তৃতীয় খণ্ড

ষোড়শীপূজা


জয় জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় মাতৃদেবী জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় ইষ্টগোষ্ঠী জয় ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


শুনিলে পবিত্র চিত,      রামকৃষ্ণ-লীলাগীত,
        সুললিত সুধার সমান ।
ভয়ারণ্য-দাবানলে,   লীলা-সংকীর্তন ফলে,
        অবহেলে মিলে পরিত্রাণ ॥ ১ ॥


দুর্বলে উপজে শক্তি,    অষ্টপাশে পায় যুক্তি,
        মিলে ভক্তি মহারত্ন-ধন ।
জাগে কুণ্ডলিনী সুপ্ত,     মূলাধারে দ্বার মুক্ত,
        সমুদিত চৈতন্য-তপন ॥ ২ ॥


অধঃবায়ু হয় উর্ধ্ব,        বিকশিত হৃদিপদ্ম,
        প্রতিঘাতে মন মত্ত উঠে পরিমল ।
নয়নের শক্তি বৃদ্ধি,         নিরমল মন-বুদ্ধি,
        চিত্তশুদ্ধি তপস্যার ফল ॥ ৩ ॥


এ অতি গম্ভীর লীলে, স্রোত বহে অন্তঃশীলে,
        বাহু চক্ষে মরুর আকার ।
না হইলে শুদ্ধ চিত্ত,       এ লীলার সারতত্ত্ব,
        বোধগম্য নহে হইবার ॥ ৪ ॥


আধ্যাত্মিকে লীলাখেলা, বাক্যে নাহি যায় খোলা,
        লীলা-রাজ্য বিমানে বিমানে ।
দেখে কানা, বলে মূক,        অন্তরে গম্ভীরে সুখ,
        বদ্ধ-মুখ হয় সে কারণে ॥ ৫ ॥


লীলার গোসাঞি যিনি,    যাদুকর-শিরোমণি,
        নিরক্ষর দীনতার বেশ ।
ভিতরে প্রতিভা-ছটা,        সলজ্জ দর্শন-ছটা,
        পরাজিত যোগেশ মহেশ ॥ ৬ ॥


যেখানে লীলার বাতি, দিনে তথা ঘোরা রাতি,
        ফুটে ভাতি দেশ-দেশান্তরে ।
সঙ্গীদের অঙ্গ ঢাকা,      মণি যেন কাদামাখা,
        স্বরূপত সাধ্য কার ধরে ॥ ৭ ॥


লীলার সহায়া যিনি,       শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী,
        মায়াম্বরে ঢাকা, চেনা ভার ।
যেখানে হইল জন্ম,      সেথা যেন জন্ম জন্ম,
        দিনে রেতে দ্বারুণ-আঁধার ॥ ৮ ॥


বিধি বিপরীত ওমা,       পূর্ণিমার ঘোর ক্ষমা,
        বিজলি প্রতিমা মেঘে ঢাকে ।
কনকে কালির বর্ণ,         জনাকীর্ণে মহারণ্য,
        বলিহারি লীলাময়ী মাকে ॥ ৯ ॥


ধরা যেত সসাগরা,      স্বতঃ মাতা মায়াম্বরা,
        তন্ত্রপরি দারুণাবরণ ।
কেবল প্রভুর চেনা,      কালাকালে জানাশুনা,
        শুন কহি অমৃত কথন ॥ ১০ ॥


শ্রীপ্রভু লীলার স্বামী,       সঙ্গে মাতাঠাকুরানী,
        সনাতনী সৃষ্টির আধার ।
বিভিন্ন মাত্র ভৌতিকে, এক আত্মা আধ্যাত্মিকে,
        অভ্যন্তরে দোঁহে একাকার ॥ ১১ ॥


দৈহিক সুখ সম্বন্ধ,        প্রভু অবতারে বন্ধ,
        পরিণয় মাত্র সংস্কার ।
কি বুঝিবে বন্ধ নয়,        ইষ্টজ্ঞান পরস্পর,
        কে পূজ্য পূজক বুঝা ভার ॥ ১২ ॥


ঠাকুরে শ্রীমায়ে বিয়ে, ছার জৈব বৃদ্ধি দিয়ে,
        দেখিলে পড়িবে মহাদায় ।
শুন কহি পরিচয়,     দেহে দেহে বিয়ে নয়,
        পরিণয় আত্মায় আত্মায় ॥ ১৩ ॥


শ্রীগুরু শ্রীগুরুমাতা, লীলাকাণ্ডে অভেদাত্মা,
        আকারে গড়নে ভিন্ন জাতি ।
সৃষ্টিলীলার কারণ,          এক বস্তু দুরকম,
        ভিন্ন নাম পুরুষ প্রকৃতি ॥ ১৪ ॥


বয়স্কা এবে জননী,    সঙ্গে আই ঠাকুরানী,
        নিবসতি দক্ষিণশহরে ।
থাকেন ভিন্ন ভবনে,       স্বতন্ত্র প্রভুর সনে,
        এই কালী-পুরীর ভিতরে ॥ ১৫ ॥


