পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ
সমাধি

যে ব্যক্তি একখানি সরু তক্তার উপর দিয়া কোন গভীর গহ্বর (খাদ) পার হয়, যে কোন মুহূর্তে হঠাৎ তাহার সমস্ত অভ্যস্ত সংস্কার ও অনুভূতির কথা মনে উদিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে সেই অত্যুচ্চ স্থান হইতে পড়িয়া যাইবার আশঙ্কা থাকে। আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার বাহিরে যে মনোরাজ্য অবস্থিত তাহাতে মধ্যে মধ্যে মানবের প্রবেশলাভ সম্পর্কে শাস্ত্রে আমরা যে-সকল গল্প লিপিবদ্ধ দেখিতে পাই, তাহারাও অনেকটা এই রকমের। সমুদ্রের উপর দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে যে মুহূর্তে পিটারের মনে পড়িল তিনি কোথায় রহিয়াছেন, অমনি তিনি ডুবিয়া যাইতে আরম্ভ করিলেন। পর্বতপার্শ্বে নিদ্রিত কয়েকজন ক্লান্ত ব্যক্তি জাগ্রত হইবার পর দেখিলেন, তাহাদের আচার্যদেব সম্পূর্ণ নূতন আকৃতিতে পরিবর্তিত হইয়া সম্মুখে বিদ্যমান। কিন্তু আবার তাঁহারা এই পার্থিব জগতে নামিয়া আসিলেন; আর ইতিমধ্যেই সেই অপূর্ব দর্শন অন্তর্হিত হইয়া স্মৃতিমাত্রে পর্যবসিত হইয়াছে। রাত্রিকালে ক্ষেতের মধ্যে বসিয়া মেষপাল পাহারা দিতে দিতে মেষপালকগণ অস্ফুটস্বরে উচ্চ ধর্ম-প্রসঙ্গ করিতেছে, সহসা তাহারা দেবদূতগণের আবির্ভাব দেখিতে পাইল। কিন্তু সেই মুহূর্ত কয়টি চলিয়া গেল, সঙ্গে সঙ্গে সেই স্থানে এবং কালে মনের সেই উচ্চ অবস্থাও চলিয়া গেল; আর একি! সেই দেবদূতগণও আকাশ হইতে অন্তর্হিত হইলেন! তাহাদের শ্রোতৃবৃন্দ নিকটবর্তী গ্রামে যে অসাধারণ ব্যাপার ঘটিয়াছে, তাহা দেখিবার জন্য সাধারণ লোকের ন্যায় পদব্রজে যাইতে বাধ্য হইল।

ভারতীয় আদর্শ ইহার বিপরীত। তিনিই ভারতের আদর্শ পুরুষ, মনের প্রবৃত্তিসমূহ যিনি এমন সম্পূর্ণরূপে বশীভূত করিয়াছেন যে, যে-কোন মুহূর্তে চিন্তাসমুদ্রে অবগাহন করিয়া ইচ্ছামত সেখানে অবস্থান করিতে পারেন; যিনি দুর্দম তন্ময়তাস্রোতে সম্পূর্ণরূপে ভাসিয়া যাইতে পারেন—সহসা ঐ ভাব ভঙ্গ হইয়া অপ্রত্যাশিতভাবে পুনরায় ইন্দ্রিয়ের রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকে না। অবশ্য শিক্ষার গভীরতা ও অনুভূতির গাঢ়তা এই শক্তিলাভের সহায়ক হয়। কিন্তু উহা সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করিবার একমাত্র উপায় হইল কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ—এত কঠোর যে, সাধক যেন ইচ্ছামাত্র চিন্তারও বাহিরে চলিয়া যাইতে পারেন। যিনি নিজ মনকে এরূপ একাগ্র করিতে পারেন যে, ইচ্ছামাত্র উহাকে সম্পূর্ণ নিরোধ করিতে সমর্থ, তাঁহার নিকট মন আজ্ঞাবাহক ভৃত্য, অথবা দ্রুতগামী অশ্বের ন্যায় হইয়া যায় এবং শরীরও মনের অনুগত প্রজারূপে পরিণত হয়। এরূপ ক্ষমতা লাভ না করা পর্যন্ত সিদ্ধি—সম্পূর্ণ অবিচলিত আত্মসংযম আসে না। একপুরুষে এরূপ কয়জন জন্মগ্রহণ করেন, যাহারা এইরূপ উচ্চাধিকারী হইতে পারেন? এইরূপ মহাপুরুষের কার্য ও কথায় এমন একটা জ্যোতি, এমন একটা দৃঢ় প্রত্যয় থাকে, যাহা বুঝিতে ভুল হয় না। বাইবেলের ভাষায়, “তাহারা এমনভাবে কথা বলেন, যেন তাহাদের ‘চাপরাস’ আছে, তাহারা কেবল পুঁথিপড়া পণ্ডিতমাত্র নন।”

