ত্রয়োবিংশ পরিচ্ছেদ
তথাকথিত অলৌকিক দর্শনাদির সহিত আচার্যদেবের সম্বন্ধ

ভারতবর্ষই নিঃসন্দেহে মনস্তত্ত্ব-চর্চার প্রকৃষ্ট স্থান। একথা বলা চলে যে, জগতের অন্য যে কোন জাতি অপেক্ষা হিন্দুদিগের নিকটই মানুষ অধিক পরিমাণে মন-রূপে প্রতিভাত হয়। চিত্তের একাগ্রতা তাদের নিকট জীবনের আদর্শ বলিয়া পরিগণিত। ধীশক্তি ও প্রতিভা, সাধারণ সততা ও সর্বোচ্চ সাধুজীবন, নৈতিক দুর্বলতা ও শক্তিমত্তা—এই সকলের মধ্যে যে পার্থক্য বিদ্যমান তাহা একাগ্রতার সামান্য তারতম্য হইতেই উদ্ভূত বলিয়া তাহারা মনে করে। অতি প্রাচীনকাল হইতেই ভারতে মনস্তত্ত্ব-চর্চা একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞানের মতো যথোচিতভাবে অধীত হইয়া আসিয়াছে; বস্তুতঃ উহাই কতকাংশে হিন্দুজাতির এই তন্ময়তার কারণ, আবার কতকাংশে তাহার ফলও বটে। জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার জন্য লিখন-প্রণালীর উপকারিতা কিছুমাত্র অনুমান করিবার বহুপূর্বে, হিন্দুসমাজে সমষ্টি মানবমনের যাবতীয় ব্যাপার পরস্পরের মধ্যে চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের আদান-প্রদান দ্বারা নিঃশব্দে সংগৃহীত হইতে আরম্ভ হইয়াছিল। বৈজ্ঞানিক গবেষণার সহিত সাধারণভাবে যন্ত্রপাতি ও রসায়নাগারের আদৌ কোন সম্পর্ক থাকিতে পারে, এই চিন্তা উদিত হইবার বহু যুগ পূর্বে, ভারতবাসীর মধ্যে তাহাদের প্রকৃতির সর্বাপেক্ষা অনুকূল এই বিজ্ঞান সম্পর্কে পরীক্ষার যুগ পূর্ণভাবে বিকশিত হয়।

ভারতবর্ষে এইরূপে সঞ্চিত ও অদ্ভুতভাবে প্রসার লাভ করিয়াছে যে জ্ঞানরাজ্য, তাহার মধ্যে মনোরাজ্যের এমন অনেক ঘটনার যথোচিত সমাবেশ ও শ্রেণীবিন্যাস যে থাকিবে, তাহা অপেক্ষাকৃত অল্প-অভিজ্ঞ পাশ্চাত্যবাসীর নিকট অস্বাভাবিক বা অলৌকিক বলিয়া বোধ হয়—ইহা কিছু বিচিত্র নয়। সুতরাং সম্মোহনী বিদ্যা এবং দুর্বোধ্য বহুপ্রকারের অসাধারণ অনুভব বা শক্তি–যেমন রোগ আরোগ্য করা, মনের কথা বলিয়া দেওয়া, দূরদর্শন এবং দুরশ্রবণ ইত্যাদি যাহা সাধারণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পরিচিত—যাহারা ভারতের প্রাচীন মনস্তত্ত্ব বা রাজযোগের আলোচনা করিয়াছেন, তাহাদের নিকট একটা মস্ত কঠিন ব্যাপার বলিয়া বোধ হয় না।

আমরা সকলেই অবগত আছি যে, বিজ্ঞানসম্মত চিন্তার প্রধান মূল্য এই যে, উহা আমাদের নানা ঘটনা বুঝিতে ও লিপিবদ্ধ করিতে সাহায্য করে। কোন একটি ব্যাধি বিরল হইলে কিছু ক্ষতি নাই—যদি সমগ্র চিকিৎসাশাস্ত্রের মধ্যে কোথাও একবার মাত্র উহার উল্লেখ থাকে। তাহা হইলেই মানবমনে উত্মার স্থান রহিয়া গেল। উহা আর অলৌকিক ব্যাপার নহে, কারণ শীঘ্র অথবা বিলম্বে উহার শ্রেণীনির্দেশ হইবেই। উহার একটি নাম আছে; রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা এখন শুধু সময়সাপেক্ষ।

