দ্বিতীয় খণ্ড
তান্ত্রিক সাধনা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শুন মন শ্রীপ্রভুর ভজন-সাধনা ।
এক মনে শুনে কিবা গায় যেই জনা ॥ ১ ॥
গেঁটে বাঁধে খাঁটি সোনা ভক্তি সমুজ্জ্বল ।
রামকৃষ্ণ-কথা হেন শ্রবণমঙ্গল ॥ ২ ॥
তন্ত্রমতে করিবারে ভজন-সাধনা ।
হইল এখন মনে প্রবল বাসনা ॥ ৩ ॥
সে সময়ে এক জনা আসে দ্বিজবর ।
শহরে বসতি মাত্র পাড়াগাঁয়ে ঘর ॥ ৪ ॥
তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ তেঁহ ভক্তিমান অতি ।
দেখিয়া তাঁহায় প্রভু করিলা যুকতি ॥ ৫ ॥
লইব শক্তির মন্ত্র ব্রাহ্মণের পাশ ।
গোপনে করিলা তারে মন্তব্য প্রকাশ ॥ ৬ ॥
মহাভাগ্যবান দ্বিজ ভাগ্যসীমা নাই ।
গুরুরূপে লৈলা যাঁরে জগৎ-গোসাঁই ॥ ৭ ॥
তুষ্ট চিতে দিলা সায় তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ ।
দেখি পাঁজি শুভদিন হয় নির্ধারণ ॥ ৮ ॥
কেমনে লইলা মন্ত্র শুন অতঃপরে ।
দীক্ষাস্থান-নিরূপণ শ্যামার মন্দিরে ॥ ৯ ॥
আচরিয়া সংযমন যথাশাস্ত্র-রীতি ।
প্রবেশিলা শ্রীমন্দিরে দ্বিজের সংহতি ॥ ১০ ॥
দীক্ষাগুরু যেন মন্ত্র দিলা কর্ণমূলে ।
হুঙ্কারি বসিলা প্রভু হর বক্ষঃস্থলে ॥ ১১ ॥
শ্যামার শ্রীপদে লগ্ন যে শিব স্থাপন ।
শ্যামা সঙ্গে এক ঠাঁই কৈলা আরোহণ ॥ ১২ ॥
দীক্ষাগুরু দরশন করি মহাত্রাসে ।
বাপ বাপ ডাকিয়া পলার ঊর্ধ্বশ্বাসে ॥ ১৩ ॥
লীলাময় লীলা তব বুঝে সাধ্য কার ।
অচিন্ত্য অবোধ্য কার্য বিস্ময় ব্যাপার ॥ ১৪ ॥
প্রভুর রকম কেহ বুঝিতে না পারে ।
যা দেখে তাহায় তাঁরে ক্ষেপা জ্ঞান করে ॥ ১৫
॥
মানুষের হয় যদি উন্মাদ-লক্ষণ ।
ঔষধ তাহার পক্ষে নারী-সংঘটন ॥ ১৬ ॥
এমত ভাবিয়া যত আত্মীয়-স্বজনে ।
ভাগিনা হৃদয়ে ডাকি কহে সংগোপনে ॥ ১৭ ॥
রূপসী যুবতী এক করিয়া সংগ্রহ ।
তাঁহার সহিত শীঘ্র জুটাইয়া দেহ ॥ ১৮ ॥
হৃদয় সুযুক্তি বুঝে তাদের বচনে ।
আনিল রূপসী এক প্রভুর কারণে ॥ ১৯ ॥
রাত্রিকালে
থাকিতেন প্রভু যেই ঘরে ।
গোপনে থাকিয়া হৃদু পাঠায় তাহারে ॥ ২০ ॥
হাবভাব
প্রকাশিয়া রূপসী হেথায় ।
পাতিয়া মোহিনী-জাল প্রভু-পাশে যায় ॥ ২১ ॥
বিষভরা কাল সর্পী দেখি সন্নিকটে ।
ভয়ার্ত পথিক প্রাণ চমকিয়া উঠে ॥ ২২ ॥
প্রাণভয়ে যথাশক্তি পলাইয়া যায় ।
তেমতি হইলা প্রভু দেখিয়া তাহায় ॥ ২৩ ॥
প্রভুর মহিমা কথা শুন অতঃপর ।
রূপসীর কিবা ভাবে দ্রবিল অন্তর ॥ ২৪ ॥
বিশুদ্ধ হইল চিত প্রভু-দরশনে ।
গর্ভজাত শিশু যেন ভাবোদয় মনে ॥ ২৫ ॥
স্বকার্যে লজ্জিত কিন্তু দিব্যভাবোচ্ছ্বাসে ।
বাৎসল্য-পূর্ণিত হৃদি আঁখিজলে ভাসে ॥ ২৬ ॥
এমন রূপসীপদে কোটি নমস্কার ।
ভাগ্য মানি পদরজে কি ভাগ্য তাহার ॥ ২৭ ॥
প্রভু দেখি যে কেঁদেছে তিলেকের তরে ।
তার সনে তুল্য কার ভুবন-মাঝারে ॥ ২৮ ॥
ধন্য রূপসীর রূপ যে রূপের বলে ।
প্রভুতে বাৎসল্য-ভাব কুড়াইয়া পেলে ॥ ২৯ ॥
জয় জয় দয়াময় আমি মুঢ়মতি ।
কি গাব তোমার লীলা কি ধরি শকতি ॥ ৩০ ॥
সামান্য কড়ির আশে আইল রূপসী ।
কল্পতরুমূলে পায় মহারত্ন-রাশি ॥ ৩১ ॥
বালকস্বভাব প্রভু ইচ্ছাময় হরি ।
অভাগার ভাগ্যে মাত্র হৈল কড়াকড়ি ॥ ৩২ ॥
বড় কড়াকড়ি প্রভু কৈলে মম প্রতি ।
শ্রীপদ-সেবায় রব এই দেহ মতি ॥ ৩৩ ॥
পশ্চাৎ হৃদয়ে প্রভু কৈলা তিরস্কার ।
এদন কুবুদ্ধি কেন হইল তোমার ॥ ৩৪ ॥
তন্ত্রমতে ক্রিয়াকাণ্ড বাধন-ভজনা ।
করিবারে শ্রীপ্রভুর একান্ত বাসনা ॥ ৩৫ ॥
রঙ্গ বেগি ভঙ্গ দিল দীক্ষাগুরু তাঁর ।
কে করে এখন তন্ত্র-সাধনা যোগাড় ॥ ৩৬ ॥
তান্ত্রিক সাধক গত ছিল যে যেখানে ।
জুটে সবে এ সময় প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৩৭ ॥
দেখাইয়া দেন প্রভু তে সবারে পথ ।
অনতিবিলম্বে যাহে পুরে মনোরথ ॥ ৩৮ ॥
সাধনা-যোগাড় শ্রীপ্রভুর সোজা নয় ।
যে কোন মানুষ হ'তে কখন না হয় ॥ ৩৯ ॥
যোগাড়ে সাহায্য-হেতু অদ্ভুত কাহিনী ।
আসিয়া জুটিল এক অদ্ভুত ব্রাহ্মণী ॥ ৪০ ॥
একদিন দেখিলেন প্রভু লক্ষ্য করি ।
সুরধুনীকূলে বসি আছে এক নারী ॥ ৪১ ॥
হৃদয়ে বলিলা প্রভু ডাকিবারে তার ।
হৃদুর হৃদয় অতি বিস্ময় ইহায় ॥ ৪২ ॥
আকাশ পাতাল হৃদু ভাবে অনিবার ।
কামিনী নরক-কৃমি গিয়ান যাঁহার ॥ ৪৩ ॥
কেন তিনি অকস্মাৎ ডাকেন কামিনী ।
যেমন মানুষ-বুদ্ধি সন্দেহ অমনি ॥ ৪৪ ॥
ভাবিয়া চিন্তিয়া হৃদু গিয়া সন্নিধানে ।
কূলে উপবিষ্টা নারী ডাক দিয়া আনে ॥ ৪৫ ॥
কেবা নারী শুন মন সংক্ষেপ আখ্যান ।
ব্রাহ্মণনন্দিনী পূর্বদেশে জন্মস্থান ॥ ৪৬ ॥
জন্মাবধি সাধ কিসে ভগবান মিলে ।
দেহে নাই মন হরিচরণকমলে ॥ ৪৭ ॥
নিদ্রাযোগে একবিন স্বপনেতে হেরে ।
পরম পুরুষ এক সুরধুনী তীরে ॥ ৪৮ ॥
চমকি উঠিয়া চিন্তা করে অনুক্ষণ ।
কি করিয়া হয় স্বপ্নদৃষ্ট দরশন ॥ ৪৯ ॥
কুল-শীল-লাজ-ভয় বিসর্জন দিয়ে ।
অন্বেষণ করে তাঁর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ॥ ৫০ ॥
দিবস-যামিনী ভ্রাম্যমাণা নিরন্তর ।
শুভদিনে উপনীত দক্ষিণ শহর ॥ ৫১ ॥
আপন চিন্তায় মগ্ন ঘাটে বসি ছিল ।
প্রভুর আজ্ঞায় হৃদু ডাকিয়া আনিল ॥ ৫২ ॥
পুলকে পূর্ণিত তনু গদগদ স্বরে ।
মা বলিয়া প্রভুদেব সম্বোধিলা তাঁরে ॥ ৫৩ ॥
এ নহে সামান্যা নারী বহু গুণাকর ।
যেমন উপরে বাহ্য তেমতি ভিতর ॥ ৫৪ ॥
শ্রীহরিচরণ-আশে ত্যাগী সন্ন্যাসিনী ।
সাধন-ভজন কত করেছেন তিনি ॥ ৫৫ ॥
দেবভাষা-বিশারদা বিশেষ প্রকারে ।
সুগৃঢ় শাস্ত্রের বাক্য ভাল ব্যাখ্যা করে ॥ ৫৬ ॥
তত্ত্বান্বেষী একজন বৈষ্ণবচরণ ।
প্রসিদ্ধ পণ্ডিত পড়া শাস্ত্র অগণন ॥ ৫৭ ॥
পরাজয় মানে তাঁর পরিচয় পেয়ে ।
কে দেখেছে কে শুনেছে হেনরূপ মেয়ে ॥ ৫৮ ॥
লিখিতে তাঁহার কথা কি আছে শকতি ।
