চতুর্থ খণ্ড
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে কথোপকথন
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শহরের মধ্যে স্থান বাদুড়বাগান ।
প্রসিদ্ধ পণ্ডিত তথা দেশজুড়ে নাম ॥ ১ ॥
শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আখ্যায় ।
শ্রদ্ধাভক্তিসহকারে দশে গুণ গায় ॥ ২ ॥
বহুগুণে বিভূষিত দিব্য কলেবর ।
বিদ্যার সাগর যেন দয়ার সাগর ॥ ৩ ॥
স্বার্থশূন্য দয়া তাঁর অন্তরেতে ভরা ।
পরদুঃখবিমোচনে দেহখানি ধরা ॥ ৪ ॥
ঈশ্বর সম্বন্ধে বিদ্যাসাগরের জ্ঞান ।
চৈতন্যস্বরূপ নিরাকার ভগবান ॥ ৫ ॥
সাধনা বলিয়া নাই কোন কর্ম করা ।
স্বভাবসুলভ ধর্ম পরদুঃখহরা ॥ ৬ ॥
স্বার্থশূন্য শুদ্ধসত্ত্ব দয়াগুণ যায় ।
প্রভুর অপার কৃপা করুণা তাঁহায় ॥ ৭ ॥
সাক্ষীর স্বরূপ শম্ভু মল্লিক সজ্জন ।
বলিয়াছি বহু অগ্রে তাঁর বিবরণ ॥ ৮ ॥
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত এবে মুখুয্যে ঈশান ।
ঠনঠনিয়ায় যাঁর আবাসের স্থান ॥ ৯ ॥
তিন শতাধিক টাকা মাসে মাসে আয় ।
দরিদ্র অনাথে দিতে তাহে না কুলায় ॥ ১০ ॥
ফুরাইলে অর্থ করে পরান বিকলি ।
অবশেষে বাঁধা যায় গৃহিণীর রুলি ॥ ১১ ॥
পরদুঃখবিমোচন খ্যাতি সাধারণে ।
দুয়ারে দুঃখীর মেলা থাকে রেতে দিনে ॥ ১২ ॥
দয়ায় গঠিত হিয়া কোমল আচার ।
দিবারাতি চিন্তা কিসে পর-উপকার ॥ ১৩ ॥
দুর্গানামে অপার বিশ্বাস ভরা ঘটে ।
বড়ই আদর তাঁর প্রভুর নিকটে ॥ ১৪ ॥
বারে বারে ঈশানের ঘরে আগমন ।
করিলেন প্রভুদেব ভক্তবিনোদন ॥ ১৫ ॥
ঈশান নিজের জন টানাটানি প্রাণে ।
এ সম্বন্ধ নহে বিদ্যাসাগরের সনে ॥ ১৬ ॥
সঙ্কেতে বুঝহ সন্দ হয় যদি মন ।
নিরাকারবাদী বিদ্যাসাগর ব্রাহ্মণ ॥ ১৭ ॥
সাকার যাঁহার প্রাণে নাহি পায় স্থান ।
সে জনে কেমনে পাবে প্রভুর সন্ধান ॥ ১৮ ॥
সত্ত্বগুণী জনে তাঁর করুণা বিস্তর ।
তাই আজি যান প্রভু পণ্ডিতের ঘর ॥ ১৯ ॥
কৃতার্থ করিতে তাঁয় দিয়া দরশন ।
সঙ্গে চলে আত্মগণ ভক্ত কয়জন ॥ ২০ ॥
গতি মতি প্রভুপদে পিরীতি অপার ।
দলমধ্যে নেতা আজি মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ২১ ॥
যখন যেখানে যান প্রভু পরমেশ ।
প্রায় হয় পথিমধ্যে ভাবের আবেশ ॥ ২২ ॥
আজিও শ্রীঅঙ্গে ভাব হইল প্রভুর ।
বিদ্যাসাগরের ঘর নহে অতি দূর ॥ ২৩ ॥
কিছু পরে দুয়ারে শকট উপনীত ।
লইয়া চলিল তাঁরে যেথায় পণ্ডিত ॥ ২৪ ॥
সভক্তিতে শ্রদ্ধাচিত্তে আসন ছাড়িয়া ।
পণ্ডিত দণ্ডায়মান প্রভুরে দেখিয়া ॥ ২৫ ॥
করুণাসাগর তাঁয় করি নিরীক্ষণ ।
সমাধিস্থ মহাভাবে হইলা মগন ॥ ২৬ ॥
ভাঙ্গিলে ভাবের নেশা বাহ্য এলে পর ।
সমাসীন প্রভু দত্তাসনের উপর ॥ ২৭ ॥
পণ্ডিতে অপার কৃপা না যায় বর্ণনে ।
বুঝ লক্ষ কোটি গুণ এক বর্ণ শুনে ॥ ২৮ ॥
ভাবভঙ্গে শ্রীপ্রভুর রীতি আগাগোড়া ।
সামাজ শীতল জল কিছু পান করা ॥ ২৯ ॥
শিশুর সমান ভাব লজ্জা নাহি মোটে ।
তখনি বলেন তাই যাহা মনে উঠে ॥ ৩০ ॥
অকপটে বলিলেন প্রভু গুণমণি ।
পাইয়াছে পিপাসা পানীয় খাব আমি ॥ ৩১ ॥
পণ্ডিত শুনিয়া চলে বাড়ির ভিতর ।
ত্ব্বরা করি পাত্রে ভরি বিস্তর বিস্তর ॥ ৩২ ॥
বর্ধমান থেকে আনা ঘরে ছিল তাঁর ।
প্রসিদ্ধ মিঠাই মিষ্টি বড়ই সুতার ॥ ৩৩ ॥
শ্রদ্ধাসহ আনিলেন পণ্ডিতপ্রবর ।
তুষিবারে প্রভুবরে পরম ঈশ্বর ॥ ৩৪ ॥
গ্রহণ করিয়া ভোজ্য কৃপার লক্ষণ ।
পণ্ডিতের সঙ্গে হয় কথোপকথন ॥ ৩৫ ॥
প্রসাদ-বণ্টনকালে মাস্টারের হাতে ।
গুণব্যাখ্যা প্রভু তাঁর কৈলা বিধিমতে ॥ ৩৬ ॥
সুন্দর স্বভাবযুক্ত যুবক সজ্জন ।
দেখিতে প্রকৃত ফল্গুনদীর মতন ॥ ৩৭ ॥
বাহ্যিকে বালুকাবন বিশুষ্ক আকার ।
অদৃশ্য রসের স্রোত অন্তে অনিবার ॥ ৩৮ ॥
আরে মন কোটি কোটি দণ্ডবৎ তাঁয় ।
রতি মতি ভক্তি যাঁর শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ৩৯ ॥
পণ্ডিতে সন্তাষে প্রভু রসের সাগর ।
এড়াইয়া খাল খানা বিস্তর বিস্তর ॥ ৪০ ॥
নদ নদী বিলা জলা ডোবা অগণন ।
