মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ

১৮৮৪, ২রা মার্চ


দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে নরেন্দ্রাদি ভক্তসঙ্গে


ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কালীমন্দিরে সেই পূর্বপরিচিত ঘরে ছোট খাটটিতে বসিয়া গান শুনিতেছেন। ব্রাহ্মসমাজের শ্রীযুক্ত ত্রৈলোক্য সান্যাল গান করিতেছেন।


আজ রবিবার, ২০শে ফাল্গুন; শুক্লা পঞ্চমী তিথী; ১২৯০ সাল। ২রা মার্চ, ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দ। মেঝেতে ভক্তেরা বসিয়া আছেন ও গান শুনিতেছেন। নরেন্দ্র, সুরেন্দ্র (মিত্র), মাস্টার, ত্রৈলোক্য প্রভৃতি অনেকে বসিয়া আছেন।


শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রের পিতা বড় আদালতে উকিল ছিলেন। তাঁহার পরলোক প্রাপ্তি হওয়াতে, পরিবারবর্গ বড়ই কষ্টে পড়িয়াছেন। এমন কি মাঝে মাঝে খাইবার কিছু থাকে না। নরেন্দ্র এই সকল ভাবনায় অতি কষ্টে আছেন।


ঠাকুরের শরীর, হাত ভাঙা অবধি, এখনও ভাল হয় নাই। হাতে অনেক দিন বাড়্‌ (Bar) দিয়া রাখা হইয়াছিল।


ত্রৈলোক্য মার গান গাইতেছেন। গানে বলিতেছেন, মা তোমার কোলে নিয়ে অঞ্চল ডেকে আমায় বুকে করে রাখ:


তোর কোলে লুকায়ে থাকি (মা)।
চেয়ে চেয়ে মুখপানে মা মা মা বলে ডাকি।
ডুবে চিদানন্দরসে, মহাযোগ নিদ্রাবশে,
দেখি রূপ অনিমেষে, নয়নে নয়নে রাখি।
দেখে শুনে ভয় করে প্রাণ কেঁদে ওঠে ডরে,
রাখ আমায় বুকে ধরে, স্নেহের অঞ্চলে ঢাকি (মা)।


ঠাকুর শুনিতে শুনিতে প্রেমাশ্রু বিসর্জন করিতেছেন। আর বলিতেছেন, আহা! কি ভাব!


ত্রৈলোক্য আবার গাহিতেছেন:


(লোফা)


লজ্জা নিবারণ হরি আমার।
(দেখো দেখো হে -- যেন -- মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়)।
ভকতের মান, ওহে ভগবান, তুমি বিনা কে রাখিবে আর।
তুমি প্রাণপতি প্রাণাধার, আমি চিরক্রীত দাস তোমার!
          (দেখো)।


(বড় দশকশী)


তুয়া পদ সার করি, জাতি কুল পরিহরি, লাজ ভয়ে দিনু জলাঞ্জলি
(এখন কোথা বা যাই হে পথের পথিক হয়ে);
আব হাম তোর লাগি, হইনু কলঙ্কভাগী,
গঞ্জে লোকে কত মন্দ বলি।     (কত নিন্দা করে হে)
(তোমায় ভালবাসি বলে)     (ঘরে পরে গঞ্জনা হে)

সরম ভরম মোর, অবহি সকল তোর, রাখ বা না রাখ তব দায়
(দাসের মানে তোমারি মান হরি),

তুমি হে হৃদয় স্বামী, তব মানে মানী আমি, কর নাথ যেঁউ তুহে ভায়।


(ছোট দশকশী)


ঘরের বাহির করি, মজাইলে যদি হরি, দেও তবে শ্রীচরণে স্থান,
(চির দিনের মতো) অনুদিন প্রেমবধু, পিয়াও পরাণ বঁধু,
              প্রেমদাসে করে পরিত্রাণ।


