১৮৯
(স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে লিখিত)
যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকা
১৮৯৫
কল্যাণবরেষু,
তোমাদের এক পত্রে অনেক সমাচার জ্ঞাত হইলাম। তবে সকলের বিশেষ সমাচার লিখ নাই। নিরঞ্জনের এক পত্র মধ্যে পাই — সে সিলোন যাইতেছে সংবাদ পাই। সারদা যাহা করিতেছে, তাহাই আমার অভিমত; তবে ‘রামকৃষ্ণ পরমহংস অবতার’ ইত্যাদি প্রচার করিবার আবশ্যক নাই। তিনি পরোপকার করিতে আসিয়াছিলেন, নিজের নাম ঘোষণা করিতে নহে। চেলারা গুরুর নাম করে; গুরু যা শেখাতে এসেছিলেন, তাতে জলাঞ্জলি দেয়, আর দলাদলি ইত্যাদি তার ফল।
আলাসিঙ্গা লিখেছে চারুবাবুর বিষয়। আমি তাঁহাকে স্মরণ করিতেছি না। চারুবাবুর বিষয় সবিশেষ লিখিবে ও তাঁহাকে আমার ধন্যবাদ দিবে। সকলের বিষয় বিশেষ করিয়া লিখিবে — বৃথা বার্তা করিবার সময় কুলায় না। আমার জীবনে বোধ হয় কারুর সহিত ঠাট্টা-বটকেরা করার অপেক্ষা অনেক কার্য আছে।
কর্মকাণ্ড ত্যাগ করিবার চেষ্টা করিবে; ঘণ্টা নাড়া সন্ন্যাসীর নহে এবং যাবৎ জ্ঞান না হয়, তাবৎ কর্ম। আমিই ঐ অনর্থের মূল। এক্ষণে দেখিতেছি যে, ঐ ঘণ্টা-পত্র লইয়া রামকৃষ্ণ-অবতারের দল বাঁধিবে এবং তাঁহার শিক্ষায় ধূলি নিক্ষেপ হইবে। তোমরা ঘণ্টা ত্যাগ করিতে পার ভালই, নচেৎ আমি তোমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারিব না। দলাদলি, দলবাঁধা, কূপমণ্ডুকের মধ্যে আমি নাই, আর যেথায় আমি থাকি। ইতি
‘—’ থিওসফিষ্ট হইয়াছেন, ভালই, রুচীনাং বৈচিত্র্যং! মঙ্গলমস্তু তেষাং, কিমহংব্রবীমি (রুচির বৈচিত্র্য! তাদের মঙ্গল হউক, আমি আর কি বলিব)? Universal brotherhood (সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব), বেশ কথা — শিবাঃ বঃ সন্তু পন্থানঃ। তার চেয়ে সুখের বিষয় কি আছে? … রামকৃষ্ণ পরমহংসের উদারভাব প্রচার করে আবার দলবাঁধা কেমন করে হয়? দলের বীজ হচ্ছে ঐ ঘণ্টা-পত্র। আমি হাজারবার ঠুকেছি, এবারও ঠুকলাম — ফলে কিছু হয় না। আমার নামে যদি তোমাদের দলবাঁধার সহায়তা হয়, তাহলেই আমি লীডার (নেতা) বটি, নইলে আমি কেউ নই! এই সত্য বটে! আমি ওতে নাই। আমি যে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য এবং তোমরাও যে তাই, এইটি বই লিখে ছাপাতে যত্ন তো যথেষ্ট হয়েছে; কিন্তু আমি যে আজ ৬ বৎসর ঘণ্টা-পত্র ত্যাগ করার জন্য বলছি, তাতে কারুর কান পাতা নাই। … আমি একমাত্র কর্ম বুঝি — পরোপকার, বাকী সমস্ত কুকর্ম। তাই শ্রীবুদ্ধদেবের পদানত হই। বুঝতে পারছ? … ফল কথা — আমি বৈদান্তিক; সচ্চিদানন্দ আমার নিজের আত্মার মহান্ রূপ ছাড়া অন্য ঈশ্বর বড় একটা দেখতে পাচ্ছি না। অবতার মানে — যাঁহারা সেই ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন, অর্থাৎ জীবন্মুক্ত। অবতারবিশেষত্ব আমি দেখিতে পাইতেছি না। ব্রহ্মাদিস্তম্ব পর্যন্ত সমস্ত প্রাণী কালে জীবন্মুক্তি প্রাপ্ত হবে এবং আমাদের উচিত সকলের সেই অবস্থা পেতে সহায় হওয়া। এই সহায়তার নাম ধর্ম, বাকী অধর্ম। এই সহায়তার নাম কর্ম, বাকী কুকর্ম; আর আমি কিছুই দেখছি না। অন্যবিধ তান্ত্রিক বা বৈদিক কর্মে ফল থাকিতে পারে, কিন্তু তদবলন্বন কেবল বৃথা জীবনক্ষয় — কারণ কর্মের ফল যে পবিত্রতা, তাহা কেবল পরোপকার মাত্রে ঘটে। যজ্ঞাদি কর্মের ভোগাদি সম্ভব, আত্মার পবিত্রতা অসম্ভব। অতএব সন্ন্যাস অবলম্বন করে, জীবকে উচ্চগতি শিক্ষা না দিয়ে পুনঃ-পুনঃ অনর্থকর কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা আমার মতে দূষণীয়। মূর্খ গৃহস্থ কর্মপর হউক, তাতে ক্ষতি নাই; কিন্তু ত্যাগী!! … সমস্তই প্রত্যেকের আত্মার বর্তমান। যে বলে আমি মুক্ত, সেই মুক্ত হবে। যে বলে আমি বদ্ধ, সে বদ্ধ হবে। দীন হীন ভাব আমার মতে পাপ এবং অজ্ঞতা। ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ’।১ ‘অস্তি ব্রহ্ম বদসি চেদস্তি ভবিষ্যসি, নাস্তি ব্রহ্ম বদসি চেৎ নাস্ত্যেব ভবিষ্যসি’।২ যে সদা আপনাকে দুর্বল ভাবে, সে কোন কালে বলবান্ হইবে না; যে আপনাকে সিংহ জানে, সে ‘নির্গচ্ছতি জগজ্জালাৎ পিঞ্জরাদিব কেশরী’।৩ দ্বিতীয়তঃ রামকৃষ্ণ পরমহংস কোন নূতন তত্ত্ব প্রচার করিতে আইসেন নাই — প্রকাশ করিতে আসিয়াছিলেন বটে, অর্থাৎ He was the embodiment of all past religious thoughts of India. His life alone made me understand what the Shastras really meant, and the whole plan and scope of the old Shastras.৪
মিশনরী-ফিশনরী এদেশে বড় চলল না। এরা ঈশ্বরেচ্ছায় আমায় খুব ভালবাসে, কারুর কথায় ভোলবার নয়। এরা আমার ideas (ভাব) যেমন বোঝে, আমার দেশের লোক তেমন পারে না, এবং এরা বড় স্বার্থপর নয়। অর্থাৎ ঐ jealousy (ঈর্ষা) আর হামবড়া ভাবগুলো এরা কাজের বেলা দূর করে দেয়, তখন সকলে মিলে একজন কাজের লোকের কথামত চলে। তাতেই এরা এত বড়। তবে এরা হচ্ছে টাকা-দেবতার জাত, সকল কথায় পয়সা; আমাদের দেশের লোক টাকার বিষয়ে বড় উদার, এরা তত নয়। কৃপণ ঘরে ঘরে। ওটি ধর্মের মধ্যে। তবে দুষ্কর্ম করলে পর পাদ্রীদের হাতে পড়ে। তখন টাকা দিয়ে স্বর্গে যায়! এগুলো সব দেশেই সমান — priestcraft (পুরোহিতদের তুকতাক)।
আমি কবে দেশে যাব, কি না যাব, কিছুই বলতে পারি না। এখানে ঘুরে বেড়ান, সেখানেও তাই। তবে এখানে হাজারো লোক আমার কথা শোনে, বোঝে — হাজারো লোকের উপকার হয়; সেখানে কি?
রামকৃষ্ণ পরমহংসের বিষয় মজুমদার যা লিখেছিল, আমি খালি তাই চাহিয়াছিলাম। তা না হয়ে কতকগুলো জার্মান ছেঁড়া পুঁথি পাঠিয়ে দিয়েছ, আর তার মধ্যে দুখানা আমার লেকচার; কি আপদ!!
সারদা যা করছে, তা আমার সম্পূর্ণ অভিমত। তাকে আমার শত শত ধন্যবাদ। বলি, তোমরা যা কিছু করছ, আমি বুঝতে পারি না। … যা হোক, মাদ্রাজ ও বম্বেতে আমার মনের মত লোক আছে। তারা বিদ্বান্ এবং সকল কথা বোঝে এবং তারা দয়াল; অতএব পরহিতচিকীর্ষা বুঝিতে পারে। কিমধিকমিতি।
মা-ঠাকুরাণীকে আমার শত শত দণ্ডবৎ দিবে এবং সকলকে আমার যথাযোগ্য সম্ভাষণ দিবে। আমি বই-টই কিছু ছাপাই নাই। এখানে লেকচার করে বেড়াই মাত্র। গুপ্ত, তুলসী প্রভৃতির বিষয় কিছুই লেখ নাই কেন? কালী কি করছে? শরৎ, যোগেন সেরে গেছে কিনা? আমার জীবনের প্রতি দেখে [তাকালে] আমার আপসোস হয় না। দেশে দেশে কিছু না কিছু লোকশিক্ষা দিয়ে বেড়িয়েছি, তার বদলে রুটির টুকরো খেয়েছি। যদি দেখতুম যে, কোন কাজ করিনি, কেবল লোক ঠকিয়ে খেয়েছি, তাহলে আজ গলায় দড়ি দিয়ে মরতুম।
সারদাকে আমায় একটা চিঠি লিখতে বলবে। তার সঙ্গে আমার মত মিলবে বোধ হয়। … আমি রামকৃষ্ণ পরমহংসের চেলা নই, আমি কারুর চেলাপত্র নই ইতি; আমি সারদার চেলা। যারা আমার মনের মত কার্য করবে, আমি তাদের চেলা। যারা তা না করবে, তাদের কোন খবর আমি চাই না, আমার কোন খবর তাদের জন্য নাই। ইতি
নরেন্দ্র
১
দুর্বল ব্যক্তি এই আত্মাকে লাভ করিতে পারে না।
২
যদি বল ব্রহ্ম আত্মা আছেন তো অস্তিই হইবে, আর যদি বল ব্রহ্ম আত্মা নাই তো নাস্তিই হইয়া যাইবে।
৩
পিঞ্জর হইতে সিংহের ন্যায় জগজ্জাল ভেদ করিয়া নির্গভ হইয়া যায়।
৪
তিনি ভারতের সমগ্র অতীত চিন্তার মর্ত বিগ্রহস্বরূপ।
প্রাচীন শাস্ত্রসমূহের প্রকৃত তাৎপর্য, তাহারা কি প্রণালীতে -- কি
উদ্দেশ্যে রচিত, তাহা আমি কেবল তাঁহার জীবন হইতেই বুঝিতে পারিয়াছি।