দ্বিতীয় খণ্ড

পুরী প্রবেশ এবং রানী ও মথুরের সঙ্গে পরিচয়


জয় জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


সুকৌশলী যাদুকর প্রভু-নারায়ণ ।
কেমনে করেন ভক্ত মন আকর্ষণ ॥ ১ ॥

অলক্ষ্যেতে লীলার পত্তন সমুদয় ।
ক্রমে ক্রমে শুন মন কহি পরিচয় ॥ ২ ॥

প্রভুর বিচিত্র খেলা কহনে না যায় ।
এবে বারশ-বাষ্টট্টি সাল গণনায় ॥ ৩ ॥

শ্রীপ্রভুর বয়ঃ মাত্র উনিশ বৎসর ।
এক দিন শুভক্ষণে পুরীর ভিতর ॥ ৪ ॥

মহাভক্ত শ্রীমথুর নেহারিয়া তাঁরে ।
পরিচয় জিজ্ঞাসিল শ্রীরামকুমারে ॥ ৫  ॥

কে নবীন ব্রহ্মচারী বয়ঃ সুকুমার ।
উত্তরে বলিলা তেঁহ, অনুজ আমার ॥ ৬ ॥

মথুর বলিল মূর্তি প্রীতি-দরশন ।
পুরীমধ্যে রাখিবারে বড় লয় মন ॥ ৭ ॥

পুনশ্চ কহিলা তাঁয় শ্রীরামকুমার ।
এখানে থাকিতে নাহি করিবে স্বীকার ॥ ৮ ॥

আর না বলিল কিছু মথুর সে দিন ।
কিন্তু মনে জাগে মুগ্ধ মূরতি নবীন ॥ ৯ ॥

আকৃষ্ট মথুর মন টানে থেকে থেকে ।
মহা আকর্ষণী প্রভু চরণ-চুম্বকে ॥ ১০ ॥

এমন সময় জুটে আসে সেইখানে ।
বিধির ঘটনা কিবা হৃদয় ভাগিনে ॥ ১১ ॥

অতি প্রিয় আত্মীয়স্বজন শ্রীপ্রভুর ।
ধরাধামে ভাগ্যবান হৃদয় ঠাকুর ॥ ১২ ॥

হৃদয়ে পাইয়া নাহি প্রীতি সীমা তাঁর ।
দুই জনে এক সঙ্গে আহার-বিহার ॥ ১৩ ॥

বাল্যাবধি শ্রীপ্রভুর ভালরূপে জানা ।
মাটিতে গড়িতে দেব-দেবীর প্রতিমা ॥ ১৪ ॥

রংগে-ঢংগে এতদূর মূর্তি অবিকল ।
মৃন্ময় কে বলে যেন জীবন্ত সকল ॥ ১৫ ॥

শিল্পকর কারিকর প্রভুর মতন ।
শ্রবণে না শুনি চক্ষে নহে দরশন ॥ ১৬ ॥

আপনার পূজার কারণ পরমেশ ।
যতনে গড়িলা গঙ্গা-মাটির মহেশ ॥ ১৭ ॥

ত্রিশূল ডমরু আধি নাগ-আভরণ ।
শশী ফোঁটা শিরে জটা বলদ বাহন ॥ ১৮ ॥

ত্রিলোক-বিজয়ী বৃষ গড়া হেন ঠামে ।
হইলেও মুক্ত আখি দেখে পড়ে ভ্রমে ॥ ১৯ ॥

ভ্রমিতে ভ্রমিতে পুরীমধ্যে শ্রীমথুর ।
অবাক হইল দেখি, কীর্তি শ্রীপ্রভুর ॥ ২০ ॥

মাটির বানানো শিব সঠিকের প্রায় ।
কৈলাস হইতে যেন উদয় ধরায় ॥ ২১ ॥

কি দিয়া গড়িলা প্রভু কি দিলা ভিতরে ।
কি হেরিয়া দর্শকের মন প্রাণ হরে ॥ ২২ ॥

কি দেখিল দরশক বলিব কেমনে ।
আঁখি মুদি দেখ মন হৃদয়-দর্পণে ॥ ২৩ ॥

ভক্ত-মন-হর প্রভু কৌশলী-অপার ।
নর-বুদ্ধি দিয়া তাঁর কার্য বুঝা ভার ॥ ২৪ ॥

লইয়া মৃন্ময় মূর্তি মথুর আপনি ।
দ্রুত উত্তরিল যথা রানী রাসমণি ॥ ২৫ ॥

পুলকে পূর্ণিত হৃদে বিস্ময়ের ভার ।
