মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

১৮৮৪, ৩০শে জুন


ঈশ্বরদর্শন জীবনের উদ্দেশ্য -- তাহার উপায়


[ঐশ্বর্য ও মাধুর্য -- কেহ কেহ ঐশ্বর্যজ্ঞান চায় না ]


ঠাকুর কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া আছেন। আবার কথা কহিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- ঈশ্বর কল্পতরু। তাঁর কাছে থেকে চাইতে হয়। তযন যে যা চায় তাই পায়।


“ঈশ্বর কত কি করেছেন। তাঁর অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড -- তাঁর অনন্ত ঐশ্বর্যের জ্ঞান আমার দরকার কি! আর যদি জানতে ইচ্ছা করে, আগে তাঁকে লাভ করতে হয়, তারপর তিনি বলে দেবেন। যদু মল্লিকের কখানা বাড়ি কত কোম্পানির কাগজ আছে এ-সব আমার কি দরকার! আমার দরকার, জো-সো করে বাবুর সঙ্গে আলাপ করা! তা পগার ডিঙিয়েই হোক! -- প্রার্থনা করেই হোক! বা দ্বারবানের ধাক্কা খেয়েই হোক -- আলাপের পর কত কি আছে একবার জিজ্ঞাসা করলে বাবুই বলে দেয়। আবার বাবুর সঙ্গে আলাপ হলে আমলারাও মানে। (সকলের হাস্য)


“কেউ কেউ ঐশ্বর্যের জ্ঞান চায় না। শুঁড়ির দোকানে কত মন মদ আছে আমার কি দরকার! আমার এক বোতলেতেই হয়ে যায়। ঐশ্বর্য জ্ঞান চাইবে কি। যেটুকু মদ খেয়েছে তাতেই মত্ত!”


[জ্ঞানযোগ বড় কঠিন -- অবতারাদি নিত্যসিদ্ধ ]


“ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ -- এ-সবই পথ। যে-পথ দিয়েই যাও তাঁকে পাবে। ভক্তির পথ সহজ পথ। জ্ঞান বিচারের পথ কঠিন পথ।


“কোন্‌ পথটি ভাল অত বিচার করবার কি দরকার। বিজয়ের সঙ্গে অনেকদিন কথা হয়েছিল, বিজয়কে বললাম, একজন প্রার্থনা করত, হে ঈশ্বর! তুমি যে কি, কেমন আছ, আমায় দেখা দাও।


“জ্ঞানবিচারের পথ কঠিন। পার্বতী গিরিরাজকে নানা ঈশ্বরীয় রূপে দেখা দিয়ে বললেন, পিতা, যদি ব্রহ্মজ্ঞান চাও সাধুসঙ্গ কর।


“ব্রহ্ম কি মুখে বলা যায় না। রামগীতায় আছে, কেবল তটস্থ লক্ষণে তাঁকে বলা যায়, যেমন গঙ্গার উপর ঘোষপল্লী। গঙ্গার তটের উপর আছে এই কথা বলে ঘোষপল্লীকে ব্যক্ত করা যায়।


“নিরাকার ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার হবে না কেন? তবে বড় কঠিন। বিষয় বুদ্ধির লেশ থাকলে হবে না। ইন্দ্রিয়ের বিষয় যত আছে -- রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ সমস্ত ত্যাগ হলে -- মনের লয় হলে -- তবে অনুভবে বোধে বোধ হয় আর অস্তিমাত্র জানা যায়।”


পণ্ডিত -- অস্তীত্যোপলব্ধব্য ইত্যাদি।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তাঁকে পেতে গেলে একটা ভাব আশ্রয় করতে হয়, -- বীরভাব, সখীভাব বা দাসীভাব আর সন্তানভাব।


মণি মল্লিক -- তবে আঁট হবে।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- আমি সখীভাবে অনেকদিন ছিলাম। বলতাম, আমি আনন্দময়ী ব্রহ্মময়ীর দাসী, -- ওগো দাসীরা আমায় তোমরা দাসী কর, আমি গরব করে চলে যাব, বলতে বলতে যে, আমি সাধন ব্রহ্মময়ীর দাসী!


“কারু কারু সাধন না করে ঈশ্বরলাভ হয়, -- তাদের নিত্যসিদ্ধ বলে। যারা জপতপাদি সাধন করে ঈশ্বরলাভ করেছে তাদের বলে সাধনসিদ্ধ। আবার কেউ কৃপাসিদ্ধ, -- যেমন হাজার বছরের অন্ধকার ঘর, প্রদীপ নিয়ে গেলে একক্ষণে আলো হয়ে যায়!


