ট, কি যন্ত্রণাই রয়েছে। তার কতকটা অবশ্য সব সময়ে ছিল। কিন্তু এখন ইউরোপীয় ও তাদের বিভিন্ন রীতিনীতি দেখে যন্ত্রণা আরো বেড়ে গেছে। সমাজ জানতে পেরেছে যে, অন্য পথও একটা আছে।”

জনৈক ইউরোপবাসীকে তিনি আবার বলেন, “আমরা মাতৃভাবকে বাড়িয়ে তুলেছি, তোমরা জায়া ভাবকে; এবং আমার মনে হয়, একটু আদানপ্রদান উভয় পক্ষেই লাভকর।”

তারপর সেই স্বপ্নের কথা, যাহা তিনি জাহাজে আমাদের নিকট এইরূপে বর্ণনা করেন—’স্বপ্নে আমি দুজনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম; তারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিবাহের আদর্শ সম্পর্কে আলোচনা করছে, এবং শেষে এই সিদ্ধান্ত হয় যে, উভয়ের মধ্যেই এমন কিছু অংশ আছে, যা এখনও জগতের পক্ষে হিতকর, অতএব বর্জন করা উচিত নয়। এই দৃঢ় বিশ্বাসহেতু প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আদর্শগুলির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিবার জন্য তিনি অত সময় অতিবাহিত করিতেন।

তিনি বলেন, “ভারতবর্ষে পত্নী স্বামীকে যেরূপ ভালবাসে, পুত্রকে পর্যন্ত স্বপ্নেও সেরূপ ভালবাসতে পারে না। তাকে সতী হতে হবে। কিন্তু স্বামী মাতাকে যত ভালবাসে, স্ত্রীকে তত ভালবাসতে পারবে না। সুতরাং ভারতবর্ষে পরম্পর আদান-প্রদানরূপ ভালবাসা প্রতিদানশূন্য ভালবাসার মতো উচ্চস্তরের বলে গণ্য হয় না। ওটা যেন দোকানদারি’। স্বামী-স্ত্রীর সব সময় পরস্পরের সান্নিধ্যলাভের আনন্দ ভারতবর্ষে উচিত বলে গ্রাহ্য হয় না। পাশ্চাত্যের কাছে এটা আমাদের নিতে হবে। আমাদের আদর্শকে তোমাদের আদর্শ দ্বারা একটু তাজা করে নিতে হবে। আর তোমাদের আমাদের মাতৃভক্তির খানিকটা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তাহার উপস্থিতিমাত্রেই লোকের মনে অপর সকল চিন্তা অভিভূত করিয়া এই ধারণা বলবতী হইত যে-যাহার উদ্দেশ্য কেবল আত্মার মুক্তি ও জগতের সেবা, গৃহসুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যপ্রয়াসী গার্হস্থ্যজীবন অপেক্ষা সেই সন্ন্যাসজীবন অনন্তগুণে শ্রেষ্ঠ। তিনি বিলক্ষণ জানিতেন যে, মহান শ্রেষ্ঠ কর্মিগণ মধ্যে মধ্যে পোষ্যবর্গের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকিবার প্রয়োজন অনুভব করেন। একবার জনৈক শিষ্যকে লক্ষ্য করিয়া তিনি অতি সস্নেহে ও সহৃদয়তার সহিত বলেন, “যদি এই সব গার্হস্থ্য ও দাম্পত্য জীবনের আকাঙক্ষা কখনো তোমার মনে ছায়া ফেলে, তার জন্য বিচলিত হয়ো না। আমার মনেও কখনো কখনো ঐ ধরনের চিন্তা আসে।” আর একবার জনৈক বন্ধুর মুখে, তিনি অত্যন্ত একাকী বোধ করিতেছেন শুনিয়া বলিয়া ওঠেন, “প্রত্যেক কর্মী সময়ে সময়ে ঐরূপ বোধ করে থাকে।”

