মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

ষড়্‌বিংশ পরিচ্ছেদ

১৮৮৩, ২৩শে সেপ্টম্বর


দক্ষিণেশ্বরে ভক্তসঙ্গে -- ২৩শে সেপ্টেম্বর, ১৮৮৩


শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। রাখাল, মাস্টার, রাম, হাজরা প্রভৃতি ভক্তগণ উপস্থিত আছেন। হাজরা মহাশয় বাহিরের বারান্দায় বসিয়া আছেন। আজ রবিবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ১৮৮৩, ভাদ্র কৃষ্ণা সপ্তমী।


নিত্যগোপাল, তারক প্রভৃতি ভক্তগণ রামের বাড়িতে থকেন। তিনি তাহাদের যত্ন করিয়া রাখিয়াছেন।


রাখাল মাঝে মাঝে শ্রীযুক্ত অধর সেনের বাড়িতে গিয়া থাকেন। নিত্যগোপাল সর্বদাই ভাবে বিভোর। তারকেরও অবস্থা অন্তর্মুখ; তিনি লোকর সঙ্গে আজকাল বেশি কথা কন না।


[শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবনা -- নরেন্দ্রের জন্য ]


ঠাকুর এইবার নরেন্দ্রের কথা কহিতেছেন ।


শ্রীরামকৃষ্ণ (একজন ভক্তের প্রতি) -- নরেন্দ্র তোমাকেও লাইক্‌ করে না। (মাস্টারের প্রতি) কই, অধরের বাড়ি নরেন্দ্র এল না কেন?


“একাধারে নরেন্দ্রের কত গুণ! গাইতে, বাজাতে, লেখাপড়ায়! সেদিন কাপ্তেনের গাড়িতে এখান থেকে যাচ্ছিল; কাপ্তেন অনেক করে বললে, তার কাছে বসতে। নরেন্দ্র ওধারে গিয়ে বসল; কাপ্তেনের দিকে ফিরে চেয়েও দেখলে না।”


[শাক্ত গৌরী পণ্ডিত ও শ্রীরামকৃষ্ণ ]


“শুধু পাণ্ডিত্যে কি হবে? সাধন-ভজন চাই। ইঁদেশের গৌরী -- পণ্ডিতও ছিল, সাধকও ছিল। শাক্ত-সাধক; মার ভাবে মাঝে মাঝে উন্মত্ত হয়ে যেত! মাঝে মাঝে বলত, হা রে রে, রে নিরালম্ব লম্বোদরজননি কং যামি শরণম্‌? তখন পণ্ডিতেরা কেঁচো হয়ে যেত। আমিও আবিষ্ট হয়ে যেতুম। আমার খাওয়া দেখে বলত, তুমি ভৈরবী নিয়ে সাধন করেছ?


“একজন কর্তাভজা নিরাকারের ব্যাখ্যা করলে। নিরাকার অর্থাৎ নীরের আকার! গৌরী তাই শুনে মহা রেগে গেল।


“প্রথম প্রথম একটু গোঁড়া সাক্ত ছিল; তুলসীপাতা দুটো কাঠি করে তুলত -- ছুঁত না (সকলের হাস্য) -- তারপর বাড়ি গেল; বাড়ি থেকে ফিরে এসে আর অমন করে নাই।


“আমি একটি তুলসীগাছ কালীঘরের সম্মুখে পুঁতেছিলাম; মরে গেল। পাঁঠা বলি যেখানে হয়, সেখানে নাকি হয় না!


“গৌরী বেশ সব ব্যাখ্যা করত। এ-ওই! ব্যাখ্যা করত -- এ শিষ্য! ওই তোমার ইষ্ট! আবার রাবণের দশমুণ্ড বলত, দশ ইন্দ্রিয়। তমোগুণে কুম্ভকর্ণ, রজোগুণে রাবণ, সত্ত্বগুণে বিভীষণ। তাই বিভীষণ রামকে লাভ করেছিল।”


[রাম, তারক ও নিত্যগোপাল ]


ঠাকুর মধ্যাহ্নে সেবার পর একটু বিশ্রাম করিতেছেন। কলিকাতা হইতে রাম, তারক (শিবানন্দ) প্রভৃতি ভক্তগণ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া তাঁহারা মেঝেতে বসিলেন। মাস্টারও মেঝেতে বসিয়া আছেন। রাম বলিতেছেন, “আমরা খোল বাজনা শিখিতেছি।”


শ্রীরামকৃষ্ণ (রামের প্রতি) -- নিত্যগোপাল বাজাতে শিখেছে?