একথা নিঃসন্দেহ যে, বালক নরেন্দ্রকে প্রথম দর্শনেই শ্রীরামকৃষ্ণ ‘আজন্ম ব্রহ্মজ্ঞানী’ বলিয়া বুঝিতে পারেন, এবং সুদক্ষ ইঞ্জিনীয়ার কর্তৃক কোন প্রবাহের বেগ নিরূপণের ন্যায় ইতিমধ্যেই বালক কতদূর মানসিক উচ্চাবস্থা লাভ করিয়াছে, তাহাও তিনি ধরিতে পারেন। আগ্রহের সহিত তিনি জিজ্ঞাসা করেন,”হাগা, তুমি কি ঘুমুবার আগে একটা জ্যোতি দেখতে পাও?” সবিস্ময়ে বালক উত্তর দিলেন, “কেন, সকলেই কি দেখে না?” পরবর্তী কালে প্রায়ই তিনি এই প্রশ্নটির উল্লেখ করিতেন এবং প্রসঙ্গক্রমে তিনি যে জ্যোতি দেখিতেন, তাহার বর্ণনা দিতেন। কখন কখনও ঐ জ্যোতি একটি গোলকের মতো হইত, এবং একটি বালক পা দিয়া উহা তাহার দিকে ছুঁড়িয়া দিত। ক্রমে উহা নিকটবর্তী হইলে, তিনি উহার সহিত এক হইয়া যাইতেন এবং সমস্ত জগৎ বিস্মৃত হইতেন। কখনও উহা অগ্নিপুঞ্জের মতো দেখাইত, এবং তিনি উহার মধ্যে প্রবেশ করিতেন। বিস্মিতচিত্তে আমরা ভাবি, যে নিদ্রার প্রারম্ভ এইরূপ তাহা কি আদৌ সেই নিদ্রা—যাহা আমরা সচরাচর নিদ্রা বলিতে বুঝিয়া থাকি? সে যাহা হউক, যে-সকল ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দের সমবয়স্ক যুবক ছিলেন, তাহারা বলেন, বিবেকানন্দ নিদ্রিত হইলে তাহাদের গুরুদেব তাহার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস লক্ষ্য করিয়া অপর সকলকে বলিতেন, “উহাকে নিদ্রিত বলিয়া মনে হইতেছে মাত্র এবং এখন ধ্যানাবস্থার কোন্ স্তরে তিনি উপনীত হইয়াছেন, তাহা সকলকে বুঝাইয়া দিতেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ যখন কাশীপুর উদ্যানে পীড়িত হইয়া অবস্থান করিতেছেন, সেই সময় একদিন স্বামীজী ঐরূপ কয়েকঘণ্টাকাল যেন নিদ্ৰাই যাইতেছিলেন বলিয়া সমীপন্থ ব্যক্তির মনে হয়। প্রায় মধ্যরাত্রে তিনি সহসা চিৎকার করিয়া ওঠেন, “আমার শরীর কোথায়?” তাহার সঙ্গী–বর্তমানে গোপালদাদা নামে পরিচিত বৃদ্ধ সাধু দৌড়িয়া তাহার নিকটে গিয়া সজোরে সমস্ত অঙ্গ ডলিয়া দিয়া মস্তকের নিম্ন হইতে শরীরের লুপ্ত অনুভূতি ফিরাইয়া আনিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেন। যখন তাহার সব চেষ্টা ব্যর্থ হইল এবং নরেন্দ্র তখনও বিশেষ কষ্ট ও আতঙ্ক অনুভব করিতেছেন, তখন গোপালদাদা দৌড়িয়া শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট গিয়া শিষ্যের অবস্থা তাহাকে জানাইলেন। তিনি শুনিয়া একটু হাসিয়া বলিলেন, “থাক ঐরকম! কিছুক্ষণ ঐভাবে থাকলে ওর কোন ক্ষতি হবে না। ঐ অবস্থা লাভ করবার জন্য সে আমাকে অনেক জ্বালাতন করেছে।” পরে তিনি গোপালদাদা ও অন্যান্য সকলকে বলেন, নরেন্দ্রের নির্বিকল্প সমাধিলাভ হইয়াছে; এখন তাহাকে কাজ লইয়া থাকিতে হইবে। স্বামীজী স্বয়ং পরে এই অবস্থা সম্বন্ধে তাহার গুরুভ্রাতা স্বামী সারদানন্দের নিকট এইরূপবর্ণনা করেনঃ “মাথার ভেতরে যেন একটা আলো দেখতে পাচ্ছিলাম; সেটা এত উজ্জ্বল যে, আমি ধরেই নিয়েছিলুম আমার মাথার পিছনে কেউ একটা উজ্জ্বল আলো রেখে গিয়ে থাকবে।” অতঃপর ইন্দ্রিয়ানুভূতির সকল বন্ধন ছিন্ন হওয়ায় তিনি সেই রাজ্যে উত্তরণ করেন, যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ’, একথা আমরা সহজেই অনুমান করিতে পারি।