সচরাচর যাহাকে ‘অলৌকিক’ দর্শনাদি বলিয়া অভিহিত করা হয়, সেই সকল ঘটনার যে অংশ বিশ্বাসযোগ্য, তাহার সম্পর্কে পূর্বোক্ত কথা কিছুটা প্রয়োগ করা চলে। এই পর্যায়ভুক্ত ঘটনাবলী সত্য হইলে স্পষ্টতই উহা বায়ুর তরলীকরণ বা রেডিয়ম পৃথককরণ অপেক্ষা বেশি অলৌকিক থাকে না। বাস্তবিক, ‘অলৌকিক’ বা ‘অতিপ্রাকৃত’ কথাটি আদৌ সঙ্গত কিনা তাহা বিতর্কমূলক। কারণ, যদি কোন জিনিসের অস্তিত্ব একবার প্রমাণ করা যায়, তাহা হইলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, উহা প্রকৃতির অন্তর্গত, এবং সেজন্য উহাকে “অতিপ্রাকৃত’ বলা নিতান্ত অযৌক্তিক। ভারতবর্ষে আলোচ্য ঘটনাসমূহ মনোবৃত্তির সমধিক বিকাশের ফল বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে; এবং ঘটনার মধ্যে উহাদের ব্যাখ্যা আবিষ্কার করিবার চেষ্টা না করিয়া, যে ব্যক্তি ঐ-সকল উপলব্ধি করিয়াছে তাহার মনের অবস্থার অনুসন্ধান করা হইয়া থাকে; কারণ, ইহা সহজেই অনুমেয় যে, ঐ মন বিশেষ বিশেষ অবস্থায় সাধারণ অনুভব হইতে পৃথক এক এক রূপ অনুভূতি লাভ করিতে পারে।

চিত্তের চরম একাগ্রতার যে-সকল লক্ষণ শাস্ত্রে বর্ণিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের দক্ষিণেশ্বরে বাসকালে বহু বৎসর ধরিয়া তাহার শিষ্যগণ তাহার মধ্যে ঐ সকল মানসিক বিকাশের বহু ঘটনার পরিচয় পান। বাহ্যজগতের ঘটনাসমূহ তিনি এমন জানিতে পারিতেন যে, তাহারা দ্বারদেশে উপনীত হইবামাত্র তিনি স্বয়ং অগ্রসর হইয়া তাহাদের সহিত সাক্ষাৎকরিতেন, এবং বালকেরা যে-সব লিখিত প্রশ্ন পকেটে করিয়া আনিতেন, জিজ্ঞাসা করিবার পূর্বেই তিনি তৎক্ষণাৎ তাহাদের উত্তর দিতে প্রবৃত্ত হইতেন। তাহার অনুভূতি এত সূক্ষ্ম ছিল যে, তিনি স্পর্শমাত্র বলিয়া দিতে পারিতেন, কিরূপ চরিত্রের লোক তাহার খাদ্যসামগ্রী, কাপড়-জামা অথবা বিছানা স্পর্শ করিয়াছে। একবার ঐরূপ স্পর্শ করিবার সঙ্গে সঙ্গে তাহার অঙ্গ যন্ত্রণায় সঙ্কুচিত হইয়া সরিয়া আসে এবং তিনি বলিয়া ওঠেন যে, তিনি দাহ যন্ত্রণা অনুভব করিতেছেন। আর এক ঘটনায় হয়তো বলিলেন, “এই দেখ! এটা আমি খেতে পারি; যে পাঠিয়েছে, সে নিশ্চয়ই ভাল লোক।” আবার তাহার স্নায়ুমণ্ডলীতে কতকগুলি বিশেষ বিশেষ ভাবের এরূপ দৃঢ় সংস্কার জন্মিয়াছিল যে, নিদ্রিত অবস্থাতেও তিনি ধাতুদ্রব্য স্পর্শ করিতে পারিতেন না, এবং কোন পুস্তক বা ফল উহার মালিকের নিকট প্রত্যর্পণ করিতে ভুলিয়া গেলে তাঁহার হাত যেন আপনা হইতেই উহা যথাস্থানে ফিরাইয়া দিয়া আসিত।

