মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ

১৮৮৫, ২৪শে অক্টোবর

শ্যামপুকুর বাটীতে নরেন্দ্র, ডাক্তার সরকার প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে

[ডাক্তার সরকার ও সর্বধর্ম পরীক্ষা (Comparative Religion)]


ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্র, মহিমাচরণ, মাস্টার, ডাক্তার সরকার প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে শ্যামপুকুর বাটীতে দ্বিতলার ঘরে বসিয়া আছেন। বেলা প্রায় একটা। ২৪শে অক্টোবর, ১৮৮৫, ৯ই কার্তিক (শনিবার, কৃষ্ণা প্রতিপদ)।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তোমার এ (হোমিওপ্যাথিক) চিকিৎসা বেশ।


ডাক্তার -- এতে রোগীর অবস্থা বইয়ের সঙ্গে মেলাতে হয়। যেমন ইংরেজী বাজনা, -- দেখে পড়া আর গাওয়া।


“গিরিশ ঘোষ কই? -- থাক্‌ থাক্‌ কাল জেগেছে।”


শ্রীরামকৃষ্ণ -- আচ্ছা, সিদ্ধির নেশার মতো ভাবাবস্থায় হয়, ওটি কি?


ডাক্তার (মাস্টারকে) -- Nervous centre -- action বন্ধ হয়, তাই অসাড় -- এ-দিকে পা টলে, যত energies brain-এর দিকে যায়। এই nervous system নিয়ে Life। ঘাড়ের কাছে আছে -- Medulla Oblongata; তার হানি হলে Life extinct হতে পারে।


শ্রীযুক্ত মহিমা চক্তবর্তী সুষুম্না নাড়ীর ভিতরে কুলকূণ্ডলিনী শক্তির কথা বলিতেছেন, -- “স্পাইন্যাল্‌ কর্ড-এর ভিতর সুষুম্না নাড়ী সূক্ষ্মভাবে আছে -- কেউ দেখতে পায় না। মহাদেবের বাক্য।”


ডাক্তার -- মহাদেব man in the maturity-কে examine করেছে। European-রা Embryo থেকে maturity পর্যন্ত সমস্ত stage দেখেছে। Comparative History সব জানা ভাল। সাঁওতালদের history পড়ে জানা গেছে যে, কালী একজন সাঁওতালী মাগী ছিল -- খুব লড়াই করেছিল। (সকলের হাস্য)


“তোমরা হেসো না। আবার Comparative anatomy-তে কত উপকার হয়েছে, শোনো। প্রথমে pancreatic juice ও bile-(পিত্তের) action-(ক্রিয়ার) তফাত বোঝা যাচ্ছিল না। তারপর Claude Bernard খরগোশের stomach, liver প্রভৃতি examine করে দেখালে যে, bile-এর action আর ওই juice-এর action আলাদা।


“তাহলেই দাঁড়ালো যে, lower animal-দের আমাদের দেখা উচিত -- শুধু মানুষকে দেখলে হবে না।


“সেইরূপ Comparative Religion-তে বিশেষ উপকার!


“এই যে ইনি (পরমহংসদেব) যা বলেন, তা অত অন্তরে লাগে কেন? এঁর সব ধর্ম দেখা আছে -- হিঁদু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, শাক্ত, বৈষ্ণব, -- এ-সব ইনি নিজে করে দেখেছেন। মধুকর নানা ফুলে বসে মধু সঞ্চয় করলে তবেই চাকটি বেশ হয়।”


মাস্টার (ডাক্তারকে) -- ইনি (মহিমা) খুব সাইয়েন্স্‌ পড়েছেন।


ডাক্তার (সহাস্যে) -- কি Maxmuller's Science of Religion?


মহিমা (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি) -- আপনার অসুখ, ডাক্তারেরা আর কি করবে? যখন শুনলাম যে আপনার অসুখ করেছে, তখন ভাবলাম যে ডাক্তারের অহংকার বাড়াচ্ছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- ইনি খুব ভাল ডাক্তার। আর খুব বিদ্যা।


মহিমাচরণ -- আজ্ঞা হাঁ, উনি জাহাজ, আর আমরা সব ডিঙ্গি।


ডাক্তার বিনীত হইয়া হাতজোড় করিতেছেন।


মহিমা -- তবে ওখানে (ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে) সবাই সমান।


ঠাকুর নরেন্দ্রকে গান গাইতে বলিতেছেন।


নরেন্দ্রের গান:


(১)   তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা।


(২)   অহংকারে মত্ত সদা, অপার বাসনা।


(৩)   চমৎকার অপার, জগৎ রচনা তোমার!
              শোভার আগার বিশ্ব সংসার!


(৪)   মহা সিংহাসনে বসি শুনেছি হে বিশ্বপতিঃ
              তোমারি রচিত ছন্দ মহান বিশ্বের গীত।
              মর্ত্যের মৃত্তিকা হয়ে, ক্ষুদ্র এই কণ্ঠ লয়ে,
              আমিও দুয়ারে তব, হয়েছি হে উপনীত।
              কিছু নাহি চাহি দেব, কেবল দর্শন মাগি,
              তোমারে যথা রবি শশী, সেই সভা মাঝে বসি,
              একান্তে গাইতে চাহে এই ভকতের চিত।


(৫)   ওহে রাজরাজেশ্বর, দেখা দাও!
              করুণাভিখারী আমি করুণা কটাক্ষে চাও ৷৷
              চরণে উৎসর্গ দান, করিতেছি এই প্রাণ,
              সংসার-অনলকুণ্ডে ঝলসি গিয়াছে তাও ৷৷
              কলুষ-কলঙ্কে তাহে আবরিত এ-হৃদয়;
              মোহে মুগ্ধ মৃতপ্রায়, হয়ে আছি দয়াময়,
              মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্রে শোমৃ ন করিয়ে লও ৷৷


(৬)   হরি-রস-মদিরা পিয়ে মম মানস মাতোরে!
              লুটায়ে অবনীতলে হরি হরি বলি কাঁদোরে ৷৷


শ্রীরামকৃষ্ণ -- আর ‘যে কুছ্‌ হ্যায় তুঁহি হ্যায়।’


ডাক্তার -- আহা!