ভাগ্যবলে হৈল আজি সাগরে মিলন ॥ ৪১ ॥
পণ্ডিত উত্তরে কন প্রভু গুণধরে ।
সাগরের লোনা জল লয়ে যান ঘরে ॥ ৪২ ॥
পণ্ডিতে পুনশ্চ শ্রীপ্রভুর প্রত্যুত্তর ।
লোনা কিসে নহে ইহা লবণসাগর ॥ ৪৩ ॥
অবিদ্যাসাগরে ধরে লবণের তার ।
ক্ষীরোদসাগর ইহা সাগর বিদ্যার ॥ ৪৪ ॥
কোমল-হৃদয় তুমি সত্ত্বগুণী জন ।
পরদুঃখনাশহেতু অর্থ-উপার্জ্জন ॥ ৪৫ ॥
সত্ত্বগুণে যদ্যপিহ রাজসের খেলা ।
স্বার্থশূন্য কর্মে নাই কর্মফলজ্বালা ॥ ৪৬ ॥
পালিলে দয়ার ধর্ম ভক্তি সহকারে ।
ক্রমশঃ লইয়া যায় ঈশ্বরের ঘরে ॥ ৪৭ ॥
দয়াতে হয়েছ তুমি কোমল নরম ।
অত্যুক্তি এ নহে তুমি সিদ্ধ একজন ॥ ৪৮ ॥
যেমন আগুনে সিদ্ধ করিলে পটল ।
আলু কি আনাজপাতি অন্য কোন ফল ॥ ৪৯ ॥
কোমল নরম হয় তাপ পেয়ে গায় ।
তোমায় করেছে তেন কোমল দয়ায় ॥ ৫০ ॥
শ্রীমুখে শুনিয়া এত প্রশংসা-কাহিনী ।
সবিনয়ে কহিল পণ্ডিতশিরোমণি ॥ ৫১ ॥
সত্য মানি সিদ্ধ আলু আনাজ পটল ।
স্বভাব ছাড়িয়া হয় অত্যন্ত কোমল ॥ ৫২ ॥
কিন্তু কলায়ের বাটা সিদ্ধ হলে পরে ।
নরম কোথায় অতি শক্ত গুণ ধরে ॥ ৫৩ ॥
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভুদেব অখিলের পতি ।
সুবিদিত যার যেন স্বভাব প্রকৃতি ॥ ৫৪ ॥
তুমি নহ তার জাতি স্বভাব সুন্দর ।
এই বলি দিয়া তাঁর কথার উত্তর ॥ ৫৫ ॥
বিশদে ভাঙ্গিয়া পরে কহেন গোসাঁই ।
তুমি নহ সে পণ্ডিত শাস্ত্রব্যবসাই ॥ ৫৬ ॥
উপমায় পঞ্জিকায় প্রকাশ সকল ।
অমুক সময়ে হবে এত আড়া জল ॥ ৫৭ ॥
কতই জলের কথা পঞ্জিকায় লেখা ।
নিঙ্গুড়িলে পাঁজি নাহি বিন্দু যায় দেখা ॥ ৫৮ ॥
সেইমত শাস্ত্রাধ্যায়ী পণ্ডিতের দল ।
বিজ্ঞান বেদান্ত ব্রহ্ম মুখেতে কেবল ॥ ৫৯ ॥
বাখানিছে যাঁর কথা সে বস্তু কেমন ।
আভাস না জানে বিনা দুই একজন ॥ ৬০ ॥
সেই বিদ্যা পরা বিদ্যা পরম সুন্দর ।
জানাইয়া দেয় যায় পরম ঈশ্বর ॥ ৬১ ॥
অন্যবিধ বিদ্যা যত স্মৃতি ব্যাকরণ ।
বিজ্ঞান পুরাণ ন্যায়শাস্ত্র অগণন ॥ ৬২ ॥
কোনই কাজের নয় নাহি তার সার ।
কেবল মনের মধ্যে জঞ্জালের ভার ॥ ৬৩ ॥
আগোটা গীতার পাঠে কিবা দরকার ।
বল দেখি মুখে গীতা মাত্র দশবার ॥ ৬৪ ॥
'গীতা' 'গীতা' উচ্চারণে 'ত্যাগী' 'ত্যাগী' হয় ।
গীতাপঠনের ফল তিয়াগ নিশ্চয় ॥ ৬৫ ॥
ধন-মান-যশ-আশা ইন্দ্রিয়ের সুখ ।
হইবে তিয়াগী জনে এ সবে বিমুখ ॥ ৬৬ ॥
সর্বসুখ পরিহার হরির কারণে ।
গীতার কেবল ইহা একমাত্র মানে ॥ ৬৭ ॥
হরিপদলাতে একা তিয়াগ সম্বল ।
গীতা অর্থে এক অর্থ তিয়াগ কেবল ॥ ৬৮ ॥
কায়মনে সকল করিবে পরিহার ।
প্রকৃত সন্ন্যাসী স্থানে ইচ্ছা হয় যার ॥ ৬৯ ॥
করিবে প্রত্যঙ্গে অঙ্গে কাজ সমুদায় ।
সমপিয়া কর্মফল শ্রীকৃষ্ণের পায় ॥ ৭০ ॥
প্রকৃত গৃহস্থ ত্যাগ রাখিবেন মনে ।
কর্মফল সমপিয়া ভক্তির কারণে ॥ ৭১ ॥
জীবগণে কহে গীতা সারার্থ ইহার ।
সর্বনাশি হরিপদ এক কর সার ॥ ৭২ ॥
যতনে হৃদয়ে ধরি বিবেক বিরাগ ।
কৃষ্ণের কারণে কর সকল তিয়াগ ॥ ৭৩ ॥
বুঝাইতে বিধিমতে তত্ত্ব উপমায় ।
দুজন সাধুর কথা কন প্রভুরায় ॥ ৭৪ ॥
শুন শুন ভক্তিতত্ব কেমন প্রভুর ।
একখানি পুঁথি ছিল জনৈক সাধুর ॥ ৭৫ ॥
কোন জন এক দিন জিজ্ঞাসিল তারে ।
কি পুঁথি কি আছে লেখা ইহার ভিতরে ॥ ৭৬ ॥
খুলিয়া সে পুঁথিখানি দেখাইল তায় ।
শুদ্ধ লেখা রামনাম প্রত্যেক পাতায় ॥ ৭৭ ॥
দ্বিতীয় সাধুর কথা আশ্চর্য কাহিনী ।
দাক্ষিণাত্যে যেইকালে গোরা গুণমণি ॥ ৭৮ ॥
দেখিলেন জনৈক পণ্ডিত কোনখানে ।
করিছেন গীতাপাঠ আপনার মনে ॥ ৭৯ ॥
সমাসীন পাশে তাঁর সাধু একজন ।
অবিরত করিতেছে অশ্রু বিসর্জন ॥ ৮০ ॥
নাহি জানে লেখাপড়া নিরক্ষর বটে ।
বুঝিতে গীতার ভাষা শক্তি নাহি ঘটে ॥ ৮১ ॥
জিজ্ঞাসিন পরে তাঁরে কোন একজন ।
কহ তত্ত্ব কি বুঝিয়া করিছ ক্রন্দন ॥ ৮২ ॥
সবিনয়ে কহে সাধু হইয়া কাতর ।
সত্যই সত্যই আমি মূর্খ নিরক্ষর ॥ ৮৩ ॥
এক শব্দ বুঝিবারে শক্তি মোর নাই ।
কিন্তু গীতাপাঠকালে দেখিবারে পাই ॥ ৮৪ ॥
যেমন সুন্দর কৃষ্ণ ভুবনমোহন ।
