মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

ষোড়শ পরিচ্ছেদ

১৮৮৪, ১৯শে সেপ্টেম্বর


পূর্বকথা -- শ্রীরামকৃষ্ণের পুরাণ, তন্ত্র ও বেদ মতের সাধনা


[পঞ্চবটী, বেলতলা ও চাঁদনির সাধন -- তোতার কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ -- ১৮৬৬ <]


শ্রীরামকৃষ্ণ (ভক্তদের প্রতি) -- তিনি আমায় নানারূপ সাধন করিয়েছেন। প্রথম, পুরাণ মতের -- তারপর তন্ত্র মতের, আবার বেদ মতের। প্রথমে পঞ্চবটীতে সাধনা করতাম। তুলসী কানন হল -- তার মধ্যে বসে ধ্যান করতাম। কখনও ব্যাকুল হয়ে মা! মা! বলে ডাকতাম -- বা রাম! রাম! করতাম।


“যখন রাম রাম করতাম তখন হনুমানের ভাবে হয়তো একটা ল্যাজ পরে বসে আছি! উন্মাদের অবস্থা। সে সময়ে পূজা করতে করতে গরদের কাপড় পরে আনন্দ হত -- পূজারই আনন্দ!


“তন্ত্র মতের সাধনা বেলতলায়। তখন তুলসী গাছ -- সজনের খাড়া -- এক মনে হত!


“সে অবস্থায় শিবানীর উচ্ছিষ্ট -- সমস্ত রাত্রি পড়ে আছে -- তা সাপে খেলে কি কিসে খেলে তার ঠিক নাই -- ওই উচ্ছিষ্টই আহার।


“কুকুরের উপর চড়ে তার মুখে লুচি দিয়ে খাওয়াতাম, আর নিজেও খেতাম। সর্বং বিষ্ণুময়ং জগৎ। -- মাটিতে জল জমবে তাই আচমন, আমি সে মাটিতে পুকুর থেকে জল দিয়ে আচমন কল্লাম।


“অবিদ্যাকে নাশ না করলে হবে না। আমি তাই বাঘ হতাম -- হয়ে অবিদ্যাকে খেয়ে ফেলতাম!


“বেদমতে সাধনের সময় সন্ন্যাস নিলাম। তখন চাঁদনিতে পড়ে থাকতাম -- হৃদুকে বলতাম, আমি সন্ন্যাসী হয়েছি, চাঁদনীতে ভাত খাব!”


[সাধনকালে নানা দর্শন ও জগন্মাতার বেদান্ত, গীতা সম্বন্ধে উপদেশ ]


(ভক্তদের প্রতি) -- “হত্যা দিয়ে পরেছিলাম! মাকে বললাম, আমি মুখ্যু -- তুমি আমায় জানিয়ে দাও -- বেদ, পুরাণ, তন্ত্রে -- নানা শাস্ত্রে -- কি আছে।


“মা বললেন, বেদান্তের সার -- ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা। যে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের কথা বেদে আছে, তাঁকে তন্ত্রে বলে, সচ্চিদানন্দঃ শিবঃ -- আবার তাঁকেই পুরাণে বলে, সচ্চিদানন্দঃ কৃষ্ণঃ।


“গীতা দশবার বললে যা হয়, তাই গীতার সার। অর্থাৎ ত্যাগী ত্যাগী!


“তাঁকে যখন লাভ হয়, বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, তন্ত্র -- কত নিচে পড়ে থাকে। (হাজরাকে) তখন ওঁ উচ্চারণ করবার জো নাই। -- এটি কেন হয়? সমাধি থেকে অনেক নেমে না এলে ওঁ উচ্চারণ করতে পারি না।


“প্রত্যক্ষ দর্শনের পার যা যা অবস্থা হয় শাস্ত্রে আছে, সে সব হয়েছিল। বালকবৎ, উন্মাদবৎ, পিশাচবৎ, জড়বৎ।


“আর শাস্ত্রে যেরূপ আছে, সেরূপ দর্শনও হত।


“কখন দেখতাম জগৎময় আগুনের স্ফুলিঙ্গ!


“কখন চারিদিকে পারার হ্রদ, -- ঝক্‌ঝক্‌ করছে। আবার কখনও রূপা গলার মতো দেখতাম।


“কখন দেখতাম রঙমশালের আলো যেন জ্বলছে!


“তাহলেই হল, শাস্ত্রের সঙ্গে ঐক্য হচ্ছে।”


[শ্রীরামকৃষ্ণের অবস্থা -- নিত্যলীলাযোগ ]


“আবার দেখালে, তিনিই জীব, জগৎ, চতুর্বিংশতি তত্ত্ব হয়েছেন! ছাদে উঠে আবার সিঁড়িতে নামা। অনুলোম বিলোম।


“উঃ! কি অবস্থাতেই রেখেছে! -- একটা অবস্থা যায় তো আর একটা আসে। যেন ঢেঁকির পাট। একদিক নিচু হয় তো আর-একদিক উঁচু হয়।


“যখন অন্তর্মুখ -- সমাধিস্থ -- তখনও দেখছি তিনি! আবার যখন বাহিরের জগতে মন এল, তখনও দেখছি তিনি।


“যখন আরশির এ-পিঠ দেখছি তখনও তিনি! আবার যখন উলটো পিঠ দেখছি তখনও তিনি।”


মুখুজ্জে ভ্রাতৃদ্বয়, বাবুরাম প্রভৃতি ভক্তেরা অবাক্‌ হইয়া শুনিতেছেন।

পরবর্তী পরিচ্ছেদ