চতুর্থ খণ্ড

প্রভুর সহিত কালীচন্দ্র, মণি গুপ্ত ও পূর্ণচন্দ্রের মিলন


জয় জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


রামকৃষ্ণ-লীলা গীত,         সুমধুর সুললিত,
          কথঞ্চিৎ না যায় বর্ণনে ।
অক্ষরে অক্ষরে তার,      করে সুধা অনিবার,
          অমরত্ব এক বিন্দু পানে ॥ ১ ॥


ঐহিকের সুখ-আশা,    বাতিক বাসনা তৃষা,
          কপটতা চোরা সান্নিপাত ।
অবিদ্যা-অম্বলে প্রীতি,    মনের কুটিল গতি,
          ক্ষণে ক্ষণে ক্ষীণ যাহে ধাত ॥ ২ ॥


আক্ষেপ রিপুর যোগ,   বৃদ্ধি যাহে ভবরোগ,
          মুষ্টিযোগ না জানে নিদান ।
বিনাশনে মহাব্যাধি,     কেবল ঔষধ বিধি,
          শ্রবণ-কীর্তন লীলা-গান ॥ ৩ ॥


পাইলে ব্যাধিতে মুক্তি,  তবে দরশন-শক্তি,
          দূরবর্তী লীলার দুয়ার ।
রত্নমণি পড়ে পথে,    ছুটে ভাতি চারিভিতে,
          বিনাশিয়া তমস আঁধার ॥ ৪ ॥

জিনি দেব-দেহধারী,    দয়াল ভকত দ্বারী,
          ঘন ঘন পথপানে চায় ।
লীলাপুরী-দরশনে,  আসে কে কাতরপ্রাণে,
          সকরুণে সম্ভাষিতে তায় ॥ ৫ ॥


আকর্ষণে সে দৃষ্টির,      যাত্রী হয় যেন বীর,
          তিলে চলে বৎসরের পথ ।
সাক্ষাতে পরশে পরে,  প্রবেশিতে পায় পুরে,
          যেইখানে পূর্ণ মনোরথ ॥ ৬ ॥


মনপ্রাণ-তৃপ্তিকরী,      কি সুন্দর কি মাধুরী,
          লীলাপুরী প্রভুর আমার ।
দেখিতে যাহার মন,    করে যেন আকিঞ্চন,
          ভক্ত-পদ-রজ লভিবার ॥ ৭ ॥


প্রভুভক্ত কিবা জাতি,    বলিয়া না হয় ইতি,
          দেবাদির আরাধ্যের ধন ।
সংজোটন পুরিবারে,      উপনীত এইবারে,
          বাদ বাকি ভক্ত তিন জন ॥ ৮ ॥

প্রথম বণিক-সুত,           বহুবিধ-গুণযুত,
          স্বভাবতঃ বৈরাগ্য প্রবল ।
বিদ্যার্জনে পাঠ-প্রিয়,    কুমার বালকবয়ঃ,
          শিশুসম অন্তর সরল ॥ ৯ ॥


নবীনে প্রবীণ বুদ্ধি,     জন্মাবধি চিত্ত-শুদ্ধি,
          সাংসারিক ভাব নাই মনে ।
ঋষি-বালকের ধারা,   যেন দু'দিনের পারা,
          বাস করে সংসার-আশ্রমে ॥ ১০ ॥


কালীচন্দ্র তাঁর নাম,   পিতা-মাতা বর্তমান,
          জন্মস্থান আহিরিটোলায় ।
সময় আগত দেখি,     বিদ্যার বাঁকা-আঁখি,
          প্রভুদেব আকর্ষিলা তাঁয় ॥ ১১ ॥


এবা কিবা আকর্ষণ,      বলিবার নহে মন,
          প্রণিধান কর নিজ মনে ।
দেখ কেবা পায় টের,   বারিরাশি সাগরের,
          শূন্যে চলে বিমানে বিমানে ॥ ১২ ॥


আকর্ষিত যেই জনা,  তাহারও নাহিক জানা,
          অন্যে কে জানিবে সমাচার ।
কারণ ক্ষণিক চলে,        বিচার-বুদ্ধির বলে,
          তারপরে অবোধ্য ব্যাপার ॥ ১৩ ॥

কারণের নাই ইতি,       কারণান্বেষণে গতি,
          মূঢ়মতি করে যেইজন ।
তাহার না মিটে আশা,  পরে ঘটে সেই দশা,
          মাস্তুলের পাখীর যেমন ॥ ১৪ ॥


শ্রেয়ঃ প্রথমেতে বলা,   ঈশ্বরের লীলা খেলা,
          বল-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়াগোচর ।
কার্য করি দরশন,          বলিতে হইবে মন,
          কার্যমূলে পরম-ঈশ্বর ॥ ১৫ ॥