এখন কখন কভু,        ভাবাপন্ন হয়ে প্রভু,
        বেশ ভূষা করিয়া ধারণ ।
প্রবেশি শ্যামা-মন্দিরে,  চামর লইয়া করে,
        করিতেন শ্যামায় ব্যজন ॥ ১৬ ॥


সখী ভাব এলে গায়,     বলিতেন গুরুমায়,
        সাজাইয়া দিতে সখীবেশে ।
মাতা কুতূহল হয়ে,      বসন কাঁচলি দিয়ে,
        সাজায়ে দিতেন পরমেশে ॥ ১৭ ॥


অঙ্গে শোভে আভরণ,  ধীরে ধীরে আগমন,
        শ্রীমন্দিরে প্রতিমা যেথায় ।
ভাবের আবেশে মত্ত,      আচরণ কত মত,
        বিশেষিয়া কহা নাহি যায় ॥ ১৮ ॥


এবে তাহা তিয়াগিয়ে,  মূর্তিমতী গুরুমায়ে,
        পুজিতে প্রভুর হৈল মন ।
যথা বিধি উপচার,      আজ্ঞা হইল তাহার,
        করিবারে ত্বরা আয়োজন ॥ ১৯ ॥


যখন যা ইচ্ছা আসে, জুটে তাহা অনায়াসে,
        ইচ্ছাময় প্রভুর ইচ্ছায় ।
আয়োজন পরিপাটি,     অণুমাত্র নাই ত্রুটি,
        যাহা লাগে যোড়শীপুজায় ॥ ২০ ॥


লইলেন তার সনে,       পূর্ব সাধনভজনে,
        ব্যবহৃত যাহা ছিল তোলা ।
বস্ত্র বিবিধ বরন,        সাজসজ্জা আভরণ,
        সগোমুখী রুদ্রাক্ষের মালা ॥ ২১ ॥


বিল্বপত্রে নিজ নাম,     সাদরে শ্রীগুণধাম,
        লিখিয়া লইলা হাতে তুলি ।
সর্বদ্রব্য সহযোগে,      মায়ের চরণ আগে,
        ভক্তিভরে দিলেন অঞ্জলি ॥ ২২ ॥


বলিলেন বারবার,        যাগযজ্ঞ তপাচার,
        সাধন ভজন সমুদায় ।
করম-কাণ্ডের মালা, আজ হৈল শেষ খেলা,
        সকল সঁপিনু দুটি পায় ॥ ২৩ ॥


পূজার সময় হেথা,     সুস্থির নীরবে মাতা,
        মহাপূজা করিলা গ্রহণ ।
দেহখানি জড়প্রায়,   বাহ্য চেষ্টা নাহি গায়,
        মৃত্তিকার প্রতিমা যেমন ॥ ২৪ ॥


পূজ্য পূজকেতে দু'য়ে,   ভাবরাজ্য তিয়াগিয়ে,
        ভাবাতীতে একত্রে মিলন ।
দেহ দু'টি প'ড়ে হেথা, মিলিয়া গিয়াছে সেথা,
        বিয়ের বারতা বুঝ মন ॥ ২৫ ॥


মা না হোলে মহাশক্তি, কার হেন গায়ে শক্তি,
        লইবেন শ্রীপ্রভুর পূজা ।
প্রভু যে পরমেশ্বর,          ব্রহ্মাবিষ্ণু মহেশ্বর,
        সর্বেশ্বর সকলের রাজা ॥ ২৬ ॥


প্রভু সঙ্গে এইবার,        জগমাতা অবতার,
        সেই পূর্ণব্রহ্ম সনাতনী ।
কৃপাময়ী কলেবরে,      করুণার ধারা করে,
        শান্তিমূর্তি মঙ্গলরূপিণী ॥ ২৭ ॥


শ্যামা নহে শ্যামাসুতা, উগ্রভাব বিবর্জিতা,
        মাতৃস্নেহে পূর্ণিত আধার ।
হিতে রতা মাতৃরীত,      পরতত্ব সুবিদিত,
        শিক্ষাহেতু গার্হস্থ্য আচার ॥ ২৮ ॥


এ পূজা পূজার ইতি, আর দেবদেবী মূর্তি,
        কভু না পুজিলা পরমেশ ।
যেন পুজা শ্রীশ্রীমার,      পরম চরম সার,
        পরিণাম সকলের শেষ ॥ ২৯ ॥


এ দিকে মায়ের রীতি,  প্রভুপদে নিষ্ঠাবতী,
        শ্রীপ্রভুই এক ধ্যান-জ্ঞান ।
তাঁর চিন্তা দিবানিশি, তাঁর সেবা-অভিলাষী,
        প্রভু যেন পরান পরান ॥ ৩০ ॥


বুঝ মন ইশারায়,       প্রভু আর শ্রীশ্রীমায়,
        রূপে দু'হু আত্মায় অভেদ ।
হৃদে চিত্তে প্রাণে মনে, এক ঠাঁই দুই জনে,
        তিলেকেও নাহিক বিচ্ছেদ ॥ ৩১ ॥


অমিয় পুরিত কথা,     রামকৃষ্ণলীলা-গাথা,
        তাহে মত্ত মগ্ন রহ মন ।
কি কাজ অপর হলে,     এক রত্নাকর তলে,
        যাবতীয় মানিক রতন ॥ ৩২ ॥