কোন ভারতীয় মনস্তত্ত্ববিদ জগতের ক্রান্তদর্শী মহাপুরুষগণের কাহারও সম্বন্ধে একথা বলিবেন না যে, উক্ত মহাপুরুষ দেবতাদের সহিত কথাবার্তা বলিয়াছেন; তাহারা শুধু বলিবেন যে, তিনি এমন একটি মানসিক ভাবাবস্থায় উপনীত হইতে পারেন, যেখানে তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস হইতে পারে, তিনি দেবতাদের সহিত কথা কহিয়াছেন, অর্থাৎ ভারতীয় দার্শনিকের মতে উহা ‘স্বসংবেদ্য ব্যাপার। এই অবস্থার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যগণ দেখিয়াছেন। তাঁহারা এখনও গল্প করিয়া থাকেন, কিরূপ বিস্ময়ের সহিত তাহারা কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরিয়া দুইজন অথবা বহুজনের মধ্যে কথাবার্তা হইতেছে শুনিতেন—তাহার মধ্যে এক পক্ষের কথাগুলিই শুধু তাহাদের কানে আসিতেছে; এদিকে তাহাদের গুরুদেব শান্তভাবে বিশ্রাম করিতে করিতে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করিতেন যে, শিষ্যগণের অদৃশ্য দেবদেবীর সহিত ধ্যানযোগে তিনি কথাবার্তা বলিতেছেন।

শ্রীরামকৃষ্ণের এই সকল অজস্র দর্শনের পশ্চাতে সর্বদাই ছিল মানবসেবার দৃঢ় সঙ্কল্প। উহাই এই সকলকে এক মহাজীবনরূপে গ্রথিত করিয়াছিল। বহুকাল পরে স্বামী বিবেকানন্দ তাহার গুরুদেব সম্বন্ধে বলিতেন, রাত্রির অন্ধকারে মাটিতে পড়িয়া যন্ত্রণায় ছটফট করিতে করিতে তিনি প্রার্থনা করিতেন, আবার যেন তিনি পৃথিবীতে এমন কি, কুকুরযোনিতেও জন্মগ্রহণ করেন, যদি তাহা দ্বারা একটি জীবেরও সহায়তা হয়। অন্যান্য সময়ে যখন মনের কথা অপরের নিকট ব্যক্ত করিতে পারিতেন, তখন তিনি বলিতেন, উচ্চতর দর্শন তাহাকে সেবার ভাব হইতে টানিয়া লইবার জন্য প্রলোভিত করিতেছে। গভীর সমাধিভঙ্গের পর তিনি যে দুই-চারিটি কথা, আপন মনে বলিতেন, তাহার শিষ্যগণ তাহা ঐ বিষয়ক বলিয়াই মনে করিতেন। তিনি যেন শিশুর ন্যায় মাতার নিকট হইতে দৌড়িয়া গিয়া খেলিবার জন্য জগন্মাতার নিকট আব্দার করিতেন। এরূপ ক্ষেত্রে সাধারণ জ্ঞানভূমিতে নামিয়া আসিবার জন্য তিনি, “আর একটি মাত্র সেবাকাজ’, অথবা ‘আর একটি ছোটখাট জিনিস’ ভোগ করিব, এই বলিয়া বায়না ধরিতেন। কিন্তু সমাধি হইতে ঐ বুত্থানকালে ঈশ্বরে একান্ত তন্ময়তাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ন্যায় তাহাতে সর্বদা অনন্ত প্রেম ও গভীর অন্তদৃষ্টি পরিলক্ষিত হইত। হার্ভার্ড বক্তৃতা উপলক্ষে স্বামী বিবেকানন্দ যখন ঐ দুইটিকেই সমাধিজনিত বাহ্যজ্ঞানশূন্যতা ও মৃগীরোগহেতু বাহ্যজ্ঞানশূনতা, এই উভয়ের মধ্যে লক্ষণের পার্থক্য বলিয়া নির্দেশ করেন, তখন আমরা বুঝিতে পারি তাহার গুরুদেবের জীবনে সমাধি অবস্থা লাভ ও পুনরায় ঐ অবস্থা হইতে সাধারণ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন—এই উভয় অবস্থা তিনি সর্বদা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন বলিয়াই তাহার প্রত্যেক কথার মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় বিরাজ করিত।