প্রভু বলিতেন চারিবেদ মূর্তিমতী ॥ ৫৯ ॥
তন্ত্র-গীতা-পুরাণাদি ভক্তি-গ্রন্থ যত ।
অক্ষর অক্ষর তাঁর সব কণ্ঠস্থিত ॥ ৬০ ॥
ব্রাহ্মণী তাঁহার আখ্যা হৈল এইখানে ।
সে হেতু ব্রাহ্মণী বলি সকলেই জানে ॥ ৬১ ॥
বিশ্বর-আনন্দ সহ কহিল ব্রাহ্মণী ।
তোমায় দেখেছি বাবা স্বপনেতে আমি ॥ ৬২ ॥
বিভোর বাৎসল্যভাবে করে নিরীক্ষণ ।
যেন প্রভুদেব তাঁর আপন নন্দন ॥ ৬৩ ॥
প্রভুও বালকবৎ দেন পরিচয় ।
অবস্থাভাবের কথা যে রকম হয় ॥ ৬৪ ॥
শাস্ত্রমতে মিলাইয়া দেখি একে একে ।
মহাভাবাবস্থাগত বুঝিল প্রভুকে ॥ ৬৫ ॥
মানুষে সম্ভব নহে হেন মহাভাব ।
হয় মাত্র নরহরি-অঙ্গে আবির্ভাব ॥ ৬৬ ॥
অবাকে ব্রাহ্মণী করে প্রভুকে দর্শন ।
বিরাজে শ্রীঅঙ্গে স্পষ্ট গৌরাঙ্গ-লক্ষণ ॥ ৬৭ ॥
ছিল এক শালগ্রাম ব্রাহ্মণীর ঠাঁই ।
অন্তরে জানিলা প্রভু জগৎ-গোসাঁই ॥ ৬৮ ॥
অগ্রে দিয়া ভোগ-রাগ পশ্চাৎ ব্রাহ্মণী ।
প্রসাদ পাইয়া তবে খান অন্নপানি ॥ ৬৯ ॥
হয়েছে ভোগের বেলা প্রভু তেকারণ ।
ভাগিনা হৃদয়ে ডাকি বলিলা বচন ॥ ৭০ ॥
মনের মতন সিধা দেহ আনাইয়া ।
সঙ্গে আছে শালগ্রাম তাঁহার লাগিয়া ॥ ৭১ ॥
পঞ্চবটতলে তবে সিদা লয়ে যায় ।
ভোগহেতু ডাল-লুচি ত্বরিতে বনায় ॥ ৭২ ॥
কি জানি কিভাবে তাঁর ঝুরে দুনয়ন ।
ভোগের কারণ লুচি বনায় যখন ॥ ৭৩ ॥
নিবেদন করে যবে মুদি দুটি আঁখি ।
ভোগসহ শালগ্রাম সম্মুখেতে রাখি ॥ ৭৪ ॥
এমন সময় প্রভুদেব ভগবান ।
চুপে চুপে গিয়া দুই হাতে লুচি খান ॥ ৭৫ ॥
ব্রাহ্মণী খুলিয়া আঁখি যে সময় চায় ।
প্রভুর স্বরূপ অঙ্গে দেখিবারে পায় ॥ ৭৬ ॥
তায় খান দত্ত ভোগ শ্রীমুখকমলে ।
ধেয়া ধেয়া নাচে মাগী পঞ্চবটতলে ॥ ৭৭ ॥
ধিয়ানে দেখিনু যাঁরে পাইলাম তাঁয় ।
এত বলি শালগ্রাম ফেলিল গঙ্গায় ॥ ৭৮ ॥
আনন্দের সীমা নাই তাঁহার অন্তরে ।
হেরিয়া দুর্লভ ধন প্রত্যক্ষগোচরে ॥ ৭৯ ॥
যাঁর জন্য ত্যাজিয়াছে আত্মীয়-স্বজন ।
সহি শীত তাপ কৈলা বিস্তর সাধন ॥ ৮০ ॥
ভবসুখে জলাঞ্জলি দিয়া যাঁর তরে ।
ক্ষুধাতৃষ্ণাতুরা অনাথিনী সম ঘুরে ॥ ৮১ ॥
সর্বস্ব রতন যাঁরে করিয়া সিদ্ধান্ত ।
অন্বেষণে ঘাঁটিয়াছে পুরাণাদি তন্ত্র ॥ ৮২ ॥
অর্জন-উপায় ভাবি সাধন ভজন ।
কত করে অনাহারে না যায় বর্ণন ॥ ৮৩ ॥
আঁখি-বারি অনিবার সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ।
দারুণ যন্ত্রণা বাক্যে না হয় প্রকাশ ॥ ৮৪ ॥
বিষম মরমভেদী হতাশ তাড়না ।
মুহূর্তে মুহূর্তে হৃদে শেলের বেদনা ॥ ৮৫ ॥
অকাতরে সহিয়াছে সে কোমল প্রাণে ।
দিয়া পাতি নিজ ছাতি ভবের তুফানে ॥ ৮৬ ॥
এ হেন সাগরছেঁচা নিধি পেলে করে ।
যে সুখ উদয়ে তাহা কে বর্ণিতে পারে ॥ ৮৭ ॥
আনন্দে
উন্মত্তা প্রায় ব্রাহ্মণী এখন ।
বাৎসল্যে হৃদয় ভরা চাহে ঘনে ঘন ॥ ৮৮ ॥
দেখিবারে
শ্রীপ্রভুর শ্রীমুখকমল ।
সাধে বাদী হৈল নিজ নয়নের জল ॥ ৮৯ ॥
ভক্তিমুখী ব্রাহ্মণী ভক্তির আচরণ ।
অবিরত ভক্তিশাস্ত্র করে অধ্যয়ন ॥ ৯০ ॥
একদিন সমাসীন প্রভুর গোচরে ।
অনুরাগে
ভক্তিগ্রন্থ পড়ে ভক্তিভরে ॥ ৯১ ॥
যথা অষ্টসাত্ত্বিক ভাবের বিবরণ ।
নানাবিধ অশ্রু আদি পুলক কম্পন ॥ ৯২ ॥
যবে যে ভাবের কথা পড়েন ব্রাহ্মণী ।
প্রভুর শ্রী অঙ্গে তাহা উদয় তখনি ॥ ৯৩ ॥
পড়ে গ্রন্থ আর প্রভু-অঙ্গ পানে চায় ।
বর্ণিত প্রত্যক্ষ দু'য়ে একত্রে মিলায় ॥ ৯৪ ॥
করতালি দিয়া মাগী নেচে নেচে বলে ।
এইতো গৌরাঙ্গদেব নিতায়ের খোলে ॥ ৯৫ ॥
হৃদয় আনন্দময় তাহার উচ্ছ্বাসে ।
যথা তথা পুরীমধ্যে এই বার্তা ঘোষে ॥ ৯৬ ॥
এই রামকৃষ্ণ সেই গৌর গুণধাম ।
সাব্যস্তে সহস্র দেয় শাস্ত্রের প্রমাণ ॥ ৯৭ ॥
প্রমাণ খণ্ডিতে কেহ নারে ধীরগণে ।
তথাপি বিশ্বাস কার নাহি হয় মনে ॥ ৯৮ ॥
মথুর বলেন ইহা কথা কি প্রকার ।
বার বিনা নাহি শুনি আর অবতার ॥ ৯৯ ॥
তবে এ স্বীকার্য কথা মানি শিরোপরে ।
কালীর হয়েছে কৃপা তাঁহার উপরে ॥ ১০০ ॥
অদ্যাবধি ভাব কিবা ভাব কারে বলে ।
কি ভাবে এমন ভাব কার অঙ্গে ফলে ॥ ১০১ ॥
কি ভাবের নাম কিবা কি তার লক্ষণ ।
এখানে বিদিত নাহি ছিল কোনজন ॥ ১০২ ॥
হইত প্রভুর অঙ্গে ভাব আগাগোড়া ।
কেহ বা বায়ুর কর্ম কেহ কয় পীড়া ॥ ১০৩ ॥
কেহ বলে ভূতে পেলে হয় এ প্রকার ।
কেহ বলে উন্মত্ততা মাথার বিকার ॥ ১০৪ ॥
যে বড় উন্নত আত্মা এইটুকু গায় ।
এমত অবস্থা তাঁর কালীর কৃপায় ॥ ১০৫ ॥
মথুর আমোদপ্রিয় বড়লোক কিনা ।
কৌতুক রহস্য কাজে খুশী ষোল
আনা ॥ ১০৬ ॥
সবিস্ময়ে মনে চিন্তা করে অনুক্ষণ ।
মানুষে ঈশ্বরাবেশ একথা কেমন ॥ ১০৭ ॥
কিছুই
না পারি আমি করিবারে স্থির ।
অকথ্য অবোধ্য তত্ত্ব অতীত বুদ্ধির ॥ ১০৮ ॥
সত্য কি এ
মিথ্যা তত্ত্ব করিতে নিশ্চয় ।
জন্মিল অন্তরে তার আগ্রহাতিশয় ॥ ১০৯ ॥
প্রভুও
নাছোড়বান্দা কন বারে বারে ।
সাধক শাস্ত্রজ্ঞ আনি সভা করিবারে ॥ ১১০ ॥
মথুর স্বীকার করি কৈল আয়োজন ।
যথা দিনে উপনীত পণ্ডিত সজ্জন ॥ ১১১ ॥
বৈষ্ণবচরণ তার মধ্যে এক জনা ।
বৈষ্ণবসমাজ-মধ্যে অতি খ্যাতনামা ॥ ১১২ ॥
গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণে মহামান্য করে ।
বিচারে মীমাংসা যাহা নতশিরে ধরে ॥ ১১৩ ॥
এখানেতে পুরীমধ্যে পাচক পূজারী ।
মথুরের দলবল যত কর্মচারী ॥ ১১৪ ॥
গণ্যমান্য নিকটের সবে সমুৎসুক ।
কুতুহলী দেখিবারে রহস্য কৌতুক ॥ ১১৫ ॥
তুলিয়া প্রসঙ্গ আগে বলিলা ব্রাহ্মণী ।
দেখাশুনা শ্রীপ্রভুর যাবৎ কাহিনী ॥ ১১৬
॥
অনুভূতি দর্শনাদি যোগজ বিকার ।
ভাবাবেশ সমাধ্যাদি প্রকৃতি আচার ॥ ১১৭ ॥
রাগাত্মিকা
ভক্তি মহাভাবের লক্ষণ ।
ভক্তিশাস্ত্র গ্রন্থে আছে যেরূপ লিখন ॥ ১১৮ ॥
মহাভাবস্বরূপিণী ব্রজে শ্রীরাধার ।
আর নবদ্বীপচন্দ্র গৌরাঙ্গ অবতার ॥ ১১৯ ॥