পূততীর্থে কুরুক্ষেত্রে পুণ্যদরশন ॥ ৮৫ ॥
বলিছেন এই গীতা মধুর বচনে ।
তৃতীয় পাণ্ডব ভক্ত বান্ধব অর্জুনে ॥ ৮৬ ॥
যতক্ষণ শুনি আমি এই গীতাগীতি ।
আগাগোড়া দেখি কৃষ্ণ মোহনমূরতি ॥ ৮৭ ॥
আখ্যান কহিয়া বলিলেন প্রভুবর ।
পরাবিদ্যাপ্রাপ্ত এই সাধু নিরক্ষর ॥ ৮৮ ॥
সেই বিদ্যা যার বলে হয় দরশন ।
সকলের সার কৃষ্ণ তাঁহার চরণ ॥ ৮৯ ॥
সাকার-প্রসঙ্গে এই ভক্তির আখ্যান ।
ঈশ্বর পণ্ডিতে কন প্রভু ভগবান ॥ ৯০ ॥
প্রথমে সাকার কথা উত্থাপন কেনে ।
অর্থ তার পণ্ডিত সাকার নাহি মানে ॥ ৯১ ॥
পণ্ডিতের ভাব অগ্রে হয়েছে প্রকাশ ।
নিরাকারবাদী নাহি সাকারে বিশ্বাস ॥ ৯২ ॥
তবে যেন দেখিতেছি শ্রীপ্রভুর ধারা ।
যাহার যেমন ভাব তাই রক্ষা করা ॥ ৯৩ ॥
পরে ব্রহ্মতত্ব প্রভু লাগিলা কহিতে ।
ভাগ্যবান পুণ্যবান ঈশ্বর পণ্ডিতে ॥ ৯৪ ॥
বলিলেন প্রভুদেব অখিলের পতি ।
বলিতেছিলাম আমি বিদ্যার ভারতী ॥ ৯৫ ॥
বিদ্যায় লইয়া যায় ঈশ্বরের পথে ।
অবিদ্যা-তামস পথ না দেয় দেখিতে ॥ ৯৬ ॥
ব্রহ্ম ঠিক আবাসের ছাদের মতন ।
সংলগ্ন সোপানে হয় তথায় গমন ॥ ৯৭ ॥
ব্রহ্মে আগমন-পথ যে বিদ্যা উপায় ।
সেই বিদ্যা সর্ব উচ্চ সোপানের প্রায় ॥ ৯৮ ॥
উভয় অবিদ্যা বিদ্যা মায়ার ভিতরে ।
মায়ার অভীত তিনি ব্রহ্ম বলি যারে ॥ ৯৯ ॥
অনাসক্ত ব্রহ্ম নহে কাহার অধীন ।
ভালমন্দ উভয়েতে সম্বন্ধবিহীন ॥ ১০০ ॥
আলোর শিখার সম স্বভাব তাঁহার ।
যে যেমন বাসে করে তেন ব্যবহার ॥ ১০১ ॥
কেহ বা আলোতে পাঠ করে ভাগবত ।
কেহ পাপমতি ব্যক্তি লিখে জালখত ॥ ১০২ ॥
আর উপমায় ব্রহ্ম সাপের মতন ।
দশনের কসে ধরে গরল বিষম ॥ ১০৩ ॥
তাহায় হানি কি কষ্ট না হয় তাহার ।
অপরে দংশনে করে প্রাণের সংহার ॥ ১০৪ ॥
আর দেখ শোক দুঃখ পাপাদি নিচয় ।
মন্দ নামে জনে জানে যার পরিচয় ॥ ১০৫ ॥
সে সকল আমাদের জীবের সম্পত্তি ।
এখে নাহি লাগে তাঁর সর্ব-উচ্চে স্থিতি ॥ ১০৬ ॥
সৃষ্টিতে মন্দের বাস ব্রহ্মে নাহি ফুটে ।
সাপের যেমন বিষ সাপের নিকটে ॥ ১০৭ ॥
ব্রহ্মের স্বরূপ তত্ত্ব ব্রহ্মের বারতা ।
বলিতে সক্ষম জন সৃষ্টিমাঝে কোথা ॥ ১০৮ ॥
তন্ত্র মন্ত্র বেদান্ত পুরাণ বেদমালা ।
সুখবিনিঃসৃত সর্ব বদনেতে বলা ॥ ১০৯ ॥
তেকারণ উচ্ছিষ্ট শাস্ত্রাদি সমুদায় ।
ব্রহ্মবস্তু অনুচ্ছিষ্ট না ফুটে কথায় ॥ ১১০ ॥
নীরব পণ্ডিত ছিল কহিল এখন ।
ব্রহ্ম অনুচ্ছিষ্ট আজি শুনিনু নূতন ॥ ১১১ ॥
প্রভুদের পণ্ডিতের বাক্যে দিয়া সায় ।
বলিলেন ব্রহ্মবস্তু না ফুটে কথায় ॥ ১১২ ॥
সাগর
কেমন কেহ করিলে জিজ্ঞাসা ।
কি দিবে উত্তর তুমি কোখা পাবে ভাবা ॥ ১১৩ ॥
বর্ণনায়
ক্ষমবান যদি হও বেশী ।
বলিবে কতই শব্দ ঢেউ রাশি রাশি ॥ ১১৪ ॥
অকূল অগাধ খুঁজে কেবা
পায় তল ।
চারিদিকে জলময় জল আর জল ॥ ১১৫ ॥
শুকদেব সম মহাপুরুষের গুণ ।
বহুকষ্টে কেহ
করিয়াছে দরশন ॥ ১১৬ ॥
পরশন কাহার বা সেই ব্রহ্মসিন্ধু ।
কাহার কেবল পান বারি এক
বিন্দু ॥ ১১৭ ॥
স্বভাব প্রকৃতি হেন আছয়ে তাহার ।
নামিলে জলধিজলে ফিরা নাহি আর ॥ ১১৮ ॥
অপর দৃষ্টান্তে ব্রহ্ম চিনির পাহাড় ।
হিমালয় সম বড় প্রকাণ্ড আকার ॥ ১১৯ ॥
শুকদেব
সমান সাধক যত জনা ।
খাইয়াছিলেন মাত্র দুই এক দানা ॥ ১২০ ॥
লবণ গঠিত কায় নুনের পুতুল ।
যদি যায় মাপিবারে জলধি অকূল ॥ ১২১ ॥
ঠাণ্ডা বায় গলিয়া মিশিয়া যায় জলে ।
তেমতি জীবের দশা ব্রহ্মে যোগ হলে ॥ ১২২ ॥
মায়ের ইচ্ছায় যদি ফিরে কোন জন ।
বলিতে না পারে ব্রহ্মসাগর কেমন ॥ ১২৩ ॥
বাখানিতে উপমায় প্রতু ভগবান ।
বলিলেন কোন এক জনের আখ্যান ॥ ১২৪ ॥
ছিল তার পুত্রদ্বয় শৈশব-সুন্দর ।
শিক্ষাহেতু পাঠাইল আচার্যের ঘর ॥ ১২৫ ॥
পুরাণ বেদান্ত বেদ ধর্মশাস্ত্র নানা ।
পড়িয়া বুঝিবে তত্ত্ব পিতার বাসনা ॥ ১২৬ ॥
যথা-আজ্ঞা গুরুগৃহে ভাই দুই জন ।
যতন সহিত শাস্ত্র করে অধ্যয়ন ॥ ১২৭ ॥
হেন রূপে কিছু দিন গত হলে পর ।
ডাকিল নন্দনদ্বয়ে আপন গোচর ॥ ১২৮ ॥
বেদান্তে ব্রহ্মের কথা কহে যে রকম ।
বলিলেন বিশেষিয়া করিতে কীর্তন ॥ ১২৯ ॥
