সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ
উপসংহার

১৯০২ খ্রীস্টাব্দে বড়দিনের অব্যবহিত পূর্বে স্বামী বিবেকানন্দের কয়েকজন শিষ্য ঐ উৎসব পালন করিবার জন্য কটকের নিকটস্থ খণ্ডগিরিতে সমবেত হন। সন্ধ্যাকাল; আমরা একখানা জ্বলন্ত মোটা কাঠের গুড়ির চারিধারে ঘাসের উপর বসিয়াছিলাম। আমাদের একপার্শে পাহাড়গুলি উঠিয়াছে; পাহাড়ের গায়ে গুহা এবং খোদাই করা পাথরের মূর্তি, চারিদিকে বায়ুবিকশিত সুপ্ত অরণ্যানীর অস্পষ্ট শব্দ। অতীতে রামকৃষ্ণ সঙ্গে ‘ক্রিসমাস ইভ’ (খ্রীস্টজন্মদিনের পূর্ব নিশা) যেরূপভাবে উদ্যাপিত হইত, স্থির করিয়াছিলাম, আমরাও সেইভাবে যাপন করিব। সাধুদের মধ্যে একজনের হাতে ছিল মেষ তাড়াইবার মতো একগাছা লম্বা বাকানো ছড়ি, এবং আমাদের সঙ্গে ছিল সেন্ট লুক প্রণীত ঈশার জীবনী ও বাণী—যাহা হইতে দেবদূতগণের আবির্ভাব এবং জগতে প্রথম ‘গ্লোরিয়া’ (গৌরব গাথা) নামক স্তুতি পাঠের সঙ্গে সঙ্গে সেই দিব্য রজনীর কল্পনা করিতে হইবে।

কিন্তু গল্পটি পড়িতে পড়িতে আমরা তন্ময় হইয়া গেলাম; খ্রীস্ট জন্মের পূর্বরজনীর বর্ণনা পাঠেই শেষ হইল না; একের পর এক ঘটনা পড়া চলিতে লাগিল। এইরূপে সেই অদ্ভুত জীবনের সমগ্ৰ অংশ আলোচিত হইবার পর অবশেষে মৃত্যু এবং সর্বশেষে পুনরুত্থান। আমরা গ্রন্থের চতুর্বিংশ অধ্যায়ে উপনীত হইলাম, এবং এক এক করিয়া পড়া হইতে লাগিল।

কিন্তু গল্পটি আমাদের কানে এমন শুনাইতে লাগিল, যাহা পূর্বে আর কখনও হয় নাই। সন তারিখযুক্ত এবং সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত আইনসঙ্গত এক দলিলের পরিবর্তে—যাহার সত্যাসত্যের যাচাই নির্ভর করে বিভিন্ন অংশের প্রাঞ্জলতা এবং পূর্বাপর সঙ্গতি রক্ষার উপর—এখন মনে হইল ইন্দ্রিয়ের অগোচর এক কাহিনী লিপিবদ্ধ করিতে প্রয়াস পাইতেছে এমন কেহ যেন হাপাইতে হাপাইতে অর্ধ উচ্চারিত ভাষায় ঐ সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। পুনরুত্থানের বর্ণনাটি আর আমাদের মনে হইল না কোন ঘটনার বিবরণ, যাহা ত্যাজ। অথবা গ্রাহ্য বলিয়া বোধ হইতে পারে। চিরকালের নিমিত্ত উহা এক দিব্যানুভূতির বর্ণনারূপে স্থান লাভ করিল—যাহার ঐ অনুভুতি হইয়াছিল, তিনি উহাকে ভাষায় গ্রথিত করিতে যথাসাধ্য প্রয়াস পাইয়াছেন, কিন্তু সর্বদা সফলতা লাভ করেন নাই, এই পর্যন্ত। সমগ্র অধ্যায়টি অসম্পূর্ণ, আকারে-ইঙ্গিতে বলা—যেন কেহ আগ্রহের সহিত কেবল পাঠকের নয়, কতকটা স্বয়ং লেখকেরই বিশ্বাস উৎপাদনের চেষ্টা করিতেছে।

