দ্বিতীয় খণ্ড
যোগ-সাধন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা শ্রবণমঙ্গল ।
গাইলে প্রফুল্ল হয় হৃদয়কমল ॥ ১ ॥
মন-ভূঙ্গ সুসৌরভে বসে গিয়া তায় ।
কমল-আসন গুরুচরণ-সেবায় ॥ ২ ॥
একদিন প্রভুদেব বসি বটমূলে ।
দেখিলা বসিয়া আছে পাখী দুটি ডালে ॥ ৩ ॥
একটি সুস্থির অন্য সচঞ্চল-কায় ।
হেলে দুলে নড়ে বুলে যেন ইচ্ছা যায় ॥ ৪ ॥
চঞ্চল
সুস্থির পানে চায় ঘনে ঘন ।
দেখিয়া সুস্থির করে বিস্তার বদন ॥ ৫ ॥
চঞ্চল ঢুকিল তার বদন বিবরে ।
হেন কালে চক্ষু বন্ধ করিল সুস্থিরে ॥ ৬ ॥
দেখিয়া প্রভুর হৈল চমকিত মন ।
এহেন ব্যাপার কিবা কিসের কারণ ॥ ৭ ॥
আত্মা-পরমাত্মা-তত্ত্ব হৃদয়ে উদয় ।
সচঞ্চল জীব আত্ম অন্য কিছু নয় ॥ ৮ ॥
সুখ দুঃখ হেতু মাত্র হেসে কেঁদে বুলে ।
সাক্ষী সব পরমাত্মা দেখিছে নিশ্চলে ॥ ৯ ॥
জীব আত্মাগত ধর্ম হেন রূপ রয় ।
সাধনা করিলে পরমাত্মে হয় লয় ॥ ১০ ॥
যো করি কিবা মর্ম হইতে বিদিত ।
অনুরাগী প্রভুদেব উৎকণ্ঠিত চিত ॥ ১১ ॥
ব্রাহ্মণী-সাহায্যে হইয়াছে সমাপন ।
তন্ত্রমতে যত কিছু সাধন-ভজন ॥ ১২ ॥
এবে যারে বলে পরব্রহ্ম নিরাকার ।
নির্গুণ নিষ্ক্রিয় জ্যোতি রূপাদির পার ॥ ১৩ ॥
আগোটা সৃষ্টির যেথা সত্তা হয় লয় ।
সে তত্ত্ব হইতে জ্ঞাত করিলা নিশ্চয় ॥ ১৪ ॥
এখন শ্রীপ্রভুদেব মানুষ-আকার ।
জৈব ভাবে আচরণ আহার বিহার ॥ ১৫ ॥
সাধন-ভজনে হয় গুরু প্রয়োজন ।
আপনি আসিয়া সঙ্গে হয় সংযোটন ॥ ১৬ ॥
এবে শুন বর্তমানে গুরুর বারতা ।
লীলারস-পরিপূর্ণ রগড়ের কথা ॥ ১৭ ॥
যোগসাধনার চিন্তা হয় দিবানিশি ।
হাজির এহেন কালে জনৈক সন্নাসী ॥ ১৮ ॥
হেথা কিবা প্রয়োজন এখানে কেমনে ।
উদ্দেশ্য যাইবে গঙ্গাসাগর-সঙ্গমে ॥ ১৯ ॥
অতিথিশালায় তাই পুরীর ভিতর ।
অদ্ভুত প্রভুর সঙ্গে মিলন খবর ॥ ২০ ॥
একদিন প্রভুদেব শ্যামার মন্দিরে ।
পূর্বমুখে সমাসীন প্রতিমা-গোচরে ॥ ২১॥
ভাবের আবেশভরে দেখিবারে পান ।
নামিয়া গঙ্গায় এক সাধু করে স্নান ॥ ২২ ॥
কৃতকর্ম যোগিবর তেজঃপুঞ্জকায় ।
প্রাচীন বয়স জটাসম্ভার মাথায় ॥ ২৩ ॥
কৌপীন নাহিক নেংটা উলঙ্গ-আচারী ।