ব্রহ্মের স্বরূপ তত্ত্ব করহ বর্ণনা ।
শুনিতে তোমার মুখে বড়ই বাসনা ॥ ১৩০ ॥
মিষ্টিভাষে কহে জ্যেষ্ঠ বেদান্তের ভাষ ।
পুঁথিতে যেমন ভাবে আছয়ে প্রকাশ ॥ ১৩১ ॥
অব্যক্ত অচিন্তনীয় মনাদির পার ।
ইত্যাদি ইত্যাদি তাহে আছে যে প্রকার ॥ ১৩২ ॥
শুনিয়াছি হও ক্ষান্ত করিয়া তাহারে ।
জিজ্ঞাসিল সেই প্রশ্ন কনিষ্ঠ কুমারে ॥ ১৩৩ ॥
শুনিয়া পিতার প্রশ্ন কনিষ্ঠ নন্দন ।
অধোমুখে রহে নহে বর্ণ উচ্চারণ ॥ ১৩৪ ॥
কিছু পরে কন তারে জনক তাহার ।
ব্রহ্মবস্তু উপলদ্ধি হয়েছে তোমার ॥ ১৩৫ ॥
অপার অনন্ত ব্রহ্ম সীমাহীন পারা ।
গুণাতীত জ্ঞানাতীত অব্যক্ত চেহারা ॥ ১৩৬ ॥
স্বরূপ বলিতে তাঁর সাধ্য কার পারে ।
মৌনী জনে কহে তত্ত্ব বাক্যবাণে নারে ॥ ১৩৭ ॥
যেথা পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞান বাক্য তথা নাই ।
উপমা সহিত ব্যাখ্যা করেন গোসাঁই ॥ ১৩৮ ॥
উনানে বসান ঘৃত কড়ার ভিতর ।
ক্রমাগত দিলে তাহে জ্বাল নিরন্তর ॥ ১৩৯ ॥
যতক্ষণ থাকে কাঁচা চড় চড় করে ।
পাকিলে নীরব ঘৃত শব্দ যায় মরে ॥ ১৪০ ॥
বিচার বাক্যের দ্বন্দ্ব কাঁচা জ্ঞান যার ।
পূর্ণ জ্ঞানে বাক্যহারা কে করে
বিচার ॥ ১৪১ ॥
পাকা ঘিয়ে পুনরায় শব্দ সমুত্থিত ।
রসে ভরা কাঁচা লুচি হইলে নিহিত ॥ ১৪২ ॥
পাকা ঘৃতে
কাঁচা লুচি কথা উপমার ।
গুরু-শিষ্যে দুয়ে যবে তত্বের বিচার ॥ ১৪৩ ॥
শূন্য গাড়ু জলমধ্যে যেন অবিকল ।
করে ভুক ভুক্ শব্দ যত ঢুকে জল ॥ ১৪৪ ॥
পরিপূর্ণ গাড়ু
যবে শব্দ কোথা আর ।
বাক্য ছাড়ে সেইমত পূর্ণ জ্ঞান যাঁর ॥ ১৪৫ ॥
কামিনীকাঞ্চন মনে যতক্ষণ রয় ।
ব্রহ্মবস্তু উপলব্ধি হইবার নয় ॥ ১৪৬ ॥
শুদ্ধাত্মা হইলে পরে সাধ হয় পূর্ণ ।
চৈতন্য কেবল জানে কেমন চৈতন্য ॥ ১৪৭ ॥
এই ঠাঁই শ্রীগোসাঁই নিজের আভাস ।
পণ্ডিতের সন্নিকটে করিলা প্রকাশ ॥ ১৪৮ ॥
বিশেষিয়া বলিবারে নাহি প্রয়োজন ।
আপনার মনে তুমি বুঝে লও মন ॥ ১৪৯ ॥
পুনরায় কহিতে লাগিলা ভগবান ।
শঙ্করাচার্যের মতে অদ্বৈতগিয়ান ॥ ১৫০ ॥
অদ্বৈতগিয়ান সত্য দ্বৈতজ্ঞান ভুল ।
জীবের যে দ্বৈতজ্ঞান মায়া তার মূল ॥ ১৫১ ॥
মায়ারাজ্যে যতকাল হয় বিচরণ ।
জীবের অদ্বৈতজ্ঞান ফুটে না কখন ॥ ১৫২ ॥
জগতে যাবৎ বস্তু ঘটনানিচয় ।
মায়ায় দেখায় মাত্র সত্য কিন্তু নয় ॥ ১৫৩ ॥
শঙ্করের মতে যাঁরা এই করে ব্যাখ্যা ।
দ্বৈতপ্রতিবাদী তাঁরা জ্ঞানিনামে আখ্যা ॥ ১৫৪ ॥
ব্রহ্ম সত্য মায়া মিথ্যা এই বোধ ঘটে ।
মিথ্যা মানে এইখানে সত্তা নাই মোটে ॥ ১৫৫ ॥
মায়া মিথ্যা অবিকল গিয়ান হইলে ।
অহঙ্কার অহংজ্ঞান নাশ পায় মূলে ॥ ১৫৬ ॥
অহং-এর চিহ্ন দেহে নাহি রহে আর ।
প্রকৃত সমাধিপদে তবে অধিকার ॥ ১৫৭ ॥
নামিলে সমাধি থেকে নীচেকার ঘরে ।
মায়া করে নিজ কাজ অহংকার ধরে ॥ ১৫৮ ॥
তবে ইহা শুদ্ধ অহং হানি নয় কাজে ।
দেখায় অবিদ্যা বিদ্যা দুই মায়া নিজে ॥ ১৫৯ ॥
সমাধিতে বুঝিবারে বিজ্ঞানী নিপুণ ।
সেই ব্রহ্ম দুই রূপে সগুণ নির্গুণ ॥ ১৬০ ॥
সগুণে ঈশ্বর নাম সৃষ্টির কারণ ।
ব্রহ্মনামধারী তিনি নির্গুণ যখন ॥ ১৬১ ॥
চতুর্বিংশ তত্ত্ব তিনি জীব ও জগৎ ।
শক্তি মায়া নানা নাম গুণে বলবৎ ॥ ১৬২ ॥
গুণভেদে নামভেদ অন্য বুঝা ভুল ।
সেইমাত্র এক ব্রহ্ম সকলের মূল ॥ ১৬৩ ॥
সৃজন পালন লয়ে নানাবিধ কাজে ।
হয়েন বিবিধ রূপ সেই ব্রহ্ম নিজে ॥ ১৬৪ ॥
নানারূপে ভক্তের নিকটে ভগবান ।
আঁখিতে বিজ্ঞানিগণে দেখিবারে পান ॥ ১৬৫ ॥
চাক্ষুষ দেখিয়া জানা বিজ্ঞানের মানে ।
অনুমান, সন্দেহ নাহিক সেইখানে ॥ ১৬৬ ॥
শুদ্ধ-আত্মা এই সব বিজ্ঞানীর গণ ।
অন্তরে বাহিরে তাঁরে করে দরশন ॥ ১৬৭ ॥
পরম ঈশ্বর হেন দ্বিবিধ কারণে ।
দেখা দিয়া দেন তত্ত্ব মুনি-ঋষিগণে ॥ ১৬৮ ॥
উদ্ধারিতে জীবগণে প্রথম কারণ ।
দ্বিতীয় ভক্তের সাধ করিতে পূরণ ॥ ১৬৯ ॥
ক্রিয়াহীন তাঁর যবে দেখিবারে পাই ।
সৃজন পালন লয় কোন কাজে নাই ॥ ১৭০ ॥
লিপ্তশূন্য সম্পর্ক নাহিক সৃষ্টি সনে ।
তখন তাঁহারে আমি ডাকি ব্রহ্ম নামে ॥ ১৭১ ॥