কহে কারিকর যেন সমকক্ষ তাঁর ॥ ২৬ ॥

ভুবন-মাঝার কোথা আছে বিদ্যমান ।
কে তিনি গঠন যার মূরতি সুঠাম ॥ ২৭ ॥

ভাগ্যবলে কারিকর পুরীর ভিতর ।
শ্যামার পূজারী যিনি তাঁর সহোদর ॥ ২৮ ॥

নবীন বয়েস, বেশ ব্রহ্মচারী প্রায় ।
দরশনে মন-প্রাণ মুগ্ধ হয়ে যায় ॥ ২৯ ॥

মনে লয় তাঁর যদি কালীর সেবনে ।
পুরীমধ্যে রাখা যায় অতি অল্প দিনে ॥ ৩০ ॥

জাগরিত করিতে পারেন শ্যামা মায়ে ।
এমত প্রতীত হয় তাঁহারে দেখিয়ে ॥ ৩১ ॥

প্রভুর নির্মিত শিব বৃষ দরশনে ।
উঠে মথুরের ভক্তি প্রভুর চরণে ॥ ৩২ ॥

তাড়াতাড়ি বাহিরে আসিয়া শ্রীমথুর ।
দেখিলা অদূরে সহ হৃদয় ঠাকুর ॥ ৩৩ ॥

ভ্রমিছেন প্রভুদেব আপনার মনে ।
পরস্পর নানাকথা প্রশস্ত উঠানে ॥ ৩৪ ॥

লোক দিয়া প্রভুস্থানে পাঠায় বারতা ।
বাসনা তাঁহার সঙ্গে কহিবেন কথা ॥ ৩৫ ॥

যাইতে না চান প্রভু মথুরের কাছে ।
পুরীতে থাকিতে তাঁয় জেদ করে পাছে ॥ ৩৬ ॥

মথুর না ছাড়ে বার্তা প্রেরে বারবার ।
ততই করেন প্রভুদেব অস্বীকার ॥ ৩৭ ॥

অবশেষে সহোদর শ্রীরামকুমারে ।
করে মহা অনুরোধ লয়ে যেতে তাঁরে ॥ ৩৮ ॥

রাখিয়া জ্যেষ্ঠের আজ্ঞা প্রভু গুণধর ।
উপনীত হইলেন মথুর-গোচর ॥ ৩৯ ॥

বরাবর সঙ্গে আছে ভাগিনে হৃদয় ।
ঠিক যেন বৃক্ষের পশ্চাতে ছায়া রয় ॥ ৪০ ॥

ভক্তবর শ্রীমথুর প্রভুরে দেখিয়া ।
উঠিলেন আপনার আসন ত্যজিয়া ॥ ৪১ ॥

সংগোপনে লইয়া কহেন ভক্তিভরে ।
পুরীতে পূজার কার্যে মত করিবারে ॥ ৪২ ॥

শ্রীপ্রভু বলেন তুমি ইহা বল কিবা ।
এ বড় জঞ্জাল করা ঠাকুরের সেবা ॥ ৪৩ ॥

বল কে লইবে হেপাজত নিরবধি ।
ঠাকুরের মূল্যবান সেবার দ্রব্যাদি ॥ ৪৪ ॥

তবে যদি হৃদু সঙ্গে থাকয়ে আমার ।
যতই না হোক কষ্ট করিব স্বীকার ॥ ৪৫ ॥

যে আজ্ঞা বলিয়া হৃদে আনন্দ প্রচুর ।
হৃদয়ে রাখিতে মত করিল মথুর ॥ ৪৬ ॥

স্থিতিমত স্থিরতর হইবার পর ।
কি হইল ইতোমধ্যে শুনহ খবর ॥ ৪৭ ॥

সৃষ্টিছাড়া হীনদৃষ্টি ধরে যেই জন ।
সে কহিবে এ সকল সামান্য কথন ॥ ৪৮ ॥

বাহ্য চোখে যে দেখিবে সে দেখিবে বাঁকা ।
আঁখি খুলে দেখা নয় আঁখি মুদে দেখা ॥ ৪৯ ॥

সামান্য তরঙ্গখেলা উপরে উপরে ।
ধন-রত্ন-মণি-খনি জলের ভিতরে ॥ ৫০ ॥

তুষ যেন তুচ্ছ বস্তু নাহি তার দর ।
ভিতরে যা ধরে তাই জীবন-শিকড় ॥ ৫১ ॥

সেইরূপ সামান্য ধরিয়া নারায়ণ ।
করিছেন লীলা-বৃক্ষ-বীজের রোপণ ॥ ৫২ ॥

একদিন পুরীমধ্যে এখানে সেখানে ।
ভ্রমিছেন প্রভু রানী দেখে শুভক্ষণে ॥ ৫৩ ॥