বুঝিতে হইবে যে, মনকে একাগ্র করিবার জন্য সর্বপ্রথম আমাদের দেহকে ভুলিতে পারা চাই। এই উদ্দেশ্যেই লোকে তপস্যা ও কৃচ্ছসাধনের অভ্যাস করিয়া থাকে। কিছুকাল কঠোর তপস্যায় কাটাইবার চিন্তা আজীবন স্বামীজীর নিকট আনন্দদায়ক ছিল। নির্ভীকভাবে বিজয়ীর ন্যায় সংসারে বিচরণ করিয়া বেড়াইলেও প্রায়ই তিনি তপস্যা-প্রসঙ্গ উত্থাপন করিতেন। সুদক্ষ অশ্বারোহী যেমন অশ্বের লাগাম ধরিয়া দেখে, অথবা প্রসিদ্ধ সঙ্গীত-বিশারদ যেমন বাদ্যযন্ত্রের পর্দার উপর অঙ্গুলি সঞ্চালন করিয়া দেখে, তিনিও সেইরূপ বার বার দেখিতে ভালবাসিতেন, শরীরটা ইচ্ছাশক্তির সম্পূর্ণ বশে চলে কি-না—যন্ত্রের উপর এখনও তাঁহার পূর্ববৎদখল আছে কি-না, নূতন করিয়া দেখিতে তিনি প্রীতি অনুভব করিতেন। জীবনের অন্তিমকালে তিনি বলেন, “দেখছি, আমি এখনো যা ইচ্ছা করতে পারি।” ঐ সময় কলকাতার গ্রীষ্মকালের কয়মাস তিনি জলপান না করিয়া থাকিতে স্বীকৃত হন। অবশ্য মুখ ধুইবার নিষেধ ছিল না। সেই সময় তিনি দেখেন যে, একবিন্দু জল প্রবেশ করিতে গেলেও তাহার গলার পেশীসমূহ আপনা হইতে বন্ধ হইয়া যাইত, সুতরাং ইচ্ছা করিলেও তিনি জল পান করিতে পারিতেন না। কোন ব্রত উপলক্ষে যখন তিনি উপবাস করিতেন, তখন তাহার নিকট অবস্থানকালে অপরেরও খাদ্যসামগ্রী অনাবশ্যক বোধ হইত, এবং চেষ্টা করিয়াও ঐ বিষয়ে রুচি হইত না। একটি ঘটনার কথা আমি এইরূপ শুনিয়াছি যে, তিনি বসিয়াছিলেন, এবং তাহার চারিপার্শ্বে উপবিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি তর্ক-বিতর্ক করিতেছিল; মনে হইতেছিল, ঐ সকল কথা তিনি শুনিতেছেন না। হঠাৎ তাহার হস্তস্থিত একটি শূন্য কাচের গ্লাস মাটিতে নিক্ষিপ্ত হইয়া চূর্ণ হইয়া গেল—ঐ তর্কে তাহার যে কষ্টবোধ হইতেছিল, ঐটুকুই তাহার নিদর্শন।

যে কঠোর সাধনার দ্বারা এই আত্মসংযমশক্তি বিকাশলাভ করিয়াছে, তাহা হৃদয়ঙ্গম করা সহজ নহে! হয়তো কত ঘণ্টা পূজা ও ধ্যানে অতিবাহিত হইয়াছে, কতক্ষণ ধরিয়া একদৃষ্টে তাকাইয়া থাকিতে হইয়াছে এবং দীর্ঘকাল আহার ও নিদ্রা পরিত্যাগ করিতে হইয়াছে! শেষোক্ত ব্যাপারে বস্তুতঃ এক সময়ে পচিশ দিন ধরিয়া তিনি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র আধঘণ্টা নিদ্রা যাইতেন। আবার এই অর্ধঘণ্টা নিদ্রা হইতেও তিনি নিজেই জাগিয়া উঠিতেন। সম্ভবতঃ ইহার পর নিদ্রা আর কখনও তাহাকে পীড়াপীড়ি করিতে বা বহুক্ষণ ধরিয়া রাখিতে পারে নাই। তাহার ‘যোগীর চক্ষু ছিল। বাল্যকালে যখন তিনি গঙ্গাবক্ষে শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বজরায় উঠিয়া তাহাকে প্রশ্ন করেন, “মহাশয়, আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন?”—তখন তিনি তাহাকে একথা বলেন। যোগীর চক্ষু কদাপি সম্পূর্ণরূপে মুদ্রিত হয় না, এবং সূর্যোদয় হইবামাত্র একেবারে উন্মীলিত হইয়া যায়, ইহাই প্রবাদ। পাশ্চাত্যে যাহারা তাহার সহিত একগৃহে অবস্থান করিতেন, তাহারা শুনিতে পাইতেন, রাত্রিশেষে স্নান করিবার সময় তিনি পরব্রহ্ম অথবা ঐ জাতীয় কোন নাম সুর করিয়া আবৃত্তি করিতেছেন। তাহাকে কঠোরতা অভ্যাসকরিতে কখনও দেখা যাইত না, কিন্তু তাহার সমগ্র জীবন এরূপ প্রগাঢ় তন্ময়তাপূর্ণ ছিল যে, অপর কাহারও নিকট উহাই কঠোর তপস্যা বলিয়া প্রতীত হইত। আমেরিকার ন্যায় রেলরাস্তা, ট্রাম প্রভৃতি যানবহুল ও জটিল নিমন্ত্রণ-তালিকার দেশে প্রথমদিকে তাহাকে ধ্যানে তন্ময় হইবার প্রবণতা কিরূপ কষ্টে দমন করিতে হইত, তাহার আমেরিকাবাসী বন্ধুগণ তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। তাহাকে স্বগৃহে আমন্ত্রণকারী জনৈক ভারতবাসী বলেন, “ধ্যান করতে বসলে দশ মিনিট যেতে না যেতেই তিনি বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়তেন, যদিও তার শরীর মশায় ছেয়ে যেত।” এই অভ্যাস তাঁহাকে দমন করিতে হইত। প্রথম দিকে, লোকে হয়তো রাস্তার অপর প্রান্তে অপেক্ষারত, এদিকে তিনি গভীর চিন্তায় নিমগ্ন বাহ্যজ্ঞানশূন্য। ইহাতে তিনি বিশেষ লজ্জিত হইতেন। একবার নিউ ইয়র্কে একটি ক্লাসে তিনি ধ্যান শিক্ষা দিতেছেন, শেষে দেখা গেল কিছুতেই তাহার বাহ্যসংজ্ঞা ফিরিয়া আসিতেছে না; অতঃপর ছাত্রগণ একে একে নিঃশব্দে প্রস্থান করিল। পরে এই ব্যাপারটি শুনিয়া তিনি অতীব মর্মাহত হন এবং পুনরায় কখনও ক্লাসে ধ্যান শিক্ষা দিতে সাহস করেন নাই। নিজেব ঘরে দুই-একজনকে সঙ্গে লইয়া ধ্যান করিবার সময় তাহাদের কোন একটি কথা বলিয়া দিতেন, যাহা পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করিলে তাহার বাহ্যচৈতন্য ফিরিয়া আসিত।

