মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

১৮৮২, ৫ই অগস্ট


ভক্তিযোগের রহস্য -- The Secret of Dualism


শ্রীরামকৃষ্ণ -- বিজ্ঞানী কেন ভক্তি লয়ে থাকে? এর উত্তর এই যে, আমি যায় না। সমাধি অবস্থায় যায় বটে, কিন্তু আবার এসে পড়ে। আর সাধারণ জীবের অহং যায় না। অশ্বত্থগাছ কেটে দাও, আবার তার পরদিন ফেঁক্‌ড়ি বেরিয়েছে। (সকলের হাস্য)


“জ্ঞানলাভের পরও আবার কোথা থেকে আমি এসে পড়ে! স্বপনে বাঘ দেখেছিলে, তারপর জাগলে, তবুও তোমার বুক দুড়দুড় করছে। জীবের আমি লয়েই তো যত যন্ত্রণা। গরু হাম্বা (আমি) হাম্বা করে, তাই তো অত যন্ত্রণা। লাঙলে জোড়ে, রোদবৃষ্টি গায়ের উপর দিয়ে যায়, আবার কসাইয়ে কাটে, চামড়ায় জুতো হয়, ঢোল হয় -- তখন খুব পেটে। (হাস্য)


“তবুও নিস্তার নাই। শেষে নাড়ীভুঁড়ি থেকে তাঁত তৈয়ার হয়। সেই তাঁতে ধুনুরীর যন্ত্র হয়। তখন আর আমি বলে না, তখন বলে তুঁহু তুঁহু (অর্থাৎ তুমি, তুমি)। যখন তুমি, তুমি বলে তখন নিস্তার। হে ইশ্বর, আমি দাস, তুমি প্রভু, আমি ছেলে, তুমি মা।


“রাম জিজ্ঞাসা করলেন, হনুমান, তুমি আমায় কিভাবে দেখ? হনুমান বললে, রাম! যখন আমি বলে আমার বোধ থাকে, তখন দেখি, তুমি পুর্ণ, আমি অংশ; তুমি প্রভু, আমি দাস। আর রাম! যখন তত্ত্বজ্ঞান হয়, তখন দেখি, তুমিই আমি, আমিই তুমি।


“সেব্য-সেবক ভাবই ভাল। আমি তো যাবার নয়। তবে থাক শালা দাস আমি হয়ে।”


[বিদ্যাসাগরকে শিক্ষা -- “আমি ও আমার” অজ্ঞান ]


“আমি ও আমার এই দুটি অজ্ঞান। আমার বাড়ি, আমার টাকা, আমার বিদ্যা, আমার এই সব ঐশ্বর্য -- এই যে-ভাব এটি অজ্ঞান থেকে হয়। হে ঈশ্বর, তুমি কর্তা আর এ-সব তোমার জিনিস -- বাড়ি, পরিবার, ছেলেপুলে, লোকজন, বন্ধু-বান্ধব -- এ-সব তোমার জিনিস -- এ-ভাব থেকে জ্ঞান হয়।


মৃত্যুকে সর্বদা মনে রাখা উচিত। মরবার পর কিছুই থাকবে না। এখানে কতকগুলি কর্ম করতে আসা। যেমন পাড়াগাঁয়ে বাড়ি -- কলকাতায় কর্ম করতে আসা। বড় মানুষের বাগানের সরকার, বাগান যদি কেউ দেখতে আসে, তা বলে এ-বাগানটি আমাদের, এ-পুকুর আমাদের পুকুর। কিন্তু কোন দোষ দেখে বাবু যদি ছাড়িয়ে দেয়, আর আমের সিন্দুকটা লয়ে যাবার যোগ্যতা থাকে না; দারোয়ানকে দিয়ে সিন্দুকটা পাঠিয়ে দেয়। (হাস্য)