এ দু'হার অঙ্গে মহাভাবের উদর ।
ভক্তিগ্রন্থে লক্ষণাদি তার যেন কয় ॥ ১২০ ॥
সেই সব সুপ্রকাশ প্রভুর শরীরে ।
তাই অবতার-তনু বাখানি তাঁহারে ॥ ১২১ ॥
আসুন বিচার-রণে থাকে কেহ যদি ।
খণ্ডিব তাঁহার তর্ক হইলে বিরোধী ॥ ১২২ ॥
এত বলি তপস্বিনী ব্রাহ্মণী বাখানে ।
একত্রিত সমবেত সভাবিদ্যমানে ॥ ১২৩ ॥
বিপন্ন সন্তানে রক্ষা করিতে জননী ।
এখানেতে সেই ভাব ধরিল ব্রাহ্মণী ॥ ১২৪ ॥
ওজস্বিনী ব্রাহ্মণীর আমূল বর্ণন ।
একমনে শুনিলেন বৈষ্ণবচরণ ॥ ১২৫ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত তেঁহ ঘটে বহু গুণ ।
সত্যতত্ত্বান্বেষী তায় সাধনানিপুণ ॥ ১২৬ ॥
সাধনাজ স্বপ্নদৃষ্টিবল সহকারে ।
প্রভুরে দেখিয়া কয় সভার ভিতরে ॥ ১২৭ ॥
ধীরে ধীরে সুপণ্ডিত বৈষ্ণবচরণ ।
প্রসঙ্গ বিচারে নাহি দেখি প্রয়োজন ॥ ১২৮ ॥
শ্রীঅঙ্গে শাস্ত্রের লিপি দেখিবারে পাই ।
ব্রাহ্মণী বলেন যাহা আমি বলি তাই ॥ ১২৯ ॥
বালকস্বভাব প্রভু আনন্দ অন্তরে ।
হাসিতে হাসিতে কন বিস্মিত মথুরে ॥ ১৩০ ॥
কি কহে পণ্ডিত আমি কিছুই না জানি ।
শুনিয়া শীতল কিন্তু হইল পরাণী ॥ ১৩১ ॥
মনে করেছিনু আমি বিয়াধি আমার ।
অসাধ্য নিদান নাহি জানে প্রতিকার ॥ ১৩২ ॥
সভামধ্যে বিদ্যমান আছিলেন যাঁরা ।
স্তম্ভিত বিস্মিত সবে বাক্বুদ্ধিহারা ॥ ১৩৩ ॥
আজিকার সভাভঙ্গ হইল এখানে ।
চলিয়া গেলেন বাস যার যেইখানে ॥ ১৩৪ ॥
কাছে বিকশিত পুষ্প মধুকোষে পূর্ণ ।
কেহ না জানিতে পারে মধুকর ভিন্ন ॥ ১৩৫ ॥
প্রভুদেবে দেখি আজি বৈষ্ণবচরণ ।
সত্যতত্ত্বান্বেষী কিনা মহানন্দ মন ॥ ১৩৬ ॥
কর্তাভজা-সম্প্রদায়ভুক্ত বর্তমানে ।
বুঝিল পাইবে পথ প্রভু-সন্নিধানে ॥ ১৩৭ ॥
কৃপা-পরশনে হয় শক্তির সঞ্চার ।
যাহাতে সহজে সিদ্ধ ফল সাধনার ॥ ১৩৮ ॥
এত জানি আপনার দলবল লয়ে ।
প্রভু-দরশনে আসে সময়ে সময়ে ॥ ১৩৯ ॥
পরম পণ্ডিত তেঁহ তাঁহার স্বীকারে ।
অন্য কেহ প্রতিবাদ করিতে না পারে ॥ ১৪০ ॥
বৈষ্ণবে বড়ই কৃপা হইল প্রভুর ।
বুঝিতে এখন বাকি আছেন মথুর ॥ ১৪১ ॥
রঙ্গময় প্রভুদেব বুঝাইতে তাঁয় ।
পরে কব প্রভু কিবা করিলা উপায় ॥ ১৪২ ॥
অর্ধ হাত পরিমাণ জলের উপরে ।
হেলে দুলে খেলে পদ্ম পবনের ভরে ॥ ১৪৩ ॥
কভু কভু উচ্চে কভু পরশিছে জল ।
শিশুতে না
বুঝে ইহা কাহার কৌশল ॥ ১৪৪ ॥
তেমনি মথুর দোলে না বুঝে কারণ ।
খেলিছেন তাঁরে লৈয়া
প্রভু নারায়ণ ॥ ১৪৫ ॥
দিবানিশি কাছে কাছে তথাপি অদৃশ্য ।
শ্রীপ্রভুর লীলাখেলা
সুগূঢ় রহস্য ॥ ১৪৬ ॥
বিষন্ন মলিন ভারি করি শ্রীবয়ান ।
মথুর বিশ্বাসে কন প্রভু
ভগবান ॥ ১৪৭ ॥
বল কি হইল মম হেতু নাহি জানি ।
ভাবের লক্ষণ ইহা বলেন ব্রাহ্মণী ॥ ১৪৮ ॥
ঈশ্বরত্বে শ্রীপ্রভুর শাস্ত্রীয় নজির ।
আর এক সাধারণে করিল জাহির ॥ ১৪৯ ॥
গাত্রদাহ-নিবারণে চেষ্টা নিরবধি ।
কত কবিরাজী তেল কতই ঔষধি ॥ ১৫০ ॥
অদ্যাবধি
দাহ-ব্যাধি হইল না খুন ।
সবার হয়েছে শূন্য উপায়ের তুণ ॥ ১৫১ ॥
সাধিকা ব্রাহ্মণী
তত্ত্ব কহিল সকলে ।
ঈশ্বরানুরাগে দাহ ব্যাধি কেবা বলে ॥ ১৫২ ॥
বিরহের দাহ ইহা শাস্ত্রে উল্লিখিত ।
মহাভাবে শ্রীরাধার শ্রীঅঙ্গে ফুটিত ॥ ১৫৩ ॥
গোপীজ্ঞাপ্য
রাগাত্মিকা গ্রন্থে হেন বিধি ।
চন্দন ফুলের মালা কেবল ঔষধি ॥ ১৫৪ ॥
ব্রাহ্মণীর কথা শুনি সবে উপহাস ।
বিশেষতঃ বর্তমানে মথুর বিশ্বাস ॥ ১৫৫ ॥
ব্রাহ্মণী বলেন উপহাস কি কারণ ।
দেখ তিন দিনে ব্যাধি করি নিবারণ ॥ ১৫৬ ॥
এত বলি চন্দন-মোক্ষণ অঙ্গে করে ।
গলায় ফুলের মালা দিয়া থরে থরে ॥ ১৫৭ ॥
সাধিকা ব্রাহ্মণী শুধু শাস্ত্রপাঠী নহে ।
সেই সেই মত হয় যখন যা কহে ॥ ১৫৮ ॥
তিন দিনে ব্যাধি নষ্ট হৈল শ্রীপ্রভুর ।
বিস্মিত সকলে রঙ্গে বিশেষে মথুর ॥ ১৫৯ ॥
শিশুভাবাপন্ন প্রভু বালকের প্রায় ।
সহজে বিশ্বাস তাঁর সবার কথায় ॥ ১৬০ ॥
শ্রীমথুরে কহিবারে শুনেছে গোসাঁই ।
বার বিনা আর অন্য অবতার নাই ॥ ১৬১ ॥
এদিকে ব্রাহ্মণী দিয়া শাস্ত্রের প্রমাণ ।
পণ্ডিতমণ্ডলীমধ্যে করেন বাখান ॥ ১৬২ ॥
এত তেজে খণ্ডিতে শকতি নাহি কার ।
প্রভুদেব শাস্ত্র বলে অসংখ্য অবতার ॥ ১৬৩ ॥
তাই প্রভু ভাবিছেন বটবৃক্ষতলে ।
গৌরাঙ্গ কি অবতার ব্রাহ্মণী যা বলে ॥ ১৬৪ ॥
হেনকালে কি হইল শুনহ বারতা ।
মহাতমবিনাশন রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ১৬৫ ॥
একদিন প্রভুদেব ভাগীরথী-তটে ।
শুনিলেন মহারোল কান যায় ফেটে ॥ ১৬৬ ॥
গঙ্গার মাঝারে উঠে দুফালিয়া জল ।
অগণন মাতোয়ারা কীর্তনের দল ॥ ১৬৭ ॥
গায়ক বাদক যত কার নাহি হুঁশ ।
নাচে গায় মাঝে দুটি সুন্দর পুরুষ ॥ ১৬৮ ॥
প্রভুদেব চিনিলেন প্রতি জনে জনে ।
লোক
যত একত্রিত আছিল কীর্তনে ॥ ১৬৯ ॥
উঠি তীরে তাঁহারে ঘেরিয়া কতক্ষণ ।
নেচে গেয়ে পুনঃ জলে হইল মগন ॥ ১৭০ ॥
জলবিম্ব উঠে যেন লয় হয় জলে ।
তেমতি ডুবিল দল গঙ্গার সলিলে ॥ ১৭১ ॥
গৌরাঙ্গাবতার কিনা শ্রীপ্রভুর মনে ।
অসম্ভব সন্দ সমুদিত হৈল কেনে ॥ ১৭২ ॥
বিশেষ কারণ আছে শুন শুন মন ।
বিশ্বগুরুরূপে প্রভু ব্রহ্ম সনাতন ॥ ১৭৩ ॥
জীবহিত এক ব্রত সতত অন্তরে ।
জৈবভাবে আচরণ জীবের উদ্ধারে ॥ ১৭৪ ॥
ভাবা চিন্তা করা কর্ম লীলার জীবনে ।
এক লক্ষ্য আপনার উদ্দেশ্য-সাধনে ॥ ১৭৫ ॥
স্বেচ্ছায় সন্দেহযুক্ত মনে আপনার ।
স্বেচ্ছায় করেন মুক্ত খেলিয়া আবার ॥ ১৭৬ ॥
যুক্ত মুক্তে যাহা হয় লীলা-আচরণ ।
তাহে করে জগতের সন্দেহ মোচন ॥ ১৭৭ ॥
অবতারে হেন শক্তি বর্তমান রহে ।
সৃষ্টি গোটা আজ্ঞা তাঁর নতশিরে বহে ॥ ১৭৮ ॥
কি চেতন কিবা জড় সকলে সমান ।
প্রভুর লীলায় পাবে বহুল প্রমাণ ॥ ১৭৯ ॥
সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক শক্তি আবর্তনে যার ।