ঠাকুর আবার প্রেমাশ্রু বির্সজন করিতে করিতে মেঝেতে আসিয়া বসিলেন। আর রামপ্রসাদের ভাবে গাহিতেছেন --


যশ অপযশ কুরস সুরস সকল রস তোমারি।
(ওমা) রসে থেকে রসভঙ্গ কেন রসেশ্বরী ৷৷


ঠাকুর ত্রৈলোক্যকে বলিতেছেন, আহা! তোমার কি গান! তোমার গান ঠিক ঠিক। যে সমুদ্রে গিয়েছিল সেই সমুদ্রের জল এনে দেখায়।


ত্রৈলোক্য আবার গান গাহিতেছেন:


(হরি) আপনি নাচ, আপনি গাও, আপনি বাজাও তালে তালে,
মানুষ তো সাক্ষীগোপাল মিছে আমার আমার বলে।
ছায়াবাজির পুতুল যেমন, জীবের জীবন তেমন,
দেবতা হতে পারে, যদি তোমার পথে চলে।
দেহ যন্ত্রে তুমি যন্ত্রী, আত্মরথে তুমি রথী,
জীব কেবল পাপের ভাগী, নিজ স্বাধীনতার ফলে।
সর্বমূলাধার তুমি, প্রাণের প্রাণ হৃদয় স্বামী,
অসাধুকে সাধু কর, তুমি নিজ পুণ্যবলে।


[The Absolute identical with the phenomenal world -- নিত্যলীলা যোগ -- পূর্ণজ্ঞান বা বিজ্ঞান ]


গান সমাপ্ত হইল। ঠাকুর এইবার কথা কহিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (ত্রৈলোক্য ও অন্যান্য ভক্তদের প্রতি) -- হরিই সেব্য, হরিই সেবক -- এই ভাবটি পুর্ণজ্ঞানের লক্ষণ। প্রথমে নেতি নেতি করে হরিই সত্য আর সব মিথ্যা বলে বোধ হয়। তারপরে সেই দেখে যে, হরিই এই সব হয়েছেন। অনুলোম হয়ে তারপর বিলোম। এইটি পুরাণের মত। যেমন একটি বেলের ভিতর শাঁস, বীজ আর খোলা আছে। খোলা বীজ ফেলে দিলে শাঁসটুকু পাওয়া যায়, কিন্তু বেলটি কত ওজনে ছিল জানতে গেলে, খোলা বীজ বাদ দিলে চলবে না। তাই জীবজগৎকে ছেড়ে প্রথমে সচ্চিদানন্দে পৌঁছাতে হয়; তারপর সচ্চিদানন্দকে লাভ করে দেখে যে তিনিই এই সব জীব, জগৎ হয়েছেন। শাঁস যে বস্তুর, বীজ ও খোলা সেই বস্তু থেকেই হয়েছে -- যেমন ঘোলেরই মাখন, মাখনেরই ঘোল।


“তবে কেউ বলতে পারে, সচ্চিদানন্দ এত শক্ত হল কেমন করে। এই জগৎ টিপলে খুব কঠিন বোধ হয়। তার উত্তর এই, যে শোণিত শুক্র এত তরল জিনিস, -- কিন্তু তাই থেকে এত বড় জীব -- মানুষ তৈয়ারী হচ্ছে! তাঁ হতে সবই হতে পারে।


“একবার অখণ্ড সচ্চিদানন্দে পৌঁছে তারপর নেমে এসে এই সব দেখা।”


[সংসার ঈশ্বর ছাড়া নয় -- যোগী ও ভক্তদের প্রভেদ ]