“ভগবান দুই কথায় হাসেন। কবিরাজ যখন রোগীর মাকে বলে, মা! ভয় কি? আমি তোমার ছেলেকে ভাল করে দিব -- তখন একবার হাসেন; এই বলে হাসেন, আমি মারছি, আর এ কিনা বলে আমি বাঁচাব! কবিরাজ ভাবছে, আমি কর্তা, ঈশ্বর যে কর্তা -- এ-কথা ভুলে গেছে। তারপর যখন দুই ভাই দড়ি ফেলে জায়গা ভাগ করে, আর বলে এদিকটা আমার, ওদিকটা তোমার, তখন ঈশ্বর আর-একবার হাসেন, এই মনে করে হাসেন; আমার জগদ্‌ব্রহ্মাণ্ড, কিন্তু ওরা বলছে, এ-জায়গা আমার আর তোমার।”


[উপায় -- বিশ্বাস ও ভক্তি ]


“তাঁকে কি বিচার করে জানা যায়? তাঁর দাস হয়ে, তাঁর শরণাগত হয়ে তাঁকে ডাক।


(বিদ্যাসাগরের প্রতি সহাস্যে) -- “আচ্ছা, তোমার কি ভাব?”


বিদ্যাসাগর মৃদু মৃদু হাসিতেছেন। বলিতেছেন, “আচ্ছা সে কথা আপনাকে একলা-একলা একদিন বলব।” (সকলের হাস্য)


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্য) -- তাঁকে পাণ্ডিত্য দ্বারা বিচার করে জানা যায় না।


এই বলিয়া ঠাকুর প্রেমোন্মত্ত হইয়া গান ধরিলেন:


[ঈশ্বর অগম্য ও অপার ]


কে জানে কালী কেমন?
      ষড় দর্শনে না পায় দরশন ৷৷
মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন ।
কালী পদ্মবনে হংস-সনে, হংসীরূপে করে রমণ ৷৷
আত্মারামের আত্মা কালী প্রমাণ প্রণবের মতন ।
তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন, ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন ৷৷
মায়ের উদরে ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ড, প্রকাণ্ড তা জানো কেমন ।
মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম, অন্য কেবা জানে তেমন ৷৷
প্রসাদ ভাষে লোকে হাসে, সন্তরণে সিন্ধু-তরণ ।
আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না ধরবে শশী হয়ে বামন ৷৷


“দেখলে, কালীর উদরে ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ড প্রকাণ্ড তা জানো কেমন! আর বলছে, ষড় দর্শনে না পায় দরশন -- পাণ্ডিত্যে তাঁকে পাওয়া যায় না।”


[বিশ্বাসের জোর -- ঈশ্বরে বিশ্বাস ও মহাপাতক ]


“বিশ্বাস আর ভক্তি চাই -- বিশ্বাসের কত জোর শুনঃ একজন লঙ্কা থেকে সমুদ্র পার হবে, বিভীষণ বললে, এই জিনিসটি কাপড়ের খুঁটে বেঁধে লও। তাহলে নির্বিঘ্নে চলে যাবে; জলের উপর দিয়ে চলে যেতে পারবে। কিন্তু খুলে দেখো না; খুলে দেখতে গেলেই ডুবে যাবে। সে লোকটা সমুদ্রের উপর দিয়ে বেশ চলে যাচ্ছিল। বিশ্বাসের এমন জোর। খানিক পথ গিয়ে ভাবছে, বিভীষণ এমন কি জিজিস বেঁধে দিলেন যে, জলের উপর দিয়ে চলে যেতে পাচ্ছি? এই বলে কাপড়ের খুঁটটি খুলে দেখে, যে শুধু রাম নাম লেখা একটি পাতা রয়েছে। তখন সে ভাবলে, এঃ, এই জিনিস! ভাবাও যা, অমনি ডুবে যাওয়া।


“কথায় বলে হনুমানের রামনামে এত বিশ্বাস যে, বিশ্বাসের গুণে সাগর লঙ্ঘন করলে! কিন্তু স্বয়ং রামের সাগর বাঁধতে হল!


“যদি তাঁতে বিশ্বাস থাকে, তাহলে পাপই করুক, আর মহাপাতকই করুক, কিছুতেই ভয় নাই।”


এই বলিয়া ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তের ভাব আরোপ করিয়া ভাবে মাতোয়ারা হইয়া বিশ্বাসের মাহাত্ম্য গাহিতেছেন:


আমি দুর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি।
আখেরে এ-দীনে, না তারো কেমনে, জানা যাবে গো শঙ্করী।


পরবর্তী পরিচ্ছেদ