কিন্তু তাহার মতে কোন সামাজিক আদর্শকে অনর্থক বাড়াইয়া তোলার মধ্যে সমাজের গণ্ডির বাহিরে অবস্থিত যে মহান আদর্শ, তাহার চিরন্তন মাহাত্ম্যকে লাঘব করারূপ অশেষ বিপদের সম্ভাবনা আছে। জনৈক শিষ্যকে একবার তিনি গম্ভীরকণ্ঠে বলেন, “তুমি যাদের শিক্ষা দেবে, তাদের প্রত্যেককে একথা বলতে কখনো ভুলো না–

‘মেরুসষপয়োর্য যৎ সূর্যখদ্যোতয়োরিব।
সরিৎসাগরয়োযৎ তথা ভিক্ষুগৃহস্থয়োঃ ॥

—মেরু ও সর্ষপে, সূর্য ও খদ্যোতে, সমুদ্র ও গোষ্পদে যে প্রভেদ, সন্ন্যাসী এবং গৃহীর মধ্যেও সেইরূপ প্রভেদ।”

তিনি জানিতেন যে, ইহার মধ্যে আধ্যাত্মিক গর্বরূপ বিপদের আশঙ্কা রহিয়াছে। তাহার নিজের পক্ষে এই বিপদ অতিক্রম করার উপায় ছিল এই যে, তিনি স্বয়ং তাহার গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্য ও ভক্তমাত্রের নিকটেই তিনি গৃহী বা সন্ন্যাসী হউন—মস্তক নত করিতেন। কিন্তু উক্ত অনুশাসনবাক্যের মর্যাদা হ্রাস করার অর্থ তাহার দৃষ্টিতে আদর্শ খর্ব করা; উহা তিনি কোনমতেই করিতে পারিতেন না। বরং তিনি অনুভব করিতেন, বর্তমান যুগে সন্ন্যাসিসঙ্ঘের উপর ন্যস্ত অন্যতম মহান গুরুতর দায়িত্ব হইল, বিবাহিত জীবনেও সন্ন্যাসের আদর্শ প্রচার করা; উদ্দেশ্য, যাহাতে কঠিনতর পথটি অপেক্ষাকৃত সহজ পথের উপর সর্বদা স্বীয় সংযমশক্তির প্রভাব প্রয়োগ করিতে পারে; এবং প্রণয়ের আপাতমধুর যে মোহজাল যাহা হৃদয়-মনের একান্ত প্রীতিকর জীবনসঙ্গী অথবা সঙ্গিনীলাভের দোহাই দিয়া মানবজীবনের চরম লক্ষ্য আত্মার অদ্বিতীয় মহিমা ও স্বাধীনতা ঢাকিয়া ফেলিতে চায়—তাহা একেবারে ছিন্ন ও বিনষ্ট হইয়া যায়।

শ্রীরামকৃষ্ণের সকল শিষ্যই বিশ্বাস করেন যে, বিবাহের চরম পরিণতি নিজ পত্নীতে মাতৃবুদ্ধি; ইহার অর্থ স্বামী-স্ত্রী উভয় কর্তৃক ব্রহ্মচর্য জীবন গ্রহণ।সেই মুহূর্ত হইতে মানব দেবত্বে লীন হয়, যার ফলে সমগ্র জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটে। পণ্ডিতেরা বলেন, মনস্তত্ত্বের দিক দিয়া দেখিলে এই আদর্শের যথার্থতা এইরূপে প্রমাণিত হয় যে, ঐ চরম অবস্থায় উপনীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিবাহসম্বন্ধের মধ্যে ভালবাসার বৃদ্ধি এবং হ্রস—ক্রমাগত প্রবৃত্তির জোয়ার-ভাটা চলিতে থাকে। বাহ্যসম্বন্ধ পরিত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু প্রকৃতির হাত হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়, এবং তখন আর প্রেমের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে না। এখন হইতে পূর্ণ নিষ্ঠার সহিত মন প্রেমাস্পদকে পূজা করিয়া থাকে।