সৃজন পালন লয়ে যবে তাঁর গতি ।
তখন সগুণ নাম প্রধানা প্রকৃতি ॥ ১৭২ ॥
যেই ব্রহ্ম সেই শক্তি ভেদ নাই দুয়ে ।
দৃষ্টান্তে ধরিয়া দেখ আগুন লইয়ে ॥ ১৭৩ ॥
আগুনের সনে তার প্রদাহিক গুণ ।
উভয়েতে একাধারে একত্রে আগুন ॥ ১৭৪ ॥
ধবলত্ব দুধের
দুধেতে যেন স্থিতি ।
সেইমত ব্রহ্মে রহে ব্রহ্মের শকতি ॥ ১৭৫ ॥
মণি আর তার জ্যোতিঃ
একই যেমন ।
ব্রহ্মের সঙ্গেতে শক্তি প্রকৃত তেমন ॥ ১৭৬ ॥
সাপের সঙ্গেতে তার
আঁকাবাঁকা গতি ।
ব্রহ্মের সহিত তেন তাঁহার শকতি ॥ ১৭৭ ॥
পূর্বোক্ত সগুণ ব্রহ্ম যাঁর পরিচয় ।
অবিরত হাতে তিন সৃষ্টি স্থিতি লয় ॥ ১৭৮ ॥
সেই
আদি মূল শক্তি প্রকৃতি প্রধানা ।
তিনিই দ্বিবিধা বিদ্যাবিদ্যা নামে জানা ॥ ১৭৯ ॥
সৃষ্টিতে অনন্ত জাতি অনন্ত রকম ।
কেহ ঊন কেহ দুনো কেহ বেশী কম ॥ ১৮০ ॥
তারতম্যে ছোট বড় নামে যায় বলা ।
সকল শক্তির কর্ম নানারূপে খেলা ॥ ১৮১ ॥
রকমারি সৃষ্টি করা শক্তির নিয়ম ।
সমরূপ দুই বস্তু না হয় কখন ॥ ১৮২ ॥
বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে বস্তু অনন্ত প্রকার ।
প্রত্যেকের ভিন্নরূপ অতি চমৎকার ॥ ১৮৩ ॥
এমন সময় কন পণ্ডিত ধীমান ।
বটে কেহ ক্ষীণবল কেহ বলবান ॥ ১৮৪ ॥
শক্তির প্রকৃতি যদি ঊনো দুনো গড়া ।
তবে কি তাঁহাতে আছে পক্ষপাতী ধারা ॥ ১৮৫ ॥
পণ্ডিতের উত্তর করিলা প্রভুরায় ।
জগতে ঘটনা যত যা হয় যেথায় ॥ ১৮৬ ॥
চিরকাল যেইরূপ সেইরূপ হয় ।
ইহা অতি সত্য কথা বুঝিবে নিশ্চয় ॥ ১৮৭ ॥
কি হেতু করেন কেন কি তাঁর বিধান ।
মানুষে জানিতে নাহি দেন ভগবান ॥ ১৮৮ ॥
কারণ কি হেতু কিবা উদ্দেশ্য স্রষ্টার ।
জীবের জানিতে ইহা নাহি অধিকার ॥ ১৮৯ ॥
সর্বশক্তিমান বিভু একক ঈশ্বর ।
সর্বভূতে সমভাবে সবার ভিতর ॥ ১৯০ ॥
ক্ষুদ্রকায় পিপীলিকা বালির সমান ।
তাহাতেও বিরাজিত রহে ভগবান ॥ ১৯১ ॥
তবে যে তাহার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রত্যেকে ।
কি শরীরে কিবা মনে কিবা আধ্যাত্মিকে ॥ ১৯২ ॥
শক্তিই তাহার মূল রকমারি গড়ে ।
অদ্ভুত শক্তির খেলা সৃষ্টির ভিতরে ॥ ১৯৩ ॥
বেদান্তের ব্রহ্ম কালী জননী আমার ।
সগুণে অনন্তরূপা বিরাট আকার ॥ ১৯৪ ॥
"কে জানে সে কালী কেমন ।
ষড় দর্শনে না পায় দরশন ॥
মূলাধারে সহস্রাবে যোগী যাঁরে করে মনন,
কালী পদ্মবনে হংসসনে
হংসীরূপে করে রমণ ॥
আত্মারামের আত্মা কালী
রামপ্রেয়সী সীতা যেমন,
শিব জেনেছে কালীর মর্ম,
অন্তে কে আর জানবে তেমন ॥
প্রসবে ব্রহ্মাণ্ড-অণ্ড প্রকাণ্ডতা বুঝ কেমন,
কালী সর্বঘটে বিরাজ করে,
ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা
যেমন ॥
রামপ্রসাদ বলে কুতূহলে সম্ভরণে সিন্ধু-গমন,
আমায় মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না,
ধরবে শশী হয়ে বামন ॥"
গেয়ে এই গীতখানি, সমাধিস্থ গুণমণি,
এ রাজ্য
ছাড়িয়া গেলা চলে ।
দ্রুতগতি উভরায়, চকিত চপলা প্রায়,
কোথায়
কাহার সাধ্য বলে ॥ ১৯৫ ॥
বীণা জিনি কণ্ঠস্বর, মিষ্ট হতে মিষ্টতর,
বদনবিবরে
নাহি আর ।
শ্রুতিদ্বয় শক্তিদ্বারা, শ্রীঅঙ্গ স্পন্দন ছাড়া,
পুত্তলিক
জড়ের আকার ॥ ১৯৬ ॥
স্থির মন স্থির চিত্ত, স্থিরতর দুটি নেত্র,
স্থিরভাবে
বসিয়া অটল ।
অন্তরের জ্যোতিঃ গুপ্ত, বাহিরে হইল ব্যক্ত,
প্রফুল্লিত বদনমণ্ডল ॥ ১৯৭ ॥
ভাবে যবে নিমগন, কোথা তিনি কি রকম,
বিবরণ
বুঝে উঠা ভার ।
লক্ষণ দেখিয়া জ্ঞান, কিংবা যাহা অনুমান,
কহি শুন
কাহিনী তাহার ॥ ১৯৮ ॥
অপার ভাবের ভাবী, একাধারে নানা ছবি,
ভাবময়
ভাবের নিদান ।
যে প্রসঙ্গে আবির্ভাব, শ্রীঅঙ্গেতে মহাভাব,
তাহাই
দেখেন মূর্তিমান্ ॥ ১৯৯ ॥
বিদ্যাসাগরের সনে, ব্রহ্মতত্ত্ব-উত্থাপনে,
কহিতেছিলেন গুণমণি ।
উপনিষদের ব্রহ্ম, আছে যার গুণ কর্ম,
তিনি তাঁর
জগৎজননী ॥ ২০০ ॥
ভক্তের আরাধ্য ধন, মিলে তাঁর দরশন,
কথোপকথন
হয় সাথে ।
বিশ্বময়ী কালী নাম, জগতের আত্মারাম,
সর্বদা
বিরাজ সর্বভূতে ॥ ২০১ ॥