যোগিজন-অগ্রগণ্য নাম তোতাপুরী ॥ ২৪ ॥
তোতায় দেখিয়া তাঁর বড় খুশী মন ।
অতিথিশালায় দু'হে হৈল সম্মিলন ॥ ২৫ ॥
তোতাও তেমতি প্রীত প্রভুদেবে হেরে ।
বাসনা প্রভুর সঙ্গে আলাপন করে ॥ ২৬ ॥
মনোমত মুর্তি শক্তি গায়ে করে খেলা ।
মনে সাধ পায় যদি করে তাঁর চেলা ॥ ২৭ ॥
তাই বলে প্রভুদেবে প্রফুল্লবদন ।
কি বাচ্চা করিবে কিছু সাধন ভজন ॥ ২৮ ॥
উত্তর বচনে প্রভু বলিলেন তাঁকে ।
পশ্চাৎ কহিব কথা জিজ্ঞাসিয়া মাকে ॥ ২৯ ॥
মাতৃগতপ্রাণ প্রভু জিজ্ঞাসিতে মায় ।
চলিলা মন্দিরমধ্যে প্রতিমা যেথায় ॥ ৩০ ॥
বালকের চেয়ে প্রভু বালক সরল ।
যতেক ঘটনা মায়ে কহিলা সকল ॥ ৩১ ॥
বালকবৎসলা মাতা অতি তুষ্ট মনে ।
দিলা আজ্ঞা ভাবাতীত অরূপ সাধনে ॥ ৩২ ॥
সেই সঙ্গে সমাগত সন্ন্যাসীর কথা ।
আমূল জীবনে তার যতেক বারতা ॥ ৩৩ ॥
সাধনার পথে কতদূর আগুয়ান ।
এখানে কেমনে এবে কিবা তার নাম ॥ ৩৪ ॥
মনোমত দ্রব্য পেয়ে মায়ের সকাশে ।
বালক যেমন মহা আনন্দেতে ভাসে ॥ ৩৫ ॥
তেমনি আনন্দমতি প্রভুদেব রায় ।
পালটিয়া চলিলেন অতিথিশালায় ॥ ৩৬ ॥
আগ্রহে সন্ন্যাসিবর উপবিষ্ট যেথা ।
গিয়াই বলেন নাম তোমারই কি তোতা ॥ ৩৭ ॥
বিস্ময়ে পূর্ণিতান্তর তোতা ভাবে মনে ।
আমার যে তোতা নাম জানিল কেমনে ॥ ৩৮ ॥
এদেশে কাহারও সঙ্গে নাই জানা শুনা ।
ত্রিরাত্রির বেশী কোথা কভু নহে থানা ॥ ৩৯ ॥
এ তীর্থে ও তীর্থে অবিরত ভ্রাম্যমাণ ।
কেমনে পাইল বাচ্চা নামের সন্ধান ॥ ৪০ ॥
যোগসিদ্ধ যোগিবর সবিস্ময় মন ।
বলিলেন পরে প্রভু করিব সাধন ॥ ৪১ ॥
তোতা কহে তিন দিন মাত্র আমি রব ।
তীর্থপর্যটনে ঘুরি তীর্থান্তরে যাব ॥ ৪২ ॥
সুকৌশলী প্রভু যেন হেন আর কোথা ।
সর্বদা তোতার সঙ্গে অরূপের কথা ॥ ৪৩ ॥
আহার বিরাম নাই এত মত্ততর ।
সপ্তাহ চলিয়া যায় নাহিক খবর ॥ ৪৪ ॥
প্রভুকে পাইয়া তোতা মহাতোষ পায় ।
তীর্থগমনের কথা না আসে মাথায় ॥ ৪৫ ॥
ত্রাসিতা ব্রাহ্মণী হেথা শুনিয়া বারতা ।
বেদান্ত-সাধনে শ্রীপ্রভুর ব্যাকুলতা ॥ ৪৬ ॥
মিষ্টভাষে প্রভুদেবে করে নিবারণ ।
অরূপ সাধনে আছে কিবা প্রয়োজন ॥ ৪৭ ॥
