মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ

১৮৮৪, ৯ই মার্চ


মণিলাল মল্লিক পুরাতন ব্রহ্মজ্ঞানী। ভবনাথ, রাখাল, মাস্টার মাঝে মাঝে ব্রাহ্মসমাজে যাইতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ওঁকারের ব্যাখ্যা ও ঠিক ব্রহ্মজ্ঞান, ব্রহ্মদর্শনের পর অবস্থা বর্ণনা করিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (ভক্তদের প্রতি) -- শব্দ ব্রহ্ম, ঋষি মুনিরা ওই শব্দ লাভের জন্য তপস্যা করতেন। সিদ্ধ হলে শুনতে পায়, নাভি থেকে ওই শব্দ আপনি উঠছে -- অনাহত শব্দ।


“একমতে, শুধু শব্দ শুনলে কি হবে? দূর থেকে শব্দ-কল্লোল শোনা যায়। সেই শব্দ-কল্লোল ধরে গেলে সমুদ্রে পৌঁছানো যায়। যে কালে কল্লোল আছে সে কালে সমুদ্রও আছে। অনাহত ধ্বনি ধরে ধরে গেলে তার প্রতিপাদ্য ব্রহ্ম তাঁর কাছে পোঁছানো যায়। তাঁকেই পরমপদ বলেছে। আমি থাকতে ওরূপ দর্শন হয় না। যেখানে আমিও নাই, তুমিও নাই, একও নাই, অনেকও নাই; সেইখানেই এই দর্শন।”


[জীবাত্মা ও পরমাত্মার যোগ ও সমাধি ]


“মনে কর সূর্য আর দশটি জলপূর্ণ ঘট রয়েছে, প্রত্যেক ঘটে সূর্যের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। প্রথমে দেখা যাচ্ছে সূর্য ও দশটি প্রতিবিম্ব সূর্য। যদি ৯টা ঘট ভেঙে দেওয়া যায়, তাহলে বাকী থাকে একটি সূর্য ও একটি প্রতিবিম্ব সূর্য। এক-একটি ঘট যেন এক-একটি জীব। প্রতিবিম্ব সূর্য ধরে ধরে সত্য সূর্যের কাছে যাওয়া যায়। জীবাত্মা থেকে পরমাত্মায় পোঁছানো যায়। জীব (জীবাত্মা) যদি সাধন-ভজন করে তাহলে পরমাত্মা দর্শন করতে পারে। শেষের ঘটটি ভেঙে দিলে কি আছে মুখে বলা যায় না।


“জীব প্রথমে অজ্ঞান হয়ে থাকে। ঈশ্বর বোধ নাই, নানা জিনিস বোধ -- অনেক জিনিস বোধ। যখন জ্ঞান হয় তখন তার বোধ হয় যে ঈশ্বর সর্বভূতে আছেন। যেমন পায়ে কাঁটা ফুটেছে, আর-একটি কাঁটা জোগাড় করে এনে ওই কাঁটাটি তোলা। অর্থাৎ জ্ঞান কাঁটা দ্বারা অজ্ঞান কাঁটা তুলে ফেলা।


“আবার বিজ্ঞান হলে দুই কাঁটাই ফেলে দেওয়া -- অজ্ঞান কাঁটা এবং জ্ঞান কাঁটা। তখন ঈশ্বরের সঙ্গে নিশিদিন কথা, আলাপ হচ্ছে -- শুধু দর্শন নয়।


“যে দুধের কথা কেবল শুনেছে সে অজ্ঞান; যে দুধ দেখেছে তার জ্ঞান হয়েছে। যে দুধ খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে তার বিজ্ঞান হয়েছে।”


এইবার ভক্তদের বুঝি নিজের অবস্থা বুঝাইয়া দিতেছেন। বিজ্ঞানীর অবস্থা বর্ণনা করিয়া বুঝি নিজের অবস্থা বলিতেছেন।


[শ্রীরামকৃষ্ণের অবস্থা -- শ্রীমুখ-কথিত -- ঈশ্বরদর্শনের পর অবস্থা ]


শ্রীরামকৃষ্ণ (ভক্তদের প্রতি) -- জ্ঞানী সাধু আর বিজ্ঞানী সাধু প্রভেদ আছে। জ্ঞানী সাধুর বসবার ভঙ্গী আলাদা। গোঁপে চাড়া দিয়ে বসে। কেউ এলে বলে, “কেমন বাবু, তোমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে?”