একা নিতি একরূপে, বিরাটে ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপে,
ইচ্ছাময়ী
ইচ্ছায় তাঁহার ।
যাবৎ ঘটনামালা, ছোট বড় যত খেলা,
সৃষ্টি
স্থিতি প্রলয় সংহার ॥ ২০২ ॥
বলিতে বলিতে কথা, মনে বাড়ে ব্যাকুলতা,
দেখিবারে
স্বরূপ মূরতি ।
সঙ্গে লয়ে প্রাণ মন, মহাভাবে তেকারণ,
নিমগন
অখিলের পতি ॥ ২০৩ ॥
বুঝিতে পারিবে মন, কর লীলা-আলাপন,
আগাগোড়া
কাহিনী ধরিয়ে ।
প্রার্থনা করিয়া তাঁয়, হৃদে যেন স্ফূর্তি পায়,
কি করিলা
অবতার হয়ে ॥ ২০৪ ॥
ভাবে মগ্ন প্রভু এবে, মন প্রাণ গেছে ডুবে,
ভাবরূপ
অকূল পাথারে ।
জীবগণে উদ্ধারিতে, তত্ত্বের বারতা দিতে,
পুনঃ দেহে
আসিছেন ফিরে ॥ ২০৫ ॥
লক্ষণে উদিল আসি, বদনে মধুর হাসি,
সুধাধারা
সে হাসির ধারা ।
দরশনে ভাগ্য যাঁর, অতুল আনন্দ তাঁর,
আপনে আপন
হয় হারা ॥ ২০৬ ॥
হাসি দেখে যায় জানা, বাহ্যমাত্র দুই আনা,
চৌদ্দ আনা
আবেশের জোর ।
মা যেন জাগায় ঠেলে, নিদ্রাতুর শিশুছেলে,
নড়ে
কিন্তু নিদ্রায় বিভোর ॥ ২০৭ ॥
যবে সিকি ঘোর কাটে, তবে মুখে বাক্য ফুটে,
নহে
স্পষ্ট জড় জড় স্বর ।
নামা-উঠা করে মন, তাই জড় উচ্চারণ,
ধরে ছাড়ে
দিব্য দেহ-ঘর ॥ ২০৮ ॥
অর্ধেক আসিলে নীচে, জিহ্বার জড়তা ঘুচে,
বলিলেন
প্রভু গুণধাম ।
আমার জননী যিনি, নিরাকার ব্রহ্ম তিনি,
করে যাঁর
বেদান্তে বাখান ॥ ২০৯ ॥
মায়ের ইচ্ছায় যার, নাশ হয় অহংকার,
সমাধিতে
সে দেখিতে পায় ।
গভীর ধিয়ানে মত্ত, ব্রহ্মের স্বরূপতত্ব,
বেদান্ত
যাঁহার কথা গায় ॥ ২১০ ॥
ফিরিলে দেখিয়া মাকে, তবু যে অহং থাকে,
সে অহং
শুদ্ধভাবাপন্ন ।
অবিদ্যা ধরে না তায়, মা-ই মনে স্ফূর্তি পায়,
মায়াঘোরে
করে না আচ্ছন্ন ॥ ২১১ ॥
সাকারা হইয়া মাতা, ভক্ত-সঙ্গে কন কথা,
ইচ্ছাময়ী
যেন ইচ্ছা তাঁর ।
কহেন সন্তানগণে, আমি ব্রহ্ম গুণহীনে,
গুণময়ী
হইয়া সাকার ॥ ২১২ ॥
এই যে সাকার কায়, যে সে না দেখিতে পায়,
দেখে
মাত্র শুদ্ধ-আত্মা জনা ।
শুদ্ধ-আত্মাখালি তাঁরা, তাঁর অংশে জন্মে যাঁরা,
ভাগবতীতনু
নামে জানা ॥ ২১৩ ॥
জ্ঞান ভক্তি একত্তরে, সামঞ্জস্য করিবারে,
বলিলেন
প্রভু গুণমণি ।
রামচন্দ্র একদিনে, বলিলেন হনুমানে,
আমায়
কিরূপ দেখ তুমি ॥ ২১৪ ॥
করজোড়ে হনুমান, কহে শুন শুন রাম,
কখন তোমায়
হেন হেরি ।
তোমা বিনা নাহি অন্য, তুমিই অনন্ত পূর্ণ,
স্বজন-পালন-লয়কারী ॥ ২১৫ ॥
শুন রাম কমলাঁখি, আমাকে তখন দেখি,
আমি আর নই
অন্ত জনা ।
আমাতে তোমার সত্ত্ব, দেবত্বমাখান গাত্র,
তোমারি
কেবল অংশ-কণা ॥ ২১৬ ॥
কখন তোমায় রামে, এইরূপ হয় মনে,
প্রভু
তুমি আমি তব দাস ।
শ্রীআজ্ঞাপালন কাজ, এই চিন্তা হৃদিমাঝ,
শ্রীচরণ-সেবনের আশ ॥ ২১৭ ॥
শুন শুন কহি রাম, নবদূর্বাদলশ্যাম,
আত্মারাম
সকলের সার ।
কখন দেখিতে পাই, আমি তুমি আমি নাই,
তুমি আমি
দুয়ে একাকার ॥ ২১৮ ॥
ভাঙ্গিয়া কহেন কথা শ্রীপ্রভু আমার ।
মনে কর সীমাহীন এক জলাধার ॥ ২১৯ ॥
নাহি তার পারাপার নাহি তার তল ।
অধঃ-উর্ধ্বে দশদিকে জল আর জল ॥ ২২০ ॥
সে জলের কোন অংশ শীতল পাইয়ে ।
জমাট বাঁধিয়া যায় বরফ হইয়ে ॥ ২২১ ॥
পুনঃ সে বরফখণ্ডে যদি তাপ পায় ।
গলিত হইয়া জল জলেতে মিশায় ॥ ২২২ ॥
জলাধাররূপ ব্রহ্ম যেই খণ্ড তার ।
ভক্তিরূপ শৈত্যে হয় বরফ-আকার ॥ ২২৩ ॥
সেই ভাগবতীতনু শুদ্ধ আত্মা নাম ।
স্বয়ং ব্রহ্মের দেহে তাঁহাদের ধাম ॥ ২২৪ ॥
উত্তাপ-স্বরূপ জ্ঞানবিচার কেবল ।
যাহাতে বরফ হয় পুনরায় জল ॥ ২২৫ ॥
যোগাসনে সমাধিতে যেই মহাজন ।
মহাভাগ্যবলে হইয়াছে নিমগন ॥ ২২৬ ॥
সন্দহীনে উপলব্ধি কেবল তাহার ।
বাহ্যজগতের স্রষ্টা জননী আমার ॥ ২২৭ ॥
তিনি নিরাকার ব্রহ্ম সগুণে সাকারা ।
তাও তিনি যাহা আছে এই দুই ছাড়া ॥ ২২৮ ॥
জীবদের আত্মারূপে তত্ত্বময়ী তিনি ।
পঞ্চভূতময়ী হয়ে সৃষ্টিস্বরূপিণী ॥ ২২৯ ॥
অদ্বৈতবাদীরা যেন মনে নাহি করে ।
সগুণে সাকার সৃষ্টি মিথ্যা একেবারে ॥ ২৩০ ॥
সাকার স্বরূপ তাঁর আর সৃষ্টি ঠিক ।
