মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ

১৮৮৫, ২৭শে অক্টোবর

শ্যামপুকুর বাটীতে নরেন্দ্র, মণি প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
অসুখ কেন? নরেন্দ্রের প্রতি সন্ন্যাসের উপদেশ


ঠাকুর শ্যামপুকুরের বাটীতে নরেন্দ্র প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। বেলা দশটা। আজ ২৭থে অক্টোবর, ১৮৮৫, মঙ্গলবার, আশ্বিন কৃষ্ণা চতুর্থী, ১২ই কার্তিক।


ঠাকুর নরেন্দ্র, মণি প্রভৃতির সহিত কথা কহিতেছেন।


নরেন্দ্র -- ডাক্তার কাল কি করে গেল।


একজন ভক্ত -- সুতোয় মাছ গিঁথেছিল, ছিঁড়ে গেল।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- বঁড়শি বেঁধা আছে -- মরে ভেসে উঠবে।


নরেন্দ্র একটু বাহিরে গেলেন, আবার আসিবেন। ঠাকুর মণির সহিত পূর্ণ সম্বন্ধে কথা কহিতেছেন --


শ্রীরামকৃষ্ণ -- তোমায় বলছি -- এ-সব জীবের শুনতে নাই -- প্রকৃতিভাবে পুরুষকে (ঈশ্বরকে) আলিঙ্গন, চুম্বন করতে ইচ্ছা হয়।


মণি -- নানারকম খেলা -- আপনার রোগ পর্যন্ত খেলার মধ্যে। এই রোগ হয়েছে বলে এখানে নূতন নূতন ভক্ত আসছে।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- ভূপতি বলে, রোগ না হলে শুধু বাড়িভাড়া করলে লোকে কি বলত -- আচ্ছা, ডাক্তারের কি হল?


মণি -- এদিকে দাস্য মানা আছে -- ‘আমি দাস, তুমি প্রভু।’ আবার বলে -- মানুষ-উপমা আনো কেন!


শ্রীরামকৃষ্ণ -- দেখলে! আজ কি আর তুমি তার কাছে যাবে?


মণি -- খপর দিতে যদি হয়, তবে যাব।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- বঙ্কিম ছেলেটি কেমন? এখানে যদি আসতে না পারে, তুমি না হয় তারে সব বলবে। -- চৈতন্য হবে।


[আগে সংসারের গোছগাছ, না ঈশ্বর? কেশব ও নরেন্দ্রকে ইঙ্গিত ]


নরেন্দ্র আসিয়া কাছে বসিলেন। নরেন্দ্রের পিতার পরলোকপ্রাপ্তি হওয়াতে বড়ই ব্যতিব্যস্ত হইয়াছেন। মা ও ভাই এরা আছেন, তাহাদের ভরণপোষণ করিতে হইবে। নরেন্দ্র আইন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতেছেন। মধ্যে বিদ্যাসাগরের বউবাজারের স্কুলে কয়েক মাস শিক্ষকতা করিয়াছিলেন। বাটীর একটা ব্যবস্থা করিয়া দিয়া নিশ্চিন্ত হইবেন -- এই চেষ্টা কেবল করিতেছেন।


ঠাকুর সমস্তই অবগত আছেন -- নরেন্দ্রকে একদৃষ্টে সস্নেহে দেখিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারকে) -- আচ্ছা, কেশব সেনকে বললাম, -- যদৃচ্ছালাভ। যে বড় ঘরের ছেলে, তার খাবার জন্য ভাবনা হয় না -- সে মাসে মাসে মুসোহারা পায়। তবে নরেন্দ্রের অত উঁচু ঘর, তবু হয় না কেন? ভগবানে মন সব সমর্পণ করলে তিনি তো সব জোগাড় করে দিবেন!


মাস্টার -- আজ্ঞা হবে; এখনও তো সব সময় যায় নাই।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- কিন্তু তীব্র বৈরাগ্য হলে ও-সব হিসাব থাকে না। ‘বাড়ির সব বন্দোবস্ত করে দিব, তারপরে সাধনা করব’ -- তীব্র বৈরাগ্য হলে এরূপ মনে হয় না। (সহাস্যে) গোঁসাই লেকচার দিয়েছিল। তা বলে, দশ হাজার টাকা হলে ওই থেকে খাওয়া-দাওয়া এই সব হয় -- তখন নিশ্চিন্ত হয়ে ঈশ্বরকে বেশ ডাকা যেতে পারে।


“কেশব সেনও ওই ইঙ্গিত করেছিল। বলেছিল, -- ‘মহাশয়, যদি কেউ বিষয়-আশয় ঠিকঠাক করে, ঈশ্বরচিন্তা করে -- তা পারে কিনা? তার তাতে কিছু দোষ হতে পারে কি?’