“আবার আছে হঠাৎসিদ্ধ, -- যেমন গরিবের ছেলে বড়মানুষের নজরে পড়ে গেছে। বাবু তাকে মেয়ে বিয়ে দিলে, -- সেই সঙ্গে বাড়িঘর, গাড়ি, দাস-দাসী সব হয়ে গেল।


“আর আছে স্বপ্নসিদ্ধ -- স্বপ্নে দর্শন হল।”


সুরেন্দ্র (সহাস্যে) -- আমরা এখন ঘুমুই, -- পরে বাবু হয়ে যাব।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সস্নেহে) -- তুমি তো বাবু আছই। কয়ে আকার দিলে কা হয়; -- আবার একটা আকার দেওয়া বৃথা; -- দিলে সেই কাই হবে! (সকলের হাস্য)


“নিত্যসিদ্ধ আলাদা থাক -- যেমন অরণি কাষ্ঠ, একটু ঘষলেই আগুন, -- আবার না ঘষলেও হয়। একটু সাধন করলেই নিত্যসিদ্ধ ভগবানকে লাভ করে, আবার সাধন না করলেও পায়।


“তবে নিত্যসিদ্ধ ভগবানলাভ করার পর সাধন করে। যেমন আলু-কুমড়ো গাছে আগে ফল হয় তারপর ফুল।”


পণ্ডিত লাউ-কুমড়োর ফল আগে হয় শুনিয়া হাসিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- আর নিত্যসিদ্ধ হোমাপাখির ন্যায়। তার মা উচ্চ আকাশে থাকে। প্রসবের পর ছানা পৃথিবির দিকে পড়ে থাকে। পড়তে পড়তে ডানা উঠে ও চোখ ফুটে। কিন্তু মাটি গায়ে আঘাত না লাগতে লাগতে মার দিকে চোঁচা দৌড় দেয়। কোথায় মা! কোথায় মা! দেখ না প্রহ্লাদের ক লিখতে চক্ষে ধারা!


ঠাকুর নিত্যসিদ্ধের কথায় অরণি কাঠ ও হোমাপাখির দৃষ্টান্তের দ্বারা কি নিজের অবস্থা বুঝাইতেছেন?


ঠাকুর পণ্ডিতের বিনীতভাব দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়াছেন। পণ্ডিতের স্বভাবের বিষয় ভক্তদের বলিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (ভক্তদের প্রতি) -- এঁর স্বভাবটি বেশ। মাটির দেওয়ালে পেরেক পুঁতলে কোন কষ্ট হয় না। পাথরে পেরেকের গোড়া ভেঙে যায় তবু পাথরের কিছু হয় না। এমন সব লোক আছে হাজার ঈশ্বরকথা শুনুক, কোন মতে চৈতন্য হয় না, -- যেমন কুমির -- গায়ে তরবারির চোপ লাগে না!


[পাণ্ডিত্য অপেক্ষা সাধনা ভাল -- বিবেক ]


পণ্ডিত -- কুমিরের পেটে বর্শা মারলে হয়। (সকলের হাস্য)


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্য) -- গুচ্ছির শাস্ত্র পড়লে কি হবে? ফ্যালাজফী (Philosophy)! (সকলের হাস্য)


পণ্ডিত (সহাস্য) -- ফ্যালাজফী বটে!


শ্রীরামকৃষ্ণ -- লম্বা লম্বা কথা বললে কি হবে? বাণশিক্ষা করতে গেলে আগে কলাগাছ তাগ করতে হয়, -- তারপর শরগাছ, -- তারপর সলতে, -- তারপর উড়ে যাচ্ছে যে পাখি।


“তাই আগে সাকারে মনস্থির করতে হয়।


“আবার ত্রিগুণাতীত ভক্ত আছে, -- নিত্য ভক্ত যেমন নারদাদি। সে ভক্তিতে চিন্ময় শ্যাম, চিন্ময় ধাম, চিন্ময় সেবক, -- নিত্য ঈশ্বর, নিত্য ভক্ত, নিত্য ধাম।


“যারা নেতি নেতি জ্ঞানবিচার করছে, তারা অবতার মানে না। হাজরা বেশ বলে -- ভক্তের জন্যই অবতার, -- জ্ঞানীর জন্য অবতার নয়, তারা তো সোঽহম্‌ হয়ে বসে আছে।”


ঠাকুর ও ভক্তেরা সকলেই কিয়ৎকাল চুপ করিয়া আছেন। এইবার পণ্ডিত কথা কহিতেছেন।


পণ্ডিত -- আজ্ঞে, কিসে নিষ্ঠুর ভাবটা যায়? হাস্য দেখলে মাংসপেশী (muscles), স্নায়ু (nerves) মনে পড়ে। শোক দেখলে কিরকম nervous system মনে পড়ে।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্য) -- নারাণ শাস্ত্রী তাই বলত, শাস্ত্র পড়ার দোষ, -- তর্ক-বিচার এই সব এনে ফেলে!


পণ্ডিত -- আজ্ঞে, উপায় কি কিছু নাই? -- একটু মার্দব --


শ্রীরামকৃষ্ণ -- আছে -- বিবেক। একটা গান আছে, --


বিবেক নামে তার বেটার তত্ত্বকথা তায় সুধাবি।


“বিবেক, বৈরাগ্য, ঈশ্বরে অনুরাগ -- এই উপায়। বিবেক না হলে কথা কখন ঠিক ঠিক হয় না। সামাধ্যয়ী অনেক ব্যাখ্যার পর বললে, ঈশ্বর নীরস! একজন বলেছিল, আমাদের মামাদের একগোয়াল ঘোড়া আছে। গোয়ালে কি ঘোড়া থাকে?