গান সমাপ্ত হইল। ডাক্তার মুগ্ধপ্রায় হইয়াছেন।


কিয়ৎক্ষণ পরে ডাক্তার অতি ভক্তিভাবে হাতজোড় করিয়া ঠাকুরকে বলিতেছেন, ‘তবে আজ যাই্‌, -- আবার কাল আসব।’


শ্রীরামকৃষ্ণ -- একটু থাক না! গিরিশ ঘোষকে খপর দিয়েছে। (মহিমাকে দেখাইয়া) ইনি বিদ্বান হরিনামে নাচেন, অহংকার নাই। কোন্নগরে চলে গিছলেন -- আমরা গিছলাম বলে; আবার স্বাধীন, ধনবান, কারু চাকরি করতে হয় না! (নরেন্দ্রকে দেখাইয়া) এ কেমন?


ডাক্তার -- খুব ভাল!


শ্রীরামকৃষ্ণ -- আর ইনি --


ডাক্তার -- আহা!


মহিমাচরণ -- হিন্দুদের দর্শন না পড়লে দর্শন পড়াই হয় না। সাংখ্যের চতুর্বিংশতি তত্ত্ব ইওরোপ জানে না -- বুঝতেও পারে না।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- কি তিন পথ তুমি বলো?


মহিমা -- সৎপথ -- জ্ঞানের পথ। চিৎপথ, যোগের। কর্মযোগ। তাই চার আশ্রমের ক্রিয়া, কি কি কর্তব্য, এর ভিতর আসছে। আনন্দপথ -- ভক্তিপ্রেমের পথ। -- আপনাতে তিন পথেরই ব্যাপার -- আপনি তিন পথেরই খপর বাতলে দেন! (ঠাকুর হাসিতেছেন)


“আমি আর কি বলব? জনক বক্তা, শুকদেব শ্রোতা!”


ডাক্তার বিদায় গ্রহণ করিলেন।


[সন্ধ্যার পর সমাধিস্থ -- নিত্যগোপাল ও নরেন্দ্র -- ‘জপাৎ সিদ্ধি’ ]


সন্ধ্যার পর চাঁদ উঠিয়াছে। আজ কোজাগর পূর্ণিমার পরদিন, শনিবার, ৯ই কার্তিক। ঠাকুর সমাধিস্থ! দাঁড়াইয়া আছেন। নিত্যগোপালও তাঁহার কাছে ভক্তিভাবে দাঁড়াইয়া আছেন।


ঠাকুর উপবিষ্ট হইয়াছেন -- নিত্যগোপাল পদসেবা করিতেছেন। দেবেন্দ্র কালীপদ প্রভৃতি অনেকগুলি ভক্ত কাছে বসিয়া আছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (দেবেন্দ্র প্রভৃতির প্রতি) -- এমনি মনে উঠছে, নিত্যগোপালের এ-অবস্থাগুলো এখন যাবে, -- ওর সব মন কুড়িয়ে আমাতেই আসবে -- যিনি এর ভিতর আছেন, তাঁতে।


“নরেন্দ্রকে দেখছো না? -- সব মনটা ওর আমারই উপর আসছে!”


ভক্তেরা অনেকে বিদায় লইতেছেন। ঠাকুর দাঁড়াইয়া আছেন। একজন ভক্তকে জপের কথা বলিতেছেন -- “জপ করা কি না নির্জনে নিঃশব্দে তাঁর নাম করা। একমনে নাম করতে করতে -- জপ করতে করতে -- তাঁর রূপদর্শন হয় -- তাঁর সাক্ষাৎকার হয়। শিকলে বাঁধা কড়িকাঠ গঙ্গার গর্ভে ডুবান আছে -- শিকলের আর-একদিক তীরে বাঁধা আছে। শিকলের এক-একটি পাপ (Link) ধরে ধরে গিয়ে ক্রমে ডুব মেরে শিকল ধরে যেতে ওই কড়ি-কাঠ স্পর্শ করা যায়! ঠিক সেইরূপ জপ করতে করতে মগ্ন হয়ে গেলে ক্রমে ভগবানের সাক্ষাৎকার হয়।”


কালীপদ (সহাস্যে, ভক্তদের প্রতি) -- আমাদের এ খুব ঠাকুর! -- জপ-ধ্যান, তপস্যা করতে হয় না!


ঠাকুরের গলায় অসুখ করিতেছে। দেবেন্দ্র বলিতেছেন -- “এ-কথায় আর ভুলি না।” দেবেন্দ্রের এই মনের ভাব যে ঠাকুর কেবল ভক্তদের ভুলাইবার জন্য অসুখ দেখাইতেছেন।


ভক্তেরা বিদায় গ্রহণ করিলেন। রাত্রে কয়েকটি ছোকরা ভক্ত পালা করিয়া থাকিবেন। আজ মাস্টারও রাত্রে থাকিবেন।


পরবর্তী পরিচ্ছেদ