দুয়ের মধ্যেতে নহে কেহই অলীক ॥ ২৩১ ॥
দৃষ্টান্তে ভাঙ্গেন তত্ত্ব বিবাদ-ভঞ্জন ।
সরলে সরলে কথা করহ শ্রবণ ॥ ২৩২ ॥
সুমূর্খে সহজে বুঝে নাহি লাগে গোল ।
সরল উপমা দুধ নবনীত ঘোল ॥ ২৩৩ ॥
নিরাকার ব্রহ্ম ঠিক দুধের মতন ।
সগুণে নবনীরূপ আকার ধারণ ॥ ২৩৪ ॥
মন্থনাবশিষ্ট ঘোল সৃষ্টিরূপে তায় ।
ইহার মধ্যেতে মিথ্যা বলিবে কাহায় ॥ ২৩৫ ॥
প্রত্যক্ষ ঈশ্বরী কালী জননী আমার ।
জীবের আমিত্ব যায় রূপায় তাঁহার ॥ ২৩৬ ॥
আমিত্ব থাকিতে কভু সমাধি না হয় ।
সমাধি ব্যতীত ব্রহ্ম উপলব্ধি নয় ॥ ২৩৭ ॥
জ্ঞানমার্গে অহং নাশে উপায় সম্বল ।
বিবেক বৈরাগ্য জ্ঞান বিচার কেবল ॥ ২৩৮ ॥
বিজ্ঞানী জনেরা হারে জ্ঞানযোগ বলে ।
বড়ই কঠিন পথ এই কলিকালে ॥ ২৩৯ ॥
ব্রহ্মজ্ঞান-আশে হইবারে সমাধিস্থ ।
নারদীয় ভক্তিভাব এ যুগে প্রশস্ত ॥ ২৪০ ॥
সেবাভক্তি আরাধনা গুণানুকীর্তন ।
এই হয় নারদীয় ভক্তির লক্ষণ ॥ ২৪১ ॥
শুদ্ধান্তরে নিরন্তর প্রার্থনা তাঁহায় ।
করিলে বাসনা পুরে মায়ের কৃপায় ॥ ২৪২ ॥
জ্ঞানপন্থিগণ ঘুরে যাহার আশায় ।
মিটে না বাসনা গোটা আয়ু কেটে যায় ॥ ২৪৩ ॥
ভকত-বৎসলা মাতা ভক্তি ভালবাসে ।
সন্তানস্বরূপ ভক্ত মায়ের সকাশে ॥ ২৪৪ ॥
ব্রহ্মজ্ঞান কখন না চায় ভক্তজনা ।
মায়েরে দেখিতে করে মায়েরে প্রার্থনা ॥ ২৪৫ ॥
যদি কেহ সমাধির উচ্চ স্থানে যায় ।
নামিয়া আনেন তাঁরে মাতা পুনরায় ॥ ২৪৬ ॥
রাখিয়া আমির রেখা ঈষৎ অন্তরে ।
সে নহে এ কাঁচা আমি পাকা বলি তারে ॥ ২৪৭ ॥
কাঁচা আমি ঠিক যেন দড়ির মতন ।
যাহাতে জীবের হয় বিষম বন্ধন ॥ ২৪৮ ॥
পাকা আমি দগ্ধ দড়ি পুড়ে হয় ছাই ।
আকারে কেবল বাঁধে হেন শক্তি নাই ॥ ২৪৯ ॥
সা রে গা মা পা ধা নি এই সপ্তটি স্বর ।
নি অতি অত্যুচ্চ চূড়া সবার উপর ॥ ২৫০ ॥
গায়ক সতত নাহি পারে থাকিবারে ।
যে নি অতি উচ্চ স্বর তাহার ভিতরে ॥ ২৫১ ॥
তেমতি সমাধিস্থানে অবিরত যোগ ।
একুশ দিনের বেশী নাহি হয় ভোগ ॥ ২৫২ ॥
ব্রহ্মজ্ঞানে সব নষ্ট সত্তালোপ পায় ।
মহাজলে জলবিম্ব যেমন মিশায় ॥ ২৫৩ ॥
তিক্ত লাগে ভক্তজনে রসনা বিস্বাদ ।
হইতে না চায় চিনি খাইবার সাধ ॥ ২৫৪ ॥
ভক্তিপ্রেম অন্তরেতে রাখি সঙ্গোপনে ।
মার সঙ্গে কবে কথা চায় ভক্তগণে ॥ ২৫৫ ॥
বিবিধ আকার মার ভুবনমোহন ।
রামরূপে অযোধ্যার নৃপতিনন্দন ॥ ২৫৬ ॥
কৃষ্ণরূপে বৃন্দাবনে নয়নের ফাঁদ ।
গোরারূপে মহাপ্রভু নদীয়ার চাঁদ ॥ ২৫৭ ॥
যে যেমন চায় মায় যেরূপে যে যাচে ।
ভকত-বৎসলা কালী তেন তার কাছে ॥ ২৫৮ ॥
যদি কোন ভক্তজনে চায় ব্রহ্মজ্ঞান ।
তখনি জননী করে তাঁহারে প্রদান ॥ ২৫৯ ॥
ভক্তি ভক্ত বড় ভালবাসেন জননী ।
এত বলি ভক্তি-তত্ত্ব কন গুণমণি ॥ ২৬০ ॥
ক্ষীণবল জ্ঞানযুক্তি কত শক্তি ধরে ।
একটানা বরাবর যাইতে না পারে ॥ ২৬১ ॥
গতিরোধ হয় পথে না চলে চরণ ।
বিশ্বাস ভক্তির শক্তি অকথ্য কথন ॥ ২৬২ ॥
পারাপার সীমাহীন অকূল জলধি ।
লাফ দিয়া হয় পার ভক্তি রহে যদি ॥ ২৬৩ ॥
সিন্ধুপারে যাইবারে রাবণ-নিধনে ।
বাঁধিতে হইল সেতু ধনুর্ধারী রামে ॥ ২৬৪ ॥
কিন্তু রামদাস হনু পবনকুমার ।
জয় রাম বলি লম্ফে যায় সিন্ধুপার ॥ ২৬৫ ॥
শিক্ষা দিতে জীবগণে রাম-অবতারে ।
যুক্তির অপেক্ষা ভক্তি কত বল ধরে ॥ ২৬৬ ॥
সাগর হইয়া পার আর এক জনে ।
যাইতে উপায় পুছে মিত্র বিভীষণে ॥ ২৬৭ ॥
কহে মিত্র রামভক্ত কি ভাবনা তায় ।
অবশ্য করিয়া দিব তাহার উপায় ॥ ২৬৮ ॥
এত বলি গোপনে তাহার অবিদিতে ।
লিখিল রামের নাম একখানি পাতে ॥ ২৬৯ ॥
সেই পত্র বিভীষণ সমর্পিয়া তায় ।
বলিলেন এই লহ পারের উপায় ॥ ২৭০ ॥
বাঁধিয়া রাখহ বস্ত্রে অতি সাবধানে ।
দেখিও না খুলে, হলে কুতুহল মনে ॥ ২৭১ ॥
যদি জলে পথিমধ্যে দেখ একবার ।
তখনি ডুবিবে জলে রক্ষা নাহি আর ॥ ২৭২ ॥
ভক্তিসহ ধরি শিরে মিত্রের সে বাণী ।
বসনে বাঁধিল এঁটে যা দিলেন তিনি ॥ ২৭৩ ॥
হৃদয়ে বিশ্বাস ভরা মহাবল গায় ।
নামিয়া সিন্ধুর জলে অবহেলে যায় ॥ ২৭৪ ॥
ঈশ্বরের বিড়ম্বনা কুতূহল প্রাণে ।