কিন্তু ধ্যানের সময়ের কথা একেবারে ছাড়িয়া দিলেও তিনি প্রায় সর্বদাই চিন্তায় তন্ময় হইয়া যাইতেন। দশজনে মিলিয়া গল্প-গুজব, হাস্য-পরিহাস চলিতেছে, এমন সময় দেখা গেল, তাহার নয়নদ্বয় স্থির হইয়া গিয়াছে, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি ক্রমেই রুদ্ধ হইয়া অবশেষে একেবারে স্থির; তারপর ধীরে ধীরে পুনরায় পূর্বাবস্থাপ্রাপ্তি। তাহার বন্ধুগণ এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন এবং সেইমতো ব্যবস্থা করিতেন। দেখা করিবার উদ্দেশ্যে কাহারও বাড়িতে প্রবেশ করিয়া যদি তিনি কথা কহিতে ভুলিয়া যাইতেন, অথবা যদি তাহাকে কোন ঘরে নিঃশব্দে বসিয়া থাকিতে দেখা যাইত, তাহা হইলে কেহ তাহাকে বিরক্ত করিত না, যদিও কখন কখনও তিনি নিজেই উঠিয়া মৌনভঙ্গ না করিয়াই আগন্তুককে সাহায্য করিতেন। এইরূপে তাহার মন অন্তরেই সমাহিত থাকিত, বাহিরের বস্তু অন্বেষণ করিত না। তাহার চিন্তার উচ্চতা ও পরিব্যাপ্তি সম্বন্ধে তাহার কথাবার্তাই ছিল আমাদের নিকট ইঙ্গিত। তাহার প্রসঙ্গ ছিল সর্বদা নিগুণ তত্ত্ব সম্পর্কে। যাহাকে লোকে সচরাচর ধর্মপ্রসঙ্গ বলিয়া অভিহিত করে, উহা ঠিক তদনুরূপ ছিল না–তাহার গুরুদেব সম্পর্কেও ঐকথা প্রযোজ্য। অনেক সময়েই প্রসঙ্গের বিষয় ছিল ঐহিক। কিন্তু উহার পরিধি ছিল অতি বিস্তৃত। যাহার মধ্যে কদাপি কোন নীচতা, সঙ্কীর্ণতা, বা ক্ষুদ্রতা থাকিত না; কোথাও সহানুভূতি সঙ্কোচপ্রাপ্ত হইত না। এমনকি, তাঁহার বিরুদ্ধ সমালোচনাও মনে হইত—কেবল সংজ্ঞানির্দেশক ও বিশ্লেষণমূলক, কোনপ্রকার বিদ্বেষ বা ক্রোধ উহাতে থাকিত না। নিজের সম্বন্ধে তিনি একদিন বলেন, “আমি একজন অবতারের পর্যন্ত বিরুদ্ধ সমালোচনা করিতে পারি, অথচ তার দ্বারা তার প্রতি আমার ভালবাসা বিন্দুমাত্র হ্রাস পাবে না। কিন্তু আমি ভাল করেই জানি, অধিকাংশ লোকই তা পারবে না, তাদের পক্ষে নিজ নিজ ভক্তিটুকু বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ।” তাহার বিশ্লেষণ শ্রবণে শ্রোতার মনেও আলোচ্য বিষয়ের প্রতি কোন বিরাগ বা ঘৃণার ভাব অবশিষ্ট থাকিত না।