চমকি উঠিল প্রাণ দেখিয়া মুরতি ।
দিব্যভাবাপন্ন কায় দিব্য মুখজ্যোতি ॥ ৫৪ ॥

ব্রাহ্মণকুমার সুশ্রী ঈশদাঁখি বাঁকা ।
সুন্দর লাবণ্যকান্তি অঙ্গময় লেখা ॥ ৫৫ ॥

সুবিশাল বক্ষঃস্থল ললাট প্রশস্ত ।
সুশোভন নাসা বাহু আজানুলম্বিত ॥ ৫৬ ॥

অতি মনোহর ঠাম শোভার আগার ।
দেখিয়া হইল হৃদে ভক্তির সঞ্চার ॥ ৫৭ ॥

কেবল ভকতি নহে স্নেহ মিশামিশি ।
বারে বারে যত হেরে তত হয় খুশী ॥ ৫৮ ॥

ভক্তির আশ্চর্য খেলা শুনহ বারতা ।
কেমনে ভক্তের সঙ্গে প্রাণে প্রাণে কথা ॥ ৫৯ ॥

জীবের হৃদয়ে যাহা উপজে ভকতি ।
সে ভকতি নহে তার প্রভুর সম্পত্তি ॥ ৬০ ॥

ভক্তির আস্পদ প্রভু বিনা কেহ নয় ।
ভক্তি দিয়া ভগবান দেন পরিচয় ॥ ৬১ ॥

চুপে চুপে টানাটানি প্রাণের ভিতরে ।
চুম্বক লোহায় যেন পরস্পর করে ॥ ৬২ ॥



এ সময় ঘটে এক অদ্ভুত ঘটন ।
বিষ্ণুর পূজায় ব্রতী ছিল যে ব্রাহ্মণ ॥ ৬৩ ॥

শুভ দিন জন্মাষ্টমী পূজার সময় ।
ভাঙ্গিল বিষ্ণুর পদ ভীত অতিশয় ॥ ৬৪ ॥

কানে কানে সবে শুনে পুরীর ভিতর ।
অবশেষে পশে বার্তা রানীর গোচর ॥ ৬৫ ॥

ভক্তিমতী রাসমণি মরে মহাখেদে ।
বিষ্ণুর চরণভঙ্গ অশিব সংবাদে ॥ ৬৬ ॥

হুলস্থুল পড়ে গেল পুরীর ভিতরে ।
অগণন লোকজন কম্পমান ডরে ॥ ৬৭ ॥

বিশেষে পূজারী যেবা অনাবিষ্টমতি ।
পূজা বন্ধ ভগ্ন-অঙ্গে পূজা নয় রীতি ॥ ৬৮ ॥

নূতন মূরতি তাই পূজার কারণ ।
বিধি দিল আনিবারে বিধিজ্ঞ ব্রাহ্মণ ॥ ৬৯ ॥

শুনিয়া রানীরে প্রভু কহিলেন গিয়া ।
ভগ্ন-অঙ্গ মূর্তি ফেল কিসের লাগিয়া ॥ ৭০ ॥

বিধি বলি এ অবিধি দিল কোন্ জন ।
একত্রিত করে যত বিধিজ্ঞ ব্রাহ্মণ ॥ ৭১ ॥

যাহা আজ্ঞা শ্রীপ্রভুর শিরোধার্য করি ।
টোলে টোলে দিল বার্তা পুরী-অধিকারী ॥ ৭২ ॥

যথাদিনে সমাগত শাস্ত্রজ্ঞ সকল ।
শাস্ত্রবিধি লয়ে করে মহা কোলাহল ॥ ৭৩ ॥

শাস্ত্রে লেখা ভগ্ন-অঙ্গে পূজা বিধি নয় ।
এক মতে যত শাস্ত্রবিদগণে কয় ॥ ৭৪ ॥

শুন পরে কি হইল আশ্চর্য কাহিনী ।
চলিলেন প্রভু যথা রানী রাসমণি ॥ ৭৫ ॥

কহিলেন জিজ্ঞাসিতে শাস্ত্রজ্ঞ সকলে ।
স্বামীর ভাঙ্গিলে পদ কি করিতে বলে ॥ ৭৬ ॥

শাস্ত্রের বিধান কিবা হ'লে এ ব্যাপার ।
ফেলিতে সুযুক্তি কিবা যুক্তি চিকিৎসার ॥ ৭৭ ॥

অতি সোজা সরল শ্রীবাক্য শ্রীপ্রভুর ।
স্বভাবে আপুনি যেন সরল ঠাকুর ॥ ৭৮ ॥

সরলে দয়াল ভালবাসা সরলতা ।
সরলে সরল বড় রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ৭৯ ॥