তথাপি এই বিষয়ে তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করিতে গিয়া হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের মধ্যে পার্থক্য সম্বন্ধে কাশ্মীরে একদিন তিনি যাহা বলিয়াছিলেন, তাহা মনে না করিয়া পারিতেছি না। সেদিন রবিবার, প্রাতঃকাল; উভয় পার্শ্বে সারি সারি পপলার বৃক্ষের মধ্য দিয়া চওড়া রাস্তা চলিয়া গিয়াছে; বেড়াইতে বেড়াইতে তিনি নারীজাতি ও জাতিভেদ সম্পর্কে কথা বলিতে লাগিলেন, আমরাও মন দিয়া শুনিতেছি। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলিলেন, “হিন্দুধর্মের মহিমা এই যে, এর মধ্যে বিভিন্ন আদর্শের নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু হিন্দুধর্ম কখনই একথা বলতে সাহস করেনি যে,ঐসব আদর্শের কোন একটিই একমাত্র সত্য পথ। এখানেই বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে তার প্রভেদ। বৌদ্ধধর্ম অন্য সকল আদর্শের ওপর স্থান দিয়েছে সন্ন্যাসকে, এবং তার মতে সন্ন্যাস হলো সকল মুমুক্ষুর সিদ্ধিলাভের একমাত্র পথ। মহাভারতে এক যুবক সাধুর গল্প আছে; জ্ঞানলাভের জন্য তিনি প্রথমে এক বিবাহিতা নারী এবং পরে এক মাংসবিক্রেতার কাছে যেতে উপদেশ পান। এই গল্পটিই পূর্বের কথার সত্যতার যথেষ্ট প্রমাণ। জিজ্ঞাসার উত্তরে পতিব্রতা এবং ব্যাধ দুজনেই বলেছিলেন, বর্ণাশ্রমধর্ম পালন করেই আমরা এই জ্ঞানলাভ করেছি।” উপসংহারে স্বামীজী বলেন, “দেখছ, এমন কোন জীবিকা নেই, যার দ্বারা ভগবানের কাছে যাওয়া না যায়, তাকে লাভ করা শেষ পর্যন্ত কেবল প্রাণের ব্যাকুলতার উপর নির্ভর করে।”

জীবনে আদর্শ পবিত্রতার প্রকাশ অনুযায়ী সকল জীবনের মহত্ত্ব নির্ধারণ করিতে হয়, এই বিষয়টি মতবাদ হিসাবে স্বামীজী সত্য বলিয়াই গ্রহণ করিতেন। কিন্তু উহার কদৰ্থ করিয়া যে মিথ্যা দাবি করা হইয়া থাকে যে, বিবাহ শুধু ধর্মলাভের উদ্দেশ্যেই অনুষ্ঠিত হইয়াছে, সাধু হিসাবে স্বামীজী এই সকল উক্তি বিষবৎ জ্ঞান করিতেন। তিনি বেশ জানিতেন, আত্মগরিমাবশতঃ আমরা সর্বদাই নিজ নিজ কার্য ও উদ্দেশ্য ঐরূপ অজ্ঞাতসারে বাড়াইয়া তুলি। তিনি আমাদের বলিয়াছিলেন যে, পাশ্চাত্যদেশে প্রায়ই এমন ব্যক্তির সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইত, যাহারা বিলাসের মধ্যে অলসভাবে জীবনযাপন করিলেও বুঝাইতে চেষ্টা করিত যে, তাহাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র স্বার্থপরতা নাই, কেবল কর্তব্যের খাতিরেই তাহারা সংসারে রহিয়াছে; এবং নানাপ্রকার ভালবাসার মধ্য দিয়া বিনা প্রচেষ্টায় আপনা হইতে ত্যাগ অভ্যাসে সমর্থ হইয়াছে। অত্যন্ত ঘৃণার সহিত তিনি এই সকল অলীক কল্পনার প্রতিবাদ করিতেন। তিনি বলেন, “আমার কেবল এই উত্তর ছিল যে, এই ধরনের মহাপুরুষ তত ভারতবর্ষে জন্মান না! মহাত্মা জনক রাজাই ছিলেন এরকম আদর্শ পুরুষ, এবং সমগ্র ইতিহাসে জনক রাজা মাত্র একবারই জন্মেছেন!” এই বিশেষ ভ্রম সম্পর্কে তিনি দেখাইয়া দিতেন যে, দুই প্রকার আদর্শবাদ (Idealism) আছে, একটি–যথার্থ আদর্শকেই পূজা ও উচ্চাসন প্রদান করা; অপরটি—আমরা নিজে যে অবস্থা লাভ করিয়াছি, তাহাকেই বাড়াইয়া স্বর্গে তোলা। শেষোক্ত ক্ষেত্রে আদর্শকে প্রকৃতপক্ষে আমাদের ‘অহং’-জ্ঞানেরই নিম্নে আসন দেওয়া হয়।

