দ্বিতীয় খণ্ড
হলধারীর
সঙ্গে রঙ্গ ও মথুরকে
শিবকালী-রূপ-প্রদর্শন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
জ্যেষ্ঠ খুল্লতাত ভাই দাদা হলধারী
।
তাঁর সঙ্গে শ্রীপ্রভুর লীলা রঙ্গ ভারি ॥ ১ ॥
বড় রহস্যের কথা বড়ই রগড় ।
দীক্ষা শিক্ষা তাঁর মধ্যে অতীব সুন্দর ॥ ২ ॥
শুদ্ধাচারী হলধারী সাধক সজ্জন ।
ভাগবত গীতাদি অধ্যাত্ম রামায়ণ ॥ ৩ ॥
বেদান্তেরও ভাব-মর্ম ভালরূপে জানা ।
নানাবিধ দেবকার্যে বিজ্ঞ এক জনা ॥ ৪ ॥
বাল্যকাল এক সঙ্গে স্বদেশে যাপন ।
যৌবনে পূজক কর্মে এখানে মিলন ॥ ৫ ॥
পুরীতে কাটিল কাল সাত বর্ষ প্রায় ।
কতই ঘটনাবলী কহনে না যায় ॥ ৬ ॥
হইল প্রত্যক্ষীভূত লোচন-সকাশ ।
তথাপি প্রভুতে নাহি উপজে বিশ্বাস ॥ ৭ ॥
পরিচয়ে শুন কথা অতীব মধুর ।
ভাবাতীত ভক্ত ভাবী লীলার ঠাকুর ॥ ৮ ॥
বসিতেন স্বতঃসিদ্ধ অনুরাগভরে ।
জগমাতা অম্বিকায় পুজিবার তরে ॥ ৯ ॥
আপনে আপুনি প্রভু হইয়া বিভোর ।
বিগলিত দর ঘর নয়নেতে লোর ॥ ১০ ॥
আবেশেতে বাহ্যহারা জড়বৎ প্রায় ।
অপরূপ কান্তিছটা বদনে বেরায় ॥ ১১ ॥
প্রত্যক্ষ করিয়া হলধারী মনে করে ।
নিশ্চয় ঈশ্বরাবেশ ইহার ভিতরে ॥ ১২ ॥
হইলে ভাবের ভঙ্গ প্রভুদেবে কয় ।
এবারে তোমারে ভায়া বুঝেছি নিশ্চয় ॥ ১৩ ॥
এবারে গিয়াছে মোর আঁখি-ধাঁধা ভ্রম ।
ফাঁকি দিতে আর নাহি হইবে সক্ষম ॥ ১৪ ॥
দেখেছি ঈশ্বরাবেশ তোমার ভিতরে ।
এত শুনি প্রভুদেব কহিলা তাঁহারে ॥ ১৫ ॥
দেখা যাবে মতি স্থির রাখহ কেমনে ।
গোলযোগ আর যেন নাহি হয় ভ্রমে ॥ ১৬ ॥
অনন্তর দেবসেবা-কার্যাদির শেষে ।
বসিলেন হলধারী মনের হরিষে ॥ ১৭ ॥
অতি প্রিয় নখ্যপাত্র ল'য়ে আপনার ।
করিবারে শাস্ত্রাদির তত্ত্বের বিচার ॥ ১৮ ॥
হেনকালে প্রভুদেব উপনীত তথা ।
দাঁড়িয়া শুনেন তত্ত্ববিচারের কথা ॥ ১৯ ॥
কিছু পরে দাদারে কহেন গুণমণি ।
পড়েছ যে সব শাস্ত্র আমি তাহা জানি ॥ ২০ ॥
বিদ্যা অভিমানী দাদা নস্য নাকে দিয়ে ।
গ্রীবোন্নত সহ চক্ষু বিস্তার করিয়ে ॥ ২১ ॥
গরজি গম্ভীর স্বরে প্রভুদেবে কন ।
বুঝিস কি তুই গণ্ডমূর্খ একজন ॥ ২২ ॥
নিজ দেহ দেখাইয়া প্রভুর উত্তর ।
সে দেয় বুঝায়ে যে ইহার ভিতর ॥ ২৩ ॥
এই কিছুক্ষণ আগে তুমিই কহিলে ।
ঈশ্বরের আবির্ভাব আছে এই খোলে ॥ ২৪ ॥