শ্রীরামকৃষ্ণের আরও অনেক বিশেষত্ব ছিল। স্নায়ুমণ্ডলীর ক্রিয়ার উপর তাহার কিরূপ সম্পূর্ণ আধিপত্য ছিল, তাহার দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, শেষ অসুখের সময় তিনি গলদেশ হইতে মনকে একেবারে তুলিয়া লইতে পারিতেন, ঔষধ প্রয়োগের দ্বারা ক্ষতস্থান অসাড় করিয়া ফেলিলে অস্ত্রোপচারের পর যেরূপ হয়, সেইরূপ কোন বেদনা অনুভূত হইত না। সকল জিনিস তন্নতন্নভাবে লক্ষ্য করিবার শক্তিও ছিল তাহার অসাধারণ। শারীরিক গঠনের খুঁটিনাটিও তাহার নিকট অর্থপূর্ণ বলিয়া বোধ হইত, এবং উহার মধ্যে তিনি ব্যক্তির চরিত্র সম্বন্ধে কিছু না কিছু পরিচয় পাইতেন। নবাগত শিষ্যকে তিনি একরূপ যোগনিদ্রায় অভিভূত করিয়া তাহার মগ্নচৈতন্য হইতে, কয়েক মিনিটের মধ্যে বহু অতীতের যে-সকল সংস্কার নিহিত আছে, তাহা জানিয়া লইতেন, অপরের নিকট তুচ্ছ বলিয়া প্রতীত হয় এরূপ প্রত্যেক সামান্য কথা ও কার্য তাহার নিকট চরিত্ররূপ মহাপ্রবাহে নীত তৃণখণ্ডের ন্যায় ঐ স্রোতের গতি নির্দেশ করিয়া দিত। তিনি বলিতেন,”কখন কখনও এমন একটা অবস্থা হয়, যখন নবনারীকে কাচের জিনিসের মতো বোধ হয়, এবং তাদের ভেতর-বার সব দেখতে পাই।”

সর্বোপরি, স্পর্শমাত্র তিনি লোকের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করিয়া দিতে পারিতেন, এবং তাহাদের সমগ্র জীবন এক নূতন শক্তিপ্রভাবে গঠিত ও পরিচালিত হইত; সমাধিবিষয়ে একথা সকলেই জ্ঞাত আছেন, বিশেষতঃ যে-সকল স্ত্রীলোক দক্ষিণেশ্বর দর্শন করিতে যাইতেন, তাহাদের সম্পর্কে। কিন্তু ইহা ব্যতীত একজন অতি সাদাসিধা প্রকৃতির লোক আমাকে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের শেষ কয়মাসের একদিনের এক ঘটনার কথা বলেন। ঐদিন কাশীপুর উদ্যানে বেড়াইতে বেড়াইতে তিনি সমবেত ভক্তদের মাথায় হাত দিয়া কাহাকেও বলেন, “চৈতন্য হোক, আর কাহাকেও বলেন, “আজ থাক’; এইভাবে সকলকে কিছু না কিছু বলেন। ইহার পরেই কৃপাপ্রাপ্ত ভক্তদের প্রত্যেকের বিভিন্ন প্রকারের অনুভূতি হয়। একজনের মনে অত্যন্ত বেদনা জাগিয়া ওঠে; অপর একজনের নিকট চারিপাশের সকল জিনিস ছায়ার ন্যায় অবাস্তব ও কোন একটি ভাবের ব্যঞ্জকমাত্র হইয়া ওঠে। তৃতীয় ব্যক্তি ঐ কৃপা অপার আনন্দরূপে অনুভব করেন। আর একজনের মহান জ্যোতি দর্শন হয়, যাহা তাহাকে কদাপি পরিত্যাগ করে নাই; কোন মন্দিরে অথবা পথিপাশ্বস্থ দেবালয়ের নিকট দিয়া যাইবার সময় তিনি সর্বদা ঐ জ্যোতি দেখিতে পাইতেন, এবং বোধ হইত ঐ জ্যোতির মধ্যে তিনি একটি মূর্তি দেখিতে পাইতেছেন; সেই মুহূর্তে তিনি যেরূপ দর্শনের উপযুক্ত হইতেন সেই অনুসারে, ঐ মূর্তি কখনও হাস্যময়, কখনও বিষণ্ণ। ‘বিগ্রহের অধিষ্ঠাতা চৈতন্য’ বলিয়াই তিনি ঐ মূর্তিকে জানিতেন এবং সেইরূপভাবে তাহার সম্বন্ধে বলিতেন।