জগতের প্রতি এই উদার ও মধুর দৃষ্টিভঙ্গি তাহার গুরুভক্তির উপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ছিল। একবার তিনি বলেন, “আমার ভক্তি কুকুরের প্রভুভক্তির মতো। আমি কারণ খুঁজি না। পদানুসরণ করেই আমি সন্তুষ্ট।” শ্রীরামকৃষ্ণেরও নিজ গুরু তোতাপুরীর প্রতি অনুরূপ মনোভাব ছিল। এই আচার্যশ্রেষ্ঠ একদিন আম্বালার নিকটবর্তী কৈথাল নামক স্থানে নিজ শিষ্যগণকে এই বলিয়া চলিয়া আসেন, “আমাকে বাংলাদেশে যেতে হবে। আমি প্রাণে প্রাণে অনুভব করছি যে, সেখানে একজন মুমুক্ষুর এখন আমার নিকট সাহায্যের দরকার।” দক্ষিণেশ্বরে তাহার কার্য শেষ হইলে তিনি পুনরায় নিজ শিষ্যগণের নিকট প্রত্যাবর্তন করেন। উত্তর পশ্চিম প্রদেশে তাহার সমাধিস্থান অদ্যাপি লোকের শ্রদ্ধা-ভক্তি আকর্ষণ করিতেছে। কিন্তু যাহাকে তিনি দীক্ষিত করিয়াছিলেন, তিনি তাহার প্রতি এরূপশ্রদ্ধা-ভক্তি পোষণ করিতেন যে, কদাপি তার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করিতেন না। “ন্যাংটা আমাকে একথা বলত”—এইরূপেই তিনি তাঁহার সম্বন্ধে উল্লেখ করিতেন। জগতের প্রাত পূর্ণ প্রেম এবং মানবের উপর পূর্ণ বিশ্বাস কেবল সেই হৃদয়বান ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব, যিনি কাহারও মধ্যে নিজ আদর্শ সম্যকভাবে রূপায়িত হইতে দেখিয়াছেন।

কিন্তু দেহবোধের পারে যাইবার শক্তিই আমাদের গুরুর ন্যায় চরিত্রবিকাশের একমাত্র কারণ নহে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী চরমশক্তি বিকাশের জন্য প্রথম আবশ্যক প্রগাঢ় অনুভব শক্তির জাগরণ, কিন্তু পরে উহাকে সম্পূর্ণরূপে সংযত করিতে হইবে। এই ব্যাপারটি এমন এক অনুভূতির রাজ্যের ইঙ্গিত প্রদান করে, যাহা আমাদের অধিকাংশের নিকটেই কল্পনাতীত; তথাপি শিষ্যাবস্থায় স্বামীজীর জীবনের একটি ঘটনা হইতে উহার কিঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যায়। তাঁহার বয়স তখনও খুব অল্প, এমন সময়ে হঠাৎ তাহার পিতার মৃত্যু পরিবারের মধ্যে দারুণ বিপর্যয় আনয়ন করে। তিনি জ্যেষ্ঠ সন্তান, সুতরাং প্রতিদিন সকলের জন্য চিন্তায় তিনি অধীর হইয়া পড়িতে লাগিলেন। যাহারা তাহার প্রিয়জন, তাহাদের কষ্টে তাহার হৃদয় যেন বিদীর্ণ হইয়া যাইতে লাগিল, এবং সহসা স্বাচ্ছন্দ্য ও সৌভাগ্যপূর্ণ জীবনের বিপরীত অবস্থা তাহাকে বিমূঢ় করিয়া তুলিল। তাহাদের বিপদের গুরুত্ব দেখিয়াও তিনি যেন বিশ্বাস করিতে পারিলেন না।

অবশেষে মর্মবেদনা সহ্য করিতে না পারিয়া তিনি তাহার গুরুর নিকট একদিন ছুটিয়া গেলেন, এবং তাহাকে তীব্র তিরস্কার করিতে লাগিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ধীরভাবে সমস্ত শ্রবণ করিয়া সস্নেহে ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “যা বাবা, ওখানে যা, মা কালীর কাছে প্রার্থনা কর। তুই যা চাইবি, মা তোকে নিশ্চয় তাই দেবেন।”

অতি সাধারণ দৃষ্টিতে এই অঙ্গীকারের মধ্যে কিছুই অসঙ্গত বা অস্বাভাবিক ছিল; কারণ শ্রীরামকৃষ্ণের অনেক ধনী ও মাড়োয়ারী ভক্ত ছিলেন, যাহারা তাহার বাক্য রক্ষা করিবার জন্য সর্বস্ব অর্পণ করিতে পারিতেন। গুরুর উপদেশের শান্তভাব ও দৃঢ়তায় কতকটা আশ্বস্ত হইয়া বালক সে স্থান পরিত্যাগ করিয়া মন্দিরে গেলেন প্রার্থনা করিবার উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ অতীত হইবার পর তিনি প্রত্যাবর্তন করিলেন। ঐ সময়ে যাহারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাহারা বলেন, তাঁহার আকৃতিতে যেন একটা বিহুল ভাব ছিল, এবং কথা বলিতে যেন কষ্টবোধ হইতেছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করিলেন, “প্রার্থনা করেছিলি?” শিষ্য উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, করেছি।”

গুরু আবার বলিলেন, “মার কাছে কি চেয়েছিলি?”