ঘুরিতেছে চিরকাল সৃষ্টির সংসার ॥ ১৮০ ॥
সে হেতু আচার্যরূপী অবতারগণ ।
শিখিয়া শিখান জীবে উদ্ধার-কারণ ॥ ১৮১ ॥
বিনাশিতে তমঃ-সন্দ লোচন-আঁধার ।
চৈতন্য-আলোকে দেখে ইষ্ট আপনার ॥ ১৮২ ॥
প্রবল পাশ্চাত্য-শিক্ষা এবে বর্তমানে ।
জড়বাদী অবতার আদতে না মানে ॥ ১৮৩ ॥
রামে কৃষ্ণে যদ্যপি কাহারও কিছু ভক্তি ।
গৌরাঙ্গাবতারে করে ভীষণ আপত্তি ॥ ১৮৪ ॥
তাই লীলাছলে করি গৌরাঙ্গ-দর্শন ।
করিলেন জগতের সন্দেহ-ভঞ্জন ॥ ১৮৫ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
উপনিষদাদি বেদ ষড়-দর্শন ॥ ১৮৬ ॥
গীতা গাথা তন্ত্রমালা আঠার পুরাণ ।
জগতে যাবৎ শাস্ত্র উপায় বিধান ॥ ১৮৭ ॥
প্রভুর আসন কেহ পরশিতে নারে ।
এতদূর দূরান্তর মায়ার উপরে ॥ ১৮৮ ॥
জানি আমি শুনে লোকে কবে কথা নানা ।
যেমন লেখক তার মত মাথাখানা ॥ ১৮৯ ॥
বৃদ্ধি সাধ্য পারগতা গিয়ান ভাষায় ।
পরাধীন দাস্যবৃত্তি পেটের জ্বলায় ॥ ১৯০ ॥
মশা মারা দশা খানি চাপড়ে না টেকে ।
ভূত-প্রেত পায় লজ্জা মুর্তিখানা দেখে ॥ ১৯১ ॥
চঞ্চল মনের বৃত্তি কপি পরাজিত ।
কপি কবি কাব্য তার তেমতি রঞ্জিত ॥ ১৯২ ॥
কেবল রঞ্জিত নয় রঞ্জিতাতিশয় ।
পূজক ব্রাহ্মণে ব্রহ্ম সনাতন কয় ॥ ১৯৩ ॥
জানিয়াও ক্ষান্ত থাকি সাধ্যে না কুলায় ।
পাছু থাকি কেহ যেন প্রবৃত্তি, জন্মায় ॥ ১৯৪ ॥
প্রত্যক্ষেতে দেখা যাহা যাহা কিছু শুনা ।
যা বলে বলুক লোকে করিব বর্ণনা ॥ ১৯৫ ॥
রানীর জামাতা মধ্যে মথুরামোহন ।
নানা গুণে বিভূষিত বৃদ্ধি বিচক্ষণ ॥ ১৯৬ ॥
তাই রানী জামাতার সুযোগ্য দেখিয়ে ।
বিষয় ব্যবসা কর্ম দিল সমর্পিয়ে ॥ ১৯৭ ॥
বিপুল সম্পত্তি জমিদারি কারবার ।
রক্ষণাবেক্ষণ পর্যালোচনার ভার ॥ ১৯৮ ॥
কার্যতঃ মথুর এবে সম্পত্যধিকারী ।
আজ্ঞাবহ দাস-দাসী যত কর্মচারী ॥ ১৯৯ ॥
ধনের অভাব নাই বহুধন ঘরে ।
কাঞ্চনাকর্ষণ কিবা অজ্ঞাত অন্তরে ॥ ২০০ ॥
কামিনীর আকর্ষণ বুঝে ষোল আনা ।
বুদ্ধিভ্রষ্ট কর্মনষ্ট যদিও ঘটে না ॥ ২০১ ॥
প্রারম্ভ যৌবন প্রভু রূপ অঙ্গে ভরা ।
সুবলন সুগঠন সুন্দর চেহারা ॥ ২০২ ॥
একবারে কামবিরহিত কায়া কিনা ।
জানিতে বৃত্তান্ত হৈল একান্ত কামনা ॥ ২০৩ ॥
স্ত্রীমাত্রে জননী জ্ঞান শ্রীপ্রভুর মনে ।
আগাগোড়া শ্রীমথুর বিশেষিয়ে জানে ॥ ২০৪ ॥
দেখিছে উজ্জলোপমা হাজার হাজার ।
তথাপি না যায় সন্দ তামস-আঁধার ॥ ২০৫ ॥
পরীক্ষার হেতু যুক্তি কৈল মনে মনে ।
রূপসী যুবতী এক বেশ্যা-সংযোটনে ॥ ২০৬ ॥
এ বাজারে কে কেমন কার কোথা থানা ।
রসজ্ঞ শ্রীমথুরের বিশেষিয়ে জানা ॥ ২০৭ ॥
লছমন বাঈ বেশ্যা অতি রূপবতী ।
যোগীরে টলায় রূপে এতেক শকতি ॥ ২০৮ ॥
একে তো জাতিতে মোহনত্ব ষোল কলা ।
তদুপরি বেশ্যাবৃত্তি ব্যবসাকৌশলা ॥ ২০৯ ॥
তায় সঙ্গে মথুরের হইল মন্ত্রণা ।
সে যেমন তরতম আর যোল জনা ॥ ২১০ ॥
একত্রিত রাখিবারে তাহার ভবনে ।
প্রভুকে জোটনা করি দিবেন সেখানে ॥ ২১১ ॥
ভাঙ্গিয়া প্রভুর কথা সবিশেষ কয় ।
তেজোজ্জ্বল ব্রহ্মচারী ব্রাহ্মণতনয় ॥ ২১২ ॥
উত্তরে মথুরে কয় কুহকী মোহিনী ।
বড় বড় রথী টলে এতো তুচ্ছ গণি ॥ ২১৩ ॥
যথা দিনে সুরঙ্গিনী কিছু নাহি বাদ ।
পাতিল ভবনমধ্যে যত ছিল ফাঁদ ॥ ২১৪ ॥
ল'য়ে অকলঙ্ক চাঁদ প্রভু ভগবানে ।
সান্ধ্য ভ্রমণের হেতু তুলিল ফেটিনে ॥ ২১৫ ॥
মথুর করিল যাত্রা গড় অভিমুখে ।
পথের দুপাশে লোক দাঁড়াইয়া দেখে ॥ ২১৬ ॥
একে মথুরের গাড়ি তাহে সুসজ্জিত ।
উচ্চৈঃশ্রবাসম জোড়া অশ্ব সংযোজিত ॥ ২১৭ ॥
শোভার কব কি কথা নাহি যায় ইতি ।
ছুটিল উদ্দেশ্য-পথে পবনের গতি ॥ ২১৮ ॥
মিনিটে এড়ায় আধ ঘণ্টাকের পথ ।
চক্রপাণি সঙ্গে যেন অর্জুনের রথ ॥ ২১৯ ॥
বিশাল গড়ের মাঠ চারিদিক খোলা ।
শীতল গাঙ্গেয় বায়ু রঙ্গে করে খেলা ॥ ২২০ ॥
সেবনে অশেষ তৃপ্তি মনের উল্লাস ।
সময় বুঝিয়া ফিরে মথুর বিশ্বাস ॥ ২২১ ॥
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী বুঝিয়া অন্তরে ।
পরীক্ষায় সুপ্রস্তুত ভকতের তরে ॥ ২২২ ॥
ভকতবৎসল তিনি ভক্ত তাঁর প্রাণ ।
যথা তথা ভক্তসঙ্গে রহে বিদ্যমান ॥ ২২৩ ॥
শ্মশানে মশানে কিবা অকূল পাথারে ।
জনশূন্য মরু কিবা হিমানী আগারে ॥ ২২৪ ॥
স্থানাস্থান কালাকাল বিচার-বিহীনে ।
সম্পদ বিপদ সখা সঙ্গে রেতে দিনে ॥ ২২৫ ॥
কখন অদৃশ্যভাবে নয়নাগোচর ।
কখন প্রত্যক্ষরূপে আঁখির উপর ॥ ২২৬ ॥
এবে পূণ্যময়ী বঙ্গে নব কলেবরে ।
লীলাপ্রিয় লীলাপর লীলার আসরে ॥ ২২৭ ॥
আজি দিন পরীক্ষার ভক্তের সহিত ।
লীলাছলে বেশ্যাগারে নিজে উপনীত ॥ ২২৮ ॥
প্রবেশিয়া দিয়া তাঁয় ভবন-ভিতরে ।
কৌশল করিয়া নিজে গেল স্থানান্তরে ॥ ২২৯ ॥
ভবনের সজ্জা কিবা দিব পরিচয় ।
দেবরাজ বাসবের যেন নৃত্যালয় ॥ ২৩০ ॥
রূপসী সতের জনা ভূষিতালঙ্কারে ।
দীপের আলোকে অঙ্গ ঝলমল করে ॥ ২৩১ ॥
দেখিয়া চাঁদের মালা চক্ষের উপর ।
প্রভুর শ্রীঅঙ্গে হয় আবেশের ভর ॥ ২৩২ ॥
খসিল কটির বাস দিগম্বর তনু ।
রূপোজ্জ্বল কলেবর যেন বাল ভানু ॥ ২৩৩ ॥
মোহিনী-মোহিত কণ্ঠে শ্যামা-গুণ-গান ।
ভাবে স্বরে তালে লয়ে সর্বাঙ্গে সমান ॥ ২৩৪ ॥
সুগায়িকা বেশ্যাগণ স্তব্ধ গীত শুনি ।
বেদের বাঁশীর স্বরে যেমন নাগিনী ॥ ২৩৫ ॥
এদিকে কি চিত্র দেখ ভরিয়ে নয়ন ।
নবীন নবীন বয়ঃ প্রারম্ভ যৌবন ॥ ২৩৬ ॥
কাঞ্চন-বরণ অঙ্গে কান্তি সমুজ্জ্বল ।
লাবণ্য সৌন্দর্যমাখা শ্রীমুখমণ্ডল ॥ ২৩৭ ॥
ঈষৎ বঙ্কিম আঁখি বাল্যভাবে ভরা ।
নিরুপম আঁখি-রাজ্যে আঁখির চেহারা ॥ ২৩৮ ॥
তুলির না হয় শক্তি আঁকিতে সে ঠাম ।
ভাণ্ডারে অভাব বর্ণ নিজে বিধি বাম ॥ ২৩৯ ॥
ঈষৎ রক্তিমাধর অতি সুশোভিত ।
তাম্বুলের রাগে যেন স্বতই রঞ্জিত ॥ ২৪০ ॥
আছে কিবা তুলনা দিতে গঠন গ্রীবার ।