কখন না কর হেন ইহাতে কি কাজ ।
শক্তি-প্রতিবাদী ভক্তিহীন যোগিরাজ ॥ ৪৮ ॥
বিশুষ্ক জ্ঞানের কাণ্ডে ভক্তি হয় ক্ষয় ।
যথা তত্ত্ব ব্রাহ্মণী কহিল সমুদয় ॥ ৪৯ ॥
কোন কথা ব্রাহ্মণীর না হয় শ্রবণ ।
সন্ন্যাস লইয়া সাধ ব্রহ্মের সাধন ॥ ৫০ ॥
দক্ষিণ শহরে এবে আই ঠাকুরাণী ।
গদাধর-গতপ্রাণ গদাই-পরানী ॥ ৫১ ॥
প্রভুরও তেমতি ভক্তি মায়ের উপর ।
কোথাও না দেখি শুনি হেন পূর্বাপর ॥ ৫২ ॥
মায়ের চরণধূলি মাখিতেন গায় ।
ঈশ্বরীর জ্ঞানে ভক্তি মাগিতেন মায় ॥ ৫৩ ॥
সকল কর্মের আগে উঠি প্রাতঃকালে ।
প্রণাম করেন মায়ে ভক্তি দাও বলে ॥ ৫৪ ॥
জননীরে দিলে কোন মনের বেদনা ।
বলিতেন শ্যামা তার না শুনে প্রার্থনা ॥ ৫৫ ॥
ঈশ্বরের পদে ভক্তি কখনও না মিলে ।
যদি ভাগ্যদোষে মাতা আঁখিজল ফেলে ॥ ৫৬ ॥
মাতা তুষ্টে সব তুষ্ট তুষ্ট জগজন ।
যত দেবদেবী তুষ্ট তুষ্ট নারায়ণ ॥ ৫৭ ॥
পরম দুর্লভ ভক্তি মিলে অনায়াসে ।
আজন্ম যদ্যপি কেহ জননীরে তোষে ॥ ৫৮ ॥
মায়ের সন্তোষ আর মাতৃপদে মন ।
সাধনার মধ্যে তাঁর এ এক সাধন ॥ ৫৯ ॥
আর বলিতেন প্রভু জগৎগোসাঁই ।
বাপ মায়ে হরগৌরী-সমজ্ঞান চাই ॥ ৬০ ॥
মায়ের পরানধন প্রভু গদাধর ।
সংসারে বিরাগহেতু চিন্তা নিরন্তর ॥ ৬১ ॥
সন্ন্যাসগ্রহণ-কথা যদি ঢুকে কানে ।
শেলের সমান ব্যথা লাগিবে পরানে ॥ ৬২ ॥
এতেক
বুঝিয়া প্রভু যোগিবরে কত ।
সংগোপনে করিবেন সন্ন্যাস গ্রহণ ॥ ৬৩ ॥
কারণ হইয়া জ্ঞাত যোগিবর খুশী ।
বেশ বলি দিল সায় ব্রহ্মজ্ঞ সন্ন্যাসী ॥ ৬৪ ॥
গোপনে গ্রহণ কৈলে নাহি কিছু হানি ।
শুভদিন নির্ধারিত হইল তখনি ॥ ৬৫ ॥
দীক্ষাকাণ্ডে নানাবিধ দ্রব্য প্রয়োজন ।
বিধানানুমত শ্রাদ্ধ হোমের কারণ ॥ ৬৬ ॥
আয়োজন সর্বাঙ্গীণ হইল সকল ।
শুভক্ষণহেতু দুয়ে সতত বিকল ॥ ৬৭ ॥
বিকলতা শ্রীপ্রভুর স্বতঃ স্বাভাবিক ।
শিষ্যপ্রেমে মুগ্ধ তোতা তা হ'তে অধিক ॥ ৬৮ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে সুলক্ষণ প্রত্যক্ষ বিরাজ ।
যাহে বিমোহিত চিত এত যোগিরাজ ॥ ৬৯ ॥
শুভদিন সমাগত দীক্ষা অঙ্গ শেষ ।
পরে সাধনাঙ্গে দিলা বিধি উপদেশ ॥ ৭০ ॥