রাম -- না, সে অমনি একটু সামান্য বাজাতে পারে।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তারক?


রাম -- সে অনেকটা পারবে।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তাহলে আর অত মুখ নিচু করে থাকবে না; একটা দিকে খুব মন দিলে ঈশ্বরের দিকে তত থাকে না।


রাম -- আমি মনে করি, আমি যে শিখছি, কেবল সংকীর্তনের জন্য।


শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি) -- তুমি নাকি গান শিখেছ?


মাস্টার (সহাস্যে) -- আজ্ঞে না; আমি উঁ আঁ করি!


[আমার ঠিক ভাব -- “আর কাজ নাই জ্ঞান-বিচারে, দে মা পাগল করে” ]


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তোমার ওটা অভ্যাস আছে? থাকে তো বল না। “আর কাজ নাই জ্ঞান-বিচারে, দে মা পাগল করে।”


“দেখ, ওইটে আমার ঠিক ভাব।”


[হাজরাকে উপদেশ -- সর্বভূতে ভালবাসা -- ঘৃণা ও নিন্দা ত্যাগ কর ]

 

হাজরা মহাশয় কারু কারু সম্বন্ধে ঘৃণা প্রকাশ করিতেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (রাম প্রভৃতি ভক্তদের প্রতি) -- ও-দেশে একজনের বাড়ি প্রায় সর্বদাই গিয়ে থাকতাম; তারা সমবয়সী; তারা সেদিন এসেছিল; এখানে দু-তিনদিন ছিল। তাদের মা ওইরূপ সকলকে ঘৃণা করত। শেষে সেই মার পায়ের খিল কিরকম করে খুলে গেল আর পা পচতে লাগল। ঘরে এত পচা গন্ধ হল যে, লোকে ঢুকতে পারত না।


“হাজরাকে তাই ওই কথা বলি, আর বলি, কারুকে নিন্দা করো না।”


বেলা প্রায় ৪টা হইল, ঠাকুর ক্রমে মুখপ্রক্ষালনাদি করিবার জন্য ঝাউতলায় গেলেন। ঠাকুরের ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব বারান্দায় সতরঞ্চি পাতা হইল। সেখানে ঠাকুর ঝাউতলা হইতে ফিরিয়া আসিয়া উপবেশন করিলেন। রাম প্রভৃতি উপস্থিত আছেন। শ্রীযুক্ত অধর সেন সুবর্ণবণিক, তাঁর বাড়িতে রাখাল অন্নগ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া রামবাবু কি বলিয়াছেন। অধর পরমভক্ত। সেই সব কথা হইতেছে।


সুবর্ণবণিকদের মধ্যে কারু কারু স্বভাব একজন ভক্ত রহস্যভাবে বর্ণনা করিতেছেন। আর ঠাকুর হাসিতেছেন। তাঁহারা রুটিঘন্ট ভালবাসেন, ব্যঞ্জন হউক আর না হউক। তাঁরা খুব সরেস চাল খান, আর জলযোগের মধ্যে ফল একটু খাওয়া চাই। তাঁরা বিলাতী আমড়া ভালবাসেন, ইত্যাদি। যদি বাড়িতে তত্ত্ব আসে, ইলিস মাছ, সন্দেশ -- সেই তত্ত্ব আবার ওদের কুটুম্ব বাড়িতে যাবে। সে কুটুম্ব আবার সেই তত্ত্ব তাদের কুটুম্ব বাড়িতে পাঠাবে। কাজে কাজেই একটা ইলিশ মাছ ১৫। ২০ ঘর ঘুরতে থাকে। মেয়েরা সব কাজ করে, তবে রান্নাটি উড়ে বামুনে রাঁধে, কারু বাড়ি ১ ঘন্টা, কারু বাড়ি ২ ঘন্টা, এইরকম। একটি উড়ে বামুন কখনও কখনও ৪। ৫ জায়গায় রাঁধে।


শ্রীরামকৃষ্ণ হাসিতেছেন, নিজে কোন মত প্রকাশ করিতেছেন না।


[ঠাকুর সমাধিস্থ -- তাঁহার জগন্মাতার সহিত কথা ]


