মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

একাদশ পরিচ্ছেদ

১৮৮৩, ১৭ই ডিসেম্বর


জীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বরদর্শন -- উপায় প্রেম


পরদিন (১৭ই ডিসেম্বর) সোমবার, বেলা আটটা হইল। ঠাকুর সেই ঘরে বসিয়া আছেন। রাখাল, লাটু প্রভৃতি ভক্তেরাও আছেন। মণি মেঝেতে বসিয়া আছেন। শ্রীযুক্ত মধু ডাক্তারও আসিয়াছেন। তিনি ঠাকুরের কাছে সেই ছোট খাটটির উপরেই বসিয়া আছেন। মধু ডাক্তার প্রবীণ -- ঠাকুরের অসুখ হইলে প্রায় তিনি আসিয়া দেখেন। বড় রসিক লোক।


মণি ঘরে প্রবেশ করিয়া প্রণামনন্তর উপবেশন করিলেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (মণির প্রতি) -- কথাটা এই -- সচ্চিদানন্দ প্রেম।


[ঠাকুরের সীতামূর্তি-দর্শন -- গৌরী পণ্ডিতের কথা ]


“কিরূপ প্রেম? ঈশ্বরকে কিরূপ ভালবাসতে হবে? গৌরী বলত রামকে জানতে গেলে সীতার মতো হতে হয়; ভগবানকে জানতে ভগবতীর মতো হতে হয়, -- ভগবতী যেমন শিবের জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন সেইরূপ তপস্যা করতে হয়; পুরুষকে জানতে গেলে প্রকৃতভাবে আশ্রয় করতে হয় -- সখীভাব, দাসীভাব, মাতৃভাব।


“আমি সীতামূর্তি দর্শন করেছিলাম। দেখলাম সব মনটা রামেতেই রয়েছে। যোনি, হাত, পা, বসন-ভূষণ কিছুতেই দৃষ্টি নাই। যেন জীবনটা রামময় -- রাম না থাকলে, রামকে না পেলে, প্রাণে বাঁচবে না!”


মণি -- আজ্ঞা হাঁ, -- যেন পাগলিনী।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- উন্মাদিনী! -- ইয়া। ঈশ্বরকে লাভ করতে গেলে পাগল হতে হয়।


“কামিনী-কাঞ্চনে মন থাকলে হয় না। কামিনীর সঙ্গে রমণ, -- তাতে কি সুখ! ঈশ্বরদর্শন হলে রমণসুখের কোটিগুণ আনন্দ হয়। গৌরী বলত, মহাভাব হলে শরীরের সব ছিদ্র -- লোমকূপ পর্যন্ত -- মহাযোনি হয়ে যায়। এক-একটি ছিদ্রে আত্মার সহিত রমণসুখ বোধ হয়।”


[গুরু পূর্ণজ্ঞানী হবেন ]


শ্রীরামকৃষ্ণ -- ব্যাকুল হয়ে তাঁকে ডাকতে হয়। গুরুর মুখে শুনে নিতে হয় -- কি করলে তাঁকে পাওয়া যায়।


“গুরু নিজে পূর্ণজ্ঞানী হলে তবে পথ দেখিয়ে দিতে পারে।


“পূর্ণজ্ঞান হলে বাসনা যায়, -- পাঁচ বছরের বালকের স্বভাব হয়। দত্তাত্রেয় আর জড়ভরত -- এদের বালকের স্বভাব হয়েছিল।”


মণি -- আজ্ঞে, এদের খপর আছে; -- আরও এদের মতো কত জ্ঞানী লোক হয়ে গেছে।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- হাঁ! জ্ঞানীর সব বাসনা যায়, -- যা থাকে তাতে কোন হানি হয় না। পরশমণিকে ছুঁলে তরবার সোনা হয়ে যায়, -- তখন আর সে তরবারে হিংসার কাজ হয় না। সেইরূপ জ্ঞানীর কাম-ক্রোধের কেবল ভঙ্গীটুকু থাকে। নামমাত্র। তাতে কোন অনিষ্ট হয় না।


মণি -- আপনি যেমন বলেন, জ্ঞানী তিনগুণের অতীত হয়। সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ -- কোন গুণেরই বশ নন। এরা তিনজনেই ডাকাত।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- ওইগুলি ধারণা করা চাই।


মণি -- পূর্ণজ্ঞানী পৃথিবীতে বোধ হয় তিন-চারজনের বেশি নাই।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- কেন, পশ্চিমের মঠে অনেক সাধু-সন্ন্যাসী দেখা যায়।


মণি -- আজ্ঞা, সে সন্ন্যাসী আমিও হতে পারি!


শ্রীরামকৃষ্ণ এই কথায় কিয়ৎক্ষণ মণিকে এক দৃষ্টে দেখিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (মণির প্রতি) -- কি, সব ছেড়ে?


মণি -- মায়া না গেলে কি হবে? মায়াকে যদি জয় না করতে পারে শুধু সন্ন্যাসী হয়ে কি হবে?


সকলেই কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া আছেন।


[ত্রিগুণাতীত ভক্ত যেমন বালক ]


মণি -- আজ্ঞা, ত্রিগুণাতীত ভক্তি কাকে বলে?


শ্রীরামকৃষ্ণ -- সে ভক্তি হলে সব চিন্ময় দেখে। চিন্ময় শ্যাম। চিন্ময় ধাম। ভক্তও চিন্ময়। সব চিন্ময়। এ-ভক্তি কম লোকের হয়।


ডাক্তার মধু (সহাস্যে) -- ত্রিগুণাতীত ভক্তি -- অর্থাৎ ভক্ত কোন গুণের বশীভূত নয়।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- ইয়া! যেমন পাঁচ বছরের বালক -- কোন গুণের বশ নয়।


মধ্যাহ্নে সেবার পর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ একটু বিশ্রাম করিতেছেন। শ্রীযুক্ত মণিলাল মল্লিক আসিয়া প্রণাম করিলেন ও মেঝেতে আসন গ্রহণ করিলেন।


মণিও মেঝেতে বসিয়া আছেন। ঠাকুর শুইয়া শুইয়া মণি মল্লিকের সঙ্গে মাঝে মাঝে একটি একটি কথা কহিতেছেন।


মণি মল্লিক -- আপনি কেশব সেনকে দেখতে গিছলেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- হাঁ -- এখন কেমন আছেন?


মণি মল্লিক -- কিছু সারেন নাই।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- দেখলাম বড় রাজসিক, -- অনেকক্ষণ বসিয়েছিল, -- তারপর দেখা হল।


ঠাকুর উঠিয়া বসিলেন ও ভক্তদের সহিত কথা কহিতেছেন।


[শ্রীমুখ-কথিত চরিতামৃত -- ঠাকুর “রাম রাম” করিয়া পাগল ]


শ্রীরামকৃষ্ণ (মণির প্রতি) -- আমি রাম রাম করে পাগল হয়েছিলাম। সন্ন্যাসীর ঠাকুর রামলালকে লয়ে লয়ে বেড়াতাম। তাকে নাওয়াতাম, খাওয়াতাম, শোয়াতাম। যেখানে যাব, -- সঙ্গে করে লয়ে যেতাম। “রামলালা রামলালা” করে পাগল হয়ে গেলাম।


পরবর্তী পরিচ্ছেদ