দেখিতে হইল সাধ কি বাঁধা বসনে ॥ ২৭৫ ॥
টলিল বিশ্বাস, শক্তি হইল হরণ ।
তখনি ডুবিল জলে খুলিল যেমন ॥ ২৭৬ ॥
সমাপন করি কথা কহিলা গোসাঁই ।
বিশ্বাসের সম শক্তি হেন আর নাই ॥ ২৭৭ ॥
প্রভুর মধুর কণ্ঠ বিশ্ববিমোহিত ।
এত বলি গান ভক্তি বিশ্বাসের গীত ॥ ২৭৮ ॥
(আমি) দুর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি ।
আখেরে এ দীনে না তার কেমনে,
জানা যাবে
গো শঙ্করী ॥
(যদি) নাশি গো ব্রাহ্মণ, হত্যা করি ভ্রূণ,
সুরাপান
আদি বিনাশি নারী,−
(আমি) এ সব পাতক না ভাবি তিলেক,
ব্রহ্মপদ
নিতে পারি ॥
একমাত্র বস্তু ভক্তি বিশ্বাস উপায় ।
কিংবা আত্মসমর্পণ ঈশ্বরের পায় ॥ ২৭৯ ॥
পুনরায় বলিলেন প্রভু ভক্তাধীন ।
কলিকালে জ্ঞানযোগ বড়ই কঠিন ॥ ২৮০ ॥
মৌন রহি কিছুকাল আপনার মনে ।
ধরিলেন অল্প গীত ভাব-সমর্থনে ॥ ২৮১ ॥
"মন কর কি তত্ত্ব তাঁরে ।
ওরে উন্মত্ত আঁধার ঘরে ।
সে যে ভাবের বিষয় ভাব ব্যতীত,
অভাবে কি ধরতে
পারে ॥
(মন) অগ্রে শশী বশীভূত,
কর তোমার শক্তিসারে ।
ওরে কোঠার ভিতর
চোরকুঠরী,
ভোর হলে সে লুকাবে রে ॥
ষড়দর্শনে দর্শন পেলে না,
আগম নিগম
তন্ত্রসারে ।
সে যে ভক্তিরসের রসিক,
সদানন্দে বিরাজ করে পুরে ॥
সে ভাবলোভে
পরম যোগী,
যোগ করে যুগ-যুগান্তরে ।
হলে ভাবের উদয় লর সে যেমন,
লোহাকে
চুম্বকে ধরে ॥
প্রসাদ বলে মাতৃভাবে,
আমি তত্ত্ব করি যারে ।
সেটা চাতরে কি
ভাঙ্বো হাঁড়ি,
বুঝ না বে মন ঠারেঠোরে" ॥
স্থির মনে প্রভুদেব থাকি কতক্ষণ ।
ঈশ্বরীয় তত্ত্বকথা কৈলা সমাপন ॥ ২৮২ ॥
অবশেষে বহু রসভাষের রগড় ।
যেমন প্রভুর ধারা দেখি পূর্বাপর ॥ ২৮৩ ॥
কারণ দিতেন তার প্রভু
নারায়ণ ।
মন প্রাণ যাহাদের কামিনীকাঞ্চন ॥ ২৮৪ ॥
ক্রমাগত শুনে তত্ত্ব নাহি হেন বল ।
তাই মাঝে মাঝে দিতে হল আঁষ্টে জল ॥ ২৮৫ ॥
তম-পরিধেয় সাজে আগত যামিনী ।
দেখিয়া বিদায় লন প্রভু গুণমণি ॥ ২৮৬ ॥
আপনি ধরিয়া বাতি পণ্ডিত এখানে ।
নিম্নতলে আনিলেন দুয়ার-প্রাঙ্গণে ॥ ২৮৭ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ আত্মগণ পাছু পাছু ধায় ।
ফটকাভিমুখে পথে শকট যেথায় ॥ ২৮৮ ॥
হেথা দুয়ারের পাশে জুড়ি দুই কর ।
দাঁড়াইয়া বলরাম ভকতপ্রবর ॥ ২৮৯ ॥
শুভ্র পরিচ্ছদ শিরে পাগ শোভা পায় ।
প্রভুর চরণতলে অবনী লুটায় ॥ ২৯০ ॥
দেখি তাঁয় পুলকিত প্রভু নারায়ণ ।
পরম সাদরে কৈলা প্রেম-সম্ভাষণ ॥ ২৯১ ॥
কি কারণ বলরাম দাঁড়ায়ে দুয়ারে ।
উত্তর করিল ভক্ত হাস্যসহকারে ॥ ২৯২ ॥
ভক্তিপ্রেমে মহানন্দে মাখামাখি ভাষে ।
দরশন বাসনায় আছি দ্বারদেশে ॥ ২৯৩ ॥
প্রবেশ না করি গৃহে দ্বারদেশে কেনে ।
জিজ্ঞাসা করিলা প্রভু পুনঃ বলরামে ॥ ২৯৪ ॥
উত্তরিল বলরাম করজোড় করি ।
এখানে আসিতে আজি হইয়াছে দেরী ॥ ২৯৫ ॥
পাছে হয় রসভঙ্গ কথোপকথনে ।
তেকারণ দাঁড়াইয়া আছি এইখানে ॥ ২৯৬ ॥
জমিদার বলরাম ঘরে কত ধন ।
দুয়ারে দণ্ডায়মান দীনের মতন ॥ ২৯৭ ॥
ভিখারীর চেয়ে ন্যূন
দীনহীন ভাবে ।
বাসনা কেবল দরশন প্রভুদেবে ॥ ২৯৮ ॥
ভক্তিদীনতার তত্ত্ব জীবগণে দিতে ।
মূর্তিমান বলরাম শ্রীপ্রভুর সাথে ॥ ২৯৯ ॥
পুণ্য দরশন দেহ ভক্তি প্রেমে মাথা ।
মহাপুণ্যে পায় অন্যে সঙ্গে তাঁর দেখা ॥ ৩০০ ॥
দিনান্তে বারেক তাঁর নাম উচ্চারণ ।
করিলে মিলয়ে রামকৃষ্ণভক্তিধন ॥ ৩০১ ॥
শকটে উঠিলা প্রভু স্বগণ-সহিত ।
করজোড়ে নমস্কার করেন পণ্ডিত ॥ ৩০২ ॥
অশ্বদ্বয় টানে গাড়ি শব্দ গড়্ গড়্ ।
ছুটিল উত্তরমুখে দক্ষিণশহর ॥ ৩০৩ ॥
যতদূর যায় দেখা দুয়ারে দাঁড়ায়ে ।
পণ্ডিত গাড়ির পানে রহে নিরখিয়ে ॥ ৩০৪ ॥
আশ্চর্য
গণিয়া মনে প্রভুরে আমার ।
কে এ প্রেমোন্মত্ত ব্যক্তি বালক-আচার ॥ ৩০৫ ॥
হৃদয়ে আনন্দ সদা ভাবে নিমগন ।
দেবতাসদৃশ চিত্র মনো-বিমোহন ॥ ৩০৬ ॥
ওরে মন শ্রীপ্রভুর মহিমা ভারতী ।
স-মনে শুনিলে হয় শ্রীচরণে মতি ॥ ৩০৭ ॥
'তত্ত্বমঞ্জরী'তে প্রকাশিত "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত" হইতে উদ্ধৃত ।