সরলে বুঝিল রানী প্রভুর বচন ।
সভায় করিল সেই প্রশ্ন উত্থাপন ॥ ৮০ ॥

ঘটনার সঙ্গে প্রশ্ন লাগে যে প্রকার ।
বুঝিয়া পণ্ডিতগণে দেখায়ে আঁধার ॥ ৮১ ॥

সোজা কথা অতি মূর্খ পারে বুঝিবারে ।
শুনিয়া বিধিজ্ঞদের মুণ্ডু গেল ঘুরে ॥ ৮২ ॥

যায় কেন মুণ্ডু ঘুরে ভেবে দেখ মন ।
সরল উত্তর যেন সরল কথন ॥ ৮৩ ॥

বিধিমতে কহি কথা ভাবে কিবা দায় ।
ধীরগণ পরস্পর মুখপানে চায় ॥ ৮৪ ॥

কাটা যায় দত্ত-বিধি শাস্ত্রসহ তার ।
যদি কয় স্বামী উপযুক্ত চিকিৎসার ॥ ৮৫ ॥

অথচ চরণভঙ্গ স্বামী দেয় ফেলে ।
ধরি নর-কলেবর, কি করিয়া বলে ॥ ৮৬ ॥

অবশেষে শাস্ত্র ছাড়ি দিতে হইল বিধি ।
পীড়িত পতির সেবা যুক্তি নিরবধি ॥ ৮৭ ॥

মীমাংসায় ভেসে যায় রানী সুখ-নীরে ।
চৌগুণ বাড়িল ভক্তি প্রভুর উপরে ॥ ৮৮ ॥

প্রভুরে জানিয়া কারিগর শিরোমণি ।
করপুটে প্রভুরে কহিল রাসমণি ॥ ৮৯ ॥

সারিবারে ভগ্ন পদ আপনার ভার ।
সায় দিয়া প্রভুদেব করিলা স্বীকার ॥ ৯০ ॥

ভগ্ন পদ সারিয়া দিলেন সেই দিনে ।
কোথায় ভাঙ্গিয়াছিল সাধ্য কার চিনে ॥ ৯১ ॥

অবাক হইল সবে পুরীর ভিতর ।
কিবা মহা সুকৌশলী প্রভু কারিগর ॥ ৯২ ॥

কি বুঝ আশ্চর্য মন, কথা, কথা ছাড়া ।
এ মহান্ বিশ্ব যাঁর সঙ্কেতেতে গড়া ॥ ৯৩ ॥

হয় রয় যায় সৃষ্টি যাঁহার আজ্ঞায় ।
সারিলেন ভগ্ন পদ কি বিচিত্র তায় ॥ ৯৪ ॥

তবে এবে নর দেহ নরের মতন ।
দীন-দুঃখী নিরক্ষর পরান্ন-ভোজন ॥ ৯৫ ॥

লইয়া ব্রাহ্মণ-বেশ খেলেন আপুনি ।
হর্তা কর্তা বিশ্বের বিধাতা চিন্তামণি ॥ ৯৬ ॥

মানুষে না চিনে নর-জ্ঞানে লয় তাঁরে ।
তাই লোকে অবাক করম তাঁর হেরে ॥ ৯৭ ॥

ভিতরে অসীম শক্তি শক্তির আধার ।
বাজে মাত্র সাজা বেশ ফল্গুর আকার ॥ ৯৮ ॥

সৎবুদ্ধিযুক্ত হরিলুব্ধ চক্ষুষ্মান ।
স্পষ্ট দেখে খেলে তাঁহে রসের তুফান ॥ ৯৯ ॥

তুষ্ট হয়ে ভক্ত রানী ভক্তিভরে তাঁয় ।
বলিলেন থাকিবারে বিষ্ণুর সেবায় ॥ ১০০ ॥

ধার্য করি শ্রীপ্রভুর মাসিক বেতন ।
ছোট ভট্টাচার্য আখ্যা করিল অর্পণ ॥ ১০১ ॥

বড় ভাই বড় ভট্টাচার্য মহাশয় ।
শ্যামা-বেশকারী হ'ল ভাগিনে হৃদয় ॥ ১০২ ॥

গঙ্গাতীরে যেথা যত আছে দেবালয় ।
