২২৯
(স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লিখিত)
C/o E. T. Sturdy
কেভার্শ্যাম, রিডিং, ইংলণ্ড
১৮৯৫
অভিন্নহৃদয়েষু,
তোমার ও সান্যালের পত্রে সবিশেষ অবগত হইলাম। তোমার চিঠি লেখার দুইটি দোষ — বিশেষ তোমার। প্রথম — যে-সকল কাজের কথা জিজ্ঞাসা করি, প্রায় তার কোনটিরই জবাব থাকে না; দ্বিতীয় — জবাব লেখায় অত্যন্ত বিলম্ব। তোমরা তো ঘরে বসে আছ ভায়া! আমাকে এ বিদেশে পেটের চেষ্টা করতে হয়, আবার দিনরাত খাটতে হয়; তার উপর লাটিমের মত ঘুরে বেড়ান। … আমি এখন বেশ বুঝতে পারছি যে, আমায় একা কাজ করতে হবে।
শশী সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত বটে; কিন্তু তোমরা খালি শশীর আসা সম্ভব কিনা তাই বিচার করছ। … এ সকল হল মহাবিলাসী বাবুর দেশ; নখের কোণে একটু ময়লা থাকলে তাকে স্পর্শ করে না। শরৎ আসতে না চায় সারদাকে পাঠাবে। অথবা মাদ্রাজে লিখে কোন লোক পাঠাবে। প্রায় দু-মাস পূর্বে আমি এ-বিষয়ে লিখেছি। তারকদা শেষ পত্রে লিখেন যে, পর মেলে (ডাকে) এ-বিষয়ে সবিশেষ জানাবে। কিন্তু এখনও দেখছি তার কিছুই ঠিকানা হয় নাই। আশা ছিল — আমি থাকতে থাকতেই কেউ আসবে; কিন্তু এখনও তো কিছুই ঠিকানা নাই, এবং দু-বছরে এক-একটা সংবাদ আসে। Business is business — অর্থাৎ কাজকর্ম তৎপর করতে হয়, গড়িমসির কাজ নয়। আসছে সপ্তাহের শেষে আমি আমেরিকায় যাব। অতএব যে আসবে, তার সঙ্গে সাক্ষাতের কোন আশা নাই।
গিরিশবাবু আমার কাজে সহায়তা করতে পারবেন — কেমন করে? আমি চাই সংস্কৃত-জানা লোক, অর্থাৎ বই-টই তর্জমা করতে সহায়তা করে স্টার্ডিকে, আমার অনুপস্থিতিতে স্টার্ডির সঙ্গে বইপত্র তর্জমা করে — এই মাত্র। অধিক আমি আশা করি না। … কেবল এই দরকার, আমার অনুপস্থিতিকালে একটু আধটু সংস্কৃত পড়ায় বা তর্জমা করে — এই বস্, আবার কি করবে? গিরিশবাবু এদেশে বেড়িয়ে যান না, বেশ কথা। ইংলণ্ড ও আমেরিকা ঘুরে যেতে ৩০০০ টাকা মাত্র পড়বে। যত লোক এ-সব দেশে আসে, ততই ভাল। তবে ঐ টুপিপরা হতভাগাদের দেখলে গা জ্বলে। ভূত কালো — আবার সাহেব! ভদ্রলোকের মত দেশী কাপড়-চোপড় পর বাবা, তা না হয়ে ঐ জানোয়ারী রূপ!
আর কেন, হরি বল! এখানে সমস্তই ব্যয়, আয় এক পয়সাও নাই। স্টার্ডি আমার জন্য অনেক টাকা খরচ করেছে। এখানে লেকচারে আমাদের দেশের মত উল্টে ঘর থেকে খরচ করতে হয়। তবে অনেকদিন করলে ও খাতির জমে গেলে খরচটা পুষিয়ে যায়। টাকাকড়ি সেই যা প্রথম বৎসর আমেরিকায় করি (তারপর হাতে এক পয়সাও নিই না), তা প্রায় ফুরিয়ে গেল; আমেরিকায় পঁহুছিবার মত মাত্র আছে। আমার এই ঘুরে ঘুরে লেকচার করে শরীর অত্যন্ত nervous (স্নায়ুপ্রধান) হয়ে পড়েছে — প্রায় ঘুম হয় না, ইত্যাদি। তার উপর একলা। দেশের লোকের কথা কি বল? কেউ না একটা পয়সা দিয়ে এ-পর্যন্ত সহায়তা করেছে, না একজন সাহায্য করতে এগিয়েছে। এ সংসারে সকলেই সাহায্য চায় — এবং যত কর ততই চায়। তারপর যদি আর না পার তো তুমি চোর!
… যা লিখতে হয় স্টার্ডিকে লিখবে — লোক পাঠাবার মতামত — যখন আসছে যুগে তোমরা সিদ্ধান্তয় উপস্থিত হবে। … শশীকে আমি বিশ্বাস করি, ভালবাসি। He is the only faithful and true man there (ওখানে সে-ই একমাত্র বিশ্বস্ত ও খাঁটি লোক)। তার ব্যামো-ফ্যামো সব প্রভুর কৃপায় ভাল হয়ে যাবে। তার সব ভার আমার। … ইতি
বিবেকানন্দ