কারণ, আমরাও কি ঐরূপ এক পুনরাগমনের কিছু কিছু আভাস পাই নাই—পূর্বোক্ত ইতিহাসের সহিত যাহা মিলাইয়া দেখা যাইতে পারে? গুরুদেব স্বয়ং স্পষ্টভাবে এবং বিশেষ চিন্তাপূর্বক যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা সহসা মনে পড়িয়া গেল এবং উহার অর্থও বোধগম্য হইল—”জীবনে বহুবার আমি পরলোকগত আত্মাদের প্রত্যাবর্তন করতে দেখেছি; এবং একবার শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের পরবর্তী সপ্তাহে যে মূর্তি দর্শন কমি, তা ছিল জ্যোতির্ময়!” যিনি তাহাদের নিকট হইতে অন্তর্ধান করিয়াছেন, সেই প্রভুকে (ঈশাকে) আর একবার দর্শন করিবার জন্য শিষ্যগণের যে আকুল আকাঙক্ষা আমরা কেব তাহাই প্রত্যক্ষ অনুভব করিলাম না, পরন্তু বিরহকাতর শিষ্যগণকে সান্ত্বনাপ্রদান ও আশীর্বাদ করিবার উদ্দেশ্যে এই পৃথিবীতে পুনরাগমনের জন্য সেই অবতারপুরুষের যে গভীরতর আকাঙক্ষা—তাহারও প্রত্যক্ষ পরিচয় পাইলাম।

“পথপার্শ্বে যতক্ষণ তিনি আমাদের সহিত কথা বলিতেছিলেন, ততক্ষণ আমাদের হৃদয় কি তীব্র আনন্দে উল্লসিত হইয়া উঠিয়াছিল!” —আমাদের গুরুদেবের দেহত্যাগের অব্যবহিত পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে আমরাও কি কত মূহুর্তে বাইবেলে উক্ত ঐরূপ অপূর্ব অনুভূতির অজস্র প্রমাণ পাই নাই! সেই সব মুহূর্তে আমাদের প্রায় দৃঢ় ধারণা জন্মিত, তিনি সত্যই আমাদের সম্মুখে আবির্ভূত হইয়াছেন!

বাইবেলে বর্ণিত, “রুটিপ্রসাদ ভাগ করিয়া দিবার সময় তাহারা তাহাকে দেখিতে পাইয়াছিলেন”—উহাও সত্য। কখনও একটু আভাস, কখনও একটি কথা, কখনও বা এক ক্ষণস্থায়ী মধুর অনুভূতি, অথবা সহসা অন্তরে জ্ঞানালোকের চকিত প্রকাশ প্রথম কয়েক সপ্তাহে এই সকলের কোন একটি বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত হইবামাত্র আমাদের হৃৎপিণ্ড নাচিয়া উঠিত; মনে হইত ঐ বুঝি আকাঙ্ক্ষিত দর্শন মিলিয়াছে, ঐ তীব্র আকাকার মধ্যে সংশয় ও নিশ্চয়তা উভযই মিশিয়া থাকিত।

সে রাত্রে খণ্ডগিরিতে আমরা পুনরুত্থানের বর্ণনার সেই অংশগুলি ছাড়িয়া দিয়া গেলাম, কাহিনীর যে-সকল অংশ মনে হয়, অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিয়া অপর কেহ পরবর্তী কালে সংযোজন করিয়াছে। পুরাতনের উপর নূতন চুণকাম করা বিবরণের প্রাচীনতর অংশের উপরেই আমাদের চিত্ত নিবিষ্ট হইয়াছিল—সেই সাদাসিধা প্রাচীন বিবরণ, বার বার চকিতের ন্যায় প্রভুর দর্শন ও অদর্শনজনিত আনন্দ-বিষাদের করুণ চিত্রে যাহা পূর্ণ; যে বিবরণের মধ্যে দেখা যায় কতবার প্রভুর একাদশ শিষ্য একত্র হইয়া অস্ফুটস্বরে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করিতেছেন, “দেখ, দেখ, সত্যই প্রভু পুনরুত্থিত হয়েছেন,” এবং পরিশেষে তাঁহার আশীর্বাদ লাভ করিয়া সকলে পরস্পরের নিকট বিদায় গ্রহণ করিতেছেন।