“যে ঈশ্বরকে সর্বদা দর্শন করছে, তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছে (বিজ্ঞানী) তার স্বভাব আলাদা -- কখনও জড়বৎ, কখনও পিশচবৎ, কখনও বালকবৎ, কখনও উন্মাদবৎ।


“কখনও সমাধিস্থ হয়ে বাহ্যশূন্য হয় -- জড়বৎ হয়ে যায়।


“ব্রহ্মময় দেখে তাই পিশাচবৎ; শুচি-অশুচি বোধ থাকে না। হয়তো বাহ্যে করতে করতে কুল খাচ্ছে, বালকের মতো। স্বপ্নদোষের পর অশুদ্ধি বোধ করে না -- শুক্রে শরীর হয়েছে এই ভেবে।


“বিষ্ঠা মূত্র জ্ঞান নাই; সব ব্রহ্মময়। ভাত-ডালও অনেকদিন রাখলে বিষ্ঠার মতন হয়ে যায়।


“আবার উন্মাদবৎ; তার রকম সকম দেখে লোকে মনে করে পাগল।


“আবার কখনও বালকবৎ, কোন পাশ নাই, লজ্জা, ঘৃণা, সঙ্কোচ প্রভৃতি।


“ঈশ্বরদর্শনের পর এই অবস্থা। যেমন চুম্বকের পাহাড়ের কাছ দিয়ে জাহাজ যাচ্ছে, জাহাজের স্ক্রু, পেরেক আলগা হয়ে খুলে যায়। ঈশ্বর দর্শনের পর কাম-ক্রোধাদি আর থাকে না।


“মা-কালীর মন্দিরে যখন বাজ পড়েছিল, তখন দেখেছিলাম স্ক্রুর মূখ উড়ে গেছে।


“যিনি ঈশ্বরদর্শন করেছেন, তাঁর দ্বারা আর ছেলেমেয়ের জন্ম দেওয়া, সৃষ্টির কাজ হয় না। ধান পুঁতলে গাছ হয়, কিন্তু ধান সিদ্ধ করে পুঁতলে গাছ হয় না।


“যিনি ঈশ্বরদর্শন করেছেন, তাঁর আমিটা নামমাত্র থাকে, সে আমির দ্বারা কোন অন্যায় কাজ হয় না। নামমাত্র থাকে -- যেমন নারকেলের বেল্লোর দাগ। বেল্লো ঝরে গেছে -- এখন কেবল দাগ মাত্র।”


[ঈশ্বরদর্শনের পর আমি -- শ্রীরামকৃষ্ণ ও কেশব সেন ]


(ভক্তদের প্রতি) -- “আমি কেশব সেনকে বললাম, আমি ত্যাগ কর -- আমি কর্তা -- আমি লোকে শিক্ষা দিচ্ছি। কেশব বললে, মহাশয়, তাহলে দল-টল থাকে না। আমি বললাম, বজ্জাত আমি ত্যাগ কর। ঈশ্বরের দাস আমি, ঈশ্বরের ভক্ত আমি ত্যাগ করতে হবে না। বজ্জাত আমি আছে বলে ঈশ্বরের আমি থাকে না।


“ভাঁড়ারী একজন থাকলে বাড়ির কর্তা ভাঁড়ারের ভার লয় না।”


[শ্রীরামকৃষ্ণ -- মানুষলীলা ও অবতারতত্ত্ব ]


(ভক্তদের প্রতি) -- “দেখ, এই হাতে লাগার দরুন আমার স্বভাব উলটে যাচ্ছে। এখন মানুষের ভিতর ঈশ্বরের বেশি প্রকাশ দেখিয়ে দিচ্ছে। যেন বলছে আমি মানুষের ভিতর রইচি, তুমি মানুষ নিয়ে আনন্দ কর।


“তিনি শুদ্ধভক্তের ভিতর বেশি প্রকাশ -- তাই নরেন্দ্র, রাখাল এদের জন্য এত ব্যাকুল হই।


“জলাশয়ের কিনারায় ছোট ছোট গর্ত থাকে, সেইখানে মাছ, কাঁকড়া এসে জমে, তেমনি মানুষের ভিতর ঈশ্বরের প্রকাশ বেশি।


“এমন আছে যে শালগ্রাম হতেও বড় মানুষ। নরনারায়ণ।


“প্রতিমাতে তাঁর আবির্ভাব হয় আর মানুষে হবে না?


“তিনি নরলীলা করবার জন্য মানুষের ভিতর অবতীর্ণ হন, যেমন রামচন্দ, শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব। অবতারকে চিন্তা করলেই তাঁর চিন্তা করা হয়।”


ব্রাহ্মভক্ত ভগবান দাস আসিয়াছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (ভগবান দাসের প্রতি) -- ঋষিদের ধর্ম সনাতন ধর্ম, অনন্তকাল আছে ও থাকবে। এই সনাতন ধর্মের ভিতর নিরাকার, সাকার সবরকম পূজা আছে; জ্ঞানপথ, ভক্তিপথ সব আছে। অন্যান্য যে-সব ধর্ম আধুনিক ধর্ম কিছুদিন থাকবে আবার যাবে।



যত্র নাদো বিলীয়তে। তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ।

পরবর্তী পরিচ্ছেদ