তুলনায় এ পুরীর সঙ্গে কেহ নয় ॥ ১০৩ ॥

পুরী দেখিবারে আসে কত লোকজন ।
ধনী-মানী-গুণী-দুঃখী সকল রকম ॥ ১০৪ ॥

কালী মায়ে রাধাশ্যামে যারা ধনবান ।
ভক্তিভরে অর্থ দিয়া করেন প্রণাম ॥ ১০৫ ॥

আগাগোড়া এই রীতি পুরীর ভিতরে ।
পূজারীর প্রাপ্য যাহা প্রণামীতে পড়ে ॥ ১০৬ ॥

প্রভুদেব টাকাকড়ি নাহি লন হাতে ।
বলিতেন দুঃখিগণে বিলাইয়া দিতে ॥ ১০৭ ॥

ত্যাগী অনাসক্ত প্রভু ছিলা আজীবন ।
যতই প্রণামী পড়ে সব বিতরণ ॥ ১০৮ ॥



ছয় মাস বিষ্ণুর মন্দিরে পূজা করি ।
পশ্চাৎ হইলা প্রভু শ্যামার পূজারী ॥ ১০৯ ॥

বিষ্ণুর সেবাতে হৈল অগ্রজের ভার ।
ইহাতে সন্তুষ্ট ভারি শ্রীরামকুমার ॥ ১১০ ॥

এইরূপে কিছুদিন গত হইলে পর ।
ত্যজিলেন শ্রীরামকুমার কলেবর ॥ ১১১ ॥

অগ্রজের লোকান্তরে শ্রীপ্রভু এখন ।
শ্যামার সেবায় দিল ষোল আনা মন ॥ ১১২ ॥

প্রভুর অপার কথা কে কহিবে ক'টি ।
কোটি-মুখে কহিলেও তবু ত্রুটি কোটি ॥ ১১৩ ॥

পড়ে দামামায় কাঠি আগুন রঞ্জকে ।
যে হ'তে আইলা প্রভু পুজিতে শ্যামাকে ॥ ১১৪ ॥

শ্যামায় পিরীতি বড় শ্যামা মনপ্রাণ ।
তপ-জপ-তন্ত্র-মন্ত্র ধন ধ্যান-জ্ঞান ॥ ১১৫ ॥

সুদৃশ্য রচেন বেশ প্রভু গুণধর ।
দেখামাত্র দর্শকের বিমোহে অন্তর ॥ ১১৬ ॥

নিত্যই নূতন বেশ নাহিক উপমা ।
মুর্তিমতী ঠিক যেন চিৎময়ী শ্যামা ॥ ১১৭ ॥

বিবিধ কুসুম জবা শ্রীচরণে সাজে ।
অপরূপ শ্যামা-রূপ শ্রীমন্দির মাঝে ॥ ১১৮ ॥

উপজয়ে দিব্য ভাব পাষণ্ড-অন্তরে ।
একবার শ্যামা-রূপ নয়নেতে হেরে ॥ ১১৯ ॥

ঘোষণা হইল বার্তা কথায় কথায় ।
আছে বহু কালীমূর্তি এমন কোথায় ॥ ১২০ ॥

দলে দলে আসে লোক কত দিক হ'তে ।
নিরুপমা শ্যামা-মাতা এখানে দেখিতে ॥ ১২১ ॥

অতিথি-সেবন-শালা পুরীর ভিতরে ।
কত আসে যায় সাধু সংখ্যা কেবা করে ॥ ১২২ ॥

শ্যামা দেখি সর্বজনে সমস্বরে কন ।
কোথাও না করি হেন মূর্তি দরশন ॥ ১২৩ ॥

নব ভাবে মাতি সবে কহে উচ্চৈঃস্বরে ।
কি জানি কি আছে শ্যামা-প্রতিমা ভিতরে ॥ ১২৪ ॥

তড়িতের বার্তাবহ তারেতে যেমন ।
দ্রুতগতি ছুটে কথা বিদ্যুৎ-মতন ॥ ১২৫ ॥

সেরূপ সুঠাম শ্যামা প্রতিমা-কাহিনী ।