নরেন্দ্র উত্তর দিলেন, “পরাভক্তি ও জ্ঞান।”

শ্রীরামকৃষ্ণ কোন মন্তব্য না করিয়া সংক্ষেপে শুধু বলিলেন, ‘আবার যা। কিন্তু কোন পরিবর্তন হইল না। তিনবার তিনি ইচ্ছামতো বর প্রার্থনা করিবার জন্য প্রেরিত হন, তিনবারই প্রত্যাবর্তন করিয়া তিনি একই উত্তর দেন। জগজ্জননীর সমীপে উপস্থিত হইবামাত্র তিনি আর সব বিস্মৃত হইয়া যান; কি প্রয়োজনে সেখানে আসিয়াছেন, সে কথা পর্যন্ত তাহার মনে পড়ে না। আমাদের মধ্যে কেহ কি সেই উচ্চ অবস্থায় কখনও উপনীত হইয়াছেন, যে অবস্থায় আমরা যাহাদের ভালবাসি, তাহাদের কল্যাণ কামনায় তন্ময়ভাবে প্রার্থনা করিতে গিয়া এরূপ আত্মবিস্মৃতি ঘটিয়াছে? তাহা হইলে ভেদবৈচিত্র্যময় আপেক্ষিক সাধারণ জগৎ হইতে এই অনুভূতির অনন্তগুণ পার্থক্য হয়তো আমরা কিছুটা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছি।

কথা কহিতে কহিতেই স্বামীজীর চিন্তা দেশকালের সীমা অতিক্রম করিত। চিন্তাটা কি অন্তরাত্মা অথবা আদি শক্তির বিকাশের অন্যতম রূপমাত্র? উহাতে যে শক্তি ব্যয়িত হয়, তাহা কি যিনি চিন্তা করেন, তাঁহার কল্যাণের দিক হইতে দেখিলে বৃথা নষ্ট হইল বলিয়া ধরিতে হইবে? প্রথমে কতকগুলি ঘটনার পরিধি, অতঃপর কতকগুলি চিন্তার পরিধি এবং সর্বশেষে সেই পরব্রহ্ম! যদি তাহা হয়, তাহা হইলে মহাপুরুষগণ কর্তৃক নিজ নিজ চিন্তা-সম্পদ অপরের সহিত একত্ৰ সম্ভোগের ন্যায় মহত্তর নিঃস্বার্থ কার্য আর কিছু নাই। তাঁহাদের কল্পনারাজ্যে প্রবেশের অর্থই মোক্ষদ্বার উন্মোচন; কারণ, ঐকালে শিষ্যের মানসে প্রত্যক্ষভাবে একটি বীজ উপ্ত হয়। যাহা মনোজগতে আত্ম-সাক্ষাৎকারে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত বিনষ্ট হয় না।

আমাদের গুরুর চিন্তা ছিল কতকগুলি আদর্শের সমষ্টিস্বরূপ, কিন্তু ঐ আদর্শগুলিকে তিনি এমন জ্বলন্ত, জীবন্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন যে, কেহ মনে করিতে পারিত না উহারা বস্তুতন্ত্র নিরপেক্ষ। ব্যক্তি ও জাতি উভয়কেই তিনি সমভাবে তাহাদের আদর্শের মাধ্যমে, তাহাদের নৈতিক উন্নতির মাপকাঠিতে বিচার করিতেন। অনেক সময় আমার মনে হইয়াছে, চিন্তাশীল ব্যক্তিগণকে দুই বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভাগ করা যাইতে পারে—স্বভাব অনুযায়ী তাঁহাদের এক শ্রেণী সব জিনিসকে দুইভাগে ভাগ করিতে চাহেন, অপরশ্রেণী তিনভাগে। স্বামীজীর সর্বদা তিনভাগে ভাগ করার দিকেই প্রবণতা দেখা যাইত। কোন গুণের দুইটি বিপরীত সীমা (যেমন শীত-উষ্ণ, ভাল-মন্দ) তো তিনি স্বীকার করিতেনই, অধিকন্তু উভয়ের মধ্যে যে সংযোগস্থল, তাহাও দেখিতে ভুলিতেন না, যেখানে উভয় দিক সমান হওয়ায়, কোন গুণই নাই, এরূপ বলা যাইতে পারে। ইহা কি প্রতিভারই একটি সর্বজনীন লক্ষণ, অথবা শুধু হিন্দুমনেরই একটি বিশেষত্ব?