“তিনিই সব হয়েছেন। সংসার কিছু তিনি ছাড়া নয়। গুরুর কাছে বেদ পড়ে রামচন্দ্রের বৈরাগ্য হল। তিনি বললেন, সংসার যদি স্বপ্নবৎ তবে সংসার ত্যাগ করাই ভাল। দশরথের বড় ভয় হল। তিনি রামকে বুঝাতে গুরু বশিষ্ঠকে পাঠিয়ে দিলেন। বশিষ্ঠ বললেন, রাম, তুমি সংসার ত্যাগ করবে কেন বলছ? তুমি আমায় বুঝিয়ে দাও যে, সংসার ঈশ্বর ছাড়া। যদি তুমি বুঝিয়ে দিতে পার ঈশ্বর থেকে সংসার হয় নাই তাহলে তুমি ত্যাগ করতে পার। রাম তখন চুপ করে রইলেন, -- কোনও উত্তর দিতে পারলেন না।


“সব তত্ত্ব শেষে আকাশতত্ত্বে লয় হয়। আবার সৃষ্টির সময় আকাশতত্ত্ব থেকে মহৎতত্ত্ব, মহৎতত্ত্ব থেকে অহংকার, এই সব ক্রমে ক্রমে সৃষ্টি হয়েছে। অনুলোম, বিলোম। ভক্ত সবই লয়। ভক্ত অখণ্ড সচ্চিদানন্দকেও লয়, আবার জীবজগৎকেও লয়।


“যোগীর পথ কিন্তু আলাদা। সে পরমাত্মাতে পৌঁছে আর ফেরে না। সেই পরমাত্মার সঙ্গে যোগ হয়ে যায়।


“একটার ভিতরে যে ঈশ্বরকে দেখে তার নাম খণ্ডজ্ঞানী -- সে মনে করে যে, তার ওদিকে আর তিনি নাই!


“ভক্ত তিন শ্রেণীর। অধম ভক্ত বলে ওই ঈশ্বর, অর্থাৎ আকাশের দিকে সে দেখিয়ে দেয়। মধ্যম ভক্ত বলে যে, তিনি হৃদয়ের মধ্যে অন্তর্যামীরূপে আছেন। আর উত্তম ভক্ত বলে যে, তিনি এই সব হয়েছেন, -- যা কিছু দেখছি সবই তাঁর এক-একটি রূপ। নরেন্দ্র আগে ঠাট্টা করত আর বলত, তিনিই সব হয়েছেন, -- তাহলে ঈশ্বর ঘটি, ঈশ্বর বাটি।” (সকলের হাস্য)


[ঈশ্বরদর্শনে সংশয় যায় -- কর্মত্যাগ হয় -- বিরাট শিব ]


“তাঁকে কিন্তু দর্শন করলে সব সংশয় চলে যায়। শুনা এক, দেখা এক। শুনলে ষোলা আনা বিশ্বাস হয় না। সাক্ষাৎকার হলে আর বিশ্বাসের কিছু বাকী থাকে না।


“ঈশ্বরদর্শন করলে কর্মত্যাগ হয়। আমার ওই রকমে পূজা উঠে গেল। কালীঘরে পূজা করতাম। হঠাৎ দেখিয়ে দিলে, সব চিন্ময়, কোশাকুশি, বেদী, ঘরের চৌকাঠ -- সব চিন্ময়! মানুষ, জীব, জন্তু, সব চিন্ময়। তখন উন্মত্তের ন্যায় চতুর্দিকে পুষ্প বর্ষণ করতে লাগলাম! -- যা দেখি তাই পূজা করি!


“একদিন পূজার সময় শিবের মাথায় বজ্র দিচ্ছি এমন সময় দেখিয়ে দিলে, এই বিরাট মূর্তিই শিব। তখন শিব গড়ে পূজা বন্ধ হল। ফুল তুলছি হঠাৎ দেখিয়ে দিলে যে ফুলের গাছগুলি যেন এক-একটি ফুলের তোড়া।”


[কাব্যরস ও ঈশ্বরদর্শনের প্রভেদ -- “ন কবিতাং বা জগদীশ” ]


ত্রৈলোক্য -- আহা, ঈশ্বরের রচনা কি সুন্দর!