পরস্পর সাধু-মুখে ছুটিল অমনি ॥ ১২৬ ॥

অতিথি সন্ন্যাসী ভক্ত থাকে যে যেখানে ।
দক্ষিণেশ্বরের কথা শুনে কানে কানে ॥ ১২৭ ॥

সুগূঢ় প্রভুর কথা কি শকতি বলি ।
প্রচারিলা নিজ স্থান সাজাইয়া কালী ॥ ১২৮ ॥

আপনে রাখিলা গুপ্ত পূজারীর সাজে ।
নাহি দিলে ধরা-ছু'য়া সাধ্য কার বুঝে ॥ ১২৯ ॥

গুহ্য হ'তে অতি গুহ্য তাঁহার করম ।
মায়া-অন্ধ নরে কিবা বুঝিবে মরম ॥ ১৩০ ॥

মানুষ থাকুক দূরে দেবাদির শক্ত ।
কৃপায় যদ্যপি নাহি আঁখি হয় মুক্ত ॥ ১৩১ ॥

মায়া-ছানি-মুক্ত চক্ষু নহে যতক্ষণ ।
কদাচ না হয় তাঁর লীলা দরশন ॥ ১৩২ ॥

মানুষের খোল ল'য়ে আপনি শ্রীহরি ।
বিরাজেন পুরী-মধ্যে হইয়া পূজারী ॥ ১৩৩ ॥

যেখানে যখন হয় বিরাজের স্থান ।
দিব্য ভাব সদা তথা থাকে বিদ্যমান ॥ ১৩৪ ॥

পুরীতে আসিয়া লোকে এত প্রীতি পায় ।
সে কেবা এসেছে কোথা সব ভুলে যায় ॥ ১৩৫ ॥

নবভাব-আবির্ভাব এমন অন্তরে ।
ঠাকুর প্রসাদ পায় ভক্তি সহকারে ॥ ১৩৬ ॥

ব্রাহ্মণেও নাহি রাখে জাতির বিচার ।
শুন রামকৃষ্ণ-কথা অমৃত-ভাণ্ডার ॥ ১৩৭ ॥

ভকতবৎসল প্রভু ভক্তগত-প্রাণ ।
নাহি কেহ প্রিয় তাঁর ভক্তের সমান ॥ ১৩৮ ॥

রানীর আছিল বড় হৃদয়ে বিবাদ ।
উচ্চবর্ণে তুচ্ছ করে ঠাকুর-প্রসাদ ॥ ১৩৯ ॥

সে বিষাদ একেবারে করিবারে দূর ।
পুরী-মধ্যে প্রবেশিলা দয়াল ঠাকুর ॥ ১৪০ ॥

প্রসাদ আপনে পেয়ে করুণা-নিদান ।
অভ্যাগত তথা যেবা তাহারে পাওয়ান ॥ ১৪১ ॥

নিষ্ঠাচারী তাহারাও বিচার না করে ।
প্রসাদ উঠায়ে খায় অতি ভক্তিভরে ॥ ১৪২ ॥

শ্যামা-ভক্ত রাসমণি শ্যামা ভালবাসে ।
দেখে শ্যামা নিরুপমা পরম হরিবে ॥ ১৪৩ ॥

কালীমাতা বিভূষিতা কবি দরশন ।
কত যে আনন্দ তাঁর নাহি নিরূপণ ॥ ১৪৪ ॥

বেশকারী প্রভু বেশ তাঁহার রচিত ।
দেখিলেই হয় মুগ্ধ মন-প্রাণ-চিত ॥ ১৪৫ ॥

জনমে রানীর ভক্তি প্রভুর উপরে ।
কি পরাণ-প্রতিমা শ্যামা সুসজ্জিত হেরে ॥ ১৪৬ ॥

বুঝিল প্রভুর বেশ সেবা-অনুরাগে ।
পাষাণ-মুরতি শ্যামা উঠিয়াছে জেগে ॥ ১৪৭ ॥

দিন দিন ভক্তি-প্রীতি অতি বৃদ্ধি পায় ।
শ্যামার সেবায় রত শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ১৪৮ ॥