বেণু বীণা পিক জিনি স্বরের দুয়ার ॥ ২৪১ ॥
সুবিশাল বক্ষঃস্থল জানু মনোহর ।
কুর্মাঙ্গের ন্যায় লিঙ্গ দেহের ভিতর ॥ ২৪২ ॥
কোমলত্বে পরাজিত কমলের দল ।
প্রভুর চরণপদ্ম এতই কোমল ॥ ২৪৩ ॥
উঠে দিব্য পরিমল পরশ যেখানে ।
বিভোর যাহাতে এবে যত বেশ্যাগণে ॥ ২৪৪ ॥
দিব্যভাবে বেশ্যাগণ জাতিবুদ্ধিহারা ।
আঁকিতে নারিনু আজি চিত্রের চেহারা ॥ ২৪৫ ॥
কেন তথা একত্রিতা কিবা প্রয়োজন ।
কি কর্মসাধনে মর্ম নাহিক স্মরণ ॥ ২৪৬ ॥
বিশ্ববিমোহন মেয়ে মায়ার মুরতি ।
যোগেশের যোগ ভাঙ্গে এতেক শকতি ॥ ২৪৭ ॥
তায় হেথা বেশ্যা এরা শুধু পেঁচ ঘটে ।
মানুষে বানায় মেষ কৌশলের চোটে ॥ ২৪৮ ॥
আজি কিন্তু বুদ্ধিহারা মোহিনীর গণ ।
রামকৃষ্ণলীলা-কথা বিচিত্র কথন ॥ ২৪৯ ॥
সর্বমনোহর প্রভু মোহন আধার ।
ধীরে ধীরে শুন মন কই সমাচার ॥ ২৫০ ॥
শ্যামা-গীত গাইতে গাইতে শ্রীপ্রভুর ।
গভীরসমাধিগত বাহ্য গেল দূর ॥ ২৫১ ॥
অশ্রুত অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপার দেখিয়ে ।
সশঙ্কিত চিত যত বারাঙ্গনা মেয়ে ॥ ২৫২ ॥
মূর্ছাগত দেখি যেন নিজের সন্তান ।
স্নেহময়ী জননীর আকুল পরাণ ॥ ২৫৩ ॥
সেই মত হইল যত বারাঙ্গনাগণে ।
সুশীতলজল কেহ সিঞ্চে শ্রীবদনে ॥ ২৫৪ ॥
কেহ বা ব্যজন করে ব্যাকুলা হইয়ে ।
বুদ্ধিশূন্যে অন্যে কেহ ডাকে ফুকুরিয়ে ॥ ২৫৫ ॥
মথুর শুনিয়া গোল আইল ত্বরায় ।
আসিলে কিঞ্চিৎ বাহ্য ফোটিনে উঠায় ॥ ২৫৬ ॥
বেগবান অশ্বে যোতা মথুরের গাড়ি ।
উত্তরিল পুরীমধ্যে অতি ত্বরা করি ॥ ২৫৭ ॥
এখানে কি কহে কথা শুনহ ব্রাহ্মণী ।
এক মুখে শত মুখ ধরিয়া আপুনি ॥ ২৫৮ ॥
প্রভুর কাহিনী গায় সবার গোচরে ।
শ্রীগৌরাঙ্গ রামকৃষ্ণ অপর আধারে ॥ ২৫৯ ॥
একি বিপরীত কথা ব্রাহ্মণী বাখানে ।
প্রভু অন্তরূপে গোরা না কহিল কেনে ॥ ২৬০ ॥
প্রভু সকলের মূল এই মাত্র জানি ।
কৃষ্ণ রাম গোরা তাঁর অবতার গণি ॥ ২৬১ ॥
নর-রূপে অবতার যথায় যা হয় ।
শ্রীপ্রভুর রূপান্তর বুঝিবে নিশ্চয় ॥ ২৬২ ॥
রূপান্তর অবতারে পূজা সেবা করি ।
রামকৃষ্ণ-রূপ মাত্র হৃদয়েতে ধরি ॥ ২৬৩ ॥
প্রভু ব্রহ্ম সনাতন সকলের মূল ।
নিরাকার সাকার সর্বজ্ঞ সূক্ষ্ম স্থূল ॥ ২৬৪ ॥
অযোধ্যায় প্রভু রাম শ্যাম বৃন্দাবনে ।
হিমাচলে দেবদেব গোরা নদে ধামে ॥ ২৬৫ ॥
নির্গুণ নিষ্ক্রিয় প্রভু বেদান্তেতে বলে ।
শক্তি নামে শাক্তগণ গায় কুতূহলে ॥ ২৬৬ ॥
বুদ্ধ বলি বৌদ্ধগণ প্রভুরে বাখানে ।
খ্রীষ্টানে যীশু গায় আল্লা মুসলমানে ॥ ২৬৭ ॥
যে রূপে যে নামে যেবা উদ্দেশি ঈশ্বরে ।
স্মরণ মনন কিংবা সংকীর্তন করে ॥ ২৬৮ ॥
ভজে পূজে রামকৃষ্ণ এই মনে করি ।
দয়াল ঠাকুর মোর ভবের কাণ্ডারী ॥ ২৬৯ ॥
দেবীমড়লের ঘাট পুরীর অদূরে ।
তাহার নিকটে বাসা দিলা ব্রাহ্মণীরে ॥ ২৭০ ॥
গোটা দিন পুরীমধ্যে কাটান ব্রাহ্মণী ।
বাসায় চলিয়া যান আইলে যামিনী ॥ ২৭১ ॥
অতি রূপবতী তেঁহ বয়স্কা এখন ।
বুঝে উচ্চবংশে জন্ম যে করে দর্শন ॥ ২৭২ ॥
সুন্দর গড়ন অঙ্গে কনক-বরণা ।
পবিত্র মুখের ভাব গেরুয়া-বসনা ॥ ২৭৩ ॥
অতি দীর্ঘ দীর্ঘ চুল পড়েছে এলায়ে ।
অযতনে ধূলা কুটি কত কি লাগিয়ে ॥ ২৭৪ ॥
সন্নিকটে প্রতিবাসী যত চারিধারে ।
আদর করিয়া তায় লয়ে যায় ঘরে ॥ ২৭৫ ॥
যত্ন করে অন্তঃপুরে রমণীর গণ ।
ভক্তিভরা প্রভুকণা করেন শ্রবণ ॥ ২৭৬ ॥
কিবা ধন প্রভুদেব কি চরিত তাঁর ।
এবে নররূপধারী হরি-অবতার ॥ ২৭৭ ॥
ভক্তিভরে নমস্কারে কিবা ফলে ফল ।
বারেক দর্শনে করে চিত নিরমল ॥ ২৭৮ ॥
পেলে অণুকণা রূপা জীবে কিবা পায় ।
ব্রাহ্মণী উন্মত্তা হয়ে প্রভু গুণ গায় ॥ ২৭৯ ॥
ধরে পায় ব্রাহ্মণীর রমণীর গণ ।
কি উপায়ে করে তারা প্রভুরে দর্শন ॥ ২৮০ ॥
দরশনলুব্ধমনা দেখি বামাদলে ।
ঊষায় আনিত সঙ্গে গঙ্গাস্নান ছলে ॥ ২৮১ ॥
এইরূপে ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় ।
ব্রাহ্মণী রমণীমন মজিয়া বেড়ায় ॥ ২৮২ ॥
মন দিয়া শুনিবারে যদি কর হেলা ।
বুঝিতে নারিবে মন শ্রীপ্রভুর লীলা ॥ ২৮৩ ॥
গিরিপদে বিন্দু বিন্দু মাত্র ঝরে জল ।
প্রণালী-আকার পরে ক্রমশঃ প্রবল ॥ ২৮৪ ॥
তৃণ ভাসে হেন স্রোত নাহিক প্রথমে ।
বলবতী স্রোতস্বতী সাগরসঙ্গমে ॥ ২৮৫ ॥
তেমনি বুঝিবে মন কার্য শ্রীপ্রভুর ।
সামান্য ধরিয়া উঠে যায় কত দূর ॥ ২৮৬ ॥
পাইয়া শ্রীমথুরের পত্র-নিমন্ত্রণ ।
পুরীমধ্যে উপনীত হৈল একজন ॥ ২৮৭ ॥
বহু বহু শাস্ত্র-পাঠে পণ্ডিত-প্রবর ।
ব্রাহ্মণের কুলে জন্ম ইন্দেশেতে ঘর ॥ ২৮৮ ॥
কাছে
কিবা দূরে বৈঠে যতেক পণ্ডিত ।
সকলের মধ্যে তাঁর নাম সুবিদিত ॥ ২৮৯ ॥
দিগ্বিজয়ী বিচারেতে সাধ্য টেকে কার ।
এমত আছিল তাহে শক্তি অম্বিকার ॥ ২৯০ ॥
তান্ত্রিক সাধক বল এত গায়ে ধরে ।
বাণী-পুত্র যদি তবু না পারে বিচারে ॥ ২৯১ ॥
সিদ্ধাইসম্ভূত শক্তি যেন তেন নয় ।
অসাধ্যকে সাধ্য করে নয়ে করে হয় ॥ ২৯২ ॥
বীরাচারী বীরভাব বীরমদে ভরা ।
বীরত্ব-প্রকাশ প্রিয় স্বভাবের ধারা ॥ ২৯৩ ॥
চলনে ধরনে হেন যেন মহাবীর ।
জীবনে না জানে করিবারে নতশির ॥ ২৯৪ ॥
গম্ভীর সিদ্ধাই রব হেরে রে রে রে রে ।
দেবীস্তোত্র একপদ তৎসহকারে ॥ ২৯৫ ॥
যথায় উচ্চারে শব্দ কানে শুনে যারা ।
তখনি তাহারা হয় বলবুদ্ধি-হারা ॥ ২৯৬ ॥
বলহারী বীরাচারী সিদ্ধাই ব্রাহ্মণ ।
শক্তিতে অন্যের করে বলের হরণ ॥ ২৯৭ ॥
অত্যাশ্চর্য তান্ত্রিকের বীরত্ব-কাহিনী ।
দর্শন দূরের কথা কানেও না শুনি ॥ ২৯৮ ॥
নিত্য পুজা অম্বিকার সমাপন পরে ।
সাজার মণেক কাষ্ঠ হাতের উপরে ॥ ২৯৯ ॥
করিবারে হোম-কার্য সহ দেবীস্তুতি ।
বাম হাতে জ্বালে কাঠ দক্ষিণে আহুতি ॥ ৩০০ ॥
অম্বিকা সেবক তেহ অম্বিকা ভরসা ।
সময় আগত তাই এইখানে আসা ॥ ৩০১ ॥