ঈশ্বরের আকর্ষণ,       যেথা সেথা নহে মন,
          আকর্ষণ খালি ভক্তগণে ।
কি কব তাহার হেতু,      লক্ষ বুড়ি গণ্ডাধাতু,
          চুম্বক লোহাকে মাত্র টানে ॥ ১৬ ॥


যেবা শ্রীপ্রভুর জন,       চির-বাঁধা তার মন,
          স্বভাবতঃ প্রভুর চরণে ।
এমন প্রকৃতি ধরে,     বারেক দেখিলে পরে,
          চিনিবারে পারে ভগবানে ॥ ১৭ ॥


কিম্বা করি দরশন,         অহেতুক মুগ্ধ মন,
          কারণান্বেষণ নাহি করে ।
জ্ঞান তার দিবানিশি,   আত্মীয় হইতে বেশী,
          চেনা-জানা জন্মজন্মান্তরে ॥ ১৮ ॥


দেব কি দেবতা তিনি, কিংবা অখিলের স্বামী,
          নাহি করি এ হেন বিচার ।
সন্দহীনে নির্বিবাদে,     বিকি যান নিরাপদে,
          নিজ সাধে শ্রীপদে তাঁহার ॥ ১৯ ॥


মহাত্যাগী ভক্তবর,          কালীচন্দ্র গুণধর,
          সম্মিলন শ্রীপ্রভুর সনে ।
পিতামাতা ঘরবাড়ি,         ইহ-সুখ পরিহরি,
          মজিলেন প্রভুর চরণে ॥ ২০ ॥

অন্য এক সুকুমার,        মণি গুপ্ত নাম তাঁর,
          মনোহর সুন্দর চেহারা ।
গোউর বরনখানি,           প্রছন্ন কুসুম জিনি,
          ফুল্ল মুখে কান্তি ছটা ভরা ॥ ২১ ॥


সরল বালক-বেশ,         চিকণ চিকণ কেশ,
          লম্বমান বালার মতন ।
নানাভাবে এঁকেবেঁকে, কুলে শিরে চারিদিকে,
          বদনের শোভাসম্পাদন ॥ ২২ ॥


সুকোমল তনুগানি,       পরাজয় মনে মানি,
          বালকেতে বালিকার রীত ।
দেখে মনে হয় হেন,  গোকুল-গোপিনী যেন,
          শিশুবেশে প্রভুর সহিত ॥ ২৩ ॥


প্রভুভক্তে চেনা দায়,  কিবা বেশে কে কোথায়,
          পরিচয় স্বভাবে প্রবল ।
কে কি আগে কিবা হেথা,  নিগূঢ়-বারতা-গাথা,
          প্রভুবর বিদিত কেবল ॥ ২৪ ॥

অবতারে অবতারে,      রূপান্তর বারে বারে,
          ভাবান্তর না হয় কখন ।
সহজে বুঝিবে পরে,     শুন মন ধীরে ধীরে,
          ভক্তি-কাণ্ড ভক্ত-সংজোটন ॥ ২৫ ॥


সকলের শেষে যাঁর,     লীলাসরে আগুসার,
          কথা তাঁর অপূর্ব-ভারতী ।
চৌদ্দ বৎসরের ছেলে,     জনম কায়স্থকুলে,
          কলিকাতা শহরে বসতি ॥ ২৬ ॥


তাঁরে লয়ে কাণ্ড পূর্ণ,     তাই তাঁর নাম পূর্ণ,
          মহাপুণ্য নাম-উচ্চারণে ।
দরশনে কিবা হয়,         কিবা দিব পরিচয়,
          পদরেণু আশা করে দীনে ॥ ২৭ ॥


নিজে শ্রীপ্রভুর বাণী,     ঈশ্বর-কোটির তিনি,
          বিষ্ণু অংশে জনম তাঁহার ।
নিজে সেই নারায়ণ,       পুত্ররূপে জন্ম লন,
          মা-বাপের ফল তপস্যার ॥ ২৮ ॥


দিনেক মানসে পুজি,   বিশ্বপত্রে নহে রাজি,
          তুষ্ট পরে তুলসী-চন্দনে ।
বুঝিনু না অণুকণা,      কিবা প্রভুভক্ত জনা,
          সাঙ্গোপাঙ্গ অন্তরঙ্গগণে ॥ ২৯ ॥


প্রভু-ভক্ত যে রাজ্যের,  জীবে নাহি জানে টের,
          ফের বুঝে শুনিলে কাহিনী ।
একমাত্র তার মানে,         দৃষ্টিহীন জীবগণে,
          কামিনীকাঞ্চনগত প্রাণী ॥ ৩০ ॥