(সহাস্যে) “তুমি ছানাবড়া হয়ে আছ। এখন দু-পাঁচদিন রসে পড়ে থাকলে তোমার পক্ষেও ভাল, পরেরও ভাল। দু-পাঁচদিন।”


পণ্ডিত (ঈষৎ হাসিয়া) -- ছানাবড়া পুড়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছে।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- না, না; আরসুলার রঙ হয়েছে।


হাজরা -- বেশ ভাজা হয়েছে, -- এখন রস খাবে বেশ।


[পূর্বকথা -- তোতাপুরীর উপদেশ -- গীতার অর্থ -- ব্যাকুল হও ]


শ্রীরামকৃষ্ণ -- কি জান, -- শাস্ত্র বেশি পড়বার দরকার নাই। বেশি পড়লে তর্ক বিচার এসে পড়ে। ন্যাংটা আমায় শেখাত -- উপদেশ দিত -- গীতা দশবার বললে যা হয় তাই গীতার সার! -- অর্থাৎ গীতা গীতা দশবার বলতে বলতে ত্যাগী ত্যাগী হয়ে যায়।


“উপায় -- বিবেক, বৈরাগ্য, আর ঈশ্বরে অনুরাগ। কিরূপ অনুরাগ? ঈশ্বরের জন্য প্রাণ ব্যাকুল, -- যেমন ব্যাকুল হয়ে বৎসের পিছে গাভী ধায়।”


পণ্ডিত -- বেদে ঠিক অমনি আছে, গাভী যেমন বৎসের জন্য ডাকে, তোমাকে আমরা তেমনি ডাকছি।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- ব্যাকুলতার সঙ্গে কাঁদো। আর বিবেক-বৈরাগ্য এনে যদি কেউ সর্বত্যাগ করতে পারে, -- তাহলে সাক্ষাৎকার হবে।


“সে ব্যাকুলতা এলে উন্মাদের অবস্থা হয় -- তা জ্ঞানপথেই থাক, আর ভক্তিপথেই থাক। দুর্বাসার জ্ঞানোন্মাদ হয়েছিল।


“সংসারীর জ্ঞান আর সর্বত্যাগীর জ্ঞান -- অনেক তফাত। সংসারীর জ্ঞান -- দীপের আলোর ন্যায় ঘরের ভিতরটি আলো হয়, -- নিজের দেহ ঘরকন্না ছাড়া আর কিছু বুঝতে পারে না। সর্বত্যাগীর জ্ঞান, সূর্যের আলোর ন্যায়। সে আলোতে ঘরের ভিতর বার সব দেখা যায়। চৈতন্যদেবের জ্ঞান সৌরজ্ঞান -- জ্ঞানসূর্যের আলো! আবার তাঁর ভিতর ভক্তিচন্দ্রের শীতল আলোও ছিল। ব্রহ্মজ্ঞান, ভক্তিপ্রেম, দুইই ছিল।”


ঠাকুর কি চৈতন্যদেবের অবস্থা বর্ণনা করিয়া নিজের অবস্থা বলিতেছেন?


[জ্ঞানযোগ ভক্তিযোগ -- কলিতে নারদীয় ভক্তি ]


“অভাবমুখ চৈতন্য আর ভাবমুখ চৈতন্য। ভাব ভক্তি একটি পথ আছে; আর অভাবের একটি আছে। তুমি অভাবের কথা বলছ। কিন্তু সে বড় কঠিন ঠাঁই গুরুশিষ্য দেখা নাই! জনকের কাছে শুকদেব ব্রহ্মজ্ঞান উপদেশের জন্য গেলেন। জনক বললেন, আগে দক্ষিণা দিতে হবে, -- তোমার ব্রহ্মজ্ঞান হলে আর দক্ষিণা দেবে না -- কেননা গুরুশিষ্যে ভেদ থাকে না।


“ভাব অভাব সবই পথ। অনন্ত মত অনন্ত পথ। কিন্তু একটি কথা আছে। কলিতে নারদীয় ভক্তি -- এই বিধান। এ-পথে প্রথমে ভক্তি, ভক্তি পাকলে ভাব, ভাবের চেয়ে উচ্চ মহাভাব আর প্রেম। মহাভাব আর প্রেম জীবের হয় না। যার তা হয়েছে তার বস্তুলাভ অর্থাৎ ঈশ্বরলাভ হয়েছে।”


পণ্ডিত -- আজ্ঞে, বলতে গেলে তো অনেক কথা দিয়ে বুঝাতে হয়।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তুমি নেজামুড়া বাদ দিয়ে বলবে হে।

পরবর্তী পরিচ্ছেদ