কিন্তু তাহার এই কঠোর সমালোচনা কোন শুষ্ক দোষদর্শীর মত ছিল না। যাহারা আমাদের গুরুদেবের ‘ভক্তিযোগ পাঠ করিয়াছেন, তাহাদের এই বিশেষ উক্তিটি মনে পড়িবে, “প্রেমিক প্রেমাস্পদের মধ্যে আদর্শকেই দেখে।” এক বালিকার একজনের প্রতি অনুরাগের কথা তখন সবেমাত্র জানা গিয়াছে। স্বামীজী তাহাকে বলেন, “যতদিন তোমরা দুজনে পরস্পরের মধ্যে আদর্শকেই দেখতে পাবে, ততদিন তোমাদের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সুখ না কমে বেড়েই যাবে।”

আমাদের গুরুদেবের বিশেষ পরিচিত ব্যক্তিগণের মধ্যে এক প্রৌঢ়া মহিলার কিন্তু এই বিশ্বাস ছিল যে, সন্ন্যাসধর্মের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠাবশতঃ বিবাহিতজীবনের পবিত্রতা ও উপকারিতা স্বামীজী যথার্থ বিচার করিতে পারেন নাই। উক্ত মহিলা বিবাহিত জীবনে অসাধারণ সুখভোগের পর দীর্ঘকাল বৈধব্যজীবন যাপন করিতেছিলেন। সুতরাং ইহা নিতান্ত স্বাভাবিক যে, দেহাবসানের কয়েক সপ্তাহ পূর্বে স্বামীজী এই বিষয়ে যে চূড়ান্ত মীমাংসায় উপনীত হন, তাহা এই মহিলাকে জ্ঞাপন করিতে চাহিবেন। যে পত্রবাহক তাহার পত্রখানি মহিলার বহুদূরে অবস্থিত গৃহে পৌঁছাইয়া দিল, সে-ই স্বামীজীর দেহত্যাগের সংবাদসহ প্রেরিত তারও ঐসঙ্গে তাঁহার হাতে দেয়। কে জানিত, পত্রখানি এরূপ দারুণ শোকের সময় যাইয়া উপস্থিত হইবে? ঐ পত্রে, স্বামীজী লেখেন, “আমার মতে কোন জাতিকে ব্রহ্মচর্যের আদর্শে উপনীত হইবার পূর্বে বিবাহবন্ধনকে পবিত্র ও অচ্ছেদ্য জ্ঞান করিয়া তাহার মাধ্যমে মাতৃভাবের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাভাবের অনুশীলন করিতে হইবে। রোমান ক্যাথলিক ও হিন্দুগণ বিবাহবন্ধনকে পবিত্র ও অচ্ছেদ্য জ্ঞান করিয়া প্রভূত শক্তিশালী মহাশুদ্ধসত্ত্ব পুরুষ ও নারী সৃষ্টি করিয়াছে। আরবদিগের নিকট বিবাহ একটা চুক্তিবদ্ধ অঙ্গীকার মাত্র, অথবা বলপূর্বক অধিকার, যাহা ইচ্ছামাত্র বিচ্ছিন্ন করা যায়। ফলে আমরা সেখানে চিরকুমারী অথবা ব্রহ্মচারীর আদর্শের বিকাশ দেখিতে পাই না। যে-সকল জাতি এখনও বিবাহবন্ধনের মাহাত্ম্য বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই, তাদের হাতে পড়িয়া আধুনিক বৌদ্ধধর্ম সন্ন্যাসকে অতি বিকৃত কদাচারপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছে। সুতরাং জাপানে যতদিন বিবাহ-সম্বন্ধে পরস্পরের মধ্যে আকর্ষণ ও প্রণয় ব্যতীত একটা মহান ও পবিত্র আদর্শের বিকাশ না ঘটে, ততদিন কিরূপে উচ্চস্তরের সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর সৃষ্টি হইবে, তাহা আমি বুঝিতে পারিতেছি না। আপনি যেমন ক্রমশঃ বুঝিতে পারিয়াছেন যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধটি পবিত্র ও অক্ষুণ্ণ রাখাই জীবনের গৌরব, সেইরূপ আমিও ক্রমশঃ এই জ্ঞান লাভ করিয়াছি যে, জগতের অধিকাংশ লোকের পক্ষেই এই মহাপবিত্র বন্ধনের বিশেষ প্রয়োজন; তাহা হইলেই কয়েকজন শক্তিশালী, আজীবন ব্রহ্মচর্যব্রতী পুরুষ ও নারীর উদ্ভব হইতে পারে।”

