মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

১৮৮২, ২৮শে অক্টোবর


“যতো বাচো নিবর্তন্তে। অপ্রাপ্য মনসা সহ।”
                                                                                [তৈত্তিরীয় উপনিষদ্‌ -- ২‌।৪]

ব্রহ্মের স্বরূপ মুখে বলা যায় না


একজন ব্রাহ্মভক্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, ঈশ্বর সাকার না নিরাকার?


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তাঁর ইতি করা যায় না। তিনি নিরাকার আবার সাকার। ভক্তের জন্য তিনি সাকার। যারা জ্ঞানী অর্থাৎ জগৎকে যাদের স্বপ্নবৎ মনে হয়েছে, তাদের পক্ষে তিনি নিরাকার। ভক্ত জানে আমি একটি জিনিস, জগৎ একটি জিনিস। তাই ভক্তের কাছে ঈশ্বর ব্যক্তি (Personal God) হয়ে দেখা দেন। জ্ঞানী -- যেমন বেদান্তবাদী -- কেবল নেতি নেতি বিচার করে। বিচার করে জ্ঞানীর বোধে বোধ হয় যে, “আমি মিথ্যা, জগৎও মিথ্যা -- স্বপ্নবৎ।” জ্ঞানী ব্রহ্মকে বোধে বোধ করে। তিনি যে কি, মুখে বলতে পারে না।


“কিরকম জান? যেন সচ্চিদানন্দ-সমুদ্র -- কূল-কিনারা নাই -- ভক্তিহিমে স্থানে স্থানে জল বরফ হয়ে যায় -- বরফ আকারে জমাট বাঁধে। অর্থাৎ ভক্তের কাছে তিনি ব্যক্তভাবে, কখন কখন সাকার রূপ ধরে থাকেন। জ্ঞান-সূর্য উঠলে সে বরফ গলে যায়, তখন আর ঈশ্বরকে ব্যক্তি বলে বোধ হয় না। -- তাঁর রূপও দর্শন হয় না। কি তিনি মুখে বলা যায় না। কে বলবে? যিনি বলবেন, তিনিই নাই। তাঁর আমি আর খুঁজে পান না।


“বিচার করতে করতে আমি-টামি আর কিছুই থাকে না। পেঁয়াজের প্রথমে লাল খোসা তুমি ছাড়ালে, তারপর সাদা পুরু খোসা। এইরূপ বরাবর ছাড়াতে ছাড়াতে ভিতরে কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না।


“যেখানে নিজের আমি খুঁজে পাওয়া যায় না -- আর খুঁজেই বা কে? -- সেখানে ব্রহ্মের স্বরূপ বোধে বোধ কিরূপ হয়, কে বলবে!


“একটা লুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিছিল। সমুদ্রে যাই নেমেছে অমনি গলে মিশে গেল। তখন খবর কে দিবেক?


“পূর্ণ জ্ঞানের লক্ষণ -- পূর্ণ জ্ঞান হলে মানুষ চুপ হয়ে যায়। তখন আমিরূপ লুনের পুতুল সচ্চিদানন্দরূপ সাগরে গলে এক হয়ে যায়, আর একটুও ভেদবুদ্ধি থাকে না।


“বিচার করা যতক্ষণ না শেষ হয়, লোকে ফড়ফড় করে তর্ক করে। শেষ হলে চুপ হয়ে যায়। কলসী পূর্ণ হলে, কলসীর জল পুকুরের জল এক হলে আর শব্দ থাকে না। যতক্ষণ না কলসী পূর্ণ হয় ততক্ষণ শব্দ।


“আগেকার লোকে বলত, কালাপানিতে জাহাজ গেলে ফেরে না।”


[আমি কিন্তু যায় না ]


“আমি মলে ঘুচিবে জঞ্জাল (হাস্য)। হাজার বিচার কর, আমি যায় না। তোমার আমার পক্ষে ভক্ত আমি এ-অভিমান ভাল।


“ভক্তের পক্ষে সগুণ ব্রহ্ম। অর্থাৎ তিনি সগুণ -- একজন ব্যক্তি হয়ে, রূপ হয়ে দেখা দেন। তিনি প্রার্থনা শুনেন। তোমরা যে প্রার্থনা কর, তাঁকেই কর। তোমরা বেদান্তবাদী নও, জ্ঞানী নও -- তোমরা ভক্ত। সাকাররূপ মানো আর না মানো এসে যায় না। ঈশ্বর একজন ব্যক্তি বলে বোধ থাকলেই হল -- যে ব্যক্তি প্রার্থনা শুনেন, সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করেন, যে ব্যক্তি অনন্তশক্তি।


“ভক্তিপথেই তাঁকে সহজে পাওয়া যায়।”


পরবর্তী পরিচ্ছেদ