এখন প্রভুর কথা সর্বথাই চলে ।
হুলস্থুল পড়িয়াছে ব্রাহ্মণীর বোলে ॥ ৩০২ ॥
তান্ত্রিক করিল মনে শুনিয়া বারতা ।
যে হউন তিনি তাঁর হরিব ক্ষমতা ॥ ৩০৩ ॥
বাহু তালি রে রে বুলি তুলিয়া তান্ত্রিক ।
চলিল আছেন যেথা প্রভু অমায়িক ॥ ৩০৪ ॥
গোচরে পাইয়া তারে প্রভু গুণমণি ।
করিলেন উচ্চতর রে রে রে রে ধ্বনি ॥ ৩০৫ ॥
ততোধিক উচ্চরব করে দ্বিজবর ।
উচ্চতম রে রে রবে প্রভুর উত্তর ॥ ৩০৬ ॥
পুনঃ দ্বিজ কৈল শব্দ জলদ-গম্ভীর ।
প্রভুর উঠিল রব শ্রবণ বধির ॥ ৩০৭ ॥
পরাজিত হ'য়ে রবে বসিল ব্রাহ্মণ ।
বিস্ময়-স্তম্ভিতভাবে মলিন বদন ॥ ৩০৮ ॥
সিদ্ধায়ের বল নষ্ট হৈল এত দিনে ।
পণ্ডিত সমাজে খ্যাতি যাহার কারণে ॥ ৩০৯ ॥
শ্রীপ্রভু দয়ার সিন্ধু করুণা-নিদান ।
সিদ্ধাই অনর্থ হরি সাধিলা কল্যাণ ॥ ৩১০ ॥
সিদ্ধায়ে সাধকে
রাখে হানা দিয়া পথে ।
ঈশ্বরের দরশনে নাহি দেয় যেতে ॥ ৩১১ ॥
বিঘ্ন দূর শ্রীপ্রভুর
কৃপায় এখন ।
রেতে দিনে প্রভুদেবে করে দরশন ॥ ৩১২ ॥
কি জানি দেখিয়া কিবা কহে একদিন ।
আশ্রিত শরণাগত আমি দীনহীন ॥ ৩১৩ ॥
আপুনি পরমব্রহ্ম এবে অবতার ।
কৃপা করি কর মুক্ত নয়ন-আঁধার ॥ ৩১৪ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন ওহে তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ ।
আমাতে এখন তুমি কি পেলে লক্ষণ ॥ ৩১৫ ॥
অন্য পণ্ডিতের সঙ্গে করিয়া বিচার ।
সাব্যস্ত করিতে হবে সিদ্ধান্ত তোমার ॥ ৩১৬ ॥
এতবলি প্রভুদেব কহিলা মথুরে ।
বৈষ্ণবচরণে লিখ শীঘ্র আসিবারে ॥ ৩১৭ ॥
রঙ্গপ্রিয় শ্রীমথুর রঙ্গরস চায় ।
বৈষ্ণবে লিখিয়া দিল আসিতে ত্বরায় ॥ ৩১৮ ॥
যথাদিনে প্রভু সঙ্গে তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ ।
শ্যামার মন্দিরে করিলেন আগমন ॥ ৩১৯ ॥
টলটল গোটা অঙ্গ আবেশের ভরে ।
চরণ যেমন তনু ধরিতে না পারে ॥ ৩২০ ॥
মথুরের হেনকালে হৈল সংযোটন ।
উপনীত সেইক্ষণে বৈষ্ণবচরণ ॥ ৩২১ ॥
বিধির ঘটন কিবা যাই বলিহারি ।
রামকৃষ্ণলীলা-কথা অমৃতলহরী ॥ ৩২২ ॥
বৈষ্ণব দেখিয়া প্রভু হইলা কেমন ।
হুঙ্কারিয়া স্কন্ধে তাঁর কৈলা আরোহণ ॥ ৩২৩ ॥
তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ দেখে আঁখির উপরে ।
দেবী চড়িলেন যেন বৈষ্ণবের ঘাড়ে ॥ ৩২৪ ॥
পদে নিপীড়িত ধূলা তাহার আকৃতি ।
কালিমা আঁধার বর্ণ বারুদ যেমতি ॥ ৩২৫ ॥
অতিশক্তি ধরে কৈলে অগ্নি পরশন ।
প্রভুর পরশে তেন বৈষ্ণবচরণ ॥ ৩২৬ ॥
সচেতন গোটা সৃষ্টি চৈতন্যের জোরে ।
সাক্ষাৎ চৈতন্য সেই কাঁধের উপরে ॥ ৩২৭ ॥
হৃদয় চৈতন্যময় তাহার উচ্ছ্বাসে ।
রচিয়া নূতন স্তোত্র অনর্গল ভাষে ॥ ৩২৮ ॥
চিত্রিত না হয় এই বিচিত্র দর্শন ।
মহাভাবে সমাধিস্থ প্রভু নারায়ণ ॥ ৩২৯ ॥
উঠিছে জ্যোতির ছটা বদনমণ্ডলে ।
সে যে কি অপূর্ব রূপ সাধ্য কার বলে ॥ ৩৩০ ॥
ছটা করে ছটাময় ছুটে যতদূর ।
স্তম্ভিত বৈষ্ণব গৌরী আর শ্রীমথুর ॥ ৩৩১ ॥
বিস্ময়ে নীরব গৌরী তান্ত্রিক-ব্রাহ্মণ ।
নব সুরচিত স্তোত্র করিয়া শ্রবণ ॥ ৩৩২ ॥
দূর হৃদিতম দেখি প্রভুর ব্যাপার ।
দণ্ডবৎ হয়ে ভূমে লুটে বার বার ॥ ৩৩৩ ॥
শ্রীপ্রভুর ভাবাবেশ ভঙ্গ হলে পরে ।
হাসি হাসি শ্রীবয়ান কহিলা গৌরীরে ॥ ৩৩৪ ॥
শুনেছ ব্রাহ্মণী কিবা মোর কথা বলে ।
গৌরাঙ্গের অবতার নিতাইর খোলে ॥ ৩৩৫ ॥
উত্তর বচনে গৌরী কহে জোড় করে ।
তা বলিলে খাট করা হয় আপনারে ॥ ৩৩৬ ॥
যে শক্তিসম্পন্ন হ'লে অবতার গণি ।
আমি জানি আপনিই সে শক্তির খনি ॥ ৩৩৭ ॥
পুনশ্চ বলেন প্রভু কি কথা তোমার ।
যদ্যপি পণ্ডিত সঙ্গে করিয়া বিচার ॥ ৩৩৮ ॥
সাব্যস্ত করিতে পার যা বলিলে তুমি ।
তবে না তোমার কথা সত্য বলি আমি ॥ ৩৩৯ ॥
দেখহ পণ্ডিত উপনীত বিদ্যমানে ।
এত বলি দেখাইলা বৈষ্ণবচরণে ॥ ৩৪০ ॥
প্রভুর কৃপায় গেছে সিদ্ধাই তাহার ।
নাহি তর্কবুদ্ধি, তর্ক কে করিবে আর ॥ ৩৪১ ॥
বসেছে বিশ্বাস ঘটে ফুটেছে নয়ন ।
প্রভুদেবে বললেন তান্ত্রিক ব্রাহ্মাণ ॥ ৩৪২ ॥
বিচারে কি আছে কিছু বিচারের নাই ।
যাহা বলিলাম আগে পুনঃ বলি তাই ॥ ৩৪৩ ॥
এক প্রশ্ন করিবারে পার তুমি মন ।
যখন শ্রীপ্রভুদেব ব্রহ্ম সনাতন ॥ ৩৪৪ ॥
কি হেতু কাহার জন্য ধ্যান-আরাধনা ।
এতাধিক দেহকষ্ট সাধন-ভজনা ॥ ৩৪৫ ॥
ব্যাকুলতা অনুরাগে পূজক যখন ।
হইয়া গিয়াছে তাঁর কালী-বরশন ॥ ৩৪৬ ॥
নিরাকারাকারে আর সরাট বিরাটে ।
স্থূল সূক্ষ্ম চরাচর প্রতি ঘটে ঘটে ॥ ৩৪৭ ॥
তবে কেন পুনরায় সমুদিত মনে ।
তন্ত্রমতে যাবতীয় সাধন-ভজনে ॥ ৩৪৮ ॥
প্রথম প্রশ্নের কথা কহি শুন আগে ।
যখন পূজক বেশ সিদ্ধ অনুরাগে ॥ ৩৪৯ ॥
সাধারণে অনুরাগে কহে যে রকম ।
শ্রীপ্রভুর অনুরাগে বিভিন্ন ধরন ॥ ৩৫০ ॥
সাধারণে শব্দার্থেতে বুঝে সাদাসিধা ।
প্রভুর রাগের অর্থ-বস্তু আলাহিদা ॥ ৩৫১ ॥
ইতিপূর্বে কহিয়াছি এ রাগের কথা ।
এবে শুন বলি পুনঃ সংক্ষেপে বারতা ॥ ৩৫২ ॥
সতীর পতিতে টান মার যেন ছায়ে ।
বিষয়ীর টান যেন অর্থাদি বিষয়ে ॥ ৩৫৩ ॥
এ তিন টানের যোগে হয় যেই টান ।
তদপেক্ষা টান রহে রাগে মুর্তিমান ॥ ৩৫৪ ॥
একলক্ষ্য-মুখী টান রাগের প্রকৃতি ।
অদম্য অরোধনীয় অতি বেগবতী ॥ ৩৫৫ ॥
রাগের বেগের কথা নাহি বলা যায় ।
রূপ-রস-যুক্ত স্থূল জগতে ভাষায় ॥ ৩৫৬ ॥
ভাসে চিত্ত মন বৃদ্ধি সন্দেহ-আগার ।
গুরুর প্রগুরু ভাসে গুরু অহঙ্কার ॥ ৩৫৭ ॥
অস্তি নাস্তি দুই ভাসে আশ্চর্য ভারতী ।
সুদুর্লভ অনুরাগে বহে এই রীতি ॥ ৩৫৮ ॥
অনুরাগ নামে সেটি ষোল আনা ত্যাগ ।
আসক্তি-সম্বল জীবে সম্ভবে কি রাগ ॥ ৩৫৯ ॥
এ রাগের অণুকণা যদি কোথা থাকে ।
কলির নারদ ব্যাস শুক বলি তাঁকে ॥ ৩৬০ ॥
বায়ুবৎ সুক্ষ্ম রাগ চক্ষের অতীত ।
লক্ষণে জ্ঞাপন করে কোথা সমুদিত ॥ ৩৬১ ॥