নামরূপ রাজ্য থেকে গুটাইয়া মন ।
ভাবাতীতে গুণাতীতে করিতে মিলন ॥ ৭১ ॥
আজীবন শ্রীপ্রভুর ভাবরাজ্যে বাস ।
ভাবময়ী জগমাতা চরণে প্রয়াস ॥ ৭২ ॥
মহোল্লাস ভাবেশ্বরী মায়েরে দেখিয়ে ।
মন নাহি চায় যেতে তাঁহারে ছাড়িয়ে ॥ ৭৩ ॥
যেখানেতে ভাবাতীত ব্রহ্মের বিহার ।
দেশকালহীন রাজ্য শূন্য একাকার ॥ ৭৪ ॥
কাজেই আসেন বাহ্যে ফিরিয়ে ফিরিয়ে ।
তা দেখি ব্রহ্মজ্ঞ শুরু উঠে গরজিয়ে ॥ ৭৫ ॥
সূচামের বিদ্ধ ভূমি অণুর ভিতর ।
প্রবেশিয়া দাও মন করি সূক্ষ্মতর ॥ ৭৬ ॥
প্রাণপণে প্রভু পুনঃ বসিলা ধিয়ানে ।
ক্রমে উপনীত ভাবময়ীর ভুবনে ॥ ৭৭ ॥
নিরুপমা মূর্তি মার নয়নগোচর ।
জ্ঞান-অসি দিয়া রূপ কাটিলা সত্বর ॥ ৭৮ ॥
রূপ নষ্টে দ্রুতগতি ধাবমান মন ।
সমরস হয়ে ব্রহ্মে হইল মিলন ॥ ৭৯ ॥
দীক্ষাগুরু ব্রহ্মবাদী নিকটে বসিয়ে ।
শিষ্যের অবস্থা দেখে বিশেষ করিয়ে ॥ ৮০ ॥
নির্বিকল্প সমাধির যতেক লক্ষণ ।
সুস্পষ্ট শ্রীঅঙ্গে করে সব নিরীক্ষণ ॥ ৮১ ॥
তথাপি সন্দেহ তাঁর বার বার মনে ।
চল্লিশ বৎসর গতে সিদ্ধ যে সাধনে ॥ ৮২ ॥
এখানে কেমনে তাহা একদিনে হয় ।
ব্রহ্মজ্ঞ না পারে কিছু করিতে নির্ণয় ॥ ৮৩ ॥
সন্দেহমোচনে পুনঃ বসে পরীক্ষায় ।
পূর্ববৎ লক্ষণাদি দেখিবারে পায় ॥ ৮৪ ॥
তখন অর্গলবদ্ধ করিয়া দুয়ারে ।
প্রহরিস্বরূপ গুরু রহিল বাহিরে ॥ ৮৫ ॥
একদিন দুইদিন তিনদিন গেল ।
তথাপি প্রভুর সাড়া-শব্দ না পাইল ॥ ৮৬ ॥
তখন কুটীরে গিয়া দেখিল গোস্বামী ।
যে ভাবে প্রথমে দেখা এখন তেমনি ॥ ৮৭ ॥
প্রাণের সঞ্চার দেহে নহে অনুমান ।
ভিতরের বায়ু-রোধ জড়ের সমান ॥ ৮৮ ॥
আসনস্থ দেহখানি অটল অচল ।
শ্রীবদনে ভাতে জ্যোতি অতীব উজ্জ্বল ॥ ৮৯ ॥
সমাধি করিতে ভঙ্গ যে ক্রিয়ার বিধি ।
তাই আচরিয়া এবে ভাঙ্গায় সমাধি ॥ ৯০ ॥
প্রভুর রকম দেখি তোতা বুদ্ধিহারা ।
বুঝিয়া না পারে কিছু করিতে কিনারা ॥ ৯১ ॥
শ্রীপ্রভু তোমার খেলা বুঝে সাধ্য কার ।
তুমি জগতের গুরু কে গুরু তোমার ॥ ৯২ ॥
ধরি নানারূপ কর নরবৎ রীতি ।
কার্যেতে প্রকাশ পায় অতুল শকতি ॥ ৯৩ ॥
যোগিজন-অগ্রগণ্য যোগসিদ্ধ তোতা ।