অধিক গম্ভীরভাবে কহে আর বার ।
কল্কি ছাড়া কলিতে কি আছে অবতার ॥ ২৫ ॥
পাগল উন্মত্ত তুই হয়েছিস এবে ।
তাই নিস আপনাকে অবতার ভেবে ॥ ২৬ ॥
তবে মৃদুমন্দ হাসি শ্রীপ্রভুর বোল ।
এই যে বলিলে আর নাহি হবে গোল ॥ ২৭ ॥
বুঝেছ জেনেছ মোরে গেছে আঁখি-ভ্রম ।
তবে এবে অন্যরূপ কহ কি কারণ ॥ ২৮ ॥
তখন কে আর দেয় সে কথায় কান ।
সজোরে উঠেছে ঘটে বিদ্যা-অভিমান ॥ ২৯ ॥
দাস্যভাবে রামাৎ-সাধনে তারপর ।
বস্ত্রহীনে মুত্রত্যাগ গাছের উপর ॥ ৩০ ॥
দেখিয়া তখন দাদা বুঝেছ প্রমাদ ।
বায়ূরোগে গদাধর দুরন্ত উন্মাদ ॥ ৩১ ॥
অপর ঘটনা কিবা শুন দিয়া মন ।
শরৎ-পূর্ণিমা চাঁদ উজ্জ্বল কিরণ ॥ ৩২ ॥
গগনে উদয় হ'য়ে বিতরয়ে ভাতি ।
ধরিয়াছে ধরামাতা মোহন মুরতি ॥ ৩৩ ॥
রাতি কিবা দিনমান বুঝা নাহি যায় ।
দশদিক আলোময় কিরণমালায় ॥ ৩৪ ॥
এহেন সময়ে পূর্ণ জ্ঞানী প্রভুরায় ।
অমা কি পূর্ণিমা আজি পুছিলা দাদায় ॥ ৩৫ ॥
ঈষদ্ধাস্যে ব্যঙ্গভাবে হলধারী কয় ।
ভুবনে এমন মূর্খ দ্বিতীয় না হয় ॥ ৩৬ ॥
অমা কি পূর্ণিমা আজি তাও নাহি জানে ।
ইহাকে আবার দেশে দেশে গুণে মানে ॥ ৩৬ ॥
পূর্ণ জ্ঞানে একাকার নাহি রকমারি ।
আঁধার আলোক এক দিবা বিভাবরী ॥ ৩৭ ॥
প্রকৃতির বিচিত্রতা সব লোপ পায় ।
ভেদাভেদহীন তত্ত্ব আসে না মাথায় ॥ ৩৮ ॥
পূর্ণজ্ঞানী হ'য়ে প্রভু হইলা পাগল ।
জ্ঞানী গণ্য জ্ঞানহীন মানুষের দল ॥ ৩৯ ॥
অধীত-শাস্ত্রাদি দাদা মান্য একজনা ।
বিবেক বৈরাগ্য-হীনে দিনমানে কানা ॥ ৪০ ॥
ধারণা ছিল না কিছু শাস্ত্রমর্মে তাঁর ।
কাজেই শ্রীপ্রভু মূর্খ বিচারে দাদার ॥ ৪১ ॥
কৃপা কর মহামায়া চৈতন্যদায়িনী ।
জন্ম জন্ম রব মূর্খ নাহি তাহে হানি ॥ ৪২ ॥
ভুলি না জননী যেন মায়াবিনাশন ।
নিরুপমা রক্তোৎপল দুখানি চরণ ॥ ৪৩ ॥
একদিন বাল্যভাবী প্রভু অকপটে ।
উপনীত হলধারী দাদার নিকটে ॥ ৪৪ ॥
যে কালে আছিলা তেহ বিচারেতে মত্ত ।
আধ্যাত্মিক জগতের সূক্ষ্মতর তত্ত্ব ॥ ৪৫ ॥
শ্রীপ্রভু কহিলা তাঁয় জানিতে বারতা ।
ভাবযোগে ঈশ্বরীয় দর্শনের কথা ॥ ৪৬ ॥
তাহার উত্তরে দাদা হলধারী কয় ।
ভাবে যাহা দেখিয়াছ ঠিক তাহা নয় ॥ ৪৭ ॥
আমার এ নয় কথা শাস্ত্রের কথিত ।
ভাবরাজ্যপুরী ছাড়া তিনি ভাবাতীত ॥ ৪৮ ॥
সরল বিশ্বাসী প্রভু জন্মজাত গুণ ।
দাদার কথায় চিত্তে উঠিল আগুন ॥ ৪৯ ॥