পড়িতে পড়িতে মনে হইল, ঐ প্রাচীন কাহিনীতে ঈশার স্থূলদেহের পুনরাবির্ভাবের কথা আদৌ বিবৃত হয় নাই; উহা শুধু আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিতভাবে প্রভু ও শিষ্যগণের ইচ্ছাশক্তির সম্মিলন, জ্ঞান ও প্রেমের পুনরাবর্তন, প্রার্থনাকালে ক্ষণিক তন্ময়তালাভের বিবরণ। প্রভু তখন স্বীয় জ্যোতির্ময় স্বরূপ প্রাপ্ত হইয়া, অন্তরতম এক সূক্ষ্ম আকাশে বিরাজমান; ইন্দ্রিয়রাজ্যে আবদ্ধ জীব আমরা ঐ স্তরের কথা ধারণাও করিতে পারি না।

আবার ঐ-সকল ঘটনা এত স্কুল ছিল না যে, সকলে সমভাবে সেই অর্ধশ্রুত, অর্ধদৃষ্ট ক্ষণিক ইঙ্গিত সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। স্থূলদৃষ্টিতে উহা একেবারেই ধরা পড়ে নাই। এমনকি যাহারা অতি সূক্ষ্মদৃষ্টিসম্পন্ন তাহাদের নিকটেও ঐসব বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ ছিল; আগ্রহ সহকারে আলোচনাপূর্বক সমগ্ৰ অংশ ক্রমানুসারে একত্র করিয়া অনুধাবন এবং সযত্নে হৃদয়ে ধারণ করার প্রয়োজন ছিল। খ্রীস্টের শিষ্যগণেরমধ্যে যাহারা অতি অন্তরঙ্গ এবং সর্বজনস্বীকৃত, তাহাদের মধ্যেও কেহকেহ হয়তো উহা একেবারেই বিশ্বাস করেন নাই। তথাপি সেই রাত্রে খণ্ডগিরির গুহা ও অরণ্যের মধ্যে খ্রীস্টানদের এই পুনরুত্থান-কাহিনী পড়িতে পড়িতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হইল, ইহার মধ্য দিয়া একটি সত্য সূত্রের আভাস পাওয়া যাইতেছে; বিশ্বাস হইল, কোথাও কোন সময়ে এক মানবাত্মা প্রকৃতই এই ক্ষণিক উপলব্ধির স্মৃতিচিহ্ন রাখিয়া গিয়াছেন, এবং আমরা তাহাই অনুধাবন করিবার প্রয়াস পাইতেছি। এইরূপই আমরা বিশ্বাস করিলাম, এইরূপই অনুভব করিলাম, কারণ অতীব ক্ষণস্থায়ী হইলেও ঐ সময়ে ঐরূপ ধরনেরই এক অনুভূতি আমাদের নিকট প্রত্যক্ষ হইয়াছিল।

ঈশ্বর করুন, আমাদের গুরুদেবের এই জীবন্ত সত্তা, যাহা হইতে আমাদের বঞ্চিত করা স্বয়ং মৃত্যুরও সাধ্য ছিল না, তাহা যেন তাহার শিষ্য আমাদের নিকট মাত্র স্মরণীয় বস্তু নাহইয়া জ্বলন্ত জাগ্রতভাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সঙ্গে সঙ্গে থাকে।