১৫১
(স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লিখিত)

ওঁ নমো ভগবতে রামকৃষ্ণায়

১৮৯৪

প্রাণাধিকেষু,

তারকদাদা ও হরির আগের লিখিত এক পত্র শেষে পাই। তাহাতে অবগত হইলাম যে, তাঁহারা কলিকাতায় আসিতেছেন। পূর্বের পত্রে সমস্ত জানিয়াছ। রামদয়ালবাবুর পত্র পাই। তথামত ছবি পাঠান হইবে। মা-ঠাকুরাণীর জন্য জমি খরিদ করিতে হইবে, তাহা ঠিক করিবে — অর্থাৎ বিল্ডিং আপাতত মাটির হউক, পরে দেখা যাইবে। কিন্তু জমিটা প্রশস্ত চাই। কি প্রকারে কাহাকে টাকা পাঠাইব, সমস্ত সন্ধান করিয়া লিখিবে। তোমাদের মধ্যে একজন বৈষয়িক কার্যের ভার লইবে।

সাণ্ডেলকে সমস্ত বৈষয়িক ব্যাপার সন্ধান করিয়া এক পত্র লিখিতে বলিবে। সাণ্ডেল চাকরি-বাকরি করিতেছে কেমন? যদি প্রভুর ইচ্ছা হয়, শীঘ্রই অনেক কাজ করিতে পারিব। হরমোহন কেদারবাবুর টাকার কথা কি লিখিয়াছে। আমি টাকা পত্রপাঠ পাঠাইব; কিন্তু কাহার নামে ও কাহাকে পাঠাইব, জানি না। একজন সেখানে এজেণ্ট না হইলে কোন কাজ চলিতে পারে না।

বিমলা — কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের জামাতা — এক সুদীর্ঘ পত্র লিখিয়াছেন যে, তাঁহার হিন্দুধর্মে এখন যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি। আমাকে প্রতিষ্ঠা হইতে সাবধান হইবার জন্য অনেক সুন্দর উপদেশ দিয়াছেন। এবং তাঁহার গুরু শশীবাবুর সাংসারিক দারিদ্র্যের কথা লিখিতেছেন। শিব, শিব! যাঁহার বড় মানুষ শ্বশুর তিনি কিছুই পারেন না, আর আমার তিন কালে শ্বশুর মোটেই নাই!! শশীবাবুর প্রণীত এক পুস্তক পাঠাইয়াছেন। উক্ত পুস্তকে সূক্ষ্মতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। বিমলার ইচ্ছা যে, এতদ্দেশ হইতে উক্ত পুস্তক ছাপাইবার সাহায্য হয়; তাহার তো কোন উপায় দেখি না, কারণ ইহারা বাঙলা ভাষা তো মোটেই জানে না। তাহার উপর হিন্দুধর্মের সহায়তা ক্রিশ্চানরা কেন করিবে? বিমলা এক্ষণে সহজ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিয়াছেন — পৃথিবীর মধ্যে হিন্দু শ্রেষ্ঠ, তন্মধ্যে ব্রাহ্মণ! ব্রাহ্মণমধ্যে শশী ও বিমলা — এই দুইজন ছাড়া পৃথিবীতে আর কাহারও ধর্ম হইতে পারেই না; কারণ তাহাদের ‘ঊধ্বস্রোতস্বিনীবৃত্তি’ নীচের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে এবং উক্ত দুইজনের কেবল উচ্চদিকে … । এই প্রকারে বিমলা এক্ষণে সনাতন ধর্মের যাহা আসল সার, তাহা খিঁচিয়া লইয়াছেন!

ধর্ম কি আর ভারতে আছে দাদা! জ্ঞানমার্গ, ভক্তিমার্গ, যোগমার্গ সব পলায়ন। এখন আছেন কেবল ছুঁৎমার্গ — আমায় ছুঁয়োনা, আমায় ছুঁয়োনা। দুনিয়া অপবিত্র, আমি পবিত্র। সহজ ব্রহ্মজ্ঞান! ভালা মোর বাপ!! হে ভগবান্! এখন ব্রহ্ম হৃদয়কন্দরেও নাই, গোলোকেও নাই, সর্বভূতেও নাই — এখন ভাতের হাঁড়িতে …। পূর্বে মহতের লক্ষণ ছিল ‘ত্রিভুবনমুপকারশ্রেণীভিঃ প্রীয়মাণঃ’, এখন হচ্ছে, আমি পবিত্র আর দুনিয়া অপবিত্র — লাও রূপেয়া, ধরো হামারা পায়েরকা নীচে।

হরমোহন মধ্যে এক দিগ‍্‍গজ পত্র লেখেন। তাতে প্রধান খবর প্রায়ই এই রকম, যথা — ‘অমুক ময়রার দোকানে অমুক ছেলে আপনার নিন্দা করিল; তাহাতে অসহ্য হওয়ায় আমি লড়াই করি’ ইত্যাদি। কে তাকে লড়াই করিতে বলে, প্রভু জানেন। ….যাক, তাহার ভালবাসাকে বলিহারি যাই এবং তাহার perseverance (অধ্যবসায়)-কে। মধ্যে যদি পার immediately (অবিলম্বে) হাওলাত করে কেদারবাবুর টাকা সুদসমেত দিও, আমি পত্রপাঠ পাঠাইয়া দিব। কাকে টাকা পাঠাই, কোথায় পাঠাই। তোমাদের যে হরিঘোষের গোয়াল। আমার টাকার কিছুই অভাব নাই, … কেদারবাবুর টাকা twice over দিব (দ্বিগুণ পরিশোধ করিব), তাহাকে ক্ষুণ্ণ হইতে মানা করিবে। আমি জানিতাম, উপেন তাহা পরিশোধ করিয়াছে এতদিনে। যাক, উপেনকে কিছুই বলিবার আবশ্যক নাই। আমি পত্রপাঠ পাঠিয়ে দিব।

