মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

ঊনত্রিংশ পরিচ্ছেদ

১৮৮৪, ২৪শে মে


শ্রীরামকৃষ্ণ এইবার পশ্চিমের গোল বারান্দায় আসিয়া বসিয়াছেন। বন্দ্যোপাধ্যায়, হরি, মাস্টার প্রভৃতি কাছে বসিয়া আছেন। বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংসারে কষ্ট ঠাকুর সব জানেন।


[বন্দ্যোকে শিক্ষা -- ভার্যা সংসারের কারণ -- শরণাগত হও ]


শ্রীরামকৃষ্ণ -- দেখ, “এক কপ্নিকে বাস্তে” যত কষ্ট। বিবাহ করে, ছেলেপুলে হয়েছে, তাই চাকরি করতে হয়; সাধু কপ্নি লয়ে ব্যস্ত, সংসারী ভার্যা লয়ে। আবার বাড়ির সঙ্গে বনিবনাও নাই, তাই -- আলাদা বাসা করতে হয়েছে। (সহাস্য) চৈতন্যদেব নিতাইকে বলেছিলেন, শুন শুন নিত্যানন্দ ভাই সংসারী জীবের কভু গতি নাই।


মাস্টার (স্বগত) -- ঠাকুর বুঝি অবিদ্যার, সংসারের কথা বলছেন। অবিদ্যার সংসারেই বুঝি “সংসারী জীব” থাকে।


(মাস্টারকে দেখাইয়া -- সহাস্যে) “ইনিও আলাদা বাসা করে আছেন। তুমি কে, না আমি বিদেশিনী; আর তুমি কে, না আমি বিরহিণী। (সকলের হাস্য) বেশ মিল হবে।


“তবে তাঁর শরণাগত হলে আর ভয় নাই। তিনিই রক্ষা করবেন।”


হরি প্রভৃতি -- আচ্ছা, অনেকের তাঁকে লাভ করতে অত দেরি হয় কেন?


শ্রীরামকৃষ্ণ -- কি জানো, ভোগ আর কর্ম শেষ না হলে ব্যাকুলতা আসে না। বৈদ্য বলে দিন কাটুক -- তারপর সামান্য ঔষধে উপকার হবে।


“নারদ রামকে বললেন, রাম! তুমি অযোধ্যায় বসে রইলে রাবণবধ কেমন করে হবে? তুমি যে সেইজন্যে অবতীর্ণ হয়েছ! রাম বললেন, নারদ! সময় হউক, রাবণের কর্ম-ক্ষয় হোক; তবে তার বধের উদ্যোগ হবে।”


[The problem of Evil and Hari (Turiyananda) -- ঠাকুরের বিজ্ঞানীর অবস্থা ]


হরি -- আচ্ছা, সংসারে এত দুঃখ কেন?


শ্রীরামকৃষ্ণ -- এ সংসার তাঁর লীলা; খেলার মতো। এই লীলায় সুখ-দুঃখ, পাপ-পুণ্য, জ্ঞান-অজ্ঞান, ভাল-মন্দ -- সব আছে। দুঃখ, পাপ -- এ-সব গেলে লীলা চলে না।


“চোর চোর খেলায় বুড়ীকে ছুঁতে হয়। খেলার গোড়াতেই বুড়ী ছুঁলে বুড়ী সন্তুষ্ট হয় না। ঈশ্বরের (বুড়ির) ইচ্ছা যে খেলাটা খানিকক্ষণ চলে। তারপর। --


 ঘুড়ি লক্ষের দুটা-একটা কাটে,


হেসে দাও মা, হাত-চাপড়ী।


 অর্থাৎ ঈশ্বরদর্শন করে দুই-একজন মুক্ত হয়ে যায়, অনেক তপস্যার পর, তাঁর কৃপায়। তখন মা আনন্দে হাততালি দেন, ভো! কাটা! এই বলে।”


হরি -- খেলায় যে আমাদের প্রাণ যায়।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- তুমি কে বল দেখি; ঈশ্বরই সব হয়ে রয়েছেন -- মায়া, জীব, জগৎ, চতুর্বিংশতি তত্ত্ব।


“সাপ হয়ে খাই, আবার রোজা হয়ে ঝাড়ি! তিনি বিদ্যা-অবিদ্যা দুই-ই হয়ে রয়েছেন। অবিদ্যা মায়ার অজ্ঞান হয়ে রয়েছেন, বিদ্যা মায়ার ও গুরুরূপে রোজা হয়ে ঝাড়ছেন।


“অজ্ঞান, জ্ঞান, বিজ্ঞান। জ্ঞানী দেখেন তিনিই আছেন, তিনিই কর্তা -- সৃষ্টি, স্থিতি, সংহার করছেন। বিজ্ঞানী দেখেন, তিনিই সব হয়ে রয়েছেন।


“মহাভাব, প্রেম হলে দেখে তিনি ছাড়া আর কিছুই নাই।


“ভাবের কাছে ভক্তি ফিকে, ভাব পাকলে মহাভাব, প্রেম।


(বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি) -- “ধ্যানের সময় ঘন্টাশব্দ এখনও কি শোনা?”


বন্দ্যো -- রোজ ওই শব্দ শোনা! আবার রূপদর্শন! একবার মন ধরলে কি আর বিরাম হয়?


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- হাঁ, কাঠে একবার আগুন ধরলে আর নেবে না। (ভক্তদের প্রতি) -- ইনি বিশ্বাসের কথা অনেক জানেন।


বন্দ্যো -- আমার বিশ্বাসটা বড় বেশি।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- কিছু বল না।


বন্দ্যো -- একজনকে গুরু গাড়োল মন্ত্র দিয়েছিলেন, আর বলেছিলেন, “গাড়োলই তোর ইষ্ট।” গাড়োল মন্ত্র জপ করে সে সিদ্ধ হল।


“ঘেসুড়ে রামনাম করে গঙ্গা পার হয়ে গিছল!”


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তোমার বাড়ির মেয়েদের বলরামের মেয়েদের সঙ্গে এনো।


বন্দ্যো -- বলরাম কে?


শ্রীরামকৃষ্ণ -- বলরাম কে জানো না? বোসপাড়ায় বাড়ি।


সরলকে দেখিলে শ্রীরামকৃষ্ণ আনন্দে বিভোর হয়েন। বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সরল; নিরঞ্জনকেও সরল বলে খুব ভালবাসেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি) -- তোমায় নিরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে বলছি কেন? সে সরল, সত্য কি না। এইটি দেখবে বলে।



অধ্যাত্মরামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড।

ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি, ত্বং কুমার উত বা কুমারী।

  ত্বং জীর্ণো দণ্ডেন বঞ্চসি ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ।।              [শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্‌, ৪।৩]

পরবর্তী পরিচ্ছেদ