মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে লাটু, মাস্টার, মণিলাল, মুখুজ্জে প্রভৃতি
ভক্ত সঙ্গে ও কলুটোলায় কীর্তনানন্দে


প্রথমপরিচ্ছেদ

১৮৮৪, ২রা অক্টোবর


ব্রাহ্ম মণিলালকে উপদেশ -- বিদ্বেষভাব (Dogmatism) ত্যাগ কর


ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন।


আজ বৃহস্পতিবার, ২রা অক্টোবর ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দ। ১৭ই আশ্বিন ১২৯১। আশ্বিন শুক্লা দ্বাদশী-ত্রয়োদশী। শ্রীশ্রীবিজয়া দশমীর দুই দিন পরে। গতকল্য ঠাকুর কলিকাতায় অধরের বাড়িতে শুভাগমন করিয়াছিলেন। সেখানে নারাণ, বাবুরাম, মাস্টার, কেদার, বিজয় প্রভৃতি অনেকে ছিলেন। ঠাকুর সেখানে ভক্তসঙ্গে কীর্তনানন্দে নৃত্য করিয়াছিলেন।


ঠাকুরের কাছে আজকাল লাটু, রামলাল, হরিশ থাকেন। বাবুরামও মাঝে মাঝে আসিয়া থাকেন। শ্রীযুক্ত রামলাল শ্রীশ্রীভবতারিণীর সেবা করেন। হাজরা মহাশয়ও আছেন।


আজ শ্রীযুক্ত মণিলাল মল্লিক, প্রিয় মুখুজ্জে, তাঁহার আত্মীয় হরি, শিবপুরের একটি ব্রাহ্ম (দাড়ি আছে), বড় বাজার ১২নং মল্লিক স্ট্রীটের মারোয়াড়ী ভক্তেরা -- উপস্থিত আছেন। ক্রমে দক্ষিণেশ্বরের কয়েকটি ছোকরা, সিঁথির মহেন্দ্র কবিরাজ প্রভৃতি ভক্তেরা আসিলেন। মণিলাল পুরাতন ব্রাহ্ম ভক্ত।


শ্রীরামকৃষ্ণ (মণিলাল প্রভৃতির প্রতি) -- নমস্কার মানসেই ভাল। পায়ে হাত দিয়ে নমস্কারের কি দরকার। আর মানসে নমস্কার করলে কেউ কুণ্ঠিত হবে না।


“আমারই ধর্ম ঠিক, আর সকলের মিথ্যা -- এ-ভাব ভাল নয়।


“আমি দেখি তিনিই সব হয়েছেন -- মানুষ, প্রতিমা, শালগ্রাম সকলের ভিতরেই এক দেখি। এক ছাড়া দুই আমি দেখি না!


“অনেকে মনে করে আমাদের মত ঠিক, আর সব ভুল, -- আমরা জিতেছি, আর সব হেরেছে। কিন্তু যে এগিয়ে এসেছে সে হয়তো, একটুর জন্য আটকে গেল। পেছনে যে পড়েছিল সে তখন এগিয়ে গেল। গোলোকধাম খেলায়, অনেক এগিয়ে এসে, পোয়া (ঘুঁটি) আর পড়ল না।


“হার-জিত তাঁর হাতে। তাঁর কার্য কিছু বোঝা যায় না। দেখ না, ডাব অত উঁচুতে থাকে, রোদ পায়, তবু ঠাণ্ডা শক্তি! -- এ-দিকে পানিফল জলে থাকে -- গরম গুণ।


“মানুষের শরীর দেখ। মাথা যেটা মূল (গোড়া), সেটা উপরে চলে গেল।”


[শ্রীরামকৃষ্ণ, চার আশ্রম ও যোগতত্ত্ব -- ব্রাহ্মসমাজ ও মনোযোগ ]


মণিলাল -- আমাদের এখন কর্তব্য?