কেহই বলিতে পারিত না, কোন্ বস্তুতে তিনি কি দেখিতে পাইবেন, কোন জিনিস তাহার হৃদয়গ্রাহী হইবে। অনেক সময় কথা অপেক্ষা চিন্তার উত্তর তিনি অধিকতর সহজে ও উত্তমরূপে দিতে পারিতেন। কি অদ্ভুত ভাব-তন্ময়তার মধ্যে তিনি অবস্থান করিতেন, তাহা এখানে-সেখানে, এক-আধটু আভাস-ইঙ্গিত হইতেই ধীরে ধীরে বুঝিতে পারা যাইত-সকল কথা ও চিন্তা তাহারই সহচরী মাত্র ছিল। কাশ্মীরে গ্রীষ্মের কয়মাস অতিবাহিত করিবার পর তবে তিনি আমাদের বলেন যে, তিনি সর্বদা জগন্মাতার মূর্তি প্রত্যক্ষ করিতেছেন। মা যেন মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া আমাদের মধ্যে চলাফেরা করিতেছেন। আবার জীবনের শেষ শীত-ঋতুতে তিনি শিষ্য স্বামী স্বরূপানন্দকে বলেন, কয়েকমাস ধরিয়া তিনি দেখিতেছেন যেন দুইখানি হাত তাহার হাত দুইটি ধরিয়া আছে। তীর্থযাত্রাকালে কেহ কেহ দেখিত, তিনি একান্তে মালা জপ করিতেছেন। গাড়িতে তাহার পিছন দিকে উপবিষ্ট থাকাকালীন কেহ কেহ শুনিতে পাইতেন, তিনি কোন একটি মন্ত্র বা স্তোত্র বার বার আবৃত্তি করিতেছেন। তাহার প্রত্যুষে উঠিয়া স্তোত্রাদি আবৃত্তির অর্থ আমরা বুঝিতে পারিলাম, যখন তিনি একদিন জনৈক কর্মীকে সংসার-সমরাঙ্গণে প্রেরণকালে বলেন, “শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস প্রত্যহ সকালে অন্য কোন কাজ করবার আগে নিজের ঘরে দুঘণ্টা ধরে ‘সচ্চিদানন্দ, ‘শিবোহ প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণ করতে করতে পায়চারি করে বেড়াতেন।” সর্বসমক্ষে এই ইঙ্গিত প্রদান ব্যতীত আমরা আর কিছু শুনিতে পাই নাই।

সুতরাং অবিরাম ভক্তিই ছিল তাহার অবিচ্ছিন্ন একাগ্রতা রক্ষা করিবার উপায়। তিনি সর্বক্ষণ যে-সব অতীন্দ্রিয় তত্ত্বের আভাস দিতেন, ধ্যানই তাহাদের মূল কারণ। তাহার কথাবার্তায় যোগদান ছিল, কোন ব্যক্তি কর্তৃক এক গভীর কূপে পাত্র ডুবাইয়া সেখান হইতে স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ ও শীতল বারি আনয়ন করা। তাহার চিন্তারাশির সৌন্দর্য অথবা গভীরতার ন্যায় উহাদের গুণ-বৈশিষ্ট্যও ইহাই প্রকাশ করিত যে, ঐ সকল চিন্তা আধ্যাত্মিক উপলব্ধিরূপ চিরতুষারাবৃত পর্বতশিখর হইতে প্রাপ্ত।

তাহার বক্তৃতাকালীন অনুভূতিসমূহের যে-সব গল্প তিনি করিতেন, তাহা হইতে এই তন্ময়তার কিছুটা আভাস পাওয়া যাইত। তিনি বলিতেন, পরদিন বক্তৃতায় তিনি যে-সব কথা বলিবেন, রাত্রে তাহার নিজের ঘরে কে যেন উচ্চৈঃস্বরে তাহা বলিয়া দিত এবং পরদিন তিনি দেখিতেন যে, বক্তৃতামঞ্চে উঠিয়া সেই কথাগুলিই তিনি আবৃত্তি করিতেছে। কখন কখনও তিনি দুইজনের কণ্ঠস্বর শ্রবণ করিতেন, তাহারা পরস্পরের সঙ্গে তর্ক বিতর্ক করিতেছে। আবার কখনও বোধ হইত ঐ কণ্ঠস্বর যেন বহুদুর হইতে আসিতেছে—যেন একটি দীর্ঘ পথের অপর প্রান্ত হইতে কেহ তাহার সহিত কথা কহিতেছে। অতঃপর ঐ স্বর যেন ক্রমশঃ নিকটবর্তী হইয়া অবশেষে চিৎকারে পরিণত হইত। তিনি বলিতেন, “ঠিক জেনে রেখো যে, পুরাকালে ঈশ্বরীয় বাণী (inspiration) বলতে লোকে যাই বুঝে থাকুক, তা নিশ্চয় এই ধরনের একটা কিছু হবে।”

কিন্তু এইসব ব্যাপারের মধ্যে তিনি অতিপ্রাকৃত কিছু দেখিতে পাইতেন না। উহা মনেরই স্বয়ংক্রিয় কার্যমাত্র; মন যখন চিন্তাপ্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট নিয়মে পরিপূর্ণভাবে আবিষ্ট হইয়া যায়, তখন ঐ চিন্তাগুলির প্রয়োগ ব্যাপারে আর কাহারও সাহায্যের অপেক্ষা করে না, আপনা হইতেই তাহাদের সংসাধন ঘটে। যে অবস্থাকে লক্ষ্য করিয়া হিন্দুগণ বলিয়া থাকেন, ‘শেষে মনই গুরু হইয়া দাঁড়ায়’—সম্ভবতঃ উহা সেই অনুভূতিরই একটা চরম আকার। ইহা হইতে আরও আভাস পাওয়া যায় যে, তাহার দুইটি শ্রেষ্ঠ ইন্দ্রিয় অর্থাৎ দর্শন ও শ্রবণ ইন্দ্রিয়দ্বয় প্রায় সমভাবে বিকাশলাভ করিলেও দর্শনেন্দ্রিয় অপেক্ষা শ্রবণেন্দ্রিয়ের প্রাধান্য কিঞ্চিৎ অধিক ছিল। তাহার শিষ্যদের মধ্যে একজন যেমন বলিয়াছিলেন, “নিজের মনের বিভিন্ন অবস্থা তিনি সম্পূর্ণ যথাযথভাবে বর্ণনা করতে পারতেন। কিন্তু ঐ সবল কণ্ঠস্বর স্বসংবেদ্য ব্যাপার ব্যতীত অন্য কিছু বলিয়া অনুমান করিবার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা তাহার ছিলনা।