গ্রাম্য-সুখ পরিহরি,      দেখিবারে লীলাপুরী,
          জীবে সাধ না হয় কখন ।
যেমন ঘায়ের কৃমি,         অমৃত-সমান গণি,
          রক্ত পুঁজে করে বিচরণ ॥ ৩১ ॥


জীবের না হয় ঋদ্ধি,        যদবধি জৈব বুদ্ধি,
          একেবারে না হয় বিনাশ ।
তদবধি আরে মন,           নাহি হয় কদাচন,
          তত্ত্বে ভক্তে ঈশ্বরে বিশ্বাস ॥ ৩২ ॥


জৈব বুদ্ধি নষ্ট যায়,    তাহে মাত্র একোপায়,
          ঈশ্বরের লীলা-আন্দোলন ।
কঠিন পাষাণে যদি,       জল পড়ে নিরবধি,
          কালে ক্ষয় তাহার যেমন ॥ ৩৩ ॥


আন-কথা ছাড়ি মন,    কর লীলা-আন্দোলন,
          কিবা ভক্ত শ্রীপ্রভুর সনে ।
বেদ-পাঠী ব্রহ্মচারী,         লক্ষ যজ্ঞসূত্রধারী,
          বাস করে পূর্ণের বদনে ॥ ৩৪ ॥


নিজের প্রভুর পূর্ণ,            সমুজ্জ্বল কৃষ্ণবর্ণ,
          ভাতিপূর্ণ বিশাল নয়ন ।
নহে লম্বা নহে বেঁটে,     অঙ্গ আয়তনে মিঠে,
          সুবলনি দোহারা গড়ন ॥ ৩৫ ॥

আপনার শ্রীমন্দিরে,     শ্রীপ্রভু পাইলে তাঁরে,
          স্নেহভরে করান ভোজন ।
পরে দিয়া গাড়িভাড়া,    ফিরাইয়া দেন ত্বরা,
          যেইখানে বসতি-ভবন ॥ ৩৬ ॥

কর্তৃ পক্ষ ঘরে যত,      ক্রোধে হয় অন্ধ-মত,
          শুনিলে এসব সমাচার ।
তাই যাত্রা সংগোপনে,     শ্রীপ্রভুর সন্নিধানে,
          লীলা শুনে লাগে চমৎকার ॥ ৩৭ ॥


কে জানে এ কেবা ছেলে, কিছুদিন না দেখিলে,
          বিকল অন্তর গুণমণি ।
বগলে পুটুলি ধরা,         মিষ্টি মিঠা ফলে ভরা,
          আসিতেন শহরে আপনি ॥ ৩৮ ॥


গোপনে দাঁড়ায়ে পথে,  অন্য কোন ভক্ত-সাখে,
          ত্রস্ত চিতে পূর্ণর কারণ ।
তাহার সান্নিধ্য-স্থানে,         পূর্ণচন্দ্র যেইখানে,
          বিদ্যালয়ে করে অধ্যয়ন ॥ ৩৯ ॥


বলিতেন শ্রীগোসাঁই,           যখন শহরে যাই,
          একা এই শিশু-ভক্ত বিনে ।
কারণ নাহিক জানা,      আছে এত জানা-শুনা,
          কাহারেও নাহি পড়ে মনে ॥ ৪০ ॥


শ্রীপ্রভুর অবতারে,          যদ্যপি সন্দেহ ধরে,
          দেখ লীলা সন্দ হবে দূর ।
ভক্তনামে যাঁরে গাই,       তার সঙ্গে কিছু নাই,
          ঐহিকেতে সম্বন্ধ প্রভুর ॥ ৪১ ॥


অথচ সম্বন্ধ বিনে,        ভালবাসা কোন্‌খানে,
          কখনই না হয় কাহার ।
শুন সবিশেষ তত্ত্ব,       দেহ যেথা সেথা স্বার্থ,
          স্বার্থই স্নেহের মূলাধার ॥ ৪২ ॥


এই ধন জন মান,           যে প্রভুর বিষজ্ঞান,
          যিনি মহাত্যাগী যোগিবর ।
সম্বন্ধ কি স্বার্থ স্নেহ,         বন্ধন মমতা মোহ,
          কেন তাঁর অন্যের উপর ॥ ৪৩ ॥


প্রভু প্রভু-ভক্তবৃন্দে,         স্মরিয়া পরমানন্দে,
          আপনার কর্ম কর মন ।
বুচিবে সকল জ্বালা,        টুটিবে মনের মলা,
          সন্দ দ্বন্দ হবে বিমোচন ॥ ৪৪ ॥