স্বপ্নের দারুণ তেজ এত দেহে ধরে ।
দুর্বল মানবাধার ধরিতে না পারে ॥ ৩৬২ ॥
সাধনাদি স্থূল যদি ক্রিয়াকাণ্ড ঢের ।
তথাপিহ সাধ্য কিছু আছে মানুষের ॥ ৩৬৩ ॥
তাই প্রভু আচরিয়া সাধনা আপুনি ।
দুর্বলাবিশ্বাসী জীবে দিলা আশাবাণী ॥ ৩৬৪ ॥
অনুরাগে যেইমত কার্য সিদ্ধ হয় ।
সাধনেও সেইমত জানিবে নিশ্চয় ॥ ৩৬৫ ॥
দ্বিতীয় কারণ আর ইহার ভিতরে ।
শাস্ত্রের মর্যাদা-আদি রক্ষা করিবারে ॥ ৩৬৬ ॥
জগতে যতেক ধর্ম মত পথ রঙ্গ ।
প্রায় আছে প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ ॥ ৩৬৭ ॥
কোথাও কেবল ভোগ অন্য কিছু নাই ।
কোথাও বা ভোগ যোগ এক অঙ্গে ঠাঁই ॥ ৩৬৮ ॥
শেষাঙ্গেতে নাহি রবে অণুমাত্র ভোগ ।
অবিরাম একধারা শুদ্ধ একা যোগ ॥ ৩৬৯ ॥
কে কোন্ অঙ্গের যোগ্য হয় অধিকারী ।
শ্রীগুরু বাছিয়া দেন বিবেচনা করি ॥ ৩৭০ ॥
ভোগ ল'য়ে সাধকের প্রথম প্রবেশ ।
পশ্চাৎ যোগেতে হয় সাধনার শেষ ॥ ৩৭১ ॥
ভোগের নাহিক লেশ প্রভুর সাধনে ।
বড়ই মাহাত্ম্য-কথা শুন এক মনে ॥ ৩৭২ ॥
পরিণামশীল সৃষ্টিরূপ-রসে পূর্ণ ।
সূক্ষ্মদৃষ্টি-সহকারে করি তন্ন তন্ন ॥ ৩৭৩ ॥
দেখিয়া শুনিয়া প্রভু জ্ঞানাগ্নি জ্বালিয়ে ।
দিয়াছেন একেবারে আমূলে পুড়িয়ে ॥ ৩৭৪ ॥
সতত নিবৃত্তি-পথে এক যোগ সাথী ।
জন্ম থেকে গঠেছেন এ হেন প্রকৃতি ॥ ৩৭৫ ॥
ত্যাগ নিষ্ঠা একাগ্রতা একমনা গুণে ।
যখন সাধনা যাহা সিদ্ধ তিন দিনে ॥ ৩৭৬ ॥
যাবতীয় ধর্মমত জগজনে জানা ।
প্রতি মতে পথে প্রভু করিলা সাধনা ॥ ৩৭৭ ॥
দেখাইলা জগজনে কল্যাণ-নিদান ।
সব মত পথ সত্য কেহ নহে আন ॥ ৩৭৮ ॥
পথ মত ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যেকে প্রত্যেক ।
পরিণামে ফল যেটি সেটি কিন্তু এক ॥ ৩৭৯ ॥
দ্বাদশবার্ষিকব্যাপী করিয়া সাধন ।
ধর্মদ্বন্দ্ব জগতের করিলা ভঞ্জন ॥ ৩৮০ ॥
দৃষ্টি যদি থাকে রঙ্গ দেখহ প্রভুর ।
স্থানীয় জাতীয় নয় জগৎঠাকুর ॥ ৩৮১ ॥
মত পথ বিশেষের এক অঙ্গে ল'য়ে ।
যদি চলে কোন জন সাধনা করিয়ে ॥ ৩৮২ ॥
যথাশ্রম প্রাণপণ যথা অনুরাগে ।
তথাপি হইতে সিদ্ধ জন্ম জন্ম লাগে ॥ ৩৮৩ ॥
মহিমা মাহাত্ম্য দেখি প্রভুর এখানে ।
মনবুদ্ধি-হারা হই লীলা-আন্দোলনে ॥ ৩৮৪ ॥
শুন সাধনার কথা তান্ত্রিক আচারে ।
ভীষণ সাধনা এই সাধনা সংসারে ॥ ৩৮৫ ॥
যখন যে কাজে হয় শ্রীপ্রভুর মন ।
তখন তাহাতে হয় যাহা প্রয়োজন ॥ ৩৮৬ ॥
আপনি জুটিয়া আসে তাঁর সন্নিধানে ।
শশব্যস্ত সৃষ্টি যেন শ্রীআজ্ঞা-পালনে ॥ ৩৮৭ ॥
রামকৃষ্ণলীলা-কথা মধুর কাহিনী ।
সমাগতা সময়েতে সাধিকা ব্রাহ্মণী ॥ ৩৮৮ ॥
তন্ত্রমতে যাবতীয় ভজন-সাধনা ।
সুকৌশলা ব্রাহ্মণীর বিশেষিয়া জানা ॥ ৩৮৯ ॥
নিরুপমা দেবীরূপে বিধাতার গড়া ।
প্রভুতে বাৎসল্য ভাব সন্তানের বাড়া ॥ ৩৯০ ॥
ছানা মাখনাদি মিষ্টি মাগিয়া ভিক্ষার ।
আনিয়া আপন হাতে প্রভুকে খাওয়ার ॥ ৩৯১ ॥
সখ্য-বাৎসল্যাদি পঞ্চভাব সুমধুর ।
ঈশ্বরের ঈশ্বরত্ব যাহে করে দূর ॥ ৩৯২ ॥
সর্বশক্তিমান বিভু পরম ঈশ্বরে ।
বসায় আত্মীয়বৎ কোলের উপরে ॥ ৩৯৩ ॥
ব্রাহ্মণী ভুলিয়া গেছে ঐশ্বর্য এখন ।
মধুর বাৎসল্য-রসে মগ্ন প্রাণমন ॥ ৩৯৪ ॥
তান্ত্রিক সাধনে হয় পরম মঙ্গল ।
এই জ্ঞান সাধিকার হৃদে সমুজ্জ্বল ॥ ৩৯৫ ॥
সেই হেতু শ্রীপ্রভুর মঙ্গল-কারণ ।
সহায়স্বরূপা হৈল প্রাণ করি পণ ॥ ৩৯৬ ॥
মুক্তিকা-আসন লাগে প্রথমে প্রথমে ।
আরাধনা পুজা জপ ধ্যানের কারণে ॥ ৩৯৭ ॥
গঙ্গাহীন প্রদেশের মুণ্ড প্রয়োজন ।
শ্রমে যত্ন করিল ব্রাহ্মণী আয়োজন ॥ ৩৯৮ ॥
বেদিকা-রচনা দুটি এক বিশ্ব-মূলে ।
তিন নরমুণ্ড পুতে আসনের তলে ॥ ৩৯৯ ॥
পঞ্চবট-মূলে হৈল বেদিকা অপর ।
তার তলে পঞ্চ মুণ্ড মৃত্তিকা-ভিতর ॥ ৪০০ ॥
এই পঞ্চ মুণ্ড নহে কেবল নরের ।
পাঁচ মুণ্ড ভিন্ন ভিন্ন বিভিন্ন জীবের ॥ ৪০১ ॥
পূজা-জপাদিতে এই তন্ত্র-সাধনার ।
দুর্লভ দুষ্প্রাপ্য বস্তু যাহা দরকার ॥ ৪০২ ॥
সে সব ব্রাহ্মণী দিনে সংগ্রহ করিয়ে ।
রাত্রিতে বেদিকা ভূমে দেন যোগাইয়ে ॥ ৪০৩ ॥
পুরশ্চরণাদি জপ অঙ্গ সাধনার ।
প্রথমত চলে কোন ত্রুটি নাই তার ॥ ৪০৪ ॥
কখন যে আসে দিন কখন যে যায় ।
জ্ঞান নাই অতদূর মত্ত সাধনায় ॥ ৪০৫ ॥
প্রধান চৌষট্টিখানা তন্ত্রের ভিতরে ।
যতেক সাধনা সব সাঙ্গ পরে পরে ॥ ৪০৬ ॥
যে কোন সাধনা অঙ্গ করেন আরম্ভ ।
দিবসত্রয়ের মধ্যে নিরাপদে সাঙ্গ ॥ ৪০৭ ॥
অনুভূতি দর্শনাদি যোগজ বিকার ।
সময়ে কতই হয় সংখ্যা নাই তার ॥ ৪০৮ ॥
একবার হৈল হেন ক্ষুধা উগ্রতর ।
খাইলেও সৃষ্টি যেন ভরে না উদর ॥ ৪০৯ ॥
এইক্ষণে রাশি রাশি যদ্যপি ভক্ষণ ।
পরক্ষণে সেই ক্ষুধা হয় জাগরণ ॥ ৪১০ ॥
কাতরে শ্রীপ্রভুদেব কন ব্রাহ্মণীরে ।
সৃষ্টিগ্রাসী ক্ষুধা কিবা উদয় উদরে ॥ ৪১১ ॥
আশ্বাসিয়া সাধিকা বলেন কিবা ভয় ।
সাধনা-সাফল্য-হেতু এ রকম হয় ॥ ৪১২ ॥
তন্ত্রোক্ত উপায় বাবা আছে প্রতিকার ।
মথুর-সহায়ে কৈল সঠিক যোগাড় ॥ ৪১৩ ॥
ঘর পূর্ণ খাদ্যদ্রব্য না হয় গণন ।
সাধনাসম্ভূত ক্ষুধা শাস্তির কারণ ॥ ৪১৪ ॥
যখন তাহাতে দৃষ্টি পড়িল প্রভুর ।
কিঞ্চিং খাইলে তার ক্ষুধা হৈল দূর ॥ ৪১৫ ॥
বিভীষিকা তন্ত্রব্রত শুনে ভয় পায় ।
চিতাধুম-পানে কভু মত্ত প্রভুরায় ॥ ৪১৬ ॥
ছুটিতেন চারিদিকে ধূমের লাগিয়ে ।
চিতাধুম লক্ষ্য করি মুখব্যাদানিয়ে ॥ ৪১৭ ॥
কখন ত্রিশূল হস্তে করিয়া ধারণ ।
গঙ্গার কূলেতে হয় গম্ভীরে চলন ॥ ৪১৮ ॥
কখন কোমরে নারে ধরিতে বসন ।
চাদর থাকিত মাত্র গাত্র-আবরণ ॥ ৪১৯ ॥
বাহ্যহীন হইলে চাদর যার প'ড়ে ।
ব্রাহ্মণী যতনে দেয় শ্রীঅঙ্গেতে বেড়ে ॥ ৪২০ ॥
অপর উদ্দেশ্য নহে গাত্র-আবরণ ।
শ্রীঅঙ্গে বাহির হয় চাঁদের কিরণ ॥ ৪২১ ॥
পাছে কেহ লোকে দেখে এই অনুমানি ।