এইরূপে প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে তাহার অন্তর্নিহিত শ্রেষ্ঠ ও সার বস্তুর উদ্বোধন করিয়া দিয়া, অথবা যিনি যে পরিমাণে গ্রহণের উপযুক্ত হইতেন, সেই অনুসারে নিজের অনুভূতি তাহাদের মধ্যে সঞ্চারিত করিয়া দিয়া, শ্রীরামকৃষ্ণ সেই কঠোর সত্যপরায়ণতা এবং প্রবল বিচারবুদ্ধির সূত্রপাত ও সংরক্ষণ করিয়া যান, যাহা তাহার হাতে গড়া সকল শিষ্যের মধ্যেই আমরা দেখিতে পাই। তাঁহাদের মধ্যে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ নামে একজন বলেন, “কোন কিছু পরীক্ষা না করে আমরা বিশ্বাস করি না, ঠাকুর আমাদের ঐরকমভাবে শিক্ষা দিয়েছেন।” আর একজনের নিকট ঐ শিক্ষা কিরূপ বিশেষ আকার ধারণ করিয়াছিল এই সম্পর্কে অনুসন্ধান করায় গভীর চিন্তার পর তিনি উত্তর দেন যে, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাদের সেই চরম সত্তার কিছু না কিছু অনুভূতি করাইয়া দিতেন; তাহা হইতে প্রত্যেকে এমন একটি জ্ঞান লাভ করিতেন, যাহা কখনও প্রতারণা করিবে না। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁহার প্রথম বয়সের বক্তৃতাগুলির একটিতে বলিয়াছেন, “আমাদের নিজের চেষ্টায় অথবা কোন সিদ্ধ মহাপুরুষের কৃপায় আমরা সেই চরম বস্তু লাভ করি।”