সেও না খুঁজিয়া পায় কিছুই বারতা ॥ ৯৪ ॥
সর্বদার ঘোল খায় মাথা যায় ঘুরে ।
কাছে যেতে কৈলে চেষ্টা পড়ে বহুদূরে ॥ ৯৫ ॥
তাই কহে মায়া সব সত্য কিছু নয় ।
শুন কি হইল পরে তার পরিচয় ॥ ৯৬ ॥
মা বলিয়া যবে প্রভু শ্যামায় সন্তাষে ।
শক্তিতে বিশ্বাস শুনি তোতাপুরী হাসে ॥ ৯৭ ॥
সাকার ভ্রান্তির কথা বৈদান্তিক স্থানে ।
মায়ার ব্যাপার কয় কিছু নাহি মানে ॥ ৯৮ ॥
শক্তির সাবস্তে প্রভু যথা কথা কন ।
তোতা তত প্রতিবাদ করে সমর্থন ॥ ৯৯ ॥
সকল মায়ার খেলা কিছু নয় সত্য ।
তোতার উত্তর এই প্রভু কন যত ॥ ১০০ ॥
কেমনে নরের হৃদে উপজে বারতা ।
উভয় সাকার নিরাকার এক কথা ॥ ১০১ ॥
একত্রিত বিপরীত ভাব এক ঠাঁই ।
সকল রঙের ভূমি জগৎ-গোসাঁই ॥ ১০২ ॥
প্রভুর কৃপায় যাহা হৃদয়ে আভাস ।
না পাই কথায় তার করিতে প্রকাশ ॥ ১০৩ ॥
সাকারেতে রূপরসগন্ধাদি আকার ।
নিরাকারে কিছু নাই খবর তাহার ॥ ১০৪ ॥
মহান তটিনী-স্রোতে ভাসমান তরী ।
আরোহী কতই দেখে প্রান্তর নগরী ॥ ১০৫ ॥
ফলে ফুলে পরিপূর্ণ বৃক্ষলতাগণ ।
উচ্চশৃঙ্গ গিরিবর বিপিন কানন ॥ ১০৬ ॥
মনোহরা ধরা পরা নানাবিধ সাজে ।
দিনেশ চন্দ্রিমা তারা গগনে বিরাজে ॥ ১০৭ ॥
পলকে পলকে উঠে ভাবের লহরী ।
কিন্তু যবে সিন্ধুগত হয় সেই তরী ॥ ১০৮ ॥
তখন কি দেখে দেখ আরোহীর গণ ।
কারিগুরি রকমারি অদৃশ্য এখন ॥ ১০৯ ॥
সকল মিশেছে জলে কিছু নাহি আর ।
যে দিকে নেহারে হেরে বারি একাকার ॥ ১১০ ॥
গেছে চন্দ্র গেছে সূর্য গেছে গিরিবর ।
বিপিন কানন গেছে গিয়াছে প্রান্তর ॥ ১১১ ॥
গেছে ফুল-ফল-ভরা বৃক্ষলতাগণ ।
মনোহরা সাজে পরা ধরা সুশোভন ॥ ১১২ ॥
ভাবের লহরী গেছে তাহার সংহতি ।
গেছে মন গেছে প্রাণ গেছে বুদ্ধি স্মৃতি ॥ ১১৩ ॥
গিয়াছে আরোহিগণ গিয়াছে তরণী ।
কি দেখে কি দেখে আর কিছু নাহি জানি ॥ ১১৪ ॥
নিরাকার কি প্রকার প্রভুর বচন ।
গেলে তথা নহে আর পুনরাগমন ॥ ১১৫ ॥
জল মাপিবারে গেলে নুনের মানুষে ।
গলে যায় ঠাণ্ডা বায় ফিরে নাহি আসে ॥ ১১৬ ॥
কিন্তু মন দেখিয়াছি প্রভু পরমেশ ।
ক্ষণে ক্ষণে ভ্রমিতেন এদেশ ওদেশ ॥ ১১৭ ॥