চাদরে ঢাকিয়া অঙ্গ রাখেন ব্রাহ্মণী ॥ ৪২২ ॥
সুন্দর অঙ্গের জ্যোতি চাদরে কি চাপে ।
শিখারূপে নির্গমন প্রতি লোমকূপে ॥ ৪২৩ ॥
কখন কখন হয় জ্যোতির্ময় কায়া ।
দাঁড়াইলে
রোদে নাহি পড়ে দেহছায়া ॥ ৪২৪ ॥
দেখিয়া জ্যোতির রাশি প্রভুদেব কন ।
প্রবেশহ দেহমধ্যে যতেক কিরণ ॥ ৪২৫ ॥
প্রবেশ অন্তরে মাগো বাহে ভয় বাসি ।
তবে না বিলয় দেহে কিরণের রাশি ॥ ৪২৬ ॥
ব্রাহ্মণী মায়ের চেয়ে সহায় সাধনে ।
সযতনে সচকিত রহে রেতে দিনে ॥ ৪২৭ ॥
অনুভূতি দর্শনাদি কতই যে হয় ।
সুমুর্খের সাধ্য কিবা দিবে পরিচয় ॥ ৪২৮ ॥
ছোট বড় কালী মূর্তি নাহি গণনায় ।
আগোটা ব্রহ্মাণ্ড মধ্যে স্থান না কুলায় ॥ ৪২৯ ॥
দ্বিভুজা হইতে দশভূজার মুরতি ।
রূপোজ্জ্বলে পরাজিত চন্দ্রিমার ভাতি ॥ ৪৩০ ॥
ধরনে গমনে শোভা সৌন্দর্য অশেষ ।
কত মত কয় কথা দেয় উপদেশ ॥ ৪৩১ ॥
ষোড়শী ত্রিপুরা ধুতি কান্তি মনোহরা ।
তুলনায় সৌদামিনী মলিনা আঁধারা ॥ ৪৩২ ॥
ভৈরবাদি দেবযোনি বিবিধ প্রকার ।
বিভিন্ন স্বভাবযুক্ত বিভিন্ন আকার ॥ ৪৩৩ ॥
ত্রিকোণ-আকারা জ্যোতির্ময়ী ব্রহ্মযোনি ।
জগৎকারণ শক্তি সৃষ্টির জননী ॥ ৪৩৪ ॥
অনির্বচনীয়া তিনি প্রসূতি প্রকাণ্ড ।
পলে পলে প্রসবিছে অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড ॥ ৪৩৫ ॥
অনাহত ধ্বনি অতি শ্রুতি-মুগ্ধকর ।
ব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় একত্রিত স্বর ॥ ৪৩৬ ॥
কুলাগারে জগদম্বা নিজে অধিষ্ঠান ।
অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি অশিব-নিদান ॥ ৪৩৭ ॥
কুণ্ডলীর জাগরণ মূলাধার হোতে ।
ঊর্ধ্বগতি পদ্মে পদ্মে সুষুম্নার পথে ॥ ৪৩৮ ॥
তন্ত্রমতে বীরভাবে সাধনার শেষ ।
জীবের কি কথা যেথা সশঙ্ক-মহেশ ॥ ৪৩৯ ॥
বীরভাবে শ্রীপ্রভুর সাধনা-বারতা ।
গাইবারে পূর্বে আছে বলিবার কথা ॥ ৪৪০॥
স্ত্রীমাত্রেই মাতৃ-জ্ঞান আজন্ম ধারণা ।
সতী কি অসতী কিবা বেশ্যা বারাঙ্গনা ॥ ৪৪১ ॥
ভেদাভেদাবিরহিত অদ্বৈত গিয়ান ।
এই লক্ষ্যে সাধকের সাধনা-বিধান ॥ ৪৪২ ॥
জন্মাবধি স্বতঃসিদ্ধ পূর্ণজ্ঞান যাঁর ।
সাধনে হইতে সিদ্ধ কিবা তাঁর ভার ॥ ৪৪৩ ॥
প্রভু যে শ্রীপ্রভুদেব পরম ঈশ্বর ।
মায়াতীত মায়াযুক্তে লীলার আকর ॥ ৪৪৪ ॥
মায়া নাহি মোহে তাঁরে পুরুষপ্রধান ।
শুদ্ধ মনে শুন রামকৃষ্ণলীলা গান ॥ ৪৪৫ ॥
ঈশ্বরীয়
উদ্দীপনা স্ত্রীমূর্তি দেখিলে ।
জৈব ভাবে কামদৃষ্টি নাহি কোন কালে ॥ ৪৪৬ ॥
বিচিত্র ত্যাগের কথা না শুনি কখন ।
স্বপনেও নহে কভু প্রকৃতিগ্রহণ ॥ ৪৪৭ ॥
বহু জ্ঞান নাহি তাঁর এক জ্ঞান জ্ঞান ।
সবে একে একে সব সকলে সমান ॥ ৪৪৮ ॥
স্থূল দৃষ্টি নাহি কভু দেখেন অন্তর ।
একের অনন্ত মূর্তি সৃষ্টি চরাচর ॥ ৪৪৯ ॥
আবিলতা মলিনতা যেন জৈব ভাবে ।
লেশ গন্ধ নাহি তার প্রভুর স্বভাবে ॥ ৪৫০ ॥
আমাদের পক্ষে প্রভুদেবে বুঝা ভার ।
স্বার্থে কাম রুধিয়াছে দৃষ্টি সবাকার ॥ ৪৫১ ॥
প্রার্থনা করিয়া মুক্ত করহ লোচন ।
যাহাতে হইবে কিছু লীলা দরশন ॥ ৪৫২ ॥
বীরভাবে শ্রীপ্রভুর লীলা সাধনার ।
পূর্ববৎ ছিল ইচ্ছা নাহি গাইবার ॥ ৪৫৩ ॥
কিন্তু এবে দেখিতেছি বিচিন্তিয়া মনে ।
হবে মহা অঙ্গহীন শ্রীলীলা বর্ণনে ॥ ৪৫৪ ॥
মহতী মাহাত্ম্য আছে এই সাধনায় ।
শুন লীলা-গীত গাথা পূর্ণ মহিমায় ॥ ৪৫৫ ॥
শক্তি অগ্রহণে বীরভাবের সাধনা ।
হয় না হবার নয় কখন হবে না ॥ ৪৫৬ ॥
তাই কথা গাইবারে পরাণ বিকল ।
ধরিলেন মাছ প্রভু না ছুঁইয়া জল ॥ ৪৫৭ ॥
একদিন নিশাভাগে হাজির ব্রাহ্মণী ।
সঙ্গে ল'য়ে এক পূর্ণ যুবতী রমণী ॥ ৪৫৮ ॥
প্রভুদেবে বলিলেন দেবী জ্ঞান করি ।
পূজা করিবার তরে যুবতী সুন্দরী ॥ ৪৫৯ ॥
যথা কথা সমাপন সাধনার অঙ্গ ।
পশ্চাৎ ব্রাহ্মণী তাহে করিল উলঙ্গ ॥ ৪৬০ ॥
পরে উপদেশে কথা তপস্বিনী বলে ।
জপ কর বাবা বসি উলঙ্গার কোলে ॥ ৪৬১ ॥
অভিন্ন জননী-দৃষ্টি প্রভুর আমার ।
অঙ্কগত ছেলে যেন কোলে বসে মার ॥ ৪৬২ ॥
একেবারে সমাধিস্থ বাহ্য গেছে ছেড়ে ।
ব্রাহ্মণী দেখিয়া ভাসে সুখের সাগরে ॥ ৪৬৩ ॥
ভাঙ্গিলে সমাধি কহে আনন্দ অপার ।
উঠ বাবা কার্যসিদ্ধি হয়েছে তোমার ॥ ৪৬৪ ॥
একদিন মৎস্য রাঁধি শবের খর্পরে ।
তর্পণাস্তে প্রভুদেবে কহে খাইবারে ॥ ৪৬৫ ॥
সন্দ-ঘৃণা-বিরহিত সুসরল মন ।
উপদেশ মত কার্য কৈলা সমাপন ॥ ৪৬৬ ॥
গলিত মনুষ্য-মাংস এক দিন আনে ।
খাইবারে দিতে চায় প্রভুর বদনে ॥ ৪৬৭ ॥
এইখানে প্রভুদেব আজি বিচলিত ।
খাইতে নারেন মহামাংস বিগলিত ॥ ৪৬৮ ॥
চঞ্চল দেখিয়া তাঁয় কহিলা সাধিকা ।
সকল করিলে বাবা হেথা কেন বাঁকা ॥ ৪৬৯ ॥
এই দেখ খাই আমি এতেক বলিয়া ।
মাংসের আংশিক দিল বদনে ফেলিয়া ॥ ৪৭০ ॥
প্রত্যক্ষে সাধিকা-কৃত দেখিয়া ঘটনা ।
প্রচণ্ডা চণ্ডিকা-মূর্তি হয় উদ্দীপনা ॥ ৪৭১ ॥
মা মা রবে ভাবাবিষ্ট প্রভুকে দেখিয়ে ।
ব্রাহ্মণী দিলেন মাংস শ্রীমুখে ফেলিয়ে ॥ ৪৭২ ॥
চণ্ডিকার ভাবারোপে নাহি আর ঘৃণা ।
অবোধ্য অগম্য তত্ত্ব বুদ্ধিতে আসে না ॥ ৪৭৩ ॥
আর দিন আনি কোন প্রণয়ী-যুগলে ।
একত্রে সঙ্গম যবে প্রভুদেবে বলে ॥ ৪৭৪ ॥
দিব্যজ্ঞানে বাবা তুমি কর নিরীক্ষণ ।
জপ কর চঞ্চল না হয় যেন মন ॥ ৪৭৫ ॥
সম্ভোগে সুসংযতাবস্থা নরনারী দুয়ে ।
পুরুষ-প্রকৃতি-ভাব দিল দেখাইয়ে ॥ ৪৭৬ ॥
শিবশক্তি মিলিত প্রধানা যার নাম ।
কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তির ধাম ॥ ৪৭৭ ॥
বাহ্যহারা সমাধিস্থ প্রভু গুণমণি ।
পরে বাহ্য প্রাপ্তে তাঁহে কহিল ব্রাহ্মণী ॥ ৪৭৮ ॥
বলিতে না পারি আজি কি আনন্দ মনে ।
দেখিয়া তোমায় সিদ্ধ আনন্দ-আসনে ॥ ৪৭৯ ॥
তান্ত্রিক ব্যাপার হৈল এইখানে ইতি ।
কল্যাণ-নিদান রামকৃষ্ণলীলা গীতি ॥ ৪৮০ ॥