মূল পৃষ্ঠা

পূর্ব পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

১৮৮৬, ১১ই মার্চ

কাশীপুর উদ্যানে শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
নরেন্দ্রকে জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগের সমন্বয় উপদেশ


ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কাশীপুরের বাগানে হলঘরে ভক্তসঙ্গে অবস্থান করিতেছেন। রাত্রি প্রায় আটটা। ঘরে নরেন্দ্র, শশী, মাস্টার, বুড়োগোপাল শরৎ। আজ বৃসস্পতিবার -- ২৮শে ফাল্গুন, ১২৯২ সাল; ফাল্গুন মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথি; ১১ই মার্চ, ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দ।


ঠাকুর অসুস্থ -- একটু শুইয়া আছেন। ভক্তেরা কাছে বসিয়া। শরৎ দাঁড়াইয়া পাখা করিতেছেন। ঠাকুর অসুখের কথা বলিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ -- ভোলানাথের কাছে গেলে তেল দেবে। আর সে বলে দেবে, কি-রকম করে লাগাতে হবে।


বুড়োগোপাল -- তাহলে কাল সকালে আমরা গিয়ে আনব।


মাস্টার -- আজ কেউ গেলে বলে দিতে পারে।


শশী -- আমি যেতে পারি।


শ্রীরামকৃষ্ণ (শরৎকে দেখাইয়া) -- ও যেতে পারে।


শরৎ কিয়ৎক্ষণ পরে দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে মুহুরী শ্রীযুক্ত ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়ের নিকট হইতে তেল আনিতে যাত্রা করিলেন।


ঠাকুর শুইয়া আছেন। ভক্তেরা নিঃসব্দে বসিয়া আছেন। ঠাকুর হঠাৎ উঠিয়া বসিলেন। নরেন্দ্রকে সম্বোধন করিয়া কথা কহিতেছেন।


শ্রীরামকৃষ্ণ (নরেন্দ্রের প্রতি) -- ব্রহ্ম অলেপ। তিন গুণ তাঁতে আছে, কিন্তু তিনি নির্লিপ্ত।


“যেমন বায়ুতে সুগন্ধ-দুর্গন্ধ দুই-ই পাওয়া যায়, কিন্তু বায়ু নির্লিপ্ত। কাশীতে শঙ্করাচার্য পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন! চণ্ডাল মাংসের ভার নিয়ে যাচ্ছিল -- হঠাৎ ছুঁয়ে ফেললে। শঙ্কর বললেন -- ছুঁয়ে ফেললি! চণ্ডাল বললে, -- ঠাকুর, তুমিও আমায় ছোঁও নাই! আমিও তোমায় ছুঁই নাই! আত্মা নির্লিপ্ত। তুমি সেই শুদ্ধ আত্মা।


“ব্রহ্ম আর মায়া। জ্ঞানী মায়া ফেলে দেয়।


“মায়া আবরণস্বরূপ। এই দেখ, এই গামছা আড়াল করলাম -- আর প্রদীপের আলো দেখা যাচ্ছে না।


ঠাকুর গামছাটি আপনার ও ভক্তদের মাঝখানে ধরিলেন। বলিতেছেন, “এই দেখ, আমার মুখ আর দেখা যাচ্ছে না।


“রামপ্রসাদ যেমন বলেছে -- ‘মশারি তুলিয়া দেখ --’


“ভক্ত কিন্তু মায়া ছেড়ে দেয় না। মহামায়ার পূজা করে। শরণাগত হয়ে বলে, ‘মা, পথ ছেড়ে দাও! তুমি পথ ছেড়ে দিলে তবে ব্রহ্মজ্ঞান হবে।’ জাগ্রৎ, স্বপ্ন, সুষুপ্তি, -- এই তিন অবস্থা জ্ঞানীরা উড়িয়ে দেয়! ভক্তেরা এ-সব অবস্থাই লয় -- যতক্ষণ আমি আছে ততক্ষণ সবই আছে।


“যতক্ষণ আমি আছে, ততক্ষণ দেখে যে, তিনিই মায়া, জীবজগৎ, চতুর্বিংশতি তত্ত্ব, সব হয়েছেন!