সন্ধ্যা হইল। উঠানে উত্তর-পশ্চিম কোণে শ্রীরামকৃষ্ণ দণ্ডায়মান ও সমাধিস্থ।


অনেকক্ষণ পরে বাহ্য জগতে মন আসিল। ঠাকুরের কি আশ্চর্য অবস্থা! আজকাল প্রায়ই সমাধিস্থ। সামান্য উদ্দীপনে বাহ্যশূন্য হন; ভক্তেরা যখন আসেন, তখন একটু কথাবার্তা কন; নচেৎ সর্বদাই অন্তর্মুখ। পূজাজপাদি কর্ম আর করিতে পারেন না।


[শ্রীরামকৃষ্ণের কর্মত্যাগের অবস্থা ]


সমাধি ভঙ্গের পর দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়াই জগন্মাতার সহিত কথা কহিতেছেন। বলিতেছেন, “মা! পূজা গেল, জপ গেল, দেখো মা, যেন জড় করো না! সেব্য-সেবকভাবে রেখো। মা, যেন কথা কইতে পারি। যেন তোমার নাম করতে পারি, আর তোমার নামগুণকীর্তন করব, গান করব মা! আর শরীরে একটু বল দাও মা! যেন আপনি একটু চলতে পারি; যেখানে তোমার কথা হচ্ছে, যেখানে তোমার ভক্তরা আছে, সেই সব জায়গায় যেতে পারি।”


শ্রীরামকৃষ্ণ আজ সকালে কালীঘরে গিয়া জগন্মাতার শ্রীপাদপদ্মে পুষ্পাঞ্জলি দিয়াছেন। তিনি আবার জগন্মাতার সঙ্গে কথা কহিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেছেন। মা আজ সকালে তোমার চরণে দুটো ফুল দিলাম; ভাবলাম; বেশ হল, আবার (বাহ্য) পূজার দিকে মন যাচ্ছে; তবে মা, আবার এমন হল কেন? আবার জড়ের মতো কেন করে ফেলছ!


ভাদ্র কৃষ্ণা সপ্তমী। এখনও চন্দ্র উদয় হয় নাই। রজনী তমসাচ্ছন্ন। শ্রীরামকৃষ্ণ এখনও ভাবাবিষ্ট; সেই অবস্থাতেই নিজের ঘরের ভিতর ছোট খাটটিতে বসিলেন। আবার জগন্মাতার সঙ্গে কথা কহিতেছেন।


[ঈশানকে শিক্ষা -- কলিতে বেদমত চলে না -- মাতৃভাবে সাধন কর ]


এইবার বুঝি ভক্তদের বিষয়ে মাকে কি বলিতেছেন। ঈশান মুখোপাধ্যায়ের কথা বলিতেছেন। ঈশান বলিয়াছিলেন, আমি ভাটপাড়ায় গিয়া গায়ত্রীর পুরশ্চরণ করিব। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে বলিয়াছিলেন যে, কলিকালে বেদমত চলে না। জীবের অন্নগত প্রাণ, আয়ু কম, দেহবুদ্ধি, বিষয়বুদ্ধি একেবারে যায় না। তাই ঈশানকে মাতৃভাবে তন্ত্রমতে সাধন করিতে উপদেশ দিয়াছিলেন। আর ঈশানকে বলেছিলেন, যিনিই ব্রহ্ম, তিনিই মা, তিনিই আদ্যাশক্তি।


ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হইয়া বলিতেছেন, “আবার গায়ত্রীর পুরশ্চরণ! এ-চাল থেকে ও-চালে লাফ! কে ওকে ও-কথা বলে দিলে? আপনার মনে করছে!... আচ্ছা, একটু পুরশ্চরণ করবে।


(মাস্টারের প্রতি) -- “আচ্ছা আমার এ-সব কি বাইয়ে, না ভাবে?”


মাস্টার অবাক্‌ হইয়া দেখিতেছেন যে, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ জগন্মাতার সঙ্গে এইরূপ কথা কহিতেছেন। তিনি অবাক্‌ হইয়া দেখিতেছেন! ঈশ্বর আমাদের অতি নিকটে, বাহিরে আবার অন্তরে। অতি নিকটে না হলে শ্রীরামকৃষ্ণ চুপি চুপি তাঁর সঙ্গে কেমন করে কথা কচ্ছেন।



যস্ত্বাত্মরতিরেব স্যাৎ .. সন্তুষ্টস্তস্য কার্যং ন বিদ্যতে ৷৷         [গীতা, ৩।১৭]

তদ্বিষ্ণো পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ। দিবীব চক্ষুরাততম্‌ ৷৷         [ঋগ্বেদ, ১।২২।২০]

পরবর্তী পরিচ্ছেদ