গুরুর জীবনই শিষ্যের করতলগত সম্পদ, এবং এ বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ নাই যে, মানবের মানসিক বৃত্তিসমূহের কতদূর সম্প্রসারণ ঘটিতে পারে, সে সম্পর্কে স্বামীজী নিজ দৃষ্ট ও অনুভূত সকল ঘটনা তৎক্ষণাৎ বিশ্লেষণ করিয়াছিলেন বলিয়াই, পাশ্চাত্যদেশের মনোরাজ্যবিষয়ক গবেষণার সংস্পর্শে আসিবামাত্র তিনি সমগ্র জ্ঞানকে অবচেতন (sub-conscious), সাধারণ বা চেতন (conscious) এবং অতিচেতন বা অতীন্দ্রিয় (superconscious)—এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করিতে পারেন। প্রথম শব্দ দুইটি ইউরোপ এবং আমেরিকায় যথেষ্ট প্রচলিত ছিল, তৃতীয়টি তিনি নিপুণ সূক্ষ্মদৃষ্টি এবং নিজ জীবনের ব্যক্তিগত অনুভূতির বলে মনস্তত্ত্ববিষয়ক শব্দসমষ্টির অন্তর্ভুক্ত করিয়া দিলেন। একবার তিনি বলেন, “সাধারণ জ্ঞান অবচেতন ও অতিচেতন (অথবা অতীন্দ্রিয়) জ্ঞানরূপ দুই মহাসমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত একটা সামান্য পাতলা পর্দামাত্র।” তিনি সবিস্ময়ে আরও বলেন, “যখন আমি পাশ্চাত্য জাতিদের সাধারণ জ্ঞান সম্পর্কে এত বড়াই করতে শুনলাম, তখন আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি। সাধারণ জ্ঞান? সাধারণ জ্ঞানে কি আসে যায়? তার নিচে অতলস্পর্শ সাগরের মতো যে মগ্নচৈতন্য এবং উপরে যে পর্বততুল্য উচ্চ অতীন্দ্রিয় জ্ঞান রয়েছে, তাদের তুলনায় সাধারণ জ্ঞান কিছুই নয়! এ সম্পর্কে আমার ভুল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ, আমি কি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসকে দশ মিনিটের মধ্যে লোকের মগ্নচৈতন্য থেকে তার সমগ্র অতীত জেনে নিতে এবং তা থেকে তার ভবিষ্যৎ এবং অন্তরের শক্তি নিরূপণ করতে দেখিনি?”

প্রকৃত অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের সহিত বিচারবুদ্ধির কখনও বিরোধ থাকিতে পারে না—’রাজযোগে লিপিবদ্ধ এই উক্তির সত্যতাও নিঃসন্দেহে তাহার উপলব্ধির বিস্তৃত জ্ঞানরাজ্যের অভিজ্ঞতা-প্রসূত। দক্ষিণেশ্বরের ঐ সাধুর নানা অসাধারণ উপায়ে অতীন্দ্রিয় জ্ঞানলাভ করিবার ক্ষমতা ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু সেজন্য বৃথা অভিমানে আত্মহারা হইয়া সাধারণ উপায়ে যাহা নিশ্চিত জানা যায়, তাহা জানিবার জন্য তিনি কখনও অসাধারণ উপায় অবলম্বন করিবার প্রয়াস পাইতেন না। একবার এক অদ্ভুত সাধুবেশধারী ব্যক্তি দক্ষিণেশ্বর উদ্যানে আসিয়া বলে যে, সে আহার ব্যতীত জীবনধারণ করিতে পারে। তাহাকে পরীক্ষা করার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ কোন অলৌকিক দর্শনের সাহায্য লইবার চেষ্টা করিলেন না, কেবল কয়েকজন চতুর প্রকৃতির লোক পাঠাইয়া দিলেন, তাহার উপর নজর রাখিবার জন্য, এবং বলিয়া দিলেন, ঐ ব্যক্তি কি আহার করে এবং কোথায় আহার করে তাহা যেন তাহাকে জানায়।

পরীক্ষা না করিয়া কোন জিনিস গ্রহণ করা চলিবে না, এবং স্বপ্ন, পূর্ব হইতে ভাবী ঘটনা দর্শন করা ও তৎসম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা ইত্যাদি যে-সব উপায়ে সাধারণ লোক পরস্পরের উপর প্রভাব বিস্তার করিবার জন্য এত চেষ্টা করিয়া থাকে, দেহত্যাগের দিন পর্যন্ত স্বামী বিবেকানন্দের নিকট ঐ সকল আতঙ্কের বস্তু ছিল। আবার লোকে ঐ সকল তাহার নিকট প্রভূত পরিমাণে উপস্থিত করিত। অবশ্য উহা কবিবারই কথা, স্বামীজী কিন্তু এসব সর্বদা অগ্রাহ্য করিয়া উঠাইয়া দিতেন, এবং বলিতেন, যদি উহারা সত্য হয়, তবে তাহার না মানা সত্ত্বেও নিজ নিজ ফল প্রকাশ করিয়া দেখাক। তিনি বলিতেন, কোন ভবিষ্যদ্বাণী কার্যক্ষেত্রে সত্য হইবে কি-না, সে কথা জানা তাহার পক্ষে অসম্ভব; কেবল এই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, একবার উহা মানিয়া লইলে আর কখনও তিনি উহার হাত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিতে পারিবেন না।