শ্রীরামকৃষ্ণ -- কোনরকম করে তাঁর সঙ্গে যোগ হয়ে থাকা। দুইপথ আছে, -- কর্মযোগ আর মনোযোগ।


“যারা আশ্রমে আছে, তাদের যোগ কর্মের দ্বারা। ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস। সন্ন্যাসীরাকাম্য কর্মের ত্যাগ করবে কিন্তু নিত্যকর্ম কামনাশূন্য হয়ে করবে। দণ্ডধারণ, ভিক্ষা করা, তীর্থযাত্রা, পূজা, জপ এ-সব কর্মের দ্বারা তাঁর সঙ্গে যোগ হয়।


“আর যে কর্মই কর, ফলাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কামনাশূন্য হয়ে করতে পারলে তাঁর সঙ্গে যোগ হয়।


“আর-একপথ মনোযোগ। এরূপ যোগীর বাহিরের কোন চিহ্ন নাই। অন্তরে যোগ। যেমন জড়ভরত, শুকদেব। আরও কত আছে -- এরা নামজাদা। এদের শরীরে চুল, দাড়ি, যেমন তেমনই থাকে।


“পরমহংস অবস্থায় কর্ম উঠে যায়। স্ম রণ-মনন থাকে। সর্বদাই মনের যোগ। যদি কর্ম করে সে লোকশিক্ষার জন্য।


“কর্মের দ্বারাই যোগ হউক, আর মনের দ্বারাই যোগ হউক ভক্তি হলে সব জানতে পারা যায়।


“ভক্তিতে কুম্ভক আপনি হয় -- একাগ্র মন হলেই বায়ু স্থির হয়ে যায়, আর বায়ু স্থির হলেই মন একাগ্র হয়, বুদ্ধি স্থির হয়। যার হয় সে নিজে টের পায় না।”


[পূর্বকথা -- সাধনাবস্থায় জগন্মাতার কাছে প্রার্থনা -- ভক্তিযোগ ]


“ভক্তিযোগে সব পাওয়া যায়। আমি মার কাছে কেঁদে কেঁদে বলেছিলাম, মা, যোগীরা যোগ করে যা জেনেছে, জ্ঞানীরা বিচার করে যা জেনেছে -- আমায় জানিয়ে দাও -- আমায় দেখিয়ে দাও! মা আমায় সব দেখিয়ে দিয়েছেন। ব্যাকুল হয়ে তাঁর কাছে কাঁদলে তিনি সব জানিয়ে দেন। বেদ-বেদান্ত, পুরাণ, তন্ত্র -- এ-সব শাস্ত্রে কি আছে; সব তিনি আমায় জানিয়ে দিয়েছেন।”


মণিলাল -- হঠযোগ?


শ্রীরামকৃষ্ণ -- হঠযোগীরা দেহাভিমানী সাধু। কেবল নেতি ধৌতি করছে -- কেবল দেহের যত্ন। ওদের উদ্দেশ্য আয়ু বৃদ্ধি করা। দেহ নিয়ে রাতদিন সেবা। ও ভাল নয়।


[মণি মল্লিক, সংসারী ও মনের ত্যাগ -- কেশব সেনের কথা ]


“তোমাদের কর্তব্য কি? তোমরা মনে কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ করবে। তোমরা সংসারকে কাকবিষ্ঠা বলতে পার না।


“গোস্বামীরা গৃহস্থ, তাই তাদের বললাম, তোমাদের ঠাকুর সেবা রয়েছে, তোমরা সংসারত্যাগ কি করবে? -- তোমরা সংসারকে মায়া বলে উড়িয়ে দিতে পার না।


“সংসারীদের যা কর্তব্য চৈতন্যদেব বলেছিলেন -- জীবে দয়া, বৈষ্ণবসেবা, নামসংকীর্তন।


“কেশব সেন বলেছিল, উনি এখন দুই-ই কর বলছেন। একদিন কুটুস করে কামড়াবেন। তা নয় -- কামড়াব কেন?”


মণি মল্লিক -- তাই কামড়ান।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- কেন? তুমি তো, তাই আছ -- তোমার ত্যাগ করবার কি দরকার?



কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ো বিদুঃ।
          সর্বকর্মফলত্যাগং প্রাহুস্ত্যাগং বিচক্ষণাঃ ৷৷
          ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ।
          য়জ্ঞদানতপঃ কর্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে ৷৷                     [গীতা, ১৮।২, ৩]

পরবর্তী পরিচ্ছেদ