“আমি বললাম, তীব্র বৈরাগ্য হলে সংসার পাতকুয়া, আত্মীয় কাল সাপের মতো, বোধ হয়। তখন, ‘টাকা জমাব’, ‘বিষয় ঠিকঠাক করব’, এ-সব হিসাব আসে না। ঈশ্বরই বস্তু আর সব অবস্তু -- ঈশ্বরকে ছেড়ে বিষয়চিন্তা!


“একটা মেয়ের ভারী শোক হয়েছিল। আগে নৎটা কাপড়ের আঁচলে বাঁধলে, -- তারপর, ‘ওগো! আমার কি হল গো।’ বলে আছড়ে পড়লো কিন্তু খুব সাবধান, নৎটা না ভেঙে যায়।”


সকলে হাসিতেছেন।


নরেন্দ্র এই সকল কথা শুনিয়া বাণবিদ্ধের ন্যায় একটু কাত হইয়া শুইয়া পড়িলেন। তাঁর মনের অবস্থা বুঝিয়া --


মাস্টার (নরেন্দ্রের প্রতি, সহাস্যে) -- শুয়ে পড়লে যে!


শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি, সহাস্যে) -- “আমি তো আপনার ভাশুরকে নিয়ে আছি তাইতেই লজ্জায় মরি, এরা সব (অন্য মাগীরা) পরপুরুষ নিয়ে কি করে থাকে?”


মাস্টার নিজে সংসারে আছেন, লজ্জিত হওয়া উচিত। নিজের দোষ, কেহ দেখে না -- অপরের দেখে। ঠাকুর এই কথা বলিতেছেন। একজন স্ত্রীলোক ভাশুরের সঙ্গে নষ্ট হইয়াছিল। সে নিজের দোষ কম, অন্য নষ্ট স্ত্রী লোকদের দোষ বেশি, মনে করিতেছে। বলে, ‘ভাশুর তো আপনার লোক, তাইতেই লজ্জায় মরি।’


[মুক্তহস্ত কে? চাকরি ও খোশামোদের টাকায় বেশি মায়া ]


নিচে একজন বৈষ্ণব গান গাইতেছিল। ঠাকুর শুনিয়া অতিশয় আনন্দিত হইলেন। বৈষ্ণবকে কিছু পয়সা দিতে বলিলেন। একজন ভক্ত কিছু দিতে গেলেন। ঠাকুর জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “কি দিলে?” একজন ভক্ত বলিলেন -- “তিনি দুপয়সা দিয়েছেন।”


ঠাকুর -- চাকরি করা টাকা কিনা। -- অনেক কষ্টের টাকা -- খোশামোদের টাকা! মনে করেছিলাম, চার আনা দিবে!


[Electricity -- তাড়িতযন্ত্র ও বাগচী চিত্রিত ষড়্‌ভুজ ও রামচন্দ্রের আলেখ্য
দর্শন -- পূর্বকথা -- দক্ষিণেশ্বরে দীর্ঘকেশ সন্ন্যাসী
]


ছোট নরেন ঠাকুরকে যন্ত্র আনিয়া তাড়িতের প্রকৃতি দেখাইবেন বলিয়াছিলেন। আজ আনিয়া দেখাইলেন।


বেলা দুইটা -- ঠাকুর ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। অতুল একটি বন্ধু মুনসেফকে আনিয়াছেন। শিকদারপাড়ার প্রসিদ্ধ চিত্রকর বাগচী আসিয়াছেন। কয়েকখানি চিত্র ঠাকুরকে উপহার দিলেন।


ঠাকুর আনন্দের সহিত পট দেখিতেছেন। ষড়্‌ভুজ মূর্তি দর্শন করিয়া ভক্তদের বলিতেছেন -- “দেখো, কেমন হয়েছে!”


ভক্তদের আবার দেখাইবার জন্য ‘অহল্যা পাষাণীর পট’ আনিতে বলিলেন। পটে শ্রীরামচন্দ্রকে দেখিয়া আনন্দ করিতেছেন।


শ্রীযুক্ত বাগচীর মেয়েদের মতো লম্বা চুল। ঠাকুর বলিতেছেন, “অনেককাল হল দক্ষিণেশ্বরে একটি সন্ন্যাসী দেখেছিলাম। ন হাত লম্বা চুল। সন্ন্যাসীটি ‘রাধে রাধে’ করত। ঢঙ নাই।”


কিয়ৎক্ষণ পরে নরেন্দ্র গান গাইতেছেন। গানগুলি বৈরাগ্যপূর্ণ। ঠাকুরের মুখে তীব্র বৈরাগ্যের কথা ও সন্ন্যাসের উপদেশ শুনিয়া কি নরেন্দ্রের উদ্দীপন হইল?


নরেন্দ্রের গান:


(১) যাবে কি হে দিন আমার বিফলে চলিয়ে।
(২) অন্তরে জাগিছ ওমা অন্তরযামিনী।
(৩) কি সুখ জীবনে মম ওহে নাথ দয়াময় হে,
      যদি চরণ-সরোজে পরাণ-মধুপ, চির মগন না রয় হে!


পরবর্তী পরিচ্ছেদ