শ্রীরামকৃষ্ণের ক্ষেত্রে দেখা যাইত, অলৌকিক দর্শনাদি কেবল পারমার্থিক বিষয়েই প্রযুক্ত হইত; কদাপি উহার ব্যতিক্রম ঘটিত না। বেদিয়াদের মতো গণনা দ্বারা ঐহিক বিষয় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী তিনি কখনও করিতেন না, এবং তাহার শিষ্যগণের মতে ভবিষ্যগণনা শক্তির অল্পবিস্তর অপব্যবহারের সূচনা করে। স্বামীজী বলিতেন, “এসব অবান্তর ব্যাপার, প্রকৃত যোগ নয়। অপরোক্ষভাবে আমাদের কথার সত্যতা প্রমাণ করে বলে এদের কতটা প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। একটু সামান্য আভাসেও মানুষের বিশ্বাস হয় যে স্থূল জড় জগতের বাইরে একটা কিছু আছে। কিন্তু যারা এসব জিনিস নিয়ে সময় কাটায়, তাদের গুরুতর বিপদের আশঙ্কা আছে।” আর একবার অসহিষ্ণুভাবে তিনি বলিয়া ওঠেন, “এসব ‘সীমান্ত-সমস্যার ব্যাপার’ (frontier questions), এগুলোর সাহায্যে কোন নিশ্চিত বা দৃঢ় জ্ঞানলাভ করা যায় না। আমি কি বলিনি, ও-সব ‘সীমান্ত-সমস্যার ব্যাপার? সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা সব সময়েই বদলে যাচ্ছে।”

আমাদের সামনে যাহা কিছু আসুক, বিচারপূর্বক উহা বুঝিবার প্রচেষ্টা সর্বদা থাকা চাই। কাহারও অলৌকিক দর্শনাদির কথা শুনিলে বলিতেই হইবে, নিজে ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করলে তবেই আমি ওটা সত্য বলে গ্রহণ করব। কিন্তু আমাদের নিজেদের অনুভূতিকেও সম্পূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করিয়া দেখিতে হইবে। কোন অলৌকিক ঘটনার যে ব্যাখ্যা প্রথমেই মনে আসিল, তাহাকেই সার জ্ঞান করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিলে চলিবে না। চট করিয়া কোন সিদ্ধান্ত মানিয়া লইবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বামীজী শেষের দিকে পরলোকগত আত্মার পুনরাগমন সম্পর্কে বিশ্বাস করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। একবার ইচ্ছাপূর্বক তিনি বলেন, “আমি জীবনে অনেকবার ভূত দেখেছি এবং একবার শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের পরসপ্তাহে এক জ্যোতির্ময় অশরীরী আত্মা দেখেছি।” কিন্তু ইহা দ্বারা একথা বুঝায় না যে, ভূতুড়ে কর্তৃক ভূত নামাইবার যে-সকল চেষ্টা ও পরীক্ষা, তাহার অধিকাংশের প্রতি তাহার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল। এইরূপ একদিনের ঘটনায় জনৈক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিকে উক্ত দলভুক্ত দেখিয়া তিনি বলেন, জাগতিক সকল বিষয়ে অসাধারণ বুদ্ধিমান এক ব্যক্তি যে তথাকথিত এক মিডিয়ামের (ভূতাবিষ্ট ব্যক্তির সামনে আসিয়াই সমস্ত বলবুদ্ধি খোয়াইয়া বসে, ইহা বড়ই পরিতাপের বিষয়। আমেরিকায় কয়েকটি ভূতনামানো ব্যাপারে তিনি দর্শকরূপে উপস্থিত ছিলেন, এবং ঐ সময়ে প্রদর্শিত অলৌকিক ব্যাপারের অধিকাংশই তিনি মনে করিতেন সম্পূর্ণ জুয়াচুরি। সব দেখিয়া শুনিয়া তিনি সার মন্তব্য প্রকাশ করেন যে, “সর্বত্রই অতি সহজ উপায়ে অতি বড় জুয়াচুরি চলে থাকে। আবার তিনি মনে করিতেন যে, এই সকল ঘটনার একটা বড় অংশকে বহির্জগতের সত্য না বলিয়া অন্তর্জগতের ব্যাপার হিসাবে ব্যাখ্যা করিলেই ভাল।(১) যদি এই সকল বাদ দিবার পরেও উহাদের কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাহা হইলে সেটুকু বাস্তবিক যথার্থ হওয়া সম্ভব।