বিষাদে কাতর নাদে কান্দিয়ে কান্দিয়ে ।
করুণ বিলাপে কন মায়ে সম্বোধিয়ে ॥ ৫০ ॥
একি শুনি ওমা শ্যামা কি তুই করিলি ।
দেখে মুখ্খু নিরক্ষর মোরে ফাঁকি দিলি ॥ ৫১ ॥
মর্মভেদী রোদনের কি কব কাহিনী ।
নয়নের নীরধারে তিতিল ধরণী ॥ ৫২ ॥
হেনকালে কি হইল শুন অতঃপর ।
নিবিড় কুয়াশাধূম নয়নগোচর ॥ ৫৩ ॥
তাহার ভিতর থেকে উঠে আচম্বিত ।
সুন্দর পুরুষ শ্মশ্রু আবক্ষ লম্বিত ॥ ৫৪ ॥
প্রভু প্রতি স্থির দৃষ্টি রাখি কিছুক্ষণ ।
"ভাব মুখে থাক্ তুই" কহি এ বচন ॥ ৫৫ ॥
বারত্রয় ঐ কথা উপদেশ দিয়ে ।
ধূয়ার মানুষ গেল ধুয়ায় মিলিয়ে ॥ ৫৬ ॥
তবে না হইল শান্ত প্রভুর হৃদয় ।
আর না দাদার বাক্যে করেন প্রত্যয় ॥ ৫৭ ॥
হলধারী একদিন কহে আর বার ।
তমোগুণময়ী দেবী কালিকা তোমার ॥ ৫৮ ॥
তাঁহাকে ভজিলে নাহি হবে কোন ফল ।
উন্নতির পথে কাঁটা দিতেছ কেবল ॥ ৫৯ ॥
বড়ই লাগিল কথা শ্রীপ্রভুর প্রাণে ।
বিশেষতঃ আপনার ইষ্টনিন্দা শুনে ॥ ৬০ ॥
তখন না কহি কিছু প্রভু গুণমণি ।
কালীর মন্দির মুখে চলিলা অমনি ॥ ৬১ ॥
মাতৃগতপ্রাণ প্রভু সজল নয়নে ।
কন মাতা অম্বিকায় কাতর বচনে ॥ ৬২ ॥
তুই কি তামসী দেবী হলধারী কয় ।
শেলের সমান কথা প্রাণে নাহি সয় ॥ ৬৩ ॥
সত্য তত্ত্ব কহ মোরে স্বরূপ তোমার ।
বুঝাইয়া দিলা শ্যামা ছাওয়ালে তাঁহার ॥ ৬৪ ॥
মায়ের বচন শুনি হ'য়ে উল্লসিত ।
দাদার সম্মুখে ত্বরা হইল উপনীত ॥ ৬৫ ॥
তখন বসিয়ে দাদা পূজার আসনে ।
বিষ্ণুর মন্দিরে বিষ্ণুপুজার কারণে ॥ ৬৬ ॥
সম্মুখেতে পুঞ্জীকৃত পূজোপকরণ ।
নৈবেদ্যাদি ফল মূল কুসুম চন্দন ॥ ৬৭ ॥
স্কন্ধে তাঁর আরোহণে বসিলা ঠাকুর ।
রুধিয়া গর্জিয়া কন সম্মুখে বিষ্ণুর ॥ ৬৮ ॥
কি বুঝিয়া কহ মাকে তামসী কালিকা ।
মা আমার সর্বেশ্বরী জগতপালিকা ॥ ৬৯ ॥
সৃষ্টিস্থিতিলয় কর্মে ত্রিগুণধারিণী ।
গুণাতীতে তিনি পূর্ণব্রহ্ম সনাতনী ॥ ৭০ ॥
ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের স্কন্ধে আরোহণে ।
দাদার চৈতন্যোদয় পরশের গুণে ॥ ৭১ ॥
স্বীকার করিল তবে প্রভুর বচন ।
প্রভুতে কালিকাবেশ করে দরশন ॥ ৭২ ॥
সম্মুখস্থ কুসুমাদি চন্দনে মাখিয়ে ।
প্রভুর শ্রীপদে দেয় অঞ্জলি ভরিয়ে ॥ ৭৩ ॥
ভাবাবেশ-ভঙ্গে প্রভু ফিরিলা স্বস্থানে ।