শ্রীরামকৃষ্ণ -- না গো, ঠিক দপ্‌ করে দেখিয়ে দিলে! -- হিসেব করে নয়। দেখিয়ে দিলে যেন এক-একটি ফুল গাছ এক-একটি তোড়া, -- সেই বিরাট মূর্তির উপর শোভা করছে। সেই দিন থেকে ফুল তোলা বন্ধ হয়ে গেল। মানুষকেও আমি ঠিক সেইরূপ দেখি। তিনিই যেন মানুষ-শরীরটাকে লয়ে হেলে-দুলে বেড়াচ্ছেন, -- যেমন ঢেউয়ের উপর একটা বালিশ ভাসছে, -- বালিশটাকে এদিক ওদিক নড়তে নড়তে চলে যাচ্ছে, কিন্তু ঢেউ লেগে একবার উঁচু হচ্ছে আবার ঢেউয়ে সঙ্গে নিচে এসে পড়ছে।


[ঠাকুরের শরীরধারণ কেন -- ঠাকুরের সাধ ]


“শরীরটা দুদিনের জন্য, তিনিই সত্য, শরীর এই আছে, এই নাই। অনেকদিন হল যখন পেটের ব্যামোতে বড় ভুগছি, হৃদে বললে -- মাকে একবার বল না, -- যাতে আরাম হয়। আমার রোগের জন্য বলতে লজ্জা হল। বললুম, মা সুসাইটিতে (Asiatic Soceity) মানুষের হাড় (Skeleton) দেখেছিলাম, তার দিয়ে জুড়ে জুড়ে মানুষের আকৃতি, মা! এরকম করে শরীরটা একটু শক্ত করে দাও, তাহলে তোমার নামগুণকীর্তন করব।


“বাঁচবার ইচ্ছা কেন? রাবণ বধের পর রাম লক্ষ্মণ লঙ্কায় প্রবেশ করলেন, রাবণের বাটীতে গিয়ে দেখেন, রাবণের মা নিকষা পালিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্মণ আশ্চর্য হয়ে বললেন, রাম, নিকষার সবংশ নাশ হল তবু প্রাণের উপর এত টান। নিকষাকে কাছে ডাকিয়ে রাম বললেন, তোমার ভয় নাই, তুমি কেন পালাচ্ছিলে? নিকষা বললে, রাম! আমি সেজন্য পালাই নাই -- বেঁচে ছিলাম বলে তোমার এত লীলা দেখতে পেলাম -- যদি আরও বাঁচি তো আরও কত লীলা দেখতে পাব! তাই বাঁচবার সাধ।


“বাসনা না থাকলে শরীর ধারণ হয় না।


(সহাস্যে) “আমার একটি-আধটি সাধ ছিল। বলেছিলাম মা, কামিনীকাঞ্চনত্যাগীর সঙ্গ দাও; আর বলেছিলাম, তোর জ্ঞানী ও ভক্তদের সঙ্গ করব, তাই একটু শক্তি দে যাতে হাঁটতে পারি, -- এখানে ওখানে যেতে পারি। তা হাঁটবার শক্তি দিলে না কিন্তু!”


ত্রৈলোক্য (সহাস্যে) -- সাধ কি মিটেছে?


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- একটু বাকী আছে। (সকলের হাস্য)


“শরীরটা দুদিনের জন্য। হাত যখন ভেঙে গেল, মাকে বললুম, মা বড় লাগছে। তখন দেখিয়ে দিলে গাড়ি আর তার ইঞ্জিনিয়ার। গাড়ির একটা-আধটা ইস্ক্রু আলগা হয়ে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার যেরূপ চালাচ্ছে গাড়ি সেইরূপ চলছে। নিজের কোন ক্ষমতা নাই।


“তবে দেহের যত্ন করি কেন? ঈশ্বরকে নিয়ে সম্ভোগ করব; তাঁর নাম গুণ গাইব, তাঁর জ্ঞানী, ভক্ত দেখে দেখে বেড়াব।”


পরবর্তী পরিচ্ছেদ