ঈশ্বর-প্রসঙ্গ কভু হয় দুইজনে ।
কন প্রভু গুণধর ভক্ত রানী শুনে ॥ ১৪৯ ॥

কখন কখন মিঠা শ্যামা-গুণগান ।
শুনিয়া রানীর হয় শীতল পরাণ ॥ ১৫০ ॥

শ্যাম-শ্যামা-গুণগান প্রভুর বদনে ।
কি মিঠা সে জানে যেবা শুনিয়াছে কানে ॥ ১৫১ ॥

মধুর সুস্বর কিবা নহে বলিবার ।
পিক-অলি বীণা-বেণু একত্র ঝঙ্কার ॥ ১৫২ ॥

দিব্যভাব পরিপূর্ণ মাখান ভিতরে ।
শুনিলে পাষাণ-মন দ্রবীভূত করে ॥ ১৫৩ ॥

কিবা আভা শোভা ফুল্ল বদনকমলে ।
আজন্ম পাষণ্ড যেবা সেও দেখে ভুলে ॥ ১৫৪ ॥

সঙ্গীতে রানীর নেশা হৈল অতিশয় ।
নিত্য নিত্য একবার না শুনিলে নয় ॥ ১৫৫ ॥

ত্রুটি নাহি সর্ব অঙ্গে পূজা সু-সুন্দর ।
পুজায় সেবায় যায় প্রহর প্রহর ॥ ১৫৬ ॥

ডুবিয়া যাইত যোল আনা মন-প্রাণ ।
কিছু না থাকিত তাঁর বাহ্যিক গিয়ান ॥ ১৫৭ ॥

কেবা কিবা কয় কেবা কোথা আসে যায় ।
শুনা দেখা নাই এত প্রমত্ত পূজায় ॥ ১৫৮ ॥

মধুলুব্ধ মধুপ যেমন ফুল্ল ফুলে ।
মত্ত হয়ে পিয়ে মধু মন-প্রাণ ভুলে ॥ ১৫৯ ॥

উলট-পালট খায় দলের উপর ।
আপনার দেহ কোথা নাহিক খবর ॥ ১৬০ ॥

কোথা শক্তিধর পাখা সকলের মূল ।
নাই গ্রাহ্য থাক যাক সুকোমল হুল ॥ ১৬১ ॥

টান দিয়ে শুষে চুষে বিভোর নেশায় ।
সেই মত প্রভুদেব শ্যামার পূজায় ॥ ১৬২ ॥

এবে ঘোর কলিকাল যত জীবগণে ।
পূজিতে ভজিতে জানে কামিনীকাঞ্চনে ॥ ১৬৩ ॥

দেবদেবী-পূজা সেবা আছি আরাধনা ।
জপ-তপ ক্রিয়া-কর্ম সাধন-ভজনা ॥ ১৬৪ ॥

একবারে লুপ্ত প্রায় গোটা ধরাতল ।
যাহা কিছু আছে মাত্র নাম সে কেবল ॥ ১৬৫ ॥

তাই প্রভু দয়াময় দয়ার সাগর ।
উপনীত ধরাধামে ধরি কলেবর ॥ ১৬৬ ॥

শিক্ষণ দিতে জীবগণে চিরহিতকারী ।
সাধন ভজন পূজা আপনে আচরি ॥ ১৬৭ ॥

প্রভুর পূজার কথা অমৃত ভারতী ।
কেমনে করেন শুন শ্যামার আরতি ॥ ১৬৮ ॥

সুবিদিত রাসমণি তাঁর দেবালয় ।
উপযুক্তমত বাদ্য আরতি-সময় ॥ ১৬৯ ॥

খোল করতাল বাদ্য বিষ্ণুর প্রাঙ্গণে ।
বাজে জোড়া নহবত উত্তর দক্ষিণে ॥ ১৭০ ॥

বাজে জোড়া কাঁসর দামামা-ঘড়ি বাজে ।
মা মা রব উচ্চে সব গায়ে পুরীমাঝে ॥ ১৭১ ॥