আমূল বৃত্তান্ত হৃদু শুনিলেন কানে ॥ ৭৪ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে হৃদয় বিস্মিত ।
হলধারী যেথা তথা হয় উপনীত ॥ ৭৫ ॥
শ্রুত ঘটনাদি যত কহিল তাঁহাকে ।
তবে কেন বল পেয়েছে ভূতে মামাকে ॥ ৭৬ ॥
তদুত্তরে হলধারী হৃদয়েরে কন ।
গদায়ের ঈশ্বরাবেশ কৈনু দরশন ॥ ৭৭ ॥
কালীর মন্দিরে আমি যে সময়ে যাই ।
জানি না আমায় কিবা করেন গদাই ॥ ৭৮ ॥
বুঝিতে না পারি কিছু করিয়া বিচার ।
এ অতি বিচিত্র কাণ্ড বিচিত্র ব্যাপার ॥ ৭৯ ॥
কতই মা কৈল খেলা লীলার প্রাঙ্গণে ।
শ্রীপ্রভুর লীলারঙ্গ শ্রীপ্রভুই জানে ॥ ৮০ ॥
মথুরের সঙ্গে রঙ্গ শুন পরিচয় ।
সে আবার অন্যরূপ এরূপের নয় ॥ ৮১ ॥
একদিন পুরীমধ্যে হয় বিচরণ ।
মথুরের সঙ্গে নানা কথোপকথন ॥ ৮২ ॥
জানি না কি ভাবে প্রভু কহিলা মথুরে ।
মায়ের ঐশ্বর্যতত্ত্ব কে বুঝিতে পারে ॥ ৮৩ ॥
মহৈশ্বর্যময়ী কালী অনন্ত আধারা ।
অপার ঐশ্বর্য তাঁর না হয় কিনারা ॥ ৮৪ ॥
মায়ের সৃষ্টিতে দেখ ছোট বড় নাই ।
বড়টিও যেন বড় ছোটটিও তাই ॥ ৮৫ ॥
দেখ ঐ জবার গাছ সম্মুখে তোমার ।
বলিহারি কারিগরি কত কি ইহার ॥ ৮৬ ॥
ফুল পত্র কাণ্ড মূল বিচিত্র কেমন ।
কি কৌশল প্রত্যেকের বিভিন্ন বরণ ॥ ৮৭ ॥
শুধু মাত্র নহে ভিন্ন কেবল বরণে ।
প্রত্যেকের প্রভেদ গুণে প্রত্যেকের সনে ॥ ৮৮ ॥
আরক্ত বরণ জবা ফুটে গাছময় ।
সব লাল একটিরও সাদা বর্ণ নয় ॥ ৮৯ ॥
ইচ্ছা যদি হয় ইচ্ছাময়ী অম্বিকার ।
দেখিবে লালের গাছে উদ্ভব সাদার ॥ ৯০ ॥
মথুর কহেন বাবা কথা অসম্ভব ।
রক্তিম জবার গাছে সাদার উদ্ভব ॥ ৯১ ॥
শ্রীপ্রভু উত্তরে কন এ নহে আশ্চর্য ।
সৃষ্টীশ্বরী যিনি যাঁর সৃষ্টি মহৈশ্বর্য ॥ ৯২ ॥
যাহা ইচ্ছা তাই তিনি পারেন করিতে ।
সৃষ্টিখানি হাতে তাঁর তিনিই সৃষ্টিতে ॥ ৯৩ ॥
এখন দেশের রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া রানী ।
আইন বিধান কত করেছেন তিনি ॥ ৯৪ ॥
চলিত আইন যাহা আছে বর্তমানে ।
হইলে তাঁহার ইচ্ছা রদ পর দিনে ॥ ৯৫ ॥
তার স্থানে আর অন্য করেন নূতন ।
যখন যা হয় ইচ্ছা তখনি তেমন ॥ ৯৬ ॥
এখানেও সেই ধারা আছে বিদ্যমান ।
ইচ্ছাময়ী অম্বিকার ইচ্ছাতে বিধান ॥ ৯৭ ॥
মথুর বলেন বাবা আশ্চর্য কাহিনী ।
প্রকৃতির এক গতি চিরকাল জানি ॥ ৯৮ ॥
বুঝিব তোমার বাক্যে সত্যতত্ত্ব আছে ।
সাদা জবা ফুটে যদি রক্তিমের গাছে ॥ ৯৯ ॥
চলিত প্রসঙ্গ আজি এইগানে ইতি ।
শ্রী প্রভুর লীলারঙ্গ অপূর্ব ভারতী ॥ ১০০ ॥
মথুর সসঙ্গ প্রভু তার পর দিনে ।
বিহার করেন রঙ্গে সে সেই বাগানে ॥ ১০১ ॥
এখানে ওখানে ঘুরি উপনীত পিছে ।
রক্তিম জবার গাছ যেইখানে আছে ॥ ১০২ ॥
দেখিলেন সে গাছের কোন এক বঁটে ।
লাল সাদা জবা দুটি রহিয়াছে ফুটে ॥ ১০৩ ॥
বাহ্যিক বিস্ময় সহ শ্রীমথুরে কন ।
এক বঁটে লাল সাদা উভয় রকম ॥ ১০৪ ॥
ফুটেছে কেমন ফুল দেখ না গো চেয়ে ।
দাঁড়িয়ে মথুর দেখে অবাক হইয়ে ॥ ১০৫ ॥
নীরব মথুর মনে বাক্য নাহি আর ।
মনে মনে বুঝিলেন এ কার্য বাবার ॥ ১০৬ ॥
সে অবধি আর নাহি প্রতিবাদে কয় ।
যা বলেন বাবা করে তাহাতে প্রত্যয় ॥ ১০৭ ॥
আর দিন প্রভুদেব সুগভীর ধ্যানে ।
মথুর দেখেন চেয়ে রহি সংগোপনে ॥ ১০৮ ॥
প্রশান্ত গম্ভীর মূর্তি অটল অচল ।
বদনে উদয় জ্যোতিঃ পরম উজ্জ্বল ॥ ১০৯ ॥
বদনমণ্ডল গোটা ঝল মল করে ।
দিব্যময় ভাবোচ্ছ্বাসে হৃদয় মাঝারে ॥ ১১০ ॥
সতৃষ্ণ নয়নে দেখে পলকবিহীন ।
প্রভুর শ্রীদেহমধ্যে করিয়া বিলীন ॥ ১১১ ॥
যেন মহাদেব দেব যোগের আসনে ।
ধ্যানে মগ্ন জগতের কল্যাণ-সাধনে ॥ ১১২ ॥
মনে মনে ভাবিতেছে ভক্ত শ্রীমথুর ।
অমানবী যাবতীয় কাণ্ড শ্রীপ্রভুর ॥ ১১৩ ॥
উচ্ছ্বাসে উতলা হৃদি আনন্দের ভরে ।
চরণ ধরিয়া লুটে মনে মনে করে ॥ ১১৪ ॥
কষ্টেতে ধৈরয ধরি সম্বরে উচ্ছ্বাস ।
প্রভুর অধিক রঙ্গ দেখিবার আশ ॥ ১১৫ ॥
শ্রীপ্রভুর নানাবিধ রঙ্গ রূপ হেরে ।
শ্রীপদে বিশ্বাস ভক্তি দিনে দিনে বাড়ে ॥ ১১৬ ॥
মথুরের মত ব্যক্তি অতুল ভুবনে ।
বাহান্তর বিভূষিত বহু বহু গুণে ॥ ১১৭ ॥
শৌর্য বীর্য সহিষ্ণুতা সৌন্দর্য অতুল ।
মান্য গণ্য সুজনতা সম্পত্তি বিপুল ॥ ১১৮ ॥
ন্যায়নিষ্ঠ মিষ্টবাক্ উদার সরল ।
ইষ্টপদে ভক্তি প্রীতি ভুবনে বিরল ॥ ১১৯ ॥
একাধারে সমাবেশ নিরুপম গুণ ।
লীলায় মথুর যেন দ্বিতীয় অর্জুন ॥ ১২০ ॥
লীলায় ভাণ্ডারি-বেশে নরদেহে আসা ।
প্রভুর ও তাহার প্রতি প্রীতি ভালবাসা ॥ ১২১ ॥
শ্রীপদে অটলবৎ রাখিতে মথুরে ।
ইষ্টরূপে দরশন দিলেন এবারে ॥ ১২২ ॥
শ্রীপ্রভুর আবাস-মন্দির যেইখানে ।
তাহার কিঞ্চিৎ দূর পূর্বোত্তর কোণে ॥ ১২৩ ॥
আছয়ে বারাণ্ডা এক অতি সুশোভন ।
পূর্ব পশ্চিমেতে লম্বা দীর্ঘ আয়তন ॥ ১২৪ ॥
তদুত্তরে ফুলের বাগান মনোহর ।
নানাজাতি ফুটে ফুল সৌরভ বিস্তর ॥ ১২৫ ॥
তাহার পূরব ভাগে বাবুদের কুঠি ।
দক্ষিণে সোপানাবলী অতি পরিপাটি ॥ ১২৬ ॥
ভক্তবর শ্রীমথুর বসিয়া সোপানে ।
নানাবিধ করে চিন্তা একাকী আপনে ॥ ১২৭ ॥
হেনকালে শ্রীমথুর দেখিবারে পায় ।
আপনে আপুনি মগ্ন প্রভুদেব রায় ॥ ১২৮ ॥
বারাণ্ডার পাদ চালি এধার ওধার ।
কাহারও উপরে লক্ষ্য মোটে নাহি তাঁর ॥ ১২৯ ॥
পশ্চিমাশ্যে যে সময় শ্রীপ্রভুর গতি ।
সে সময় দেবদেব মহেশ-মূরতি ॥ ১৩০ ॥
পূর্বাস্থ্যে যখন প্রভু ফিরেন আবার ।
তখন মোহিনী ঠামা প্রতিমা শ্যামার ॥ ১৩১ ॥
গড়ন আকৃতি ঠিক সমতুল সাথে ।
অবিকল যেন দেবী মন্দিরের মাঝে ॥ ১৩২ ॥
শিবকালী যুগ্মরূপ প্রভুর শরীরে ।
ভাগ্যবান শ্রীমথুর দেখে বারে বারে ॥ ১৩৩ ॥
মথুর প্রথমে বুঝে আঁখির বিকার ।
পূর্ববৎ তাই যত দেখে বারংবার ॥ ১৩৪ ॥
আনন্দ-উচ্ছ্বাস হৃদে এত বলবতী ।
মথুর হইল যাহে ধৈরয-বিচ্যুতি ॥ ১৩৫ ॥
দ্রুতগতি উপনীত প্রভুর নিকটে ।
ধরিয়া চরণপদ্ম কাঁদে আর লুটে ॥ ১৩৬ ॥
ঠাকুর বলেন হেন করিতে যে নাই ।
তুমি গণ্য মান্য বাবু রানীর জামাই ॥ ১৩৭ ॥
অপরে দেখিলে পরে কি কবে তোমায় ।
এত বলি সান্ত্বনা করেন প্রভুরায় ॥ ১৩৮ ॥
তখন কি শুনে কথা কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে ।
বারংবার পদদ্বয় ধরে জড়াইয়ে ॥ ১৩৯ ॥
তবে জিজ্ঞাসিল প্রভু হেন কি কারণ ।
বৃত্তান্ত খুলিয়া কহ করিব শ্রবণ ॥ ১৪০ ॥
মুখে না বেরায় বাণী গদ্গদ স্বরে ।
আমূল দর্শন যাহা কহিল গোচরে ॥ ১৪১ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন একি কথা কহ তুমি ।
কি জানি আমি তো বাবু কিছুই না জানি ॥ ১৪২ ॥
মথুর না শুনে কথা মুখপানে চায় ।
ধরিয়া অভয় পদ অবনী লুটায় ॥ ১৪৩ ॥
নানামতে বুঝাইতে তবে তারপর ।
ক্রমে ক্রমে ধীরে ধীরে শান্ত ভক্তবর ॥ ১৪৪ ॥
করজোড় করি কহে বুঝিনু সকল ।
সত্যই ফলিল মোর ঠিকুজির ফল ॥ ১৪৫ ॥
মথুরের ঠিকুজিতে লেখা হেন কথা ।
সশরীরে সঙ্গে রবে তার ইষ্ট মাতা ॥ ১৪৬ ॥
প্রত্যক্ষ করিয়া আজি ঠিকুজির ফল ।
শ্রীপদে উপজে ভক্তি বিশ্বাস অটল ॥ ১৪৭ ॥
দুঁহু সঙ্গে দোঁহাকার সম্বন্ধ মধুর ।
সেবক ভাণ্ডারী সখা মন্ত্রী শ্রীমথুর ॥ ১৪৮ ॥
প্রভুরও অপার কৃপা মথুরে প্রতি ।
ত্রাতা পাতা রক্ষাকর্তা দুকালের গতি ॥ ১৪৯ ॥
একদিন প্রভুদেব শিবের মন্দিরে ।
করেন মহিম্নঃস্তোত্র পাঠ ধীরে ধীরে ॥ ১৫০ ॥
মহেশ-মাহাত্ম্যগাথা স্তোত্র বিরচিত ।
তাহাতে শ্রীপ্রভুদেব হন ভাবান্বিত ॥ ১৫১
॥
তখন ভুলিয়া স্তব উচ্চৈঃস্বরে কন ।
ওগো মহাদেব তব মহিমা-কথন ॥ ১৫২ ॥
কেমনে কহিব
আমি কি শক্তি আমার ।
গণ্ড বেয়ে দুনয়নে বহে অশ্রুধার ॥ ১৫৩ ॥
শুনিয়া রোদন রোল যে
যেখানে ছিল ।
ব্যাপার জানিতে সেথা আসিয়া জুটিল ॥ ১৫৪ ॥
উন্মত্ত পাগল প্রভু
তাহাদের চোখে ।
রহস্য কৌতুকবৎ দাঁড়াইয়া দেখে ॥ ১৫৫ ॥
নানাজনে কহে নানা উপহাস করি ।
কেহ কয় আজি বড় কাণ্ড বাড়াবাড়ি ॥ ১৫৬ ॥
কেহ কয় এমন কোথাও নাহি দেখি ।
কেহ বলে
শিবের ঘাড়েতে চড়ে নাকি ॥ ১৫৭ ॥
কেহ কর কাছে গিয়া সামালো সামালো ।
হাত ধ'রে
বাহিরেতে টেনে আনা ভাল ॥ ১৫৮ ॥
শুভ যোগ শ্রীমথুর আজি এইখানে ।
আসিছেন দ্রুতগতি
কোলাহল শুনে ॥ ১৫৯ ॥
সসম্ভ্রমে ভৃত্যগণে ছেড়ে দিল বাট ।
যেখানে জমিয়াছে মানুষের হাট ॥ ১৬০ ॥
দেখিল মন্দিরমধ্যে গুণাকর রায় ।
ভাবেতে বিভোর চিত্ত শিবমহিমায় ॥ ১৬১ ॥
মথুর দেখিয়া চিত্র মুগ্ধ অতিশর ।
নীরব আলেখ্যবৎ দাঁড়াইয়া রয় ॥ ১৬২ ॥
একজন কর্মচারী কহে যুক্তিমতে ।
টানিয়া আনিতে দেবে মন্দির হইতে ॥ ১৬৩ ॥
বিরক্তিব্যঞ্জক স্বরে কহেন মথুর ।
কার সাধ্য শ্রীঅঙ্গ পরশে শ্রীপ্রভুর ॥ ১৬৪ ॥
মাথার উপরে মাথা যে জনার আছে ।
সেই যেন এ সময় যায় ওঁর কাছে ॥ ১৬৫ ॥
পশ্চাতে আসিল বাহ্য ভাব-অবসানে ।
দেখেন লোকের হাট বসেছে পেছনে ॥ ১৬৬ ॥
তন্মধ্যে মথুরানাথ সবার অগ্রণী ।
বালকের মত ত্রস্ত হ'য়ে গুণমণি ॥ ১৬৭ ॥
কহিলেন মথুরের মুখপানে চেয়ে ।
করে কি ফেলেছি কিছু বেসামাল হ'য়ে ॥ ১৬৮ ॥
মথুর কহিল অগ্রে করিয়া প্রমাণ ।
তুমি তো করিতেছিলে শিবস্তুতি গান ॥ ১৬৯ ॥
না বুঝিয়া কর্ম মর্ম যদি কোন জনে ।
তোমারে বিরক্ত করে সেই সে কারণে ॥ ১৭০ ॥
সাবধানে সসতর্কে হেথা বহুক্ষণ ।
দাঁড়াইয়া আছি আমি দ্বারীর মতন ॥ ১৭১ ॥
ধন্য ধন্য শ্রীমথুর ধন্য ধন্য তুমি ।
তোমার শাশুড়ী ধন্য রানী রাসমণি ॥ ১৭২ ॥
তোমার গৃহিণী ধন্য জগদম্বা নাম ।
তোমাদের যেহ কেহ সকলে প্রণাম ॥ ১৭৩ ॥