দেহাদিবিলুপ্তভাবে যদি এই ক্ষণে ।
কিছু পরে মা মা রব ফুটে শ্রীবদনে ॥ ১১৮ ॥
জীবে যদি গুরুবলে সপ্তমেতে যায় ।
আর কার নাহি সাধ্য তাহারে ফিরায় ॥ ১১৯ ॥
শ্রীপ্রভুর মহাশক্তি যে শক্তির বলে ।
এই স্থিতি অতি ঊর্ধ্বে এই অধস্তলে ॥ ১২০ ॥
হেন প্রভু মানুষের বুঝা বড় দায় ।
একঘেয়ে সিদ্ধযোগী কত ঘোল খায় ॥ ১২১ ॥
সাধন-ভজনে হয় গুরু-প্রয়োজন ।
আগাগোড়া চিরকাল তাঁহার নিয়ম ॥ ১২২ ॥
পালিবারে স্বকৃত নিয়ম ভগবান ।
লোকশিক্ষা হেতুমাত্র গুরুরে আনান ॥ ১২৩ ॥
জগতের শুরু যিনি হর্তা পাতা ত্রাতা ।
কে আবার গুরু তাঁর কেবা শিক্ষাদাতা ॥ ১২৪ ॥
যেবা মহাভাগ্যবান গুরুরূপে আসে ।
অমুল্য রতন পায় প্রভুর সকাশে ॥ ১২৬ ॥
দম্ভ ভারি তোতাপুরী না মানে সাকার ।
যা দেখে যা শুনে কয় কৌশল মায়ার ॥ ১২৭ ॥
একদিন যোগিবর ধুনি জ্বেলে ব'সে ।
হেনকালে জনেক আগুন নিতে আসে ॥ ১২৮ ॥
যেমন লইল অগ্নি তোতা দেখি তায় ।
রাগেতে চিমটা ধরি তাড়া করি যায় ॥ ১২৯ ॥
ক্রুদ্ধ দেখি যোগিবরে শালা শালা বলি ।
বাহ্য কুপি প্রভুদেব দিলা তায় গালি ॥ ১৩০ ॥
রূপ গুণ কার্য যদি মায়ার সৃজন ।
কারে তবে কর ক্রোধ কারে আক্রমণ ॥ ১৩১ ॥
সলজ্জবদন তোতা বাক্য নাহি সরে ।
শুদ্ধমাত্র ঠিক বাত ঠিক বাত করে ॥ ১৩২ ॥
বচনে মানিল মাত্র আপনার ভ্রম ।
হৃদয় যেমন তাই পূর্বের মতন ॥ ১৩৩ ॥
সাকার শক্তিতে নাই কোনই বিশ্বাস ।
বরঞ্চ শুনিলে কথা করে উপহাস ॥ ১৩৪ ॥
পঞ্চবটমূলে তোতা সাজাইত ধুনি ।
তথায় কাটিয়া যায় আগোটা রজনী ॥ ১৩৫ ॥
সচৈতন্য সিদ্ধস্থান পঞ্চবটতল ।
যে করে সাধনা তথা না হয় বিফল ॥ ১৩৬ ॥
ভৈরবে সে স্থান রক্ষা করে নিরন্তর ।
তোতা রেতে কি দেখিল শুন অতঃপর ॥ ১৩৭ ॥
বিকটদর্শন সেই ভৈরব-আকার ।
আগুনের কাছে বসে নিকটে তোতার ॥ ১৩৮ ॥
দেখি তোতা কহে তায় ত্রাসশূন্যকায়া ।
তুমিও মায়ার চিত্র আমি যেন মায়া ॥ ১৩৯ ॥
সমুঝে সকল মায়া যাহা দেখে শুনে ।
সাকার শক্তির কথা আদতে না মানে ॥ ১৪০ ॥
শক্তির সম্বন্ধে প্রভু যত কন তায় ।
মায়া মায়া বলি তোতা হাসিয়া উড়ায় ॥ ১৪১ ॥
যদি প্রভু কোন দিন না করেন ধ্যান ।