আর একটি অনুভূতি সম্পর্কে, যাহা আমি স্বয়ং তাহার নিকট শুনিয়াছি, তাহাতে মনের ঐরূপ স্বতঃপ্রবৃত্তক্রিয়াই প্রকাশ পায়, হয়তো ততখানি বিকাশপ্রাপ্ত নয়। যখনই কোন অপবিত্র চিন্তা ও আকৃতি তাহার সম্মুখে আসিত, তিনি তৎক্ষণাৎ অনুভব করিতেন,যেন ভিতর হইতে মনের উপর একটা ধাক্কা আসিয়া পড়িত-ও তাহাকে চুর্ণ-বিচূর্ণ, অসাড় করিয়া দিত! অর্থাৎ-”না ওরকম হতে পারবে না।”

অপরের মধ্যে যে কাৰ্যগুলি প্রথমে মনে হয় সহজাতপ্রবৃত্তি দ্বারা সাধিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অতীন্দ্রিয় উপলব্ধিগত, উচ্চতর জ্ঞান দ্বারা নিয়মিত–তাহাদের তিনি অতি সহজে ধরিতে পারিতেন। যে বস্তু যথার্থ ঠিক, কেন তাহার কারণ কেহ নির্দেশ করিতে পারে না, অথচ যাহা সাধারণ মাপকাঠিতে বিচার করিলে ভুল বলিয়া বোধ হয়, এইরূপ স্থলে তিনি এক উচ্চতর শক্তির প্রেরণা দেখিতে পাইতেন। তাঁহার দৃষ্টিতে সকল অজ্ঞান সমান অন্ধকারময় বলিয়া বোধ হইত না।

নির্দিষ্ট কার্য শেষ হইলে স্বামীজী আবার তাহার নির্বিকল্প সমাধিরূপ আর্ষের আস্বাদন করিতে পারিবেন, গুরুদেবের এই ভবিষ্যদ্বাণী তাহার যৌবনের সঙ্গিগণ কদাপি বিস্মৃত হন নাই। কেহই জানিত না, কোন্ মুহূর্তে তাহার ঐকার্য সমাপ্ত হইবে, এবং চরম অনুভূতি যে আসন্ন, কেহ কেহ তাহা সন্দেহও করিয়াছিলেন। জীবনের শেষ বৎসরে কয়েকজন সঙ্গী অতীত দিনের আলোচনা করিতেছিলেন, ঐ প্রসঙ্গে সেই ভবিষ্যদ্বাণীর কথাও উঠিল, “নরেন যখনই জানতে পারবে, সে কে এবং কি, তখন তার শরীর রাখবে না।” তাহাদের মধ্যে একজন কতকটা হাস্যচ্ছলে তাহার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “স্বামীজী, তুমি কি এখন জানতে পেরেছ তুমি কে?” অপ্রত্যাশিত উত্তর আসিল, “হাঁ, এখন জেনেছি।” এস্ত হইয়া সকলে গম্ভীর ও নীরব হইয়া গেলেন। ঐ বিষয়ে তাহাকে আর কোন প্রশ্ন করিতে কাহারও সাহস হইল না। শেষ সময় যতই নিকটতর হইতেছিল, ধ্যান ও তপস্যা অধিকাংশ সময় তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিতেছিল। যে-সকল বস্তু তাহার অত্যন্ত প্রিয় ছিল,তাহারাও এখন আর তাহার চিত্তকে তেমন করিয়া আকৃষ্ট করিতে পারিত না। অবশেষে শেষ মুহূর্তে যখন তিনি মহাসমাধিতে মগ্ন হইয়া গেলেন, তখন ঐ বিরাট অতীন্দ্রিয় শক্তির ছটা যেন নিকটে ও দূরে যাহারা তাহাকে ভালবাসিতেন, তাহাদেরও স্পর্শ করিয়াছিল। একজন স্বপ্নে দেখিলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ যেন পুনরায় সেই রাত্রে দেহত্যাগ করিয়াছেন। প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে শুনিলেন, সংবাদবাহক দ্বারে অপেক্ষারত। তাহার অন্তরঙ্গ বন্ধুগণের অপর একজন দেখিয়াছিলেন, তিনি যেন উল্লাসের সহিত নিকটে আসিয়া বলিতেছেন, “শশী, শশী, শরীরটাকে থু থু করে ফেলে দিয়েছি।” আরও একজনকে সেই সন্ধ্যাকালে কে যেন জোর করিয়া ধ্যানের ঘরে লইয়া গিয়াছিল; তিনি দেখিলেন, তাহার আত্মা এক অসীম জ্যোতির সম্মুখীন, তাহার কণ্ঠ হইতে উচ্চারিত হইল ‘শিব গুরু’ এবং ঐ জ্যোতির সম্মুখে তিনি সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন।