দ্বিতীয় খণ্ড
কলিকাতায় শ্রীশ্রীপ্রভুর আগমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা শ্রবণ-মঙ্গল ।
ত্রিতাপ-সন্তপ্ত চিত শুনিলে শীতল ॥ ১ ॥
নিরমল সুবিমল হৃদয়-মুকুর ।
প্রতিভাত হয়
যথা রূপ শ্রীপ্রভুর ॥ ২ ॥
ছটার ঘটায় মুগ্ধ হয় প্রাণমন ।
নূতন জীবন উঠে যায় পুরাতন ॥ ৩ ॥
বিমোহিত পঞ্চভূত ইন্দ্রিয়নিচয় ।
লক্ষ মন যেই মন এক মন হয় ॥ ৪ ॥
ঘুচে সন্দ-অন্ধকার অজ্ঞানাবরণ ।
মায়াপাশ ফাঁস মহাত্রাস বিনাশন ॥ ৫ ॥
দেখিয়া প্রভুর লীলা সেও বসি কাঁদে ।
জগৎমোহন মায়া বিশ্বে ফেলে ফাঁদে ॥ ৬ ॥
এহেন লীলার সিন্ধু কথা শ্রীপ্রভুর ।
কলিকালে কূপে খেলে তরঙ্গ সিন্ধুর ॥ ৭ ॥
মজার ঠাকুর হেন না হয় শ্রবণ ।
দেথান নখের কোণে গোটা ত্রিভুবন ॥ ৮ ॥
দেখিবারে আঁখির সাহায্য নাহি লাগে ।
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা হৃদে যার জাগে ॥ ৯ ॥
কথার মাহাত্ম্য-কথা সাধ্য কার করে ।
হিয়ালি কহিনু এবে ভেঙ্গে দিব পরে ॥ ১০ ॥
গুপ্ত অবতার প্রভু অখিলের রাজ ।
গায়ে পরা নিরক্ষর ব্রাহ্মণের সাজ ॥ ১১ ॥
অলঙ্কার দীনাচার হীনতম জনে ।
সর্ব অগ্রে নমস্কার বিচারবিহীনে ॥ ১২ ॥
পরিচ্ছদ-বলে অন্য রূপ ধরে নরে ।
সে যেন আপুনি তেন ভিতরে ভিতরে ॥ ১৩ ॥
সন্দেহ হইলে, লৈলে বাস-আবরণ ।
পুনরায় তাই হয় সে নিজে যেমন ॥ ১৪ ॥
সে রূপ-ধরণ নহে
শ্রীপ্রভুর বেশ ।
ঠিক দীন-দুঃখী নাহি সন্দেহের লেশ ॥ ১৫ ॥
কায়মনোবাক্যে খেলে
বেশের মূরতি ।
সমরূপ-রঙ্গ-ঢঙ্গ স্বভাব-প্রকৃতি ॥ ১৬ ॥
জন্মাবধি মাতৃগর্ভে বেশের
গঠন ।
সে বুঝে মানুষে কিসে ব্রহ্মাদির ভ্রম ॥ ১৭ ॥
যে ঠাকুর এতদূর অবিকল সাজে ।
তিল আধ নাহি শক্তি নরে তারে বুঝে ॥ ১৮ ॥
কর্ম-কাণ্ড সেইমত মুরতি যেমন ।
মায়াপর
ক্ষুদ্র নর মুদিত নয়ন ॥ ১৯ ॥
সৎবুদ্ধিহীন ক্ষীণ আসক্তির দাস ।
কামিনীকাঞ্চন-সেবা
সদা অভিলাষ ॥ ২০ ॥
অন্তর্দৃষ্টি নাহি বাহে গত মন-প্রাণ ।
তৈলকার-যন্ত্রে বন্ধ বলদ
সমান ॥ ২১ ॥
কেমনে দেখিবে লীলা কি চিনিবে তাঁয় ।
মহাযোগেশ্বর যথা পাগল বনায় ॥ ২২ ॥
বালকের প্রায় বিষ্ণু ভাসে সিন্ধু নীরে ।
কি রহস্য চারি আস্বস্থ্য গাভী-বৎস হয়ে ॥ ২৩ ॥
মত্তবৎ শুকদেব বিহীন বসন ।
পুরাণ লিখিয়া ব্যাস তবু ক্ষুন্নমন ॥ ২৪ ॥
সর্ব
অঙ্গ ইন্দ্রিয়াদি একতানে ল'য়ে ।
শুদ্ধনাম অবিরাম নারদ গাইয়ে ॥ ২৫ ॥
না পাইয়া কোন তত্ত্ব উদাসীর প্রায় ।
সুকৌশল গণ্ডগোল করিয়া বেড়ায় ॥ ২৬ ॥
অনন্ত বদনে জপি না পেয়ে আভাস ।
অনন্ত মরমে কৈল পাতালেতে বাস ॥ ২৭ ॥
অগণন ফণা মাথা একত্র করিয়া ।
লজ্জায় ধরণী ধার রাখে আবরিয়া ॥ ২৮ ॥
দেবগণ বৃথা শ্রম অনর্থ যাতনা ।
বুঝিয়া বিহরে স্বর্গে লয়ে বারাঙ্গনা ॥ ২৯ ॥
কিবা হাসি যোগী ঋষি শ্রদ্ধার আস্পদ ।
আশায় গোঁয়ায় বনে ছাড়ি জনপদ ॥ ৩০ ॥
অনশনে একমনে ধ্যানে নিমগন ।
গত কত শত যুগ না যায় গণন ॥ ৩১ ॥
তবু নয় সিদ্ধকাম মরম অধিক ।
লুকায় লইয়া কায় সুদীর্ঘ বল্মীক ॥ ৩২ ॥
হেন তত্ত্বাতীত যাঁরে না মিলে সাধনে ।
মায়া-মত্ত-চিত নরে কি প্রকারে চিনে ॥ ৩৩ ॥
এ হেন ঠাকুর গুপ্ত অবতার সাজে ।
সঙ্গে আত্মগণ সাঙ্গ ধরণীর মাঝে ॥ ৩৪ ॥
নিজে যেন মহাগুপ্ত তেন আত্মগণ ।
খনিমধ্যে কাদামাখা মানিক যেমন ॥ ৩৫ ॥
দুর্বল সুগুপ্ত তবু সর্বশক্তিমান ।
দেখিবে, যে লবে প্রভু রামকৃষ্ণ নাম ॥ ৩৬ ॥
শুনরে অবোধ মন লীলাকথা তাঁর ।
ভবব্যাধি-মহৌষধি শান্তির ভাণ্ডার ॥ ৩৭ ॥
শ্রীরামকুমার তাঁর জ্যেষ্ঠ সহোদর ।
ভক্তিমান শাস্ত্রাধ্যায়ী পণ্ডিতপ্রবর ॥ ৩৮ ॥
সুশিক্ষিত টোলে তিনি এই শুনি কথা ।
টোল করিবারে আসিলেন কলিকাতা ॥ ৩৯ ॥
ঝামাপুকুরেতে টোল করিলা স্থাপন ।
সন্নিকটে দিগম্বর মিত্রের ভবন ॥ ৪০ ॥
জুটিলেন প্রভুদেব কিছু দিন পরে ।
একত্রে কাটেন কাল দুই সহোদরে ॥ ৪১ ॥
সর্বদা অগ্রজ করে অনুজে যতন ।
শিখিবারে কিছু কিছু শাস্ত্র-ব্যাকরণ ॥ ৪২ ॥
অধ্যয়নে অন্যমন বলেন উত্তরে ।
প্রভুদেব গদাধর জ্যেষ্ঠ সহোদরে ॥ ৪৩ ॥
সে বিদ্যায় বল দাদা কিবা উপকার ।
চাল কলা দুটামাত্র শেষ ফল যার ॥ ৪৪ ॥
হৃদয়ে
অবিদ্যা আনে যে বিদ্যা-অর্জনে ।
শিখিতে এমন বিদ্যা কহ কি কারণে ॥ ৪৫ ॥
হইলে
শিক্ষার কথা নাহি যেন কান ।
হেথা-সেথা যথা ইচ্ছা বেড়িয়া বেড়ান ॥ ৪৬ ॥
পল্লীমধ্যে
পরিচিত শ্রীরামকুমার ।
কেবল পাণ্ডিত্যে নহে বহুগুণ তাঁর ॥ ৪৭ ॥
সিদ্ধবাক্ স্বল্পে তুষ্ট অতি মিষ্টভাষী ।
সাধুর প্রকৃতিযুক্ত ঈশ্বরবিশ্বাসী ॥ ৪৮ ॥
দেবদ্বিজে
ভক্তিশ্রদ্ধা নিষ্ঠাপরায়ণ ।
যাহে হৈলা অনেকের ভক্তির ভাজন ॥ ৪৯ ॥
উপযুক্ত দেখি পাত্র পরম আহ্বলাদে ।
নিয়োজিত করে তাঁয় পুরোহিত-পরে ॥ ৫০ ॥
ক্রমে ক্রমে দেখাদেখি হইল সত্বর ।
সম্ভ্রান্ত অনেকগুলি যজমান-ঘর ॥ ৫১ ॥
প্রতিঘরে ঠাকুরের সেবা দুইবেলা ।
তদুপরি সাময়িক পূজা-ব্রতমালা ॥ ৫২ ॥
সারিয়া টোলের কাজ এ সব করিতে ।
বিশ্রামের কাল নাহি হয় কোনমতে ॥ ৫৩ ॥
অবিরাম শ্রমে হয় কষ্ট অতিশয় ।
সংসারে অভাব বহু না করিলে নয় ॥ ৫৪ ॥
এ হেন সময় তথা প্রভুর গমন ।
উদাসীন বিদ্যাভ্যাসে হইল না মন ॥ ৫৫ ॥
কাজেই অগ্রজ নিয়োজিত কৈলা তাঁয় ।
যজমান-ঘরে নিত্য ঠাকুর সেবায় ॥ ৫৬ ॥
মনোমত পেয়ে কর্ম অনুজ তখন ।
অগ্রজের অনুমতি করেন পালন ॥ ৫৭ ॥
শ্রীপ্রভুর স্বভাবেতে বহে অবিকল ।
কুসুমের
পরিমল কোমল শীতল ॥ ৫৮ ॥
জীব-মধুকর মত্ত বিভোর যাহায় ।
যে আসে যখন সেই ফুলের
সীমায় ॥ ৫৯ ॥
যজমান-ঘরে যত পুরুষ কি মেয়ে ।
সকলের মহানন্দ প্রভুরে পাইয়ে ॥ ৬০ ॥
বিশেষতঃ স্ত্রীলোকেরা হৃদয় সবলা ।
বয়োনিবিশেষে বৃদ্ধা যুবতী কি বালা ॥ ৬১ ॥
দুই বেলা যাওয়া-আসা তাহাদের ঘরে ।
দেখাশুনা আলাপনা ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ॥ ৬২ ॥
ক্রমে পেয়ে পরিচয় গুণ শ্রীপ্রভুর ।
হইল দ্বিতীয় হেথা কামারপুকুর ॥ ৬৩ ॥
ফলমূল মিষ্টান্নাদি মনের মতন ।
সতত তাঁহাকে দিত করিয়া যতন ॥ ৬৪ ॥
না দেখিলে একদিন ব্যাকুল অন্তর ।
লইত যে কোনরূপে প্রভুর খবর ॥ ৬৫ ॥
শুনিত অমিয়-মাখা শ্রীমুখের গান ।
পুলকিত তাহে এত দ্র্রবিত পরাণ ॥ ৬৬ ॥
গানে তাঁর মহাশক্তি মিশান থাকিত ।
হউক পাষাণ তবু শুনিলে গলিত ॥ ৬৭ ॥
হইত তখনি আঁখি জলের ফোয়ারা ।
অবিরত বিগলিত দরদর ধারা ॥ ৬৮ ॥
মহাভাগ্যবান যেবা শুনিয়াছে কানে ।
আজীবন মাধুরী-ঝঙ্কার তুলে প্রাণে ॥ ৬৯ ॥
মোহনিয়া শ্রীবদনে গীত এত মিঠে ।
শুনিলে হৃদয়-তন্ত্রী নেচে নেচে উঠে ॥ ৭০ ॥
এতেক রূপের ছবি বাক্যে না বেরোয় ।
ভুবনমোহিনী মায়া দেখে মুগ্ধ যায় ॥ ৭১ ॥
তদুপরে গীতিস্বরে এতই মাধুরী ।
শ্রীকণ্ঠে
লুকান যেন মোহন বাঁশরী ॥ ৭২ ॥
সকলেই যুদ্ধচিত সঙ্গীত-শ্রবণে ।
কে বলিবে কি আনন্দ
দিব্য দরশনে ॥ ৭৩ ॥
যে বারেক দেখিয়াছে শুনিয়াছে গান ।
তার ঘরে আর নাহি থাকে মন
প্রাণ ॥ ৭৪ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা অপরূপ মিঠে ।
যত ধীরে যাবে তলে তত সুধা উঠে ॥ ৭৫ ॥
হৃদয়ের তৃপ্তিকর মধুর ভারতী ।
ধীরে ধীরে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৭৬ ॥