বলিতেন যোগিবর প্রভু-সন্নিধান ॥ ১৪২ ॥
নিত্য প্রথামত ধ্যান না করিলে পরে ।
পিতলের পাত্রসম মনে ম'লা ধরে ॥ ১৪৩ ॥
যোগিবরে শ্রীপ্রভুর উত্তর হইত ।
পাত্র যদি হয় শুদ্ধ সুবর্ণে গঠিত ॥ ১৪৪ ॥
কেমনে ধরিবে ম'লা ওহে যোগিবর ।
শুনি তোতা একেবারে মৌন নিরুত্তর ॥ ১৪৫ ॥
তথাপি না বুঝে তোতা প্রভু কোন্ জনা ।
একমনে শুন মন পশ্চাৎ ঘটনা ॥ ১৪৬ ॥
সন্ধ্যাকালে একদিন দিয়া করতালি ।
নাচেন শ্রীপ্রভু মুখে হরিবোল বলি ॥ ১৪৭ ॥
সন্ন্যাসীরা এইমত হাতে পিটি পিটি ।
থাবার কারণ গড়ে ময়দার রুটি ॥ ১৪৮ ॥
প্রভু প্রতি কহে তোতা উপহাসছলে ।
দেখি হাতে পিটি রুটি কেমন করিলে ॥ ১৪৯ ॥
ইহা শুনি প্রভুদেব বুঝিলা কেমন ।
দিনত্রয় না করিলা কথোপকথন ॥ ১৫০ ॥
গালি দিয়া ক্রুদ্ধ যারে প্রভু ভগবান ।
ধরায় তাহার মত নাহি ভাগ্যবান ॥ ১৫১ ॥
রুষ্টে তুষ্টে সমফল মঙ্গল-আকর ।
রামকৃষ্ণ অবতার দয়ার সাগর ॥ ১৫২ ॥
যোগিবরে সাকার শক্তির স্বরূপত্ব ।
বিধিমতে শিক্ষা দিতে কৈলা স্থিরীকৃত ॥ ১৫৩ ॥
শিখাবার সুকৌশল হেন দেখি নাই ।
যেন দেখিতেছি প্রভু শ্রীগুরুর ঠাঁই ॥ ১৫৪ ॥
কথায় না বুঝে যেবা শিক্ষা পায় কাজে ।
আজন্ম স্মরণ শিক্ষা হাড়ে হাড়ে ভিজে ॥ ১৫৫ ॥
তোতারে কেমন শিক্ষা দিলা ভগবান ।
অতি রগড়ের কথা রহস্য আখ্যান ॥ ১৫৬ ॥
দুই তিন দিন মধ্যে সিদ্ধ যোগিবর ।
হইলেন উদরের পীড়ায় কাতর ॥ ১৫৬ ॥
রক্ত-আমাশয় পীড়া জীর্ণ শীর্ণ কায় ।
যন্ত্রণায় ভূমিতলে গড়াগড়ি যায় ॥ ১৫৭ ॥
রকম রকম খায় কতই ভসম ।
কিসেও না হয় কিছু পীড়া-উপশম ॥ ১৫৮ ॥
হরদম ল'য়ে লোটা যায় ছুটে ছুটে ।
শরীর ধনুকখানি বাম হাত পেটে ॥ ১৫৯ ॥
যন্ত্রণায় একদিন বড়ই অস্থির ।
স্থিরতর কৈল দিবে ছাড়িয়া শরীর ॥ ১৬০ ॥
সুরধুনীজলে মগ্ন মরণ উপায় ।
জ্ঞানশূন্য সিদ্ধযোগী নামিল গঙ্গায় ॥ ১৬১ ॥
প্রভুর ইচ্ছায় যোগিবর যার যত ।
কোথাও না পায় জল ডুবিবার মত ॥ ১৬২ ॥
পাতালপরশী জল গঙ্গার মাঝারে ।
তোতার নাহিক উঠে হাঁটুর উপরে ॥ ১৬৩ ॥
ভিতরে কৌশল কিবা ভাবিয়া না পাই ।
কে বুঝিবে কিবা কল করিলা গোসাঁই ॥ ১৬৪ ॥
বিফল প্রয়াস দেখি সিদ্ধ যোগিবর ।
কাঁদিতে কাঁদিতে আসে প্রভুর গোচর ॥ ১৬৫ ॥
কহিল তাঁহারে কত করিয়া মিনতি ।
কেমনে আরোগ্য হই করহ যুকতি ॥ ১৬৬ ॥
দয়া করি প্রভুদেব উত্তরিলা তায় ।
আরোগ্য যদ্যপি কর প্রণাম শ্যামায় ॥ ১৬৭ ॥
শুনা মাত্র চলিলেন শ্যামার মন্দিরে ।
করজুড়ি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম তোতা করে ॥ ১৬৮ ॥
ফিরে আসি দেখিলেন আর নাহি ব্যাধি ।
শক্তিতে বিশ্বাস তার হৈল তদবধি ॥ ১৬৯ ॥
ব্যাপারে বিস্ময়াপন্ন তোতা যোগিরাজ ।
মুখে নাই কোন বাক্য কানে করে কাজ ॥ ১৭০ ॥
এতদিনে পূর্ণজ্ঞান হৈল তোতার ।
প্রাণে প্রাণে বুঝিলেন যিনি নিরাকার ॥ ১৭১ ॥
নির্গুণ অরূপা নাম অনন্ত অখণ্ড ।
তিনিই বিরাটরূপে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড ॥ ১৭২ ॥
ক্রিয়াহীনে ব্রহ্মবাচ্য ক্রিয়াযুক্তে শক্তি ।
একভাবে জ্ঞান রূপ অন্য ভাবে ভক্তি ॥ ১৭৩ ॥
একের অবস্থাভেদে বিপরীত রীতি ।
নির্গুণে পুরুষ আর সগুণে প্রকৃতি ॥ ১৭৪ ॥
নব চক্ষু পেয়ে গেছে সব সন্দ ঘুচে ।
একে দেখে লক্ষ কোটি মহানন্দে নাচে ॥ ১৭৫ ॥
রূপের কথায় আগে ছিল উপহাস ।
এখন যা কন প্রভু করেন বিশ্বাস ॥ ১৭৮ ॥
পুরীমধ্যে দিনত্রয় থাকিবার কথা ।
একাদশ মাস এবে গত হৈল হেথা ॥ ১৭৯ ॥
প্রভুর মাহাত্ম্যকথা কি কহিব মন ।
কহিলেও কোটি কোটি তবু কোটি কন ॥ ১৮০ ॥
বিশুষ্ক জ্ঞানের কাণ্ড কেবল বিচার ।
রীতি ধরা সুর সেই একই প্রকার ॥ ১৮১ ॥
গম্ভীর গম্ভীর গতি নীরস নীরস ।
তিল মাত্র নাই রাগ-রাগিণীর রস ॥ ১৮২ ॥
আছিল বিশুদ্ধ যোগী জ্ঞান প্রখরায় ।
এবে প্রভু সঙ্গগুণে প্রভুর কৃপায় ॥ ১৮৩ ॥
মধুর সরস এবে মিঠানি মিঠানি ।
হৃদয়বীণায় বাজে ভক্তির রাগিণী ॥ ১৮৪ ॥
একদিন বীণাকণ্ঠ প্রভু গুণধর ।
শ্যামাগুণ গীত গান তোতার গোচর ॥ ১৮৫ ॥
ভাবেতে বিভোর তোতাপুরী যোগিবর ।
গণ্ড বেয়ে অশ্রু ঝরে বক্ষের উপর ॥ ১৮৬ ॥
কোথায় আছিল তোতা এখন কোথায় ।
ভাবরাজ্যেশ্বর প্রভু তাঁহার কৃপায় ॥ ১৮৭ ॥
রামকৃষ্ণ-গুণগীতি শ্রবণমঙ্গল ।
শ্রবণ-কীর্তনে মিলে ভক্তি নিরমল ॥ ১৮৮ ॥