এখানে মন্দিরে প্রভুদেব ভগবান ।
তেজস্বী তপস্বী সম বর্ণ দীপ্তিমান ॥ ১৭২ ॥

মহাক্রমে বৃহৎ আরতি এক করে ।
গুরুভার ঘণ্টা প্রভু ধরিয়া অপরে ॥ ১৭৩ ॥

আলো করি শ্রীমন্দির করেন আরতি ।
দেখ মন এবে কিবা প্রভুর মূরতি ॥ ১৭৪ ॥

ভক্তগণ মনোলোভা শোভা নিরুপম ।
উপমায় কিছু নাই আঁকিতে অক্ষম ॥ ১৭৫ ॥

হয় ক্লান্ত কলেবর যত বাদ্যকরে ।
বাজাইতে বহুক্ষণ হাত গেল ভরে ॥ ১৭৬ ॥

শব্দ গেল স্তব্ধ সব ঘর্মে আদ্রকায় ।
প্রভুর আরতি ঘণ্টা তবু না ফুরায় ॥ ১৭৭ ॥

ঘোর ঘন ঘন শব্দে ঘণ্টা বেজে চলে ।
হেলে দুলে আরতি দক্ষিণ করে খেলে ॥ ১৭৮ ॥

অবিরাম চলিতেছে আরতি অতুল ।
বাহ্য নাহি প্রভু যেন কলের পুতুল ॥ ১৭৯ ॥

রক্তিম বরণ মুখমণ্ডলে বেড়ায় ।
উচ্চরবে মা মা রব পাগলের প্রায় ॥ ১৮০ ॥

অবশেষে জড়বৎ বাহ্য হারাইয়া ।
হৃদয় বাহিরে আনে যতনে ধরিয়া ॥ ১৮১ ॥

এই মত প্রার হয় আরতির কালে ।
না বুঝিয়া লোকে-জনে উন্মত্ততা বলে ॥ ১৮২ ॥

দিবাভাগে বলিলাম পুজার ধরন ।
সাধনা রাত্রিতে হয় শুন শুন মন ॥ ১৮৩ ॥

ভক্তভাবে অবতার প্রভু ভগবান ।
কুলহারা জীবে দিতে ধর্মের বিধান ॥ ১৮৪ ॥

ভক্তভাবী ভগবান তাঁহার বারতা ।
আমাদের সঙ্গে তাঁর বিপরীত কথা ॥ ১৮৫ ॥

এক ভগবান আর জীব অগণন ।
জীবভাবে জীবভাবে সদা সংমিলন ॥ ১৮৬ ॥

ভক্তভাবে জীবভাবে কখন না মিলে ।
তাই ক্ষেপা প্রভুদেব জীবগণে বলে ॥ ১৮৭ ॥

দেশে রাষ্ট্র হৈল কথা বড় পরমাদ ।
সবে কর হইয়াছে গদাই উন্মাদ ॥ ১৮৮ ॥

হেন পরমাদ কথা মনে হয় ডর ।
ইহার ভিতরে আছে বড়ই রগড় ॥ ১৮৯ ॥

বিয়া করিবার সাধ বড় তাঁর মনে ।
উন্মাদ প্রবাদে লোকে কন্যা দিবে কেনে ॥ ১৯০ ॥

শ্রীপ্রভুর বিবাহের সাধ অতিশয় ।
মানুষে যেরূপ করে সে প্রকারে নয় ॥ ১৯১ ॥

বালকস্বভাব প্রভু বালক-আচার ।
বয়সের সঙ্গে মাত্র বাড়িছে আকার ॥ ১৯২ ॥

বালকের ভাব খেলে বাক্যকায়মনে ।
স্মরণ রাখিও কথা শয়নে স্বপনে ॥ ১৯৩ ॥

সরল মধুর বড় রামকৃষ্ণ-কথা ।
বুঝিতে নারিবে যদি ভুলহ বারতা ॥ ১৯৪ ॥

শ্রবণান্দোলনে মন না করিবে হেলা ।
ভবসিন্ধু তরিবার একমাত্র ভেলা ॥ ১৯৫ ॥