যে মহাপুরুষ — হুজুক সাঙ্গ করে দেশে ফিরে যেতে লিখছেন, তাঁকে বলো কুকুরের মত কারুর পা চাটা আমার স্বভাব নহে। যদি সে মরদ হয় তো একটা মঠ বানিয়ে আমায় ডাকতে বলো। নইলে কার ঘরে ফিরে যাব? এ দেশে আমার more (অধিক) ঘর — হিন্দুস্থানে কি আছে? কে ধর্মের আদর করে? কে বিদ্যের আদর করে? ঘরে ফিরে এস!!! ঘর কোথা?

এবারকার মহোৎসব এমনি করবে যে, আর কখনও তেমন হয় নাই। আমি একটা ‘পরমহংস মহাশয়ের জীবনচরিত’ লিখে পাঠাব। সেটা ছাপিয়ে ও তর্জমা করে বিক্রী করবে। বিতরণ করলে লোকে পড়ে না, কিছু দাম লইবে। হুজুকের শেষ !!! … এই তো কলির সন্ধ্যে। আমি মুক্তি চাই না, ভক্তি চাই না; আমি লাখ নরকে যাব, ‘বসন্তবল্লোকহিতং চরন্তঃ’ (বসন্তের ন্যায় লোকের কল্যাণ আচরণ করে) — এই আমার ধর্ম। আমি কুঁড়ে, নিষ্ঠুর, নির্দয়, স্বার্থপর ব্যক্তিদের সহিত কোন সংস্রব রাখিতে চাই না। যাহার ভাগ্যে থাকে, সে এই মহাকার্যে সহায়তা করিতে পারে। … সাবধান, সাবধান! এ-সকল কি ছেলেখেলা, স্বপন-দেখা নাকি? মধো, সাবধান! সুরেশ দত্তর ‘রামকৃষ্ণচরিত’ পড়িলাম, মন্দ হয় নাই। শশী সাণ্ডেলের কোন উপকার যদি তোমাদের দ্বারা হয়, করিবে। বেচারা ভক্ত মানুষ, বড়ই কষ্ট পাচ্ছে। আমি তো দাদা এখানে বসে কোন উপায় দেখি না। কিমধিকমিতি।

দাদা, একবার গর্জে গর্জে মধুপানে লেগে যাও দিকি — মাস্টার, জি. সি. ঘোষ, অতুল, রামদা, নৃত্যগোপাল, শাঁকচুন্নি! বলি, শাঁকচুন্নির কোন কথাই তো তোমরা লেখ না! সে গেল কোথা? মাকে ভক্তি করছে তেমনি কিনা? নৃত্যগোপাল-দাদার শরীর বেশ ভাল হয়েছে কি না, বাবুরাম যোগেন সেরেছে কিনা — ইত্যাদি আমি সকলের বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে চাই। শরৎকে কি সাণ্ডেলকে একটি বিশেষ পত্রে সব খুলে লিখতে বলবে। কালীকৃষ্ণ, ভবনাথ, দাশু, সাতু, হরি চাটুয্যে সকলকে তোমরা ভালবাস কিনা — সব লিখবে। … তোরা এক একটা মানুষ হ দিকি রে বাবা! গঙ্গাধর খেতড়ি থেকে তো পালায় নাই?

বলি, আর খবরের কাগজ পাঠাবার আবশ্যক নাই। তার ঢের মেরে গেছে। তোদের কারও organising power (সংগঠন-শক্তি) নাই দেখিতেছি; বড়ই দুঃখের বিষয়। সকলকে আমার ভালবাসা দিবে, সকলের help (সাহায্য) আমি চাই; কারুর সঙ্গে বিবাদবিসংবাদ খবরদার যাতে না হয়। Neither money pays, nor name, nor fame, nor learning; it is character that can cleave through adamantine walls of difficulties,  — মনে রেখো। লোকের সঙ্গে যাওয়া-আসা, বিশেষ করিয়া মতামত pooh pooh (দুঃ ছাই) করিবে না, তাতে লোক বড়ই চটে। জায়গায় জায়গায় এক একটা সেণ্টার করিতে হইবে — এ তো বড় সহজ! যেমন তোমরা জায়গায় জায়গায় ফের, অমনি একটি সেণ্টার করবে সেখানে। এই রকম করে কার্য হবে। যেখানে পাঁচজন লোক তাঁকে মানে, সেখানেই এক ডেরা — এমনি করে চল এবং সর্বদা সকল জায়গার সঙ্গে communication (যোগাযোগ) রাখিতে হইবে। ইতি

চিরস্নেহাস্পদ
বিবেকানন্দ


ত্রিভুবনের হিত করিতে যিনি ভালবাসেন।
টাকায় কিছু হয় না, নামযশে কিছু হয় না, বিদ্যায় কিছু হয় না, চরিত্রই বাধাবিঘ্নের বজ্রদৃঢ় প্রাচীর ভেদ করতে পারে।