কিন্তু যদি এইরূপই হয়, তথাপি এই মায়িক জগতের জ্ঞানলাভ আমাদের চরম লক্ষ্য হইতে পারে না। দুই-চারিজন ভ্রাম্যমাণ জীবের কোন সূক্ষ্ম জগৎ হইতে স্থূল জগতে প্রত্যাবর্তনের দ্বারা অমৃতত্বের প্রকৃত ধারণা সম্বন্ধে অতি অল্প জ্ঞানই লাভ করা যায়। একমাত্র ত্যাগের দ্বারাই এই অমৃতত্ব লাভ করা যায়।

স্বামীজীর মতে ভূতপ্রেতাদি লইয়া বেশি নাড়াচাড়া করার ফলে বাসনা ও অহঙ্কারের বৃদ্ধি হয়, এবং অসত্যে পতন অনিবার্য হইয়া পড়ে। যদি আত্মার জন্য জীবনের সাধারণ ভোগ-বাসনাই পরিত্যাগ করিতে হয়, তাহা হইলে এইসকল অলৌকিক ক্ষমতা আরও কতক অধিক পরিমাণে ত্যাজ্য! এমনকি, খ্রীস্টধর্মে সিদ্ধাই-এর ব্যাপার যদি না থাকিত, তাহা হইলে তিনি উহাকে উচ্চতর ধর্ম বলিয়া মনে করিতে পারিতেন। সিদ্ধাই-এর প্রতি ভগবান বুদ্ধের দারুণ ঘৃণা বৌদ্ধধর্মের চিরন্তন গৌরব। উহাদের মূল্য সম্পর্কে বড় জোর এই কথা বলা যায় যে, উহারা বিশ্বাস-উৎপাদনে কিঞ্চিৎ সাহায্য করে, তাহাও আবার ধর্মশিক্ষার প্রথম স্তরে। বাইবেলের ভাষায়, “সিদ্ধাই প্রভৃতি যাহা কিছু সব লোপ পাইবে। একমাত্র প্রেমই চিরকাল থাকিবে।” যে দৃঢ়চেতা ব্যক্তি এইসব প্রলোভন দূর করিতে পারেন, তাহার নিকটেই সত্যের দ্বার উদঘাটিত হয়। মহর্ষি পতঞ্জলির কথায়, “প্রসংখ্যানেহপ্যকুসীদস্য সর্বথা বিবেকখ্যাতেধর্মমেঘঃ সমাধিঃ”—যিনি সিদ্ধিসমূহ সমূলে পরিহার করিতে সমর্থ হন, তাহারই ধর্মমেঘ নামক সমাধিলাভ হয়; তিনিই ব্ৰহ্ম উপলব্ধি করেন।


১ যেমন, দাক্ষিণাত্যে একব্যক্তি মনের কথা বলিয়া দিবার ক্ষমতার জন্য বিশেষ খ্যাতিলাভ করে। সে বলিত, এক অদৃশ্য স্ত্রীমূর্তি তাহার নিকট দাঁড়াইয়া থাকিয়া বলিয়া দিত, তাহাকে কি বলিতে হইবে। স্বামীজী বলিতেন, “এই ব্যাখ্যা আমার পছন্দ না হওয়ায় আমি অপর ব্যাখ্যার অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সে নিজের ভিতর হইতেই ঐসকল তথ্য লাভ করিত