[নরেন্দ্র প্রভৃতি চুপ করিয়া আছেন।]


“মায়াবাদ শুকনো। কি বললাম, বল দেখি।”


নরেন্দ্র -- শুকনো।


ঠাকুর নরেন্দ্রের হাত-মুখ স্পর্শ করিতে লাগিলেন। আবার কথা কহিতেছেন -- “এ-সব (নরেন্দ্রের সব) ভক্তের লক্ষণ। জ্ঞানীর সে আলাদা লক্ষণ, -- মুখ, চেহারা শুকনো হয়।


“জ্ঞানী জ্ঞানলাভ করবার পরও বিদ্যামায়া নিয়ে থাকতে পারে -- ভক্তি, দয়া, বৈরাগ্য -- এই সব নিয়ে থাকতে পারে। এর দুটি উদ্দেশ্য। প্রথম, লোকশিক্ষা হয়, তারপর রসাস্বাদনের জন্য।


“জ্ঞানী যদি সমাধিস্থ হয়ে চুপ করে থাকে, তাহলে লোকশিক্ষা হয় না। তাই শঙ্করাচার্য ‘বিদ্যার আমি’ রেখেছিলেন।


“আর ঈশ্বরের আনন্দ ভোগ করবার জন্য -- সম্ভোগ করবার জন্য -- ভক্তি-ভক্ত নিয়ে থাকে!


“এই ‘বিদ্যার আমি’, ‘ভক্তের আমি’ -- এতে দোষ নাই। ‘বজ্জাৎ আমি’তে দোষ হয়। তাঁকে দর্শন করবার পর বালকের স্বভাব হয়। ‘বালকের আমি’তে কোন দোষ নাই। যেমন আরশির মুখ -- লোককে গালাগাল দেয় না। পোড়া দড়ি দেখতেই দড়ির আকার, ফুঁ দিলে উড়ে যায়। জ্ঞানাগ্নিতে অহংকার পুড়ে গেছে। এখন আর কারও অনিষ্ট করে না। নামমাত্র ‘আমি’।


“নিত্যতে পৌঁছে আবার লীলায় থাকা। যেমন ওপারে গিয়ে আবার এপারে আসা। লোকশিক্ষা আর বিলাসের জন্য -- আমোদের জন্য।”


ঠাকুর অতি মৃদুস্বরে কথা কহিতেছেন। একটু চুপ করিলেন। আবার ভক্তদের বলিতেছেন -- “শরীরের এই রোগ -- কিন্তু অবিদ্যা মায়া রাখে না! এই দেখো, রামলাল, কি বাড়ি, কি পরিবার, আমার মনে নাই! -- কে না পূর্ণ কায়েত তার জন্য ভাবছি। -- ওদের জন্য তো ভাবনা হয় না!


“তিনিই বিদ্যামায়া রেখে দিয়েছেন -- লোকের জন্য -- ভক্তের জন্য।


“কিন্তু বিদ্যমায়া থাকলে আবার আসতে হবে। অবতারাদি বিদ্যামায়া রাখে! একটু বাসনা থাকলেই আসতে হয়, ফিরে ফিরে আসতে হয়। সব বাসনা গেলে মুক্তি। ভক্তরা কিন্তু মুক্তি চায় না।


“যদি কাশীতে কারু দেহত্যাগ হয় তাহলে মুক্তি হয় -- আর আসতে হয় না। জ্ঞানীদের মুক্তি।”


নরেন্দ্র -- সেদিন মহিম চক্রবর্তীর বাড়িতে আমরা গিছলাম।


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- তারপর?


নরেন্দ্র -- ওর মতো এমন শুষ্ক জ্ঞানী দেখি নাই!


শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- কি হয়েছিল?


নরেন্দ্র -- আমাদের গান গাইতে বললে। গঙ্গাধর গাইলে --


শ্যামনামে প্রাণ পেয়ে ইতি উতি চায়,
সম্মুখে তমালবৃক্ষ দেখিবারে পায়।


“গান শুনে বললে -- ও-সব গান কেন? প্রেম-ট্রেম ভাল লাগে না। তা ছাড়া, মাগছেলে নিয়ে থাকি, এ-সব গান এখানে কেন?”


শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি) -- ভয় দেখেছ!


পরবর্তী পরিচ্ছেদ