আমাদের মধ্যে কেহ কেহ মনে করেন, এই পত্রখানিতে স্বামীজী স্বয়ং যতটা অর্থপ্রকাশ করিয়াছেন বলিয়া মনে করিতে পারিতেন, তাহা অপেক্ষা ব্যাপকতর অর্থ নিহিত আছে। ইহাই সেই মহান দর্শনের শেষ কথা, “বহু এবং একের মধ্যে সেই একই সত্য বিরাজমান।” যদি দাম্পত্যবন্ধনকে পবিত্র ও অচ্ছেদ্য জ্ঞান করাই বস্তুতঃ সমাজকে এরূপভাবে গঠিত করার সোপানস্বরূপ হয়, যাহাতে নির্জনবাস ও সংযমপূর্ণ সন্ন্যাসজীবনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা দেখা যায়, তাহা হইলে যথোচিত শ্রদ্ধার সহিত সাংসারিক কর্তব্যগুলির অনুষ্ঠান, পূজা এবং প্রার্থনাদির ন্যায় আত্মসাক্ষাৎকারের অন্যতম উপায়স্বরূপ বলিয়াই গৃহীত হইবে। সুতরাং এখানে আমরা একটি সাধারণ নিয়মের পরিচয় পাই যাহাতে আমরা বুঝিতে পারি, কেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ভাবসমাধি প্রভৃতি ধর্মজীবনের উচ্ছাসকে প্রশংসা না করিয়া বরং তাঁহার শিষ্যগণের মধ্যে চরিত্রের দৃঢ়তা বিকাশের সমধিক পক্ষপাতী ছিলেন। আবার স্বামী বিবেকানন্দ নিজেও যে কেন সর্বদা সকলকে বীর্যবান হইবার জন্য উৎসাহিত করিতেন, তার অন্তর্নিহিত অর্থও আমরা বুঝিতে পারি। উহার কারণ নির্ণয় অতি সহজ। যদি “বহু ও এক, একই মন কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবস্থায় দৃষ্ট একমাত্র সত্তা” হয়, তাহা হইলে এক কথায় বলা যায়, চরিত্রই ধর্ম। জনৈক গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তি যেমন বলিয়াছেন, “প্রকৃতপক্ষে জগতের সাধারণ জিনিসগুলি গ্রহণ করিয়া ঠিক ঠিক ভাবে তাহাদের মধ্যে চলাফেবা করাই মহত্ত্ব, এবং গভীর প্রেম ও প্রভূত সেবাই সাধুতা।” এই সহজ কথাগুলিই হয়তো অবশেষে এযুগের নব ধর্মবাণীর প্রাণস্বরূপ হইয়া দাঁড়াইবে। ইহা যে সম্ভবপর, আমাদের গুরুদেবের নিজ কথাগুলিই তাহার নিদর্শন, “সর্বোচ্চ সত্য সকল সময়েই অতি সহজ।”


১ সতীত্ব বলিতে হিন্দুগণের ধারণা এই যে, স্বামীর প্রতি পত্নীর কেবল অবিচলিত নিষ্ঠা নহে, ঐ নিষ্ঠার কদাপি লেশমাত্র ইতরবিশেষ ঘটিবেনা। এই আদর্শ আমার ভাল লাগে না বলিয়া ঐ নিষ্ঠার কোনরূপ বিচ্যুতি ঘটিবার উপায় নাই।